‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থের কালিদাস ও রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধ অবলম্বনে দুই কবির মধ্যকার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য নির্দেশ কর।


মননশীল ও যুক্তবাদী প্রাবন্ধিক আবদুল ওদুদের ‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থটি বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের ধারায় এক অনন্য গ্রন্থ। গ্রন্থটিতে লেখকের ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক ভাবধারা প্রকাশ পেয়েছে। সে ভাবধারার মধ্যে একটি উদার, মানবিক, যৌক্তিক, অসা¤প্রদায়িক এবং বৈশ্বিকবোধ অভিব্যক্ত হয়েছে। সাহিত্য-ভাবনার মধ্যে রয়েছে একটা সার্বজনীন কল্যাণবোধ। প্রভাবমন্ডিত মেরুদন্ড সম্পন্ন সাহিত্যিকের খোঁজ প্রাবন্ধিক দেশ-বিদেশের একাল-সেকালের সাহিত্য স্রষ্টাদের নিয়ে আলোচনা করেছেন। ‘কালিদাস ও রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধটিতে দুই কবির মধ্যকার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য নির্ণয় করেছেন।

কাজী আবদুল ওদুদ তাঁর ‘কালিদাস ও রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে প্রাচীন ভারতের কবি-নাট্যকার কালিদাস এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের নির্মাতা রবীন্দ্রনাথের কাব্যানুভবের তুলনামূলক নন্দনতাত্তি¡ক আলোচনা করেছেন। কালিদাসের ভোগবাদ রবীন্দ্রনাথ সচেতনভাবে নিষ্কাম প্রেমবাদে শোধন করে নিয়েছেন বলেই রবীন্দ্রনাথ মহত্তম স্রষ্টা।
দুই যুগের দুই মহাভাবুক কাজী আবদুল ওদুদকে বিমুগ্ধ ও বিস্মিত করেছে। তাঁদের দু’জনের তুলনার মধ্য দিয়ে প্রাবন্ধিক তাঁদের শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেছেন। এ কাজটি যেমন প্রীতিকর, তেমনি কষ্টসাধ্য। তবুও এ কষ্টসাধ্য কাজটি প্রাবন্ধিক অনায়াসে করতে সক্ষম হয়েছেন।
কালিদাস ও রবীন্দ্রনাথ দু’জনেই সৌন্দর্যের পূজারি। দু’জনেই পৃথিবীর শোভা-সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন এবং উপভোগ করেছেন সে শোভা। কালিদাস বলেছেন-
অহো উদাররমণীয়া পৃথিবী।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেনÑ
শ্যামলা বিপুলা এ ধরার পানে,
চেয়ে দেখি আমি মুগ্ধ নয়াণে।
(কবির পুরষ্কার)
কালিদাসের ও রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যবোধ ও রসবোধে এরকম যথেষ্ট মিল থাকা সত্তে¡ও বড় পার্থক্য এখানে যে কালিদাস যথেষ্ট ভোগবাদী। তবে সবল সেই ভোগবাদ অসুন্দর নয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আনন্দবাদী। কালিদাস ও রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক মনে করেনÑ
কালিদাসের সৌন্দর্যবোধ ও রসবোধের চাইতে সূ²তর রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যবোধ ও রসবোধ।
প্রাবন্ধিক এ বিষয়ে অনেক উদাহরণসহ আলোচনা করে বলেন-
কালিদাসের ভোগবাদ রবীন্দ্রনাথ যেন সজাগ ভাবেই ‘শোধিত’ করে নিয়েছেন।
কালিদাস ভোগবাদী কবি হয়েও আশ্চর্যভাবে ত্যাগবাদীও। কেননা মহারাজ অজের রাজ্যভোগ আর দিগবিজয়ী রঘুর সন্ন্যাসের কৃচ্ছ সাধনা এই দুয়ের যে ছবি তিনি পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছেন তা মনোরম। প্রকৃত মহত্তে¡র ছবিও কালিদাস এঁকেছেন। ভারত রাজ্যলোভী না হয়ে রামের অনুপস্থিতিকালে দীর্ঘকাল রাজ্য পরিচালনার ছবিও আছে।
একই সঙ্গে ভোগ ও ত্যাগ রবীন্দ্রনাথেও আছে, কিন্তু এক্ষেত্রে কালিদাসের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পার্থক্য সূ² ও গভীর। কালিদাসের চোখে সংসার ও সন্ন্যাস যেন দুই স্বতন্ত্র্য জগৎ, একটিকে সম্পূর্ণ বর্জন করে তবেই যেন অন্যটিতে প্রবেশ পথ পাওয়া যায়। অর্থাৎ মানুষ যতদিন সংসারে আছে সে মুখ্যত ভোগবাদী। অবশ্য মহৎদেব ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটে।
আত্মার মধ্যে পরমাত্মার উপলদ্ধির মাহাত্ম্য সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ সচেতন ছিলেন। এই প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথের ‘নৈবেদ্য’ কবিতা থেকে উদ্বৃত করেছেন-
ওগো অন্তর্যামী,
অন্তরে যে রহিয়াছে অনির্বাণ আমি
দুঃখে তার লব আর দিব পরিচয়।
কালিদাসের অধ্যাত্মিকতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতার বড় পার্থক্য এই যে, রবীন্দ্রনাথ মুখ্যতা গুহ্য সাধনবাদী মরমী নন ‘বিকাশ ধর্মী মানবতা’ পন্থী। ভগবানে তাঁর যতখানি আনন্দ তার চাইতে বেশি আনন্দ মানুষের জাগতিক জীবনের সর্বাঙ্গীন উৎকর্ষ সাধনায়। রবীন্দ্রনাথ মনে করেন যে, মানুষকে হতে হবে ঈশ্বরের মত সুন্দর ও শক্তিমান অর্থাৎ সৃষ্টিধর্মী তাঁর আরেকটি বিখ্যাত বাণী এক্ষেত্রে স্মরণীয়Ñ
যা শাস্ত্র তাই বিশ্বাস্য নয়, যা বিশ্বাস্য তাই শাস্ত্র।
কালিদাসের কালে ভারতবর্ষে প্রবল হয়েছিল বেদপন্থী ও বেদ বিরোধীদের সংঘর্ষ। কালিদাস ছিলেন বেদপন্থী বর্ণাশ্রমধর্মের শক্তিমান সমর্থক। রবীন্দ্রনাথের যুগে ভারতবর্ষে যে সংঘর্ষ হয়েছিল তা হলো প্রাচ্য আর প্রতীচ্যের সংঘর্ষ। এই ব্যাপক ও গভীর সংঘর্ষ সমস্ত চেতনা দিয়ে অনুভব করবার শক্তি নিয়ে জন্মেছিলেন রবীন্দ্রনাথ বলেই তাঁর চিন্তাধারার ও আদর্শের অপূর্ব মর্যাদা। প্রাবন্ধিকের মতে রবীন্দ্রনাথ যেন সেকাল ও একালের মধ্যবর্তী সেতু। একালের মানুষের চিন্তায় ‘মরমী’ সাধনার চেয়ে বিকাশধর্মী মানবতা বেশি প্রভাব বিস্তার করে আছে। তাই রবীন্দ্রনাথের আদর্শ কালিদাসের আদর্শের চাইতে ব্যাপকতর ; একালের মানুষের জন্য বেশি সত্য ও সার্থক।
রবীন্দ্রনাথ জীবনাদশে সমৃদ্ধ হলেও কালিদাস অঙ্কন কুশলতায় কালজয়ী শ্রেষ্ঠ কবি। কালিদাসের মতো সেই কালজয়ী কবি প্রতিষ্ঠা রবীন্দ্রনাথও লাভ করবেন যে যে কারণে-
“কালিদাসের রচনায় রয়েছে অপূর্ব লালিত্য ও গাম্ভীর্য ; রবীন্দ্রনাথের রচনাও তুল্যরূপে ললিত ও গম্ভীর। হয়তো এক্ষেত্রে কালিদাসই রবীন্দ্রনাথের বিশিষ্ট পদপ্রদর্শক। কিন্তু বিদ্যা এক্ষেত্রে যোগ্য শিষ্যে ন্যস্ত হয়েছিল।”
কালিদাস জন্মেছিলেন স্বাধীন ভারতবর্ষে, সেই স্বাধীন ভারতবর্ষে ছিলো মহাবিক্রম নৃপতিকুল। কালিদাসের শ্রেষ্ঠ নায়করা তাই শক্তিমান সৈনিক অমিতপরাক্রম। রবীন্দ্রনাথের জন্ম পরাধীন ভারতবর্ষে, কিন্তু সেই পরাধীনতার মধ্যেও ভারতবাসীর অন্তরে নবশক্তির উলাস জেগেছিল। রবীন্দ্রনাথ সেই জাগরণের কবি। তাই, তার নায়কেরাÑ
ব্যবসায়ে বীর-সৈনিক না হলেও প্রকৃতপক্ষে বীরত্বধর্মী, পরাজয় স্বীকার করা তাদের স্বভাব নয়, জীবনে নব নব মহিমার সম্ভাবনায় উদ্বোধিত হওয়া তাদের জন্মগত অধিকার।
কালিদাস সৃষ্টি করেছেন শকুন্তলাকে, অপূর্ব সেই নারী মূর্তি। মনে হয় শিল্পে নারীসৃষ্টির চরম রূপ। শকুন্তলা একাধরে সে উর্বশী আর লক্ষ্মী , মর্ত্য আর স্বর্গ, বসন্ত আর হেমন্ত। রবীন্দ্রনাথও এক অপূর্ব মাতৃমূর্তি আনন্দময়ীকে, যা জগতের সাহিত্যে হয়তো অদ্বিতীয় মাতৃমূর্তি। কিন্তু শকুন্তলার মতো একই সঙ্গে মহিমা ও মোহনতা সেই মূর্তিতে নেই, তাই শিল্পসৃষ্টি হিসেবে শকুন্তলার গৌরব বেশি। তবে এক পরমমোহন শিল্প-সৃষ্টি রবীন্দ্রনাথও করেছেন, সেটি হচ্ছে তাঁর নিজের অন্তরাত্মা। প্রকৃতির অজস্র লীলায় সে অপরূপভাবে চঞ্চল। অথচ এই যে এত লীলাচাঞ্চল্য; সৌন্দর্যের পরমসূ² অনুভূতি, সব অজানার উদ্দেশ্যে স্তব নিবেদন-
আমার সব চেতনা সব বেদনা
রচিল এ যে কী আরাধনা ……….
গম্ভীর ও অকুল স্তবনিবেদন জগতে ঢের হয়েছে, কিন্তু এমন মোহন স্তবনিবেদন হয়তো আর কোনো দ্বিতীয় কবির দ্বারা সম্ভবপর হয় নি।
কালিদাস ও রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধে কালিদাস ও রবীন্দ্রনাথের কবি প্রতিভা ও তাঁদের রসবোধ ও সৌন্দর্যবোধের রসাল আলোচনা পাঠকের কাছে তাঁদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধূসূদন কলেজ, যশোর।