রবীন্দ্র-ছোটগল্পে গীতিধর্মিতা – কাব্য ও কাহিনির সুরেলা সমন্বয়।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য।

গীতিধর্মিতা- রবীন্দ্র-ছোটগল্পের ক্ষেত্রে দোষের না গুণের।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বৈচিত্র্যময় বিষয়বস্তু ও বর্ণিল শিল্পপ্রকরণ বিশিষ্ট ছোটগল্প রচনার মধ্যে দিয়ে বাংলা সাহিত্যে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। ছোটপ্রাণ, ছোটকথা, ছোটছোট দুঃখকথা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে ছোটগল্প লিখেছেন, তাতে যে সুখ-দুঃখ ও অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে তা গল্পের চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নি, শেষ পর্যন্ত তা চিরন্তনতা লাভ করেছে।

তাই ,কোনো কোনো সমালোচক রবীন্দ্র-ছোটগল্পকে গীতিধর্মী বলেছেন। কেউ কাব্যধর্মীও বলেছেন। কেননা, কল্পনার প্রাচুর্য ও অলঙ্কার বহুলতা প্রভৃতি কাব্যের উপাদান ছোটগল্পে ব্যবহৃত হয়েছে। রবীন্দ্র-ছোটগল্পগুলোতে কাব্যধর্মী বা গীতিধর্মিতার বৈশিষ্ট্য আছে কিনা তা বিচার করে দেখা যেতে পারে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প

কাব্যধর্ম ও গীতিধর্ম একই বিষয়ের দুটি অঙ্গ। তাই, এদের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক। কাব্যধর্ম সব কবিতায় থাকে, কিন্তু গীতিকাব্য ছাড়া গীতিধর্মিতা অন্য কাব্যে থাকে না। কবির একান্ত ব্যক্তি অনুভূতির প্রকাশ গীতিকাব্যে থাকে। এখানে বাস্তব জ্ঞানের খুব একটা প্রয়োজন হয় না। অন্যদিকে, ছোটগল্প রচনার জন্য গল্পকারকে বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হয়। অর্থাৎ, জীবনের কোনো একটি বিশেষ মুহূর্ত কোনো বিশেষ পরিবেশের মধ্যে কেমনভাবে লেখকের কাছে প্রত্যক্ষ হয়েছে ,তারই রূপায়ণ ছোটগল্প।

রবীন্দ্রনাথ শ্রেষ্ঠ গীতিকবি। গীতিমর্ধী মন নিয়ে তিনি সুখ-দুঃখ-বিরহ-মিলন পূর্ণ মানব-সমাজে প্রবেশের আকাক্ষা যেমন প্রকাশ করেছেন, তেমনি নিরুদ্দেশ সৌন্দর্যলোকে উধাও হয়ে পড়বার আকাক্ষাও প্রকাশ করেছেন। এ রকম কবিমন নিয়ে ছোটগল্পের আসরে এসে বাংলাদেশের সহজ-সরল অনাড়ম্বর জীবন প্রবাহের মধ্যে নিভৃত গোপন প্রবাহের সন্ধান করেছেন। জীবনের খণ্ডাংশের মধ্যে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনার মধ্যে দুঃখ-সুখ, আনন্দ -বেদনার এক একটি সুর ফুটিয়ে তুলেছেন। এই যে অন্তর্নিহিত সুর বা আবেগ গীতিধর্মিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

অথচ এমনভাবে তা করলেন, যা শেষ হয়েও শেষ হয় নি। অন্তরের মধ্যে তার গুঞ্জন নিরন্তর থেকেছে। কবি এখানে একাধারে গীতিপ্রাণ ও বস্তুসচেতন , কবিসত্তা ও গদ্যরচনার মেধা একসঙ্গে এসে মিশেছে ছোটগল্পে। তাই, রবীন্দ্র-ছোটগল্পে কাব্যধর্ম আছে একথা যেমন এক রকম সত্য, তেমনি গীতিধর্মিতা আছে, তাও এক রকম সত্য।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতার ফসল একথা পুরোপুরি বলা যায় না। গল্পের প্রয়োজনে অনেক স্থানে তিনি কল্পনাকে আশ্রয় করেছেন। সেজন্যই তার ছোটগল্প লিরিকধর্মী হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্র-ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যের নিরিখে গীতিধর্মিতা অপবাদ বলে মনে হয় না। সবক্ষেত্রে তা দোষের বলে মনে হয় না। রবীন্দ্র-ছোটগল্পে তার অন্যান্য রচনার মতো কল্পনার প্রাচুর্য , অলঙ্কারের বহুল প্রয়োগ লক্ষণীয়। তাই, এগুলো কাব্যধর্মী বলে মনে হয়।

রবীন্দ্র-গল্পগুলো কাব্যধর্মীর গুণে আলাদা বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল, যা অন্যান্য লেখকের ছোটগল্পে পাওয়া যায় না। কাজেই কাব্যধর্ম রবীন্দ্র ছোটগল্পের জন্য দোষের কিছু নয়। ছোটগল্পের অন্তরে কাব্যধর্ম ও গীতিধর্ম প্রবাহিত আছে বলেই কবির কবিতার মতো তার ছোটগল্প যতবার পড়া হয়, ঠিক ততবার নতুন মনে হয়, সেজন্যই তার ছোটগল্পের আবেদন আজও সমান।

গীতিকবিতা আকারে ছোট, ছোটগল্পও সাধারণত আকারে ছোট হয়। অনেকে এ অবয়বের প্রেক্ষিতে ছোটগল্পের ওপর গীতিকবিতার প্রভাব স্বীকার করেন, কিন্তু এ লক্ষণের ভিত্তিতে ছোটগল্প ও গীতিকাব্য এক হতে পারে না। ব্যক্তিত্বের ছাপ গীতিকবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। ব্যক্তিত্বের ছাপ লেখকের অন্য শ্রেণীর রচনার মধ্যে পড়াটা স্বাভাবিক, তবে বেশি আচ্ছন্ন করলে তা দোষের পর্যায়ে পড়ে। কোনো রচনার মধ্যে লেখকের ব্যক্তিত্বের ছাপ পড়লে তাকে গীতিধর্মিতা বলা চলে।

তবে, একটা কথা মনে রাখতে হবে ভাবোচ্ছ্বাস থাকলেই তা গীতিধর্মিতা না গীতিময়তা নয়, তা লেখকের ব্যক্তিগত একান্ত হৃদয়ঘটিত ভাবোচ্ছ¡াস হতে হবে। ভাবোচ্ছ্বাস গল্পের চরিত্রকে আচ্ছন্ন না করলেই হলো। চরিত্রের মধ্যে ভাবোচ্ছ্বাস সীমাবদ্ধ থাকলে তা কাব্যধর্মী হতে পারে, কিন্তু তা কখনো গীতিধর্মী নয়। গল্পগুচ্ছের অনেক গল্পের মধ্যে অনেক স্থানেই ভাবোচ্ছ¡াস আছে , কিন্তু তা কখনো গল্পের পাত্র-পাত্রীর জীবনধারাকে অতিক্রম করে যায় নি।

রবীন্দ্রনাথের শতাধিক গল্প নানা বিষয়-বৈচিত্র্যে ভরপুর। সামাজিক, পারিবারিক, প্রেমপ্রণয়, নৈসির্গিক প্রভৃতি বিষয়ে তার ছোটগল্প রয়েছে। এর মধ্যে আছে ঘটনামূলক সরল চিত্রমূলক গল্প (খোকবাবুর প্রত্যাবর্তন, স্বর্ণমৃগ) , বাস্তবতাভ্রষ্ট অতিপ্রাকৃত গল্প ( ক্ষুধিত পাষাণ, নিশীথে ), বাস্তবভিত্তিক(কাবুলিওয়ালা) এবং অনভ্যস্ত ঘটনা ও চিত্রমূলক (মহামায়া ) গল্প। এসব গল্পের মধ্যে কবির কবিত্বশক্তির, গীতিময়তার প্রভাব রয়েছে। তবে তা গল্পের শৈল্পিক সত্তাকে আকর্ষণীয় করেছে, কখনোও শিল্পগুণকে ক্ষুন্ন করেনি।

কঙ্কাল ও ক্ষুধিত পাষাণ বাস্তবতাভ্রষ্ট অতিপ্রাকৃত গল্পের চরম বিকাশ। অপরের মুখ দিয়ে স্বপ্নদৃষ্ট কাহিনি বর্ণিত। এখানে দ্রষ্টার সাথে লেখকের ব্যক্তিত্বকে অভিন্ন করে দেখা ঠিক না। ক্ষুধিত পাষাণ সম্বন্ধেও ঐ একই কথা ্ ঐ যে অদ্ভূদ লোকটি, অজ্ঞাতনামা স্টেশনের ওয়েটিং রুমে কয়েকটি মাত্র ঘণ্টার জন্য যার সঙ্গে হঠাৎ দেখা, তার মুখে কাহিনিটি একটি বিশেষ তাৎপর্য লাভ করেছে। গল্পগুচ্ছের আর কোনো চরিত্রের মুখে এমন খাপ খেত না।

আসলে কল্পনাপ্রধান হলেই তা গীতিধর্মী হয় না। মোট কথা লেখকের ব্যক্তিত্বের সাথে মিলে মিশে না গেলেই হলো। কঙ্কাল ও ক্ষুধিত পাষাণ গল্পের আবেগময় ভাষা গল্পদুটিকে কাব্যধর্মী তো করেছেই, গীতিধর্মীও করেছে অনেকটা। রবীন্দ্রনাথ নিজেও তা স্বীকার করেছেন।

রবীন্দ্রনাথই বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রথম আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের সংকীর্ণ ও তুচ্ছ ঘটনার বাইরের বিবর্তনের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে এনে জীবনের তলদেশে যে অপূর্ব মাধুর্য ও সুগভীর জীবনরসে সিক্ত হয়ে নিভৃত ফল্গুধারা প্রবাহিত, সেদিকে ধাবিত করেন। শিল্পীর কাব্যিক দৃষ্টির রসে সিক্ত হয়ে সে গোপন প্রবাহটি আমাদের সামনে এক নতুন দিগন্ত হিসেবে ধরা দেয়।

কবির ভাব ও কল্পনায় মিশে সাধারণ ঘটনা ও বিষয় অপূর্ব বিষ্ময়ের উদ্রেক করে। আলাদা সুরের জগতের সৃষ্টি করে। তাই, পোস্টমাস্টার গল্পে স্বজনহারা গ্রাম্য বালিকার হৃদয়বেদনা চিরন্তনতা পেয়েছে, পোস্টমাস্টার সাধারণ ঘটনা প্রবাহের মধ্যে চিরন্তন তত্তে¡র সন্ধান পেয়েছে।

একরাত্রি গল্পের ভাঙা স্কুলের সেকেন্ডমাস্টার সমস্ত ট্র্যাজেডিময় জীবনে ঝড়জলের মধ্যে এক অনন্ত রাত্রের সন্ধান করেছে। নায়ক বলেছে – আমি এই এক রাত্রে মহাপ্রলয়ের তীরে দাঁড়াইয়া অনন্ত আনন্দের আস্বাদ পাইয়াছি। এভাবে কবির কল্পলোকের মানুষগুলো তাদের আচরণ নিয়ে পারিপার্শ্বিক ঘটনায় মিশে গিয়ে এক সুরের জগৎ সৃষ্টি করেছে। এবং গল্পগুলোর মধ্যে গীতিময়তার আবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকেরা গল্পগুলো মধ্যে গীতিময়তার সন্ধানও করেছেন।

রবীন্দ্র-ছোটগল্পে কল্পনার বেগ থাকলেও গল্পগুচ্ছের কোথাও বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া হয় নি। এখানে জীবন্ত বাংলাদেশকে পাওয়া যায়। বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য, নদীস্রোত, তার প্রান্তর, বাঁশবন, চণ্ডীমণ্ডপ, রথতলা, দুরন্ত কলোচ্ছাসিত পল্লীপ্রাণ বালক-বালিকা, কল্যাণী বুদ্ধিমতী গৃহিনী, পান-তামাক-আড্ডায় আসক্ত ভালমানুষ, সামাজিক বিপ্লব, নির্বোধ পুরুষের দাম্ভিক, আত্মকেন্দ্রিকতা, বালিকা বধূর নিঃশব্দ দুঃখ-বেদনা ইত্যাদি দেখে মনে হয় যে গল্পগুলোর মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ কথা বলে উঠেছে বার বার।

সমাপ্তি গল্পের কথা বলা যায়। অপরিণত গ্রাম্য বালিকা আর অকালগম্ভীর বি,এ, পাশ যুবকের মধ্যে আমরা নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখি। লেখক প্রকৃতির পটভূমিকায় কাব্যময় ভাষায় অপরিণত বালিকার মনের বিস্তাারকে স্তরে স্তরে মেলে ধরেছেন। কথায়, চিন্তায়, মৃণ¥য়ী তার বয়স ও শিক্ষাকে অতিক্রম করে নি। সে উচ্ছৃংখল অশিক্ষিত গ্রাম্য বালিকা, অথচ তারই অন্তরে প্রেমের মধুর পূর্ণতার বিকাশ কী সহজ এবং সহজ বলেই সুন্দর। মৃণ¥য়ীর এ পরিবর্তন স্বাভাবিক হৃদয়ের, এ সম্পদের জন্য স্কুল কলেজে পড়তে হয় না। মৃণ¥য়ী পারিপার্শ্বিক জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়েও এক দেশকালাতীত ভাবলোকের অধিবাসী।

দুরাশা গল্পের নায়িকা বদ্রাওনের নবাব কন্যার মুখে অনেক ভাবোচ্ছ¡াসের কথা আছে। কিন্তু তা চরিত্রের সম্ভাবনাকে লক্ষন করে যায় না। মুসলমান কন্যা হলে কি হবে হিন্দু ব্রাহ্মণ কেশরলালের জন্য তার হৃদয়ে সে ভালবাসার জন্ম নিয়েছে, তাতে তার পক্ষে অতটুকু ভাবোচ্ছ¡াস প্রকাশ করা স্বাভাবিক।

স্ত্রীর পত্র গল্পে মৃণালের পত্রের সবটুকুই ভাবোচ্ছ¡াসে ভরা, কিন্তু এ ভাবোচ্ছ¡াসের বীজ মৃণাল চরিত্রে মধ্যেই নিহিত রয়েছে। সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী মৃণাল নিজের বন্দীদশার স্বরূপ বুঝতে পেরে দীর্ঘ পনের বছর পরে স্বামীর কাছে আত্মমুক্তির যে বিবরণ দিয়েছে, তাতে ভাবোচ্ছ্বাস থাকতেই পারে।

বীন্দ্র-প্রতিভা মূলত গীতিধর্মী। গীতিধর্মের আতিশয্যের ফলে অনেক গল্পের চরিত্রের কার্যকলাপ নিজ সীমানা লঙ্ঘন করেছে বলে কিছু কিছু গল্পে গীতিধর্মিতা ও কাব্যধর্মিতা প্রকাশ পেয়েছে। তবে ঢালাওভাবে রবীন্দ্র-ছোটগল্পগুলোকে গীতিধর্মী বলা যায় না।

গীতি-প্রতিভার বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে সাধারণ তুচ্ছ বস্তুর মধ্যে অসাধারণত্ব খুঁজে বের করা। আর প্রকৃতির অনুষঙ্গে হৃদয়-বেদনাকে পরিস্ফূটিত করতে হলে সুরের সাহায্য নিতেই হয়। গীতিকবি রবীন্দ্রনাথও তাই করেছেন। তাই সুভা গল্পে গীতাত্মক ছাপ সুস্পষ্ট। মানুষের সাথে প্রকৃতির নিবিড় বন্ধন এখানে লক্ষণীয়। মূক বালিকার সাথে মূক প্রকৃতির নিবিড় ঐক্যের মধ্যে গীতিধর্মিতা প্রকাশ পেয়েছে। শিল্পকুশলতার সঙ্গে যেভাবে মর্মের বিচিত্রভাব ও চিন্তাধারার সাথে বিশ্বজগতের বিচিত্র ভাব প্রকাশের নিবিড় ভাবগত ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে, তাতে গল্পটি কল্পলোকের স্বপ্ন ও সংগীত মাধুর্যময় হয়ে উঠেছে।

মহামায়া গল্পে গীতিকবিতার সুর আরও সুন্দরভাবে পরিস্ফূট। মহামায়া তার দীপ্ত চরিত্র নিয়ে এক দুর্ভেদ্য অবগুণ্ঠনের অন্তরালে আত্মগোপন করে নায়ক রাজিবের নিকটে নিজেকে রহস্যময়ী করে তোলে। রাজিব তার নাগাল না পেয়ে অতৃপ্ত তৃষিত হৃদয়ে সেই রহস্যভেদের চেষ্টা করে। কোনো এক বর্ষারাতের শুল্কপক্ষের জোছনায় প্রকৃতি ও মহামায়াকে এক করে দেখে রাজিব। প্রকৃতির রহস্যভেদের সাথে মহামায়ার রহস্য ভাঙতে যায়।

মহামায়া কোনো উত্তর না দিয়ে পিছনে না ফিরে বের হয়ে গেল। আর তার সে ক্ষমাহীন চিরবিদায়ের ক্রোধানল রাজিবের সমস্ত ইহজীবনে একটি দগ্ধচিহ্ন রেখে দিয়ে গেল। একটা রহস্য সুন্দরভাবে ঘনীভূত হয়ে আবার হঠাৎ বিদায়-রহস্যের মধ্যে পরিসমাপ্তি লাভ করে পাঠকের হৃদয়-চিত্তকে বিষ্মিত করেছে। এর মধ্যে শুধু কল্পনা শক্তি নয়, ভাবলোকের স্পর্শও রয়েছে।

অপরাজিতা গল্পটি একটি গানের উচ্ছ¡াসি সুরে বাঁধা। গল্পের প্রথমপর্বে তেমন কিছু নেই। বিয়ে সম্পর্কিত বাস্তব ঘটনাই বর্ণিত। শেষপর্বে এসে গল্পটি একটি গানের ধুয়ায় রূপান্তরিত হয়েছে। কোনো এক অপরিচিতার অন্তরতম অনির্বচনীয় কণ্ঠের একটিমাত্র শব্দ জায়গা আছে Ñ এর মধ্যে সেই ধুয়ার রেশ শোনা যায়। লেখকের বর্ণনায় যুবকের মনোভাব-

কিন্তু আমি আশা ছাড়িতে পারিলাম না। সে সুর চিরদিন যে আমার হৃদয়ের মধ্যে আজো বাজিতেছে Ñ। আর সে যে রাত্রির অন্ধকারের মধ্যে আমার কানে আসিয়াছিল, জায়গা আছে। সে যে আমার চিরজীবনের গানের ধুয়া হয়ে রহিল।

বাস্তব জীবনে হয়ত অন্য রকম সমাপ্তি হতে পারত। কিন্তু যে ভাবলোকধ্যান এ গল্পে প্রকাশ পেয়েছে, সাহিত্যে তার মূল্য আছে। এমন অপূর্ব রস-মাধুর্যময় পরিণতি, এমন অপরূপ সুরে সমাপ্তি এমন গীতিধর্মিতা কোনো ছোটগল্পেই দেখা যায় না।

নিশীথে গল্পটির মধ্যে অপূর্ব সুরধর্মের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। এ গল্পের গীতিধর্মিতার রস-মাধুর্য সব গল্পকে ছাড়িয়ে গেছে। গল্পটি সহজ ও স্বাভাবিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। প্রতিদিনের সহজ কথা এবং কাজকর্মের মধ্যে অতীন্দ্রিয় অতিপ্রাকৃত জগতের মায়াজাল বিস্তৃত হয়।

হঠাৎ এই অতিপ্রাকৃতের স্পর্শে একটা সাময়িক মনোবিকার ঘটে এবং তাকে অবলম্বন করে কবি কল্পনা সমস্ত আখ্যানটিকে রসে রহস্যে সুনিবিড় করে তোলে। প্রথম স্ত্রীর কাছে করা ভালোবাসার উক্তিটি যখন দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছে করল, তখনই একটা ভৌতিক শিহরণে দক্ষিণাচরণ কাঁপতে থাকে। রুগ্ন প্রথম স্ত্রীর অবিশ্বাস ও পরিহাসের সুতীক্ষ হাসি দক্ষিণাচরণকে মানসিক বিকারের মধ্যে পতিত করে। কিছুতেই যেন তা থেকে মুক্তি মেলে না ।

কাবুলিওয়ালা একটি বাস্তবভিত্তিক সরল চিত্রমূলক ছোটগল্প। অসামান্য এর মানবিক আবেদন। আপাত দুর্ধর্ষ আফগানের হৃদয়ে ফল্গুধারার মতো যে পিতৃস্নেহ ক্ষরিত হয়, তার আবেগসিক্ত পরিচয় এই গল্পে পাওয়া যায়। এ গল্পের ভাষা আবেগময়; যা অনেকটা কাব্যময়। রহমত জেল থেকে ছাড়া পেয়ে লেখকের বাড়িতে মিনির সঙ্গে দেখা করতে ব্যর্থ হয়েছে। রহমত সযতœরক্ষিত কাগজের টুকরো বুকের কাছ থেকে বের করে লেখককে দেখায় । লেখকের বর্ণনায়

দেখিলাম কাগজের উপর একটি হাতের ছাপ। ফটোগ্রাফ নহে, তেলের ছবি নহে, হাতে খানিকটা ভুসা মাখাইয়া কাগজের উপরে তাহার চিহ্ন ধরিয়া লইয়াছে। কন্যার এই স্মরণ চিহ্নটুকু বুকের কাছে লইয়া রহমত প্রতি বৎসর কলিকাতা রাস্তায় মেওয়া বেচিতে আসে Ñ যেন সেই সুকোমল ক্ষুদ্র শিশু-হস্তটুকুর স্পর্শধ্বনি তাহার বিরাট বিরহী-বক্ষের মধ্যে সুধা-সঞ্চার করিয়া রাখে।

সামান্য এক টুকরো কাগজ যে অসামান্য ব্যঞ্জনায় রহমতের পিতৃহৃদয়ের গভীর তলদেশ পাঠকের অনুভূতিকে উন্মোচিত করে, সে কথা আর বলার অবকাশ রাখে না।

রবীন্দ্র-ছোটগল্পের গীতিধর্মিতা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন

অসংখ্য ছোটো ছোটো লিরিক লিখেছি, বোধ হয় পৃথিবীর অন্য কোন কবি এত লেখেন নি Ñ কিন্তু আমার অবাক লাগে তোমরা যখন বল যে আমার গল্পগুচ্ছ গীতিধর্মী।

সমালোচকদের বক্তব্যের প্রত্যুত্তরে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের উপর্যুক্ত স্পষ্ট অনুযোগ থাকা সত্তে¡ও তার ছোটগল্পে কাব্যগুণের সন্ধান করা নিরর্থক বলে মনে হয় না। কেননা, সাহিত্যের প্রাঙ্গণে গীতিধর্মিতা ও কাব্যধর্মিতা দুই সহোদরা বৈশিষ্ট্য।

কবি-সমালোচক বুদ্ধদেব বসুর মতে,

গল্প ও কাব্য পরস্পর বিরোধী সংজ্ঞার্থ নয়। গল্প স্বভাবত কাব্যধর্মী হতে পারে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ গল্পই বাস্তবধর্মী। রবীন্দ্র-গল্পে সারা বাংলাদেশ তার গ্রাম্যতা ও নাগরিকতা নিয়ে উপস্থিত। গল্পের পাত্র-পাত্রীরা অব্যবহিত পরিবেশ চ্যূত নয়, অথচ দেশ-কালাতীত ভাবলোকের অধিবাসী। গল্পগুচ্ছের রচনারীতি সরল ও সুমিত। সমসাময়িক কাব্যের Ñ চিত্রা, সোনার তরী, বলাকা, কল্পনা’র Ñ বর্ণালঙ্কার বাহুল্য এতে নেই এবং ভাষা বিষয়কে অতিক্রম করে না। কবির গল্পে উপমার ব্যবহার যথেষ্ট আছে। যদিও উপমা কাব্যশাস্ত্রে অলঙ্কার বিশেষ। ছোটগল্পে উপমা ও বিশেষণের উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে গল্পের কাহিনী অংশকে ফুটিয়ে তোলা।

পরিশেষে বলতে হয় যে, কল্পনা ও ভাবের ঐশ্বর্য থাকার কারণে, তুচছ ঘটনার মধ্যে ভাবাতীত লোকের সন্ধান দেওয়াতে, গল্পগুচ্ছের কিছু কিছু গল্পে গীতিধর্মিতার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মর্ত্যলোকের পটভূমিকায় ছোটগল্পের প্লট নির্মাণ করলেও অনেক গল্পে অমর্ত্যলোকে পৌঁছানোর আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছেন।

ছোটগল্প সৃষ্টিতে তার গীতিকবির প্রতিভা সংযুক্ত হয়েছে, সেজন্য অনেক গল্পে গীতিধর্মিতা লক্ষণীয়। তবে, যেখানে গীতিধর্মিতার লক্ষণ রয়েছে, সেখানেও তার প্রতিভা এতটুকুও ¤øান হয় নি। রবীন্দ্রনাথের ভাষা, উপমা, অলঙ্কার বর্ণনাভঙ্গি বা রচনাভঙ্গির জন্য গল্পগুলি যেমন কাব্যধর্মী হয়ে উঠেছে, তেমনি তার মর্ত্যভাবনা অমর্ত্যলোকে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে গীতিধর্মিতা ব্যক্ত হয়েছে। তবে কখনও সমাজ-বাস্তবতাকে তিনি অতিক্রম করে যান নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *