সংজ্ঞা বা কাকে বলে?

‘উপমা’ শব্দটি সাধারণত তুলনা অর্থেই বেশি পরিচিত। সংস্কৃতে এ অলঙ্কারের যে সংজ্ঞা তার মধ্যে এর আসল পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন- “যে-বস্তু সে-বস্তু নয় (তবু) সেই বস্তুর মতন।” আধুনিককালে এসেও উপমা হলো- “দুই বিজাতীয় বস্তুর মধ্যে সাদৃশ্য আবিষ্কারের ফলে যে চমৎকৃতি, তা-ই।”

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক উপাদান।

এটি পাঠককে গভীর ভাবনায় সমৃদ্ধ করে।

এটি হলো দুটি বিজাতীয় বস্তুর মধ্যে তুলনা। বস্তু দুটোর মধ্যে বিভিন্ন দিক থেকে অনেক পার্থক্য থাকতে পারে।। কিন্তু এ অলঙ্কারে সে পার্থক্য উল্লেখ করা হয় না। শুধু উল্লেখ থাকে মিল বা সাদৃশ্যের কথা। তাহলে বলা যায়-
“একই বক্তব্যে পরস্পর পৃথক ও বিসদৃশ বস্তুদুটির মধ্যে কোন সাধারণ সাদৃশ্য বা সাম্যের ভিত্তিতে যে সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়, তার নাম উপমা।” যেমন-

এটি সাহিত্যকে অলঙ্কৃত করে এবং আবেগী করে তোলে।

“জনগনে যারা জোঁক-সম শোষে তারে মহাজন কয়।”
বা
“কাকের চোখের মত কালো চুল।”
এখানে ‘মহাজন’/‘চুল’-উপমেয়’‘জোঁক’/‘কাকের চোখ’-উপমান/এরা পরস্পর আলাদা। তবু তাদের মধ্যে একটা দিক থেকে মিল খুঁজে সৌন্দর্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই এটিি উক্ত অলঙ্কার।

সাহিত্যের সৌন্দর্যবর্ধনের অন্যতম উপায় হলো অলঙ্কার। আর বাংলা অলঙ্কারের অন্যতম শাখা হলো আলোচ্য অলঙ্কারটি । সাধারণত, কোনো বস্তুর সঙ্গে আরেকটি বস্তুর সাদৃশ্য বা মিল দেখিয়ে যে রূপকল্প বা অলঙ্কার তৈরি হয়, তখনই এ অলঙ্কারের জন্ম হয়। অর্থাৎ একটি বস্তুকে আরেকটি বস্তুর সাথে তুলনা করে বক্তব্যকে সুস্পষ্ট, চিত্রময় ও কাব্যিক করে তোলাই এর কাজ।

এর সংজ্ঞাটি বুঝতে হলে এর প্রকারভেদ জানা প্রয়োজন।

 সহজভাবে বলতে গেলে, “যেখানে তুলনা আছে, সেখানেই এ অলঙ্কারের উদ্ভব। “

সংজ্ঞা:
যেখানে উপমান (যাকে তুলনা করা হচ্ছে) এবং উপমেয় (যার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে) — এ দুয়ের মধ্যে কোনো একটি বিশেষ সাদৃশ্য নির্দেশ করা হয় এবং সেই তুলনা প্রকাশিত হয়, তাকে উক্ত অলঙ্কার বলে।

এটি হয়তো কিছু ক্ষেত্রে অস্পষ্ট, কিন্তু এর গুরুত্ব অপরিসীম।

এটি সাহিত্যিক রচনায় বিশেষ একটি স্থান অধিকার করে।

এটি তৈরি করতে হলে আমাদের সৃজনশীল হতে হবে।

এ অলঙ্কার পাঠককে গভীর অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত করে।

এ অলঙ্কার দিয়ে আমরা আমাদের ভাব প্রকাশের নতুন পথ খুলতে পারি।

এটি আমাদের ভাষাকে আরো সমৃদ্ধশালী করে।

 উদাহরণ:
“তুমি যেন চাঁদের আলো”
এখানে ‘তুমি’ উপমেয়, ‘চাঁদের আলো’ উপমান, আর ‘যেন’ তুলনাবাচক শব্দ।

এ অলঙ্কার সাহিত্যকে আরও চিত্তাকর্ষক করে তোলে।

প্রকারভেদ

১. পূর্ণোপমা: যে উপমায় উপমেয়, উপমান, সাধারণ ধর্ম ও তুলনাবাচক শব্দ এই চারটি অঙ্গই সুস্পষ্টভাবে উল্লেখিত থাকে, তাকে পূর্ণোপমা বলে। যেমন-

“রোদের নরম রঙ শিশুর গালের মত লাল।”

উপমেয়-রোদের নরম রঙ; উপমান-শিশুর গাল; সাধারণ ধর্ম-লাল; তুলনাবাচক শব্দ-মত। উক্ত অলঙ্ককারের চারটি অঙ্গই এখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব, এটি পূর্ণোপমা।

২. লুপ্তোপমা: যেখানে উপমেয় ছাড়া অঙ্গদুলোর অন্য যে কোন একটি, দুটি এমনকি তিনটি অঙ্গই লুপ্ত থাকে লুপ্তোপমা বলে।
যেমন “পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।”
এখানে উপমেয়- চোখ, উপমান- পাখির নীড়, তুলনাবাচক শব্দ- মত, কিন্তু সাধারণ ধর্মের কোনো উল্লেখ এখানে নেই।
“ অগাধ বারিধি মসীকৃষ্ণ”। এখানে অগাধ- বারিধি– উপমেয়, মসী– উপমান, কৃষ্ণ- সাধারণ ধর্ম। কিন্তু তুলনাবাচক শব্দ এখানে নেই।

৩. মালোপমা: যে অলঙ্কারে একটি মাএ উপমেয়ের জন্য একাধিক উপমানের ব্যবহার করা হয়, তাকে মালোপমা বলে। (অর্থাৎ উপমেয়ের গলায় উপমানের মালা)।
যেমন- “তোমার সে চুল জড়ানো সূতার মত, নিশীথের মেঘের মতন।” বুদ্ধদেব বসু।

এখানে উপমেয় –চুল , উপমান হলো- সূতা ও নিশীথের মেঘ। অর্থাৎ উপমেয় চুলের উপমান দুইটি – সুতো, নিশীথের মেঘ।

৪. বস্তু- প্রতিবস্তুভাবের তুলনাবাচক অলঙ্কার: যদি এ ধরনের অলঙ্কারে সাধারণ ধর্ম ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় প্রকাশ কার হয় বস্তু- প্রতিবস্তু।

যেমন- “ ওই সবুজ স্বচ্ছ জল সাপের চিকন দেহের মতো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এখানে, উপমেয়- জল, উপমান- সাপের দেহ, তুলনাবাচক শব্দ মতো এবং সাধারণ ধর্ম- সবুজ স্বচ্ছ ও চিকন। সবুজ স্বচ্ছ ও চিকন ভিন্ন ভাষা, কিন্তু অর্থ ঝকঝকে। তাই উক্ত শব্দদুটি বস্ত- প্রতিবস্তু

৫. বিম্ব-প্রতিবিম্বভারের উপমা: উপমেয় ও উপমানের ধর্ম যদি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়, অথচ তাদের মধ্যে একটা সূক্ষ মিল দেখা যায়, তবে ঐ ধর্ম দুটিকে বলা হয় বিম্ব-প্রতিবিম্বভাবের-উপমা।


“ আগুনে যেমন সব বিষ যায়, প্রেমেও তেমনি সকলি শুচি।

প্রেম’ ও ‘আগুন’ উপমেয় ও উপমান, ‘আগুন’ সব কিছুকে পুড়িয়ে শুদ্ধ করে। প্রেমও হৃদয়ে আগুন জ্বেলে মনকে শুদ্ধ করে। তেমনি- ‘সব বিষ যায়’, ও ‘সকলি শুচি’- ধর্ম দুটি বাহ্যিকভাবে আলাদা হলেও একটা সূক্ষ মিল এদের মধ্যেও রয়েছে। এটি বিম্ব প্রতিবিম্ব ভাবের তুলনা।

৬. স্মরণোপমা: কোনো বস্তু দেখে যদি সেরকম অন্য কোনো বস্তুর স্বৃতি জাগে, তবে তাকে স্মরণোপমা বলে।
যেমন- কালো জল ঢালিতে সই কালা পড়ে মনে,
এখানে কালো রঙের জল ঢালতে গিয়ে রাধার কৃষ্ণের কৃষ্ণরূপ মনে পড়ে গেল। তাই এটি স্মরণোপমা।

এর অঙ্গসমূহ:

এটি সাদৃশ্য অলঙ্কারের অন্তর্গত। সাদৃশ্যমূলক অলঙ্কারের চারটি অঙ্গ। সেহেতু এ তুলনাবাচক অলঙ্কারেও প্রধান অঙ্গ চারটি অঙ্গ চারটি হলো-   

১. উপমেয় – যাকে তুলনা করা হয়।
২. উপমান – যার সঙ্গে তুলনা করা হয়।
৩. সাধারণ ধর্ম – যে মিলের কারণে তুলনা করা হয়।
৪.  তুলনাবাচক শব্দ – যেমন: যেন, মতো, সদৃশ, অনুরূপ, প্রভৃতি।

এ অলঙ্কারের আরও কতিপয় প্রকারভেদ:

বাংলা সাহিত্যে এ অলঙ্কারের নানান প্রকার পাওয়া যায়। উপর্যুক্ত আলোচিত প্রকারভেদ ছাড়াও নিম্নে কিছু উল্লেখ করা গেল।

১. সাধারণ

যেখানে সরলভাবে তুলনা করা হয়।
 উদাহরণ: সে বাঘের মতো সাহসী।

২. উপমিত

যেখানে একটির সঙ্গে আরেকটির মিল দেখানো হয় এবং দু’টিই সমানভাবে প্রকাশিত হয়।
 উদাহরণ: সে যেমন দয়ালু, তেমনি সে উদার।

এ অলঙ্কারের প্রয়োগের মাধ্যমে লেখক তার ভাবনা সহজে প্রকাশ করতে পারে।

৩. অব্যক্ত বা নিহিত

যেখানে তুলনাবাচক শব্দ ব্যবহার করা হয় না, কিন্তু তুলনা অন্তর্নিহিত থাকে।
 উদাহরণ: “চাঁদের হাসি তোমার মুখে।”

৪. অতিশয়োক্তি

যেখানে তুলনাকে বাড়িয়ে অতিরঞ্জিতভাবে প্রকাশ করা হয়।
 উদাহরণ: তার চোখ দুটি যেন সমুদ্রের মতো গভীর।

৫. উপমেয়র গলায় উপমানের -মালা

এটি হল সাহিত্য রচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এটি লেখকদের জন্য একটি সশক্ত হাতিয়ার।

এটি আমাদের ভাব প্রকাশে নতুন মাত্রা এনে দেয়।

যেখানে একসাথে একাধিক উপমান ব্যবহার করা হয়।
 উদাহরণ: সে যেন ফুলের মতো কোমল, সিংহের মতো সাহসী, আর নদীর মতো প্রশান্ত।

এ অলঙ্কারটি সাধারণত মৌলিক ভাবনা প্রকাশে ব্যবহৃত হয়।

এটি লেখার প্রক্রিয়াকে মসৃণ করে তোলে।

৬. উপমানের-শৃঙ্খল

যেখানে এক তুলনা থেকে আরেকটি তুলনার সূত্র ধরে এগিয়ে চলে।
 উদাহরণ: “তুমি নদীর মতো, নদী সাগরের মতো, সাগর অসীমতার মতো।”

অলঙ্কারটির মাহাত্ম্য  বা গুরুত্ব:

এ অলঙ্কারটি হলো কাব্যের প্রাণ, যেখানে একটি বস্তুকে আরেকটির সঙ্গে তুলনা করে ভাবকে স্পষ্ট ও সুন্দর করা হয়।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।

4 Responses

  1. আক্তার স্যার হলো আমাদের গর্বের অহংকার; যার হাত ধরে সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, বাংলা বিভাগ গুটি গুটি পায়ে তার লক্ষে এগিয়ে যাচ্ছে।

  2. এখান থেকে অনেক কিছু আয়ত্ত করতে সুবিধা হচ্ছে এবং বারংবার দেখতেও পারছি বাধা ছাড়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *