রসনিষ্পত্তি সম্পর্কে ভরতের মতামত: কাব্য নির্মাণ কলা
কাব্য নির্মাণ কলা: রস সম্পর্কে ভরতের মতামত
ভারতীয় আলষ্কাবিকদের মধ্যে আচার্য ভরতকে প্রথম এবং প্রধান পুরুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তাঁর আবির্ভাব নিয়ে পন্ডিতমহলে মতভেদ রয়েছে। কেউ-কেউ মনে করেন তিনি খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দের,কারো কারো মতে তিনি খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দের লোক ছিলেন। তবে যা-ই হোক প্রায় দুই হাজার বছর আগেকার এই মনীষী ভারতীয় নাট্যবেদের আদিগুরু এবং অলংকার শাস্ত্রের প্রধান পুরুষ হিসেবে কীর্তিত।
ভরত রচিত বিশাল গ্রন্থ নাট্যশাস্ত্র। একে পঞ্চম বা গান্ধর্ববেদও বলা হয়ে থাকে। এ গ্রন্থে মূলত তিনি দৃশ্যকাব্য বা নাট্যশাস্ত্রের আলোচনা করেছেন। উল্লেখ্য যে এ গ্রন্থের ষষ্ঠ ও সপ্তম অধ্যায়ে তিনি নাট্যরস ও ভাবসমূহ বিচার করেছেন। তবে দৃশ্যকাব্য আলোচনা করতে গিয়ে ভরত শ্রব্যকাব্য প্রসঙ্গও আলোচনা করেছেন।
ভরত তার গ্রন্থের ষোড়শ অধ্যায়ে কাব্যের অলংকার দোষ-গুণ ও লক্ষণসমূহের হৃদয়গ্রাহী আলোচনা করেছেন। তিনি অবশ্য তাবৎ কাব্যের শ্রেষ্ঠতত্ত্বরূপে ‘রস’ কেই স্বীকৃতি দিয়েছেন। রসতত্ত্বের প্রবর্তক হিসেবে তিনি প্রাচীন ভারতীয় কাব্যতত্ত্বের ইতিহাস স্বীকৃত।

রস নিষ্পত্তি সম্পর্কে ভরতের অভিমত ঃ
ভরতের মতে ‘রসই’ হচ্ছে সাহিত্য বৃক্ষের বীজ, অর্থাৎ বীজ হতে যেমন গাছ হয় এবং গাছ হতে ফুল ও ফল হয়, তেমনি রসবীজ হতেই কাব্য এবং এ কাব্যের ফুল ফল (ভাব, রীতি, অলঙ্কার ইত্যাদি) এই রসেরই প্রকাশ।
কাব্য নির্মাণ কলা: রস সম্পর্কে ভরতের মতামত
‘রিম’ ধাতু থেকে ‘রস’ শব্দটি। এর অর্থ আস্বাদন করা। জিহবার দ্বারা কটু-তিক্ত-অম্ল-মধুরগুন আস্বাদন করে বলেই জিহবার আরেক নাম রসনা। রস শব্দটির ধাতুগত দিক থেকে অর্থ ধরলে হয়-যা আস্বাদন করা হয়, তাই রস।
জিহবার ক্ষেত্রে ‘রস’ শব্দের যে অর্থ, সামাজিকের চিত্ত নামক অন্তরিন্দ্রিয়ের ক্ষেত্রেও ‘রস’ শব্দের সেই অর্থ গ্রাহ্য। তাই অনুভূতিপ্রবণ চিত্ত দিয়ে শৃঙ্গার করুণ ইত্যাদি যা কিছু আস্বাদ্য, তা সাহিত্য সংসারে রস বলে গ্রহনীয়। ভরতমুনি অন্তরিন্দ্রিয়গ্রাহ্য রসের কথাই বলেছেন।
ভরতের মতে বাচিক, আঙ্গিক ও সাত্ত্বিক অভিনয়ের দ্বারা যা কাব্যে বিষয়কে ভাবায় তাই ভাব। এই ভাব থেকে রস হয়। তবে স্থায়ী ভাব থেকেই রস হয়। রতি হাস, শোক, ক্রোধ, উৎসাহ, ভয়, জুগুম্পা, বিষ্ময় এই আটটি স্থায়ী ভাব থেকে যথাক্রমে শৃঙ্গার, হাস্য করুণ, রৌদ্র, বীর, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভূত আটটি রস সৃষ্টি হয়। ভরত বলেছেন যে, স্থায়ীভাব বিভাব, অনুভাব ও ব্যভিচারী ভাবের সংযোগে রসনিষ্পত্তি হয়।
কাব্য নির্মাণ কলা: রস সম্পর্কে ভরতের মতামত
ভরতের মতে ভাবের উৎপত্তি ঘটে যা থেকে তাই বিভাব। বিভাব শব্দটি কারণ, নিমিত্ত ও হেতুর সমার্থক। আর অনুভাব হচ্ছে তাই, যা দিয়ে বাচিক-আঙ্গিক সাত্ত্বি অভিনয় অনুভাবিত হয়। যে সব ভাব রসগুলোর সম্পর্কিত হয়ে বিবিধ বিষয়ের অভিমুখে বিরেন করে তাই ব্যভিচারী।
কাব্য নির্মাণ কলা: রস সম্পর্কে ভরতের মতামত
স্থায়ীভাব থেকে রসের উৎপত্তি ঘটে। স্থায়ী ভাবের কারণ হলো বিভাব। যেমন- নায়িকার রূপ, গুণ, পোশাক ইত্যাদি নায়কের মনে রতিভাবের সৃষ্টি করে। আর সেই সাথে যদি কোকিলের ডাক, জোছনা রাত, নির্জন সমুদ্র সৈকত হয়, তাহলে নায়কের মনের ভাব আরও উত্তেজিত হয়। বিভাবের মাধ্যমে রস সৃষ্টির প্রথম পর্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
মনে ভাব উদিত হলে বাইর যে লক্ষণ প্রকাশ পায়, তাকে কাব্যে অনুভাব বলে। যেমন শোক ভাব যদি অন্তরে আসে, তবে ক্রন্দন, অশ্রুপাত, বক্ষে আঘাত, মুর্ছা যাওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে তা প্রকাশ পায়। অনুভাব রস সৃষ্টির দ্বিতীয় ধাপ।
অন্তরে সবভাব স্থায়ী নয়। যে সব ভাব উদয় ও তিরোহিত হতে হতে স্থায়ীভাবকে পুষ্ট করে তাকে ব্যভিচারী বা সঞ্চারী ভাব বলে।
রস নিষ্পত্তির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ভরত বলেছেন যে, যেমন নানা রকম ব্যঞ্জন, ্ঔষধি দ্রব্যের সংযোগে কটু, অম্ল প্রভূতি ষড়রস জন্মায় তেমনি নানা ভাবের উপস্থিতিতে রসনিষ্পত্তি হয়। বিদগ্ধ দর্শক নানাভাবের বাচিক আঙ্গিক সাত্তিক অভিনয়ের দ্বারা রঞ্জিত স্থায়ীভাবগুলো আস্বাদ্ধন করেন এবং আনন্দলাভ করেন।
ভরতের মতে ভাবের সংখ্যা ৪৯টি। তার মধ্যে স্থায়ী ভাব ৮টি, ব্যভিচারী ভাব ৩৩টি, আর সাত্তিকভাব ৮টি। যদিও অন্যরা সাত্তিকভাবগুলোকে অনুভাবের মধ্যে ধরেন। ভরত বলেন কেবল ৮টি স্থায়ী ভাবেই রসত্ব ঘটে।
কাব্য নির্মাণ কলা: রস সম্পর্কে ভরতের মতামত
বিভাব-অনুভাবেব সংযোগে ৪৯টি ভাব সাধারণীকৃত হয়েই যদি রস হয়, তবে শুধু স্থায়ীভাব রসে পরিণত হবে কেন ? ভরত এ প্রশ্নের জবাবে বলেছেন যে, লৌকিক জগতে একই রকম হাত-পা-শরীর থাকা সত্ত্বেও কুলশীল, বিদ্যাকর্ম, জ্ঞান-বিচক্ষণতার জন্য কেউ রাজা হয়। অন্যেরা হয় অনুচর। বহুলোকের মধ্যে যেমন রাজা নাম পায়, তেমনি বিভাব-অনুভাব-ব্যভিচারী ভাবগুলো ঘিরে থাকলেও স্থায়ীভাবই রস নাম পায়।
ভরতমুনি রস সৃষ্টির প্রক্রিয়ার সাথে চারটি জগতের কথা বলেছেন। জগৎ চারটি হলোÑলৌকিক জগৎ, কবির চিত্তজগৎ, কাব্য জগৎ, সহৃদয় সামাজিকের চিত্তজগৎ।
বাস্তব সংসারের নানা বিচিত্র সুখ-দুঃখ, ভাল-মন্দ ঘটনার উৎসস্থলই হলো লৌকিক জগৎ। লৌকিক জগতের ঘটনা কবির অন্তরে নানা ভাবের সৃষ্টি করে। লৌকিক জগতের ঘটে যাওয়া ঘটনা যখন কবির মনে বিশেষ ভাব জাগিয়ে তোলে, রসসৃষ্টির প্রক্রিযায় তখন তাকে কবির চিত্তজগৎ বলা হয়। কবি চিত্তে জন্ম নেওয়া ভাব যখন শব্দার্থে রূপ লাভ করে তখন তা কাব্যজগৎ। লৌকিক ভাব নাম ‘বিভাব’। কাব্য জগৎ অলৌকিক মায়ার জগৎ। আর সহৃয় সামাজিকের চিত্তজগৎ বলার অর্থ হচ্ছে পাঠক বা নাটকের ক্ষেত্রে দর্শকের চিত্তজগৎ। এক্ষেত্রে ‘সহৃদয়’ অর্থ হচ্ছে যাদের শিল্পকর্মের রসাস্বাদনের ক্ষমতাগুণ আছে তাদের চিত্তকে বোঝায়।
লৌকিক জগতের ভাব কবির চিত্তজগৎ ও কাব্যজগতের মধ্যে দিয়ে সামাজিকের চিত্তে স্থায়ী ভাবকে জাগিয়ে তোলে। সহৃদয় পাঠক কাব্যজগতের সাথে একত্রীভূত হয়ে অলৌকিক আনন্দ লাভ করে।
ভরতমুনির রসসূত্রের মূল কথা হচ্ছে বিভাব অনুভাব, ব্যভিচারী তিনটি উপাদানের একত্রিত হয়ে স্থায়ী ভাবকে আস্বাদনীয় করে তোলে এবং আস্বাদ্য স্থায়ী ভাবই রস। বিভাব স্থায়ীভাবকে জাগায়, অনুভাব ভাবকে বাইরে প্রকাশ করে, ব্যভিচারী স্থায়ীভাবকে মুষ্ট করে। ভরত মুনির এ রসসূত্র তর্কাতীতভাবে সকলেই মেনে নিয়েছেন।
নিবন্ধের বক্তব্য শিক্ষকতা জীবনে পাঠদানের প্রয়োজনে বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে সংকলিত।
প্রফেমর মো: আখতার হোসেন,
বাংলা বিভাগ,
সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।
রসতত্ত্ব বিষয়ক রেফারেন্স বইয়ের তালিকা
প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থ
- ভরত মুনি — নাট্যশাস্ত্র
- আনন্দবর্ধন — ধ্বন্যালোক
- আবিনবগুপ্ত — অভিনব ভারতী (ভরত মুনির নাট্যশাস্ত্রের টীকা)
- ভামহ — কাব্যালঙ্কার
- বিশ্বনাথ কবিরাজ — সাহিত্য দর্পণ
- রাজশেখর — কাব্যমীমাংসা
- কুণ্ডকুন্দরাচার্য — রসিকরণ
বাংলা রচয়িতা ও গবেষক
- ড. সুকুমার সেন — বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (প্রাসঙ্গিক অধ্যায়)
- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ — বাংলা সাহিত্যের কথা
- আশুতোষ ভট্টাচার্য — রসতত্ত্ব ও বাংলা সাহিত্য
- অমলেন্দু ভট্টাচার্য — বাংলা কাব্য ও রসতত্ত্ব
- ড. নীহাররঞ্জন রায় — বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস: আদি পর্ব
- অধ্যাপক বিশ্বনাথ ত্রিপাঠী — রসতত্ত্বের পরিচয়
- ড. সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত — বাংলা কাব্যের রসতত্ত্ব
- ড. গোবিন্দচন্দ্র দে — কাব্যতত্ত্ব ও সমালোচনা
- সত্যরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় — কাব্যতত্ত্ব: রস ও অলঙ্কার
ইংরেজি রেফারেন্স
- Gerow, Edwin. Indian Poetics. (Oxford University Press)
- Keith, A. Berriedale. The Sanskrit Drama.
- Hiriyanna, M. Art Experience in Indian Philosophy.
- De, S.K. History of Sanskrit Poetics.
- Masson, J.L. Aesthetic Theories of India.
- Pollock, Sheldon. A Rasa Reader: Classical Indian Aesthetics. (Columbia University Press, 2016)
পড়ে ফেললাম স্যার
এই সব পড়তে হবে🙂
পড়লাম স্যার
এত বিশদ আলোচনা 🥹
এত বিশদ আলোচনা 🥹