অক্ষরবুত্ত ছন্দের বিভিন্ন শাখার পরিচয় দাও।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দসহ বিভিন্ন ছন্দ নির্ণয়

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য।

অক্ষরবৃত্ত ছন্দের বৈচিত্র্য

ভূমিকা

বাংলা ছন্দের ইতিহাসে অক্ষরবৃত্ত একটি প্রাচীন, শাস্ত্রসম্মত ও সুসংহত ধারা হিসেবে পরিচিত। কাব্যের ছন্দতত্ত্বে অক্ষরবৃত্ত শুধু একটি নিয়ম নয়, এটি কবিতার শ্বাস-প্রশ্বাস, গতি ও সংগীতধর্মিতার মূল ভিত্তি। বাংলা কবিতার প্রাথমিক পর্যায়ে অক্ষরবৃত্ত ছন্দই ছিল কবির প্রধান আশ্রয়, কারণ এই ছন্দে অক্ষরের নির্দিষ্ট গণনার মাধ্যমে ছন্দের স্থায়িত্ব ও সৌন্দর্য রক্ষা করা যায়। অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শৃঙ্খল কবিতাকে যেমন কাঠামো দেয়, তেমনি ভাবকে দেয় দৃঢ়তা।

কালক্রমে অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ভেতরেই নানা রূপান্তর দেখা যায়। এই রূপান্তরের ধারায় জন্ম নেয় মুক্তক ছন্দ, অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও গৈরিশ ছন্দ—যেগুলো বাহ্যিকভাবে মুক্ত মনে হলেও অন্তর্গতভাবে অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ঐতিহ্য বহন করে। বিশেষত মুক্তক ছন্দে অক্ষরগণনার বাঁধন শিথিল হলেও অক্ষরবৃত্ত-এর ছায়া একেবারে বিলুপ্ত হয় না। একইভাবে অমিত্রাক্ষর ছন্দে মিলের অনুপস্থিতি থাকলেও ছন্দগত ভারসাম্য অনেকাংশে অক্ষরবৃত্ত নির্ভর।

আধুনিক বাংলা কবিতার বিকাশে অক্ষরবৃত্ত এক অনিবার্য রেফারেন্স পয়েন্ট। ছন্দ ভাঙার সাহস এসেছে ছন্দ জানার মধ্য দিয়েই, আর সেই জানার কেন্দ্রে রয়েছে অক্ষরবৃত্ত। গৈরিশ ছন্দের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, ভাবের স্বাধীনতা থাকলেও ছন্দচেতনায় অক্ষরবৃত্ত-এর নিয়ন্ত্রণ একেবারে অস্বীকার করা যায় না। ফলে বলা যায়, বাংলা কবিতার ছন্দযাত্রা বোঝার জন্য অক্ষরবৃত্ত ছন্দের আলোচনাই হলো প্রথম ও মৌলিক ধাপ।

এই প্রবন্ধে অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ভিত্তিতে মুক্তক ছন্দ, অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও গৈরিশ ছন্দের স্বরূপ, বৈশিষ্ট্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে—যাতে বাংলা ছন্দের ক্রমবিকাশ একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা পায়।

অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখা —- মুক্তক ছন্দ

মুক্তকছন্দ: যে বিশিষ্ট ছন্দরীতিতে যতিকে উপেক্ষা করে ছেদ অনুসারে পর্ব গঠিত হয়, প্রবহমানতা থাকে, অসম পংক্তি ও চরণ, চরণান্তে মিল থাকতেও, পারে নাও থাকতে পারে এবং অর্থ বিভাগ ভিত্তক পংক্তি সৃষ্টি করা হয়, সেই বিশিষ্ট ছন্দরীতির নাম মুক্তক ছন্দ।
তাহলে বলা যায় – ছেদ অনুসারে পর্বগঠন , অন্ত্যানুপ্রাস বা অন্ত্যানুপ্রাসহীন, প্রবহমানতা, অর্থ-বিভাগভিত্তিক পংক্তি সৃষ্টি, অসম মাত্রার পংক্তি ও চরণ মুক্তক ছন্দের বৈশিষ্ট্য।

অমিত্রাক্ষর ছন্দ অন্ত্যমিলহীন ও সমপংত্তিক, গৈরিশ ছন্দ অসম-পার্বিক ও অসমপংত্তিক, কিন্তু মুক্তক ছন্দ অন্ত্যমিলযুক্ত বা অন্ত্যমিল হীন। অমিত্রাক্ষর, গৈরিশ ও মুক্তক – এ তিন ছন্দেই প্রবহমানতা প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। মুক্তক ছন্দের অন্ত্যানুপ্রাসের জন্যে এ ছন্দেকে সমিল মুক্তকও বলা হয়।

মুক্তক ছন্দ আসলে অক্ষরবৃত্ত ছন্দের পয়ারের কাঠামো থেকে বাংলা ছন্দকে পর্ব, পংক্তি, যতি, ছেদ, ভাব ও চরণ সব দিক থেকে বিস্ময়কর বৈচিত্র্য আনা হয়েছে মুক্তক ছন্দে। তাই রবীন্দ্রনাথ একে ” বেড়াভাঙ্গা পয়ার” বলেছেন। বাংলা কবিতার তিন ছন্দেই এই মুক্তকের ব্যবহার করা হয়েছে। মত্রাবিচারের দিক থেকে শুধূ পার্থক্য লক্ষ করা যায়। মুক্তকের অন্ত্যমিল প্রবহমানতা ও অনিয়মিত দৈর্ঘের পংক্তি তিন ছন্দে বর্তমান থেকেও পর্বের মাত্রাবিচারে এদের ভিন্নতা সুপষ্ট। তবে মুক্তকের যথার্থ মুক্তি অক্ষরবৃত্তেই বিদ্যমান।

অক্ষরবৃত্ত ছন্দে মুক্তক –
তোমার কীর্তির চেয়ে/ তুমি যে মহৎ//৮+৬
তাই তব জীবনের রথ//১০
পশ্চাতে ফেলিয়া যায়/কীতিরে তোমায়//৮+৬
বাবম্বার// ৪
তাই// ২
চিহ্ন তব পাড়ে আছে/তুমি হেথা নাই।//৮+৬

স্বরবৃত্তে সমিল মুত্তক ছন্দ।

মুক্তি এবার/ মুক্তি আজি ৪+৪
ঊঠিল বাজি//৪
অনাদরের/কঠিন পায়ে//৪+৪
অপমানের/ঢাকে ঢোলে/সকল নগর/সকল গাঁয়ে//৪+৪+৪+৪

সমিল মাত্রারত্তে সমিল মুক্তক
তারায় ভরা/উদাসী রাতে ৫+৫
তোমার সাথে ৫
এমন করে/আবার একা ৫+৫
হঠাৎ দেখা/৫
হবে//২
ভাবিনি সখী/পড়িবে মনে ৫+৫
কোন সে উৎ/সবে//৫+২

অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখা-প্রশাখা:

অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখা ত্রিপদী: অক্ষরবৃত্তের যে ছন্দে প্রতি চরণে তিনটি করে পর্ব।
দুই চরণের মধ্যে অন্ত্যমিল থাকে এবং প্রতি চরণের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বেও অন্ত্যমিল থাকে তাকে ত্রিপদী ছন্দ বলে।
ত্রিপদী দুই প্রকার

(১) লঘু ত্রিপদী (২) দীর্ঘ ত্রিপদী

অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখা— লঘু ত্রিপদী : যে ত্রিপদী ছন্দে চরণের প্রথম দুপর্ব ছ’ মাত্রার তৃতীয় পর্বটি আট মাত্রার এবং ত্রিপদী ছন্দের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য ও বজায় থাকে তাকে লঘু ত্রিপদী ছন্দ বলে।

যে জন দিবসে/ মনের হরষে/
জ্বালায় মোমের বাতি//৬+৬+৮
আশু গৃহে তার/ দেখিবে না আর/
নিশিতে প্রদীপ ভাতি//৬+৬+৮

এখানে দুটি চরণ তান্ত্যমিল রয়েছে। প্রতি চরণে তিনটি করে পর্ব, প্রতি চরণের ১ম পর্বের সাথে ২য় পর্বের অন্ত্যমিল রয়েছে, মাত্রা বিন্যাস ৬+৬+৮। অক্ষরবৃত্ত ছন্দের অন্তর্গত এই ধরনের কবিতা রীতির নাম ত্রিপদী। আর এটি লঘু ত্রিপদী।

অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখা দীর্ঘ ত্রিপদী ঃ যে ত্রিপদী ছন্দে প্রতি চরণের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব আট মাত্রার শেষ পর্ব দশ মাত্রার এবং ত্রিপদী ছন্দের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও বজায় থাকে, তাকে ত্রিপদী ছন্দ বলে।

বলো না কাতর স্বরে/ বৃথা জন্ম এ সংসারে/
এ জীবন নিশার স্বপন//৮+৮+১০
দ্বারা পুত্র পরিবার/ তুমি কার কে তোমার/
বলে জীব করো না ক্রন্দন//৮+৮+১০

এখানে দুটি চরণ অন্ত্যমিল রয়েছে, প্রতি চারণে তিনটি করে পর্ব, প্রতি চরণের ১ম পর্বের সাথে ২য় পর্বের অন্তমিল রয়েছে। মাত্রা বিন্যাস ৮+৮+১০। এটি অক্ষরবৃত্ত ছন্দের দীর্ঘ ত্রিপদী।

বিঃ দ্রঃ- ত্রিপদী ছন্দের মূল মিল হয় চরনান্তে। পাশাপাশি দুটি পর্বে মিল থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিল দেখা গেলেও ১ম পর্বের সাথে ২য় পর্বের মিল না থাকার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়-

ঢলঢল কাঁচা/ অঙ্গের লাবনী/
অবনী বহিয়া যায়// ৬+৬+৮
ঈষৎ হাসির/ তরঙ্গ-হিলোলে/
মদন মুরুছা যায়// ৬+৬+৮

মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করে গমন
হয়েছেন প্রতি স্মরণীয় ৮+৮+১০
সেই পথ লক্ষ্য করে- স্বীয় কীর্তি ধ্বজা ধরে
আমরাও হব বরনীয়। ৮+৮+১০

দীর্ঘ ত্রিপদীর উদাহরণ

অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখা চোপদী

চৌপদী ঃ অক্ষরবৃত্ত ছন্দের অন্তর্গত যে ছন্দে প্রতি চরণে চারটি করে পর্ব চরনান্ত অন্ত্যমিল এবং প্রতি চরণের প্রথম তিনটি পর্বেরও অন্ত্যমিল থাকে তাকে চৌপদী ছন্দ বলে।
পর্বে মাত্র ব্যবহারের রীতি অনুযায়ী চতুর্থপদী বা চৌপদী ছন্দকে দুটি ভাগ করা হয়ে থাকে।
লঘু ও দীর্ঘ চৌপদী।
লঘু চৌপদী: অক্ষরবৃত্ত ছন্দের অন্তগত যে ছন্দে প্রতি চরণে চারটি করে পর্ব, চরনান্তে অন্ত্যমিল প্রতি চরণে প্রথম পরপর তিনটি পর্বেও অন্ত্যমিল এবং প্রথম তিনটি পর্বের মাত্রা ছয়। শেষ পর্বের মাত্রা সংখ্যা তার চেয়েও কম হয়, তাকে লঘু চৌপদী বলে।

চিরসুখী জন/ ভ্রমে কি কখন/
ব্যথিত বেদন/বুঝিতে পারে ?//৬+৬+৫+৫
কি যাতনা বিষে/ বুঝিবে সে কিসে/
কভু আশীবিষে/দংশেনি সারে ?//৬+৬+৬+৫

এখানে প্রতিটি চরণেরই চারটি করে পর্ব। প্রথম তিনটি পর্ব পরস্পর মিলযুক্ত ও ছ মাত্রার, শেষ পর্বটি পাঁচ মাত্রার। দুটি চরণই অন্ত্যমিল যুক্ত। তাই, এ চরণ দুটি লঘু চৌপদীর উদাহরণ।

দীর্ঘ চৌপদী:- অক্ষরবৃত্ত ছন্দের অন্তগত যে ছন্দে প্রতি চরণে চারটি করে পর্ব চরনান্তে অন্ত্যমিল, প্রতি চরণের প্রথম তিনটি পর্ব পরস্পর মিলযুক্ত এবং চরণের চারটি পর্বের মধ্যে প্রথম তিনটি আট ও শেষ পর্বটি হয় তার চেয়েও কম মাত্রার তার নাম দীর্ঘ চৌপদী। (৮+৮+৮+৭) (৮+৮+৮+৬) (৮+৮+৮+৫)

নীলাম্বরে কিবা কাজ/ তীরে ফেলে এসো আজ/
ঢেলে দেব সব লাজ/সুনীল জ্বলে।// ৮+৮+৮+৫
সোহাগ তরঙ্গ রাশি/ অঙ্গখানি দিবে গ্রাসি/
উচ্ছ¡সি পড়িবে আসি/উরসে গলে।//৮+৮+৮+৫

এখানে এই দুটি চরণে চারটি করে পর্ব। প্রথম তিনটি পর্ব আট মাত্রার এবং পরস্পর মিলযুক্ত। শেষ
পর্বটি পাঁচ মাত্রার। চরণ দুটি মিলযুক্ত।

কেবা সত্য কেবা মিছে/ নিশিদিন আকুলিছে/ ৮+৮+৮+৬
কভু ঊর্দ্ধে কভু নিচে/টানিছে হৃদয়ে//
জড় দৈত্য শক্তি হানে/ মিনতি নাহিকমানে/
প্রেম এসে কোলে টানে/দূর করে ভয়।// ৮+৮+৮+৬

অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখা — গৈরিশ ছন্দ
অভিনেতা-নাট্যকার গিরিশচন্দ্র গোষ পৌরণিক নাটকের সংলাপ সৃষ্টির জন্য অক্ষরবৃত্তের অন্তর্গত অমিত্রাক্ষর ছন্দকে ভেঙ্গে অসম পর্ব, পংক্তি ও চরণের বিশেষ বিন্যাসে যে ছন্দরীতির প্রবর্তন করেন, তাকে গৈরিশ ছন্দ বলা হয়।

গৈরিশ ছন্দও এক প্রকার অমিত্রাক্ষর ছন্দ। এই ছন্দকে ভাঙ্গা অমিত্রাক্ষর বলা যেতে পাারে। গৈরিশ ছন্দের দ্বারা বাংলা ছন্দের অতিরিক্ত মুক্তি সাধিত হয়েছে। গৈরিশ ছন্দকে মধুসূদনের অমিত্রাক্ষর এবং রবীন্দ্রনাথের মুক্তকে ছন্দের মধ্যবর্তী পর্যয়ে স্থান দেওয়া যায়। এখানে অমিত্রাক্ষরের প্রবহমানতাকে কাজে লাগিয়ে পংক্তির মাত্রাসংখ্যাকে অসমান করা হয়েছে।

বৈশিষ্ট্য:
(১) এর লয় ধীর
(২) অক্ষরবৃত্তের পয়ারের স্বাভাবিক যতি ও পর্ব বিন্যান এতে মানা হয়নি। অসমপার্বিক এবং যতি ভাগ ভাব অনুযায়ী।
(৩ ) সংলাপের প্রয়োজন অনুযায়ী এতে পর্ব, পংক্তি ও চরণ বিন্যাস্ত।
(৪) পংক্তি ও চরণ সব সময় মিলহীন।
(৫) প্রবহমানতা আছে।
(৬) পুুরাতন পন্থী সাধুভাষাই এতে বিশেষভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
(৭) প্রধানত পৌরাণিক নাটকের ভক্তিরসই এর বিশেষ উপজীব্য।

ব্যস তব / দর্শন আশায় // ৪+৬
প্রতীক্ষায় বহুদিন / আছি কাশী ধামে। // ৮+৫
শস্তিদাতা / বৈরাগ্য তোমায়। // ৪+৬
বিবেক বৈরাগ্য / তব সাথী তুমি, // ৬+৪
বিরক্ত সন্ন্যাসী তুমি,// ৮+০
সাহায্যে তোমায় // ০+৬
বহু কার্য / কবির উদ্ধার। // ৪+৬

এখানে ভাব চরণ থেকে চরণান্তরে স্বচ্ছন্দে প্রবহমান। লয় ধীর, অক্ষরবৃত্তে বিন্যাস্ত এর পংক্তিগুলো
অসম মাত্রার। পর্বও অসম চরণও অসম।

অমিত্রাক্ষর ছন্দ কাকে বলে? উদাহরণসহ এর বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর।

উত্তর: বিদ্রোহী পুরুষ হিসেবেই বাংলা সাহিত্য মধুসূদনের আর্বিভাব। বাংলা সাহিত্য তাঁর যাত্রা বিপ্লবাত্মক। এ বিপ্লবাত্মক ছিল আঙ্গিক, ভাব, মনন সর্বক্ষেত্রে। বাংলা কাব্য-লক্ষ্মীকে নিদিষ্ট মাপের ছন্দের গন্ডী থেকে মুক্তি দেওয়ার মানসে তিনি ছন্দের ক্ষেত্রেও বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন আনেন। অসামান্য প্রতিভাবলে তিনি পয়ারের বেড়ি ভেঙ্গে দিয়ে বাংলা কাব্য সাহিত্য প্রবর্তন করেন অমিত্রাক্ষর ছন্দের। তিনি বুঝেছিলেন যে, অক্ষরবৃত্ত ছন্দের পয়ারের বেড়ি ভেঙ্গে ছন্দের একঘেয়েমি দূর না করলে মহাকাব্য নাটক ইত্যাদি উন্নয়ন সম্ভব নয়। পয়ারের নানা অসুবিধা দূর করার জন্যই মধুসূদন ইংরেজি blank verses ও সংস্কৃত ছন্দের বৈশিষ্ট্য লক্ষ করে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন করেন।

সংজ্ঞা: অক্ষরবৃত্ত ছন্দের অন্তর্গত যে ছন্দে প্রচলিত পয়ারের আট-ছয় চৌদ্দমাত্রার চরণ বজায় থাকে, কিন্তু চরণান্তে মিত্রাক্ষর বা মিল থাকে না, যাতে বক্তব্য বিষয় প্রয়োজন মত চরণ থেকে চরণান্তর টেনে চলে এবং ছেদ-যতির সবোর্চ্চ স্বাধীনতা থাকে, তার নাম অমিত্রাক্ষর ছন্দ।

ছন্দ পরিচিতি গ্রন্থে এস, এম আবদুল লতিফ বলেছেন-

“ পয়ারের আধারে চৌদ্দমাত্রার পংক্তি নিয়ে মিত্রাক্ষর ত্যাগ করে প্রবর্তিত হয় এ ছন্দ। পয়ারের ন্যায় এতে চৌদ্দ মাত্রার শেষে অর্থগত ছেদ টানার কোনো বাধ্যবাকতা নেই। পয়ার ছন্দের পটভূমির উপরের পয়ারের দুই চরণের বন্ধনকে অস্বীকার করে গড়ে ওঠে অমিত্রাক্ষর ছন্দ।”

পয়ার ছন্দভিত্তিক, অন্ত্যানুপ্রাসহীন এবং পূর্ণ যতির মিত্রতাহীন তথা প্রবহমানতাযুক্ত যে ছন্দ তারই নাম অমিত্রাক্ষর ছন্দ।

অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখা অমিত্রাক্ষর ছন্দের বৈশিষ্ট্য:

(১) প্রচলিত পয়ারের মতই এর উচ্চারণের গতিভঙ্গী বা লয় ধীর।
(২) অক্ষরবৃত্তের পয়ারের মতই এর পূর্ণ চরণও চৌদ্দমাত্রার এবং দুটি পর্ব-আট-ছয়ের।
(৩) চরণের সাথে পরের চরণের অন্ত্যমিল নেই অথাৎ চরনান্ত মিলহীনতা।
(৪) অক্ষরবৃত্তের পয়ারের মত প্রতি চরণে বক্তব্য বা শেষ না অর্থাৎ প্রবহমানতা আছে।
(৫) চরণান্ত মিলহীনতা অভাব দূর করার জন্য এ ছন্দে প্রচুর পরিমাণে অনুপ্রাস ও যমকের ব্যবহার করা হয়েছে।
(৬) এ ছন্দের মধ্যে গুরুগম্ভীর ধ্বনি ফুটিয়ে তোলার জন্য প্রচুর পরিমাণে তৎসম এবং সমাসবদ্ধ শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে।
(৭) এ ছন্দের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সুকুমার সেন বলেছেন-

পয়ারের দুই চরণের নিগড় ভাঙ্গিয়া মধুসূদন ছন্দের প্রসার বাড়াইয়া ভাব প্রকাশের অবকাশ দিলেন-ইহাই অমিত্রাক্ষর ছন্দের আসল কথা। বস্তুতঃ মিল না থাকাটাই বড় কথা নয়; যতির স্বাধীনতা অর্থাৎ ছন্দের প্রবহমানতাই অমিত্রাক্ষরের বৈশিষ্ট্য।

(৮) প্রচলিত অক্ষরবৃত্তের পয়ার ছন্দের মত অমিত্রাক্ষর ছন্দে যতি একস্থানে পড়লেও ছেদ পড়ে ভিন্ন স্থানে। প্রবাহমানতা, মিলহীনতা যতি পাতের স্বাধীনতা অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই ছন্দকে অমিল প্রবহমান পয়ার বলা যায়।
উদাহারণ ঃ

সম্মুখ সমরে পড়ি/বীর চূড়ামনি//৮+৬
বীরবাহু চলি যবে/গেলা যমপুরে//৮+৬
অকালে কহ হে দেবী/অমৃত ভাষানি//৮+৬
কোন বীরবহে বরি/সেনাপতি পদে//৮+৬
পাঠাইলা রণে পুনঃ/রক্ষঃকুল নিধি//৮+৬

ব্যাখ্যা ঃ লয় ধীর। চৌদ্দ মাত্রার চরণ। আট ছয়ের দুটি পর্ব। চরণান্ত মিল নেই। প্রবহমানতা আছে। তৎসম ও সমাসবদ্ধ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অনুপ্রাসের ব্যবহার করা হয়েছে। অর্ধচ্ছেদ একাধিক থাকলেও পূর্ণচ্ছেদ পড়েছে ষষ্ট চরণের শুরুতে-যা সাধারণ পয়ারে কখনই সম্ভব ছিল না।

ছন্দ নির্ণয় বিগত বিশ বছরের প্রশ্নের আলোকে

অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্ত

১. গগণে গরজে মেঘ ঘন বরষা,// ৮ (১৯৯২)
কুলে একা বসে আছি /নাহি ভরসা।// ৮+৫
রাশি রাশি ভারা ভারা//৮
ধান কাটা হল সারা//৮
ভরা নদী ক্ষুর ধারা/ খরপরশা।//৮+৫
মাত্রাবৃত্ত ছন্দ

৩. হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে/ করেছ মহান ।//৮+৬ (১৯৯৩)
তুমি মোরে দানিয়াছ / খৃষ্টের সম্মান//৮+৬
কন্টক -মুকুট শোভা। /দিয়াছ তাপস//৮+৬
অসঙ্কোচ প্রকাশের/ দুরন্ত সাহস,// ৮+৬
উদ্ধত উলঙ্গ দৃষ্টি;/ বাণী ক্ষুর ধার,// ৮+৬
বীণা মোর শাপে তব /হ’ল তরবার ।// ৮+৬

অক্ষরবৃত্ত ছন্দ, লঘু প্রবহমান সমিল পয়ার।

৪. আজকে তোমায়/ দেখতে এলাম/ জগত আলো/ নুর জাহান,// (১৯৯৩) ৪+৪+৪+৩
সন্ধ্যা রাতের/ অন্ধকার আজ/ জোনাক পোকায়/ স্পন্দমান ।//৪+৪+৪+৩
বাংলা থেকে / দেখতে এলাম/ মরুভূমির /গোলাপ ফুল,// ৪+৪+৪+৩
ইরান দেশের/ শকুন্তলা /কই সে তোমার/ রূপ অতুল।//৪+৪+৪+৩
স্বরবৃত্ত ছন্দ

৫. পঞ্চশরে /দগ্ধ করে /করেছ এ কি /সন্ন্যাসী,// ৫+৫+৫+৪ (১৯৯৪)
বিশ্বময় /দিয়েছ তারে/ ছড়ায়ে।//৫+৫+৫+৩
ব্যাকুলতর /বেদনা তার/ বাতাসে উঠে/ নিঃশ্বাসী;// ৫+৫+৫+৪
অশ্রু তার /আকাশে পড়ে/ গড়ায়ে।// ৫+৫+৫+৩
মাত্রাবৃত্ত ছন্দ

৭. মা কেঁদে কয়,/ মঞ্জুলী মোর/ ওইতো কচি/ মেয়ে//,(১৯৯৫)
ওরই সঙ্গে/ বিয়ে দেবে, /বয়সে ওর / চেয়ে //
পাঁচগুণো সে/ বড়ো-//
তাকে দেখে/ বাছা আমার/ ভয়েই জড়ো /সড়ো।//
এমন বিয়ে /ঘটতে দেব /নাকো । //
স্বরবৃত্ত ছন্দ

৮. ওই দূর বনে/ সন্ধ্যা নামিছে/ ঘন আবীরের/ রাগে, // (১৯৯৫)
অমনি করিয়া/ লুটায়ে পড়িতে/ বড় সাধ আজ/ জাগে। //
ম’জিত হইতে / আজান হাঁকিছে/ বড় সকরুন /সুর,//
মোর জীবনের/ রোজ কেয়ামত/ ভাবিতেছি কত /দূর। //
মাত্রাবৃত্ত ছন্দ

৯. ভূতের মতন চেহারা যেমন নির্বোধ অতি ঘোর- (১৯৯৬)
যা- কিছু হারায় গিন্নী বলেন কেষ্টা বেটায় চোর।
উঠিছে বসিতে করি বাপাšত , শুনেও শোনে না কানে-
যত পায় বেত না পায় বেতন, তবু না চেতন মানে ।

১০. আমি বিদ্রোহী ভ্রৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ চিহ্ন; (১৯৯৬)
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক- তাপ হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন ।
আমি বিদ্রোহী ভ্রৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ -চিহ্ন;।
আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন ।

১১. কিসের তরে অশ্রু ঝরে, কিসের লাগি দীর্ঘ শ্বাস;.(১৯৯৭)
হাস্য মুখে অদৃষ্টেরে করব মোরা পরিহাস।
রিক্ত যারা সর্বহারা সর্বজয়ী বিশ্বে তারা
গর্বময়ী ভাগ্য দেবীর নয়কো তারা ক্রীতদাস ।
হাস্য মুখে অদৃষ্টেরে করব মোরা পরিহাস।

১২. গান যেখানে সত্য (১৯৯৭)
অনন্ত গোধূলী লগ্নে
সেই খানে
বহিচলে ধলেশ্বরী
তীরে তমালের ঘন ছায়া
আঙ্গিনাতে
যে আছে অপেক্ষা করে, তার
পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর ।

অক্ষরবৃত্ত — গদ্য ছন্দ

১৩. মুক করে ঐ /মুখর মুখে/ লুকিয়ে রেখো / না,// (১৯৯৮)
ওগো কুঁড়ি, /ফোটার আগেই/শুকিয়ে থেকো/ না ।//
মলিন নয়ান /ফুলের বয়ান/ মলিন এ দি/ লে //
রাখতে পারে / কোন্ সে কাফের/ আশেক বেদী/ নে ? //

১৪. প্রত্যয় নাহি আর, (১৯৯৮)
জীবনের পথে মানুষ কখনো সাথী হতে পারে কার।
বড় অবেলায় এসেছে বন্ধু, আজি বড় অসময়,
ষোল কলা চাঁদ ঘন কুজ্ঝ¡াট গগনে হয়েছে লয়।

১৫. সময় যে নাই,(১৯৯৮)
আবার শিশির রাতে তাই
নিকুঞ্জে ফুটায়ে তোল নব কুন্দরাজি
সাজাইতে হেমেšেতর অশ্রুভরা আনন্দের সাজি।

১৬. আমার সাšত্বনা নাই জানি বন্ধু জানি,(১৯৯৯)
শুনিতে এসেছি তবু যদি কানা কানি
হয় তব কূলে কূলে আমার সে ডাক।
এ কূলে শোনে কি তাহা চক্র বাকী তার ?
এ বিরহ একি শুধু বিরহ একার?

১৭. দুই পাশে দুই অন্ধকার মাঝখানে চড়া (১৯৯৯)
মধ্যে পাতা একটি হাতে বসুন্ধরা
হাতের উপর লক্ষ রেখা রেখায় ছোটে জল,
জলে ভাসছে গাছের পাতা পাতায় উঠি চল।

১৮. দুঃখের বরষায় (১৯৯৯)
চক্ষের জল যেই
নামল,
বক্ষের দরজায়
বন্ধুর রথ সেই
থামল।

১৯. ওরা চিরকাল (২০০০)
টানে দাঁড়,ধরে থাকে হাল;
ওরা মাঠে মাঠে
বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে –
ওরা কাজ করে
নগরে প্রাšতরে ।

২০. মা কেঁদে কয়, মঞ্জুলী মোর ওইতো কচি মেয়ে,(২০০০)
ওরই সঙ্গে বিয়ে দেবে, বয়সে ওর চেয়ে
পাঁচগুণো সে বড়ো-
তাকে দেখে বাছা আমার ভয়েই জড়ো সড়ো।
এমন বিয়ে ঘটতে দেব নাকো ।

২১. নব সংসার পাতিগে আবার চলো (২০০০)
যে কোন নিভৃত কন্টকাবৃত বনে,
মিলবে সেখানে অšততঃ লোনাজলও,
খসবে খেজুর মাটির আকর্ষণে। (আকর +ষনে)

২২. অনেক সৌন্দর্য আছে হৃদয় ভরিয়া,(২০০১)
সহস্র মানিক্য জ্বলে অšতরে আঁধারে
অনšত সঙ্গীত রাশি কাঁপিয়া কাঁপিয়া
দিবস রজনী করে উন্মাদ আমারে।

২৩. ঐ / বাসন বিধি সে/ আমারে ধরিতে/ বাড়ায়েছিল রে/ হাত,//(২০০১)
মম / অগ্নি- দাহনে/ জ্বলে পুড়ে তাই/ ঠুটো সে (জগন্নাথ)। জগৎ/ + নাথ //
আমি / জানি জানি ঐ/ স্রষ্টার ফাঁকি,/ সৃষ্টির ঐ /চাতুরী,//
তাই / বিধি ও নিয়মে/ লাথি মেরে ঠুকি/ বিধাতার বুকে/ হাতুড়ি।//

২৪. জ্যৈষ্ঠ মাসে /আম চিড়া আর/ ভ্রাদ্রে তালের/ পিঠা// ,(২০০২) ৪+৪+৪+২
শীতের ভাপা/ পুলি মায়ে/ করতো বেজায়/ মিঠা। //৪+৪+৪+২
হরেক রকম/ খাইয়ে দিয়ে /তৃপ্তি যে নেই/ তার,// ৪+৪+৪+২
জানতে চাইতো/, ‘’ছোট্ট খোকা,/ কি খেতে চাস /আর’’?// ৪+৪+৪+২
স্বরবৃত্ত ছন্দ

২৫. দুঃখেরে দেখেছি নিত্য,/পাপেরে দেখেছি নানা ছলে;// (৯৮) ৮+১০
অশাšিতর ঘূর্ণি দেখি/ জীবনের স্রোতে পলে পলে;// ৮+১০
মৃত্যু করে লুকোচুরি //৮
সম¯ত পৃথিবী জুড়ি। //৮
ভেসে যায় তারা সরে যায়,// ১০
জীবনেরে করে যায় //৮
ক্ষণিক বিদ্রুপ। // ৬

অক্ষরবৃত্ত ছন্দ

২৬. আমরা চলি/ সম্মুখ পানে/,(৯৯)
কে আমারে /বাঁধবে ?//
ছিড়বে বাঁধা/ রক্ত পায়ে,/
জড়িয়ে ওরা /আপন গায়ে/
কেবলই ফাঁদ /ফাঁদবে।//

২৭. মত্ত সাগর/ দিল পাড়ি/ গহন রাত্রি /কালে//
ঐ যে আমার/ নেয়ে। //
ঝড় বয়েছে /ঝড়ের হাওয়া/ লাগিয়ে দিয়ে/ পালে //
আসছে তরী/ বেয়ে//

২৮. আমাদের ছোট গায়ে / ছোট ছোট ঘর //
থাকি সেথা সবে মিলে /নাহি কেহ পর । //
পাড়ার সকল ছেলে, /মোরা ভাই ভাই //
এক সাথে খেলি আর /পাঠশালে যাই । //

অক্ষরবৃত্ত ছন্দের পয়ার।

২৯. দুঃসহ দহনে তব হে দর্পী তাপস,(৯৬)
অ¤øান স্বর্ণেরে মোর করিলে বিরস,
অকালে শুকালে মোর রূপ রস প্রাণ ।
শীর্ণ কর পুষ্ট ভরি সুন্দরের দান

৩০. বেয়নেট হ’ক যত ধারালো (৯৬)
কা¯েতটা ধার দিও বন্ধু।
শেল্ আর বোম হ’ক ভারালো
কা¯েত টা শান দিও বন্ধু ।
বাঁকানো চাঁদের সাদা ফালিটি
তুমি বুঝি খুব ভাল বাসতে ?
চাঁদের শতক আজ নহে তো,
এ-যুগের চাঁদ হ’ল কা¯েত!

৩১. রাত্রির উৎসব জাগালে দিবসেই, তাইতো তন্দ্রায় ভূবন ছায়, (৯৭)
রাত্রির গুন সব দিনেরে দিনে দান,তাইতো বিচ্ছেদ দ্বিগুণ হায়,
ইন্দ্রের দক্ষিণ বাহুসে তুমি দেব পূজ্য লও মোর পুজার ফুল;
পঙ্কর বংশের চূড়া যে তুমি মেঘ, বন্ধু ! দৈবের ঘুচাও ভূল ।

৩২. প্রিয়তম আমি তোমারে যে ভাল বেসেছি (৯৭)
দয়া করে কোরো মার্জনা কোরো মার্জনা ।
ভীরু পাখি আমি তব পিঞ্জার এসেছি
তাই বলে দ্বার রুদ্ধ কোরো না কোরো না।

৩৩. সঘন মেঘে /বর্ষা আসে/ (২০০২)
বরষে ঝর/ঝর।//
কাননে ফুটে /নবমালতী/
কদম্ব কে/শর !//
স্বচ্ছ হাসি/ শরৎ আসে /
পূর্ণিমা মা/লিকা।//
সকল বন/ আকুল করে /
শ্রুভ্র শেফা/লকা।//

৩৪. অবাক কাÐ একি
এমন কথা মানুষ শুনেছে কি !
জাতে হয়তো মেথর হবে কিম্বা নেহাত ওচাঁ,
যাত্রী ঘরের করে ঝাড়া মোছা,
পঁচিশ টাকা দিতেই হবে তাকে।
এমন হলে দেউলে হতে ক’দিন বাকি থাকে!

৩৫. ঘুম পাড়ানী/ মাসীপিসী/ মোদের বাড়ি/ যেও//
বাটা ভরা /পান দেব/ গাল ভরে/ খেও। //

৩৬. যৌবনের মর্মজানে জরাজীর্ণ জায়
সুস্থ মর্ম জান এ অসুস্থ জায়গায়
সুখ মর্ম দুঃখী জানে না জানে রাজন।
কন্যা জানে নাহি জানে প্রসব বেদন।

৩৭.শ্রাবণ নিশীথে ঝড়ের কাঁদন শুনেছ কি কোন দিন ? (২০০৩)
কার অশাšত অসহ রোদন আজিও শ্রাšিত হীন
দিক দিগšেত দস্যুর মত হানা দিয়ে ফেরে হায়।
ভবনে ভবনে কার বুক থেকে কাহারে ছিনিতে চায়?

৩৮. তোমার শঙ্খ /ধুলায় পড়ে/ (২০০৩)
কেমন করে /সইব//
বাতাস আলো /গেল মরে /
এ কিরে দুর্দৈব (দুর + দৈব মধ্যখÐন হবে)
লড়বি কে আয় / ধ্বজা বেয়ে /
গান আছে যার / ওঠ্না গেয়ে,/
চলবি যারা/ চলরে ধেয়ে /
আয় না নিঃ/শঙ্ক। //
ধুলায় পড়ে রইল চেয়ে
ওই যে অভয় শঙ্খ

স্বরবৃত্ত ছন্দ

৩৯.নিভৃত এ চিত্ত মাঝে নিমিষে নিমিষে বাজে (৯৯)
জগতের তরঙ্গ আঘাত
ধ্বনিত হৃদয়ে তাই মুহূর্ত বিরাম নাই
নিদ্রাহীন সারা দিন রাত ।

৪০. আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু (৯৯)
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূম কেতু ।
সাত- সাতশ’ নরক জ্বালা জ্বলে মম ললাটে ।
মম ধূম কুÐলী করেছে শিবের ত্রিনয়ন ঘন ঘোলাটে ।

৪১. চপল পায় কেবল ধাই কেবল গাই পরীর গান
পুলক মোর সকল গায় বিভোল মোর সকল প্রাণ।
বিজন দেশ কুজন নাই নিজের পায় বাজাই তাল,
একলা ধাই একলা গাই দিবস রাত সাঁঝ সকাল।

৪২. ফিরে এল আজ সেই মোহরম মাহিনা ,
ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।
উষ্ণীষ কোরানের হাতে তেগ আরবীর,
দুনিয়াতে নত নয় মুসলিম কারো শির।

৪৩. প্রিয়া তারে রাখিল না রাজ্য তারে ছেড়ে দিল পথ
রুধিল না সমুদ্র পর্বত
আজি তার রথ
চলিয়াছে রাত্রির আহŸানে
নক্ষত্রের গানে
প্রভাতের সিংহদ্বার পানে।
তাই
স্মৃতিভারে আমি পড়ে আছি
ভারমুক্ত সে এখানে নাই।

অক্ষরবৃত্ত ছন্দের মুক্তক ।

অক্ষরকৃত্ত চন্দের বৈচিত্র্য

উপসংহার

উপসংহারে এসে স্পষ্টভাবে বলা যায়, বাংলা কবিতার ছন্দচর্চায় অক্ষরবৃত্ত কেবল একটি প্রথাগত কাঠামো নয়, বরং এটি একটি ছন্দচেতনা। মুক্তক ছন্দ, অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও গৈরিশ ছন্দ—এই তিনটি ধারাই কোনো না কোনোভাবে অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বাহ্যিক স্বাধীনতা যতই থাকুক, অন্তর্গত ছন্দবোধে অক্ষরবৃত্ত-এর প্রভাব অস্বীকার করা যায় না।

মুক্তক ছন্দে আমরা দেখি অক্ষরবৃত্ত-এর বাঁধন আলগা হলেও সম্পূর্ণ ছিন্ন নয়। অমিত্রাক্ষর ছন্দে মিল ত্যাগ করা হলেও ছন্দের ভারসাম্য অনেক সময় অক্ষরবৃত্ত নির্ভর। আবার গৈরিশ ছন্দে ভাবের প্রবাহ যত স্বতঃস্ফূর্তই হোক, ছন্দের অন্তর্লীন শৃঙ্খলায় অক্ষরবৃত্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ আধুনিকতা ও স্বাধীনতার আড়ালেও অক্ষরবৃত্ত এক নীরব নিয়ন্ত্রক।

ছন্দ শেখা মানে শুধু নিয়ম মুখস্থ করা নয়; ছন্দ মানে ভাষার সংগীত বোঝা। সেই সংগীত বোঝার প্রথম পাঠশালা হলো অক্ষরবৃত্ত। তাই বাংলা কবিতার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—তিন ক্ষেত্রেই অক্ষরবৃত্ত ছন্দ একটি মৌলিক ও অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে টিকে থাকবে। ছন্দ ভাঙার মধ্যেও যে ছন্দ থাকে, সেই অন্তর্লুকায়িত সত্যটি বুঝতে হলে অক্ষরবৃত্ত-এর আলোতেই ফিরে তাকাতে হয়।

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *