কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের ময়নাতদন্ত।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক …

কৃষ্ণকান্তের উইল – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বাংলা উপন্যাসের ইতিহাস মূলত আধুনিক কালের ইতিহাস। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলা গদ্যের যাত্রা শুরু হলেও উপন্যাস রচনার যোগ্যতা ও সুনির্দিষ্ট রূপ নির্মাণে আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আগমন পর্যন্ত। প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ বাংলা উপন্যাসের প্রথম যুগচিহ্নিত সৃষ্টি হলেও, তা কাঠামোগতভাবে পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসে পরিণত হতে পারেনি; বরং তা ছিল উপন্যাসের পূর্বসূরি বা রূপান্তরিত আখ্যান। প্রকৃত অর্থে বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের শিল্পরূপ, চরিত্রগঠন, নৈতিক জটিলতা, কাহিনির গতি—এই সবকিছুর সার্থক সমন্বয় দেখা যায় বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে।

এই পরিপ্রেক্ষিতেই ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ (১৮৮২–১৮৮৪) বাংলা সাহিত্যের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামাজিক উপন্যাস। প্রথমে ধারাবাহিকভাবে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রকাশিত এই আখ্যান পরবর্তীতে বঙ্কিমচন্দ্রের নিজের জীবদ্দশায় চারবার মুদ্রিত হয়। এ থেকে বোঝা যায়—উপন্যাসটি কতটা জনপ্রিয়, কতটা বিতর্কিত এবং কতটা পাঠকআকর্ষক ছিল।

উপন্যাসটির কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে এক ত্রিভুজ সম্পর্ক—রোহিণী, ভ্রমর, গোবিন্দলাল। তবে কাহিনির মূল স্পন্দন, নৈতিক দ্বন্দ্ব, শিল্পীসত্তার উদ্‌ঘাটন—সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে রোহিণী চরিত্রে। বঙ্কিমচন্দ্র নিজেও স্বীকার করেছিলেন—রোহিণীকে শেষমেশ হত্যা করা তাঁর ‘ঘাট’ বা সাহিত্যিক ব্যর্থতার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঠকেরা প্রশ্ন তুলেছিলেন—রোহিণীকে কেন মরতে হলো? তার কি আর কোনো জীবনপথ ছিল না?

এই বিশ্লেষণে আমরা প্রথমে কাহিনি, তারপর সামাজিক প্রেক্ষাপট, এরপর চরিত্রসমূহের মানসিক গঠন, এবং শেষে রোহিণী চরিত্রের বিশেষ শিল্পগুণ নিয়ে গভীর আলোচনা করব।

১. বাংলা উপন্যাস ও ‘ কৃষ্ণকান্তের উইল ’—ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বাংলা উপন্যাস কোনো হঠাৎ আবির্ভূত সাহিত্যধারা নয়; এর গঠন-প্রক্রিয়া যুক্ত হয়েছে—

বঙ্কিমচন্দ্রের হাত ধরেই উপন্যাস হয় কাহিনি+চরিত্র+মনস্তত্ত্ব+সমাজচিত্রের একটি সমন্বিত শিল্পধারা। তাঁর প্রায় প্রতিটি উপন্যাসেই—

‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এর ক্ষেত্রেও বিষয়টি ব্যতিক্রম নয়।

২. কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের কাহিনির সারসংক্ষেপ : উইল—ভাগ—ভালোবাসা—দ্বন্দ্ব

উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে ধনী জমিদার কৃষ্ণকান্ত। তিনি মৃত্যুর আগে উইলে সম্পত্তি বণ্টন করেন—

এই সম্পত্তিবণ্টনই পরবর্তীকালে বহু সংকট সৃষ্টি করে।

ত্রিভুজ সম্পর্ক

বিবাগী প্রেমের ফল

রোহিণীর চরিত্রের উন্মোচন

রোহিণী গোবিন্দলালের প্রতি গভীর প্রেমে দগ্ধ হলেও তার চরিত্রে রয়েছে—

কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের শেষ পরিণতি

৩. কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের সামাজিক ও নৈতিক তাৎপর্য

১. হিন্দু সমাজে বিধবার অবস্থান

২. সম্পত্তি বণ্টন—উইলের সামাজিক প্রভাব

৩. নৈতিক দ্বন্দ্ব : শিল্পীর পরাজয়?

রোহিণীর মৃত্যু নিয়ে পাঠকের প্রশ্ন ছিল— “কেন রোহিণীকে মরতেই হলো?”

বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই লিখেছিলেন বঙ্গদর্শনে— “আমার ঘাট হইয়াছে।”

অনেকে মনে করেন—

৪. কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের চরিত্রসমূহের বিশ্লেষণ

১. কৃষ্ণকান্ত

২. ভ্রমর

৩. গোবিন্দলাল

৫. রোহিণী চরিত্র : উপন্যাসের হৃদয়

রোহিণী : সৌন্দর্য, নিষিদ্ধ প্রেম ও আত্মবিনাশের প্রতীক

রোহিণী এ উপন্যাসের কেন্দ্রমুখী শক্তি। কাহিনি তার চারপাশে ঘোরে।
এক কথায়—সে ‘বাংলা সাহিত্য ইতিহাসের অন্যতম জটিল নারী চরিত্র’।

রোহিণীর বৈশিষ্ট্য

রোহিণীর প্রেমও নিষিদ্ধ সমাজের কাছে

বিধবা নারীর—

রোহিণী : বঙ্কিমচন্দ্রের নৈতিকতা বনাম শিল্পবোধ

বঙ্কিমচন্দ্রের সমস্যাটি এখানেই।

১. শিল্পীর দৃষ্টিতে রোহিণী

২. নীতিবাদীর দৃষ্টিতে রোহিণী

৬. কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের —কাহিনির বৈশিষ্ট্য (পয়েন্ট আকারে)

৭. সাহিত্যিক দিক : কেন এই উপন্যাস পাঠযোগ্য?

১. চরিত্রচিত্রণ

বঙ্কিমচন্দ্র চরিত্র নির্মাণে অসাধারণ।
রোহিণী–ভ্রমর–গোবিন্দলাল তিনজনই ভিন্ন ভিন্ন প্রতীক—

২. ভাষাশৈলী

৩. কাহিনির নাটকীয়তা

৮. চূড়ান্ত মন্তব্য : উপন্যাসের শিল্পগুণ

রোহিণীর মৃত্যু পাঠকের মনে দাগ কাটলেও, তা পুরো উপন্যাসের নৈতিক আলোচনাকে তীব্র করে।
গোবিন্দলালের পতন আমাদের শেখায়—দায়িত্ব এড়িয়ে প্রেম টিকে থাকে না।
ভ্রমরের মৃত্যু দাম্পত্যের শুদ্ধতার প্রতীক হয়ে ওঠে।

সুতরাং, এই উপন্যাস শুধু প্রেমের গল্প নয়; এটি সমাজ, নীতি ও মানুষের ভাঙচুর হওয়া স্বপ্নের গল্প।

কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের সারসংক্ষেপ

(১) ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ —পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস বিশ্লেষণ

বঙ্কিমচন্দ্রের “কৃষ্ণকান্তের উইল” বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে এক অনন্য সৃষ্টি। সম্পত্তি-বিষয়ক একটি উইলকে কেন্দ্র করে চলমান পারিবারিক দ্বন্দ্ব—লঘু বিষয়ের মতো মনে হলেও লেখক তা থেকে নির্মাণ করেছেন মানুষের মনোজগতের সূক্ষ্ম ওঠানামা, প্রেম–অপ্রেমের অন্ধ মোহ, সামাজিক নিষেধ–নির্বন্ধ এবং নৈতিকতার পতনের এক গভীর নকশা। এই উপন্যাসে কাহিনির গতি যেমন আকর্ষণীয়, চরিত্রচিত্রণ তেমনি বহুমাত্রিক।

গোবিন্দলাল: নৈতিক দ্বিচারিতার প্রতিনিধি

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্র গোবিন্দলাল প্রথম দৃষ্টিতে এক মার্জিত, আকর্ষণীয়, সুস্বভাব যুবক। কিন্তু গল্পের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তার চরিত্রের আসল রূপ প্রকাশিত হয়। তার নৈতিকতা নির্বাচিত; পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলে যায়। ভ্রমরকে ভালোবাসলেও রোহিণীর রূপ–বুদ্ধির জটিল আকর্ষণে সে বারবার ভেঙে পড়ে। রোহিণীকে সে আশ্রয় দেয়, কিন্তু তাকে স্ত্রী–মর্যাদা দিতে সাহস পায় না। আবার তার কাছ থেকে চায় ‘স্ত্রী–সুলভ’ ত্যাগ ও বিশ্বস্ততা। এই দ্বৈততা গোবিন্দলালকে মানবিক করলেও নৈতিকভাবে দুর্বল প্রমাণ করে।

ভ্রমর: অন্তঃস্থ জগতের পবিত্রতার প্রতীক

ভ্রমর একেবারেই বিপরীত ধাঁচের। সে বিশ্বাসী, অনুগত, পতিনিষ্ঠ। বঙ্কিম ভ্রমরের সরলতা দেখাতে গিয়ে তার মানসিক গভীরতাকে আরো উন্মোচন করেছেন—

“হে সন্দেহভঞ্জন, তুমি আমার সন্দেহ—তুমিই আমার বিশ্বাস।”

এই এক বাক্য তার প্রেম ও বেদনার সারসংক্ষেপ। ভ্রমর জানে স্বামী বিচ্যুত, তবু তার ভালোবাসা ভাঙে না। এই আত্মসমর্পণকে সরলতা মনে হলেও, তার মধ্যে আছে গভীর মানবিকতার শক্তি।

রোহিনী: সমাজের বঞ্চনা থেকে জন্ম নেওয়া জটিল চরিত্র

রোহিনী উপন্যাসের সবচেয়ে জীবন্ত, আধুনিক, বহুস্তরবিশিষ্ট নারী। বঙ্কিম তাকে ‘খল’ করেননি—বরং দেখিয়েছেন কেন সে এমন হলো। বাল্যবিধবা রোহিনীর দেহ–মন–বাসনা বদ্ধ ছিল সমাজের কঠিন নিয়মে। তার স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, প্রেমের খোঁজ, জীবনের উচ্ছ্বাস—সবই গোপনে জমে বিস্ফোরিত হয়। তার ‘চুরি’ আসলে সমাজের প্রতি অবচেতন প্রতিবাদ; তার আত্মহত্যাপ্রবণতা মানসিক বিচ্ছিন্নতার ফল। গোবিন্দলালের প্রতি তার প্রেম যেমন আকস্মিক, তেমনি অসহায়। শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুই প্রমাণ করে—প্রেমের খোঁজে বের হওয়া রোহিণী আসলে নিজের পরিচয়টিই হারিয়ে ফেলে।

ত্রিভুজ প্রেমের মনস্তত্ত্ব

ভ্রমরের মধ্যে আছে গভীর স্থিরতা; রোহিনীর মধ্যে প্রবল অস্থিরতা। গোবিন্দলাল প্রথমটিকে খোঁজে, পরে দ্বিতীয়টিতে মুগ্ধ হয়—আবার তাকে নিয়েই অনিশ্চিত। এই বিপরীত শক্তির সংঘর্ষই উপন্যাসের প্রধান নাটকীয়তা সৃষ্টি করেছে।

সামাজিক সত্য ও ট্র্যাজিক পরিণতি

উপন্যাসের শেষ অংশ বঙ্কিমীয় ট্র্যাজেডির উজ্জ্বল উদাহরণ। রোহিণী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়; ভ্রমর শোকে ভেঙে পড়ে প্রাণ হারায়; গোবিন্দলাল সব হারিয়ে গৃহত্যাগী হয়। মিলন নয়, এই বিয়োগান্তই উপন্যাসকে বাস্তবতার কক্ষে নিয়ে আসে।

“কৃষ্ণকান্তের উইল” কেবল ত্রিভুজ প্রেম নয়; এটি সমাজের বিধবা-বঞ্চনার ইতিহাস, পুরুষের নৈতিক দ্বিচারিতা, নারীর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, এবং প্রেম–মোহ–প্রতারণার মনস্তত্ত্বের এক কালজয়ী দলিল।

 (২) রোহিণী চরিত্রের বিশেষত্ব — বিশ্লেষণধর্মী গদ্য

রোহিণী বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে এমন একটি চরিত্র, যে একই সঙ্গে সুন্দর, বিপজ্জনক, আকুল, অসহায় এবং অসীম জীবন্ত। বঙ্কিমচন্দ্র যে সময় লিখছেন—সেই সমাজে বিধবা নারীর অবস্থান ছিল নিষ্ঠুরভাবে সংকীর্ণ। সে সমাজে একটি কিশোরী মেয়ের মনোজগৎ, তার স্বপ্ন, তার দেহ-চেতনার বিকাশ—এসবকে স্বীকার করার মতো জায়গাই ছিল না। তাই রোহিণী সমাজের দৃষ্টিতে যতটা ‘অপরাধিণী’, পাঠকের দৃষ্টিতে ততটাই মানবিক এক বিদ্রোহিণী।

রোহিণীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য—তার জটিলতা। বাংলা উপন্যাসে এর আগে নারীরা হয় অতিরিক্ত পবিত্র, নয় অতিরিক্ত দুষ্ট রূপে দেখা গেছে। কিন্তু রোহিনী এই দুইয়ের কোনোটিই নয়। সে ভুল করে, ভালোবাসে, আবার সেই ভালোবাসাকে চুরি করেও ফেলে। তার ‘চুরি’—স্বভাবগত নয়; তা ক্ষণিকের দুর্বলতা এবং বহুদিনের জমে থাকা মানসিক ক্ষুধার ফল। তার আত্মহত্যাপ্রবণতা তার দুষ্কৃতির প্রকাশ নয়, বরং নিজের অস্তিত্বকে না-পাওয়ার গভীর হতাশা।

রোহিণী প্রেমে যেমন আকর্ষণ জাগায়, তেমনি ভীতি সৃষ্টি করে। তার রূপের মধ্যে আছে আগুন, তার আচরণের মধ্যে অনিশ্চয়তা। গোবিন্দলালের প্রতি তার আকর্ষণ এমনই অকূলে, যা যুক্তিকে অস্বীকার করে। আবার সেই গোবিন্দলাল তার দুর্বলতার সুযোগ নেয়, তাকে স্ত্রী মর্যাদা দেয় না—তবু তার কাছ থেকে নিখুঁত বিশ্বস্ততা চায়। রোহিণীর এই অসম সম্পর্কই শেষমেশ মানসিক বিপর্যয় তৈরি করে।

রোহিনী সুন্দরী, বুদ্ধিমতী, প্রাণচঞ্চল—কিন্তু একই সঙ্গে  অসহায়, দিশেহারা, সামাজিক বিধিনিষেধের শিকার। এই দ্বৈত অথচ সজীব রূপটাই তাকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আধুনিক নারীচরিত্রে পরিণত করেছে।

রোহিনীকে ঘৃণা করা যায় না; কারণ তার প্রতিটি ভুলের পেছনে লুকিয়ে আছে বঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাস।

 আবার তাকে সম্পূর্ণ নির্দোষও বলা যায় না; কারণ তার সিদ্ধান্তগুলো একাধিক মানুষের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে। এই দ্বিধার মধ্যেই রোহিণী চরিত্রের অনন্যতা।

শিল্পের সাথে রক্ষণশীলতার দ্বন্দ্ব:

বিধবা নারী রোহিণীকে অবলম্বন করে বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই শিল্পবোধ ও নৈতিক আদর্শের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। বিধবা নারী রোহিণী হত্যার ঘটনাটির শৈল্পিক ও নৈতিক বিচারমান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বঙ্কিমচন্দ্র এ প্রসঙ্গে বঙ্গদর্শনে লিখেছিলেন, অনেক পাঠক আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছেন-

‘রোহিণীকে মারিলেন কেন? অনেক সময়ই উত্তর দিতে বাধ্য হইয়াছি, আমার ঘাট হইয়াছে।’

 কৃষ্ণকান্তের উইল: উপন্যাস-ইতিহাস, কাহিনি ও চরিত্র-বিশ্লেষণ

বাংলা সাহিত্যে উপন্যাস প্রকৃত অর্থেই আধুনিক যুগের সৃষ্টি। ১৮০১ সালে বাংলা গদ্যের সূত্রপাত হলেও উপন্যাস রচনার জন্য একটি দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করতে হয়েছে। প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ (১৮৫৭) বাংলা উপন্যাসের জনকস্বরূপ হলেও তা সার্থক উপন্যাসের পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। সেই সার্থক উপন্যাসের জন্মধারা স্থাপন করেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর হাত ধরেই বাংলা উপন্যাসে কাহিনিনির্মাণ, চরিত্র-প্রতিমা, পরিবেশ-মানচিত্র এবং শিল্প-রীতির পূর্ণতর রূপ ফুটে ওঠে। এ ধারার একটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি হলো তাঁর সামাজিক উপন্যাস ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’

১৮৮২ ও ১৮৮৪ সালে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় বিভিন্ন কিস্তিতে উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় এবং বঙ্কিমের জীবদ্দশায় চারটি সংস্করণ বেরোয়—যার সর্বশেষটি ১৮৯২ সালে।
উপন্যাসটি কেবল উইল-কেন্দ্রিক একটি পারিবারিক দ্বন্দ্ব নয়; এটি সমাজের বিধবা-বঞ্চনা, পুরুষের নৈতিক দ্বিচারিতা, নারীর প্রেম-ইচ্ছা ও সামাজিক অবদমনের গভীর এক দলিল।

কাহিনির নতুনভাবে বিশ্লেষণ

কৃষ্ণকান্ত নিজের উইলে দুই ছেলেকে তিন আনা করে, স্ত্রী ও কন্যাকে এক আনা করে এবং ভাইপো গোবিন্দলালকে আট আনা দিয়ে যান—‘সৎ চরিত্রের’ বলে। কিন্তু বাস্তব ঘটনা এই ‘সততা’র ধারণাকে ভেঙে দেয়।

গোবিন্দলাল, তার স্ত্রী ভ্রমর এবং বিধবা রোহিণীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনি। রোহিণীর রূপ, বুদ্ধি ও চঞ্চলতা গোবিন্দলালকে আকর্ষণ করে।

ভ্রমরের স্বামী থাকা সত্ত্বেও রোহিণী প্রেমপ্রবণতার বশে প্ররোচনা দেয় গোবিন্দলালকে, এবং গোবিন্দলালও নৈতিকতার ভীরুতায় সেই টানে ভেসে যায়। পরে কৃষ্ণকান্ত গুরুতর অসুস্থ হলে গোবিন্দলাল-ভ্রমর তার কাছাকাছি ফিরে যায়, আর এই সুযোগে রোহিণী নিশাকরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।

গোবিন্দলালের চরিত্রহীনতা কৃষ্ণকান্ত বুঝতে পেরে ভ্রমরের নামে আট আনার নতুন উইল করে দেয়। কিন্তু ভ্রমর স্বামীর অবহেলায় ক্ষীণ হয়ে মৃত্যুর মুখে পড়ে। গোবিন্দলাল অন্তঃকরণে ভেঙে পড়ে—শোকে-দুঃখে গৃহত্যাগ করে এবং বারো বছর পর একবার বাড়িতে ফিরে আবার অদৃশ্য হয়ে যায়।

 রোহিণী চরিত্রের বিশদ, নতুন বিশ্লেষণ

রোহিণী উপন্যাসটির কেন্দ্রবিন্দু—বাংলা সাহিত্যের এক বিরল বহুমাত্রিক নারীচরিত্র।
তিনি—

• রূপবতী,
• চঞ্চলা,
• বুদ্ধিমতী,
• আবেগপ্রবণ,
• এবং সর্বোপরি বিধবা।

বিধবা রূপ তার জীবনের ট্র্যাজেডির মূল কেন্দ্র। শাস্ত্রীয় নিয়মে তার প্রেম, মনোবাসনা ও দাম্পত্য জীবনের পথ বন্ধ। কিন্তু তার দেহ-মন স্বাভাবিকভাবেই ভালোবাসা খোঁজে—যা সমাজের কঠিন নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সংঘর্ষে অবতীর্ণ হয়। এই সংঘর্ষই তার চরিত্রকে জটিল ও মানবিক করে তোলে।

রোহিণী খল নয়—সমাজের নির্মমতার শিকার

বঙ্কিম তাঁর অন্যান্য নারীর মতো রোহিণীকেও ‘খল’ করেননি। তিনি দেখিয়েছেন—কীভাবে সমাজ নারীর ইচ্ছা, আবেগ ও স্বাধীনতার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। রোহিণী সেই নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে চায়, কিন্তু পারে না—ফলে সে ভুল করে, আবার সেই ভুলের শাস্তিও ভোগ করে।

 তার ‘চুরি’ নৈতিক পতন নয়—অন্তর্দ্বন্দ্বের ফল

উপন্যাসে রোহিণীর চুরির ঘটনা অনেক পাঠকের চোখে নৈতিক অপরাধ মনে হলেও বঙ্কিম দেখিয়েছেন—এটা ছিল মানসিক চাপ, অস্থিরতা ও মুহূর্তের আশ্রয়হীনতার বহিঃপ্রকাশ।

 আত্মহত্যাচেষ্টা—ব্যর্থ প্রেম ও দমিত যৌবনের আর্তি

গোবিন্দলালকে না পাওয়ার বেদনা এবং সমাজের নিষেধ-সীমা তার জীবনের সব দরজা বন্ধ করে দেয়। ফলে রোহিণী বারবার আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়—এটি তার অপরাধ নয়, মানসিক বিচ্ছিন্নতার ফল।

 গোবিন্দলালের নৈতিক দুর্বলতা রোহিণীকে ভেঙে দেয়

গোবিন্দলাল তাকে ভালোবাসে, আবার গ্রহণ করে না। এই দ্বন্দ্ব রোহিণীর শুধু অস্তিত্বই নয়, তার আত্মপরিচয়ও ধ্বংস করে। ফলে রোহিণীর মৃত্যু শুধু গল্পের ঘটনা নয়—এটি সমাজের এক বিধবার অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার প্রতীক।

 ভ্রমরের নতুন বিশ্লেষণ

ভ্রমর শান্ত, নিরীহ, পতিব্রতা ও সরল। বঙ্কিম তাকে আদর্শায়িত করেননি—বরং দেখিয়েছেন তার মানসিক গভীরতা। তার বিখ্যাত বাক্য—

“হে সন্দেহভঞ্জন! তুমি আমার সন্দেহ—তুমিই আমার বিশ্বাস।”

এই বাক্যে ভ্রমরের প্রেম, যন্ত্রণা, মমতা ও নৈতিক দৃঢ়তার সবকিছু ফুটে ওঠে।

ভ্রমর রোহিণীর প্রতিপক্ষ নয়—সে এক আলাদা জগৎ, স্থিতির জগৎ; রোহিনী হচ্ছে অস্থিরতার জগৎ। এই দুই বিপরীত নারীর টানাপড়েনেই গোবিন্দলালের মনোজগৎ দোদুল্যমান হয়ে ওঠে।

বঙ্কিমচন্দ্রের নৈতিক আদর্শ বনাম শিল্পীচেতনা

রোহিণীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বঙ্কিম নিজেই দ্বিধায় পড়েছিলেন। পাঠকের প্রশ্নে তিনি লিখেছিলেন—

“আমার ঘাট হইয়াছে।”
“যিনি কেবল গল্পের অনুরোধে উপন্যাস পাঠ করেন, তিনি এ উপন্যাস না পড়িলেই বাধ্য হইেন।”

এই বক্তব্যে স্পষ্ট—বঙ্কিম কেবল কাহিনি বলেননি; তিনি সমাজের গভীর সমস্যার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাই অনেকে মনে করেন—এখানে নীতিবাদী বঙ্কিম শিল্পী বঙ্কিমকে কিছুটা পরাভূত করেছেন। আবার অন্যরা বলেন—এ পরিণতিই রোহিণী চরিত্রকে ট্র্যাজিক মহিমায় উত্তীর্ণ করেছে।

কৃষ্ণকান্তের উইল —সংক্ষিপ্ত কাহিনি (Summary)

কৃষ্ণকান্তের উইল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত একটি সামাজিক উপন্যাস (১৮৭৮) যেখানে গোবিন্দলাল–ভ্রমর–রোহিণীর ত্রিভুজ প্রেম এবং উইল-কেন্দ্রিক সম্পত্তি বিবাদ গল্পের মূল স্রোত।

জমিদার কৃষ্ণকান্ত মৃত্যুর আগে উইল করে তাঁর দুই পুত্র, কন্যা, স্ত্রী এবং ভ্রাতুষ্পুত্র গোবিন্দলালকে সম্পত্তি বণ্টন করেন। এতে বড় ছেলে হরলাল অসন্তুষ্ট হয় এবং নানা চক্রান্তের জন্ম দেয়। কৃষ্ণকান্তের মৃত্যুর পর গল্পের কেন্দ্রে আসে—
গোবিন্দলাল, তার স্ত্রী ভ্রমর, এবং সুন্দরী বাল্যবিধবা রোহিণী।

ভ্রমরকে ভালোবাসলেও রোহিণীর রূপ, বুদ্ধি ও চাতুর্যে আকৃষ্ট হয়ে গোবিন্দলাল তাকে আশ্রয় দেয় এবং একসময় পালিয়েও যায়। কিন্তু রোহিণীর অস্থিরতা ও সম্পর্কের দ্বিচারিতা গোবিন্দলালকে সন্দিহান করে তোলে। শেষে নিশাকর নামের এক যুবকের সাথে রোহিণীর গোপন সাক্ষাত দেখে ক্ষুব্ধ গোবিন্দলাল তাকে গুলি করে হত্যা করে।

গোবিন্দলাল সাত বছর কারাভোগের পর ফিরে এসে দেখে তার অনুগত স্ত্রী ভ্রমর শোকে মৃত্যুশয্যায়। ভ্রমরের মৃত্যুতে সে বাড়ি–ঘর ছেড়ে সন্ন্যাসগ্রহণ করে চিরতরে হারিয়ে যায়।

প্রেমের উপাখ্যান মিলনে নয়, ট্র্যাজেডিতে শেষ হয়।

উপসংহার : কৃষ্ণকান্তের উইলের অনিবার্য সত্য

সবশেষে আমরা যখন উপন্যাসের বিস্তৃত কাহিনি, চরিত্রের বহুমাত্রিকতা এবং রোহিণীর শৈল্পিক বিশেষত্ব এক সূত্রে গাঁথতে চাই, তখন স্পষ্ট দেখা যায়— ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ কেবল একটি গ্রন্থ নয়, বরং বাংলা কথাসাহিত্যের রসায়নে এক যুগান্তকারী নির্যাস। কৃষ্ণকান্তের উইল আমাদের শিখিয়েছে, উত্তরাধিকার কখনো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার প্রকৃত রূপ প্রকাশ পায় মানুষের মনস্তত্ত্ব, লোভ, প্রেম এবং দায়বদ্ধতার অনিবার্য সংঘাতে। আর এ কারণেই কৃষ্ণকান্তের উইল আজও পাঠকের চেতনায় প্রশ্ন তোলে— কে সত্যিকার অর্থে উত্তরাধিকারী? যে কাগজ হাতে পায়, নাকি যে মানুষ হয়ে ওঠে?

রোহিণীর প্রতিটি সংলাপ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেন প্রমাণ করে দেয়, লেখক এখানে মানবজীবনের নির্মম সৌন্দর্যকে এক শিল্পীর তুলি দিয়ে এঁকেছেন। আর এই চিত্রফলকের কেন্দ্রে নিঃসন্দেহে রয়েছে কৃষ্ণকান্তের উইল, যা একদিকে যেমন কাহিনির চালিকাশক্তি, অন্যদিকে চরিত্রগুলোর নৈতিকতার আয়না।

সুতরাং বলা যায়, কৃষ্ণকান্তের উইল শুধু একটি উপন্যাস নয়— এটি বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্টি-শক্তির এক অমর দলিল, যেখানে উত্তরাধিকার নয়, মানুষের সত্য, ট্র্যাজেডি, ভাঙন ও নির্মাণ— সবই শেষ পর্যন্ত নিজেদের স্বাক্ষর রেখে যায়। তাই কৃষ্ণকান্তের উইল আজও আমাদের মনে মনে নতুন নতুন প্রশ্ন তোলে, আর তার ভাষা-নির্মাণ, চরিত্র-নির্মাণ এবং জীবন-বিচারের অনন্ত আলো পাঠককে ফের টেনে আনে সেই চিরন্তন বঙ্কিম-জগতে।

“কৃষ্ণকান্তের উইল” কেবল উইল-সংক্রান্ত বিরোধ নয়; এটি নারীর স্বাধীনতা, পুরুষের নৈতিক দ্বিচারিতা, বিধবা-জীবনের অমানবিক বাস্তবতা এবং প্রেম–অপ্রেমের মনস্তত্ত্বের এক চিরকালীন দলিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *