জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন কাব্য ঐতিহ্য ও ইতিহাসচেতনার এক নন্দনধর্মী রূপায়ণ


ঐতিহ্য ও ইতিহাসচেতনা – বনলতা সেন কাব্য

ঐতিহ্য ও ইতিহাসচেতনার সেতুবন্ধনে বনলতা সেন কাব্যটি জীবনানন্দের কাব্যিক আত্মদর্শন । ঐতিহ্য ও ইতিহাসচেতনা নয়, এ যেন বলা যেতে পারে –
- বাংলা কবিতায় ঐতিহ্য ও ইতিহাসচেতনার আলোয় জীবনানন্দের সময়-স্মৃতির কাব্যভুবন
- বাংলা আধুনিক কবিতায় ঐতিহ্য ও ইতিহাসচেতনার নব ব্যাখ্যা
- ঐতিহ্য ও ইতিহাসচেতনা নয়, এ যেন অতীতের আলোয় মানবচেতনার অনন্ত সন্ধান
- ইতিহাসের ধূলিকণায় হারানো সময় ও চিরমানবের প্রত্যাবর্তন
- ঐতিহ্য ও ইতিহাসচেতনা নয়, এ যেন সময়, স্মৃতি ও সভ্যতার অন্তঃস্বরের কবিতা
- ঐতিহ্যের নিঃশব্দ ছায়ায় আধুনিকতার আত্মদর্শন
- বাংলা কবিতায় সময় ও স্মৃতির এক অনন্ত সংলাপ যেখানে ইতিহাস হয়ে ওঠে আত্মার পরিভ্রমণ
- ঐতিহ্য ও ইতিহাসচেতনা নয়, এ যেনঅতীতের অন্তরালে এক আধুনিক মননের যাত্রা
- ঐতিহ্য, সময় ও সৌন্দর্যের একান্ত সংলাপ
- ঐতিহ্য ও ইতিহাসচেতনা নয়, এ যেন বাঙালি চেতনার অতীত অনুসন্ধানে বনলতা সেন
- ঐতিহ্য ও ইতিহাসচেতনা নয়, এ যেন ইতিহাসের শেকড়ে বাঁধা সময়ের নন্দন-রূপ
এক বিমূঢ় যুগের বিভ্রান্ত কবি জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)। তাঁর কাব্যে সমকালিন মানবাত্মার ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত পরিচয় পাওয়া যায়। যন্ত্র-যুগের যথার্থ চিত্রকল্প সৃষ্টিতে ইন্দ্রিয়ন পরিবেশ রচনায় ইতিহাস তথা ভৌগোলিক চেতনার প্রকাশে, মৃত্যু চেতনা ও পরপবাস্তবের ব্যবহারে বাংলা কাব্য ধারায় কবি এক স্বতন্ত্র ভবনের নির্মাতা। সত্যানুসন্ধানী কবি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মধ্যে সত্যের সন্ধানে মগ্ন থেকে যুগ-যন্ত্রণা এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন।

“কবিতার অস্থির ভেতরে থাকবে ইতিহাস চেতনা ও মর্মে থাকবে পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান”- কবিতা সম্পর্কে এ রকম উক্তি যে কবি করতে পারেন। তাঁর কবিতায় সমগ্র অবয়ব জুড়ে ইতিহাস ও ঐতিহ্যচেতনা ঝলমল করবে, এটাই স্বাবাবিক মহাবিশ্বের ইশারা থেকে উৎসারিতসময়-চেতনা তাঁর কাব্যে একটি সঙ্গতি সাধক অপরিহার্য সত্যের মতো।
ইতিহাস চেতনা স্বাভাবিকভাবেই কাব্যকে ঐতিহ্যের মধ্যে টেনে নিয়ে যায়। কবি ইতিহাসকে গ্রহণ করেছেন বর্তমান পৃথিবীর রক্তাক্ত রূপকে প্রলেপ দেবার জন্য। তাই তিনি কাব্যে প্রানদায়িনী উৎসের সন্ধানে ট্রয়, ব্যবিলন, মিশর, বিদিশা, উজ্জয়িনী ইত্যাদি সভ্যতার দিকে যাত্রা শুরু করেছেন। এবং খুঁজলেন তাকে বিভিন্ন ঐতিহ্যের মধ্যে। এই প্রগাঢ় ইতিহাস চেতনার কারণে অনেক কবিতাই কালোত্তীর্ণ হয়েছে। কবি ইতিহাসের মূল সুরকে কাব্যের মধ্যে গেঁথে নিয়ে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে একই সমান্ত্ররালে উপাস্থাপন করেছেন।
জীবনানন্দ দাশ প্রথম থেকেই ইতিহাস সচেতন। ঝরা পালক এর বিভিন্ন কবিতার মধ্যে তা লক্ষণীয়। বর্তমান কালের আত্মিক শূণ্যতায় হয়ে ম্যাথু আর্নল্ডের মতো কবির মনে হয়েছে বর্তমানে প্রেম নেই, আলো নেই, ব্যথায় নেই কোনো নিরাময়তা, চিন্তার নৈরাজ্যে বিশ্বাসের ধ্রুবতারা নেই। অথচ স্বপ্নজগৎ রচনা করে তার মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করাও সম্ভব নয়।
‘বনলতা সেন’ কাব্যে কবির ইতিহাস ও ঐতিহ্য চেতনা সবচেয়ে প্রখর। এ কাব্যে ‘বনলতা সেন’ কবিতা উল্লেখযোগ্য। Jimeless and jemporal-এর সময় সমন্বয় বাংলা সাহিত্যে এর আগে হয়নি। বন্ধ্যাযুগের ‘রূপকল্পে ‘কবি প্রেমের অচরিতার্থ রূপ দেখে ব্যথিত, সৌন্দর্যহীনতায় পীড়িত। তাই তিনি প্রেমের ও সৌন্দর্যের প্রকৃত স্বরূপকে খুঁজেছেন ভুগোল ও ইতিহাসের বৃহত্তর পাটে। দেশকালে সীমাবদ্ধ নাটোরের বনলতা সেনের পাশ্চাত্যে রয়েছে। ভূগোলের বিস্তৃতি ও ইতিহাসের বেধ (depth)। এই দুই আয়াতনের যোগে একটি ক্ষুদ্র লিরিক কবিতা মহাকাব্যের ব্যাপ্তি পেয়েছে।
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার আশোকের ধূসর জগতে সেখানে ছিলাম আমি, আরে দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে।
সৌন্দর্যের সন্ধানে কবি আরও বললেন-
চুলকার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা মুখতার শ্রাবস্তীর কারুকার্য।
উল্লিখিত প্রাচীন সভ্যতার নামগুলো উচ্চারণের সাথে সাথে কোনো এক মন্ত্রবলে আমাদের চোখের সামনে ভেষে ওঠে এবং ‘dream heavy land’- যেখানে ইচ্ছা, অনুভুতি ও কল্পনা পরিপূর্ণ তৃপ্তি পায় । প্রিয়ার স্মৃতিচারণার মধ্যে দিয়ে কবির চোখে ভেসে উঠেছে হারানো সৌন্দর্যের, হারানোর পূর্ণতার নানা চিত্র। এ প্রসঙ্গে ‘নগ্ন নির্জণ হাত’ ও ‘হাওয়ার রাত’ কবির কথা বলা যায়।
‘হাওয়ার রাত’ ও ‘নগ্ন নির্জণ হাত’ কবিতার মধ্যে কবি ক্লান্তিহীনভাবে প্রেম ও সৌন্দর্যের অনুসন্ধান করেছেন ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে। ‘ভারত সমুদ্রের তীরে’ ‘ভূমধ্যসাগরের কিনারায়’ অথবা টায়ার সিন্ধুর পারে, কোনো এক নগরীর মূল্যবান আসবাবপত্রে ভরা কক্ষে পারস্যগালিচা, কাশ্মীর বিলুপ্ত করে দিয়ে প্রেম ও সৌন্দর্যকে উপভোগ করেছেন।
প্রেম ও সৌন্দর্যের মতো ব্যর্থতাকেও ইতিহাসের মধ্যে উপলব্ধি করতে চেয়েছেন। যেমন-‘শ্যামলী‘কবিতায়। যুগে যুগে মানুষ প্রেমের আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেছে। প্রেমের নজরানা দিতে গিয়ে “দ্রক্ষা দুধ ময়ূর শয্যার কথাভূলে“- দুঃসাহসিক অভিযানে বের হতো। হয়তো সাফল্য মেলে নি। ব্যক্তির মতো জাতিগনও তিল তিল করে যে তিলোত্তমা সত্যভার সৃষ্টি করেছিলো, তার মর্মেও ক্লান্তি নেমেছে।
গ্রীক হিন্দু ফিনিশীয় নিয়মের রূঢ় আয়োজন শুনেছ ফেনিল শব্দে তিলোত্তমা নগরীর গায়ে কী- চেয়েছে? কী পেয়েছ?-গিয়েছে হারায়ে।
(সুরঞ্জণা বনলতা সেন)
প্রতি সভ্যতা তার সংকল্প, উদ্যম একদা কালের ধর্মে-হারিয়ে ফেলে, কিন্তু নারীর প্রেম মানুষকে যে প্রেরণা দেয় তার ক্ষয় নেই।
সময়ের শতকের মৃত্যু হলে তবু দাঁড়িয়ে রয়েছে শ্রেয়তর বেলাভূমি।
(মিতভাষণ, ব, সে)
তাই ধর্ম, সংঘ, শক্তির চেয়েও মানুষের প্রত্যাশা- আরো আলো, মানুষের তরে এক মানুষীর গভীর হৃদয়।
এখানে ধর্মাশোক, মহেন্দ্র, ভূমধ্যসাগর, গ্রীক, হিন্দু, ফনিসীয় ইত্যাদি শব্দের ব্যবহারে যা ব্যক্তিগত ছিল, তাকে কবি করে তুলেছেন বিশ্বের। কবি সুদূর অতীতে পথ হেঁটে হেঁটে-
ভূমধ্যসাগর ঘিরে যেন সব জাতি তাহাদের সাথে সিন্ধুর আঁধার পথে করেছি গুঞ্জণ।
(সবিতা ব, সে)
‘হাজার বছর শুধু খেলা করে’ কবিতাটিও একই অভিজ্ঞতার আলো বিতরণ করে। শত শত জন্মের চারপাশে সফেন মৃত্যুর সমুদ্র। প্রেমের অভিজ্ঞতাই শুধু অনির্বাণ জেগে থাকে আর সবই ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়।
কবি কোন খণ্ড ইতিহাসে ডুব দেন নি, মানব জাতির বৃহৎ ঐতিহ্যে ডুব দিয়েছেন। অতীত সভ্যতার মাঝে নিজেকে সংস্থাপন করে অনুভবে দীপ্ত করেছেন অন্তরকে। কারণ-
“বাইরের বস্তুজগৎ অন্তরের স্বপ্নজগৎকে যে মুহূর্তে ভ্রান্ত বলে প্রমান করে দেবে জীবননান্দ তা জানতেন। আর বাইরের বস্তু জগৎ যদি নঞর্থক্ কিন্তু বাইরের জগত কেবল বর্তমান যুগের শূল্যবোধেই সীমাবদ্ধ নয়। তার মধ্যে রয়েছে সমগ্র বিশ্ব, সমগ্র যুগ-যুগান্ত, রয়েছে আবিষ্কৃত সভ্যতা উর, ব্যবিলন, নিনের্ভা, মিশর, বিদিশা, উজ্জয়িনী”
এজন্য তিনি প্রাণদায়িনী উৎসের সন্ধানে যাত্রা শুরু করেছেন এবং বিভিন্ন ঐতিহ্যের মধ্যে তাকে সন্ধান করেছেন।
কবি ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে দেশ-কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখেন নি। তাঁর কল্পনা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সব দিকেই বিস্তৃতি লাভ করেছে। কবির কব্যে ইতিহাস এসেছে কবি প্রসিদ্ধির মহে নয়, বাস্তব জীবনাভূতির গভীর বোধের আশ্রয়ে। তিনি অতীতকে মূল্যায়ন করেছেন ইতিহাসের আলোকে। আর তা করেছেন শান্তির অন্বেষায়।
কবির ইতিহাস ও ঐতিহ্যচেতনা সহানুভূতির স্পর্শে জীবন্ত। কবি আপন মাতৃভূমির ইতিহাসে, সভ্যতায় নিজেকে স্থাপন করে অন্তরকে রাঙিয়ে নিয়েছেন। পুরাতনের সাথে নতুনের সংযোগ ঘটিয়ে ঐতিহ্য সংরক্ষণের মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তাইতো বিদিশা শ্রারম্ভীর জগৎ ছেড়ে খুব সহজেই কবি নাটোরের বনলতা সেনের কাছে দাঁড়িয়েছেন।
কবি বর্তমানের নির্মম যন্ত্রণার আঘাতে ক্লান্ত হয়ে ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ডুব দিয়ে শাস্তি পেতে চেয়েছেন। বনলতা সেন কাব্যে কবি বিশ্ব ঐতিহ্য ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে পথ পরিভ্রমণ করে শেষ পর্যন্ত আপন দেশ ও জাতির ঐতিহ্য-ইতিহাসে পদার্পণ করেছেন। আমাদের জাতিগত স্মৃতিচারণ পাওয়া যায়। নায়িকারা যেন অতীত ও বর্তমানে সমস্ত প্রিয়তমাদের মুখ।ইতিহাস চেতনা এর কেন্দ্রভূমিতে বিরাজ করেছে বলে এর মাধুর্য আরো গভীর।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।