‘‘ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রকে দিয়েই বাংলা উপন্যাসের যাত্রা”- এ উক্তির আলোকে ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান ‘আলোচনা কর।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য।

ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র

ভূমিকা: পাশ্চাত্য শিক্ষার সংস্পর্শ ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে গদ্য চর্চা শুরু হলে উনিশ শতকে বাংলা উপন্যাসের সূত্রপাত হয়। প্রথম দিকে সমাজ-জীবনের উচ্ছৃঙ্খলতা নিয়ে কিছু নকশা জাতীয় রচনার মধ্যে উপন্যাসের কিছু কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতা কমলালয়’ (১৮২৩) ‘নববাবু বিলাস’ (১৮২৫) ও ‘নববিবি বিলাস’ (১৮৩০), হ্যানা ক্যাথারিন মালেন্সের” ফুলমণি ও করুণার বিবরণ (১৮৫২) ইত্যাদি গ্রন্থকে কাহিনি নির্ভর গদ্য রচনা বলা যায়। এ রচনাগুলোতে তৎকালীন সমাজ-জীবনের বাস্তব-ছবি অঙ্কিত হলেও উপন্যাসের কোনো শর্তই এ সব গ্রন্থে রক্ষিত হয় নি।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলালের ‘(১৮৫৮) মধ্যে উপন্যাসোচিত সমস্যা, প্রকৃতি ও মানুষের ব্যবহার, ঔপন্যাসিকের মানসদৃষ্টি ইত্যাদি ঔপন্যাসিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ পন্ডিতেরা গ্রন্থটিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাসের মর্যাদা দিতে চেয়েছেন। কিন্তু অগোছালো কাহিনি, ক্রমপরিণতিহীন ঘটনা বিন্যাস, অবিকশিত চিরত্র, ব্যক্তিত্বহীন নায়ক ও অবাস্তব নারী চরিত্র, নিষ্প্রভ রস ইত্যাদি কারণে, ‘আলালের ঘরের দুলাল ‘কে প্রথম উপন্যাস বলা গেলেও সার্থক উপন্যাস বলা যায় না।

ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র : যাত্রা শুরু

যথার্থ উপন্যাসের রচনা আরো বিলম্বিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-৯৪) হাতেই প্রথম সার্থক উপন্যাসের সৃষ্টি হয়। সে হিসেবে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী‘র প্রকাশকাল ১৮৬৫ খ্রিঃ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, এই উপন্যাস থেকেই বাংলা সাহিত্যে সার্থক উপন্যাসের ধারার সূত্রপাত।

বঙ্কিমচন্দ্র উনিশ শতকের ইংরেজি রোমান্স-আশ্রয়ী ঐতিহাসিক উপন্যাস (স্যার ওয়াল্টার স্কটের আদর্শে) এবং সামাজিক পারিবারিক কথাসাহিত্যের আদর্শে বাঙালির অতীত ইতিহাস ও সমাজ-পরিবার জীবনকে কেন্দ্র করে উপন্যাস লিখেছিলেন। আজ সে সব গ্রন্থের দেশকাল অতীত হয়ে গেলেও তাঁর গ্রন্থের জনপ্রিয়তা কোনো অংশে কমে যায় নি। তাঁর উপন্যাসে ক্রমে ক্রমে কাহিনি গৌণ হয়ে পড়ল এবং চরিত্রদ্বন্দ্ব প্রাধান্য পেতে লাগলো, মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত অপেক্ষাকৃত সুচিত্রিত হল। মোদ্দা কথা তিনিই বাংলা উপন্যাসের পথপ্রদর্শক ও শিল্পী হিসেবে শ্রেষ্ঠ।

ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র : মধুসূদনের মতো ইংরেজি দিয়ে শুরু

ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম উপন্যাস ইংরেজিতে রচিত Rajmohan’s Wife: এটি ১৮৬৪ খ্রিঃ-এ Indian Field নামে একখানি সাপ্তাহিক পত্রে ধারাবহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু বিদেশি ভাষায় সাহিত্য রচনায় পরিপূর্ণ তৃপ্তি লাভ করতে না পারায় তিনি বাংলা ভাষায় উপন্যাস রচনায় আত্মনিয়োগ করেন এবং স্বল্প সময়েই সাহিত্যের এ শাখায় অসীম দক্ষতার পরিচয় দেন।

ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র – উপন্যাসের সংখ্যা ও নাম এবং বিস্তারিত আলোচনা।

বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাহিত্যিক জীবনের বাইশ বছরে (১৮৬৫-১৮৮৭) মোট চৌদ্দখানি উপন্যাস রচনা করেন। সেগুলো হল: ‘দুর্গেশনন্দিনী‘ (১৮৬৫) ‘কপালকুণ্ডলা‘ (১৮৬৬) মৃণালিনী‘ (১৮৬৯) ‘বিষবৃক্ষ (১৮৭৩) ‘ইন্দিরা‘ (১৮৭৩) ‘যুগলাঙ্গুরীয় (১৮৭৪) ‘রাধারাণী (১৮৭৫) ‘চন্দ্রশেখর (১৮৭৫) “রজনী ‘(১৮৭৭) ‘কৃষ্ণকান্তের উইল‘(১৮৭৮)

রাজসিংহ‘(১৮৮১)’আনন্দমঠ‘(১৮৮২)”দেবীচৌধুরাণী‘(১৮৮৪)ও ‘সীতারাম’ (১৮৮৭)। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের মধ্যে কতগুলো ঐতিহাসিক উপন্যাসের লক্ষণযুক্ত। কিছু উপন্যাসে অতীত ইতিহাসের কাহিনী বিধৃত। অবশ্য একমাত্র রাজসিংহকেই যথার্থ, ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা যেতে পারে।

ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের নিজেরও সেই মত। রাজস্থানের চঞ্চলাকুমারীকে ঔরংজেবের বিবাহের ইচ্ছা এবং তা থেকে রাণা রাজসিংহের সাথে ঔরংজেবের বিরোধ, সেই বিরোধে রাজসিংহের জয়লাভ ও চঞ্চলাকুমারীর সাথে বিয়ে এই হল মূল ঘটনা। এ ঘটনা ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু এর সাথে তিনি আবার জেবুন্নেসা-মবারক-দরিয়া বিবির একটি কাল্পনিক উপঘটনাও চিত্রিত করেছেন।

ইতিহাসের সামান্য সংস্পর্শ বিদ্যামান রয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী‘তে। খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর শেষ পর্যায়ে উড়িষ্যার অধিকার নিয়ে মোগল ও পাঠানদের মধ্যে যে সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল, তাকেই এ উপন্যাসের পটভূমিকা হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

উপন্যাসে যুদ্ধ-বিগ্রহের কলকোলাহলের স্থান দেওয়া হলেও এতে প্রেমের সূচনা, বিকাশ ও পরিণতির পরিচয় দান করা হয়েছে। এ উপন্যাসের ভাষা তেমন প্রশংসনীয় না হলেও অন্যতম বৈশিষ্ট্য ইংরেজি শিক্ষিতদের রুচি এবং আদর্শ অনুযায়ী গ্রন্থটি রচিত হয়েছিল। সে যুগের যন্ম, শৌর্যবীর্য, প্রেম-প্রতিহিংসার চিত্রাঙ্কণ উপন্যাসটির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

তের শতকের প্রথম দিকে মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়ের কাহিনিকে উপজীব্য করে ‘মৃণালিনী‘ উপন্যাস রচিত। সেন রাজবংশ শাসিত বাংলাদেশকে পটভূমি হিসেবে গ্রহণ করে বন্ধিমচন্দ্র এ উপন্যাসটি রচনা করলেও ঐতিহাসিক ঘটনার আড়ালে হেমচন্দ্র -মৃণালিনী এবং পশুপতি -মনোরমার প্রেমকাহিনী প্রাধান্য লাভ করেছে। এ উপন্যাসে বিধৃত ঘটনা এবং চরিত্রসমূহ সম্পূর্ণ অনৈতিহাসিক।

‘কপালকুণ্ডলা‘ উপন্যাসে ঐতিহাসিকতার কিছুটা স্পর্শ থাকলেও তাতে প্রাধান্য বিস্তার করেছে গার্হস্থ্যজীবন। বিজন অরণ্যে কাপালিক পতিপালিতা সংসারানভিজ্ঞা কপালকুন্ডলার জীবনে মানবসমাজ কীরূপ প্রভাব বিস্তার করেছিল, সেই কাহিনি রূপায়নই এই উপন্যাসের প্রধান সম্পদ। এ প্রসঙ্গে কপালকুন্ডলা চরিত্র চিত্রণের পাশাপাশি মোতিবিবি চরিত্রের রহস্য উদঘাটন এবং কাহিনীর অনবদ্য গঠন-কৌশলের প্রশংসা করতে হয়। গ্রীক ট্র্যাজেডির প্রভাবও এ গ্রন্থে লক্ষযোগ্য।

চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসটি ইংরেজ শাসনের প্রতিষ্ঠা ও মীর কাসীমের সাথে ইংরেজদের যুদ্ধের পটভূমিকায় রচিত। উপন্যাসটি ইতিহাসাশ্রয়ী হলেও তাতে গার্হস্থ্যজীবনের কাহিনির সংমিশ্রণ রয়েছে। প্রতাব-শৈবালিনীকে কেন্দ্র করে এ উপন্যাসে বঙ্কিম প্রণয়ের দ্বন্দ্ব এবং পাপের বীভৎস পরিণামের চিত্র অঙ্কন করেছেন। ইতিহাস অপেক্ষা গার্হস্থ্যজীবন রূপায়নই এ উপন্যাসের মূল উদ্দেশ্য। উপন্যাসটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য শৈবালিনী চরিত্র চিত্রণ।

বঙ্কিম সামাজিক উপন্যাসও লিখেছেন। ‘বিষবৃক্ষ‘ ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ সামাজিক উপন্যাসের অগ্রদূত স্বরূপ। এ দুটি উপন্যাসের কেন্দ্রস্থলে আছে রূপজ মোহের সাথে কল্যাণবোধের সংঘাতের শোচনীয় ট্র্যাজিডি। ইতিহাসের পটভূমিকা পরিত্যাগ করে সম্পূর্ণ সামাজিক জীবনকে অবলম্বন করে বদ্বিম ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাস রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন।

 বিবাহিত জীবনে বিকৃত প্রেমের পরিণতি কেমন বিষময় হতে পারে নগেন্দ্র, সূর্যমুখী, কুন্দ, হীরা, দেবেন্দ্র প্রভৃতি চরিত্র সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে তা প্রতিপন্ন করেছেন। নগেন্দ্রনাথের ঘরে পরমা সুন্দরী পত্নী সূর্যমুখী থাকা সত্ত্বেও তরুণ বিধবা কুন্দনন্দিনীর প্রতি রূপজ আকর্ষণ এবং পরিণামে কুন্দনন্দিনীর আত্মহত্যায় উপন্যাসটি ট্র্যাজিডিতে পরিণত হয়েছে। এ উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র অত্যন্ত সুন্দর ভাবে অঙ্কিত হয়েছে।

‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এ একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে বিষাদান্ত এক কাহিনি রূপায়িত হয়েছে। বিধবা রোহিনীর রূপে আকৃষ্ট হয়ে সতীসাধ্বী স্ত্রী ভ্রমরকে পরিত্যাগ করায় গোবিন্দলালের জীবনে বিপর্যয় সৃষ্টি এবং পরিণামে গোবিন্দলালের হাতে রোহিনীর শোচনীয় মৃত্যু এই ট্র্যাজেডি উপন্যাসের বিষয়বস্তু। উপন্যাসে অঙ্কিত চরিত্রসমূহের মধ্যে গোবিন্দলালই সবচেয়ে ট্র্যাজিক চরিত্র। রোহিনী চরিত্র বিশ্লেষণে শিল্পী বঙ্কিম নীতি ও আদর্শের ঊর্ধ্বে দৃষ্টিকে প্রসারিত করতে পারে নি।

রজনী‘ উপন্যাসে সামাজিক পটভূমিতে একটি অন্ধ মেয়ের প্রেমের বিকাশ দেখানো হয়েছে। এ উপন্যাসে অনেক অবিশ্বাস্য ঘটনার সমাবেশ রয়েছে। বিভিন্ন চরিত্রের আত্মকথার মাধ্যমে কাহিনীর বর্ণনায় লেখক আঙ্গিকগত দিক থেকে অভিনবত্ব দেখিয়েছেন।

আনন্দমঠ‘দেবী চৌধুরাণী’‘সীতারাম‘কে রাজনৈতিক উপন্যাসের লক্ষণাক্রান্ত বলে মনে করা হয়। এ উপন্যাসের মধ্যে বঙ্কিম দেশাত্মবোধ ও স্বাজাত্যবোধে মুখর। এ দেশের অধিবাসীদের জীবনে ছিয়াত্তরের ভয়াবহ মন্বন্তরের ঐতিহাসিক ঘটনা যে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছিল, তারই কাহিনিসহ উত্তরবঙ্গের সন্ন্যাসী বিদ্রোহ উপজীব্য করা হয়েছে ‘আনন্দমঠ‘ উপন্যাসে। মুঘল যুগের সমাপ্তি ও ইংরেজ আমলের গোড়ার দিকে এর কাহিনির পট বিস্তৃত, কিন্তু বাইরে মুসলমান-বিরোধিতা থাকলেও আসলে ইংরেজ কুশাসনের বিরুদ্ধেই প্রচ্ছন্নভাবে এ উপন্যাসটি রচিত হয়েছিল।

দেবীচৌধুরাণী‘ উপন্যাসে এ দেশের সমাজ, পরিবেশ, ও তৎকালীন রাষ্ট্রীয় বিশৃঙ্খলার বাস্তব চিত্র স্থান পেয়েছে। সমাজ ও সংসারের সীমানার বাইরে কঠোর সাধনায় রত দেবী চৌধুরাণী লেখকের আদর্শ অনুযায়ী আদর্শ হিন্দু-স্ত্রী। ‘দেবীচৌধুরাণী’ পুরাতন বাংলার সমাজ ও পারিবারিক পটভূমিকায় স্থাপিত একটি মনোরম গাহংস্থ্য কাহিনী হলেও এর আড়ালে আছে হিন্দুদের

সামাজিক আচার-আচরণ ঘটিত তত্ত্বকথা। প্রফুল্ল নামের এক অতি সাধারণ কুলবধূ। যাকে শ্বশুরের একগুঁয়েমির জন্যে স্বামীর ঘর ছাড়তে হয়েছিল, নানা ঘটনাচক্রে তাকেই হতে হল ভয়ঙ্করী দস্যুনেত্রী দেবীচৌধুরাণী। দস্যুনেত্রী এবং প্রচুর ঐশ্বর্য ও প্রচন্ড প্রতাপের অধিকারিনী হলেও তার গুরুর কাছে গীতার নিষ্কামতত্ত্ব সম্বন্ধে অবহিত হয়ে নারীজীবনের উদ্দেশ্য কী, এবং তার স্থানই বা কোথায় তা বুঝতে পারলো। পরে ঘটনা অনুকূল হলে সে সমস্ত ঐশ্বর্য ও শক্তি ত্যাগ করে আবার স্বামীর ঘরে এসে কুলবধূটি হয়ে পুকুরঘাটে বাসন মাজতে লাগলো। এতে বঙ্কিম গীতাতত্ত্ব এবং হিন্দুনারীর যথার্থ স্থান সম্বন্ধে অনেক উপদেশ দিয়েছেন। উপন্যাসের কাহিনী বয়নে লেখক কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন।

সীতারাম‘ ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের সর্বশেষ উপন্যাস। এ উপন্যাসে ক্ষুদ্র সামন্ত রাজ্যের উত্থান-পতনের ইতিহাস, পারিবারিক জীবনের সমস্যা এবং বিপর্যন্ত ব্যক্তি চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে। উপন্যাসটিতে দেশাত্মবোধের বিশেষ আদর্শের প্রচার করা হয়েছে বলে তাতে শিল্পগত অপকর্ষ লক্ষ্য করা যায়।

‘যুগলাঙ্গুরীয়’, ইন্দিরা, ও রাধারাণী ঔপন্যাসিক বয়িমচন্দ্রের ক্ষুদ্রাকৃতির উপন্যাস। এগুলোকে ছোটগল্প বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ছোটগল্পের আকৃতিগত বৈশিষ্ট্য ছাড়া অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য এগুলোতে না থাকায়, এগুলো ছোটগল্পও হয়ে উঠতে পারে নি সংক্ষিপ্ত উপন্যাস হিসেবেই এগুলোর পরিচিত।

ঔপন্যাসিক বদ্বিমচন্দ্রের উপন্যাসে পুরুষ চরিত্রগুলোর ভাগ্য প্রতিনিয়ত নিয়তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। রূপজ মোহে পড়ে পুরুষের জীবনে নেমে এসেছে ট্র্যাজিক পরিণতি। তাঁর উপন্যাসে নিয়তির নীলার বিচিত্র প্রকাশ ঘটলেও মানবপ্রবৃত্তিকেই তার পরিণতির জন্যে তিনি দায়ী করেছেন।

দ্বন্দ্বহীন প্রেম, সমান্তরাল প্রেমকাহিনী, পূর্বরাগের প্রকাশ, সাধুসন্ন্যাসীদের অলৌকিক কার্যকলাপ, অবাস্তব পরিবেশের নায়িকা -এ সমস্তই বয়িমের উপন্যাসসের বৈশিষ্ট্য। তাঁর উপন্যাস সৃষ্টিতে স্যার ওয়াল্টার স্কটের আদর্শের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। ওয়াল্টার স্কট যেমন ইতিহাসের ঘটনা অবলম্বনে উপন্যাস রচনা করে জাতীয় জীবনে ইতিহাস- চেতনা এনেছিলেন, তেমনি বঙ্কিম ইতিহাসের কাহিনীকে উপন্যাসে প্রতিফলিত করে হিন্দু জাতির অতীতের গৌরবময় চিত্র দেখাতে চেয়েছেন।

ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের রচনারীতির মধ্যে অসাধারণ মৌলিকতা বিদ্যমান, যা তাঁকে ‘সাহিত্য সম্রাট’-এর আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। তাঁর ভাষা ভাব প্রকাশের জন্য যথোপযুক্ত। বিদ্যাসাগরের গদ্যরীতিতে নমনীয়তা ও সরসতা সঞ্চার করে তিনি বাংলা গদ্যকে সর্বজনগ্রাহী করে তুলেছেন। তাঁর সময়েই মানুষের মুখের ভাষা ও মনের কথার মধ্যে ব্যবধান কমে এসেছে।

নীতি ও আদর্শের প্রতি পক্ষপাত সত্ত্বেও মানব জীবনের বিচিত্র রহস্যের প্রতি ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের সুগভীর অন্তর্দৃষ্টি ছিল, নরনারীর জীবনের বৃহৎ স্বরূপ সম্বতে তাঁর পরিপূর্ণ ধারণা ছিল। সর্বোপরি বিশেষ দেশকালের পটভূমিকায় বিশেষ দেশকালের নরনারীর চরিত্র আঁকলেও তিনি তারই মধ্যে দিয়ে সর্বকালের মানুষের ছবি এঁকেছেন। সেজন্যে বর্তমান যুগের পাঠকও তাঁর সৃষ্ট কাহিনী ও চরিত্রের মধ্যে নিজের কালের ছবি দিখতে পায় এ গুণ এবং রচনার অপূর্ব ঐশ্বর্য তাঁকে কালজয়ী ঔপন্যাসিকের মর্যাদা এনে দিয়েছে।

উপসংহার:

ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা সাহিত্যকে যে উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন, তা এক অনন্য কীর্তি। ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র কেবল গল্পকার নন, তিনি জাতির চেতনার রূপকার। তাঁর উপন্যাসে সমাজ, ইতিহাস, ধর্ম ও প্রেম একসঙ্গে মিলিত হয়েছে গভীর শিল্পরূপে। বাংলা ভাষার গদ্যকে ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র যে গৌরবময় মর্যাদা দিয়েছেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের সকল সাহিত্যিকের কাছে এক চিরন্তন প্রেরণা। বলা যায়, ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রই আধুনিক বাংলা উপন্যাসের ভিত্তি রচনা করেছেন এবং তাঁর কলমেই জাতি প্রথম নিজের স্বর খুঁজে পেয়েছে। তাই বাংলা সাহিত্যচর্চার যেখানেই আলো জ্বলে, সেখানে ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের নাম আজও উজ্জ্বল ও অমলিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *