ইলিয়াড (Homer): যুদ্ধ, বীরত্ব ও ট্র্যাজেডির সংমিশ্রণে বিশ্বসাহিত্যের অমর মহাকাব্য

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য।

খোলা পাতায় প্রকাশিত সকল কন্টেট দেখতে ক্লিক করুন

ইলিয়াড  –

হোমারের ইলিয়াড কেবল যুদ্ধের কাহিনি নয়—এটি বীরত্ব, অহংকার, দেবতা ও মানুষের সংঘাত, প্রেম ও মৃত্যুর গভীর ট্রাজেডির অমর দলিল। ট্রয় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা এই মহাকাব্য আজও বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে পাঠককে মুগ্ধ করে।

হোমারের ‘ইলিয়াড’ অমর এক মহাকাব্য। যেখানে যুদ্ধ, বীরত্ব ও ট্রাজেডির এক মহাকাব্যিক রূপ দেখানো হয়েছে। , গ্রিক ও ট্রোজান পক্ষের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গ্রিক বীর অ্যাকিলিসের ক্রোধ, সম্মান এবং মানবিক পরিণতির চিত্র তুলে মহাকাব্যির কৌশলে তুলে ধরা হয়েছে।। ২৪টি সর্গে বিভক্ত এই মহাকাব্যটি ট্রয় নগরীর অবরোধ, বীরদের সাহস, ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ এবং ধ্বংসের বেদনাকে ফুটিয়ে তুলে পাঠককে শাশ্বত মানবিক সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড় করায়

যুদ্ধ, বীরত্ব ও ট্রাজেডির সংমিশ্রণে ‘ইলিয়াড’ অমর হওয়ার কারণসমূহ: 

ভয়াবহ যুদ্ধের চিত্রায়ণ:  মহাকাব্য মানেই যুদ্ধের তুর্যনিনাদ, ভয়াবহ নিষ্টুরতার বিবরণ। তবে হোমারের ইলিয়াড  কেবল যুদ্ধের বাহ্যিক বর্ণনা নয়, বরং ১০ বছর ধরে চলা ট্রয় ও গ্রিকদের যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী এবং নিষ্ঠুর বাস্তবতার দলিল । যুদ্ধের ভয়াবহতা, নির্মমতা,   যুদ্ধের কৌশল, ধ্বংসলীলা, ক্ষোভ, প্রতিহিংসা,  এবং এর রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক  ও মানবিক প্রভাব স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ।

বীরত্ব ও সাহসিকতা: পাশ্চাত্য মহাকাব্যে মানেই বীরত্বের জয়গাঁথা। ইলিয়াড মহাকাব্যের প্রতিটি চরিত্রই অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের প্রতীক।  মহাকাব্যটি অ্যাকিলিস, হেক্টর, ডায়োমেডিস ও ওডিসিউসের মতো কিংবদন্তি বীরদের অনন্য সাহসিকতার কথা বলে । অ্যাকিলিসের অমানুষিক শক্তি , বীরত্ব, প্রতিশোধস্পৃহা, বন্ধুত্বের প্রতি টান এবং হেক্টরের নিজ শহর ও পরিবারের প্রতি নিঃস্বার্থ কর্তব্যবোধ ও বীরত্ব কাহিনি  ইলিয়াডের প্রতিটি অধ্যায়ে বর্ণিত।

ট্রাজেডি ও মানবিক আবেগ: করুণ পরিণতির শিল্পময় অভিব্যক্তি অপরিসীম কৌশলে হোমার ইলিয়াড কাব্যে ফুটিয়ে তুলেছেন । ইলিয়াডের মূল ট্রাজেডি হলো যুদ্ধের পরিণাম। বন্ধু প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যুতে অ্যাকিলিসের শোক,  প্রিয়জনের হারানো এবং শেষে হেক্টরের মৃত্যু ও সৎকার—সব মিলিয়ে এক গভীর মানবিক হাহাকার তৈরি করে । প্রতিশোধস্পৃহায় উন্মত্ত অ্যাকিলিসের আচরণ, হেক্টরের প্রতি অমানবিকতা, আবার রাজা প্রিয়ামের সন্তানের প্রতি মমত্ববোধ অ্যাকিলিসের কাছে মাথানত করায়। অ্যাকিলিসও শেষ পর্যন্ত মানবিকতার নিদর্শন দেখিয়ে হেক্টরের সৎকারের সুযোগ করে দেয়।  যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক বেদনা ট্রাজেডির চরম রূপ।

ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ ও মানুষের ভাগ্য: গ্রিক মিথলজির অন্যতম অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নিয়তি নির্ধারিত কর্মফলকে অবশ্যাম্ভাবী করে ফুটিয়ে তোলা। এখানে দেবতা ও মানুষের সমান সক্রিয়তা লক্ষ্যণীয়। দেবতারা নিজে উপস্থিত থেকে ভবিতব্যকে নিশ্চিত করে তোলে।  যুদ্ধক্ষেত্রে দেবতাদের অংশগ্রহণ, যেমন- দেবতারা নিজ নিজ পছন্দের বীরের পক্ষে লড়াই করেন, যা মানবিক বীরত্বের পাশাপাশি ভাগ্যের নির্মমতার দিকটি ফুটিয়ে তোলে ।

শাশ্বত মূল্যবোধ: মহাকাব্যে যুদ্ধের ভয়াবহতা থাকে, প্রতিশোধস্পৃহার চরম প্রকাশ থাকে। তারপরও মহাকাব্যে ক্লাসিক মুল্যবোধ বা শাশ্বত আচরণিক বিষয়গুলোর প্রকাশ থাকে।  বীরত্ব, সম্মান, ক্রোধ, প্রতিশোধ এবং ভালোবাসার মতো চিরন্তন মানবিক বিষয়গুলো ইলিয়াডে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে । 

‘ইলিয়াড’ শুধুমাত্র যুদ্ধের কাহিনী নয়, এটি ট্রয়ের যুদ্ধের মাধ্যমে মানবজীবনের নশ্বরতা এবং যুদ্ধের ভয়াবহতার এক চিরকালীন আখ্যান। হোমারের অতুলনীয় বর্ণনাভঙ্গি এটিকে মানব ইতিহাসের এক অমর মহাকাব্যে রূপান্তর করেছে

কাহিনির বিবরণ:

পৃথিবীর চারটি জাত মহাকাব্যের মধ্যে ইলিয়াড় ও ওডেসির রচয়িতা হোমার।  ইলিয়াড হোমারের রচিত প্রথম মহাকাব্য খ্রীষ্টপূর্ব ১২০০ থেকে ১৩০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে যা প্রায় ৩২০০ থেকে ৩৩০০ বছর পূর্বে রচিত। হোমারের ইলিয়াড মহাকাব্যটির মূল বিষয়বস্তু ট্রয়যুদ্ধ। আরো নির্দিষ্ট করে যদি বলি তা হচ্ছে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে চলা ট্রয় যুদ্ধের শেষের দিকের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে ইলিয়াড মহাকাব্যে। 

পূর্বে ট্রয় নগরীকে ইলিয়াম নামেই ডাকা হতো। ইলিয়াড শব্দটি এসেছে ইলিয়াম শব্দ থেকে। সেই ট্রয় নগরী ও ট্রয় যুদ্ধ গ্রীক হেলেনীয় সংস্কৃতির সাথে মিলেমিশে মানুষ ও দেবতার মিশেল তা রূপ নিয়েছে অসাধারন এক মহাকাব্যে।

পার্টার রাজা ম্যানেলাসের স্ত্রী হেলেনকে অপহরণ করে নিয়ে আসে ট্রয় রাজপুত্র প্যারিস। গ্রিক বাহিনী হাজারখানিক জাহাজ ও অসংখ্য সৈন্যসামন্ত নিয়ে ট্রয় নগরীর বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করে। দীর্ঘ নয় বছরের পরিশ্রমের পরেও গ্রীক বাহিনী ট্রয় নগরীর দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভাঙতে সক্ষম হয়নি। গ্রিক সৈন্য ও তাদের বাহিনীর প্রধান অ্যাগামেমনন ও কিছুটা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

দেবতাদের ষড়যন্ত্রে গ্রিক বাহিনীর মধ্যে প্লেগ ছড়িয়ে অ্যাগামেমননের দুশ্চিন্তার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়।  গ্রীক সেনা শিবিরে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়ে, ফলাফলস্বরূপ বহু গ্রিক সেনা মারা গেছে।  গ্রিক বাহিনী ট্রয় নগরের পাশের নগরগুলোতে হামলা করে তাদের সকল সম্পত্তি লুট করে এবং নারীদের নিজেদের লালসার বস্তুতে পরিণত করেছিল। দুই সুন্দরী নারী সাইস্রিস ও ব্রিসিসকে উপঢৌকন হিসেবে অ্যাগামেমনন ও অ্যাকিলিসকে দেওয়া হয়৷  

সাইস্রিস ছিল গ্রিক দেবতা অ্যাপোলোর মন্দিরের পুরোহিত সাইস্রেসের মেয়ে। সাইস্রিসকে ছাড়াতে ট্রয়ের রাজা প্রিয়াম অনেক উপঢৌকন পাঠালেও অ্যাগামেমনন সাইস্রিসকে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলাফলস্বরূপ বাধ্য হয়ে সাইস্রেস দেবতা অ্যাপোলোর মন্দিরে নিজের মেয়েকে যে প্রার্থনা করেন। দেবতা অ্যাপোলো নিজের একনিষ্ঠ ভক্তের কথা শুনেন এবং শাস্তিস্বরূপ গ্রীক সেনা শিবিরে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে দেন।

শেষ পর্যন্ত অ্যাগামেমনন সাইস্রিসকে মুক্ত করে দেন কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি অ্যাকিলিসের উপপত্নী বা প্রেমিকা ব্রিসিস কে গ্রহণ করেন। অ্যাকিলিস অ্যাগামেমননের উপর ক্রোধান্বিত হয়ে যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করেন। অ্যাকিলিস ছিলেন গ্রীকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। সে ছিল অপ্রতিরোধ্য এবং সে ছিলে সমুদ্র দেবী থেটিস ও রাজা পেলিয়াসের সন্তান।

অ্যাকিলিস যুদ্ধ  ত্যাগ করার গ্রিকরা যুদ্ধে পিছিয়ে যায় এবং ট্রোজনরা যুদ্ধে সুবিধা জনক অবস্থান নিয়ে নেয়। অ্যাকিলিস যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করায় গ্রিকরা অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়ে। অ্যাকিলিস যুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ায় অ্যাকিলিসের প্রিয় বন্ধু পেট্রোক্লাস অ্যাকিলিসের বর্ম পরিধান করে যুদ্ধের ময়দানে নেমে পড়ে।

লড়াইয়ের এক পর্যায়ে পেট্রোক্লাস মুখোমুখি হয় ট্রয় রাজপুত্র ও শ্রেষ্ঠ ট্রয় যোদ্ধা হেক্টরের। দুজনের মধ্যে তুমুল লড়াইয়ে হেক্টরের হাতে প্রাণ হারায় পেট্রোক্লাস।

অ্যাকিলিস প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকগ্রস্ত হয়ে পড়েন। হেক্টর কেবল তার প্রিয় বন্ধুকেই হত্যা করেননি, বরং হেক্টর অ্যাকিলিসের সুন্দর বর্মটিও ছিনিয়ে নিয়েছে। দেবী থেটিসের অনুরোধে দেবতারা অ্যাকিলিসের জন্য নতুন বর্ম তৈরি করে দেয়। অ্যাকিলিসের সেই বর্মে প্রদর্শিত ছিল পৃথিবী ও আকাশ, সাগর, সূর্য, পূর্ণচন্দ্র, নক্ষত্র ও হান্টার ও বাঘ; এগুলো সব ঘূর্ণায়মানভাবে দেখানো হয়েছে।

এছাড়াও, সেখানে ছিল দুই শহরের দৃশ্য, একটি শহরে দেখাচ্ছে লোকেরা উৎসব করছে, বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে। শিশুরা আনন্দে নৃত্য করছে। কৃষকরা ফসল ফলিয়ে আনন্দের হাসি হাসছে। অপরদিকের অন্য শহরে দেখাচ্ছে  সৈন্যরা লড়াই করছে, আশেপাশে পড়ে আছে বহু নিথর লাশ। আর চারাপশে সব ধ্বংসের চিহ্ন। হোমার এই বর্মের মাধ্যমে শুধু যুদ্ধের সরঞ্জাম নয়, বরং মানুষের জীবন, সমাজ, যুদ্ধ, শান্তি, আনন্দ, দুঃখ সবকিছুরই প্রতিফলন ঘটিয়েছ

বন্ধুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে অ্যাকিলিস যুদ্ধে যোগ দেয়। হেক্টরকে দ্বৈত যুদ্ধে আহ্বান করে। রাজা প্রিয়াম চায়নি হেক্টর অ্যাকিলিসের মুখোমুখি হোক। কেনন, নিশ্চিত মৃত্যু হবে হেক্টরের। তিনি জানেন অ্যাকিলিসের মুখোমুখি দাঁড়ানো মানেই তার প্রিয় সন্তান হেক্টরের মৃত্যু সুনিশ্চিত। হোমার এই অংশটায় এসে হেক্টর তার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে অসাধারণ এক আবেগময় দৃশ্যের সৃষ্টি করেছেন।

হেক্টর বীর, দেশ ও পরিবারের জন্য নিবেদিত।  স্ত্রী,সন্তান, পিতা-মাতা ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বশীল হেক্টর অ্যাকিলিসের বিরুদ্ধে দ্বৈতযুদ্ধে অংশ নেন। অ্যাকিলিসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পেড়ে ওঠা  অসম্ভব। কেননা, অ্যাকিলিস অর্ধেক দেবতা ও অর্ধেক মানুষ; সেই সাথে সে দেবতাদের বিশেষ আশীর্বাদ পুষ্ট। লড়াইয়ে হেক্টর হেরে যায়। মৃত্যুর আগে হেক্টর অ্যাকিলিসকে অনুরোধ করেছিল, তাকে হত্যার পর তার দেহ যেন তার নগরবাসীর হাতে হস্তান্তর করে। যেন তারা হেক্টরের শেষকৃত্য করতে পারে। 

অ্যাকিলিস হেক্টরের কথা শুনেনি। প্রতিশোধের নেশায় অ্যাকিলিস ছিল বিবেকহীন, ও ভয়াবহরকম নিষ্ঠুর।  অ্যাকিলিস হেক্টরের মৃতদেহ ঘোড়ার পেছনে বেঁধে গ্রিক শিবিরের চারদিকে ঘোরায়। হেক্টরের মৃতদেহের উপর চালানো অমানবিক  কর্মকান্ডকে  হোমার  দেখিয়েছিলেন যুদ্ধের অমানবিক ও নিষ্ঠুর বর্বরতাকে। 

নিজ পুত্রের মৃতদেহের উপর এরকম অমানবিক আচরণে রাজা প্রিয়াম সহ্য করতে না পেরে তিনদিন পর মধ্যরাতে ট্রয়ের রাজা প্রিয়াম লুকিয়ে অ্যাকিলিসের শিবিরে প্রবেশ করেন। তিনি অ্যাকিলিসকে বিনীত অনুরোধ করেন, যেন সে তার সন্তান হেক্টরের মৃতদেহ ফিরিয়ে দেয়। অ্যাকিলিস মানবিক দিক বিবেচনা করে বৃদ্ধ রাজাকে তার মৃত সন্তানের দেহ হস্তান্তর করেন। ট্রয় নগরবাসী ও রাজা প্রিয়াম হেক্টরের জন্য এক রাজকীয় শেষকৃত্যের আয়োজন করেন। হেক্টরের শেষকৃত্য ও ট্রয় নগরীর শোকাহত দৃশ্যের মাধ্যমেই হেমারের ইলিয়াড মহাকাব্যের সমাপ্তি ঘটেছে।

গল্পটি দৃশ্যত একটি যুদ্ধ সম্পর্কে, এটি প্রকৃতপক্ষে বীরত্ব, সম্মান, অমরত্ব এবং ভাগ্যের গ্রীক ধারণা সম্পর্কে । অ্যাকিলিস, প্যাট্রোক্লাস, ডায়োমেডিস এবং হেক্টর সহ বেশ কয়েকটি চরিত্র বীরত্বপূর্ণ উপায়ে অভিনয় করে।

হোমার
ইলিয়াড

ইলিয়াডের চরিত্রগুলো:

প্রেম ও বন্ধুত্ব, ভাগ্য ও স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি এবং সম্মান হল হোমারের দ্য ইলিয়াডের মূল বিষয়বস্তু।  তিনটি বিষয়ই এ মহাকাব্যের কাহিনি ও চরিত্রগুলো অনুসরণ করে বিকশিত হয়েছে।   অ্যাকিলিস তার প্রেম ও বন্ধুত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়েই ভাগ্যকে বরণ করে নিয়েছে।  মহাকাব্যের অন্যান্য প্রধান চরিত্রগুলোও প্রেম ও বন্ধুত্ব, ক্ষমা ও দায়িত্ববোধ, পারিবারিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারে  বিকশিত হয়েছে।

হোমারের ‘ইলিয়াড’ মহাকাব্যের প্রতিটি চরিত্র একদিকে যেমন প্রতিশোধস্পৃহায় উন্মত্ত আবার অন্যদিকে  মানবিক আবেগ, বীরত্ব, ক্রোধ ও ট্রাজিক পরিণতির এক অনন্য সংমিশ্রণে বিকশিত, চরিত্রগুলো তাদের  সফলতার মাপকাঠি কেবল জয় দিয়ে নয়, বরং মৃত্যুভয়হীন লড়াই এবং আত্মসম্মান দিয়ে নির্ধারণ করেছে।

প্রধান চরিত্র একিলিস তার ক্রোধের মাধ্যমে ধ্বংস আনলেও বীরত্বে শ্রেষ্ঠ, অন্যদিকে হেক্টর তার পরিবার ও ট্রয় রক্ষার প্রচেষ্টায় মানবিকতার প্রতীক হিসেবে সফল । এছাড়া আগামেমননের অহংকার,  প্যারিসের রূপতৃষ্ণা,  এবং প্রায়ামের শোকচরিত্র যুদ্ধকে গভীর মানবিক ট্রাজেডিতে রূপান্তর করেছে । 

ইলিয়াডের চরিত্রগুলোর সফলতার বিচার নিচে করা হলো:

ইলিয়াডে কাহিনি অপেক্ষা চরিত্র প্রাধান্য পেয়েছে। চরিত্রগুলো ঐতিহ্যসূত্রে পেলেও কবি নিজের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে নতুন করে সৃষ্টি করেছেন। এ জন্য আগামেমনন, মেনিলাস, হেলেন, প্যারিস, হেক্টর, প্রায়াম, ওডিসাস, নেস্টর, হেকুবা, এন্ড্রোমেকি ইত্যাদি নামেই পৌরাণিক, মূলত এগুলো কবির নিজস্ব অভিনব সৃষ্টি।

অ্যাকিলিস : গ্রিক বাহিনীর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। তার সফলতা তার অসামান্য শক্তি ও সাহসে, কিন্তু কিন্তু আগামেমনন এর আচরণ ও অহংকার অ্যাকিলিসকে ক্রোধান্বিত করে তোলে।  তার ক্রোধ (Wrath) গ্রিক বাহিনীর জন্য বিপর্যয় এবং হেক্টরের মৃত্যুর কারণ হয় ।

অ্যাকিলিস আত্মসম্মানবোধের জন্য যুদ্ধ থেকে বিরত থাকেছে আবার বন্ধুত্বের পরাকাষ্ঠা দেখাতে  পাটোক্লাসের মৃত্যুতে ফিরে আসা তাকে ব্যক্তিগত আবেগে পরিচালিত এক ট্রাজিক বীর করে তোলে ।

একিলিস ‘ইলিয়াড’ মহাকাব্যের প্রাণকেন্দ্র এবং বিশ্বসাহিত্যের প্রথম সার্থক ট্র্যাজিক হিরো।

আত্মসম্মান ও দম্ভ: একিলিসের চরিত্রে আত্মসম্মানবোধ অত্যন্ত প্রখর। আগামেমনন কর্তৃক তার যুদ্ধবন্দিনী ব্রিসিসকে ছিনিয়ে নেওয়াকে সে চরম অবমাননা হিসেবে দেখে। এই দম্ভ (Hybris) তাকে বিদ্রোহী করে তোলে।

ক্রোধ ও প্রতিহিংসা: কাব্যের মূল উপজীব্য হলো ‘একিলিসের ক্রোধ’। তার ক্রোধ তাকে এতইলিয়াড  – কেন ইলিয়াড শুধু যুদ্ধের গল্প নয়? বীরত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা ও ট্রাজেডির অমর মহাকাব্য

ইলিয়াড (Homer): যুদ্ধ, বীরত্ব ও ট্রাজেডির সংমিশ্রণে বিশ্বসাহিত্যের অমর মহাকাব্য

হোমারের ইলিয়াড কেবল যুদ্ধের কাহিনি নয়—এটি বীরত্ব, অহংকার, দেবতা ও মানুষের সংঘাত, প্রেম ও মৃত্যুর গভীর ট্রাজেডির অমর দলিল। ট্রয় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা এই মহাকাব্য আজও বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে পাঠককে মুগ্ধ করে।

হোমারের ‘ইলিয়াড’ অমর এক মহাকাব্য। যেখানে যুদ্ধ, বীরত্ব ও ট্রাজেডির এক মহাকাব্যিক রূপ দেখানো হয়েছে। , গ্রিক ও ট্রোজান পক্ষের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গ্রিক বীর অ্যাকিলিসের ক্রোধ, সম্মান এবং মানবিক পরিণতির চিত্র তুলে মহাকাব্যির কৌশলে তুলে ধরা হয়েছে।। ২৪টি সর্গে বিভক্ত এই মহাকাব্যটি ট্রয় নগরীর অবরোধ, বীরদের সাহস, ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ এবং ধ্বংসের বেদনাকে ফুটিয়ে তুলে পাঠককে শাশ্বত মানবিক সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড় করায়

কাহিনির বিবরণ

পৃথিবীর চারটি জাত মহাকাব্যের মধ্যে ইলিয়াড় ও ওডেসির রচয়িতা হোমার।  ইলিয়াড হোমারের রচিত প্রথম মহাকাব্য খ্রীষ্টপূর্ব ১২০০ থেকে ১৩০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে যা প্রায় ৩২০০ থেকে ৩৩০০ বছর পূর্বে রচিত। হোমারের ইলিয়াড মহাকাব্যটির মূল বিষয়বস্তু ট্রয়যুদ্ধ। আরো নির্দিষ্ট করে যদি বলি তা হচ্ছে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে চলা ট্রয় যুদ্ধের শেষের দিকের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে ইলিয়াড মহাকাব্যে। 

পূর্বে ট্রয় নগরীকে ইলিয়াম নামেই ডাকা হতো। ইলিয়াড শব্দটি এসেছে ইলিয়াম শব্দ থেকে। সেই ট্রয় নগরী ও ট্রয় যুদ্ধ গ্রীক হেলেনীয় সংস্কৃতির সাথে মিলেমিশে মানুষ ও দেবতার মিশেল তা রূপ নিয়েছে অসাধারন এক মহাকাব্যে।

পার্টার রাজা ম্যানেলাসের স্ত্রী হেলেনকে অপহরণ করে নিয়ে আসে ট্রয় রাজপুত্র প্যারিস। গ্রিক বাহিনী হাজারখানিক জাহাজ ও অসংখ্য সৈন্যসামন্ত নিয়ে ট্রয় নগরীর বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করে। দীর্ঘ নয় বছরের পরিশ্রমের পরেও গ্রীক বাহিনী ট্রয় নগরীর দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভাঙতে সক্ষম হয়নি। গ্রিক সৈন্য ও তাদের বাহিনীর প্রধান অ্যাগামেমনন ও কিছুটা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

দেবতাদের ষড়যন্ত্রে গ্রিক বাহিনীর মধ্যে প্লেগ ছড়িয়ে অ্যাগামেমননের দুশ্চিন্তার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়।  গ্রীক সেনা শিবিরে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়ে, ফলাফলস্বরূপ বহু গ্রিক সেনা মারা গেছে।  গ্রিক বাহিনী ট্রয় নগরের পাশের নগরগুলোতে হামলা করে তাদের সকল সম্পত্তি লুট করে এবং নারীদের নিজেদের লালসার বস্তুতে পরিণত করেছিল। দুই সুন্দরী নারী সাইস্রিস ও ব্রিসিসকে উপঢৌকন হিসেবে অ্যাগামেমনন ও অ্যাকিলিসকে দেওয়া হয়৷  

সাইস্রিস ছিল গ্রিক দেবতা অ্যাপোলোর মন্দিরের পুরোহিত সাইস্রেসের মেয়ে। সাইস্রিসকে ছাড়াতে ট্রয়ের রাজা প্রিয়াম অনেক উপঢৌকন পাঠালেও অ্যাগামেমনন সাইস্রিসকে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলাফলস্বরূপ বাধ্য হয়ে সাইস্রেস দেবতা অ্যাপোলোর মন্দিরে নিজের মেয়েকে যে প্রার্থনা করেন। দেবতা অ্যাপোলো নিজের একনিষ্ঠ ভক্তের কথা শুনেন এবং শাস্তিস্বরূপ গ্রীক সেনা শিবিরে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে দেন।

শেষ পর্যন্ত অ্যাগামেমনন সাইস্রিসকে মুক্ত করে দেন কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি অ্যাকিলিসের উপপত্নী বা প্রেমিকা ব্রিসিস কে গ্রহণ করেন। অ্যাকিলিস অ্যাগামেমননের উপর ক্রোধান্বিত হয়ে যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করেন। অ্যাকিলিস ছিলেন গ্রীকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। সে ছিল অপ্রতিরোধ্য এবং সে ছিলে সমুদ্র দেবী থেটিস ও রাজা পেলিয়াসের সন্তান।

অ্যাকিলিস যুদ্ধ  ত্যাগ করার গ্রিকরা যুদ্ধে পিছিয়ে যায় এবং ট্রোজনরা যুদ্ধে সুবিধা জনক অবস্থান নিয়ে নেয়। অ্যাকিলিস যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করায় গ্রিকরা অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়ে। অ্যাকিলিস যুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ায় অ্যাকিলিসের প্রিয় বন্ধু পেট্রোক্লাস অ্যাকিলিসের বর্ম পরিধান করে যুদ্ধের ময়দানে নেমে পড়ে।

লড়াইয়ের এক পর্যায়ে পেট্রোক্লাস মুখোমুখি হয় ট্রয় রাজপুত্র ও শ্রেষ্ঠ ট্রয় যোদ্ধা হেক্টরের। দুজনের মধ্যে তুমুল লড়াইয়ে হেক্টরের হাতে প্রাণ হারায় পেট্রোক্লাস।

অ্যাকিলিস প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকগ্রস্ত হয়ে পড়েন। হেক্টর কেবল তার প্রিয় বন্ধুকেই হত্যা করেননি, বরং হেক্টর অ্যাকিলিসের সুন্দর বর্মটিও ছিনিয়ে নিয়েছে। দেবী থেটিসের অনুরোধে দেবতারা অ্যাকিলিসের জন্য নতুন বর্ম তৈরি করে দেয়। অ্যাকিলিসের সেই বর্মে প্রদর্শিত ছিল পৃথিবী ও আকাশ, সাগর, সূর্য, পূর্ণচন্দ্র, নক্ষত্র ও হান্টার ও বাঘ; এগুলো সব ঘূর্ণায়মানভাবে দেখানো হয়েছে।

এছাড়াও, সেখানে ছিল দুই শহরের দৃশ্য, একটি শহরে দেখাচ্ছে লোকেরা উৎসব করছে, বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে। শিশুরা আনন্দে নৃত্য করছে। কৃষকরা ফসল ফলিয়ে আনন্দের হাসি হাসছে। অপরদিকের অন্য শহরে দেখাচ্ছে  সৈন্যরা লড়াই করছে, আশেপাশে পড়ে আছে বহু নিথর লাশ। আর চারাপশে সব ধ্বংসের চিহ্ন। হোমার এই বর্মের মাধ্যমে শুধু যুদ্ধের সরঞ্জাম নয়, বরং মানুষের জীবন, সমাজ, যুদ্ধ, শান্তি, আনন্দ, দুঃখ সবকিছুরই প্রতিফলন ঘটিয়েছ

বন্ধুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে অ্যাকিলিস যুদ্ধে যোগ দেয়। হেক্টরকে দ্বৈত যুদ্ধে আহ্বান করে। রাজা প্রিয়াম চায়নি হেক্টর অ্যাকিলিসের মুখোমুখি হোক। কেনন, নিশ্চিত মৃত্যু হবে হেক্টরের। তিনি জানেন অ্যাকিলিসের মুখোমুখি দাঁড়ানো মানেই তার প্রিয় সন্তান হেক্টরের মৃত্যু সুনিশ্চিত। হোমার এই অংশটায় এসে হেক্টর তার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে অসাধারণ এক আবেগময় দৃশ্যের সৃষ্টি করেছেন।

হেক্টর বীর, দেশ ও পরিবারের জন্য নিবেদিত।  স্ত্রী,সন্তান, পিতা-মাতা ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বশীল হেক্টর অ্যাকিলিসের বিরুদ্ধে দ্বৈতযুদ্ধে অংশ নেন। অ্যাকিলিসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পেড়ে ওঠা  অসম্ভব। কেননা, অ্যাকিলিস অর্ধেক দেবতা ও অর্ধেক মানুষ; সেই সাথে সে দেবতাদের বিশেষ আশীর্বাদ পুষ্ট। লড়াইয়ে হেক্টর হেরে যায়। মৃত্যুর আগে হেক্টর অ্যাকিলিসকে অনুরোধ করেছিল, তাকে হত্যার পর তার দেহ যেন তার নগরবাসীর হাতে হস্তান্তর করে। যেন তারা হেক্টরের শেষকৃত্য করতে পারে। 

অ্যাকিলিস হেক্টরের কথা শুনেনি। প্রতিশোধের নেশায় অ্যাকিলিস ছিল বিবেকহীন, ও ভয়াবহরকম নিষ্ঠুর।  অ্যাকিলিস হেক্টরের মৃতদেহ ঘোড়ার পেছনে বেঁধে গ্রিক শিবিরের চারদিকে ঘোরায়। হেক্টরের মৃতদেহের উপর চালানো অমানবিক  কর্মকান্ডকে  হোমার  দেখিয়েছিলেন যুদ্ধের অমানবিক ও নিষ্ঠুর বর্বরতাকে। 

নিজ পুত্রের মৃতদেহের উপর এরকম অমানবিক আচরণে রাজা প্রিয়াম সহ্য করতে না পেরে তিনদিন পর মধ্যরাতে ট্রয়ের রাজা প্রিয়াম লুকিয়ে অ্যাকিলিসের শিবিরে প্রবেশ করেন। তিনি অ্যাকিলিসকে বিনীত অনুরোধ করেন, যেন সে তার সন্তান হেক্টরের মৃতদেহ ফিরিয়ে দেয়। অ্যাকিলিস মানবিক দিক বিবেচনা করে বৃদ্ধ রাজাকে তার মৃত সন্তানের দেহ হস্তান্তর করেন। ট্রয় নগরবাসী ও রাজা প্রিয়াম হেক্টরের জন্য এক রাজকীয় শেষকৃত্যের আয়োজন করেন। হেক্টরের শেষকৃত্য ও ট্রয় নগরীর শোকাহত দৃশ্যের মাধ্যমেই হেমারের ইলিয়াড মহাকাব্যের সমাপ্তি ঘটেছে।

গল্পটি দৃশ্যত একটি যুদ্ধ সম্পর্কে, এটি প্রকৃতপক্ষে বীরত্ব, সম্মান, অমরত্ব এবং ভাগ্যের গ্রীক ধারণা সম্পর্কে । অ্যাকিলিস, প্যাট্রোক্লাস, ডায়োমেডিস এবং হেক্টর সহ বেশ কয়েকটি চরিত্র বীরত্বপূর্ণ উপায়ে অভিনয় করে।

ইলিয়াডের চরিত্রগুলো:

প্রেম ও বন্ধুত্ব, ভাগ্য ও স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি এবং সম্মান হল হোমারের দ্য ইলিয়াডের মূল বিষয়বস্তু।  তিনটি বিষয়ই এ মহাকাব্যের কাহিনি ও চরিত্রগুলো অনুসরণ করে বিকশিত হয়েছে।   অ্যাকিলিস তার প্রেম ও বন্ধুত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়েই ভাগ্যকে বরণ করে নিয়েছে।  মহাকাব্যের অন্যান্য প্রধান চরিত্রগুলোও প্রেম ও বন্ধুত্ব, ক্ষমা ও দায়িত্ববোধ, পারিবারিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারে  বিকশিত হয়েছে।

হোমারের ‘ইলিয়াড’ মহাকাব্যের প্রতিটি চরিত্র একদিকে যেমন প্রতিশোধস্পৃহায় উন্মত্ত আবার অন্যদিকে  মানবিক আবেগ, বীরত্ব, ক্রোধ ও ট্রাজিক পরিণতির এক অনন্য সংমিশ্রণে বিকশিত, চরিত্রগুলো তাদের  সফলতার মাপকাঠি কেবল জয় দিয়ে নয়, বরং মৃত্যুভয়হীন লড়াই এবং আত্মসম্মান দিয়ে নির্ধারণ করেছে।

প্রধান চরিত্র একিলিস তার ক্রোধের মাধ্যমে ধ্বংস আনলেও বীরত্বে শ্রেষ্ঠ, অন্যদিকে হেক্টর তার পরিবার ও ট্রয় রক্ষার প্রচেষ্টায় মানবিকতার প্রতীক হিসেবে সফল । এছাড়া আগামেমননের অহংকার,  প্যারিসের রূপতৃষ্ণা,  এবং প্রায়ামের শোকচরিত্র যুদ্ধকে গভীর মানবিক ট্রাজেডিতে রূপান্তর করেছে । 

ইলিয়াডের চরিত্রগুলোর সফলতার বিচার নিচে করা হলো:

ইলিয়াডে কাহিনি অপেক্ষা চরিত্র প্রাধান্য পেয়েছে। চরিত্রগুলো ঐতিহ্যসূত্রে পেলেও কবি নিজের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে নতুন করে সৃষ্টি করেছেন। এ জন্য আগামেমনন, মেনিলাস, হেলেন, প্যারিস, হেক্টর, প্রায়াম, ওডিসাস, নেস্টর, হেকুবা, এন্ড্রোমেকি ইত্যাদি নামেই পৌরাণিক, মূলত এগুলো কবির নিজস্ব অভিনব সৃষ্টি।

অ্যাকিলিস : গ্রিক বাহিনীর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। তার সফলতা তার অসামান্য শক্তি ও সাহসে, কিন্তু কিন্তু আগামেমনন এর আচরণ ও অহংকার অ্যাকিলিসকে ক্রোধান্বিত করে তোলে।  তার ক্রোধ (Wrath) গ্রিক বাহিনীর জন্য বিপর্যয় এবং হেক্টরের মৃত্যুর কারণ হয় ।

অ্যাকিলিস আত্মসম্মানবোধের জন্য যুদ্ধ থেকে বিরত থাকেছে আবার বন্ধুত্বের পরাকাষ্ঠা দেখাতে  পাটোক্লাসের মৃত্যুতে ফিরে আসা তাকে ব্যক্তিগত আবেগে পরিচালিত এক ট্রাজিক বীর করে তোলে ।

একিলিস ‘ইলিয়াড’ মহাকাব্যের প্রাণকেন্দ্র এবং বিশ্বসাহিত্যের প্রথম সার্থক ট্র্যাজিক হিরো।

আত্মসম্মান ও দম্ভ: একিলিসের চরিত্রে আত্মসম্মানবোধ অত্যন্ত প্রখর। আগামেমনন কর্তৃক তার যুদ্ধবন্দিনী ব্রিসিসকে ছিনিয়ে নেওয়াকে সে চরম অবমাননা হিসেবে দেখে। এই দম্ভ (Hybris) তাকে বিদ্রোহী করে তোলে।

ক্রোধ ও প্রতিহিংসা: কাব্যের মূল উপজীব্য হলো ‘একিলিসের ক্রোধ’। তার ক্রোধ তাটাই অন্ধ করে যে, সে নিজ বাহিনীর পরাজয় কামনা করে। বন্ধু প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যুতে এই ক্রোধ হেক্টরের প্রতি হিংস্র প্রতিহিংসায় রূপ নেয়।

অন্তর্দ্বন্দ্ব: তার চরিত্রে ব্যক্তিগত সম্মান এবং বীরধর্মের মধ্যে তীব্র টানাপোড়েন বিদ্যমান। সে একদিকে অজেয় বীর, অন্যদিকে আবেগের কাছে বন্দি এক মানুষ।

মানবিক উত্তরণ: কাব্যের শেষে একিলিসের চরিত্রে এক বিরাট পরিবর্তন আসে। বৃদ্ধ রাজা প্রায়ামের প্রতি দয়া প্রদর্শন এবং হেক্টরের দেহ ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তার দম্ভ প্রশমিত হয় এবং সে প্রকৃত মহত্ত্ব ও মনুষ্যত্বের মহিমায় স্থিত হয়।

হেক্টর : ট্রোজানদের  পক্ষের প্রধান যোদ্ধা। পারিবারিক ও রাজনৈতিকভাবে দায়িত্বে আবদ্ধ।  সে কেবল বীর নয়, বরং দেশপ্রেমিক ও দায়িত্বশীল স্বামী-পিতা। হেক্টর হীনম্মন্যতাহীন লড়াইয়ের প্রতীক, ভাগ্যের পরিণাম জেনেও ট্রয় রক্ষার জন্য লড়েছেন, এদিক থেকে হেক্টর  অধিক মানবিক ও সফল চরিত্র হিসেবে বিকশিত।

হেক্টর ট্রয়ের প্রধান সেনাপতি এবং একিলিসের ‘প্রতিনায়ক’। তাকে এমন এক চরিত্র হিসেবে আঁকা হয়েছে যাকে ভালো না বেসে পারা যায় না।

নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম ও কর্তব্যবোধ: হেক্টর জানেন ট্রয়ের ধ্বংস অনিবার্য, তবুও তিনি দেশ, পরিবার ও অধিবাসীদের রক্ষার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তার লড়াই ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, বরং কর্তব্যের টানে।

স্নেহপ্রবণ স্বামী ও পিতা: হেক্টর চরিত্রে বীরত্বের পাশাপাশি এক কোমল হৃদয় রয়েছে। স্ত্রী এন্ড্রোমাকির ভবিষ্যৎ নিয়ে তার উদ্বেগ এবং শিশুপুত্র এস্টিয়ানক্সের জন্য তার প্রার্থনা তাকে একজন শ্রেষ্ঠ পারিবারিক মানুষ হিসেবে তুলে ধরে।

ভয় ও সাহসের সমন্বয়: হেক্টর দেবতা বা অতিমানব নন, তিনি সম্পূর্ণ মানুষ। একিলিসকে দেখে তিনি প্রথমে ভয় পেয়ে নগর-প্রাচীর প্রদক্ষিণ করে পালিয়েছিলেন। কিন্তু পরক্ষণেই সেই ভয় জয় করে বীরের মতো মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন।

উন্মাদনা ও ভুল (Hybris): জয়ের নেশায় একসময় তিনিও অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। পলিডামাসের সঠিক পরামর্শ উপেক্ষা করে তিনি ট্রজানদের বিপদে ফেলেছিলেন, যার জন্য তিনি পরে অনুশোচনাও করেছেন।

জাতীয় ট্র্যাজিক বীর: হেক্টরের ট্র্যাজেডি কেবল তার নিজের নয়, সমগ্র ট্রয় নগরীর। তার মৃত্যু মানেই ট্রয়ের পতন। তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অগৌরবের চেয়ে গৌরবময় মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করেছেন।

আগামেমনন: গ্রিক বাহিনীর নেতা। তার সফলতা তার উচ্চতর পদমর্যাদায়, কিন্তু তার অহংকার ও একিলিসের কাছ থেকে প্রিসেসকে (Briseis) কেড়ে নেওয়া মহাকাব্যের মূল ট্রাজিক দ্বন্দ্ব তৈরি করে ।

প্রায়াম:  ট্রয়ের বৃদ্ধ রাজা। যুদ্ধের ভয়াবহতায় সন্তানদের হারিয়েও তার ধৈর্য এবং হেক্টরের দেহ উদ্ধারে অ্যাকিলিসের কাছে গিয়ে ভিক্ষা চাওয়া তার চরিত্রকে এক মানবিক ও করুণ সফলতায় পৌঁছে দেয় ।

রাজা প্রায়াম (Priam): শোকাতুর পিতৃত্বের করুণ প্রতিচ্ছবি

ট্রয়রাজ প্রায়াম এক বিষাদ-করুণ চরিত্র, যার ঐশ্বর্য থাকলেও ভাগ্য ছিল নির্মম।

বিষাদময় ব্যক্তিত্ব: জরাজীর্ণ বয়সে তাকে দেখতে হয়েছে নিজের চোখের সামনে বীর সন্তানদের মৃত্যু এবং ট্রয়ের আসন্ন ধ্বংস। তিনি নিয়তিকে প্রত্যক্ষ করেও তা রোধ করতে অক্ষম।

সন্তানবৎসল পিতা: হেক্টরই ছিল তার সকল আশা-ভরসার নিদান। হেক্টরের মৃত্যুতে তার গোময়-স্তূপে গড়াগড়ি দিয়ে বিলাপ করা এবং শোকাতুর অবস্থা পাঠকের চোখে জল আনে।

সীমাহীন সাহস ও বিনয়: পুত্রহন্তা একিলিসের শিবিরে একাকী যাওয়ার সাহস তিনি দেখিয়েছেন। সেখানে একিলিসের জানু জড়িয়ে ধরা এবং পুত্রের মৃতদেহের জন্য তার হাত চুম্বন করা জগতের ইতিহাসে এক বিরল ও করুণ দৃশ্য।

মানসিক ভারসাম্যহীনতা: হেক্টরের মৃত্যুতে তিনি এতটাই শোকে মুহ্যমান ছিলেন যে, পথে জনতাকে অহেতুক তিরস্কার করে এবং নিজের সন্তানদেরও ভর্ৎসনা করে সাময়িক মানসিক ভারসাম্য হারানোর পরিচয় দিয়েছেন।

প্যাট্রোক্লাস (Patroclus): একিলিসের মানবিক প্রতিভূ

প্যাট্রোক্লাস একিলিসের প্রিয় বন্ধু এবং তার চরিত্রের এক অনন্য অংশ।

মানবিকতাবোধ: একিলিস যখন রাগে যুদ্ধ থেকে দূরে ছিলেন, তখন একিয়ানদের দুর্দশা দেখে প্যাট্রোক্লাস স্থির থাকতে পারেননি। তার হৃদয়ে সাধারণ সৈন্যদের প্রতি গভীর অনুকম্পা ছিল।

একিলিসের পরিপূরক: প্যাট্রোক্লাস একিলিস চরিত্রের সেই মানবিক দিকটি ফুটিয়ে তোলেন যা ক্রোধের কারণে আচ্ছন্ন ছিল। তার যুদ্ধের অনুমতি চাওয়া প্রমাণ করে যে একিলিসের মনও ভেতরে ভেতরে নরম হচ্ছিল।

বীরত্ব ও ট্র্যাজেডি: তিনি অসীম সাহসের সাথে লড়াই করে হেক্টরের হাতে প্রাণ দেন। তার এই মৃত্যুই মূলত একিলিসকে পুনরায় যুদ্ধে ফিরিয়ে আনে।

জটিল মনস্তত্ত্ব: লেখকের মতে, একিলিস অবচেতন মনে হয়ত প্যাট্রোক্লাসের পরাজয় চেয়েছিলেন যাতে তার নিজের অপরিহার্যতা প্রমাণিত হয়। ফলে প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যু ছিল একিলিসের দম্ভের চরম মূল্য।

আগামেমনন (Agamemnon)-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য

আগামেমনন একজন ক্ষমতাশালী রাজা হওয়া সত্ত্বেও তার চরিত্রের কিছু মৌলিক ছিদ্র বা ত্রুটি তাকে সমালোচিত করেছে। তার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

১. ঔদ্ধত্য ও হঠকারিতা

আগামেমনন অত্যন্ত একগুয়ে ও উদ্ধত স্বভাবের। দেবতা অ্যাপোলোর পুরোহিত ক্রাইসেস তার কন্যার মুক্তির জন্য প্রচুর মুক্তিপণ নিয়ে এলেও, আগামেমনন তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। তার এই হঠকারিতার কারণেই গ্রিক শিবিরে মড়ক ও বিপর্যয় নেমে আসে।

২. লোভ ও স্বার্থপরতা

তার চরিত্রে নৈতিক বলের অভাব ছিল। পরিস্থিতির চাপে যখন তিনি নিজের বন্দিনীকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন, তখন ক্ষতিপূরণ হিসেবে তিনি একিলিসের যুদ্ধ-বন্দিনী ব্রিসিসকে জোর করে ছিনিয়ে নেন। তার এই হঠকারী ও স্বার্থপর সিদ্ধান্তের কারণেই একিলিস যুদ্ধ ত্যাগ করেন, যা গ্রিকদের চরম বিপদে ফেলে।

৩. দম্ভ ও আত্মবিশ্বাসের অভাব

তিনি প্রায়ই দম্ভ প্রকাশ করতেন যে একিলিস ছাড়াও তিনি যুদ্ধ জয় করতে পারবেন। কিন্তু এই দম্ভের পেছনে লুকিয়ে ছিল এক গভীর সংশয় ও ভীরুতা। বীর ডায়োমিডিস তাকে বিদ্রূপ করে বলেছিলেন যে, জিউস তাকে রাজদণ্ড দিলেও যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় ‘সাহস’ দেননি।

৪. মানসিক অস্থিরতা ও দ্বিধা

আগামেমনন ছিলেন অত্যন্ত অস্থিরচিত্ত ও অপরিণামদর্শী। যুদ্ধে সামান্য বিপর্যয় ঘটলেই তিনি হতাশায় ভেঙে পড়তেন এবং যুদ্ধ ছেড়ে পালানোর কথা ভাবতেন। তার মধ্যে রণক্ষেত্রে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো মানসিক স্থৈর্যের অভাব ছিল।

৫. অনুশোচনা ও ভুল স্বীকার

চরিত্রের এত নেতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও, পরবর্তীকালে তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। একিয়ানদের সভায় তিনি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেন যে, একিলিসের প্রতি তিনি অন্যায় করেছেন। একিলিসের ক্রোধ শান্ত করতে তিনি উপঢৌকন ও সন্ধির প্রস্তাব পাঠান, যা তার চরিত্রের নমনীয় দিকটি ফুটিয়ে তোলে।

৬. ভ্রাতৃপ্রেম (মানবিক গুণ)

আগামেমননের চরিত্রের সবচাইতে উজ্জ্বল ও মানবিক দিক হলো তার ভাই মেনিলাসের প্রতি গভীর মমতা। মেনিলাস আহত হলে তিনি যে তীব্র ব্যাকুলতা এবং আর্তনাদ প্রকাশ করেন, তা তার রূঢ় আচরণের আড়ালে থাকা এক দরদী হৃদয়ের পরিচয় দেয়।

ইতিবাচক দিকনেতিবাচক দিক
গভীর ভ্রাতৃপ্রেম (মেনিলাসের প্রতি)একগুয়েমি ও হঠকারিতা
ভুল স্বীকার করার মানসিকতালোভ ও প্রবল স্বার্থপরতা
শৃঙ্খলার প্রতি সচেতনতামানসিক অস্থিরতা ও সাহসের অভাব

ওডিসিস: চতুর ও বুদ্ধিদীপ্ত যোদ্ধা। তার সফলতা তার কূটনীতি এবং বিচক্ষণতায়, যা গ্রিক শিবিরে শান্তি বজায় রাখতে ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিতে সাহায্য করে ।

দেবতারা (যেমন- জিউস, এথেনা, অ্যাপোলো): চরিত্রগুলোর সফলতায় দেবতাদের ভূমিকা অপরিসীম। তারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়ে নিজ পক্ষের যোদ্ধাদের সাহায্য করেন, যা যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ।

নারী চরিত্রগুলোর বৈশিষ্ট্য

১. হেলেন (Helen): সৌন্দর্য ও আত্মগ্লানির প্রতীক

হেলেন বিশ্বের সুন্দরীশ্রেষ্ঠা, যার সৌন্দর্যকে দেবীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তার চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

সৌন্দর্যের অভিশাপ: তার রূপই ছিল ট্রয় যুদ্ধের মূল কারণ। কিন্তু এই সৌন্দর্য তাকে সুখ দেয়নি, বরং চিরস্থায়ী কলঙ্ক ও মানসিক যন্ত্রণা দিয়েছে।

তীব্র আত্মগ্লানি ও অনুশোচনা: হেলেনের মধ্যে গভীর পাপবোধ কাজ করে। সে নিজেকে ‘লজ্জাহীনা’, ‘দুষ্টমনা’ এবং ‘ঘৃণ্য জীব’ বলে ধিক্কার দেয়। তার ব্যভিচারের ফলে যে ধ্বংসলীলা চলছে, তার জন্য সে নিজেকেই দায়ী মনে করে।

অন্তর্দ্বন্দ্ব: একদিকে তার ফেলে আসা স্বদেশ ও প্রাক্তন স্বামী মেনিলাস, অন্যদিকে বর্তমান জীবনের মোহ ও প্যারিসের প্রতি ঘৃণা—এই দুইয়ের মধ্যে সে প্রতিনিয়ত জর্জরিত। প্যারিসের কাপুরুষতা তাকে ব্যথিত করে, তবুও সে তার মোহ কাটাতে পারে না।

২. এন্ড্রোম্যাকি (Andromache): পতিব্রতা ও মমতাময়ী নারী

এন্ড্রোম্যাকি হলো শাশ্বত ভারতীয় বা প্রাচ্য নারীত্বের মতো এক স্নেহময়ী রূপ। তার বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

পারিবারিক নির্ভরতা: এন্ড্রোম্যাকির বাবা ও সাত ভাইকে একিলিস হত্যা করেছে। তাই তার কাছে স্বামী হেক্টরই সব—পিতা, মাতা এবং ভাই।

ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা: সে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও দূরদর্শী। সে বুঝতে পেরেছিল হেক্টরের বীরত্বই তার ধ্বংস ডেকে আনবে এবং সে নিজে বিধবা ও সন্তান অনাথ হবে। এই আশঙ্কায় সে হেক্টরকে যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত করতে চেয়েছে।

গভীর শোক: হেক্টরের মৃত্যুতে তার বিলাপ অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। স্বামীর মৃতদেহ দেখে তার জ্ঞান হারানো এবং পরবর্তী বিলাপ কেবল একজন স্ত্রীর নয়, বরং এক সর্বস্বান্ত নারীর আর্তনাদ।

৩. হেকুবা (Hecuba): শাশ্বত মাতৃত্বের স্বরূপ

ট্রয়রাজ প্রায়ামের স্ত্রী এবং হেক্টরের মা হেকুবা চরিত্রটি চিরন্তনী মাতৃত্বের প্রতিচ্ছবি।

সন্তানবৎসল: হেকুবা সর্বদা সন্তানের অমঙ্গল আশঙ্কায় অস্থির থাকেন। হেক্টরকে একিলিসের সামনে যেতে দেখে তিনি যে স্তন তুলে ধরে মাতৃত্বের দোহাই দিয়ে মিনতি করেন, তা মহাকাব্যের অন্যতম শক্তিশালী দৃশ্য।

ঘৃণা ও প্রতিহিংসা: পুত্রের হত্যাকারী একিলিসের প্রতি তার প্রবল ঘৃণা। তিনি এতটাই ক্ষিপ্ত যে একিলিসের কলিজা চিবিয়ে খাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ করেন।

স্বামীর প্রতি উদ্বেগ: বৃদ্ধ স্বামী প্রায়াম যখন হেক্টরের লাশ আনতে একিলিসের শিবিরে যেতে চান, তখন তিনি বাধা দেন। তার এই নিঃসঙ্গ জীবনে স্বামীই ছিল একমাত্র অবলম্বন।

চরিত্রপ্রধান বৈশিষ্ট্যজীবনের ট্র্যাজেডি
হেলেনসৌন্দর্য ও বিলাপনিজের রূপের কারণে যুদ্ধ ও সামাজিক ঘৃণা।
এন্ড্রোম্যাকিপ্রেম ও আনুগত্যস্বামীকে হারিয়ে দাসীবৃত্তি ও অনাথ সন্তানের ভবিষ্যৎ।
হেকুবামাতৃত্ব ও মমতাচোখের সামনে বীর সন্তানদের মৃত্যু ও লাঞ্ছনা দেখা।

ইলিয়াড মহাকাব্য রহস্যে মোড়া এক সাহিত্য-ধাঁধাঁ। হাজার হাজার বছর ধরে সারা পৃথিবী ব্যস্ত এর সাহিত্যরস উন্মোচনে। ইলিয়াড রচনার মধ্যে দিয়েই পাশ্চাত্য সাহিত্যের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। দেবতাদের মহিমার আবরণ থেকে বের হয়ে মানুষের জয়গাথা শুরু ইলিয়াড থেকে।

শুরুটা দেবদেবীর ছলাকলা দিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত মানবসত্তার বহিঃপ্রকাশ দিয়ে কাব্যটি শেষ হয়। সাহিত্য , ইতিহাস, ধর্ম, রাজনীতি, বিজ্ঞান, প্রেম, বিরহ, বীরত্ব, কলহ, কাম, ক্রোধ, কাপুরুষতা, ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র, মহামারী, অপত্যস্নেহ, সবই আছে এ মহাকাব্যে।। সবকিছুকে ছাপিয়ে এই মহাকাব্য অমর সৃষ্টি। সাহিত্যের সত্যিকার রসাস্বাদনে ইলিয়াডের কোনো বিকল্প নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *