আধুনিকতার লক্ষণ -বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আধুনিক যুগের সূত্রপাত কখন ও কীভাবে হয়? আলোচনা কর।


ভূমিকা: আঠারো শতকের শেষ ও উনিশ শতকের প্রথম দিকে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠতে থাকে যে, যা মধ্যযুগের সাহিত্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। এ বৈশিষ্ট্যগুলোর জন্যই বাংলা সাহিত্য নতুন যুগে প্রবেশ করে। শুরু হয় আধুনিক যুগ। পণ্ডিতরা সবাই একমত যে, ১৮০০ খ্রিঃ থেকেই আধুনিক যুগের সূত্রপাত। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ, সাহিত্য, চিন্তা ও জীবনবোধে আসে নবতর ধারা। এই পরিবর্তনের নামই আধুনিকতা। সাহিত্য ও সমাজে আধুনিকতার লক্ষণ চিহ্নিত করা যায় মনন, ভাবনা, রুচি ও মূল্যবোধের নবউদ্ভাসের মধ্য দিয়ে।
আধুনিকতার সংজ্ঞা
আধুনিকতার লক্ষণ বুঝতে হলে আগে জানা দরকার ‘আধুনিকতা’ বলতে কী বোঝায়। ‘আধুনিকতা’ হলো পুরনো রীতিনীতির বন্ধন ভেঙে নতুন ভাবনা ও যুক্তিবাদী মনোভাবের প্রকাশ। এটি এক ধরনের চিন্তার বিপ্লব, যা মানুষকে স্বাধীন ও সৃষ্টিশীল হতে শেখায়।
পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সাহিত্যের সংস্পর্শে এসে এদেশের সমাজ ও সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে পাল্টে যায়। বুদ্ধিজীবীদের চিন্তায়, কাজে ও সৃষ্টিতে এক নতুনত্ব প্রকাশ পায়। এর নাম দেওয়া হয়েছে নবজাগৃতি বা রেনেসাঁ। এই নবজাগৃতির ফলে সমাজ ও সংস্কৃতিতে যেমন পালাবদল ঘটেছে, সাহিত্যের ক্ষেত্রেও নব নব বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। এই স্বকীয় বৈশিষ্ট্যই মধ্যযুগের সাহিত্য ধারা থেকে আধুনিক বাংলা সহিত্যেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।
পাশ্চাত্য সংস্পর্শে এসে এদেশের মানুষের মেধা ও মননে পরিবর্তন ছাড়াও ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসে। বই মুদ্রনের জন্য ছাপাখানা ও গদ্য সাহিত্যের সৃষ্টির ফলে সাহিত্যের আঙিনায় নবতর বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠতে দেখা যায়। তাই ১৮০০ খ্রিঃ থেকেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শুরু বলে ধরে নেওয়া হয়। আর যে নবতর বৈশিষ্ট্য মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগকে পৃথক করেছে, সে নবতর বৈশিষ্ট্যগুলোই আধুনিক যুগের লক্ষণ হিসেবে পরিচিত।
আরও পড়ুন—-
“পাঁজি মিলিয়ে মডার্নের সংজ্ঞা নির্ণয় করা যায় না।” তাই ১৮০০ খ্রিঃ থেকেই বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ ধরা হলেও এর অনেক আগে থেকেই আধুনিকতার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। “আধুনিকতা সময় নিয়ে নয়, মর্জি নিয়ে, কারণ তা যতটা কালের কথা নয়, ততটা ভাবের কথা।”
মধ্যযুগের শেষ কবি ভারতচন্দ্রের মধ্যে মানবিকতা, নাগরিকতা, কবিওয়ালা ও শায়েরদের রচনায় অলৌকিকতা পরিহার করে বাস্তবমুখিতা ইত্যাদি প্রকাশ পেয়েছে। সাহিত্যকে জীবনমুখী করার এই ইঙ্গিতময় মুহূর্তে পাশ্চাত্য ভাবধারার প্রত্যক্ষ প্রভাবে বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের সূত্রপাত।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়া, বিভিন্ন সাময়িক পত্র-পত্রিকার প্রকাশ, ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন, হিন্দুকলেজ প্রতিষ্ঠিত ও ইয়ংবেঙ্গল দল সৃষ্টি, নৈতিকতা ও সমাজ সম্পর্কে স্বাধীন মত প্রকাশ ইত্যাদি বিষয়গুলো বাঙালি মন ও মননে দারুণ প্রভাব বিস্তার করে।
সমাজ ও মনন থেকে সনাতনী প্রথা, ধর্মীয় অমানবিক রীতিনীতি খসে পড়তে থাকে। বাঙালি জীবন গতিময় হয়ে ওঠে। এই গতির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে সমাজ, শিক্ষা, রাজনীতি সব কিছু পরিবর্তিত হতে থাকে। এই পরিবর্তন আধুনিক সাহিত্য সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোয় মধ্যযুগের অন্ধকার দূর করতে সক্ষম হয়। সচেতন হয় বাঙালি, আত্মত্মবিশ্বাস বাড়ে, দেশের প্রতি, সমাজের প্রতি, নিজের দিকে, মানুষের প্রতি নজর দেবার আগ্রহ জাগে, সবার প্রতি লক্ষ্য রাখার মমতা জাগে।
অন্তরে জন্ম নেয়া এ নব অনুভূতি হৃদয়ে ও মনে নানা ভাবের জন্ম দেয় এবং এ অনুভূতি প্রকাশের জন্য উদগ্রীব হয়। নবচেতনায় উদ্ভাসিত বাঙালি নবসাহিত্য সৃষ্টির প্রেবণা পায়। এ সময়ে সৃষ্ট সাহিত্যের মধ্যে যুগপ্রভাবে সৃষ্ট নবচেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে।
আধুনিক যুগের শুরু থেকেই আধুনিক সাহিত্যের সবগুলো লক্ষণ প্রকাশ পায়নি। ১৮০০ খ্রিঃ-এর আগে থেকেই যেমন আধুনিক যুগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে, তেমনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কবি সাহিত্যিকের রচনায় তা ফুটে ওঠে। তবে সবাই একমত যে, মাইকেল মধুসূদন দত্তের রচনার মধ্যে আধুনিকতার সবগুলো লক্ষণ ফুটে উঠতে থাকে। তাই মধুসুদনকে আধুনিকতার প্রবর্তক বলেও মন্তব্য করা হয়।
সময় ক্ষণ দিয়ে যুগ বিচার হয় না। প্রকৃতি বিচার করেই যুগ বিভাগ করা যেতে পারে। যুগের প্রভাব সাহিত্যে প্রতিফলিত হতে থাকলে সাহিত্যেকে স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্য দান করে। এ স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্যই
সাহিত্যকে এক যুগ থেকে অন্য যুগকে আলাদা করে দেয়। যে সব স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্য আধুনিক যুগকে মধ্যযুগ থেকে আলাদা করেছে, সেগুলোই হলো আধুনিকতার লক্ষণ। লক্ষণগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
আধুনিকতার লক্ষণসমূহ:
মানবিকতা: আধুনিকতার লক্ষণ মানবিকতা। সমগ্র মধ্যযুগ দেবতার জয়-জয়কার। সেখানে মানুষের কোন কথা নেই। মধ্যযুগের সাহিত্যের ইতিহাসে মানবিকতার কোন চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবে না। দেবতার প্রাধান্যের কারণে মানুষ জায়গা পায়নি। যুগের দাবীতে মানুষ নিজের সৃজন শক্তিতে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। মানুষ দেবতার স্থান দখল করে। মধুসূদনের হাতে রামের চেয়ে রাবণ বড় হয়ে উঠেছে। মানব ধর্মই আধুনিক সাহিত্যের ধর্ম হয়ে উঠল।
বিশিষ্ট আধুনিকতার লক্ষণ হলো আত্মচেতনা ও আত্মপ্রসার। সমগ্র মধ্যযুগে কবি হৃদয়ের যথার্থ প্রতিফলন নেই। কবি মনের নিজস্ব অনুভূতি ও উপলব্ধির কোনো নিদর্শন ছিল না। আধুনিক যুগে কবিদের কাছে বাইরের বস্তুর চেয়ে অন্তরের অনুভূতির মূল্য বেশি। আধুনিক কালের গীতিকবিতার মধ্যে কবিমনের বিচিত্র অনুভূতির পরিচয় পাওয়া যায়। কবি বিহারীলালের কবিতায় এ বৈশিষ্ট্য প্রথম লক্ষ্য করা যায়। কবি নিজের সম্পর্কে সচেতন হয়েছেন এবং তা পাঠককে জানিয়েছেন। এর মধ্যে আত্মপ্রসারের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে।
মধ্যযুগের সাহিত্যে ব্যক্তি মানুষের কোনো মূল্য ছিল না। ব্যক্তিচেতনা আধুনিক যুগের সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। গোষ্ঠীগত চেতনা ও গোষ্ঠীগত পরিচয়ই মধ্যযুগের সাহিত্যে বড় হয়ে দেখা দিত। আধুনিক সাহিত্যে ব্যক্তির মর্যাদা, অন্তরের আনন্দবেদনা, ব্যক্তি হিসেবে মানুষের আলাদা সত্ত্বা গুরুত্ব পেয়েছে।
মধুসূদনের রচনায় প্রথম ব্যক্তিচেতনার প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। মেঘনাদ বধ কাব্যের রাবণ, মেঘনাদ, প্রমীলা, বীরবাহু, চিত্রাঙ্গদা-প্রতিটি চরিত্রই আলাদা মর্যাদা নিয়ে কাব্যে স্থান করে নিয়েছে। প্রতিটি চরিত্রই ব্যাক্তিস্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল।
নবযুগের নবজাগরণের প্রভাবে মানুষ নিজের সম্পর্কে, দেশের সম্পর্কে, সমাজ সম্পর্কে ভাবতে শুরু করে। সাহিত্যে তার প্রভাব পড়ে। তাই সমাজচেতনা এ যুগের আরেক আধুনিকতার লক্ষণ। পাশ্চাত্য শিক্ষার ফলে মানসিক পরিবর্তনের সূত্রপাত। এ থেকে মানুষ আত্মরক্ষার তাগিদে নিজের অবস্থান সম্পর্কে সজাগ হয়।
ঈশ্বরগুপ্ত ব্যঙ্গ কবিতার মধ্যে দিয়ে বিজাতীয় আচার ব্যবহারের প্রতি কটাক্ষ করেছেন। এতে সমাজচেতনা প্রকাশ পেয়েছে। সে সময়ে রচিত পাঠ্যপুস্তক ও নাটক রচনার পেছনে সমাজচেতনাই সক্রিয় থেকেছে। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ ব্যক্তিদের রচনায় তার নিদর্শন মেলে।
দেশেপ্রেম বা জাতীয়তাবোধ এ যুগের অন্যতম আধুনিকতার লক্ষণ। উনিশ শতকের নবচেতনার ফসল দেশপ্রেম। পাশ্চাত্যের প্রভাবে এ দেশের মানুষ নিজের দেশকে বুঝতে সক্ষম হয়। রাজানুগত্যের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় চেতনাবোধের উদ্ভব ঘটে। রঙ্গলাল, ঈশ্বর গুপ্ত, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্রের কবিতার মধ্যে এর প্রকাশ ঘটেছে। মধুসূদনের রাবণ, মেঘনাদ, বীরবাহু দেশপ্রেমের উজ্জ্বল নিদর্শন রেখেছে।
রোমান্টিকতার কথাও এ প্রসঙ্গে বলা যায়। আধুনিক সাহিত্যে ইউরোপীয় সাহিত্যের রোমান্টিক কাব্যের আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলা গীতিকাব্যে রোমান্টিসিজম প্রবল প্রভাব বিস্তার করে। রোমান্টিক কাব্যের প্রভাবে বাংলায় বিহারীলাল ও রবীন্দ্রনাথের কাব্যে অতীন্দ্রিয়তা, সৌন্দর্যচেতনা, মিস্টিসিজম, অতিতুচ্ছ বস্তুর মধ্যেও আনন্দলাভ, প্রকৃতির বিচিত্র সৌন্দর্য প্রকাশ পেয়েছে।
মৌলিকতা আধুনিক যুগের অন্য একটি লক্ষণ। মধ্যযুগের সব সাহিত্য ছিল অনুবাদমূলক। একই বিষয় নিয়ে একাধিক কবি কাব্য রচনা করেছেন। আধুনিক যুগেই মৌলিক সাহিত্য সৃষ্টির প্রেরণা এসেছে। ইতিহাস ও পুরাণের সব রূপায়ণ ঘটেছে। কোনো অনুকরণ নেই। জগৎ ও জীবনের বিচিত্র বৈশিষ্ট্য সাহিত্যের উপকরণ হয়ে এসেছে।
গতানুগতিকতা পরিহার করে ঈশ্বরগুপ্ত, রঙ্গলাল নতুনভাবে সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। মধুসূদন পৌরাণিক বিষয়কে নতুন করে সৃষ্টি করেছেন। বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, মধুসূদন প্রমুখ কবি সাহিত্যিকদের সৃষ্টিতে বিষয়ের বৈচিত্র্য লক্ষণীয়।
আধুনিক যুগেই বাংলা সাহিত্যে নাগরিকতা প্রবেশ করে। আধুনিক যুগে শিক্ষার বিষয়টি নগরকেন্দ্রিক হওয়াতে নগরকেন্দ্রিক সাহিত্য গড়ে ওঠে। মধ্যযুগে নাগরিকতা ছিল না। ভারতচন্দ্রের কাব্যে রাজসভার বৈশিষ্ট্য থাকলেও নাগরিকতার পূর্ণ প্রকাশ সেখানে ছিল না। বাংলা সাহিত্য নাগরিকতার পথ ধরেই বিশ্ব পথিক।
মুক্তবুদ্ধি এ যুগের অন্যতম আধুনিকতার লক্ষণ। মৌলিক সাহিত্য সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে এ যুগের কবি সাহিত্যিকরা মুক্তবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন। পুরাতন হলেই তা সত্য এবং আঁকড়ে ধরে রাখতে হবে, এ রকম মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে। যুগের প্রেক্ষিতে যুক্তি দিয়ে যাচাই করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়েছে।
সমগ্র মধ্যযুগের সাহিত্য মানেই কাব্য। আঙ্গিকগত বৈচিত্র্য সেখানে অনুপস্থিত। অন্যদিকে আঙ্গিকের রূপান্তর আধুনিক যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ আধুনিক যুগের আগে সাহিত্য বলতে যা ছিল তা হলো কবিতা।
আধুনিক যুগে বাংলা সাহিত্য কাব্যের আঙিনা ছেড়ে গদ্যের আঙিনায় পা রাখে। ফলে নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদি রচনারীতির আদর্শ প্রকাশ পায়। কাব্যধারার মধ্যেও বৈচিত্র্য আসে। মহাকাব্য, গীতিকবিতা, খণ্ডকীবিতা ইত্যাদি আঙ্গিকগত রূপান্তর এ যুগের বৈশিষ্ট্য। শব্দ, ছন্দ ও অলঙ্কারের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দেখা যায় বৈচিত্র্য। লেখকরা হয়ে ওঠেন শিল্প সচেতন।
মুদ্রনযন্ত্রের প্রচলন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রাচীন আধুনিক যুগের ভেদরেখা টেনে দিয়েছে। প্রাচীন সাহিত্য হাতে লেখা, কণ্ঠ আশ্রিত ও পুঁথিবাহিত, অপ্রাচীন সাহিত্য ছাপা বই সম্প্রসারিত। ছাপাখানা সাহিত্যকে অসংখ্য পাঠকের কাছে নিয়ে গেছে। সাময়িক পত্রের প্রকাশ সম্ভব হয়েছে। বিপুল ও বিচিত্র সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে মুদ্রন যন্ত্রের জন্য।
- যুক্তিবাদী চিন্তাধারা — অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তি, বিজ্ঞান ও বাস্তবতার প্রতি আগ্রহ।
- ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বিকাশ — মানুষ নিজের চিন্তা, অনুভূতি ও স্বাধীনতাকে প্রাধান্য দিতে শুরু করে।
- মানবিক মূল্যবোধের জাগরণ — বর্ণ, ধর্ম, লিঙ্গভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতাকে মূল আদর্শ হিসেবে গ্রহণ।
- বিজ্ঞানমনস্কতা ও প্রগতিশীলতা — প্রযুক্তি ও জ্ঞানের প্রসারের মাধ্যমে সমাজে পরিবর্তনের চেষ্টা।
- নবীন রুচি ও শিল্পবোধ — সাহিত্যে ও শিল্পে নতুন শৈলী, প্রতীক, ভাব ও ভাষার উদ্ভব।
- আত্মবিশ্লেষণের প্রবণতা — প্রতিষ্ঠিত মতবাদ বা বিশ্বাসকে প্রশ্ন করার সাহস।
- সমকালীন বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীলতা — সমাজ, রাজনীতি ও ব্যক্তিজীবনের বাস্তব চিত্রের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি।
- নারীমুক্তি ও সমানাধিকারের দাবি — আধুনিক সমাজে নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে আধুনিকতার প্রতিফলন
সাহিত্যে আধুনিকতার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে ভাষার সরলতা, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, অন্তর্জাগতিক অভিব্যক্তি ও প্রতীকী উপস্থাপনের মাধ্যমে। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, নজরুল থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত আধুনিকতার এই স্রোত বহমান।
উপসংহার
সব মিলিয়ে দেখা যায়, আধুনিকতার লক্ষণ কেবল সাহিত্য বা সমাজে নয়, মানুষের চিন্তাভাবনা ও জীবনদর্শনেও গভীরভাবে প্রোথিত। পরিবর্তনের সাহস, নতুনের প্রতি আগ্রহ, এবং মানবিকতার পুনর্মূল্যায়নই আধুনিকতার লক্ষণকে জীবন্ত রাখে। তাই বলা যায়, আধুনিকতার লক্ষণ আসলে মানুষের ক্রমবিকাশের ইতিহাস, যা যুগে যুগে নবজাগরণের আলো ছড়িয়ে দেয়।, আধুনিকতার সূত্রপাত পাশ্চাত্য শিক্ষা এদেশে প্রসার লাভ করার পর থেকে। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি নবচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সাহিত্যে নব নব বৈশিষ্ট্যের জন্ম দেয়। হাজার বছর ধরে যা না হয়েছে, একশ বছরে তা হয়েছে। পাঠকের মন ও রুচির বিস্তার বেড়েছে, পরিবর্তিত হয়েছে। আধুনিক যুগের বিচিত্র বৈশিষ্ট্য সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে বিশ্বের দরবারে পাকা আসন পেতে সহায়তা করেছে।


