অলঙ্কারের সংজ্ঞা , শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের প্রকারভেদ আলোচনা।


খোলা পাতা ব্লগ – প্রকাশিত বিষয়ের তালিকা
অলঙ্কার – শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কার
অলঙ্কার শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ- যার দ্বারা ভূষিত করা হয় বা সজ্জিত করা হয়। নারী দেহকে সুন্দর ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করার জন্য যেমন কানে দুল, গলায় হার, নাকে নোলক, হাতে চুড়ি, পায়ে মল ইত্যাদি দ্বারা সজ্জিত করা হয়, তেমনি সাহিত্যের দেহের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার জন্যও বিভিন্ন অলঙ্কার ব্যবহৃত হয়। সুতরাং, কাব্যের সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করার জন্যে যা দ্বারা কাব্যকে সজ্জিত করা হয়, তাই অলংকার।
এক কথায়- কাব্যদেহের শোভাকর ধর্মকেই অলংকার বলে।
আচার্য বামনের মতে- কাব্যের সৌন্দর্যই অলংকার।
অলংকার এমনই এক গুণ, যা দ্বারা বক্তব্যের শক্তি বৃদ্ধি পায় ও সৌন্দর্য সম্পাদন হয়।
তাই বলা যায়- অনুপ্রাস, উপমা, রূপকাদি ইত্যাদি যে সব লক্ষণ সাহিত্য-সৃষ্টির সৌন্দর্য সম্পাদন ও উৎকর্ষ ঘটায়, তাকে অলংকার বলে।
সহজ কথায় বলা যায় যে, কবি সাহিত্যিকরা তাদের রচনার সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য রচনার দেহে বাইরে থেকে যে রূপ আরোপ করেন, তাকে অলংকার বলে।
অলঙ্কারের প্রকারভেদ:
কাব্যদেহ হলো শব্দ বা বাক্য। তাই, কবি-সাহিত্যিককে অলঙ্কারের জন্য শব্দের উপর নির্ভর করতে হয়। শব্দের দুটো রূপ। এক, ধ্বনিরূপ, দুই অর্থরূপ। ধ্বনিরূপ আমাদের কানকে মুগ্ধ করে, আর অর্থরূপ আমাদের মনকে মুগ্ধ করে। তাই দেখা যায়, কবি-সাহিত্যিকরা শব্দের ধ্বনিরূপ ও অর্থরূপকে আশ্রয় করে তাদের সৃষ্টিকর্মের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে সার্থক ও রসোত্তীর্ণ করে তোলে। তাহলে বলা যায় যে,অলঙ্কার দুই প্রকার। যথা- শব্দালংকার ও অর্থালঙ্কার।
১. শব্দালংকার:
শব্দের ধ্বনিরূপের উপর ভিত্তি করে যে অলংকার গড়ে ওঠে, তাকে শব্দালংকার বলে। শব্দালংকারের মূল ভিত্তি হলো ধ্বনিরূপ। তাই, এর মূল মাধুর্য লুকিয়ে থাকে এর ধ্বনিরূপের মধ্যে। সেজন্য ধ্বনিরূপ বদলে দিলে আর এ অলংকারের অস্তিত্ব থাকে না। যেমন-
যতবার লেখা শুরু করি
ততবার ধরা পড়ে ; এ খবর সহজ তো নয়। (রবীন্দ্রনাথ )
এটি অনুপ্রাস শব্দালংকারের দৃষ্টান্ত।
ভারত ভারত খ্যাত আপনার গুণে।
এটি যমক শব্দালংকারের দৃষ্টান্ত।
পরোয়া করি না বাঁচি না বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে
মাথার উপর জ্বলিছেন রবি রয়েছে সোনার শত ছেলে। (নজরুল )
এটি শ্লেষ শব্দালংকারের দৃষ্টান্ত।
শব্দালংকার কাকে বলে? শব্দালংকারের শ্রেণীবিভাগ
শব্দের ধ্বনিরূপের উপর ভিত্তি করে যে অলংকার গড়ে ওঠে, তাকে শব্দালংকার বলে। শব্দালংকারের মূল ভিত্তি হলো ধ্বনিরূপ। তাই, এর মূল মাধুর্য লুকিয়ে থাকে এর ধ্বনিরূপের মধ্যে। সেজন্য ধ্বনিরূপ বদলে দিলে আর এ অলংকারের অস্তিত্ব থাকে না।
শব্দালংকারের প্রকারভেদ:
শব্দালংকার পাঁচ প্রকার। যথা :-
১. অনুপ্রাস, ২. যমক, ৩. শ্লেষ, ৪. বক্রোক্তি ও ৫. পুনরুক্তবদাভাস।
১. অনুপ্রাস: অনু শব্দের অর্থ পরে বা পিছনে, আর প্রাস শব্দের অর্থ বিন্যাস, প্রয়োগ বা নিক্ষেপ। তাহলে বলা যায় যে, একটি শব্দে ব্যবহৃত কোনো ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছ পরের বা পিছনের শব্দে একই ভাবে ব্যবহৃত হওয়ার নাম অনুপ্রাস।
বিভিন্ন পণ্ডিত বিভিন্নভাবে অনুপ্রাসের সংজ্ঞা দিয়েছেন। তাদের মতামতের ভিত্তিতে বলা যায় যে, একই ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছ একাধিকবার যথাসম্ভব পরপর বা কাছাকাছি ব্যবহৃত হয়ে যে সুন্দর ধ্বনিসৌন্দর্য সৃষ্টি হয়, তার নাম অনুপ্রাস।
এক কথায়, একই ধ্বনি বার বার ব্যবহার করার নামই অনুপ্রাস।
অনুপ্রাস বিভিন্ন প্রকার হয়ে থাকে। যেমন- আদ্যানুপ্রাস, মধ্যানুপ্রাস, অন্ত্যানুপ্রাস, বৃত্তানুপ্রাস, ছেকানুপ্রাস, শ্রুত্যনুপ্রাস ইত্যাদি। তবে বাংলা সাহিত্যে অন্ত্যানুপ্রাস, বৃত্তানুপ্রাস ও ছেকানুপ্রাস বেশি ব্যবহৃত হয়।
ক) আদ্যানুপ্রাস : কবিতার প্রথম পংক্তির প্রথম পদের সাথে পরের পংক্তির প্রথম পদের সাথে ধ্বনিগত মিল থাকার নাম আদ্যানুপ্রাস। অর্থাৎ, কবিতার চরণের প্রথমেই অনুপ্রাস থাকলে তাকে আদ্যানুপ্রাস বলে। যেমন-
১. যতবার লেখা শুরু করি ততবার ধরা পড়ে; এ খবর সহজ তো নয়। (রবীন্দ্রনাথ)
২. পাকা যে ফল পড়ল মাটির টানে, শাখা আবার চায় কি তাহার পানে? (রবীন্দ্রনাথ)
খ) মধ্যানুপ্রাস : কবিতার চরণের মধ্যে ধ্বনিগত মিলের ফলে যে অনুপ্রাসের সৃষ্টি হয়, তাকে মধ্যানুপ্রাস বলে। যেমন-
চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা।
এখানে চরণের মাঝখানে আর ধ্বনির মিল রয়েছে।
গ) অন্ত্যানুপ্রাস: কবিতার চরণের শেষের শব্দটির সাথে পরবর্তী চরণের শেষ ধ্বনিটির ধ্বনিসাম্য থাকলে তাকে অন্ত্যানুপ্রাস বলে। এর আরেক নাম অন্তমিল। মিত্রাক্ষর কবিতার মিলই অন্ত্যানুপ্রাস। যেমন-
এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে, তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।
এখানে তলে ও জলে শব্দে ধ্বনিগত মিল রয়েছে।
ঘ) বৃত্ত্যনুপ্রাস: একটি ব্যঞ্জনধ্বনি মাত্র দুই বার ধ্বনিত হলে, একটি ব্যঞ্জনধ্বনি একাধিকবার ধ্বনিত হলে, ব্যঞ্জনগুচ্ছ স্বরূপানুসারে যুক্ত বা বিযুক্তভাবে মাত্র দুইবার ধ্বনিত হলে, বা ব্যঞ্জনগুচ্ছ ক্রমানুসারে যুক্ত বা বিযুক্তভাবে বহুবার ধ্বনিত হলে, তাকে বৃত্ত্যনুপ্রাস বলে।
একটি ব্যঞ্জনধ্বনি মাত্র দুই বার ব্যবহৃত
জাগে রথ রথী গজ অশ্ব পদাতিক। (মধুসূদন)
এখানে জ, র, খ, গ মাত্র দুই বার ধ্বনিত হয়েছে।
একটি ব্যঞ্জনধ্বনি বহুবার ব্যবহৃত-
- ১. কাক কালো কোকিল কালো কালে কন্যার কেশ
- ২. কুলায়ে কাঁপিছে কাতর কপোত।
- ৩. চল চপলার চকিত চমকে।
ব্যঞ্জনগুচ্ছ স্বরূপানুসারে যুক্ত বা বিযুক্তভাবে মাত্র দুই বার ব্যবহৃত-
সবারে বাসরে ভাল
নইলে তোর মনের কালো ঘুচবে না। (অতুলপ্রসাদ)
এখানে সবারে ও বাসরে শব্দদুটিতে একই ব্যঞ্জনবর্ণ থাকলেও একই ক্রমে নেই, এটি স্বরূপানুসারে ব্যবহৃত।
ব্যঞ্জনগুচ্ছ ক্রমানুসারে যুক্ত বা বিযুক্তভাবে বহুবার ব্যবহৃত-
১. মালঞ্চের চঞ্চল অঞ্চল (রবীন্দ্রনাথ)
এখানে ঞ, চ একই ক্রমে যুক্তভাবে বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে।
২. ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া।
এখানে লোক ব্যঞ্জনগুচ্ছ বিযুক্তভাবে বহুবার ব্যবহৃত।
ঙ) ছেকানুপ্রাস: দুই বা ততোধিক ব্যঞ্জনধ্বনি যুক্ত বা বিযুক্তভাবে একই ক্রমে মাত্র দু’ বার ধ্বনিত হলে যে অলংকার হয় তাকে ছেকানুপ্রাস বলে। যেমন-
১. লঙ্কার পঙ্কজ রবি গেলা অস্তাচলে। (মধুসূদন)
এখানে ঙ ও ক যুক্তভাবে ক্রমানুসারে মাত্র দুই বার ব্যবহৃত হয়েছে।
২. মম, এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য।
এখানে ব্যঞ্জনগুচ্ছ ব-শ-র একই ক্রমে বাঁশের ও বাঁশরী শব্দে বিযুক্তভাবে মাত্র দু’বার ব্যবহৃত হয়েছে।
চ) শ্রুত্যনুপ্রাস : বর্ণ বা ধ্বনি স্বতন্ত্র, কিন্তু বাগযন্ত্রের একই স্থান থেকে উচ্চারিত হয় বলে শ্রুতিগত দিক থেকে এক ধরণের অনুপ্রাস সৃষ্টি হয়, এ ধরণের অনুপ্রাসকে শ্রুত্যনুপ্রাস বলে।
সহজ কথায় ভিন্ন বর্ণ হওয়া সত্ত্বেও যদি বাগযন্ত্রের একই স্থান থেকে উচ্চারিত হওয়ার ফলে শ্রবণের দিক থেকে মিল থাকে, তবে তাকে শ্রুত্যনুপ্রাস বলে। যেমন-
বলে দাও মোর সারথিরে ডেকে,
ঘোড়া বেছে নেয় ভালো ভালো দেখে।
এখানে ক ও খ ভিন্ন ধ্বনি। কিন্তু এদের উচ্চারণ স্থান একই এবং শ্রুতিগত মিল রয়েছে।
২. যমক: একই শব্দ যদি একাধিকবার ব্যবহার করে একাধিক অর্থ প্রকাশ করা হয়, তবে তাকে যমক বলে।
একটা শব্দ যতবার ব্যবহৃত হবে, অর্থও ভিন্ন ভিন্ন হবে। একই চেহারার জমজ ভাই বা বোনের মতো। দেখতে একই হলেও তারা যেমন ভিন্ন মানুষ, তেমনি যমকে শব্দ একই হলেও অর্থ আলাদা। যেমন- আমি চিনি চিনি। এখানে চিনি শব্দটি দুই বাব ব্যবহৃত। কিন্তু অর্থ আলাদা। চিনি – চেনাজানা; চিনি– মিষ্টিদ্রব্য।
অন্য কথায় একই শব্দ একই স্বরধ্বনিসমেত একই ক্রমে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে একাধিকবার ব্যবহারে যে অলঙ্কার হয়, তার নাম যমক অলংকার। যমকে একই শব্দ দু’বার স্বরধ্বনিসহ ব্যবহৃত হয় এবং অর্থও হয় ভিন্ন। তবে দু’বার ব্যবহৃত শব্দে স্বরধ্বনির বদল ঘটলে যমক নাও থাকতে পারে।
যমক চার প্রকার। যথা:- আদ্যযমক, মধ্যযমক, অন্ত্যযমক ও সর্বযমক।
ক) আদ্যযমক: বাক্যের বা চরণের প্রথমে যমক অলংকার থাকলে তাকে আদ্যযমক বলে। যেমন-
ভারত ভারত খ্যাত আপনার গুণে।
প্রথম ভারত অর্থ ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর। আর দ্বিতীয় ভারত শব্দের অর্থ ভারতবর্ষ।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, একই শব্দ দুইবার ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ভারত শব্দে এখানে যমক অলংকার হয়েছে। চরণের প্রথমে আছে বলে এটি আদ্যযমক।
এ রকম- মাটির ভয়ে রাজ্য হবে মাটি।
প্রথম মাটি অর্থ মাটি; দ্বিতীয় মাটি মানে নষ্ট হওয়া। জুতা আবিষ্কার কবিতায় রাজাকে পরামর্শ দেওয়া হলো মাটি এড়াতে ঘরে বসে থাকতে। রাজা বললেন, হ্যা তিনি মাটি ভয়ে যদি ঘরে বসে থাকেন তাহলে রাজ্যেই মাটি হয়ে যাবে, অর্থাৎ নষ্ট হয়ে যাবে।
খ) মধ্যযমক: বাক্যের বা চরণের মাঝে যমক অলংকার থাকলে, তাকে মধ্যযমক বলে। যেমন-
তোমার এ বিধি, বিধি কে পারে বুঝিতে? (মধুসূদন)
এখানে প্রথম বিধি অর্থ নিয়ম, দ্বিতীয় বিধি অর্থ ঈশ্বর বা বিধাতা। চরণের মাঝে আছে বলে এটি মধ্যযমক।
এ রকম- পাইয়া চরণ-তরী তরি ভবে আশা। (ভারতচন্দ্র)
গ) অন্ত্যযমক: বাক্যের বা চরণের শেষে ব্যবহৃত যমককে অন্ত্যযমক বলে। যেমন-
কবির রমণী বাঁধি কেশপাশ
বসি একাকিনী বাতায়ন পাশ।
এখানে প্রথম পাশ শব্দের অর্থ গুচ্ছ, আর দ্বিতীয় পাশ শব্দের অর্থ পাশে। চরণের শেষে আছে বলে এটি অন্ত্যযমক।
এ রকম-
১. সামনে আসছে শুভ দিন
ফুল মার্কায় ভোট দিন।
২. আমি চিনি চিনি।
ঘ) সর্বযমক: বাক্যের বা চরণের মধ্যে যদি আদ্য, মধ্য ও অন্ত্য এই তিন প্রকার যমকই পরপর ব্যবহৃত হয়, তবে তাকে সর্বযমক বলে। যেমন-
কান্তার আমোদ পূর্ণ কান্তসহকারে।
কান্তার আমোদ-পূর্ণ কান্ত সহকারে।
কান্তার অর্থ – বনভূমি, দয়িতার;
আমোদ অর্থ -সৌরভ, আনন্দ:
কান্ত অর্থ – বসন্তকাল, প্রেমাস্পদ:
সহকারে অর্থ – সমাগমে, সঙ্গে।
অর্থাৎ প্রথম পংক্তির অর্থ হলো বনভূমি বসন্ত সমাগমে সৌরভপূর্ণ হয়েছে।
দ্বিতীয় পংক্তির অর্থ হলো দয়িতা প্রিয়সঙ্গে আনন্দিত হয়েছে।
এটি সর্বযমকের উদাহরণ।
৩. শ্লেষ : একটি শব্দ একাধিক অর্থে একবার মাত্র ব্যবহারের ফলে যে অলংকার হয়, তাকে শ্লেষ অলংকার বলে।
কবি সাহিত্যিকরা একটি শব্দ একবার ব্যবহার করেও তার মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন অর্থের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে থাকেন এবং পাঠক সমাজ একাধিক অর্থেই তাকে গ্রহণ করে। তাহলে বলা যায়-যে অলংকারে একটি শব্দ একবার ব্যবহৃত হয়ে একাধিক অর্থ প্রকাশ পায় এবং শ্রোতা পাঠক একাধিক অর্থেই তাকে গ্রহণ করে, তাকে শ্লেষ বা শব্দশ্লেষ অলংকার বলে।
শ্লেষ দুই প্রকার। যথা:- অভঙ্গ শ্লেষ ও সভঙ্গ শ্লেষ।
ক) অভঙ্গ শ্লেষ: যে শ্লেষ অলঙ্কারে শব্দটি না ভেঙেই পাঠক বা শ্রোতা একাধিক অর্থেই গ্রহণ করে, তাকে অভঙ্গ শ্লেষ বলে। যেমন-
পরোয়া করি না বাঁচি না বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে
মাথার উপর জ্বলিছেন রবি রয়েছে সোনার শত ছেলে। (নজরুল)
এখানে রবি শব্দের অভিপ্রেত অর্থ দুটি। একটি অর্থ সূর্য, অন্যটি রবীন্দ্রনাথ। একবার মাত্র ব্যবহারে দুটি অর্থ প্রকাশ পেয়েছে। এটি অভঙ্গ শ্লেষ। এ রকম-
আছিলাম এককিনী বসিয়া কাননে।
আনিলা তোমার স্বামী বান্ধি নিজগুণে।
এখানে গুণে শব্দটিতে শ্লেষ। একটি অর্থ ধনুকের ছিলায়, অন্য অর্থ সুন্দর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। শব্দটি না ভেঙে দুটি অর্থ পাওয়া গেছে, তাই এটি অভঙ্গ শ্লেষ।
খ) সভঙ্গ শ্লেষ : যদি এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করে শ্লেষ অলংকার সৃষ্টি করা হয়, যাকে না ভাঙলে বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ পাওয়া সম্ভব নয়, তবে তাকে সভঙ্গ শ্লেষ অলংকার বলে। অর্থাৎ শব্দ না ভাঙলে একাধিক অর্থ পাওয়া যায় না, ভাঙলেই কেবল ভিন্ন অর্থ পাওয়া যায়। যেমন-
কীর্তনিয়ার গানে-
নয়ন নাচাইছে।
এখানে কোনো একটি বিষয় চোখ বা নয়নকে নাচাচ্ছে। কিন্তু নাচাইছে শব্দটিকে ভাঙলে অন্য অর্থ পাওয়া যায়। না+ চাইছে অর্থাৎ কোনো বিষয় চোখ বা নয়ন চাচ্ছে না।
তেমনি- এলো না মাধব। এখানে মাধব শব্দের অর্থ কৃষ্ণ। অর্থাৎ রাধা বলছে কৃষ্ণ এলো না, কিন্তু শাশুড়ি বা ননদের ভয়ে মাধব শব্দটিকে ভেঙে বলছে এলো না মা ধব। অর্থাৎ মাগো স্বামী এলো না। ধব শব্দের অর্থ স্বামী। এ রকম-
অর্ধেক বয়স রাজা এক পাটরাণী।
পাঁচ পুত্র নৃপতির সবে যুবজানি। (আলাওল)
যুবজানি শব্দে শ্লেষ। যুবজানি শব্দের অর্থ যুবতী জায়া আছে যার। শব্দটি ভাঙলে হয় যুব+জানি অর্থাৎ যুবক বলে জানি।
৪. বক্রোক্তি: বক্রোক্তি শব্দের সাধারণ অর্থ বাঁকা কথা। শ্রোতা অনেক সময় বক্তার কথার সঠিক উত্তর জেনেও ইচ্ছা করে একটু বাঁকিয়ে ভিন্ন অর্থে গ্রহণ করে জবাব দেয়। এ রকম বক্তব্যের নাম বক্রোক্তি।
তাহলে বলা যায় সোজাসুজি কোনো কথা না বলে প্রশ্ন বা স্বরবিকৃতির দ্বারা বাঁকাভাবে কথা বলায় যে অলংকারের সৃষ্টি হয়, তবে তার নাম বক্রোক্তি।
ভিন্নভাবে বক্তা না প্রশ্নকারী যদি কোনো কথাকে বিশেষ অর্থে ব্যবহার করেন, অথচ শ্রোতা বা উত্তরদাতা সে অর্থ গ্রহণ না করে কথাটিকে ভিন্ন অর্থে গ্রহণ করেন কিংবা সে অনুসারে উত্তর দেন তবে সেখানে বক্রোক্তি অলংকার হয়।
বক্রোক্তি দুই প্রকার। যথা:- শ্লেষ বক্রোক্তি ও কাকু বক্রোক্তি।
ক) শ্লেষ বক্রোক্তি: বক্তার কথার অভিপ্রেত অর্থ গ্রহণ না করে ভিন্ন অর্থে গ্রহণ ও সে অনুযায়ী জবাব দেওয়াতে যে অলংকার হয়, তাকে শ্লেষ বক্রোক্তি বলে। শ্লেষ বক্রোক্তিতে দুটো পক্ষ থাকে বক্তা ও শ্রোতা। যেমন-
- বক্তা- আপনার ভাগ্যে রাজানুগ্রহ আছে।
- শ্রোতা তিনমাস জেল খেটেছি; আর কতদিন খাটব?
বক্তা এখানে রাজানুগ্রহ বলতে রাজার অনুগ্রহ আছে বোঝাতে চেয়েছেন। শ্রোতা সে অর্থ বুঝেও রাজানুগ্রহ শব্দের জেলখাটা অর্থ ধরে নিয়েছেন এবং সেভাবেই উত্তর দিয়েছেন। বক্তার বক্তব্য ছিল যে শ্রোতার ভাগ্যে রাজার অনুগ্রহ আছে। শ্রোতা তা জেনেও বলল যে, তিনমাস জেল খেটেছে, আর কত দিন জেল খাটবে। অর্থাৎ কত রাজানুগ্রহ থাকবে। তেমনি –
রাজা: তোমার অক্ষরের ছাঁদটা সুন্দর, কিন্তু বোঝা শক্ত। একি চীনা অক্ষরে লেখা নাকি?
নটরাজ: বলতে পারেন অচিনা অক্ষরে।
এখানে চীনা অক্ষর বলতে চীন দেশের অক্ষরকে বুঝিয়েছেন, কিন্তু নটরাজ সঠিক অর্থটি জেনেও বাঁকিয়ে জবাব দিল যে অক্ষরটি তার চেনা নয়।
খ) কাকুবক্রোক্তি : কণ্ঠস্বরের বিশেষ ভঙ্গির সাহায্যে হ্যা-বোধক বক্তব্য না-বোধক এবং না-বোধক বক্তব্যকে হ্যা-বোধক অর্থে ব্যবহার করার নাম কাকুবক্রোক্তি।
কাকু মানে স্বরভঙ্গি। উচ্চারণের বিশেষ ধরন। উচ্চারণের এই বিশেষ ধরনের জন্য মানুষ অনেক সময় হ্যা-বোধক কথাকে না-বোধকে এবং না-বাচক কথাকে হ্যা-বাচকে (প্রশ্নের মাধ্যমে) প্রকাশ করে। কণ্ঠস্বরের বিশেষ ভঙ্গির উপর সৃষ্ট এই বক্রোক্তির নাম কাকুবক্রোক্তি। যেমন-
আমি কি ডরাই সখি ভিখারী রাঘবে?
এখানে এই হ্যা-বাচক এটি কাকুবক্রোক্তি। এখানে -বক্তব্যের মূল অর্থ হলো না-বাচক। অর্থাৎ আমি ভিখারী রাঘবকে ডরাই না।
হাতে তুলে দেখিনি কি চাষার লাঙল?
বালতিতে টানিনি কি জল?
এখানে এই না-বাচক বক্তব্য কণ্ঠস্বরের বিশেষ ভঙ্গির জন্য হ্যা-বাচক বক্তব্যে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ চাষার লাঙল হাতে তুলে নিয়েছি। বালতিতে জল টেনেছি। এটা কাকুবক্রোক্তি।
৫. পুনরুক্তবদাভাস: পুনরুক্তবদাভাস – পুনঃ+উক্ত+বৎ (বৎ অর্থ মতো) আভাস। একই বাক্যে ভিন্ন আকৃতির বিশিষ্ট সমার্থক একাধিক শব্দ ব্যবহার করে যদি ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করা যায়, তাহলে তাকে পুনরুক্তবদাভাস অলঙ্কার বলে।
আপাতদৃষ্টিতে কোনো বাক্যে যদি মনে হয় একই অর্থে একাধিক শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে অথচ একটু মনোযোগ সহকারে বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় যে, আসলে ঐ শব্দগুলো ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তাহলে তাকে পুনরুক্তবদাভাস অলঙ্কার বলে। যেমন-
তনু দেহে রক্তাম্বর নীবীবন্ধে বাঁধা
চরণে নূপুরখানি বাজে আধা-আধা। (রবীন্দ্রনাথ)
এখানে তনু ও দেহ দুটো শব্দের অর্থই এক। অর্থাৎ দেহ বা শরীর। কিন্তু এখানে তনু শব্দটি ছিপছিপে অর্থে ব্যবহৃত। এটি পুনরুক্তবদাভাস।
২. অর্থালংকার :
অর্থালংকার কাকে বলে? অর্থালংকারের শ্রেণীবিভাগ উদাহরণসহ আলোচনা কর।
একান্তভাবে শব্দের অর্থরূপের উপর নির্ভর করে যে অলংকার গড়ে ওঠে, তাকে অর্থালংকার বলে। অর্থালংকার বাক্যে ব্যবহৃত শব্দ বা শব্দাবলির অর্থের আশ্রয় গ্রহণ করে সৃষ্টি হয়। অর্থীণংকারে শব্দের ফানিরূপ একেবারে গৌণ, শব্দের অর্থই প্রথম এবং প্রধান। এজন্য শব্দের অর্থকে বজায় রেখে শব্দকে বদলে দিয়ে সমার্থক শব্দ খেয়াল-খুশীমত বসিয়ে দিলেও এই অলংকারের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয় না। অর্থালংকারের অর্থই আসল। যেমন-
হরিণ-নয়না সুন্দর সখী মুখখানি তুলে চাও। এই বক্তব্যের বদলে যদি বলা হয় হে মুগ-নয়না সুন্দর সমী বদন তুলিয়া চাহ- তাহলেও এর অভিপ্রেত অর্থের কোনো হেরফের হয় না। এভাবে শক্ষের বারবার বসল। ঘটলেও অর্থ যদি ঠিক থাকে, তাহলে অর্থালংকারের কোনো আবেদন ক্ষুন্ন হয় না।
অর্থালংকারের শ্রেণিবিন্যাস :
শব্দ বা বাক্যের অন্তর্নিহিত অর্থই অর্থালংকারের নিয়ামক বলে এর যথার্থ শ্রেণিবিন্যাস করা বড় কঠিন। শব্দালংকার রমণীদেহের বাইরের সৌন্দর্যের মতো, তাই তার সীমা-পরিসীমা নির্ণয় করা সহজ। অর্থালংকার হলো ব্যক্তির অন্তর্নিহিত গুণাবলির মতো, তাই এর সম্পূর্ণ পরিচয় দেওয়া জটিল। তাছাড়া শব্দের অর্থও বড় বিচিত্র। তবে অর্থালংকারের সাধারণ বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে মোটামুটি পাঁচভাগে ভাগ করা যায়। যথাঃ-
১. সাদৃশ্যমূলক, ২. বিরোধমূলক, ৩. শৃঙ্খলামূলক, ৪. ন্যায়মূলক ও ৫. গূঢ়ার্থমূলক।
সাদৃশ্যমূলকঃ দুটি বিশেষ বিজাতীয় বা বিসদৃশ বস্তুর অন্তর্নিহিত স্বরূপ সাদৃশ্যের ভিত্তিতে যে অলঙ্কার গড়ে ওঠে, তার নাম সাদৃশ্যমূলক অলঙ্কার।
সহজ কথায়, দুটো ভিন্ন জাতীয় বস্তুর মধ্যে কবি-কল্পনার সাহায্যে যদি মিল খুঁজে বের করে তুলনা করা হয়, তবে তাকে সাদৃশ্যমূলক অলংকার করে।
বস্তু দুটোর মধ্যে যতই অমিল থাকুক না কেন, কবি-প্রতিভার সাহায্যে বস্তু দুটোর মধ্যে এমন একটি মিল খুঁজে বের করা হয় যে, বস্তু দুটোর মধ্যে একটি অভিন্ন সাম্য তৈরি হয়। বৈসাদৃশ্য যত বেশি হয়, অলঙ্কারও তত বেশি বৈচিত্র্য ও সুন্দর হয়। মুখের সাথে মুখের চোখের সাথে চোখের তুলনায় কোনো অলংকার হয় না, কিন্তু মুখের সাথে চাঁদের, চোখের সাথে পদ্মের তুলনায় অলঙ্কার তৈরি হয়। যেমন-
কাকের চোখের মতো কালো চুল।
এখানে উপমান কাকের চোখ, উপমেয় চুল, সাধারণ ধর্ম কালো, তুলনাবাচক শব্দ-মতো। এটি সাদৃশ্যমূলক অলঙ্কার।
সাদৃশ্যমূলক অলংকারের অঙ্গ চারটি-
- উপমেয়- যাকে তুলনা করা হয়।
- উপমান- যার সাথে তুলনা করা হয়।
- সাধারণ ধর্ম – যে গুণ বা বৈশিষ্ট্যের জন্য তুলনা করা হয়।
- তুলনাবাচক শব্দ – যে শব্দ ব্যবহার করে তুলনা বোঝানো হয়।
সাদৃশ্যমূলক অলংকারের সংখ্যা অনেক। এদের মধ্যে উপমা, উৎপ্রেক্ষা, সন্দেহ, নিশ্চয়, অপহৃতি, রূপক, ব্যতিরেক, অতিশয়োক্তি, সমাসোক্তি ইত্যাদি প্রধান।
বিরোধমূলকঃ প্রচলিত অর্থে বিরোধ মানে-দ্বন্দ্ব, ঝগড়া, সংঘর্ষ, অমিল বা সাদৃশ্যের অভাব। কিন্তু বিরোধমূলক অলংকারে যে বিরোধ তা সত্যিকার অর্থে বাস্তব বিরোধ নয়, এ বিরোধ বক্তা বা কবির কল্পিত মাত্র। কবি-কল্পনার সাহায্যে এ বাহ্যিক বিরোধ সৌন্দর্য সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে অবসান ঘটে।
সংজ্ঞা: দুটি বিশেষ বস্তুর আপাতবিরোধকে কেন্দ্র করে যে অলংকার গড়ে ওঠে, তার নাম বিরোধমূলক অলংকার। যেমন-
নজরুলের সর্বহারা কাব্যের কাণ্ডারী হুশিয়ার কবিতায় কবি যখন বলেন-
ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান।
তখন এ বক্তব্য পাঠকের কাছে আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী বলেই মনে হয়, কেননা ফাঁসির মঞ্চতো মৃত্যু, সেখানে আবার জীবনের জয়গান কীভাবে সম্ভব। কিন্তু একটু বিশ্লেষণ করলেই এ বিরোধের অবসান ঘটে। স্বদেশের মুক্তির জন্য যারা ফাঁসিকে বরণ করে নিয়েছে, সে তো মৃত্যু নয়, তাদের জীবন মৃত্যুঞ্জয়ী এবং সেজন্য ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান।
বিরোধমূলক অলংকারের সংখ্যা অনেক। এর মধ্যে প্রধান হলো বিরোধাভাস, বিভাবনা, বিশেষোক্তি, অসঙ্গতি, বিষম ইত্যাদি।
শৃঙ্খলামূলকঃ বাক্যাংশের সংযোজন শৃঙ্খলাকে আশ্রয় করে যে অলংকার গড়ে ওঠে, তার নাম শৃঙ্খলামূলক অলঙ্কার।
অনেক সময় বাক্য বা বাক্যাংশের কোনো কারণের কাজ সেই বাক্যের বা অন্য বাক্যের আরেকটি কাজের কারণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এভাবে সাজানোর ফলে এক বা একাধিক বাক্যের বক্তব্যগুলো পরস্পর কার্য-কারণযোগে শৃঙ্খলিত থাকে। অনেক সময় বাক্যের বক্তব্যের মধ্যে একটা শৃঙ্খলার বন্ধন থাকে। এইভাবে শৃঙ্খলার বন্ধনটিই যদি বাক্যের মূল হিসেবে কাজ করে তবে সেখানে শৃঙ্খলামূলক অলংকার হয়।
সহজ কথায় এক কারণের কার্য যদি আরেক কার্যের কারণ হয়ে ওঠে, তবে তাকে শৃঙ্খলামূলক অলঙ্কার বলে। যেমন-
লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।
এখানে লোভ থেকে পাপ আর পাপ থেকে মৃত্যু এই বিষয় গুলোর মধ্যে একটা শৃঙ্খলা বজায় আছে। তেমনি-
বিদ্যা হতে জ্ঞান হয়, জ্ঞানে হয় ভক্তি। ভক্তি হতে মুক্তি হয়, এই সার মুক্তি।
শৃঙ্খলামূলক অলংকারের প্রধান তিনটি শাখা কারণমালা, একাবলী ও সার।
ন্যায়মূলক অলঙ্কার ন্যায়-সঙ্গত সমর্থনের সাহায্যে বক্তব্যকে বিশোষিত করার মাধ্যমে যে সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়, তার নাম ন্যায়মূলক অলংকার।
অন্য কথায় আমাদের উপস্থাপিত ন্যায়ের সমর্থনজনিত বক্তব্য যে অলংকারের আশ্রয়ে গড়ে ওঠে তার নাম ন্যায়মূলক অলঙ্কার। যেমন-
- যুদ্ধ যুদ্ধের মূল-উৎপাটন করতে পারে না।
- হিংসার সাহায্যে হিংসা দমন করা যায় না।
- এ জগতে হায় সেই বেশি চায়, আছে যার ভুরি ভুরি রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।
গূঢ়ার্থমূলক অলঙ্কার: প্রকাশিত বাচ্যার্থের আড়ালে আরেকটি আসল বক্তব্য বা মুলবক্তব্য লুকানোর কারণে খে অলঙ্কার সৃষ্টি হয়, তার নাম গূঢ়ার্থমূলক অলঙ্কার:।
কবি সাহিত্যিকরা অনেক সমগ্র বাক্যের সাধারণ অর্থ প্রকাশ করলেও আড়ালে কাঙ্খিত আসল অর্থ আড়াল করে থাকেন। এই ধরনের গূঢ় অর্থের আশ্রয়ে সে অলংকার গড়ে ওঠে, তারই নাম গূঢ়ার্থমূলক অলঙ্কার:। যেমন-
অতিবড় বৃদ্ধ গতি সিদ্ধিতে নিপুন।
কোন গুণ সাহি তাঁর কপালে আগুন “
কুকথায় পঞ্চমুখ কষ্ঠভরা বিষ
কেবল আমার সঙ্গে দ্বন্দ্ব অহর্নিশ।
এখানে সাধারণ বক্তব্য নিন্দা, কিন্তু ভিতরে বক্তব্য হলো ভিন্ন। অর্থাৎ অভিপ্রেত অর্থ হলো নিন্দার ছলে প্রশংসা করা হয়েছে।
অলংকারঃ কবি-সাহিত্যিকরা তাদের রচনার সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য রচনার দেহে বাইরে থেকে যে রূপ আরোপ করে তাকে অলংকার বলে।
অলঙ্কার অলম+কার; অর্থাৎ ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো-মার দ্বারা ভূষিত করা হয়। কাজের সৌন্দর্ঘকে বৃদ্ধি করা জন্য মা দ্বারা কার্যকে সজ্জিত করা হয়, তাই অলংক উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, শ্লেষ, ঘমক ইত্যাদি কর্যকে শিল্প সৌন্দর্য্যময় করে, তাই এগুলো অলঙ্কার।
উপমা: সমান রূপ বা গুণবাচক দুটি ভিন্ন জাতীয় বস্তুর মধ্যে মিত্র দেখিখে তুলনা করাকে উপমা বলে। যেমন-সামির দীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।
উৎপ্রেক্ষা : অতিরিক্ত সাদৃশ্যের জন্য যদি উপমেয়কে উপমান বলে মনে হয় বা সংশয় দেখা দেয়, তবে তাকে উৎপ্রেক্ষা অলঙ্কার বলে। উৎপ্রেক্ষা দুই প্রকার।
বাচ্য–উৎপ্রেক্ষা যে উৎপ্রেক্ষা অলংকারে যেন সংশয়বাচক শব্দটির উল্লেখ থাকে, তাকে বাচ্য উৎপ্রেক্ষা বলে। যেমন পুর্নিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।
প্রতীয়মান-উৎপ্রেক্ষা: যে উৎপ্রেক্ষা অলংকারে সংশয়বাচক শব্দটির উল্লেখ সাকে না, তাকে প্রতীয়মান-উৎপ্রেক্ষা বলে।
আগে পিছে পাঁচটি মেয়ে- পাঁচটি রঙিণ ফুল। (জসীম উদদীন) এখানে যেন সংশয়বাচক শব্দটি নেই।
রূপকঃ নিকট ও নিবিড় সাদৃশ্যের জন্য উপমেয়ের সঙ্গে উপমানের অভেদ কল্পনায় যে সৌন্দর্ম সৃষ্টি হয়, তাকে রূপক অলঙ্কার বলে। যেমন-
মনমাঝি তোর বৈঠা নেরে আমি আর বাইতে পারলাম না।
এখানে উপমেয় মন, উপমান মাঝি। কিন্তু, মন ও মাঝিকে অভেদ কল্পনা করা হয়েছে। । এটি তাই রূপক অলঙ্কার।
অলঙ্কারের প্রয়োজনীয়তা:
সাহিত্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য অলংকারের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অলংকারহীন বাক্য সুন্দর হতে পারে, কিন্তু অলংকার যথোপযুক্তভাবে প্রয়োগ করা হলে সাহিত্যের সৌন্দর্য অবশ্যই বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া-
মনোভাবকে সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য অলংকার প্রয়োগ করতে হয়। রসহীন বক্তব্যকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্যে অলঙ্কার বিশেষভাবে সাহায্য করে।
যথাস্থানে যথোচিতভাবে অলংকার প্রয়োগ করা হলে সাহিত্যসৃষ্টি যথার্থই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
সাহিত্য অলংকারের প্রয়োজনীয়তা প্রাচীন কাল থেকে কবি-সাহিত্যিকেরা অনুভব করে এসেছেন। তাই দেখা যায়, নানা রকম অলংকারে বাংলা সাহিত্য সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে উঠেছে।
অলংকারের কাজই হলে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা। নারীদেহ অলংকার ছাড়া যেমন নিতান্তই বেমানান, তেমনি কাব্য অলংকার ছাড়া একেবারে অচল। উৎকৃষ্ট কাব্য মানেই উৎকৃষ্ট অলংকারের ব্যবহার।
অলঙ্কার ছাড়া সাহিত্য বা কাব্য সৃষ্টি সম্ভব নয়। সাহিত্যিক বা কবি সচেতন ভাবে হোক আর অসচেতনভাবেই হোক অলংকারের ব্যবহার করে থাকেন। কারণ তারা জানেন কাব্য মানেই রসাত্মক বাক্য। এ রসাত্মক বাক্য সৃষ্টি করতে উপযুক্ত শব্দের প্রয়োগ আবশ্যক। এ উপযুক্ত শব্দ প্রযুক্ত হলেই অলংকার আপনা হতেই সৃষ্টি হয়ে যায়। তাই, কাব্য সৃষ্টি করতে গেলে স্বাভাবিক নিয়মেই অলংকার আসে।
প্রকৃতি, নারীদেহ কিংবা কাব্যদেহ যাই হোক না কেন অলঙ্কার দিয়ে সাজানোর পেছনে কাজ করে সৌন্দর্য পিপাসা। মানুষ সৌন্দর্যের পুজারি। কাব্যের জন্মই হলো সৌন্দর্য পিপাসা থেকে। কাব্যকে কবি সুন্দর করে সাজাবেন এটাই স্বাভাবিক। এই সুন্দর করে সাজানোতে অলঙ্কার বিশেষ ভূমিকা রাখে।
