বাংলা ছন্দ- স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত ছন্দের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য
ছন্দের সংজ্ঞা ও ছন্দের প্রয়োজনীয়তা
পরিমিত ও সুশৃঙ্খল বাক্যবিন্যাস, যা কাব্যকে রসঘন ও শ্রুতিমধুর করে তোলে, পাঠককে আকৃষ্ট করে, মোহিত করে, তা-ই ছন্দ। প্রশ্ন জাগে ছন্দ কেন বা কী ? তার উত্তর জানতেই এ বিষয়ের অবতারণা।
মানুষ সুন্দরের পুজারি। সে চায় তার সৃষ্টি সুন্দর ও রসালো হোক। আর মানুষ তার প্রয়োজনেই ছন্দকে বেছে নিয়েছে। তাই, ছন্দের সংজ্ঞা নিরূপণ কঠিন ব্যাপার। কোনো বস্তু বা বিষয়ের মধ্যে বিশেষ ধরনের গঠনগত শিল্প-শৃঙ্খলা ও সুষমাবোধজনিত প্রত্যাশা যদি সুশৃঙ্খলভাবে বারবার ঘুরে ফিরে আসে, তবে সেখানে ছন্দের সৃষ্টি হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে।
কবিতার ক্ষেত্রে ছন্দ হচ্ছে কাব্যভাষার প্রবহমান ধ্বনিসৌন্দর্য। কবি তার মনের অনুভূতিকে ছন্দের মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকে। কাব্য-ভাষার ক্ষেত্রে ধ্বনিসমূহের উচ্চারণের সময়ের সামঞ্জস্য বিধান করতে হয়। যেভাবে পদবিন্যাস করলে বাক্য শ্রুতিমধুর, হয় এবং মনে রসের সঞ্চার হয়, তাকে ছন্দ বলা যেতে পারে।
কবিতায় পরিমিত মাত্রার যে পর্ব গড়ে ওঠে, তাকে ঘিরেই ছন্দ গড়ে ওঠে। তাই বলা যায়, ধ্বনির সাথে সময়ের সামঞ্জস্য বিধান করার অন্য নাম ছন্দ।
বিভিন্ন পণ্ডিতদের ছন্দের সংজ্ঞা :
ডঃ সুনীতিকুমারের মতে ছন্দের সংজ্ঞা –
বাক্যস্থিত পদগুলোকে যেভাবে সাজাইলে বাক্যটি শ্রুতিমধুর হয় ও ভাষার মধ্যে ভাবগত ও ধ্বনিগত সুষমা উপলব্ধি হয়, পদ সাজাইবার সেই পদ্ধতিকে ছন্দ বলে।
প্রবোধ চন্দ্র সেনের মতে ছন্দের সংজ্ঞা — শিল্পিত বাকরীতির নামই ছন্দ।
অমূল্যধন মুখোপাধ্যায় ছন্দের সংজ্ঞা সম্পর্কে বলেন- যেভাবে পদবিন্যাস করিলে বাক্য শ্রুতিমধুর হয় এবং মনে রসের সঞ্চার হয়, তাহাকে ছন্দ বলে।
তারা পদ ভট্টাচার্যের মতে ছন্দের সংজ্ঞা – সাহিত্যিকরা ভাষার মাধ্যমে প্রবহমান ধ্বনি-সৌন্দর্য সৃষ্টি করেন তাই ছন্দ। ভাষাগত ধ্বনিসৌন্দর্য বা সুমঞ্জস ও তরঙ্গায়িত একটি পূর্ণ ধ্বনি প্রবাহকে ছন্দ বলা যেতে পারে।
মনীষীদের ছন্দের সংজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, হন্দের সংজ্ঞা নির্ধারণে সকলেই সাধারণত পদবিন্যাসরীতির উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই, পরিশেষে আমরা ছন্দের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলতে পারি যে,
বাক্য পরস্পরায় ভাষাগত ধ্বনিপ্রবাহের মধ্যে একটা সুসমঞ্জস, সংগীতমধুর ও তরঙ্গ সৃষ্টি করা যায় যে পরিমিত পদবিন্যাসের দ্বারা, সে পদবিন্যাসরীতিকে ছন্দ বলা যাবে।
অথবা,
যে বিশিষ্ট বিন্যাসের শব্দ-সজ্জায় সুপরিমিত কালগত ও ধ্বনিগত সুষমামণ্ডিত নৃত্যঝঙ্কার সৃষ্টি হয় এবং বক্তব্য বেগবান ও ব্যঞ্জনাধর্মী ও রসঘন ও শ্রুতিমধুর হয় তারই নাম ছন্দ।
উদাহরণ দেওয়া যাক-
বাঁশ বাগানের/ মাথার উপর/ চাঁদ উঠেছে/ ওই //,
মাগো আমার/শোলোক বলা/কাজলা দিদি/কই।//
অথবা,
গগনে গরজে মেঘ/ ঘন বরযা //
কূলে একা বসে আছি/নাহি ভরসা//
রাশি রাশি ভারা ভারা /
ধান কাটা হলো সারা //
ভরা নদী ক্ষুরধারা //
খরপরশা// –
কাটিতে কাটিতে ধান/ এল বরযা ।//

স্বরবৃত্ত ছন্দ কাকে বলে? স্বরবৃত্ত ছন্দের বৈশিষ্ট্য
অথবা, স্বরবৃত্ত ছন্দের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা প্রসঙ্গে আলোচনা করে দেখাও যে, যে কোনো প্রকারের ভাব ভাষা ও শব্দ গ্রহণের প্রবণতা এই ছন্দে সর্বাপেক্ষা বেশি।
ষ্বরবৃত্ত ছন্দের সংজ্ঞা : যে ছন্দরীতিতে উচ্চারণের গতিবেগ বা লয় দ্রুত, যাতে যতি ও শ্বাস পড়ে ঘন ঘন, পর্ব হয় ছোট বা চার মাত্রার, অক্ষরমাত্রই এক মাত্রার আর যার প্রতিপর্বের আদি অক্ষরে একটি করে প্রবল শ্বাসাঘাত থাকে, তার নাম স্বরবৃত্ত ছন্দ।
স্বরবৃত্ত বাংলার বনেদী ছন্দ। বাংলা ছড়া ও লোক-সাহিত্যে এর ব্যাপক ব্যবহারের কারণে একে ছড়ার ছন্দ ও লৌকিক ছন্দও বলা হয়ে থাকে। সর্ব সাধারণের কাছে এ ছন্দ সমান সমাদৃত বলে রবীন্দনাথ একে প্রাকৃত বাংলা ছন্দও বলেছেন। এটি বাংলার ঘরোয়া ছন্দ। কথ্য ভাষার সাথে এর আত্মিক যোগ আছে।
গম্ভীর ভাব প্রকাশের অনুকূল না হলেও এর একটা অনবদ্য ঝংকার আছে। মৌখিক ভঙ্গির তাজা রস ও জীবন্ত দীপ্তির জন্য বর্তমানে এর বিকাশ হচ্ছে। বিচিত্র ভঙ্গি ও রূপের জন্য যে-কোনো অভিজাত ছন্দ্যেরীতির সমকক্ষতা লাভ করেছে। রবীন্দ্রনাথ পলাতকা কাব্যে উচ্চ ভাবের কবিতায় এ ছন্দ প্রয়োগ করে তার প্রমাণ করেছেন। সংজ্ঞা ও প্রকৃতির দিক থেকে স্বরবৃত্ত ছন্দের আরও যে সব বৈশিষ্ট্য আছে তা নিম্নরূপ-
- এ ছন্দে উচ্চারণের গতিভঙ্গি বা লয় দ্রুত।
- প্রতি পর্বের আদি অক্ষরে একটি করে প্রবল শ্বাসাঘাত পড়ে।
- এ ছন্দে প্রতিটি অক্ষরের মাত্রামান সবসময়ই সুনির্দিষ্ট। মুক্তাক্ষর ও বদ্ধাক্ষর সব ক্ষেত্রেই এক মাত্রার।
- এ ছন্দে যতি ও শ্বাস পড়ে ঘন ঘন। এতে বাগযন্ত্রে ক্ষিপ্রতা বাড়ে। সেজন্য পর্বও হয় হ্রস্বতম অর্থাৎ চার মাত্রার।
- এ ছন্দের পূর্ণপর্ব হয় চার অক্ষরের চার মাত্রার। তাই পর্বাঙ্গ সব সময় দুই দুই ক্রমে হয় অর্থাৎ ঘট-ঘট ভদিতে।
- এ ছন্দে যুক্ত ব্যঞ্জনের উচ্চারণ সব সময় সংশ্লিষ্ট ভঙ্গিতে হয়। যেমন – ঊধ্র্ব এখানে র +ধ+ব এই তিনটি বর্ণ মিলে হচ্ছে একটি মাত্র যুক্তব্যঞ্জন অথচ এখানে অক্ষর দুটি – উর+ধ।
- এ ছন্দে পূর্ণ পর্ব বদ্ধাক্ষর ও মুক্তাক্ষর উভয় রীতির অক্ষরে গঠিত হয়।
- এ ছন্দে চরণ অতিক্রমকারী প্রবহমানতা সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্য নয়। তাই অমিত্রাক্ষর রচনা এতে সহজ ও স্বাভাবিক নয়।
- পর্ব ছোট বলে এতে মুক্তাক্ষরের বদলে ইচ্ছামত বদ্ধাক্ষর সমাবেশ করা সম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় — এ ছন্দের শোষণশক্তি তেমন নেই।
- এ ছন্দে কথ্যরীতির ক্রিয়াপদই বেশি ব্যবহৃত হয়। তাই, এতে বাংলা ভাষার স্বাভাবিক উচ্চারণ বজায় থাকে।
- দ্রত তালে উচ্চারণেই এর বাংকার ফুটে ওঠে। হালকা বিষয়বস্তুই এ ছন্দে সার্থকভাবে রূপায়িত হয়ে ওঠে।
থাকব নাক/বদ্ধ ঘরে/ দেখব এবার/ জগৎটাকে //৪+৪+৪+৪
কেমন করে /ঘুরছে মানুষ। যুগান্তরের/ ঘূর্ণিপাকে। // ৪+৪+৪+৪
মাত্রাবৃত্ত ছন্দ কাকে বলে? এর বৈশিষ্ট্য
মাত্রাবৃত্ত ছন্দের সংজ্ঞা : যে ছন্দরীতিতে অক্ষরের মাত্রামান সব সময় সুনির্দিষ্ট , লয় মধ্যম বা বিলম্বিত, পর্ব মধ্যম আকৃতির অর্থাৎ পাঁচ, ছয়, ও সাত মাত্রার এবং অক্ষরধ্বনি সুষ্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়ে থাকে, তার নাম মাত্রাবৃত্ত ছন্দ। অক্ষরের দিক থেকে মুক্তাক্ষর এক মাত্রার এবং বদ্ধাক্ষর যে ছন্দে বিশিষ্ট ভঙ্গিতে উচ্চরিত হয়ে সব সময় দুই মাত্রার হয় ,তারই নাম মাত্রাবৃত্ত ছন্দ।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে এর যে বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়, তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
- এ ছন্দে বদ্ধাক্ষর সব সময় টেনে টেনে বিশ্লিষ্ট ভঙ্গিতে উচ্চারণ করতে হয়। এজন্য এ ছন্দের উচ্চারণের গতিভূঙ্গি বা লয় হচ্ছে মধ্যম বা বিলম্বিত।
- এ ছন্দে শ্বাস ও যতি যেমন খুন ঘনঘন পড়ে না-ঠক তেমনি অতি বিলম্বেও পড়ে না। এর পর্ব হয় সব সময় মধ্যম আকৃতির অর্থাৎ পাঁচ, ছয়, ও সাত মাত্রার।
- এ ছন্দে অক্ষরের মাত্রামান সব সময়ই সুনির্দিষ্ট। অর্থাৎ মুক্তাক্ষর হলেই এক মাত্রা এবং বদ্ধাক্ষর হলেই দুই মাত্রা।
- এ ছন্দে প্রতিটি অক্ষর ধ্বনিই সুস্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়। অক্ষর ধ্বনির অতিরিক্ত কোনো সুরের টান বা তান এতে বড় হয়ে ওঠে না।
- এ ছন্দে বদ্ধাক্ষর উচ্চারণে সব সময় বিশ্লিষ্ট হয়। অর্থাৎ ভেঙে উচ্চারণ করতে হয়।
- এ ছন্দে মুক্তাক্ষরের ও বদ্ধাক্ষরের মাত্রামান সব সময় সুনির্দিষ্ট। মুক্তাক্ষরের বদলে বদ্ধাক্ষর ইচ্ছামত বসানো যায় না। অন্যকথায়- এর শোষণশক্তি একেবারেই নেই।
- এর লয় মধ্যম, মাত্রা সুনির্দিষ্ট। স্বাভাবিকভাবেই এ ছন্দ শ্রুতিমধুর। িএজন্য গীতিকবিতা লেখা এতে সর্বাধিক সার্থক হয়। মহাকাব্য বা অন্য শ্রেণির বিশালাকার ও সমন্নত ভাবাদর্শের কাব্য এ ছন্দে লেখা যায় না।
- এ ছন্দে চরণ অতিক্রমকারী প্রবহমানতা অর্থাৎ অমিত্রাক্ষর সৃষ্টি করা সচরাচর স্বচ্ছন্দ নয়।
- এ ছন্দের কবিতা বিশ্লিষ্ট ভাঙ্গিতে অর্থাৎ টেনে টেনে আবৃত্তি করতে হয়। বিশেষ শক্তি প্রয়োগ না করে এ ছন্দের কবিতা দুর্বল ভঙ্গিতে উচ্চারিত হয়ে থাকে। এ কারণে রবীন্দ্রনাথ এ ছন্দকে মেয়েলি ছন্দ বলেছেন।
- এ ছন্দে পর্বাঙ্গ বিন্যাস সাধারণত পাঁচ মাত্রার পর্ব হলে ৩:২, ছয় মাত্রার পর্ব হলে ৪:২ বা সাত মাত্রার পর্ব হলে ৩: ৪ বা ৪:৩ হয়।
এইখানে তোর/ দাদির কবর/ ডালিম গাছের /তলে,// ৬+৬+৬+২
তিরিশ বছর /ভেজায়ে রেখেছি /দুই নয়নের/ জলে। // ৬+৬+৬+২
অক্ষরবৃত্ত ছন্দ কাকে বলে? অক্ষরবৃত্ত ছন্দের বৈশিষ্ট্য
অক্ষরবৃত্ত ছন্দের সংজ্ঞা : যে ছন্দরীতিতে পর্ব দীর্ঘতম, লয় ধীর, মুক্তাক্ষর এক মাত্রার এবং বদ্ধাক্ষর শব্দের আদি ও মধ্যে হলে এক মাত্রার ও শব্দের শেষে হলে দুই মাত্রার, আর যাতে অক্ষরধ্বনির অতিরিক্ত একটি সুরের তান বা টান বড় হয়ে ওঠে, তার নাম অক্ষরবৃত্ত। একে তানপ্রধান বিস্তার- প্রধান-মিশ্রবৃত্ত- মিশ্রকলাবৃত্ত প্রভৃতি নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। (বাংলা ছন্দ – আব্দুল নঈম)
অক্ষরবৃত্ত ছন্দ অত্যন্ত বৈচিত্র্যমণ্ডিত। বিভিন্ন প্রকার পয়ার, অমিত্রাক্ষর, মুক্তক, গৈরিশ ইত্যদি ছন্দ অক্ষরবৃত্তের বিভিন্ন শাখা। অক্ষরবৃত্ত ছন্দের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করণে মোটামুটি যে বৈশিষ্ট্যগুলো পাওয়া যায় তা নিম্নরূপ-
- এ ছন্দের গতিভঙ্গি বা লয় ধীর।
- এ ছন্দে শ্বাস ও যতি পড়ে তুলনামূলক ভাবে বেশ কিছুটা বিলম্বে। ফলে এর পূর্ণপর্ব হয় দীর্ঘতম অর্থাৎ আট ও দশমাত্রার।
- অক্ষরের মাত্রামান এ ছন্দে সব সময় সুনির্দিষ্ট নয়। মুক্তাক্ষর এক মাত্রার, আর বদ্ধাক্ষর শব্দের প্রথমে ও মাঝে হলে এক এবং শব্দের শেষে হলে দুমাত্রার হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হয়।
- এ ছন্দে পর্বের অন্তর্গত অক্ষরধ্বনির অতিরিক্ত একটা সুরের তান বা টান থাকে। এ জন্য যে কোন প্রকার অক্ষরকে ছোট বড় করা যায়। যুক্তব্যঞ্জনের ভারবহন করার ক্ষমতাও অপরিসীম।
- এ ছন্দে মুক্তাক্ষরের বদলে সর্বাধিক সংখ্যক বন্ধাক্ষর বসানো যায়: এতে মাত্রামানের কোনো হেরফের হয় না। অক্ষরের এই স্থিতিস্থাপকতা, বদ্ধাক্ষরের ভারবহন শক্তির কারণে শোষণ শক্তি একমাত্র এই ছন্দেই স্বাভাবিক, অন্য কোনো ছন্দে স্বাভাবিক নয়।
- গাম্ভীর্য ও সংযম এই ছন্দে সবচেয়ে বেশি। তাই মহাকাব্য ও অন্যান্য সমুন্নত ভাবাদর্শের কাব্য-কবিতা এতে রচনা করা সহজেই সম্ভব।
- চরণ অতিক্রমকারী প্রবহমানতা বজায় রাখা ও সমস্ত ধরনের শব্দসম্ভার ব্যবহার এ ছন্দের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অমিত্রাক্ষর রচনায় এ ছন্দ তাই সর্বাধিক উপযোগী।
উদাহরণ-
মহাভারতের কথা অমৃত সমান।//৮+৬
কাশীরাম দাস কহে শুনে পুণ্যবাণ । //৮+৬
অথবা,
প্রিয়া তারে রাখিল না/ রাজ্য তারে ছেড়ে দিল পথ//৮+১০
রুধিল না সমুদ্র পর্বত // ১০
অক্ষর বৃত্তের শোষণ শক্তি বলতে কী বুঝি ?
বাংলা ছন্দের পর্বের দৈর্ঘ্য ও পর্বের মাত্রামাপ সব সময়ই সুনির্দিষ্ট। তাই পর্বের দৈর্ঘ্য ও মাত্রামাণ বা অক্ষর বাড়ানো যায় না। এটা করতে গেলেই ছন্দ পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। তবে পর্বের মাত্রামাপ ঠিক রেখে কবি ইচ্ছা করলে মুক্তাক্ষরের বদলে বদ্ধাক্ষর বা বদ্ধাক্ষরের বদলে মুক্তাক্ষর বসাতে পারেন। এভাবে পর্বের মাত্রা ঠিক রেখে স্বরান্ত বা মুক্তাক্ষরের বদলে বন্ধাক্ষর বসানোর নামই ভারবহণ শক্তি বা শোষণশক্তি।
স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দে অক্ষরের মাত্রামাণ সবসময় সুনির্দিষ্ট। স্বরবৃত্ত ছন্দে মুক্তাক্ষর ও বদ্ধাক্ষরের মান সবসময় এক মাত্রার। তাই, মুক্তাক্ষরের পরিবর্তে বদ্ধাক্ষর বসালে মাত্রার হেরফের হয় না। তবে স্বরবৃত্ত ছন্দে পর্বের আকার ছোট বলে বেশি বদ্ধাক্ষর বসানো যায় না। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে মুক্তাক্ষরের বদলে বদ্ধাক্ষর বসানোই যায় না। কেননা, এ ছন্দে বদ্ধাক্ষর সব সময় দুমাত্রা।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দে অক্ষরের মাত্রামান সুনির্দিষ্ট নয়। মুক্তাক্ষর সব সময় এক মাত্রার হলেও বদ্ধাক্ষরের মাত্রামাণ সবসময় নির্দিষ্ট নয়। শব্দের প্রথমে ও মাঝে হলে একমাত্রার আর শব্দের শেষে ও একক হলে দুমাত্রার হয়। এ কারণে শব্দের আদি ও মধ্যে মুক্তাক্ষরের বদলে ইচ্ছামত বদ্ধাক্ষর বসালেও পর্বের মাত্রামাপের কোনো হেরফের হয় না।
তাছাড়া এ ছন্দে অক্ষর ধ্বনিকে আচ্ছন্ন করে একটা তান বা টান বা সুরের সৃষ্টি হয়, ফলে এর প্রভাবে অক্ষরের ছোট-বড় বা বদ্ধাক্ষরের সংকোচন, প্রসারণ সহজে করা যায়।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দের পর্ব হয় দীর্ঘতম, উচ্চারণের গতিও বীর। ফলে বদ্ধাক্ষর বা যুক্তাক্ষরের ভারবহন ক্ষমতা বেশি। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে এ ছন্দে মাত্রাসংখ্যা ঠিক রেখে যেমন যুক্তাক্ষর বিহীন চরণ রচনা করা যায় . তেমনি যুক্তাক্ষর বহুল চরণও রচনা করা যায়। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ উদাহরণসহ সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
পাষাণ মিলায়ে যায়। গায়ের বাতাসে ।// ৮+৬
এখানে বন্ধাক্ষর থাকলেও একটিও যুক্তাক্ষর নেই।
পাষাণ মুর্ছিয়া যায়/ অঙ্গের বাতাসে। //৮+৬
পাষাণ মুর্জিয়া যায়/ অঙ্গের উচ্ছ্বাসে ।//৮+৬
সঙ্গীত তরঙ্গ রঙ্গ/ অদের উচ্ছ্বাসে ।//৮+৬
ধীরে ধীরে যুক্তাক্ষর বাড়ানো হয়েছে, অথচ মাত্রার কোনো হেরফের হয় নি। এভাবে আরও যুক্তাক্ষর চাপানো হলেও নৌকাডুরি হবার কোনো সম্ভাবনা নেই। যেমন-
দুর্দান্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণ/দুঃসাধ্য সিদ্ধান্ত // ৮+৬
এখানে নয়টি বন্ধাক্ষর ও নয়টি যুক্তাক্ষর থাকলেও মাত্রানান ১৪।
এভাবে মাত্রামাণ ঠিক রেখে ইচ্ছামতো বদ্ধাক্ষর বা যুক্তাক্ষর বসানোর নামই শোষণশক্তি। অক্ষরবৃত্তের এ রকম শোষণশক্তির জন্য জয়জয়ন্তীর উচ্চগম্ভীর ধানি এবং পূরবীর সাহানার মৃদু করুণ সুর -এ দুই সুরই একই বীণাতারে ঝংকৃত হয়ে ওঠে। ( বাংলা ছন্দ – আব্দুল নঈম)
মুক্তক ছন্দ কাকে বলে? মুক্তক ছন্দের বৈশিষ্ট্য
মৃক্তক ছন্দের সংজ্ঞা: যে ছন্দরীতিতে যতিকে উপেক্ষা করে ছেদ অনুসারে পর্ব গঠিত হয়, প্রবহমানতা থাকে, অসম পংক্তি ও চরণ থাকে, চরণান্তে মিল থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে এবং অর্থবিভাগভিত্তিক পংক্তি সৃষ্টি করা হয়, সেই বিশিষ্ট ছন্দরীতির নাম মুক্তক ছন্দ।
মুক্তক ছন্দের সংজ্ঞার আলোকে বলা যায় –
- ছেদ অনুসারে পর্ব গঠন, অন্ত্যানুপ্রাস বা অন্ত্যানুপ্রাসহীনতা, প্রবহমানতা, অর্থ বিভাগভিত্তিক পংক্তি সৃষ্টি, অসমমাত্রার পংক্তি ও চরণ মুক্তক ছন্দের বৈশিষ্ট্য।
- অমিত্রাক্ষর ছন্দ অন্ত্যমিলহীন ও সমপংক্তিক, গৈরিশ ছন্দ অসমপার্বিক ও অসমপংক্তিক, কিন্তু মুক্তক ছন্দ অন্ত্যমিলযুক্ত বা অন্তমিলহীন এবং এর অসমপর্বগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- অমিত্রাক্ষর, গৈরিশ ও মুক্তক এ তিন ছন্দেই প্রবহমানতা প্রধানতম বৈশিষ্ট্য।
- মুক্তক ছন্দের অন্ত্যানুপ্রাসের জন্য এ ছন্দকে সমিল মুক্তকও বলা হয়। অন্ত্যানুপ্রাস না থাকলে অমিলমুক্তক বা অতিমুক্তক বলা হয়।
- পয়ারের কাঠামো থেকে বাংলা ছন্দকে বিস্ময়করভাবে বৈচিত্র্য দেওয়া হয়েছে মুক্তক ছন্দে। পর্ব, পংক্তি, যতি, ছেদ, ভাব ও চরণ সবদিক থেকে বাংলা ছন্দকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এ জন্য রবীন্দ্রনাথ একে বেড়াভাঙা পয়ার বলেছেন।
- বাংলা কবিতার তিন ছন্দেই এই মুক্তকের ব্যবহার করা হয়েছে। মাত্রাবিচারের দিক থেকে শুধু পার্থক্য লক্ষ্ করা যায়।
- মুক্তকের অন্ত্যমিল প্রবহমানতা ও অনিয়মিত দৈর্ঘ্যের পংক্তি তিন ছন্দেই ব্যবহার করা হয়েছে। তবে পর্বের মাত্রাবিচারে এদের ভিন্নতা সুস্পষ্ট।
- মুক্তকের প্রকৃত স্বরূপ অক্ষরবৃত্তেই যথার্থভাবে বিদ্যমান।
অক্ষরবৃত্তের সমিল মুক্তক ছন্দের উদাহরণ-
তোমার কীর্তির চেয়ে/ তুমি যে মহৎ //৮+৬
তাই তব জীবনের রথ // ১০
পশ্চাতে ফেলয়া যায় / কীর্তিরে তোমার //৮+৬
বারম্বার //8
তাই // ২
চিহ্ন তব পড়ে আছে/ তুমি হেথা নাই। // ৮+৬
স্বরবৃত্তের সমিল মুক্তক ছন্দ-
মুক্তি এবার / মুক্তি আজি / ৪+৪
উঠল বাজি // 8
অনাদরের / কঠিন ঘায়ে // ৪+৪
অপমানের / চাকে ঢোলে / সকল নগর/ সকল গাঁয়ে // 8+8+8+8
তারায় ভরা /উদাসী রাতে/৫+৫
তোমার সাথে //৫
মাত্রাবৃত্তের সমিল মুক্তক-
হঠাৎ দেখা/৫
হবে //২
ভাবিনি সখী/ পড়িবে মনে ৫+৫
কোন সে উৎ/ সবে // ৫+২
মুক্তক ছন্দে অন্ত্যানুপ্রাস থাকে। মিল এর কারণে এ ছন্দ প্রতিমাধুর্যে পরিপূর্ণ। বৈচিত্যপূর্ণ মিল বিন্যাসের কারণে এ ছন্দকে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করে তুলছে। মিত্রাক্ষর আছে বলেই এ ছন্দ নানা বৈচিত্রা অবলম্বন করা হয়। অনেক সময় পর পর দু পংক্তিতে মিল
তোমার কীর্তির চেয়ে/ তুমি যে মহৎ //৮+৬
তাই তব জীবনের রথ // ১০
পশ্চাতে ফেলয়া যায় / কীর্তিরে তোমার //৮+৬
বারম্বার //8
তাই // ২
চিহ্ন তব পড়ে আছে/ তুমি হেথা নাই। // ৮+৬
অনেক সময় একই মিত্রাক্ষর পর পর অনেকগুলো পংক্তিতে ব্যবহৃত হয়। যেমন-
শুধু যাও, শুধু ধাও/শুধু বগে ধাও // ৮+৬
উদ্দাম উধাও/ ৬
ফিরে নাহি চাও/৬
যা কিছু তোমার সব/ দুই হাতে ফেলে ফেলে যাও।// ৮+১০
এ ছাড়াও আরও বিচিত্র মিল দেওয়ার রীতি লক্ষ করা যায়।
মুক্তক ছন্দের বৈশিষ্ট্য লক্ষ করলে দেখা যায়, এর পর্বের দৈর্ঘ্য সমান থাকে না। দুই, চার, ছয়, আট, দশ মাত্রার পর্ব মিশ্রিত করে ছন্দ গঠিত হয়। বিভিন্ন চরণের মাত্রার সংখ্যাও সমান নয়। কখনো দুই মাত্রার চরণ, আবার আট মাত্রার এক পর্বের চরণ, কথানো আবার আট ও ছয় এর বা আট ও দশ-এর দু পর্বের চরণ।
তাই বলা যায় এ ছন্দে একদিকে যতির বন্ধন মুক্ত করা হয়েছে, অন্যদিকে আবার পংক্তিতে মাত্রাসাম্য বা পর্বসাম্য এবং পর্বে মাত্রাসাম্য রক্ষিত হয়নি। মুক্তিই এ ছন্দের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবে বিশেষ সামঞ্জস্যসহ অসম পর্ব ও অসম পংক্তি ব্যবহার করা এবং ছেদের বিরতি অনুসারে পর্ব ও পংক্তি গঠন করা এ ছন্দের প্রধান লক্ষ্য। সেই সাথে থাকবে প্রবহমানতা।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।
বারবার অনুশীলন যোগ্য একটা নোট ।
সময় নিয়ে বুঝে বুঝে পড়তে হবে এবার।
Thank’s Sir