কেন ‘ওথেলো’ শেক্সপীয়রের সবচেয়ে ভয়ংকর ট্র্যাজেডি?” ট্র্যাজেডি হিসেবে এর সাফল্য বিচার কর।
ওথেলো নাটক – শেক্সপীয়রের নান্দনিক শিল্পের চূড়ান্ত প্রকাশ।


ভূমিকা:
ওথেলো নাটকের ট্র্যাজেডির সাফল্য বিচারে শেক্সপীয়রের ট্র্যাজেডি তত্ত্বে একটা কথা মনে করিয়ে দেয়, তা হলো – ঈর্ষা থেকে পতন। ট্র্যাজেডির নান্দনিকতা বিচারে বলা যায়- ওথেলোতে ভালোবাসার রক্তাক্ত পরিণতি। “When Love Turns Poison: কেন ‘ওথেলো’ শেক্সপীয়রের সবচেয়ে ভয়ংকর ট্র্যাজেডি?” শেক্সপীয়রীয় ট্র্যাজেডির এক অসাধারণ রূপান্তর ওথেলো নাটক, যেখানে মানবমনের অন্ধকার গহ্বরে দৃষ্টি ফেলা হয়েছে।
খোলা পাতা ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সকল বিষয় দেখতে ও পড়তে ক্লিক করুন
‘ওথেলো নাটক গার্হস্থ্য ট্র্যাজেডি। ইংরেজি নাট্যসাহিত্যের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক বিশ্ববিশ্রুত নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপীয়রের ‘ওথেলো’ শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডি হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। ‘ওথেলো’ নাটকের ট্যাজিক আবেদন তীব্রতম। এ নাটকের মূল ট্র্যাজেডি ওথেলো ও তার স্ত্রী ডেসডিমোনার তথা দাম্পত্য জীবনাশ্রয়ী অর্থাৎ গার্হস্থ্য এবং ট্র্যাজেডির মৌল বিষয় স্ত্রীর প্রতি ওথেলোর যৌন অবিশ্বাস অর্থাৎ যৌন ঈর্ষা।
গ্রীক ট্র্যাজেডিতে নিয়তির প্রাধান্য, এই নিয়তির দ্বারা মানুষের জীবন নির্ণীত হয়, কিন্তু মানুষ স্বীয় চরিত্রশক্তি ও মহিমায় এবং দুঃখ ভোগের অসীম ক্ষমতাগুণে সেই নিয়তিকে অবজ্ঞা ও অস্বীকার করে। মানুষ যতই নিয়তিকে এড়িয়ে যেতে চায়, ততই নির্মমতার জালে জড়িয়ে যায়। নেমে আসে ট্র্যাজেডি।
অন্যদিকে রেনেসাঁসের সাধক শেক্সপীয়রের নাটকে নিয়তিই প্রধান নয়, বরং নিয়তিকে চরিত্রের মধ্যেই নিহিত, -যাকে বলা হয় Character of destiny । চরিত্রের কোনো দোষত্রুটি বা আচরণ অবলম্বন করেই নিয়তি প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। ‘ওথেলো’ নাটকে ওথেলোর জীবনের ভয়াবহ পরিণতির বীজ তার চরিত্রের মাঝেই নিহিত, ওথেলোর যৌন-ঈর্ষা ট্র্যাজেডির বীজরূপে কার্যকরী হয়েছে। নিঃসন্দেহে, গভীর ট্র্যাজেডি, আর এ ট্র্যাজেডি ওথেলো ও ডেসডিমনার দাম্পত্য জীবনে। করুণ পরিণতির জন্য তারা দুজনেই দায়ী।
ওথেলো কৃষ্ণকায় মূর। সাত বছর বয়স থেকেই ওথেলোর জীবন কেটেছে যুদ্ধ শিবিরে-সৈনিকের তাঁবুতে। ফলে, জগৎ জীবন সম্পর্কে সে অনভিজ্ঞ। তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো সৈনিকের সারল্য ও নৃশংসতা ।
বীর ওথেলো সাইপ্রাস যুদ্ধের সেনাপতি। বংশমর্যাদা নয়, বীরত্ব, উদার হৃদয় ও প্রেমপ্রবণ পৌরুষদীপ্তভায় ভেনেসীয় সমাজে উচ্চতর পদ অধিকার করে নিয়েছে। সকল সৌন্দর্যকে হার মানানোর মত অপরূপা সুন্দরী তন্বী ডেসডিমোনাকে জিতে নিয়েছে। তাকে ভালবাসে প্রাণের চেয়েও বেশি। তার জন্য সে জাতধর্মও বিসর্জন দিতে পারে। ওথেলো জাতপ্রেমিক। তার এ বিজয় ও গভীর প্রেমকে অনেকে সাদা চোখে দেখে নি।
ভেনেসীয় সমাজ সাদা চোখে না নিলেও ওথেলো সরলমনা বিশ্বাস নিয়ে ইয়াগো বা ক্যাসিওসহ সবাইকে ভালোবেসেছে। ডেসডিমনাকে পেয়ে সে মুগ্ধ, সমস্ত হৃদয়মন দিয়ে ভালোবাসার মমত্বে স্ত্রীকে জড়িয়ে রেখেছে। ওথেলো বলে – “ওকে অবিশ্বাস করবার আগে যেন আমার মৃত্যু হয়”।
“কঠিন কোমলের সংমিশ্রণে এক ট্র্যাজিক নায়ক: ওথেলোর রোমান্টিক মন ও একগুঁয়ে বিশ্বাস”
রোমান্টিকতা, সরলতা, কল্পনাশক্তি, বিশ্লেষণহীনতা, একগুঁয়েমি—সব মিলিয়ে এক ধরনের ট্র্যাজিক হিরো-টাইপ। ওথেলো কঠিন কোমলের ট্র্যাজিক নায়ক: ওথেলো চরিত্রে রোমান্টিক কল্পনা ও বিশ্লেষণহীনতার দ্বন্দ্ব। উদ্দীপ্ত কল্পনাশক্তির অধিকারী হয়েও ওথেলো শিশুর মত সবল, বহির্মুখীন এবং বিশ্লেষণবিমুখ। শিশুসুলভ সরলতা থেকে ট্র্যাজিক পতন, এটিই ওথেলো চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক নির্মাণ। গভীর বিশ্লেষণ না করে সামান্যতে বিশ্বাস স্থাপন করে।
যুদ্ধের দামামার ভেতর প্রেমের বাঁশরি: এটি ওথেলোর রোমান্টিক সত্তা ও ট্র্যাজেডির বীজ বিশ্বাসের অন্ধত্ব ও কল্পনার উন্মাদনা ওথেলো চরিত্রের ট্র্যাজিক স্বভাব। ওথেলো বিশ্লেষণপ্রবণ আত্মমগ্ন চিন্তাশীল দার্শনিক নয়। সে একান্ত রোমান্টিক প্রকৃতির। তার মধ্যে রয়েছে উদ্দীপ্ত কল্পনার অধিকারী সমৃদ্ধ কবি-মন। যুদ্ধের দামামার মধ্যে সে বাজাতে পারে প্রেমের বাঁশরি। কঠিন কোমলের সংমিশ্রণে তার চরিত্র নির্মিত। সে যেমন যুদ্ধের সেনাপতি, তেমনি ঈর্ষণীয়। সুন্দরীর প্রেমিক ও আরাধ্য। তার ভালবাসা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কোন মধ্যপন্থা নেই। ভালোবাসলে ভালোই বাসে, কোনো কারণে ঘৃণা জন্মালে ঘৃণাই করে। স্বভাবগুণেই সে এমন একগুঁয়ে প্রকৃতির।
ভাবতেই অবাক লাগে, আলোচ্য ওথেলোই হত্যাকারীতে পরিণত হয়। অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ করে, অশোভন আচরণ করে। প্রতিহিংসাপরায়ণ শয়তান ইয়াগোর চাতুরীতে যৌন-ঈর্ষার শিকার হয়। ইয়াগোর চক্রান্তের কাছে ওথেলো সম্পূর্ণ অসহায়। সন্দেহ নামক বিষবৃক্ষের পত্তন হওয়ার পর থেকে একগুয়ে, বিশ্লেষণবিমুখ ওথোলো ডেসডিমোনাকে হত্যায় এবং আত্মহননে গিয়ে শেষ হয়।
সন্দেহের বিষবাষ্প ওথেলোর জীবনকে বিধ্বস্ত করেছে, ওথেলোর বিশাল বক্ষ হয়েছে ক্ষত-বিক্ষত। সীমাহীন সংগ্রাম ও অন্তহীন যন্ত্রণার মধ্যে ওথেলোর জীবন নিমজ্জিত হয়েছে। ইয়াগোর চক্রান্তে তার হৃদয় হয়ে উঠেছে অশান্ত-বিক্ষুব্ধ।
ওথেলো চরিত্রে সংশয়ী পরিপূর্ণ মানবাত্মার ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত পরিচয় ফুটে উঠেছে। তার অন্তর্লোকে যে সমুদ্র মন্থন চলেছে, তারই ওগরানো বিষ তাকে পান করতে হয়েছে। তার দাম্পত্যকে তন্ন তন্ন করতে গিয়ে তার চরিত্র হয়েছে দ্বন্দ্ব বিক্ষুব্ধ ও ছিন্ন ভিন্ন। শিকারি ইয়াগোর ষড়যন্ত্রে ওথেলো শিকার করেছে নিজের জীবনের জীবন ও আপন শান্তিকে।
‘ওথেলো’ নাটকে খ্যাতিমান, বিশিষ্ট ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ওথেলোর পতন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। ওথেলোর ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা তার সামান্য ভুলের জন্য তার দাম্পত্য জীবন অনর্থ হয়ে পড়েছে। এরই মাঝে ফাঁকে ফাঁকে দৈব বা অদৃষ্ট দ্বারাও তারা পীড়িত।
ওথেলো নাটকে নাট্যকার বিশেষ গুরুগম্ভীর বাণীভঙ্গিতে মানবজীবনের নিদারুণ ব্যথাকে রূপদান করেছেন। নাটকটিতে ওথেলো গভীর অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত। একদিকে নিজের সাথে নিজের দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে বাইরের ঘটনার সাথে নিজের দ্বন্দ্ব। আত্মদ্বন্দ্বে পরাভূত হয়ে সে স্ত্রী হনন করে নিজে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেও তার এ কাহিনি মৃত্যুঞ্জয়ী, তাই তার ভাগ্যবিপর্যয়েও তার প্রতি আমরা শ্রদ্ধান্বিত হই।
শেক্সপীয়রের ট্র্যাজেডিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘ওথেলো’ নাটক’। এক মহৎ বীরের পতন আমাদের চিত্তে ভীতি ও করুণার সঞ্চার করে এবং আমরা বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে তার ভাগ্য ও পরিণতি অবলোকন করি। ওথেলো যথার্থই এক ট্র্যাজিক চরিত্র। তার চরিত্রের সর্বৈব সারল্য, সুগভীর প্রেম এবং প্রেম হতে জাত ঈর্ষা দ্বারাই তার জীবন তাড়িত। এই প্রেম ঈর্ষাই তার সকল শক্তি ও অশক্তির নিদান। স্ত্রীর প্রতি অবিশ্বাস, সংশয়, দ্বিধা দ্বন্দ্বে ক্লান্ত পর্যুদস্ত ওথেলো হয়ে ওঠে কঠোর নির্মম।
সকল মানবীয় গুণ- দয়া-মায়া, স্নেহ-প্রেম, তার থেকে অপসৃত হয়। প্রেমিকার কন্ঠের আর্তধ্বনি তাকে বিচলিত করতে পারে না। যে স্ত্রী ছিল তার মহিমার অংশভাগিনী, সে আজ দ্বি-চারিণী। তীক্ষ্ণ অনুভূতি ও প্রখর কল্পনাশক্তি নিয়ে সে তার যন্ত্রণা প্রতি মুহূর্তে উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়েছে। ডেসডিমোনা কাছে থাকতেও সে অনিকেত নিঃসঙ্গ। তার নিঃসঙ্গতা, যন্ত্রণা কাতরতা তাকে যথার্থ ট্র্যাজিক চরিত্রে পর্যবসিত করেছে।
ওথেলো নাটকের ট্র্যাজিক মুহূর্তু মৃত্যুতে নয়। যৌন ঈর্ষা তথা প্রেমিক ওথেলো তার স্ত্রীকে নিয়ে ক্যাসিওকে ঘিরে যে সন্দেহ, তার জ্বালা অনেক বেশি মর্মান্তিক এবং বিভক্ত আত্মার অপচয়ের বেদনা। মৃত্যুর চেয়েও তা ভয়াবহ। অবিশ্বাস ও সন্দেহ নামক সর্পাঘাতে ওথেলোর সমস্ত শরীর মন বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। কথাবার্তা ও আচরণে পর্যন্ত ফুটে উঠেছে জ্বালা। এই জ্বালা নিয়েই সে ডেসডিমোনাকে হত্যা করেছে।
ওথেলোর যন্ত্রণা পাঠককে সিক্ত করে। ওথোলোর স্বীয় দুর্বলতাজনিত বিপর্যয়কে নাট্যকার শেক্সপীয়র সাফল্যের সাথে চিত্রিত করে পাঠকের সহানুভূতিকে আকর্ষণ করেছেন। ওথেলোর বিপর্যয় তার চরিত্রকে গৌরবান্বিত করেছে। ওথেলোর ক্ষতাক্ততা আমাদের হৃদয়কে দ্বিখণ্ডিত করে দেয়, বেদনায় নীল হয়ে পড়ে আমাদের চিত্ত।
ডেসডিমনার ট্র্যাজেডিও ভয়াবহ। ডেসডিমোনার ট্র্যাজেডি ওথেলো অপেক্ষা কোন অংশে কম নয়। বিশ্ব সাহিত্যের এরূপ ট্র্যাজিক নারী চরিত্রের তুলনা মেলা ভার। গভীর ভালোবাসার বিনিময়ে তার জীবনে যে করুণ ও মর্মন্তুদ পরিণতি ঘটে তাই শেক্সপীয়র মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে অপলোকন করেছেন এবং পাঠকের জন্য উপহার দিয়েছেন।
ডেসডিমোনার চরিত্রে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা প্রকাশিত, ভেনেসীয় সম্ভ্রান্ত পরিবারের অপরূপা সুন্দরী হয়েও সে কৃষ্ণাঙ্গ মুর ওথেলোকে ভালবেসে বিয়ে করেছে। স্বামীর ভালোবাসা পেয়ে ও স্বামীকে ভালোবেসেই সে সুখী, কোনো নারী দ্বিচারিণী হতে পারে তা তার অজানা। প্রেমিক ও রোমান্টিক ওথেলোকে সে জীবন দিয়ে ভালোবেসেছে, এমনকি জাত পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছে। সে স্বামীগতপ্রাণা বলেই যথার্থ সহধর্মিণী হতে চেয়েছে। স্বামীই তার একমাত্র ভাবনা।
ডেসডিমনা ইয়াগোর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে স্বামীর মনের জায়গা হারায়। ওথেলো ডেসডিমোনার প্রতি অভাবনীয় অসভ্য আচরণ করে। ওথেলো তাকে দূরে সরিয়ে দেয়। বহু দূরে। ওথেলোর সাথে তার আত্মিক সম্পর্ক ঘোচে। সে যাপন করে এক নিঃসঙ্গ জীবন, সে জীবনে তার একাকিত্ব দুঃসহ। তার নিঃসঙ্গ জীবনের যন্ত্রণাকাতরতা ভয়াবহ। তার সমস্ত প্রত্যাশা বিশ্বাসহীন আঁধারে গলে গলে একেবারে আধার হয়ে যায়, সীমাহীন আঁধার। অন্ধকার এখন বন্ধুর মত কাজ করছে তার জীবনে।
সন্দেহ অত্যন্ত নির্মম হয়ে ওথেলো ও ডেসডিমোনার গোলাপকুঁড়ি তুল্য পাপড়িগুলোকে খেয়ে ফেলেছে। দু’জন দু’জনকে ভালবেসে সব এমনকি সব দিতে পারে। এত ভালবাসা অথচ শান্তির পরিবর্তে সৃষ্টি করল অথৈ উদ্বেগ। তাদের দাম্পত্য জীবন হয়ে ওঠে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত একা।
যদিও শেক্সপীয়রের ট্র্যাজেডিতে মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু মৃত্যুতে ট্র্যাজেডি সে অর্থে সৃষ্টি হয় নি। বরং তারা যতক্ষণ বেঁচেছিল ততক্ষণ তিলে তিলে যন্ত্রণার আগুনেই পুড়ে মরেছে। ওথেলো ও ডেসডিমোনা- এ দম্পতির মাধ্যমে আমরা জীবনের গভীর বেদনা ও উল্লাস অনুভব করি। এখানেই ওথেলো নাটক গার্হস্থ্য ট্র্যাজেডি হিসেবে সর্বৈব সার্থক ও সফল।
ওথেলো নাটক – সফলতা ও সীমাবদ্ধতা :
ওথেলো নাটক শেক্সপীয়রের অমর সৃষ্টি। বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডিও বটে। বিশ্বসাহিত্যে গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল ট্র্যাজিডির যে স্বরূপ ব্যাখ্যা করেছেন, বিভিন্ন ভাষা ও সাহিত্যের তা অনুসৃত হয়েছে। শেক্সপীয়র গ্রিক ট্র্যাজেডির কাঠামো অনুসরণ করলেও ওথেলো নাটকটিতে নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য যোগ করেছেন, যা একে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
এরিস্টটল নির্দেশিত ট্র্যাজিডির বৈশিষ্ট্যে করুণ পরিণতির জন্য নিয়তিকে প্রাধান্য দিলেও শেক্সপীয়রের ট্র্যাজেডির মূল ভিত্তি হলো— “Character is Destiny” (চরিত্রই নিয়তি)। ওথেলো নাটকে এই বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে:
ট্র্যাজিডিময় হিরো:
কাহিনির প্রধান চরিত্রকে ঘিরেই ট্র্যাজিডির আবহ গড়ে ওঠে। ট্র্যাজেডির কেন্দ্রীয় চরিত্রকে হতে হয় উচ্চবংশীয় বা উচ্চপদস্থ। সে দিক বিচারে ওথোলো নাটকের নায়ক বা প্রধান চরিত্র ওথেলো ভেনিসের একজন বীর সেনাপতি। তিনি মহৎ, সাহসী এবং সহজসরল। ওথেলো এখানে শুধু ব্যক্তি নয়, একটা বিশেষ শ্রেণির প্রতিনিধি। তাই, তার পতন কেবল একজন ব্যক্তির পতন নয়, বরং একটি বিশাল ব্যক্তিত্বের বিনাশ।
নিয়তি নির্ধারিত নয়, চারিত্রিক দুর্বলতাই বড় কথা :
নিয়তি নয়, শেক্সপীয়রের নায়কদের পতনের মূলে থাকে কোনো একটি চারিত্রিক দুর্বলতা। ওথোলো নাটকে নিয়তি নয়, ওথেলো চরিত্রের অন্ধ বিশ্বাস এবং অহেতুক ঈর্ষা ওথোলোর জীবনে ভয়াবহ পরিণাম সৃষ্টি করেছে। তার এই অতি-সরলতা এবং ইয়াগোর প্ররোচনায় নিজের স্ত্রী ডেসডিমোনাকে সন্দেহ করাই তার পতনের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যাকে বিশ্বাস করে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে, ঘৃণা করলে চরমভাবে ঘৃণা করে। এই যে, চরমভাবাপন্ন স্বভাব, অন্ধ বিশ্বাস, আর অহেতুক ঈর্ষা ওথোলোকে শেষ করে দিয়েছে।
নাটকীয় দ্বন্দ্ব সৃষ্টিতে খলনায়কের ভূমিকা : (The Villain)
শেক্সপীয়রের ট্র্যাজেডিতে অপ্রধান চরিত্রগুলো অসাধারণ বিকশিত। নাটকের আবহ সৃষ্টিতে অপ্রধান চরিত্রগুলো যেন জীবন্ত হয়ে ধরা দেয়। অপ্রধান চরিত্রগুলোর মধ্যে খলনায়কের ভূমিকা এমন হয়ে থাকে যেন, ঘুড়ির নাটাম তারই হাতে। শেক্সপীয়রের ট্র্যাজেডিতে খলনায়কের চক্রান্ত নাটকীয় মোড় পরিবর্তন করে। ওথোলো নাটকের ইয়াগো বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম ধূর্ত খলনায়ক। তার ‘Motiveless Malignity’ বা অহেতুক বিদ্বেষ ওথেলোর মনে সন্দেহের বিষ ঢুকিয়ে দেয়।
দ্বন্দ্ব : ভেতর ও বাইরের, তবে বিশেষভাবে মানসিক দ্বন্দ্ব : (Inner Conflict)
ট্র্যাজেডির নায়ক দ্বন্দ্বময়। নিজের সাথে , পরিবেশের সাথে প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত হয়। ওথেলো নাটকে ওথেলোর মনে এক জটিল ও ভয়াবহ দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। দ্বন্দ্বই ট্র্যাজেডির প্রাণ, সেদিক থেকে শেক্সপীয়রের ওথোলো নাটক অনন্য। ওথেলোর মনে একদিকে ডেসডিমোনার প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং অন্যদিকে ইয়াগোর দেওয়া সন্দেহের মধ্যে যে তীব্র মানসিক যুদ্ধ চলে, তা শেক্সপীয়রীয় ট্র্যাজেডির প্রাণ। তিনি ডেসডিমোনাকে হত্যা করার আগে যে দ্বিধা ও যন্ত্রণায় ভুগেছেন, তা দর্শককে আবেগাপ্লুত করে।
শেক্সপীয়রীয় ট্র্যাজেডির অসাধারণ শিল্পময় রূপ ওথোলো। দর্শক শেষ পর্যন্ত গভীর উদ্বেগের সাথে কাহিনির শেষ প্রান্তে এসে ট্র্যাজেডির এক নান্দনিক রূপ উপভোগ করে। ওথোলো নাটকের যে দিকগুলো অনন্য –
- সহানুভূতি ও ভয় (Pity and Fear): ট্র্যাজিডি দর্শকদের মনে এক গভীর আবহ সৃষ্টি করে। এরিস্টটলের মতে, ট্র্যাজেডির সার্থকতা হলো দর্শকের মনে করুণা ও ভীতি তৈরি করা। ডেসডিমোনার মতো একজন নিরপরাধ নারীর মৃত্যু এবং ওথেলোর মতো বীরের করুণ পরিণতি দর্শকদের মনে গভীর হাহাকার সৃষ্টি করে।
- সর্বজনীন আবেদন: ওথোলো নাটকের মূল উপজীব্য হলো ভালোবাসা, ঈর্ষা এবং বিশ্বাসঘাতকতা। নাট্যকার চরিত্রের বৈশিষ্ট্যকে এমনভাবে আদি-মধ্য-অন্ত্য বিন্যস্ত, যা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজও সমানভাবে সত্য। যাপিত জীবনের জীবন্ত মানুষের মনের অন্ধকার দিকটি শেক্সপীয়র এখানে নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন।
- কাব্যিক ন্যায়বিচার (Poetic Justice) অনুপস্থিত: রুদ্ধশ্বাস পিনপতন নীরবতায় গভীর উৎকণ্ঠায় পাঠক বা দর্শক উপলব্ধি করে ফেলে কী নিদারূণ করুণ পরিণতি ঘটে গেল নায়কের জীবনে, যা ট্র্যাজিডির বৈশিষ্ট্য। ট্র্যাজেডিতে প্রায়শই দেখা যায় যে অপরাধী শাস্তি পেলেও তার আগেই নিরপরাধ মানুষের জীবন চলে যায়। নিরীহ, নিরপরাধ স্বামীর ভালোবাসায় সিক্ত নারী ডেসডিমনা জানেই না তার কী অপরাধ। অথচ, সেই স্বামীর হাতেই তার মৃত্যু। ডেসডিমোনার মৃত্যু এই ট্র্যাজেডিকে আরও বেশি হৃদয়বিদারক ও সফল করে তুলেছে।
- ভাষার ব্যবহার: ওথেলোর গাম্ভীর্যপূর্ণ সংলাপ এবং ইয়াগোর দ্ব্যর্থবোধক কথাবার্তা নাটকটির গাম্ভীর্য ও ট্র্যাজিক আবহ বজায় রাখতে সাহায্য করেছে।
উপসংহার
ওথেলো নাটক কেবল একটি পরকীয়া বা সন্দেহের গল্প নয়, এটি মানুষের মনের দুর্বলতা এবং শয়তানি বুদ্ধির কাছে মহত্ত্বের পরাজয়ের এক করুণ আখ্যান। ওথেলো নাটকের শেষে যখন ওথেলো নিজের ভুল বুঝতে পেরে আত্মহত্যা করেন, তখন ট্র্যাজেডির সার্থকতা পূর্ণতা পায়।

