আয়না’র সমাজ ও রাজনীতির চিত্র-অঙ্কনে আবুল মনসুর আহমদের সফলতা বিচার।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক …

আয়না’র সমাজ ও রাজনীতির চিত্র

সচেতন লেখক কখনো সমাজকে উপেক্ষা করতে পারেন না। তবে এক এক লেখকের সমাজ-ভাবনা এক এক রকম। বিখ্যাত রাজনীতিবিদ, সংবাদিক, আইনজীবী ও সচেতন সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ সমাজকে দেখেছেন ভিন্নভাবে। তিনি সমাজের বিভিন্ন আসঙ্গতিকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মাধ্যমে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। ফলে আয়না গ্রন্থের বিভিন্ন গল্পগুলো সমকালীন সমাজ বাস্তবতার জীবন্তদলিল হয়ে উঠেছে। আয়না’র সমাজ ও রাজনীতি আজও প্রাসঙ্গিক।

আবুল মনসুর আহমদ – আয়না
আয়না – আবুল মনসুর আহমদ

লেখকের সমসাময়িক সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, হিন্দু-মুসলমানের বিবাদ, একই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ধর্মীয় কলহ নিত্য নৈমিত্তক ঘটনা ছিল। ধর্মের ক্ষেত্রে ধর্মের নামে ভন্ডামি, অন্ধ গোঁড়ামী, ধর্মীয় খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে দ্বিমত পোষণ ও তা নিয়ে কলহে লিপ্ত হওয়া, ভন্ডপীরদের কীর্তিকলাপ ইত্যাদি বিষয় সমকালীন মুসলমান সমাজ প্রবলভাবে ক্রিয়াশীল ছিল। সমকালীন সামাজিক, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের নানা অসঙ্গতি নিয়ে লেখক ব্যঙ্গ করেছেন এবং সমাজ ও মানুষের নানা ভন্ডামীর মুখোশ উম্মোচন করেছেন।

গল্পগুলো বিশ্লেষণ করলে লেখকের ব্যঙ্গের বিষয়ের একটা তালিকা সহজেই তৈরি করা যায়। আর তা লেখকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোয় আলোকিত। স্বাধীনতার নামে নিজ স্বার্থ অন্বেষণ, বাইরে বিদ্রোহী ভেতরে ইংরেজ ভক্ত, বিদেশী শাসক প্রীতি, ভন্ডপীর মোল­াদের বিবাহপ্রীতি, মোল­াদের ভোজনপ্রীতি, মাযহাবী বিরোধ, বাহাসের অসারতা, সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা, ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে কলহ, মৌলবীদের মধ্যে অশোভন প্রতিদ্ব›িদ্বতা ও সংঘর্ষ, অনাবশ্যক আরবিপ্রীতি, শিক্ষার আধুনিকতা বর্জন, ধর্মীয় পত্রিকার ব্যবসা, আঞ্জুমান জাতীয় সেবা প্রতিষ্ঠান নিয়ে ব্যবসা, মওলানাদের ভাষা ব্যবহার, মুসলমানদের কাবুলপ্রীতি, পর্দা প্রথা ইত্যাদি সমাজ-জীবনের খন্ড খন্ড চিত্র এ গ্রন্থের গল্পগুলোর মধ্যে অত্যন্তবাস্তবতার সাথে অঙ্কিত হয়েছে।

বিদগ্ধ সমাজ সচেতন শিল্পী আবুল মনসুর আহমদ সমকালীন সমাজ জীবনের অসঙ্গতিকে ব্যঙ্গের মধ্যে দিয়ে ফুঁটিয়ে তুলেছেন। এ গ্রন্থের গল্পগুলো মূলত সমকালীন সমাজের আয়না হিসেবে বিবেচিত। এই আয়নায় সমকালীন সমাজ বাস্তবতা প্রতিবিম্বিত হয়েছে। আমাদের সমাজে হরেক রকমের মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ানো মানুষের প্রতিবিম্ব এই আয়নায় ধরা পড়েছে। এই সব বহুরুপী বন মানুষগুলোকে মন্দিরে, মসজিদে, বক্তৃতার মঞ্চে, পলিটিক্সের আখড়ায়, সাহিত্য-সমাজে বার বার দেখা যায়। বিভিন্ন গল্পের মধ্যে সত্যিই সমাজের বিচিত্র ধরনের মানুষের কথাই আছে।

মুসলমান সমাজে ভন্ডপীরদের প্রভাব অনস্বীকার্য। আয়না’র সমাজ বাস্তবতার জীবন্তচিত্র হুজুর কেবলা গল্পটি। হুজুর কেবলা গল্পে এরকম ভন্ডপীরের মুখোশ উম্মোচিত হয়েছে। এরা সাধারণ মানুষকে কেরামতির নামে ধোকা দিয়ে নিজেদের স্বার্থ ও কামলালসা চরিতার্থ করে। এসব পীরদের ভোজনপ্রিয়তা, তাদের সহযোগীদের অপকর্ম, ধর্ম নিয়ে ব্যবসা, মানুষকে প্রতারণা করা ইত্যাদির এক বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে।

পশু বাঁচানোর নামে মানুষ নামের পশুরা কীভাবে মানুষ হত্যা করেছে তার এক বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। গো দেওতা কা দেশ গল্পে। ইংরেজ তাড়ানোর জন্যে তৎকালীন মানুষ চেয়েছে হিন্দু মুসলমানের ঐক্য। অথচ, এই উভয় স¤প্রদায় সামান্য বিষয় নিয়ে কলহ, এমন কি দাঙ্গা পর্যন্তকরেছে। আর ইংরেজ এদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। অনেকে ধর্মের আচার আচরণকে মনুষ্যত্বের উপরে স্থান দিয়েছেন। ইংরেজরা সে সময় গোরক্ষা আন্দোলনের নামে হিন্দুদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতো। গোরক্ষা আন্দোলনের সমর্থক ও প্রচারক আনন্দ বাজার পত্রিকা ও দাঙ্গায় উসকানি দাতা ডিভাইড ল্যান্ড রুলের প্রবক্তা ইংরেজদের বিরুদ্ধে লেখকের ব্যঙ্গ প্রকাশ পেয়েছে।

আয়না’র সমাজ ও রাজনীতির চিত্র – ধর্মরাজ্য গল্পে

আয়না’র সমাজের আবেক মাত্রা দেখা য়ায় ধর্মরাজ্য গল্পে। ধর্মরাজ্য গল্পের মধ্যেও সমকালীন সমাজ-চিত্রের প্রতিফলন ঘটেছে। ধর্মীয় আচার নিয়ে দাঙ্গা ও দাঙ্গায় ইন্ধন যোগানো ইংরেজদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে। মন্দির এবং মসজিদ নিয়ে হিন্দু-মুসলমান যেভাবে মাতামাতি করেছে, তাতে তৎকালীন সমাজ বাস্তবতার ছবি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

মুসলীম সমাজ বিভিন্ন মাযহাবে বিভক্ত ছিল। এই বিভেদকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণীর ভন্ড মৌলবিরা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করত। মুজাহেদিন গল্পে তার জ্বলন্তউদাহরণ দেখানো হয়েছে। মৌলবিরা স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ভিন্ন ভিন্ন মাযহাবদের মেধ্য ধর্মীয় সুড়সুড়ি জাগিয়ে বাহাসের সৃষ্টি করত। নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য মনগড়া ধর্মীয় ব্যাখ্যা প্রদান করত এবং মুসলমান সমাজের ঐক্য নষ্ট করত। এরা আধুনিক শিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করে আরবি শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিত। বাহাসকে কেন্দ্র করে মারামারি খুন-মামলা-জেল-জরিমানা সবই হত। মুজাহেদিন গল্পে তারই বাস্তব চিত্র অঙ্কিত হয়েছে।

আয়না’র সমাজ ও রাজনীতির চিত্র নায়েবে নবী গল্পে

নায়েবে নবী গল্পের মধ্যে তৎকালীন মোল্লা-মৌলবীদের ধ্যান-ধারণা ও কর্মকান্ডের ছবি অঙ্কিত হয়েছে। মুসলমানদের মত, পথ ও আচার-আচরণের ভিন্নতা নিয়ে সংঘর্ষ, হানাফী-মোহাম্মদীর মধ্যে বিরোধ, বাহাসের সভা, সভাশেষে মারামারি, পরিণামে মামলা-মোকদ্দমা ও জেল-জরিমানা, ধর্মীয় আচার-আচরণের তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় নিয়ে দুজন প্রতিদ্ব›িদ্ব মওলানার মধ্যে অশোভন সংঘর্ষ, নিজ স্বার্থ সিদ্ধির জন্য মনগড়া ফতোয়া প্রদান, জানাজা পড়ানোর টাকার লোভে অশোভন আচরণ, অর্থের লোভে একজনের স্ত্রীকে অন্যের সাথে নিকা দেওয়া, বহুবিবাহ, ভোজন-লালসা, মওলানাদের আধুনিক জগৎ সম্পর্কে অজ্ঞতা ইত্যাদি সমকালীন ছবি এ গল্পে অঙ্কিত হয়েছে।

আয়না’র সমাজ ও রাজনীতির চিত্র লিডরে কওম গলেপ:

লিডরে কওম গল্পে ধর্ম ব্যবসার আধুনিক রূপকারদের বাস্তব ছবি অঙ্কিত হয়েছে। ধর্মের নামে বড় বড় কথা বলা তথাকথিত সুবিধাবাদী ইসমাইল চরিত্রের মধ্যে দিয়ে সমকালীন সমাজ বাস্তবতার নগ্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। মিথ্যা সাংবাদিকতা, অকৃতজ্ঞতা, মাযহাবী কোন্দল লাগাবার চক্রান্ত, আঞ্জুমানের নামে অর্থ আত্মসাৎ ও কোন্দল সৃষ্টি, প্রতারণার মাধ্যমে অন্যের পত্রিকার মালিক হওয়া, ইসলাম প্রচার ও মুসলমানদের উন্নতির নামে ভন্ডামি প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যধারী ইসমাইল চরিত্রের মধ্যে দিয়ে লেখক স্বার্থপর মুখোশধারী ভয়ঙ্কর ধর্ম ব্যবসায়ীদের স্বরূপ উম্মোচন করেছেন।

আয়না গ্রন্থের প্রতিটি গল্পে কোন না কোন ব্যক্তিকে ঘিরে কাহিনী গড়ে উঠলেও চরিত্রগুলো তাদের সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেছে। সমকালীন রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয় সংক্রান্তঅসঙ্গতিগুলো লেখক ব্যঙ্গের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। চরিত্রগুলো তাই সমাজ জীবনের নানা দিক ধারণ করে পাঠকের সামনে হাজির হয়েছে।

হুজুর কেবলার পীর সাহেব, সুফী সাহেব, নায়েবে নবী গল্পের গরীবুল­াহ ও সুধারামী সাহেব, লিডরে কওম গল্পের ইসমাইল, মুজাহেদীন গল্পের মাওলানা সাহেব, মৌলবী সাহেব, একপাল গরুর সংলাপের মধ্যে দিয়ে গো দেওতা কা দেশ গল্পের অনুলি­খিত মানুষ, দাঙ্গা সৃষ্টিকারী অনুলি­খিত হিন্দু-মুসলমান বিদ্রোহী সংঘের আফতাব ইত্যাদি চরিত্রগুলো যেন সমাজ থেকে নেওয়া। ধর্মীয় নেতারা মুখেই শুধু শরিয়তের কথা বলে, কিন্তু অর্থের জন্য যে কোন মুহূর্তে যে কোন বিধান পাল্টাতে দ্বিধা করে না। আসলে এরা সবাই অর্থলোভী ভন্ড। এরা আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

আয়না’র সমাজ ও রাজনীতির চিত্র বিদ্রোহী সংঘ গল্পে

বিদ্রোহী সংঘ গল্পে আফতাব চরিত্রটির মধ্যে দিয়ে তৎকালীন সুবিধাভোগী মানুষের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যাদের কথার সাথে কাজের কোন মিল নেই। শুধু আফতাব নং, ব্রাদারইন-ল সংগঠনের সকল সদস্যদের মধ্যেও একই চিত্র ফুটে উঠেছে।এরা সবাই সুবিধাবাদী বাঙালি। এরা মুখেই শুধু স্বাধীনতার কথা বলে, দেশের উন্নতির কথা বলে। আসলে, ভেতরে ভেতরে এরা সবাই ইংরেজদের দালাল।

আয়না’র সমাজ ও রাজনীতির চিত্র – উপসংহার

পরিশেষে বলতেই হয় আয়না গ্রন্থের প্রতিটি গল্পই আসলে সমকালীন সমাজ জীবনের বাস্তব দলিল। লেখক ছিলেন সমাজ সচেতন ও মানবতাবাদী। তাই তিনি রঙ্গ-ব্যঙ্গের মাধ্যমে সামাজিক কল্যাণ ও মনুষ্যত্ববোধের উদ্ভোধন ঘটাতে চেয়েছেন। প্রতিটি গল্পেই লেখক সফল হয়েছেন। তাই প্রতিটি গল্পও হয়ে উঠেছে সমাজ জীবনের জীবন্তআলেখ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *