আমাদের শেকড়ের অস্তিত্ব ও মানচিত্রের প্রকাশ

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির গৌরবময় ইতিহাসের অংশ। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্র“য়ারির ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত ঘটনা এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ জাতীয় জীবনে সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ দুটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা বাংলাদেশের সাহিত্যকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল করে তোলে। মাতৃভাষার জন্য আত্মত্যাগের মাধ্যমেই বাঙালি নিজের ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতির স্বরূপ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে এবং ভাষা আন্দোলন কেন্দ্রিক একুশের চেতনাকে জাতীয় জীবনের সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস পায়। বাঙালি রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়। নিজেদের অধিকার আদায়ে সংগ্রামমুখর হয়ে ওঠে। এ আন্দোলনের পথ ধরেই আসে মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকারী হলে মাতৃভাষার যথার্থ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। ভাষা আন্দোলনই জাতীয় চেতনার বিকাশকে তরান্বিত করে। এ ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের সাহিত্যের বিকাশে ও উৎকর্ষ সাধনে বিশেষ প্রেরণা দান করে।

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে জাতি স্বকীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলাদেমের সাহিত্যের বিকাশে ও স্বতন্ত্র পরিচয়ে উদ্ভাসিত করে তুলতে সাহায্য করে। স্বাধীন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার মর্যাদা স্বীকৃত হলে বাংলা ভাষার চর্চা ব্যাপক হয়। জাতীয় ভাষা হিসেবে এর উপযোগিতার জন্য তার প্রয়োজনীয় উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলা ভাষার যুগোপযোগী ব্যবহারের অনন্য সুযোগ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সাহিত্যের উৎকর্ষ বিধানে প্রত্যক্ষ সাহায্য করেছে। মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি নিয়ে নানাধরণের সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে এবং তা দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত থাকবে বলেই মনে হয়। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে বাঙালির সংগ্রামশীলতা, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, শৌর্যবীর্য, ইত্যাদি গুণের পরিচয় বিধৃত হয়ে সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে ক্রমেই স্বমহিমায় আত্মপ্রকাশ করেছে।

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সাহিত্যের ধারার প্রেক্ষাপট:

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের আগেই ৪৭ পরবর্তীতে কলকাতার পরিবর্তে সাহিত্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে ঢাকা পরিচিতি পায়। ফলে পিছিয়ে পড়া মুসলমান কবি-সাহিত্যিকদের এগিয়ে আসার একটা অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মধ্যযুগে মুসলমানদের অবদান বেশি হলেও আধুনিক যুগে তারা হিন্দুদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে। হিন্দুদের লেখনিতে মুসলমানদের জীবনচিত্রও তেমন প্রতিফলিত হয় নি। ফলে মুসলমানেদের মধ্যে একটা ক্ষোভ ছিল এবং সেই সাথে একটা স্বতন্ত্র সাহিত্যধারা প্রবর্তন করে তার অবসানের চেষ্টা চলে। স্বতন্ত্র আবাসভূমি লাভের প্রেক্ষিতে মুসলমানদের মনের লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হলে তারা ঐতিহ্য ও ইতিহাস ভিত্তিক রচনা সৃষ্টি করে এবং সেই রচনায় সমকালীন রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রভাবও পড়ে।

স্বতন্ত্র আবাসভূমি ও স্বাধীনতা অর্জনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রকৃতি ও মানুষের পরিচয়, তাদের জীবনপ্রণালী, আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো সহজ হয়। সমকালীন ঘটনার প্রেক্ষিতে উদ্ভুত নবচেতনাবোধ, আঞ্চলিক জীবনবোধ, দেশের সৃষ্টি-কালচারের স্বাতন্ত্র্য এ দেশের কবি-সাহিত্যিকদের দৃষ্টিতে নতুন করে ধরা পড়ে। বৈচিত্র্যপূর্ণ রূপায়ণের ফলে সাহিত্য আকর্ষণীয় ও সম্ভাবনাময় হয়ে ওঠে এবং এ সাহিত্যের প্রচার ও প্রসারের জন্য বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান, প্রকাশনা সংস্থা এগিয়ে আসে। এ প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমি বিদেশি সাহিত্য অনুবাদ, পরিভাষা তৈরি, লোকসাহিত্য সংগ্রহ, বানানারীতি সংস্কার, অভিধান তৈরিসহ নানা কর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাহিত্যকে বিশিষ্ট করে তুলেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কর্মের কথাও এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়। এ ক্ষেত্রে ভাসা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

মাতৃভাষার মর্যাদার জন্য জীবনদান, বাঙালির স্বকীয়তা অর্জনে নানা ঘটনাপ্রবাহ, ৭১-এর স্বাধীনতা এ দেশের জাতীয় জীবনপ্রবাহে নবচেতনার সঞ্চার করে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও একুশের চেতনা বাংলাদেশের সাহিত্যে এক নবদিগন্তের সূচনা করে। এ নবচেতনা সাহিত্যকে স্বতন্ত্র মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করে।

দেশভাগের ফলে এদেশে মধ্যবিত্ত মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার অগ্রসরতা বাড়ে। মধ্যবিত্ত সমাজ শিক্ষিত হয়ে শিল্প-সংস্কৃতিতে অবদান রাখার সুযোগ পায়। জীবন ও সমাজের সমস্যা সম্পর্কে সচেতন হয়। সাহিত্যে মধ্যবিত্ত জীবনের রূপায়ণ ঘটে।

দেশবিভাগ পরবর্তী জীবনে ও সমাজে যে যুগসংক্রান্তি দেখা দিয়েছিল, তার প্রতিফলন সাহিত্যে পড়ে। ইংরেজদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে নতুন জীবনে প্রবেশ, নতুন ভাবধারার প্রবর্তন, আবার পুরাতনকে একেবারে ত্যাগ করতে না পারা ইত্যাদি কারণে সমাজ-জীবনে একটা সংকট আসে। পুরাতন ঐতিহ্য ত্যাগ করার প্রবণতা, অভিনব জাতীয় চেতনার সঞ্চার এ দুয়ের ফলে একটা ক্রান্তিলগ্নের সৃষ্টি হয়। অতীতকে নিঃশেষে বিসর্জন দিতে না পারা এবং নতুন মনমানসিকতাকে দ্রুততালে গ্রহণ করতে না পারার দ্বন্দ্ব সমকালীন সাহিত্যে প্রতিফলিত। ফলে সাহিত্যে আছে পুরাতন আর নতুন মানসিকতার সমাবেশ, সৃষ্টি হয়েছে নবীনপ্রবীণ মূল্যবোধের সমন্বয়ভিত্তিক সাহিত্য।

বিষয়বস্তু বিন্যাসেও অভিনবত্ব লক্ষণীয়। প্রকৃতি ও মানুষ যেমন বৈচিত্র্য নিয়ে ধরা পড়েছে, তেমনি গবেষণার ফলে বাঙালি মুসলমানদের অবদানের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যে উপেক্ষার বিষয়টি ছিল, তাও ধরা পড়ে। এদেশের পণ্ডিতদের গবেষণার মাধ্যমে সামগ্রিক বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের মর্যাদা স্বীকৃত হয়েছে। শুধু মুসলমান শাসকগোষ্ঠীই নয়, মুসলমান কবিগণ বিশেষ করে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন, তার রহস্য উদ্ঘাটনে বাংলাদেশের গবেষণা সাহিত্য বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে।

দেশবিভাগ পরবর্তী নবীনপ্রবীণের সমন্বয় বাংলাদেশের সাহিত্যে এক নতুনতর চেতনার সঞ্চার করে। দেশভাগের আগে থেকেই যারা সাহিত্যচর্চার সাথে যুক্ত ছিলেন , তারা নতুনধারার সাথে সম্পৃক্ত করে সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। আবার একদল তরুণ দেশভাগের পর সাহিত্যের সমৃদ্ধিসাধনে যথেষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করেন। স্বতন্ত্র পরিবেশের আনুকূল্যে তাদের চিন্তাধারায় মৌলিকতা ও রূপরীতি প্রয়োগে স্বকীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এভাবে বাংলাদেশের সাহিত্য স্বকীয়তা নিয়েই সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যায়।

সাহিত্যে স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টির প্রয়োজনে ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যসম্বলিত ভাবধারা অবলম্বন, আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দের প্রাচুর্যপূর্ণ ব্যবহার, পুঁথি সাহিত্যের অনুসরণ প্রথমদিকে প্রকট হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সে সময়ের শাসক শ্রেণির বৈষম্যনীতির কারণে বাঙালি জাতীয়তাবোধের উপর আঘাত আসে। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর বৈরী মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর সাহিত্যে প্রকাশ পায়। ফলে সাহিত্যে বাঙালি জাতীয় জীবনের আশাআকাঙ্ক্ষা, চিন্তাভাবনা, জীবনচিত্র প্রকাশিত হতে থাকে। সাহিত্যের রূপরীতিগত পরিবর্তনও লক্ষণীয়।

স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়েছে এক নবতর চেতনা এবং সময়ের অগ্রগতিতে তা ক্রমান্বয়ে স্পষ্টতর হয়েছে। একাত্তরের আগে থেকেই জাতীয় জীবনে যে আশা-আকাঙ্ক্ষা রূপায়ণের সচেতন প্রয়াস চলছিল, তা বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী জীবন ও সমাজ কবি-সাহিত্যিকদের মনে নতুন আবেগের সঞ্চার করে এবং স্বাধীনতা উত্তর সাহিত্যে তার প্রতিফলন ব্যাপকতর হয়েছে।

‘৪৭ পরবর্তী জীবনধারার মধ্যে স্বতন্ত্রতা বিদ্যামান এবং তা সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়ে তাকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছে। বিষয়বস্তুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আঙ্গিকগত পরিবর্তনও সুস্পষ্ট। এজন্য একটা পৃথক যুগের পরিচয়ে বাংলাদেশের সাহিত্যকে চিহ্নিত করা চলে। ৪৭ সালে দেশবিভাগের ফলে এই যুগনির্দেশনা সহজ ও তাৎপর্যপূর্ণ। তবে একথা ঠিক যে, বাংলাদেশের সাহিত্য যে স্বতন্ত্রতা লাভ করেছে, তা প্রকৃতিগত নয়, কালগত বা দেশগত মাত্র। আধুনিক যুগের বাংলা সাহিত্যের প্রকৃতি অনুসরণেই বাংলাদেশের সাহিত্য বিকশিত হেেয়ছে। প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত যে পার্থক্য বাংলাদেশের সাহিত্যে সে ধরনের কোনো পৃথক বৈশিষ্ট্য নেই। ফলে একে স্বতন্ত্র যুগে চিহ্নিত করার প্রয়োজনীয়তা এখনো আসে নি বলেই মনে হয়।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন,

অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ,

সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *