কৃষ্ণকুমারী নাটক বাংলা সাহিত্যের প্রথম ট্র্যাজেডি নাটক।
কৃষ্ণকুমারী : প্রকাশকাল ১৮৬১
নাট্যকার পরিচিতি:
মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)
২৫ শে জানুয়ালী- জন্ম-
২৯ জুন মৃত্যু।
হিন্দু কলেজে পড়াশোনা ১৮৩৩
কোথায় কোথায় লিখতেন: জ্ঞান অন্বে^ষণ, ইবহমধষ ঝঢ়বপঃধঃড়ৎ খরঃবৎধপু এষবধাবং, খরঃবৎধু ইষড়ংংড়স প্রভূতি পত্রিকায় লিখতেন এই সময়ে
খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ : ১৮৪৩, ৯ ফ্রেরুয়ারি
নাট্যকারের কলকাতা পর্ব ঃ ১৮৫৬-১৮৬২
নাটকের শুরু : পাইক পাড়ার বিদ্যুৎসাহী রাজাদের অনুরোধে রামনারায়ণ তর্করত্নের রত্নাবলী ’ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করেন।
এই সব নাটক দেখে মধুসূদন লেখেন —
অলিক কুনাট্য রঙ্গে মজে লোক রাঢ়ে বঙ্গে
নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়।
এভাবে বন্ধু গৌরদাস বসাকের কাছে আক্ষেপ প্রকাশ।
গৌরদাস বসাকের অনুরোধে মধুসূদন ১৮৫৯ সালে “শর্মিষ্ঠা” রচনা।
পাইকপাড়ার রাজাদের অনুরোধে ১৮৬০ সালে একেই কি বলে সভ্যতা, বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ-রচনা করেন।
১৮৬০ সালে ‘পদ্মবতী’ নাটক ১৮৬০ ব্রজাঙ্গনাকাব্য
১৮৬০ সালে ‘তিলোত্তমাসম্ভব’ ৬১ নীলদর্পণ এর ইংরেজি অনুবাদ
১৮৬১ সালে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ ১৮৬২ রীরাঙ্গনা।
ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে থাকার সময় “চতুর্দশাপদী”।
১৮৭১ হেক্টরবধ ১৮৭৩ মায়াকানন
১৮৭৩ অসম্পূর্ণ নাটক বিষ না ধনর্গুন।
কৃষ্ণকুমারী নাটক এর উৎস : কৃষ্ণকুমারী নাটকের কাহিনি নেওয়া হয়েছে টডের রাজস্থানের ইতিহাস থেকে। টডের ইতিহাস প্রথম খন্ডের ৪৬১ পৃষ্ঠায় বর্ণিত কাহিনি থেকে।
কৃষ্ণকুমারী নাটক এর মঞ্চস্থ : ১৮৬৭ সালে ফ্রেরুয়ারি শোভা রাজারের নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হয়।
কৃষ্ণকুমারী নাটক চরিত্রসমূহ:
নারী চরিত্র ঃ মদনিকা, কৃষ্ণকুমারী, বিলাসবতী, মহিষা অহল্যা, তপস্বিনী,
অপ্রধান চরিত্র ঃ মদনিকা, ধনদাস, বিলাসবতী, বলেন্দ্রসিংহ, মন্ত্রীদ্বয়, সত্যদাস, তপস্বিনী, অহল্যা।
কৃষ্ণকুমারী নাটক — কাহিনিগত বৈশিষ্ট্য ঃ
মূল কাহিনী ইতিহাস থেকে গৃহীত। তবে ইতিহাসের ওপর রোমান্টিক প্রলেপ দিয়েছেন নাট্যকার। একে ‘ঐরংঃড়ৎরপধষ ড়হব’ বলেছেন। তবে পুরোপুরি ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহকে আনেননি।
টডের ইতিহাসে জগৎসিংহের রক্ষিতার নাম কর্পুরমঞ্জুরী, মধুসূদন তার নাম পরিবর্তন করেছেনÑ বিলাসবতী।
বিলাসবতীর সখী মদনিকা চরিত্রসৃষ্টি করে হাস্যরস পরিবেশন করা হয়েছে।
আরেকটি স্বাতন্ত্র্য : টডের ইতিহাসে আছে বাইরের শত্রুর প্ররোচনায় উদয়পুর, রানা ও তাঁর পরিবারের করুণ পরিনতি। নাট্যকার এটি নেন নি। নাট্যকার দেখিয়েছেন বাইরের লোভ ও লোভের দুর্নিবার আকর্ষণ ও জাতি বৈরিতার দ্বন্দ্ব ও ঈর্ষার কারণে করুণ পরিণতি হয়েছে।
কৃষ্ণকুমারী নাটক : তথ্য-কণিকা।
- এ নাটকে ট্রাজেত্তি ও কমেডি দুই ধারার মিশ্রণ রয়েছে।
- নাটকে বৈচিত্র্য সৃষ্টির জন্য ১ম ও ৮র্থ অঙ্কে লঘু রসাতœক জয়পুররাজ, ধনাদাস, বিলাসবতী ও মদনিকার কাহিনী এনেছেন।
- কৃষ্ণকুমারী নাটক – ট্র্যাজেডি নাটক। গ্রিক ট্র্যাজেডির প্রভাব বেশি।
গ্রিক নাটকের একমুখীন প্রবাহ, বিষাদের ব্যাপকতা এবং নিয়তির অদৃশ্য অঙ্গুলিসংকেত অনিবার্য পরিণতি এ নাটকের কাহিনীতে রয়েছে, কৃষ্ণকুমারীর নিয়তি একট্য অদৃশ্য চরিত্ররূপে বিরাজ করেছে। তাতেই নায়িকার করুণ পরিণতি কৃষ্ণকুমারী মানসিংহকে পতিরূপে চেয়েছে, সস্পর্ণ বিপরীত ফল পেয়েছে।
‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটক -এর গঠন কৌশল।
কৃষ্ণকুমারী নাটক হলো ট্র্যাজেডিমূলক, ঐতিহাসিক নাটক। ঐতিহাসিক সত্য অক্ষুন্ন রয়েছে। সংলাপ আবেগ ও গভীর অনুভূতিময় ভাব অনুযায়ী ভাষা ও বাক্য ব্যবহৃত হয়েছে। চরিত্রের মানসপ্রবনতার সাথে সমন্বয় করে সংলাপ রচিত হয়েছে। উপমা প্রয়োগ করলেও তা কৃত্রিম হয় নি। অলংকারে সুষম ব্যবহার রয়েছে। ট্্র্যাজিক গাম্ভীর্য সৃষ্টির জন্য অলকৃত তৎসম শব্দপূর্ণ গদ্যভাষা এবং লঘুদৃশ্যে কথ্যভাষা ব্যবহার করেছেন। চরিত্রানুযায়ী সংলাপ এ নাটকটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য
ঐক্য প্রসঙ্গে বলা যায় তিনি স্থানগত ঐক্য মানতেন না। তিনি বিভন্ন দৃশ্য সংযোজনের পক্ষপাতি। কাল ও স্থানগত ঐক্য যথাসম্ভব রক্ষিত। মঞ্চের চাহিদা অনুযায়ী চরিত্রের সংখ্যা সীমাবদ্ধ রেখে স্বগতোক্তির আশ্রয় নিতে হয়েছে।
কৃষ্ণকুমারী নাটক -এর ভীমসিংহ ও কৃষ্ণা চরিত্রে স্বাদেশিকতা ও স্বাজাত্যবোধের প্রকাশ ঘটেছে। নাট্যকার কৌশলে মেবারের দেশ ও জাতির কল্যান ও দুর্যোগের সাথে কৃষ্ণার ভাগ্য বিপর্যয় সংযোজন করে এক বেদনাময় পরিণতির সৃষ্টি করেছেন। কারূণ্যকে রাজ পরিবার হতে সমগ্র রাজ্যে পরিব্যাপ্ত করেছেন।
- গঠণনকৌশল: বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে সর্ব প্রথম নাটকীয় কাহিনির দেখা পাওয়া যায়। স্থ্পাত্য-সুলভ অঙ্গ-সৌষ্ঠব এ নাটকের গঠনশৈলীতে পাওয়া যায়।
- অ্কং বিভাগ: কৃষ্ণকুমারী নাটক পাঁচ অঙ্কের। নাটকের পঞ্চমসন্ধি পাঁচটি অঙ্কে রয়েছে। সূচনা, প্রবাহ, উৎকর্ষ,বিমর্ষসত্তা (গ্রন্থিমোচন) উপসংহার । তবে ৩য় অঙ্ক থেকেই নাটকের পরিণতি সূচিত হয়েছে। কৃষ্ণকুমারীর মনে মানসিংহের প্রতি অনুরাগ, মানসিংহ কর্তৃক ভীম সিংহের কাছে দূত প্রেরণ, মহারাষ্ট্রের অধিপতি আত্মবিসর্জনে উৎসাহ প্রদান নাটকের ‘ঞঁৎহরহম চড়রহঃ’ বলে ধরা যায়।
কৃষ্ণকুমারী নাটক -এর ঐতিহাসিকতা :
নাট্যকার যতদূর সম্ভব টডের বর্ণিত কাহিনী অনুসরণ করেছেন। তবে সেখানে বিচ্যুতি যা আছে, তা নাটকের প্রয়োজনে। কোনো ঘটনাকে পরিবর্তন করেন নি। ইতিহাসের পটভূমি, চরিত্র কাহিনির পটভূমি অবিকৃত রয়েছে, কাজেই ঐতিহাসিক নাটক হিসেবে গ্রহণ করা যায়।
কৃষ্ণকুমারী নাটক এ নাট্যকারের কল্পিত অংশ : মানসিংহকে না দেখে তার প্রতি কৃষ্ণার অনুরাগ নাট্যকারের কল্পিত অংশ। কৃষ্ণকুমারী চরিত্রকে মানবীয় করতে এটি করা হয়েছে, জয়পুরের রাজ জয়সিংহেরন উপপতœীর নাম কর্পুর মঞ্জুরী। মধুসূদন তার চরিত্রে অভিমান ও ঈষৃা সৃষ্টি করে নায়িকা কৃষ্ণকুমারীর বিপরীত দিকে স্থাপন করেছেন।
বিলাসবতীর স্বার্থেই মদনিকার চক্রান্ত। বিলাসবতী চরিত্রটি সম্পৃর্ণ কাল্পনিক নয়। মদনিকার সৃষ্ট জটিলতা কাল্পনিক কাহিনি। তবে উভয় রাজার মধ্যে কৃষ্ণকুমারীকে পাওয়ার আশায় সে সংঘর্ষ বেঁধেছিল তা টডের ইতিহাসে আছে। অহল্যা, তপস্বিনী, ধনদাস এরা ঐতিহাসিক চরিত্র নয়। কিন্তু ঐতিহাসিক সম্ভাবনা এদের মধ্যে আছে। নাটকের প্রয়োজনে এদের দরকার ছিল।
কৃষ্ণকুমারী নাটক – এর কাহিনি ইতিহাস থেকে নিলেও নাট্যকারের ইতিহাস বোধের অভাবে নাটকটি ঐতিহাসিক হিসেবে সার্থকতা পায় নি। উদ্বীপ্ত কল্পনার অভাবে চরিত্রগুলো ইতিহাসের সাথে মিশে যেতে পারে নি।
টডের রাজস্থান থেকে কাহিনি নিলেও সেই কাহিনির প্রকৃত তাৎপর্য রাজপুত জীবনের চরম সংকট রাজপুত ইতিহাসের অষ্টাদশ শতকের সেই ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ আবহাওয়া, গৃহবিবাদ, বহিঃশত্রুর আক্রমণ, অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম, অপমানের গ্লানি ও গ্লানি থেকে আত্মসম্মান উদ্ধারের চেষ্টা এসব কিছুকে ঐতিহাসিক পটভূমি হিসেবে গ্রহণ না করে নাট্যকার সামাজিক জীবনের ছোটখাট লোভ, ঈর্ষা, বিবাদকে নাটকের পটভূমি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ফলে প্রকৃত সার্থক ঐতিহাসিক নাটক হয়ে ওঠেনি। তবে নাটক হিসেবে তা সার্থক।
অপ্রধান চরিত্র ঃ প্রধান চরিত্র অপেক্ষা অপ্রধান চরিত্র সৃষ্টিতে নাট্যকারের কৃতিত্ব অপরিসীম, ‘টডের ইতিহাস’ থেকে নেওয়া কৃষ্ণকুমারী, ভীমসিংহ, জগৎসিংহ ও বলেন্দ্রসিংহ- সফলতা পায় নি।
অথচ কাল্পনিক চরিত্র ধনদাস মদনিকা অত্যন্ত সফল।
কৃষ্ণকুমারি নাটক : কাহিনি সংক্ষেপ
২টি দৃশ্য
১ম অঙ্ক ১ম গর্ভাঙ্ক- জয়পুর রাজগৃহ মন্ত্রীর পত্রহাতে রাজার সাথে সংলাপ। রাজা পত্র দেখতে চায় না। মন্ত্রী রাজাকে অনন্তদেবের সাথে তুলনা করলে রাজা বলে যে, সে মানুষ। ধনদাসের প্রবেশ, মন্ত্রী বিরক্ত হয়ে চলে যায়-বলে-এক মনসা, তায় আবার ধুনার গন্ধ-
ধনদাসের বক্তব্য এ রাজ্যে মহারাজের উপযুক্ত কোনো স্ত্রীলোক নেই।
জয়পুর রাজা ভোগবাদী। নিত্যনতুন নারী তার চাই, তাই ধনদাস রসিকতা করে বলে-
কেবল ভেরে-, ধুতুরা প্রভৃতি গোটা কত কদম ফুল বাকি আছে।
সাগর বারিশূণ্য হল- রাজা বলে, ধনদাস বলে- এমন অগস্ত্য অবিশ্রান্ত শুষতে লাগলে সাগরে কি আর বারি থাকে।
তবে এখন মেঘবরের উপায় কি- রাজা বলে ধনদাসকে ।
ধনদাস বলে – পৃথিবীতে সাতটা সাগর আছে।
ধনদাস রাজা জগৎসিংহকে একটা চিত্রপট দেখায়। এটি উদয়পুরের রাজা ভীমসিংহের কন্যা কৃষ্ণকুমারীর। জগৎসিংহ ছবি দেখে মুগ্ধ হয়, পেতে চাই। সুচতুর ধনদাস এই সুযোগে ২০ হাজার টাকায় ছবিটি বিক্রি করে। (বন্ধুর নাম করে) (ষোলহাজার টাকা দাম উঠেছিল) কোষাধ্যক্ষকে পত্র লিখে দেয় টাকাটা ধনদাসকে দিয়ে দেবার জন্য।
সংক্ষিপ্ত কাহিনি: ধনদাস জয়পুরের রাজা জগৎসিংহকে কৃষ্ণার চিত্রপট দেখিয়ে কৃষ্ণাকে বিয়ের প্রস্তাবে প্রলুব্ধ করে। বিলাসবতীর মহচরী মদনিকা ধনদাসের মনোভাব বুঝতে পেরে ধনদাসের দুরভিসন্ধি নস্যাৎ করে দিয়ে কৌশলে মানসিংহের প্রতি কৃষ্ণাকে অনুরাগিনী করে তোলে ।
কৃষ্ণার জবানিতে মদনিকা মানসিংহকে পত্র দিলে মানসিংহ ও কৃষ্ণাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। উভয় প্রতিদ্বন্দ্বীই কৃষ্ণাকে না পেলে উদয়পুর আক্রমণ করবে বলে বিবেচনা করে এবং ভীমসিংহের ভাই বলেন্দ্রসিংহের উপর সে দায়িত্ব পড়ে। বলেন্দ্র অপত্ত্যবোধের কারণে কৃষ্ণাকে হত্যায় ব্যর্থ হয় এবং কৃষ্ণাকে সব জানিয়ে দেয়। কৃষ্ণা রাজ্যের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে নিজেই আত্মাহুতি দেয়। রাজা হয় উন্মাদ এবং রানী অহল্যা দেবী মৃত্যুবরণ করে।
কৃষ্ণকুমারী নাটক -এর দ্বন্দ্বঃ
একদিক একমাত্র কন্যা, অন্যদিকে রাজ্য ও রাজ্যের জনগণ। দুটোর ওপরই দরদ ও কর্তব্য তার একই রকম, মেয়ের জীবন রক্ষা করলে রাজ্য ধ্বংস হবে, রাজ্য রক্ষা করলে মেয়ের জীবন বিনাশ হবে। এ টান টান সংকট নাটকের দ্বন্দ্বকে সৃজনশীল করেছে।
কৃষ্ণকুমারী নাটক সার্থক ট্ট্যাজেডি কিনা :
এরিস্টটলের মতে –
রঙ্গমঞ্চে নায়ক-নায়িকার গতিমান জীবন কাহিনির দৃশ্য পরস্পরায় উপস্থাপন করত যে নাটক দর্শক হৃদয়ে উদৃক্তভীতি ও করুণা প্রশমন করে তার মনে করুণ রসের আনন্দ সঞ্চার কওে, তাই ট্র্যাজেডি।
ট্র্যাজেডির জন্ম গ্রীকে, ইংল্যান্ডে বিকাশ। বর্তমানে সারা বিশ্বে এর ব্যাপ্তি। গ্রীক ট্র্যাজেডিতে নিয়তির ভূমিকা বড়, আর শেক্সপীয়রের ট্র্যাজেডি চরিত্রের দোষক্রুটির কারণে নির্মম পরিণতি নেমে আসে।
ইতিহাসের জন্য অক্ষুন্ন রেখে নাট্যকার ভিমসিংহের ট্র্যাজিক পরিণতি এঁকেছেন, সেই সাথে দেশ-জাতির কল্যাণের জন্য কৃষ্ণার আত্মদানের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। মেবারের পূর্ব গৌরব ছিল, অথচ এখন যে রাজা সে দুর্বল, বর্তমান জাতীয় অবস্থাও ভাল নয়, স্বাধীনতা রক্ষায় অসমর্থ মেবার জাতীয় আসন্ন পতন কাহিনি বেদনার ভাষায় লেখক উপস্থাপন করেছেন।
মদনিকা-ধনদাস-বিলাসবতী উপকাহিনীর মাধ্যমে কাহিনিতে জটিলতা ও হাস্যরস সৃষ্টি করা হলেও এ কাহিনির মধ্যে উদয়পুরের রাজার আসন্ন দুর্যোগের আভাস আছে।
কাহিনিতে নাটকীয়তা আছে, কৃষ্ণার নামে মদনিকার লেখা পত্র কাহিনিতে গতি সঞ্চার করেছে। অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির পত্র আড়াল করে কৃষ্ণার জীবনাবসান হলোÑ এখানেই নাটকীয়তা এবং নাট্যকারের সফলতা।
কৃষ্ণকুমারী নাটক -এ সংলাপের ক্ষেত্রেও নাট্যকার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। গদ্যে সংলাপ রচিত হয়েছে। চরিত্র অনুযায়ী সংলাপ ব্যবহৃত। অনেক ক্ষেত্রে উপমা ব্যবহৃত হয়েছে। সাধুভাষাও প্রয়োগ করেছেন, তবে তা কৃত্রিম হয়নি, বরং ট্র্যাজিক গাম্ভীর্য সৃষ্টিতে এটি সহায়তা হয়েছে।
প্রকৃত ট্র্যাজিক আবহ সৃষ্টির সুযোগ থাকলেও নাট্যকার যথাযথ প্রয়োগ করতে পারেন নি। বিয়ের কথায় কুমারী মেয়ের মনে যে আনন্দ ও সেই আনন্দ বঞ্চিত হলে কুমারী মেয়ের জীবনে যে বেদনা ও নৈরাশ্য সৃষ্টি হয়, লেখক তা উপেক্ষা করেছেন। কৃষ্ণা চরিত্রে কোনো গৌরবের ব্যাপার নেই, যা তাকে দেশ ও জাতি রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে। কৃষ্ণার মনে মানসিংহের প্রতি জন্ম নেওয়া অনুরাগ ও প্রবল নয়, যা মৃত্যুরাগে পরিণত করে।
কৃষ্ণার প্রেম ও কর্তব্যের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব দেখা যায় নি। চাচার মুখে রাজ্যের অবস্থা শুনেই তার আত্মহনন বিশেষ প্রযতেœ সৃষ্ট নয়। তবে নাট্যকারের বিভিন্ন কথা থেকে জানা যায় তিনি ট্র্যাজেডির বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার জন্য সচেষ্ট থেকেছেন। রাজপরিবার থেকে সৃষ্ট ট্র্যাজিক সুরকে দেশ ও জাতির মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন। এখানেই ট্র্যাজেডি হিসেবে সার্থকতা।
কৃষ্ণকুমারী নাটকের আগে বাংলা সাহিত্যে দুটো বিয়োগান্তক নাটক রচিত হলেও ‘কৃষ্ণকুমারী’কেই সার্থক ট্র্যাজেডি বলা চলে। নাটকের উপযুক্ত প্লট দ্রƒত গতি, স্বাভাবিক পরিণতি এবং অসংলগ্নতাহীন বৈশিষ্ট্য এ নাটককে শ্রেষ্ঠত্ব এনে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেনÑ
“রচনা, গ্রন্থনা, ঘটনা সংঘাত ও সংলাপের দিক থেকে এ নাটক মাইকেলের নাট্যপ্রতিভার সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয় বহন করে। কবি রানা ভীমসিংহের ট্র্যাজিক ব্যর্থতা ও কৃষ্ণকুমারী আখ্যানে করুণ রসের উচ্ছ্বাস অতি সংযতভাবে বর্ণনা করেছেন। অবশ্য নাটকটি ট্র্যাজেডি ঘেঁষা হলেও বিশুদ্ধ ট্র্যাজেডি হতে পারে নি। ভীমসিংহের অতি নাটকীয়তা ও কৃষ্ণার করুণ রসের লিরিক মূর্ছনা ট্র্যাজিক নাটকে মানায় না। তবে কৃষ্ণকুমারী বিশুদ্ধ ট্র্যাজিডি না হলেও নাটক হিসেবে অনেকটা সার্থক হয়েছে।”
নাটকের নাম ‘কৃষ্ণকুমারী’ তাই এটা মনে হওয়া স্বাভাবিক যে কৃষ্ণার করুণ পরিণতি রচনাই নাট্যকারের মুখ্য উদ্দেশ্য। কৃষ্ণার প্রতি নাট্যকারের সহানুভূতি ছিল। কৃষ্ণার মৃত্যুই নাটকের করুণতম ঘটনা। কিন্তু যে যোগ্যতার বলে ট্র্যাজেডির নায়িকা হওয়া সম্ভব, সে-সব বৈশিষ্ট্য কৃষ্ণার ছিল কিনা সে বিষয়ে সমালোচকগণ একমত নন। ডঃ অজিত কুমার ঘোষের মন্তব্যÑ
আলোচ্য নাটকে যে ঘটনা ধারার পরিণামে নাটকের বিষাদময় সমাপ্তি ঘটেছে, তার সঙ্গে কৃষ্ণকুমারীর যোগ নেই।
এ নাটকে প্রথম থেকে রানা ভীমসিংহের মুখে বিষাদের সুর অনুরণিত। ট্র্যাজেডিতে নায়ক চরিত্রে যে প্রবল অর্ন্তদ্বন্দ্ব ও প্রতিকূল ঘটনার বিরুদ্ধে সংগ্রামের পরিচয় লক্ষ করা যায় ভীমসিংহের চরিত্রে তা নেই। সে দুঃখে কেবল কাতরোক্তি করেছে, পৌরুষের পরিচয় দিতে পারে নি। দেশ ও জাতির এবং পরিবারের দুর্যোগময় ভবিষ্যতের কথা ভেবে সব সময় শংকিত হয়েছে। রাজ মহিষী নিয়তির বাণী শুনিয়েছে সব সময়।
রাজমন্ত্রী সত্যদাসের প্রজাগণের হিতার্থে ও বংশের মান রক্ষার্থে কৃষ্ণাকে বিসর্জনের পরামর্শ দান ও কন্যা স্নেহে পিতৃহৃদয়ের আলোড়নÑ এই প্রবল অন্তর্দ্বন্দ্বে ভীমসিংহের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। মহিষী অহল্যার মৃত্যু হয়েছে। ফলে দুটো চরিত্রের কেউ ঝঁভভবৎ করবার কোনো সুযোগ পায়নি।
তবে একটা কথা স্বীকার করতেই হয় যে, এই নাটকের ট্র্যাজেডির রসের আধার কৃষ্ণা, তার জন্যই দুদেশের বাজা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে অবতীর্ণ। তার পাণিপ্রার্থী দুই রাজা তার পিতার উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। শুরু হয়েছে রাজনৈতিক সমস্যা। আর এ সমস্যাকে কেন্দ্র করেই রাজা ভীমসিংহের জীবনে করুণ পরিণতি নেমে এসেছে। পিতা হয়ে কন্যাকে মৃত্যুর আজ্ঞা প্রদান করেছেন, এর চেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্য আর কি হতে পারে ? এই নাটকে কৃষ্ণার আত্মহননের চেয়ে ভীমসিংহের আত্মহনন অনেক বেশি শোকাহত। এ নাটক সম্পর্কে নাট্যকার তার বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে লিখেছেনÑ
Read Kissenkumare as soon as you yet it there is some attempt at pathos in that book also.
নাটকের সর্বত্র একটা বিষাদের সুর পরিলক্ষিত হয়। কৃষ্ণকুমারী ও ভীমসিংহ সে বিষাদের প্রতিমূর্তি। রানা ভীমসিংহের শোকোন্মত্ততা, কৃষ্ণার আত্মহনন, মহিষী অহল্যার মৃত্যু এক গভর কারুণ্য সৃষ্টি করেছে। এই কারুণ্য রাজ পরিবার হতে সমগ্র রাজ্যে পরিব্যাপ্ত হয়ে দেশ-জাতির জীবনে বেদনা ব্যঞ্জিত করেছে। এখানেই ট্যাজেডি হিসেবে এ নাটকের সার্থকতা।
নাটকটিতে রাজা ইডিপাসের মত নিয়তির প্রভাব যেভাবে মূর্ত হয়েছে, তাতে মনে হয় নিয়তি প্রথম থেকেই ক্রিয়াশীল ছিল এবং আড়ালে থেকে নিয়তিতার স্থির গতি বজায় রেখেছে। সমগ্র নাট্যকে কৃষ্ণ চরিত্র নিয়তি দ্বারা প্রভাবিত এবং এই নিয়তির চক্রান্তেই কৃষ্ণার শোচনীয় মৃত্যু।
সবশেষে বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য নাটকের তুলনায় এটি কাহিনী গ্রন্থস, চরিত্র বিত্রন, সংলাপ, বাস্তবতা ভাষার ব্যবহার প্রভূতি গুণাবলির জন্য প্রথম সার্থক ট্র্যাজেডি নাটক। নিখুঁত শিল্পগুণ ও স্বাতন্ত্র্যের জন্য কৃষ্ণ কুমারী মধুসূদনের নাট্য প্রতিভার শ্রেষ্ঠ নিদর্শণ হিসেবে অবিসংবাদিত হয়েছে।
ভীমসিংহের চরিত্র: কৃষ্ণকুমারী নাটকে যে চরিত্রটি আত্মদ্বন্দ্ব ও বহির্দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে, তিনি হলেন মেরার রাজা ভীমসিংহ। ভিমসিংহ ঐতিহাসিক চরিত্র। ফলে নাট্যকার স্বাধীনভাবে চরিত্রটি বিকশিত করতে পারে নি। প্রথম থেকেই চরিত্রটি গম্ভীর, বিষন্ন এবং দারুণভাবে নিরাশাকবলিত। রাজা হয়েও প্রথম থেকেই রাজ্য বোগের সুখ থেকে বঞ্চিত। ফলে রাজা সুলভ ব্যক্তিত্ব তার মধ্যে গড়ে ওঠে নি। তাঁর আচরণ দুর্বলচিত্ত সাধারণ মানুষের মতো। ভিমসিংহের চরিত্রে ছিল অন্তর্নিহিত দুর্বলতা সেই সাথে ছিল পার্শ্ববর্তী রাজ্যের রাজার দৌরাত্ম।
সেই দুর্বল ব্যক্তিত্বের ছিদ্রপথে তাঁর জীবনে নেমে এসেছে মর্মান্তিক পরিণতি। সেই সাথে প্রাণের পুত্তলি কৃষ্ণার জীবনে নেমে এসছে অকাল এবং অকারণ মৃত্যু। আপন ব্যক্তিত্বের প্রতি, আপন সামর্থ্যরে প্রতি যদি তিনি আস্থাবান হতেন তাহলে নিরাপরাধ কন্যাকে হত্যার আদেশ তিনি দিতে পারতেন না। একটা বিষয় লক্ষ্যনীয় যে, ভমিসিংহের এই আদেশের সূত্র ধরে এই নাটকের ট্র্যাজেক মহিমা পূর্ণতা লাভ করেছে।
ভীমসিংহ দেশ প্রেমিক, দুর্বলচিত্তের হলেও তার স্বাদেশিকতাবোধ সে যুগের প্রেক্ষাপটে একটি অন্যান্যসাধারণ গুণ বলা বিবেচিদ। কন্যাকে হত্যা করে দুর্বলচিত্তের পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু সেই সাথে এটাও প্রমান করেছেন যে, কন্যা স্নেহের তুলনায় দেশ প্রেম তার কাছে বেশি মূল্যবান। স্বদেশপ্রীতি ও স্বাজাত্যবোধের প্রকাশে ভীমসিংহ চরিত্রটি তুলনাহীন।
উদয়পুরে সিংহাসনে (১৭৭৮-১২২৮) থাকাকালে তার জীবন শান্ত ছিল না, যুদ্ধ, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম দেশে অন্তর্কলহ, কোষাগার শূণ্যতা দেশ বীরশূণ্য, ইত্যাদি সমস্যায় ভরপুর ছিল। অথচ এই শৈল দেশীয় রাজাদের পূর্বপুরুষেরা শৌর্যবীর্য, অর্থ বিত্তে ছিলো আকাশচুম্বী।
চরিত্রটি নিষ্ক্রিয়, নিজের সংকল্প বাস্তবায়ন করে ঘটনাকে নিজের মতো করে নিতে পারেনি। সে বৃদ্ধ ও দুর্বল, সপ্তরথীবেষ্টিত অভিমুন্যার সাথে নিজেকে তুলনা করেছে। নিজের নিস্ক্রিয় সম্পর্কে সচেতন, তাই সে মন্ত্রীকে বলেছে হায় এ শৈলরাজের বংশে আমার মতন কাপুরুষ আর কে কবে জন্মগ্রহণ করেছে ? বাঘের ভয়ে শৃগাল গহবরে প্রবেশ করে, কিন্তু সিংহের কি সে রীতি ?
তিনি ক্ষত্রিয় বীরের ন্যায় আচরণ না করে ঘটনাস্রোতে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন। জগৎসিংহের হাতে কন্যাকে দান করার ইচ্ছে থাকলেও মহারাষ্ট্রপতির নির্দেশে জয়পুরের দূতকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির নির্দেশে কৃষ্ণাকে বিসর্জন দানের নির্দেশে অনুজ বলেন্দ্রসিংহকে দিয়েছেন।
নিজের অসহায়ত্বের কথা বলেছেন, দুঃখ পেয়েছেন, সবাইকে দুঃখ দিয়েছেন তাকে ঘিরে অনেক ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু কোনো ঘটনাকে নিজের অনুকূলে আনতে পারেননি।
ভীমসিংহের কাঁধে ছিল অনেক দায়িত্ব, একদিকে কুলের মর্যাদা, অন্রদিকে জাতির কল্যাণ। কিন্তু দায়িত্বের জন্য প্রতিরোধের পথ বেছে না নিয়ে অগৌরবের, কলঙ্কের হার গলায় পরেছেন।
ভীমসিংহ চরিত্রে অসহায়ত্ব থাকলেও মানবিক মহিমা প্রবল। অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির পত্র পেয়ে তার হৃদয়ে ঝড় উঠেছে। মনে প্রবল সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে কন্যার প্রতি স্ন্রেহ, অন্যদিকে রাজপরিবার ও চন্ডালেও করতে পারে না, পশুপাখিও করতে চায় না, তা-ই তাকে করতে হয়েছে। এই মানসিক আলোড়নে তিনি মানসিক ভাবসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন।
একদিকে রাজ্য, অন্যদিকে মেয়ে। মেয়ে বাঁচলে রাজ্য যাবে, রাজ্য বাঁচালে মেয়ে ধ্বংস হবে। এ সংকট নাটককে গতি দিয়েছে। ভীমসিংহের চরিত্রের এ দুর্বলতার মধ্যেই কৃষ্ণার আত্মহত্যার বীজ লুকানো ছিল। রাজা হিসেবেও যেমন ভাগ্য বিপর্যয় ঘটেছে, পিতা হিসেবেও চরম দুঃখ পেতে হয়েছে।
জাতি ও দেশের অকল্যাণের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এ চরিত্রে প্রতিরোধ স্পৃহা জাগালে ট্র্যাজেডির আবেদন গভীর হতো। তার উন্মত্ততা, দুর্বলতা করুণ রস সৃষ্টি করলেও ট্র্যাজেডির মহিমা পায়নি। ঐতিহাসিক কারণে চরিত্রটিকে দুর্বল করলেও মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটিয়ে শিল্পী চরিত্র দুর্বলতম চরিত্র হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। তবে নাট্যকারের স্বাদেশিকতা ও স্বাজাত্যপ্রীতি চরিত্রদিক অনন্য করেছে।
কৃষ্ণকুমারী নাটক -এর কৃষ্ণকুমারীর চরিত্র
কৃষ্ণকুমারী নাটক মধুসূদনের অন্যতম সৃষ্টি। উনিশ শতকের বাংলাদেশে যে রেঁনেসা ঘটেছিল, তার অন্যতম প্রেরণা ছিল নারীর মহিমা আবিষ্কার। মধুসূদন নবজাগরণের কবি তাই তার সাহিত্য চিন্তায় নারীর একটি বিশেষ স্থান ছিল। এবং তার প্রথম প্রকাশ ঘটে ‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটকের নামচরিত্র অর্থাৎ কৃষ্ণকুমারীর মাধ্যমে।
নাটকটি ট্র্যাজেডিমূলক রাজা ভীমসিংহের ট্র্যাজিক মহিমা প্রকাশ এ নাটকের মূল কথা, আর এ ট্র্যাজেডির গতিকে ত্বরান্বিত করেছে কৃষ্ণকুমারীর কিংবদন্তিতুল্য সৌন্দর্য। কৃষ্ণার সৌন্দর্যকে ঘিরেই উদয়পুরে যুদ্ধের ভয়াবহতা নেমে এসেছে এবং কৃষ্ণাকে মৃত্যুর স্বাদ নিতে হয়েছে। ফলে কৃষ্ণাই এ নাটকের প্রাণ। নাট্যকার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এ নাটকে কৃষ্ণার চরিত্রকে উপস্থাপন করেছেন।
নাট্যকার নিজেই এ চরিত্র সম্পর্কে বলেছেনÑ
ঞযব ঢ়ৎরৎপবংং. ও যড়ঢ়ব রং ফরমৎরভরবফ. ুবঃ মবহঃষব.
সংসারের রূঢ় বাস্তবতা সম্পর্কে অনভিজ্ঞা এই রাজকন্যার জীবনবোধ ছিল সরল। পিতা ভীমসিংহ এবং মাতা অহল্যাদেবীর আদরিণী কন্যা রাজদ্বন্দ্বের শিকার হয়ে জীবনমান ঘটিয়ে ট্র্যাজেডি চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।
কৃষ্ণকুমারী নাটকে নাট্যকারের মূলউদ্দেশ্য ছিলো কৃষ্ণকুমারীর নির্মল জীবনের ট্র্যাজিক পরিণাম দেখানো। এ প্রসঙ্গে কৃষ্ণা চরিত্রের বিরুদ্ধে সাধারণভাবে দুটো অভিযোগ উঠতে পারে। রাজনীতির জটিল আবর্ত থেকে দুরে অবস্থান করে যে বালিকা গান গেয়ে এবং মালা গেঁথে দিন কাটায়, তাকে অনেকে নিষ্ক্রিয় এবং নির্দোষ বলতে চান। কিন্তু এ দুটি বৈশিষ্য থাকলেই যে তার জীবনে ট্র্যাজেডি নেমে আসবে না, এরকম পূর্ব ধারণা পোষণ করা ঠিক নয়। আত্মকর্মের জন্য দুর্ভোগ দুর্দশা মৃত্যুবরণ করার মধ্যে এক ধরনের মহিমা অবশ্যই আছে।
কৃষ্ণার জীবনে সবচেয়ে বড় ঘটনা মানসিংহের প্রতিতার প্রেম। কিন্তু পিতামাতার প্রতি তার জন্মজাত ভালোবাসা এবং ভক্তি কম ছিল না। রাজনীতির কুটনৈতিক চালে তার জীবন নিয়ে খেলা হয়েছে। অসহায় পিতা তাকে রক্ষা করতে অসমর্থ। শুধু পিতা নয়। স্নেহপরায়ণ কাকা বলেন্দ্রসিংহও কৃষ্ণাকে অত্যাধিক সেন্হ করতেন। অথচ কৃষ্ণার জীবনের নির্মম পরিহাস এই যে, পিতা তাকে মৃত্যুদন্ডাজ্ঞা দিয়েছেন, আর সেই দন্ডাজ্ঞা শুনিয়েছেন তার কাকা। তখন কৃষ্ণার মনে নির্মম প্রশ্ন জেগেছে-
“কাকা, আমার পিতারও কি এই ইচ্ছা যে।”
বলাই বাহুল্য, বলেন্দ্রসিংহ সত্য কথাটাই বলেছেন।
নাট্যকারের কৃষ্ণা চরিত্র শুধু নাটকীয় চরিত্র নয়, নাট্যকারের মানস কন্যাও বটে। মধুসূদন সবসময় তার সৃষ্টির সাথে একাত্ম হতেন, যেমন মেঘনাদবধের প্রতি ছত্রে কবি উপস্থিত, তেমনি কৃষ্ণকুমারী সম্পর্কেও তাঁর মন্তব্য স্মরনীয়-
ও’ঝযবফ ঃবধৎং যিবহ ঢ়ড়ড়ৎ করংংৎড়শঁসধৎল ঝঃধনষরবফ যবৎংবষভ ধহফ ঃবষষ ড়হ যবৎ নবফ.
সুতরাং সযতœ মনোযোগ ও অকৃত্রিম দরদ দিয়ে তিনি কৃষ্ণকুমারী’ চরিত্রটি সৃষ্টি করেছিলেন এতে কোনো সন্দেহ নেই।
কৃষ্ণকুমারী অপরূপ সৌন্দর্যময়ী। প্রথম জানতে পাই ধনদাসের কথায়। ২য় অঙ্কের ১ম গর্ভাঙ্কে আমরা তার মার্জিত ও বিনম্্র সৌন্দর্যের সন্ধান পাই। তপস্বিনীর মুখ দিয়ে নাট্যকার কৃষ্ণার সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়েছেন। জগৎসিংহ টিত্রপট দেখে বলেছে-
কোন ঋষি বরের অভিশাপে এ জলধিতলে এসে বাস করিতেছে।
ধনদাস বলেছে-“কৃষ্ণার মত এমন রূপ লাবণ্য পৃথিবীতে আর কোথাও নাই।”
কৃষ্ণার রূপ লাবন্য, চারিত্রিক সৌন্দর্য আর বিধ্যাবৃদ্ধি দেখে নাট্যকার নিজেই বলেছেন- উরমৎরভরবফ ুবঃ মবহঃষব”। তার চরিত্রের প্রধান গুন সরলতা মধুসূদন নিজ কল্পনা বলে চরিত্রটিকে বিশিষ্ট করে তুলেছেন।
কৃষ্ণার সেীন্দর্যের কথা সবরাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। জয়পুরের জঙ্গসিংহ বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। মদনিকার ছলচাতুরীতে মরুদেশের রাজা মানসিংহের কাছে পত্র লিখে তাকে জানিয়ে দেয়। সে যেন ভীমসিংহের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। কৃষ্ণাকে পাবার জন্য দু’পক্ষ উদয়পুরের দিকে ধৈয়ে আসে। কৃষ্ণার জীবনে নেমে আসে দুর্যোগ আর এ দুর্যোগ যত না দৈবিক, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক।
কৃষ্ণার জীবনে এ দুর্যোগ নেমে আসার আগেই লেখক তার চরিত্রে কোমলতা, স্পর্শকাতরতা, সরলতা সঞ্চারিত করেছেন। শেষ পর্যন্ত এ চরিত্রটিকে টেনে আনা হয়েছে রাজইনতিক আবর্তে। অবশ্য এজন্য দায়ী নিযতি।
নাট্যকার কৌশলে কৃষ্ণার হ্নদয় জগত উম্মোচন করেদেন, মানসিংহকে ভালোবাসা এবং এ ভালোবাসা তাকে স্বপ্নের জগৎ থেকে নির্বাসিত করলে মধুর যন্ত্রণার জগতে প্রবেশ করে। রাজনৈতিক ভাবে শেষ পর্যন্ত তার নির্মম ভাগ্য মির্ধারিত হয়ে যায়। নিজ হাতে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়।
অবশ্য কৃষ্ণার হ্নদয় যন্ত্রনার আষাতে জর্জরিত জ্ঞয়ার আগেই রাজনীতির রূপ ধরে নিয়তির খড়গ নেমে আসে তার উপর। বিপদের মোকাবেলা কররে আগেই তার মন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। পদ্মিনীর প্রত্যাদেশ কৃষ্ণাকে আতœদানের মধ্যে ঠেলে দেয়। সব মিলে তার জীবনে নেমে এসেছে বেদনাবিধুর পরিনতি।
কুমারী জীবনে বিয়ের কথায় কুমারীর মনে আনন্দ জাগে, আবার সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হলে বেদনার জম্ম হয়। নাট্যকার কৃষ্ণার জীবনের এই দিকটাকে পরিহার করেছেন। কৃষ্ণার মুখে এমন কোনো গেীরবের কথা ও বলান নি, যা তাকে আতœদানে উদ্বুছ করতে পারে। মানসিংহের প্রতি অনুরাগ মৃত্যুরাগে পরিনত করার মধ্যে যে গেীরর আছে, লেখক তাও উপৈক্ষা করেছেন। অর্থাৎ প্রেম ও কর্তব্যের মধ্যে নাট্যকার কোনো দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে পারেন নি, করত্তে পারলে কৃষ্ণার মানসিক মংঘাত শিল্পময় হতো এবং কৃষ্ণারপরিনত্তি পাঠকের কাছে আর ও মর্মস্পশী হতো।এখানেই এ চরিত্রের দুর্বলতা।
তবে সব বিচারে চরিত্রটি জীবন্ত হয়েছে। নাট্যকারের শিল্পী মনের স্পর্শে চরিত্রটির হ্নদয়বিদারক পরিনতি পরিনতি পাঠক হ্নদয়কে ভারাক্রান্ত করে তোলে সহজেই। এখানেই এর সার্থকতা।
প্রফেসর মোঃ আখতার হোসেন
অধ্যাপক
বাংলা বিভাগ
সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, কলেজ