আয়না গ্রন্থের জীবনবোধ/ বিষয়বৈচিত্র্য#মুখোশধারী সমাজের চালচিত্র# শিল্পময় করে দেখা# ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মক সাহিত্য

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক …

আয়না গ্রন্থের জীবনবোধ

ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মক সাহিত্যের ধারায় আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৮) এক জনপ্রিয় নাম। তিনি ব্যঙ্গ বিদ্রুপাত্মক গল্পের ধারায় অপরিসীম নিপুণতার পরিচয় দিয়েছেন। আয়না (১৯৩৫) গল্পগ্রন্থ তাঁর অসাধারণ সৃষ্টি। আয়না গল্পগ্রন্থের বিভিন্ন গল্পের মধ্যে লেখক অসৎ মুখোশধারী মানুষের স্বরূপ তুলে ধরেছেন। প্রতিটি গল্পের মধ্যে বিদ্রূপের অন্তরালে প্রবাহিত হয়েছে মানব জীবনের অন্তহীন অশ্রুপাত ও শুভচেতনা।

আবুল মনসুর আহমদ – আয়না
আয়না – আবুল মনসুর আহমদ

আয়না গল্পগ্রন্থে মোট সাতটি গল্প রয়েছে। গল্পগুলো হলো (১) হুজুর কেবলা (২) গো দেওতা কা দেশ (৩) নায়েবে নবী (৪) লিডরে কত্তম (৫) মুজাহেদীন (৬) বিদ্রোহী সংঘ ও (৭) ধর্মরাজ্য। এসব গল্পের মধ্যে রঙ্গ-ব্যঙ্গ-কৌতুকের মাধ্যমে লেখক সমকালীন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় ভন্ডামি, অসঙ্গতি ও ব্যক্তিক দোষত্রুটিকে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন।

আয়না গ্রন্থের গল্পগুলোকে কেন্দ্র করে লেখকের বিষয়-ভাবনা ও জীবনবোধ প্রকাশ পেয়েছে। কাহিনিতে বৈচিত্র্য সৃষ্টির চেষ্টাও লক্ষ করা যায়। গল্পগ্রলোর কাহিনির বিষয় অনুসারে বিচার করলে দেখা যায় হুজুর কেবলা, নায়েবে নবী ও লিডরে কওম গল্পের মধ্যে ভন্ডপীর, মওলানা, মৌলবীদের নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়েছে। মুজাহেদীন গল্পে মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতভেদ ও হানাহানির কাহিনি ফুটে উঠেছে। গো দেওতা কা দেশ ও ধর্মরাজ্য গল্পে হিন্দু-মুসলমান স¤প্রদায়ের সা¤প্রদায়িক কলহ ও দাঙ্গা এবং সেই সাথে ইংরেজ সরকারের ভূমিকা নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা হয়েছে। বিদ্রাহী সংঘ গল্পে ইংরেজ বিদ্বেষ ও সেই সাথে ইংরেজ বিদ্রোহীর নামে ভন্ডদের ইংরেজদের দালালিবৃত্তির পরিচয় ফুটে উঠেছে।

হুজুর কেবলা

‘হুজুর কেবলা’ গল্পের কাহিনি গড়ে উঠেছে এমদাদ নামের এক নাস্তিকের পীরভক্তিকে কেন্দ্র করে। ধর্মের প্রতি পরিপূর্ণ মনোনিবেশের মানসে এমদাদ এক পীর সাহেবের কাছে যায়। কিন্তু পীরের কার্যকলাপ এমদাদের মনে সন্দেহের জন্ম দেয়। পীর অদ্ভুত কেরামতির নামে গ্রামবাসিকে বোকা বানিয়ে এক মুরিদের যুবতী স্ত্রীকে নিজের ৪র্থ বিবিতে পরিণত করে। এমদাদের কাছে পীরের মুখোস খসে গিয়ে আসল চেহারা ধরা পড়ে।

এমদাদ প্রতিবাদ করে, কিন্তু তারা এতই শক্তিশালী যে এমদাদকেই তারা গ্রাম থেকে বের করে দেয়। পীর সাহেবের সকল অপকর্মের সহযোগী সুফী সাহেব। ভন্ডামী, মিথ্যা বলা, ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করা, অন্যকে প্রতারিত করা ইত্যাদি সকল অপকর্ম তাদের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সুফী সাহেবের সাহায্যেই পীর সাহেব অসহায় কলিমনকে বিয়ে করে। সমাজের তথা কথিত এ-রকম মুখোশধারী ভন্ড মৌলবিদের প্রতিচ্ছবি প্রতিবিম্বিত হয়েছে এ গল্পে।

গো-দেওতা কা দেশ

এ গল্পে পশু বাঁচানোর নামে মানুষ নামের পশুরা কিভাবে মানুষ হত্যা করেছে, তা নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়েছে।। ইংরেজ তাড়াতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। কিন্তু দেখা গেছে এ দুই স¤প্রদায়ের মধ্যে সব সময় সামান্য বিষয় নিয়ে কলহ লেগে থাকতো। এ কলহ অনেক সময় দাঙ্গা পর্যন্ত পৌছেছে। ধর্মীয় কলহ বিশেষ ভাবে এ ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে। এ দাঙ্গার পিছনে ইংরেজ সরকার সব সময় ইন্ধন যুগিয়েছে। গল্পটিতে একপাল গরু-গাভির সংলাপের মধ্যে দিয়ে হিন্দু মুসলমানের দ্বন্দ্বের চিত্র চিত্রায়িত হয়েছে।

নায়েবে নবী

অর্থলোভী ভন্ড মাওলানাদের কবলে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন কীভাবে দূর্বিসহ হয়ে ওঠে এ গল্পের মধ্যে তারই ছবি অঙ্কিত হয়েছে। গরীবুল্লাহ সাহেব ও সুধারামী সাহেব দু’জনই ভন্ড ও অর্থলোভী। মৃত ব্যক্তির জানাযা পড়ানোর সময় সীনা বরাবর দাঁড়াতে হবে, না মাথা বরাবর দাঁড়াতে হবে এ নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা তর্কে লিপ্ত হয়েছে। শেষে এক মাতব্বর শ্রেণি লোকের মধ্যস্থতায় অর্থ সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়ার কথা বলে থামানো হয় দু’জনকে।

ধর্মরাজ্য

এ গল্পের মধ্যেও ধর্মীয় আচার-আচারণ নিয়ে দাঙ্গা ও দাঙ্গায় ইংরেজদের ইন্ধন যোগাবার ছবি অঙ্কিত হয়েছে। মানুষ যে অনেক সময় মনুষ্যত্বের চেয়ে ধর্মীয় আচার-আচরণকে বড় করে দেখে, লেখক সে বিষয় নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন। হিন্দু মুসলমান যখন মসজিদ মন্দিরের সামনে বাদ্যযন্ত্র ও আযান দেয়া নিয়ে দাঙ্গায় লিপ্ত, তখন ইংরেজ সরকার মধ্যস্থতা করে। তাদের সিদ্ধান্ত হলোÑ যেখানে মসজিদ বেশি সেখানে পুজোর বাদ্য চলবে না। যখন নামাজের সময় নয়, তখন হিন্দুরা পুজো করবে, আর যেখানে মন্দির বেশি, সেখানে মসজিদের সামনে বাদ্য বাজবে, যখন পুজোর সময় নয়, তখন সেখানকার সমজিদে আযান চলবে।

এরপর দেখা গেল কোলকাতার সমস্ত ঘরবাড়ি হয় মসজিদ, না হয় মন্দিরে পরিণত হলো, আর সবাই কাজকর্ম ও খাওয়া-দাওয়া ফেলে পুজো ও নামাযে লিপ্ত হলো। রান্নাঘরও ধর্মশালায় রূপান্তরিত, ফলে মানুষ না খেয়ে মারা গেল। মরা পচাঁ হিন্দু মৃতদেহগুলোর বুকের উপর আবিরের অক্ষরে লেখা আর্যবীর, আর মুসলমানদের বুকের উপর লেখা শহীদ। এভাবেব ব্যঙ্গের মধ্যে দিয়ে লেখক তৎকালীন সমাজ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি আমাদেরকে দেখাতে চেয়েছেন।

মুজাহেদিন

এ গল্পেও ভন্ড মৌলবিদের ভন্ডামির চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। এই মৌলবি এত নীচ ও কুচক্রী যে সামান্য স্বার্থ সিদ্ধির জন্য হানাফি ও মোহাম্মদি স¤প্রদায়ের মাঝে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে। এখানে আরবি শিক্ষা প্রীতিকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে। আরবি জানা না থাকলে ঈমাম মেহেদী ও খানে দযযাল এ দুজনকে সনাক্ত করা যাবে না। কেননা, আরবি ভাষাতেই দযযালের কপালে কাফের এবং ঈমাম মেহেদীর কপালে মোমিন লেখা থাকবে। নিজেদের মধ্যে, স্বধর্ম অবলম্বীদের মধ্যে হানাহানি খুন-খারাবি বাঁধিয়ে মুজাহিদরা কর্তব্য পালন করে ।

লিডরে কওম

এ গল্পের মধ্যেও মুজাহেদিন গল্পের ভন্ড মৌলবির মতো এক ভন্ড মওলানার পরিচয় পাওয়া যায় যে নিজেকে মুসলমান জাতির ত্রাণকর্তা বলে নিজেকে ঘোষণা দেয়। আসলে, সে ভন্ড, ধড়িবাজ, অর্থলোভী ছাড়া আর কিছুই নয়। ধর্ম ব্যবসার আধুনিক রূপকারদের ছবি এখানে অঙ্কিত হয়েছে। ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়, মিথ্যা সাংবাদিকতা, তথাকথিত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের অকৃতজ্ঞতা, মাযহাবী কোন্দল লাগাবার চক্রান্ত এবং আঞ্জুমানের নামে রিলিফ ফান্ড খুলে নিজের জন্য টাকা সংগ্রহ ইত্যাদি বিষয় ব্যঙ্গের মাধ্যমে অত্যন্ত নিপুনতার সাথে অঙ্কিত হয়েছে এ গল্পে।

বিদ্রোহী সংঘ

এ গল্পে আফতাব চরিত্রটির মধ্যে দিয়ে তৎকালীন সুবিধাভোগী মানুষের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যাদের কথার সাথে কাজের কোনো মিল নেই। শুধু আফতাব নয় ব্রাদার-ইন-ল সংগঠনের সকল সদস্যদের মধ্যেও একই চিত্র ফুটে উঠেছে। এরা সবাই সুবিধাবাদী বাঙালী। এরা মুখেই শুধু ভারত বর্ষের স্বাধীনতার কথা বলে, দেশ শত্রæমুক্ত করার কথা বলে, দেশের উন্নতির কথা বলে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এরা ইংরেজদেরই দালাল।

আয়না গ্রন্থের গল্পগুলোর মধ্যে লেখক যেসব ছবি অঙ্কন করেছেন, তাতে লেখকের সমাজ বাস্তবতার পরিচয় মেলে। সমকালীন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয় অত্যন্ত নিপুনতার সাথে তিনি গল্পের মধ্যে তুলে ধরেছেন। সমকালীন সমাজ, রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, হিন্দু-মুসলমানের বিবাদ, একই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ধর্মীয় কলহ, ধর্মের নামে ভন্ডামি, অন্ধ গোঁড়ামী, ধর্মীয় খুটিনাটি বিষয় নিয়ে দ্বিমত পোষণ ও তা নিয়ে কলহে লিপ্ত হওয়া, ভন্ডপীরদের কীর্তিকলাপ ইত্যাদি বিষয় সে সময়ে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা ছিল।

আয়না গল্পগ্রন্থের গল্পগুলোর বিষয় ভাবনা থেকেও লেখকের ব্যঙ্গের বিষয়ের একটা তালিকা তৈরি করা যায়। স্বাধীনতার নামে নিজ স্বার্থ অন্বেষণ বাইরে বিদ্রোহী ভেতরে ইংরেজ ভক্ত, বিদেশী শাসকপ্রীতি, ভন্ডপীর, মোল্লাদের বিবাহ প্রীতি, মোল্লাদের ভোজনপ্রীতি, মাযহাবী বিরোধ, বাহাসের অসারতা, সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা, ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে কলহকারী, মৌলবীদের মধ্যে অশোভন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘর্ষ, অনাবশ্যক আরবি প্রীতি, শিক্ষার আধুনিকতা বর্জন, ধর্মীয় পত্রিকা ব্যবসা, আঞ্জুমান জাতীয় সেবা প্রতিষ্ঠান নিয়ে ব্যবসা, মাওলানাদের ভাষা ব্যবহারের রীতি, মুসলমানদের কাবুলপ্রীতি ইত্যাদি বিষয়কে লেখক তার ‘আয়না’য় প্রতিবিম্বিত করেছেন।

চরিত্র সৃষ্টিতেও লেখকের কৃতিত্ব অপরিসীম। তিনি এক ঝাঁক চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে সমকালীন সমাজ বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোকে অবাস্তব বা কাল্পনিক বলে মনে হয় না। এ প্রসঙ্গে কবি কাজী নজরুল ইসলামের মন্তব্য স্মরণযোগ্য। তিনি লিখেছেন –

এমনি আয়নায় শুধু মানুষের বাইরের প্রতিচ্ছবিই যায়, কিন্তু আমার বন্ধু শিল্পী আবুল মনসুর যে আয়না তৈরি করেছেন, তাতে মানুুুুষের অন্তরের রূপ ধরা পড়েছে। যে সমস্ত মানুষ হরেক রকমের মুখোশ পরে আমাদের সমাজ অবাধে বিচরণ করছে, আবুল মনসুরের আয়নার ভিতরে তাদের স্বরূপমূর্তি বন্য ভীষণতা নিয়ে ফুটে উঠেছে। মানুষের মুখোশ পরা এই বহুরূপী বনমানুষগু লোর সবাইকে মন্দিরে, সমজিদে, বক্তৃতার মঞ্চে, পলিটিকসের আখড়ায় সাহিত্য সমাজে যেন বহুবার দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।

হুজুর কেবলার পীর সাহেব, সুফী সাহেব, নায়েবে নবী গল্পের জানাযার নামায নিয়ে হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী গরীবুল­াহ সাহেব ও সুধারামী সাহেব, লিডরে কওম গল্পের ইসমাইল সাহেব, মুজাহেদীন গল্পের মওলানা সাহেব, মৌলভী সাহেব, একপাল গরুর সংলাপের মধ্যে দিয়ে গো- দেওতা-কা- দেশ গল্পের অনুল্লিখিত মানুষ, দাঙ্গা সৃষ্টিকারী অনুলি­খিত হিন্দু মুসলমান, বিদ্রোহী সংঘের আফতাব ইত্যাদি চরিত্রগুলো যেন সমাজ থেকেই নেওয়া। ধর্মীয় নেতারা মুখেই শুধু শরীয়তের কথা বলে, কিন্তু অর্থের জন্য মুহূর্তের মধ্যে যে কোনো বিধান পাল্টাতে দ্বিধা করে না। আসলে, এরা সবাই অর্থলোভী ভন্ড। এরা আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে রয়েছে।

সাহিত্য শিল্পময় হয়ে ওঠে ভাষা ব্যবহারের গুনে। আবুল মনসুরের ভাষা সৃষ্টির মর্মমূল থেকে উৎসারিত। গল্পের বিষয় বর্ণনায়, চরিত্র পরিকল্পনায়, ব্যঙ্গরস সৃষ্টিতে লেখক উপযুক্ত ভাষা ব্যবহার করেছেন। বিষয় অনুযায়ী ভাষা ব্যবহার, চরিত্র অনুযায়ী সংলাপ রচনায় লেখকের স্বতন্ত্রতা চোখে পড়ে। তিনি চলিত ভাষা ব্যবহার করেছেন।

তবে গল্পের বিষয় ভাবনার সাথে মিল রাখতে তার গল্পে আরবি-ফারসি শব্দ বহুল পরিমাণে ব্যবহার করেছেন। যেমনÑজববা, কামেল, মোবাকেবা, মোশাহেদা, ফানা, ওয়াজ, নিকাহ, মজলিস, সোওয়াব, কাফের, খারেজি ইত্যাদি; ইংরেজি শব্দও তিনি প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করেছেন। যেমনÑপ্রোগ্রাম, চেঞ্জ, সার্জেন্ট, সিপড, কণক্লুডিং সং, ব্রাদার-ইন-ল, ট্রাম, প্রভোকেটর ইত্যাদি।

ব্যঙ্গ বিদ্রূপ প্রকাশের দিক থেকে লেখকের পারদর্শিতা অনস্বীকার্য। এ প্রসঙ্গে নজরুল ইসলামের একটি মন্তব্য উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন –

বাংলা ভাষায় ব্যঙ্গ সাহিত্য খুব উন্নত হয় নি। তার কারণ ব্যঙ্গ সৃষ্টিতে অসাধারণ প্রতিভার প্রয়োজন। এ যেন সেতারের কান মলে সুর বের করা। সুরও বেরুবে, তারও ছিড়বে না। ভাষার কান মলে রস সৃষ্টির ক্ষমতা আবুল মনসুরের অসাধারন। এ যেন পাকা ওস্তাদি হাত। আবুল মনসুরের ব্যঙ্গের একটা অসাধারন বৈশিষ্ট্য এই যে, সে ব্যঙ্গ যখন হাসায়, তখন সে ব্যঙ্গ, কিন্তু কামড়ায় যখন, তখন হয় সে সাপ।

আর সে কামড় গিয়ে যার গায়ে বাজে, তার মুখের ভাব হয় সাপের মুখের ব্যঙের মতই করুন। কিন্তু সে হাসির পিছনে যে অশ্রু আছে, সে কামড়ের পিছনে যে দরদ আছে, তা যারা ধরতে পারবেন আবুল মনসুরের ব্যঙ্গের সত্যিকার রসোপলব্ধি করতে পারবেন তারাই। বন্ধুবরের এ রসাঘাত কশাঘাতের মতই তীব্র ও ঝাঁঝালো।। কাজেই এ রসাঘাতের উদ্দেশ্য সফল হবে, এটা নিশ্চয়ই আশা করা যেতে পারে।

নজরুলের এ কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য।

আবুল মনসুর ছিলেন মানবতাবাদী লেখক। তাই তিনি রঙ্গ ব্যঙ্গের মাধ্যমে সামাজিক কল্যাণ ও মনুষ্যত্ববোধের উদ্ভোধন ঘটাতে চেয়েছেন। প্রতিটি গল্পের মধ্যে দিয়েই তিনি এ কাজটি অত্যন্ত সফলতার সাথে করেছেন।

আয়না’ গল্পগ্রন্ত্রের নামকরণও অত্যন্ত সার্থক। আয়নায় মানুষের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, কিন্তু লেখক যে আয়না সৃষ্টি করেছেন তাতে মানুষের অর্ন্তনিহিত রূপও ধরা পড়ে। নামকরণ করা হয়েছে রূপকের অন্তরালে যে ব্যঞ্জনা প্রকাশ পেয়েছে তার প্রতীকীরূপে।

পরিশেষে বলা যেতে পারে শিল্প সফলতার সব কয়টি মাপকাঠিতে আয়না গ্রন্থ উত্তীর্ণ হয়েছে এটা নিঃসন্দেহ।। কাহিনি নির্মাণ, চরিত্র চিত্রণ, ভাষারীতি, নামকরণ, সামাজিক চিত্র অঙ্কন, ব্যঙ্গ কৌতুক সৃষ্টিতে লেখকের কৃতিত্ব অপরিসীম। গ্রন্থটি শিল্পময়তার দিক থেকে এক অসাধারণ সৃষ্টি।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধূসূদন কলেজ, যশোর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *