চর্যাপদের ভাষা যে বাংলা তা প্রমাণ কর।


ভূমিকা: নেপালের রাজদরবার থেকে হরপ্রসাদ কর্তৃক আবিষ্কৃত চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের একমাত্র নির্ভরযোগ্য নিদর্শন। চর্যাপদের আবিষ্কার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মান ও মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাথমিক স্তরের সৃষ্টি। তাই পণ্ডিতদের মধ্যে এর ভাষা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। তবে ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ও ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্যের আলোকে পণ্ডিতেরা প্রমাণ করেছেন যে, চর্যাপদের ভাষা বাংলা।


বাংলা, আসামী, উড়িয়া, হিন্দি ও মৈথিলী ভাষা একই ভাষাগোষ্ঠীর। এদের মধ্যে প্রাথমিক স্তরে অনেক মিল ছিল। তাই, চর্যাপদ আবিষ্কারের পর উক্ত ভাষাভাষীরা নিজ নিজ ভাষার বলে দাবী করে। চর্যাপদ যে সময়ে রচিত হয়েছে, তখন তার ভাষা সবেমাত্র তার পূর্ববর্তী রূপ থেকে বেরিয়ে এসেছে। উক্ত ভাষাগুলো একই সময়ে একই ভাষা থেকে জন্ম নিয়েছে। ফলে চর্যাপদের ভাষায় ব্যবহৃত শব্দের রূপের সাথে উক্ত নব্য ভারতীয় আর্য ভাষাগুলোর শব্দ-রূপের মিল থেকে গেছে বা উক্ত ভাষাগুলোর শব্দ চর্যাপদের ভাষায় ব্যবহৃত হয়েছে।
চর্যাপদের ভাষার উপর অন্য ভাষাভাষীদের দাবীর যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে গিয়ে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কয়েকটি বিষয়কে সামনে রেখে আলোচনা শুরু করেছেন। যেমন-
- এটি কোনো একক ভাষা নয়,
- এটি খিচুড়ি ভাষা;
- এটি অপভ্রংশ;
- এটি হিন্দি;
- এটি মৈথিলি;
- এটি কোনো একক ভাষা নয়,
- এটি খিচুড়ি ভাষা;
- এটি অপভ্রংশ;
- এটি হিন্দি;
- এটি মৈথিলি;
- এটি বাংলা।
চর্যাপদের ভাষা: বাংলা
সমস্ত আলোচনা শেষে তিনি চর্যাপদের ভাষাকে বঙ্গ-কামরূপী বলে মত প্রকাশ করেন। ডঃ সুকুমার সেন বলেন ‘চর্যার উপর অসমীদের দাবী অযৌক্তিক নয়, কেননা ষোড়শ শতাব্দী অবধি দুই ভাষার বিশেষ তফাৎ ছিল না”। ডঃ শহীদুল্লাহ আলোচনা করে দেখিয়েছেন যে আমি, তুমি, তুই, আপনি, কান্ডারি, কেডুয়াল ও করিস শব্দগুলোর প্রাচীন রূপ চর্যাপদের ভাষার মধ্যে রয়েছে। ১৯২০ সালে তিনি ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে প্রমাণ করেন যে চর্যাপদের ভাষা বাংলা।
বিজয় চন্দ্র মজুমদারের মতে চর্যাপদের ভাষা খিচুড়ি ভাষা। তবে হিন্দির প্রাধান্য বেশি। তার মতে উড়িয়া ও মৈথিলি শব্দের মতো বাংলা শব্দের অস্তিত্বও আংশিক। তিনি বলেছেন ১ নং চর্যায় ‘পইঠা’ হিন্দি শব্দ। ৩৩ নং চর্যায় ‘হাড়ীত ভাত নাই’ বাংলা ভাষা, কিন্তু ‘দুহিল দুধু’ হয় হিন্দি, না হয় উড়িয়া। ‘যামায়’, ‘জহি’, ‘তহি’ ‘এ’, উড়িয়াপদ; ‘অচ্ছ’, ‘কএলা’ উড়িয়া ক্রিয়াপদ। এ ভাবে হিন্দির প্রভাব যে বেশি, তা তিনি দেখিয়েছেন। কিন্তু ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য না ধরে শুধু বিচ্ছিন্ন শব্দ ধরে ভাষার জাতি বিচার করা যায় না।
রাহল সাংকৃত্যায়ন, কাশীপ্রসাদ, জয়সোয়াল প্রমুখ হিন্দিভাষী পন্ডিতেরা মনে করেন চর্যার অনেক শব্দ হিন্দির কাছাকাছি, চর্যাপদ হিন্দি দোহা ছন্দে রচিত, চর্যার কবিরা হিন্দিভাষী বিহারের অধিবাসী। এর বিপক্ষে বলা যায়-
হিন্দির পূর্বরূপ পশ্চিমা অপভ্রংশের কিছু শব্দ চর্যাপদের ভাষায় এসেছে বলে এরকম মনে হয়েছে। শব্দ থাকলেই বা কি হবে, চর্যার ভাষাগত মূল কাঠামো বাংলার কাছাকাছি, দোহা ছন্দ থাকলেও তা খুবই সীমাবদ্ধ। চর্যার সব কবিই বিহারের অধিবাসী নয়। আর বিহার হলেও তারা বৃহৎ প্রত্নবঙ্গের অধিবাসী।
মৈথিলি ভাষার ক্ষেত্রে যুক্তি হলো-
১। বেশির ভাগ পদকর্তা মৈথিলি ভাষী;
২। চর্যার ধ্বনিতত্ত্ব ও রূপতত্ত্ব মৈথিলির মতো; যেমন- নাসিক্য ধ্বনির ব্যবহার, দন্ত্য শিশধ্বনির উপস্থিতি, করণ কারকে ‘এঁ’, ‘তে’ এবং সম্মন্ধপদে ‘ক’ বিভক্তির প্রয়োগ;” হাঁউ’ ‘মো’, মোএ’, ‘তোএ’, ‘তোরা’, ‘সে’ ইত্যাদি সর্বনামীয় শব্দরূপের ব্যবহার।
৩। ‘আজি’, ‘সাঙ্কম’, ‘তেঞ্জলি’, ‘টাঙ্গি’, ‘সাসু’, ‘কোঠা’, ‘ভাত’, ‘বাড়ী’ ইত্যাদি মৈথিলি শব্দের ব্যবহার:
৪। চর্যায় ব্যবহৃত প্রবাদ প্রবচন এখনও মৈথিলিতে ব্যবহৃত হয়।
এ যুক্তির বিপক্ষে বলা যায়-
দু’একজন কবি বিহারের অধিবাসী হলেও এরা প্রত্নবঙ্গভাষী এলাকার অধিবাসী। ধ্বনিতত্ত্ব ও রূপতত্ত্বের যে বৈশিষ্ট্যের কথা তারা বলেছে, তা ঐতিহ্য সূত্রে বাংলা ভাষারও প্রাচীন বৈশিষ্ট্য বলে গণ্য করা যায়। শব্দের দিক থেকে তারা যা দাবী করে, তা বাংলা ভাষারও শব্দ, প্রবাদ প্রবচনের কথা যা বলেছে, ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে তা বাংলার বলে গ্রহণ করা যায়। একমাত্র শান্তিপাদের চর্যায় মৈথিলির লক্ষণ পাওয়া যায়।
প্রাকৃত ভাষার শেষ স্তর অপভ্রংশ। অপভ্রংশের খোলস ছেড়েই নব্যভারতীয় আর্যভাষাগুলোর জন্ম। চর্যাপদ বাংলা ভাষার জন্ম মুহূর্তে রচিত। তখনও অপভ্রংশের খোলস থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয় নি। মৌলিক রূপ পেলেও সম্পর্ক ত্যাগ করেনি। তাছাড়া অপভ্রংশ সে সময়ে বিশাল জনপ্রিয় লৌকিক সাহিত্যের ভাষা হিসেবে চালু ছিল।
পদকর্তারা অনেকে অপভ্রংশে পদ রচনা করেছেন। এ সব কারণে ‘জসু’, ‘তসু’, ‘অইসন’ ইত্যাদি শব্দ; না বাচক অব্যয় হিসেবে ‘মা’ শব্দের ব্যবহার, উত্তম পুরুষের ক্রিয়ায় ‘মি’ বিভক্তি যুক্ত (পুছমি) ইত্যাদি অপভ্রংশের প্রভাব চর্যায় রয়ে গেছে। বিশেষ করে শৌরসেনী অপভ্রংশ বাংলাদেশসহ সমগ্র ভারতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে থাকায় সিদ্ধাচার্যদের ভাষায় শৌরসেনী অপভ্রংশের প্রভাব পড়েছে। আর এ জন্যই হিন্দি, উড়িয়া, মৈথিলি ভাষাভাষীরা নিজ নিজ প্রাদেশিক গৌরব বৃদ্ধি করতে “চর্যাপদ নিয়ে রীতিমত মামলা” বাঁধিয়ে দেয়।
ডঃ সুনীতিকুমার ভাষাতাত্ত্বিক বিচার করে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, চর্যার ভাষা প্রাচীন বাংলা। চর্যাপদের মধ্যে বাংলা ভাষার ব্যাকরণগত ও ভাষাগত যে বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তা একে একে উল্লেখ করা হলো-
যেসব ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য চর্যার সঙ্গে বাংলার সম্পর্ককে প্রমাণ করে সেগুলো হলো:
সম্বন্দ্ব পদে-অর বিভক্তি,
সম্প্রদানে কে, সম্প্রদানবাচক অনুসর্গ অন্তরে (মধ্যযুগীয় ও আধুনিক রূপ-তরে), অধিকরণে অন্ত, ত,
অধিকরণবাচক অনুসর্গ-মাঝে,
অতীত ক্রিয়ায়-ইল এবং
ভবিষ্যত ক্রিয়ায়-ইব। চর্যা মৈথিলি। বা পূরবীয়া হিন্দিতে রচিত হলে অতীত ক্রিয়ায়-অল ও ভবিষ্যতে-অব যুক্ত হতো।
বাকভঙ্গী:
গুনিয়া, লেই, দিল, ভণিআঁ, সড়ি, পড়িআঁ, উঠি গেল, আখি বুজিঅ, ধরণ ন জাঅ, কহন না জাই, পার করেই, নিদ গেলা, আপনা মাংসে হরিণা বৈরী, হাড়ীত ভাত নাহি ইত্যাদি বাগভঙ্গিমা ও শব্দযোজনা বাংলা ভাষায় পরবর্তীকালেও সুলভ। এর সঙ্গে অবশ্য তসু, জৈসন, জিস, কাঁহি, পুছমি প্রভৃতি পশ্চিমা অপভ্রংশের শব্দও আছে। তবে সেগুলো মূলত কৃতঋণ শব্দ হিসেবেই চর্যায় ব্যবহৃত হয়েছে।
এছাড়া সম্প্রদানে-ক এবং সাথ, -লাগ, লগ-এর বদলে সঙ্গে, সম অনুসর্গের ব্যবহার এবং নাসিক্যধ্বনির বাহুল্যের জন্য চর্যার ভাষাকে রাঢ় অঞ্চলের ভাষা বলে মনে করা হয়।
▶ চর্যায় অ-কার কিছু বেশি বিবৃত; কতকটা আধুনিক আ-এর কাছাকাছি। সম্ভবত আদিম্বরের শ্বাসাঘাতের জন্য অ/আ ধ্বনির বিপর্যয় দেখা যায়। যেমন অইস/আইস, কবালী/কাবালী, সমাঅ/সামাঅ ইত্যাদি।
▶ ব্যঞ্জনধ্বনির ক্ষেত্রে প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো: পদমধ্যে ‘হ’-ধ্বনির সংরক্ষণ (যেমন: খনহ, তঁহি, করহ ইত্যাদি); মহাপ্রাণ বর্ণের অস্তিত্ব (যেমন: আহ্মে, কাহ্ন, দিঢ় ইত্যাদি) এবং উড়িয়া-সুলভ ‘ল’-ধ্বনি বজায় থাকা।
▶ নাসিক্যব্যঞ্জনের পূর্বম্বর দীর্ঘত্বলাভের সঙ্গে সঙ্গে অনুনাসিক হয়ে গেছে। যেমন: চন্দ্র চন্দ চাঁদ ইত্যাদি।প্রিলিমিনারি বাংলা (খন্ড-১)
▶ পাশাপাশি অবস্থিত একাধিক স্বরধ্বনির অস্তিত লক্ষ করা যায়। যেমন: উদাস উআস। পদান্তেও স্বরধ্বনির ব্যবহার দেখা যায়। যেমন: ভণতি ভণই ইত্যাদি।
▶ চর্যায় স্বরসংগতির দু-একটি উদাহরণ মেলে। যেমন: সমুন্ন (< শ্বশুর) ইত্যাদি।
▶ শ. য.স এবং ন. ণ এর যথেচ্ছ ব্যবহার দেখা যায়। যেমন: নিঅ/ণিঅ, নাবী/ণাবী, সহজে/ষহজে, আস(<আশা) ইত্যাদি।
▶ দীর্ঘস্বর ও হ্রসম্বরের উচ্চারণের পার্থক্য হ্রাস পেয়েছিল।
যেমন: শবরি/সবরী, জোই/জোঈ ইত্যাদি।
▶ পদের আদিতে ‘য’ ধ্বনি ‘জ’ ধ্বনিতে পরিণত হয়েছিল।
যেমন: জাই/যাই।
▶-এর ও-ক বিভক্তির মাধ্যমে সম্বন্ধপদ নিষ্পন্ন হতো
যেমন: ‘রুখের তেন্ডুলি’, ‘করণক পাটের আস’ ইত্যাদি।
▶-ই.এ.-হি,-তে ও-ত অধিকরণের বিভক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। যেমন: ‘নিঅড়ি’, ‘ঘরে’, ‘হিঅহি’, ‘সুখদুখেতে’, ‘হাঁড়িত’ ইত্যাদি।
▶ করণের বিশিষ্ট বিভক্তি-এ সপ্তমীর সঙ্গে প্রায় অভিন্ন হওয়ার কারণেও -তে, এতে, -তে বিভক্তি দেখা যায়। যেমন: ‘সাঁদে’ (< শব্দেন), ‘বোধে’ (< বোধেন), ‘মতিত্র’, ‘সুখদুখেতে’ (< সুখদুঃখ এ+ ত + এন)।
▶ অপাদানে অপভ্রষ্ট থেকে আগত -হুঁ বিভক্তি দু-একটি পাওয়া গেছে। যেমন: ‘খেপহুঁ’, ‘রঅনই’।
▶ সংস্কৃতের মতো কর্মভাববাচ্যের প্রচুর উদাহরণ চর্যাপদে আছে। যেমন: ‘নাব ন ভেলা দীসই’, ‘ধরণ ন জাই’ ইত্যাদি।
▶ চর্যাপদে যৌগিক কালের উদাহরণ না থাকলেও যৌগিক ক্রিয়ার উদাহরণ প্রচুর আছে। যেমন: ‘গুণিআ লেই’, ‘নিদ গেল’ ইত্যাদি।
▶ কর্মভাববাচ্যে অতীতকালে-ই-ইল এবং ভবিষ্যৎকালে-ইং বিভক্তির প্রয়োগ দেখা যায়। যেমন: ‘চলিল কাহ্ন’, ‘মই ভাইব’ ইত্যাদি।
▶ প্রাচীন বাংলার চর্যাপদে ব্যবহৃত প্রবচনগুলো বাংলা ভাষায় ঐতিহ্যবাহী। যেমন: ‘হাড়িত ভাত নাহি নিতি আবেশী, ‘অপণা মাংসে হরিণা বৈরী’ ইত্যাদি।
চর্যাপদের ভাষা নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের অবসানান্তে প্রতীয়মান হয় যে এটি বাংলা ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। চর্যাপদের রচয়িতা বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ সংস্কৃতে পারদর্শী হলেও তারা তৎকালীন অপরিণত বাংলাতেই পদগুলো রচনা করেছিলেন। চর্যাপদের ভাষা বাংলা ভাষার অদ্যাবধি আবিষ্কৃত আদিতম রূপ। অসমীয়া উড়িয়া মৈথিলি বিদ্বজ্জনেরা এ ভাষায় নিজেদের পূর্বসূরিত্বের সন্ধান করলেও ভাষাবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ফল. বাংলা ভাষারই অনুকূল।