অনুপ্রাস কাকে বলে? বিভিন্ন প্রকার অনুপ্রাসের উদাহরণসহ পরিচয়।


অনুপ্রাস – বিস্তারিত আলোচনা।
ভূমিকা: বাংলা অলংকারশাস্ত্রে ভাষাকে শ্রুতিমধুর ও ছন্দোময় করে তোলার ক্ষেত্রে অনুপ্রাস অলংকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাব্য, কবিতা ও গদ্য রচনায় ধ্বনিগত সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে অনুপ্রাস অলংকার ব্যবহৃত হয়। একই বা সাদৃশ্যপূর্ণ ধ্বনির পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে পাঠকের কানে একটি সুরেলা আবেশ সৃষ্টি হয়। এই কারণেই বাংলা সাহিত্যে অনুপ্রাস অলংকার বিশেষভাবে সমাদৃত। অনুপ্রাস অলংকার ভাষাকে প্রাণবন্ত ও আবেগঘন করে তোলে।
অনু শব্দের অর্থ পরে বা পিছনে, আর প্রাস শব্দের অর্থ বিন্যাস, প্রয়োগ বা নিক্ষেপ। তাহলে বলা যায়- একটি শব্দে ব্যবহৃত কোনো ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছ পরের বা পিছনের শব্দে একইভাবে ব্যবহৃত হওয়ার নাম অনুপ্রাস।
একই ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছ একাধিকবার যথাসম্ভব পরপর বা কাছাকাছি ব্যবহৃত হয়ে যে সুন্দর ধ্বনিসৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়, তার নাম অনুপ্রাস। ( বাঙলা অলঙ্কার, আবদুল নঈম)
সহজ ভাষায়- একই ধ্বনি বার বার ব্যবহার করার নামই অনুপ্রাস।
১. কাক কালো কোকিল কালো কালো কন্যার কেশ।
২. কলিকাতার কমলা কাকাকে কহিল, কাকা কাক কেন কা কা করে।
৩, ওহে চাচা, এ চটা চেচো না, আচাচা চটা আছে চাচা, সেই চটা চাকু দিয়ে চাচো চাচা।
অনুপ্রাসের প্রকারভেদ:
বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন ধরনের অনুপ্রাসের ব্যবহার দেখা যায়। প্রধান প্রধান অনুপ্রাসের সংজ্ঞা ও উদাহরণ আলোচনা করা হল।
ক) আদ্যানুপ্রাস:
কবিতার চরণের প্রথম শব্দটির সাথে পরের চরণের প্রথম শব্দের ধ্বনিসাম্য থাকলে তাকে আদ্যানুপ্রাস বলে। অর্থাৎ বক্তব্যের প্রথমে যে অনুপ্রাস থাকে, থাকে আদ্যানুপ্রাস বলে। যেমন-
১.যতবার লেখা শুরু করি
ততবার ধরা পড়ে; এ খবর সহজ তো নয়।
এখানে যতবার শব্দের সাথে পরের চরণের ততবার শব্দের একটা ধ্বনিসাম্য রয়েছে।
২. পাকা যে ফল পড়ল মাটির টানে,
শাখা আবার চায় কি তাহার পানে?
এখানে পাকা শব্দের সাথে শাখা শব্দের অনুপ্রাস সৃষ্টি হয়েছে।
খ) অন্ত্যানুপ্রাস: কবিতার প্রথম চরণের শেষ শব্দের সাথে পরের চরণের শেষ শব্দের ধ্বনিগত মিল থাকলে, তাকে অন্ত্যানুপ্রাস বলে। কবিতার দুটি চরণের শেষে যে অন্তমিল, তা-ই অন্ত্যানুপ্রাস। এর আরেক নাম অন্ত্যমিল। বক্তব্যের শেষে যে অনুপ্রাস থাকে তাকে অন্ত্যানুপ্রাস বলে। যেমন-
এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে,
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।
এখানে তলে আর জলে শব্দে ধ্বনিগত মিল রয়েছে।
গ)মধ্যানুপ্রাস: কবিতার চরণের মধ্যে ধ্বনিগত সাম্যের ফলে যে অনুপ্রাস সৃষ্টি হয়, তাকে মধ্যানুপ্রাস বলে। বক্তব্যের মাঝে যে অনুপ্রাস থাকে, তাকে মধ্যানুপ্রাস বলে। যেমন-
চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা।
এখানে চরণের মাঝখানে আর ধ্বনির মিল রয়েছে। (তার, কবেকার, অন্ধকার, বিদিশার)
ঘ) বৃত্ত্যনুপ্রাস: একই ধ্বনি বার বার ব্যবহার করার নাম বৃত্ত্যনুপ্রাস। নিম্নের যে-কোনো একটি হলে বৃত্ত্যনুপ্রাস হবে-
১. একটি ব্যঞ্জনধ্বনি একাধিকবার ধ্বনিত হলে;
কুলায়ে কাঁপিছে কাতর কপোত– এখানে ক ধ্বনি বহুবার ধ্বনিত হয়েছে।
কাক কালো কোকিল কালো কালো কন্যার কেশ।
২. একটি ব্যঞ্জনধ্বনি মাত্র দুইবার ধ্বনিত হলে;
জাগে রথ-রথী গজ অশ্ব পদাতিক
এখানে জ, গ, র, থ – দুই বার করে ব্যবহৃত হয়েছে।
৩. ব্যঞ্জনগুচ্ছ স্বরূপানুসারে যুক্ত বা বিযুক্তভাবে মাত্র দুই বার ধ্বনিত হলে;
সবারে বাসরে ভাল
নইলে তোর মনের কালো ঘুচবে না। (অতুল প্রসাদ)
স, ব, র ধ্বনি স্বরূপানুসারে বিযুক্তভাবে মাত্র দুই বার ধ্বনিত হয়েছে।
৪. ব্যঞ্জনগুচ্ছ ক্রমানুসারে যুক্ত বা বিযুক্তভাবে বহুবার ধ্বনিত হলে বৃত্ত্যনুপ্রাস হবে।
মালঞ্চের চঞ্চল অঞ্চল- এখানে ঞ ও চ যুক্তভাবে বহুবার ধ্বনিত হয়েছে।
হায়রে মানব হৃদয়/তোমার সঞ্চয়/ দিনান্তে নিশান্তে পথ প্রান্তে ফেলে যেতে হয়। এখানেও ন ও ত যুক্তভাবে বহুবার ধ্বনিত হয়েছে।
ভূলোক দ্যূলোক গোলোক ভেদিয়া- এখানে লোক বহুবার ধ্বনিত হয়েছে।
সংক্ষেপে-
ব্যঞ্জনধ্বনি বহুবার, ব্যঞ্জনগুচ্ছ স্বরূপানুসারে যুক্ত বা বিযুক্তভাবে দুই বার বা ক্রমানুসারে যুক্ত বা বিযুক্তভাবে বহুবার ধ্বনিত হলে বৃত্ত্যনুপ্রাস হয়।
( স্বরূপানুসার বলতে কী বুঝায়? –
সবারে, বাসরে – এখানে তিনটি ব্যঞ্জনধ্বনি, স, ব, র, প্রথম শব্দেও আছে , পরের শব্দেও আছে, তবে প্রথম শব্দে যেভাবে আছে পরের শব্দে সেভাবে নেই, স্থান পরিবর্তন করেছে। বর্ণ ঠিক থাকলেও স্থান ঠিক নেই। তাই এটি স্বরূপানুসারে। আগের শব্দে যে যে বর্ণ থাকবে পরের শব্দেও সেই সেই বর্ণ থাকবে তবে একই ক্রমে থাকবে না।
ক্রমানুসারে বলতে কী বুঝায়? –
মালঞ্চের চঞ্চল অঞ্চল- এখানে ঞ ও চ বর্ণদুইটি আগের শব্দেও যেভাবে আছে, পরের শব্দেও একই ক্রমে আছে, স্থান পরিবর্তন করেনি, তাই এটি ক্রমানুসারে।
যুক্ত ও বিযুক্ত:
কল, কল এখানে ক ও ল বিযুক্তভাবে ক্রমানুসারে। কল, লক – এখানে ক ও ল বিযুক্তভাবে স্বরূপানুসারে। ক্ল , ক্ল এখানে যুক্তভাবে ক্রমানুসারে, ল্ক ও ক্ল যুক্তভাবে স্বরূপানুসারে।
ঙ) ছেকানুপ্রাস:
দুই বা ততোধিক ব্যঞ্জনধ্বনি যুক্ত বা বিযুক্তভাবে ক্রমানুসারে মাত্র দুই বার ধ্বনিত হলে যে অলংকার হয় তাকে ছেকানুপ্রাস বলে।
ছেকানুপ্রাস হতে হলে কমপক্ষে দুই বা ততোধিক ব্যঞ্জধ্বনির প্রয়োজন। যুক্ত বা বিযুক্তভাবে ক্রমানুসারে ব্যবহৃত হতে হবে। যেমন-
১. লঙ্কার পঙ্কজ রবি গেলা অস্তাচলে। এখানে ঙ ও ক যুক্তভাবে ক্রমানুসারে মাত্র দুই বার ধ্বনিত।
২. মম, এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য। এখানে বঁ, শ, র ক্রমানুসারে বিযুক্তভাবে মাত্র দুই বার ধ্বনিত হয়েছে।
চ) শ্রুত্যনুপ্রাস:
বর্ণ বা ধ্বনি আলাদা, কিন্তু বাগযন্ত্রের একই স্থান থেকে উচ্চারিত এবং শ্রুতিগত দিক থেকে এক ধরনের মনে হয়, এসব ধ্বনির মধ্যে যে অনুপ্রাস সৃষ্টি হয় তাকে শ্রুত্যনুপ্রাস বলে। অন্যভাবে বলা যায়-
ভিন্ন বর্ণ হওয়া সত্ত্বেও যদি বাগযন্ত্রের একই স্থান থেকে উচ্চারিত হওয়ার ফলে শ্রবণের দিক থেকে মিল থাকে তবে তাকে শ্রুত্যনুপ্রাস বলে।
১. বলে দাও মোর সারথিরে ডেকে
ঘোড়া বেছে নেয় ভালো ভালো দেখে।
এখানে ক ও খ ভিন্ন ধ্বনি, কিন্তু একই স্থান থেকে উচ্চারণের ফলে শুনতে একই রকম। অনেক সময় চ-ছ, জ-য, র-ড়, ট-ঠ, ত-থ ইত্যাদি ধ্বনির মধ্যে অনুপ্রাস দেখা যায়, এগুলোই শ্রুত্যনুপ্রাস।
পাকা যে ফল পড়ল মাটির টানে,
শাখা আবার চায় কি তাহার পানে?
এখানেও ক ও খ এর মধ্যে অনুপ্রাস সৃষ্টি করা হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায এ অলংকার বাংলা কাব্যভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং ভাষাকে শ্রুতিমধুর ও আকর্ষণীয় করে তোলে। ধ্বনির পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে উক্ত অলংকার পাঠকের মনে সুর, আবেগ ও কাব্যিক রসের সৃষ্টি করে। বাংলা সাহিত্যে এ অলংকারের ব্যবহার তাই চিরকাল গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য হয়ে থাকবে।
