চর্যাপদের ধর্ম ও দর্শন আলোচনা করে তাদের সাধনপ্রণালীর বর্ণনা দাও।


উত্তরঃ চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন। চর্যাপদগুলো বৌদ্ধ সহজিয়াদের সাধন পদ্ধতিমূলক এক প্রকারের গান। তাই, চর্যাপদের সাহিত্য-মূল্য বিচারের সঙ্গে এর ধর্মতত্ত্বের পর্যালোচনা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। চর্যাপদে বর্ণিত ধর্মীয় ইঙ্গিত, সাধন-প্রণালীর বিবরণ, ও বিভিন্ন রূপক-উপমা-প্রতীকের উল্লেখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, এই গানগুলোর মূল পটভূমিকা হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্ম। তবে বৌদ্ধ ধর্মের আদিরূপ নয়, কোনো একটি পরিবর্তিত তান্ত্রিক রূপ। আর তা হলো বজ্রযান থেকে উৎপত্তি সহজযান মতবাদ। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর দি বুদ্ধিস্ট মিস্টিংস সং গ্রন্থে চর্যার ধর্ম ও দর্শন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।


বিভিন্ন পণ্ডিতদের মতামতের ভিত্তিতে চর্যাপদের ধর্ম ও দর্শনের ব্যাখ্যা।
বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক হলেন গৌতম বুদ্ধ। তিনি মানুষের শোক, জ্বরা-মৃত্যু নিরোধে ছিলেন চিন্তিত। মানুষের জীবনের উক্ত সমস্যা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে বুদ্ধ কঠোর সাধনা করে বুদ্ধত্ব লাভ করেন। মানুষের মুক্তির জন্য চেয়েছিলেন নির্বাণ।
বৌদ্ধ মতে পঞ্চস্কন্দ (রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার বিজ্ঞান) ধ্বংস হলে জীবনের ধ্বংস হয়। কিন্তু মানুষের কর্ম আবার নতুন স্কন্দের জন্ম দেয় এবং মৃত্যুর পর নতুন করে জন্ম নিয়ে দুঃখ-শোক ভোগ করে। বৌদ্ধ ধর্ম মতে, সাধনার দ্বারা মানুষ জন্ম রোধ করতে পারে এবং জাগতিক জীবনের কষ্ট থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে। এই যে দুঃখ ভোগ থেকে নিবৃত্তি, তাকেই বলা হয় নির্বাণ।
গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর বৌদ্ধ ধর্মের লক্ষ্য নিয়ে মতভেদের কারণে বৌদ্ধ ধর্ম হীনযান ও মহাযান এ দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। মহাযান থেকে উৎপত্তি হয় বজ্রযান, মন্ত্রযান ও কাল চক্রযান। বজ্রযান থেকে উৎপত্তি হয় সহজযানের। চর্যার সিদ্ধাচার্যরা এই সহজযানের অন্তর্গত। তবে বৌদ্ধধর্ম বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হলেও সব শাখারই মূল উৎস বুদ্ধের মতবাদ।
কালক্রমে বিভিন্ন ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান এসব শাখার উপর প্রভাব বিস্তার করে। মহাযানীরা মনে করে যে, সকল জীবের মধ্যে বুদ্ধত্ব লাভের সম্ভাবনা আছে, তবে গৌতমবুদ্ধের মতো বোধিসত্তাবস্থায় উপনীত হয়ে পরের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে। (বুদ্ধত্ব লাভের আগের অবস্থাকে বলা হয় বোধিসত্তাবস্থা।)
বোধিসত্তাবস্থাকে স্থায়ী করতে গিয়েই মন্ত্র-শক্তি এসে যোগ হয়। তার ফলে বৌদ্ধমতের সাথে যোগ হয় তন্ত্রধর্মের বিভিন্ন আচার-পদ্ধতি। যেমন মন্ত্র, মণ্ডল, মুদ্রা, তান্ত্রিক যৌনাচার ও যৌগিক কায়সাধনা। এ সব প্রভাবযুক্ত বৌদ্ধমত তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম বা বজ্রযান নামে পরিচিতি পায়। বজ্রযান থেকে উৎপত্তি সহজযান তন্ত্রনির্ভর ছিল। তাই মহাযানী ধর্মমতের ধারণাগুলো তান্ত্রিক ধারণাগুলোর দ্বারা প্রভাবিত ও পরিবর্তিত হয়ে সহজযান ধর্মতত্ত্বে গৃহীত হয়।
মহাযানী ধর্ম ও দর্শন মতে পার্থিব সকল বস্তুই অস্তিত্বহীন। তাদের কোনো স্বরূপ নেই বা ধর্ম নেই। এরূপ মনে করার নাম শূন্যতা। আর সকল পার্থিব জীবনের মুক্তির জন্য আকুতিকে বলা হয় করুণা।
ধর্মতত্ত্বের দিক থেকে শূন্যতা ও করুণার মিলনকে বলা হয় বোধিচিত্ত। আর বোধিচিত্ত লাভের মধ্যে দিয়ে উপনীত হওয়া যায় বোধিসত্তাবস্থায়। তারপর ক্রমে বুদ্ধত্ব লাভ হয়। এই শূন্যতা ও করুণা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মে যথাক্রমে নারী ও পুরুষ এবং সহজযানী বৌদ্ধধর্মে প্রজ্ঞা ও উপায়ে পরিণত হয়েছে। মহাযানীর বোধিচিত্ত বজ্রযানে বজ্রসত্ত্ব এবং সহজযানে সহজ, সহজানন্দ, মহাসুখ ইত্যাদি নামে পরিচিত।
তান্ত্রিকরা মনে করেন দেহের মধ্যে শক্তি ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে। তাকে যোগসাধনার দ্বারা জাগিয়ে দেহের ভিতর অবস্থিত বিভিন্ন চক্র অতিক্রম করে মস্তিস্কের সহস্রাব চক্রে নিয়ে যেতে হবে। বাম দিকের ইড়া নাড়ি এবং ডান দিকের পিঙ্গলা নাড়িকে তারা যথাক্রমে শক্তি ও শিবরূপে কল্পনা করে।
ইড়া ও পিঙ্গলার মধ্যবর্তী স্থানকে বলে সুষুম্মা। এই ইড়া ও পিঙ্গলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত অপান ও প্রাণ বায়ুকে যোগ-সাধনার দ্বারা সুষুম্মাতে এনে মিলিত করে, সুষুম্মা পথে তাকে উপরের দিকে পরিচালিত করে মস্তিস্কের সহস্রার চক্রে নিয়ে যেতে হবে। এই যাত্রাপথে মূলাধার চক্র, স্বাধীষ্ঠান চক্র, মণিপুর চক্র, অনাহত চক্র, বিশুদ্ধ চক্র ও আজ্ঞাচক্র অতিক্রম করতে হয়।
চর্যাপদে বর্ণিত সহজিয়া সাধকরাও মহাসুখ লাভের ঠিক একই প্রক্রিয়া বর্ণনা করেছেন। তারা ইড়া নাড়িকে প্রজ্ঞা, আর পিঙ্গলা নাড়িকে উপায় বলে মনে করেন। ইড়া-পিঙ্গলার সাথে প্রজ্ঞা ও উপায় অভিন্ন হয়ে চন্দ্র-সূর্য, গঙ্গা-যমুনা, ললনা-রসনা, নাদ-বিন্দু, আলি-কালি ইত্যাদি নামে চর্যাপদে অভিহিত হয়েছে। বোধিচিত্ত অবধুতিকারূপে শেষ পর্যন্ত সুষুম্মার সঙ্গে অভিন্ন কল্পনা করা হয়েছে। এই ললনা-রসনা-অবধুতিকা নানা বিচিত্র রূপকে চর্যাপদে আত্মপ্রকাশ করেছে।
বৌদ্ধতন্ত্র অনুসারে চক্র চারটি। যথা-
- ১) জননেন্দ্রিয় থেকে নাভি পর্যন্ত অংশ নির্মাণ চক্র
- ২) হৃদয়ে ধর্মচক্র
- ৩) কণ্ঠে সম্ভোগ চক্র
- ৪) মস্তিস্কে মহাসুখ চক্র।
বৌদ্ধতন্ত্র অনুসারে ললনা ও রসনার মিলনে যে বোধিচিত্ত উৎপন্ন হয়, তার স্বভাব চঞ্চল এবং নিচের দিকে ধাবিত হওয়ার প্রবণতা থাকে। যোগ-সাধনার দ্বারা তাকে মহাসুখ চক্রে নিয়ে যেতে পারলে সে রূপান্তরিত হয় পারমার্থিক বোধিচিত্তে। এই পারমার্থিক বোধিচিত্তই চর্যাপদে সহজসুন্দরী, নৈরাত্মাদেবী, নৈরাত্মামণি, পরমশূন্যতা প্রভৃতি নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ৫ নং চর্যার ধর্মমত ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। যেমন-
নদীর দু’তীরে যেমন কাদা থাকে, তেমনি এই ভবনদীর দু’তীরে অনেক মোহ-মায়া রয়েছে। মানুষ সে মোহে পড়ে ধ্বংস হয়। চাটিল পাদ সেজন্য যোগ-সাধনারূপ সাঁকোর উপর দিয়ে মহাসুখ চক্রে গিয়ে নির্মাণ লাভের কথা বলেছেন। প্রথমে মোহগুলো দূর করতে হবে জ্ঞানের আলোকে।
সেতুর উপর দিয়ে যাবার সময় মধ্য পথে অর্থাৎ সুষুম্মাপথে যেতে হবে, ডানে-বামে যাওয়া যাবে না। ডান-বাম দিকে ইড়া-পিঙ্গলার পথ অর্থাৎ প্রবৃত্তির পথ। সুযুম্মা পথই যথার্থ পথ অর্থাৎ নিবৃত্তির পথ। সেই পথে চলতে থাকলে বোধিলাভ সহজেই সম্ভব।
চর্যাপদে বিধৃত ধর্ম ও দর্শন প্রধানত সহজযান বৌদ্ধধর্ম। এই ধর্ম সাধনাকে সহজ নামে অভিহিত করার কারণ হলো দুটো এক; এই ধর্ম সাধনার সাধ্যও সহজ, দুই; সাধন পদ্ধতিও সহজ। এরা সাধনার দ্বারা যা পেতে চায়, তাও সহজানন্দ, অন্যদিকে এদের সাধন পদ্ধতিও বক্র নয়, সহজ দেহ।
বৌদ্ধমতের অন্যান্য সাধকরা দেহের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলো রোধ করে ধ্যান, সমাধি, জপতপ, শাস্ত্রপাঠ, মন্ত্র, পারমিতা, পঞ্চশীলা ইত্যাদির মাধ্যমে মুক্তির সাধনা করেছেন। সহজিয়ারা এভাবে সাধনাকে বক্রপথে গমন বলে আখ্যায়িত করেছেন। চর্যাপদের প্রথম গানেই লুই ধ্যান-সমাধির ব্যর্থতা ঘোষণা করে বলেছেন-
সঅল সমাহিঅ কাহি করিঅই।
সুখ দুখেতে নিচিত মারিঅই।
৩৪ সংখ্যক গানে দারিক পাদ বলেছেন যে, মন্ত্রে, তন্ত্রে, ধ্যানে, শাস্ত্র-ব্যাখ্যায় কোনো লাভ নেই। মহাসুখ লীলায় প্রতিষ্ঠিত না হলে পরম নির্বাণকে পাওয়া যায় না। ২৯নং চর্যার গানে লুই বলেছেন-
জাহের বান চিহ্ন———–।
সো কইসে ———-বাখানী।
যে সহজের বর্ণ চিহ্নরূপ কিছুই জানা যায় না, তার কথা আগমবেদে কী করে ব্যাখ্যা করা যায়? কাহ্ন ৪০ নং চর্যায় বলেছেন যে, সহজানন্দ ইন্দ্রিয়গোচর নয়, কায়-বাকচিত্ত কোনো কিছুই তার মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। তাই যে যত ব্যাখ্যা করবে, সে তত ব্যর্থ হবে। তাই চর্যাকার নির্দেশ দিয়েছেন-
উজ্জুরে উজ্জু বাড়ি মা লেহুরে বঙ্ক।
নিয়ডিহি বোহি মা জাহুরে লঙ্কা।
সাধনার পথ সোজা, সোজাপথ ছেড়ে বাঁকাপথে যেও না, বোধি নিকটেই আছে, লঙ্কায় (দূরে) যেও না, যারা সোজা পথে গেছে, তারা কেউ ফেরে নি অর্থাৎ সহজানন্দ লাভ করেছে।
চর্যার সিদ্ধাচার্যরা বৌদ্ধতন্ত্রের শূন্যতা-করুণার দ্বন্দ্ব ত্যাগ করে মানবদেহের মেরুদণ্ড নির্ভর সাধনার কথা ব্যক্ত করেছেন। যোগ-সাধনার দ্বারা চর্যার সাধকরা অনুপ্রাণিত, তাই তাদের সাধনায় দেহ শোধন, মহারসপান, নরনারীর যৌনমিলন জনিত অদ্বয় অবস্থা লাভের বিধান দেখা যায়। সরহপা ২২নং চর্যায় তার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বৌদ্ধমতে যোগ সাধনায় নারীর কোনো স্থান নেই। কিন্তু চর্যার সাধকরা তান্ত্রিক মত দ্বারা প্রভাবিত, তাই তাদের সাধনায় নারীর স্থান রয়েছে। কেননা তান্ত্রিকদের সাধনায় নারী ছিল অপরিহার্য। চর্যায় মিথুনাত্মক যোগ-সাধনা সর্বত্র দেখা যায়।
লুই পা ১নং চর্যায় বলেছেন যে, চঞ্চল চিত্তকে শান্ত করার জন্যই ধমন-চমন বা রেচক-পূরক দুই পিড়িতে বসে শূন্য সাধনা করতে হবে। কিন্তু একাকী তা সম্ভব নয়। তাই ৪নং চর্যায় বলা হয়েছে-
তিয়ড়া চাপী জোইনি দে অঙ্কবালী।
কমলকুলিশ ঘান্টে করহু বিআলী।
চর্যার সাধকরা সহজিয়া। সহজ স্বরূপকে উপলব্ধি করে মহাসুখ লাভে মগ্ন হওয়াটা হলো তাদের মূল আদর্শ। এদের মতে গুরুর আদেশই সব। সহজ সাধনা হলো এদের মূল সাধনা। আচার-পুজো অর্চনা, কঠিনতত্ত্ব -এসবের কোনো দরকার নেই, গুরুর হাতেই এ সাধনার চাবিকাঠি। তাই ১নং চর্যায় লুই বলেছেন-
লুই ভনই গুরু পুছিঅ জান
অন্যত্র কম্বলাম্বর বলেছেন সদগুরু পুছি। কাহ্নপা, ডোম্বী পা, ভুসুকু পা, শবর পা সকলেই সাধনায় গুরুকে অতি উচ্চে স্থান দিয়েছেন।
চর্যার মূল কথা হলো মানবদেহে বিষ ও অমৃত দুই-ই মিশ্রিত আছে, গুরুর কাছ থেকে জ্ঞান নিয়ে বিষ আলাদা করে অমৃত পান করে অজয়-অমর হতে হবে। তাতে শূন্যতা ও করুণার মিলন ঘটবে। মহাসুখময় নির্বাণ লাভ তখনই সম্ভব হবে।।
চর্যার ধর্ম ও দর্শন আলোচনা শেষে বলা যায় যে, চর্যায় যে ধর্মের কথা বলা হয়েছে তা বৌদ্ধধর্মেরই কথা। তবে তা বৌদ্ধধর্মের মূলযানের মতো করে নয়। মূলযানের মৌল লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্য চর্যায় নেই। এটা সত্য যে, পার্থক্য যতই থাকুক না কেন, তাদের মূল লক্ষ অর্জন অভিন্ন। শুধু পথ আলাদা।
চর্যার সহজিয়ারা বৌদ্ধ সাধনার মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও মূলত এরা বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শনের মধ্যেই অবস্থান করেছে। বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শনের মূল উপাদানের অনেক কিছু অনুপস্থিত ও অস্বীকৃত হলেও অনেক উপকরণ চর্যায় পাওয়া যায়। যেমন মহাযানের ত্রিশরণ, শূন্যতা, নির্বাণ, পঞ্চস্কন্দ, বোধি ইত্যাদি; বজ্রযানের প্রজ্ঞা, উপায়, মহাসুখ, নৈরাত্মা বৌদ্ধতন্ত্রের অষ্টসিদ্ধিরস, রস-রসায়নপান ইত্যাদি চর্যায় বিদ্যামান।
তাছাড়া, বৌদ্ধমতবাদের ত্রিশরণ, শূন্যতা, নির্বাণ যা স্বয়ং বুদ্ধ পালন করতেন, তাও চর্যায় পাওয়া যায়। তাই, তান্ত্রিকদের সাথে বেশি মিল থাকলেও তাদের মতকে তারা সহজ করে নিয়েছেন এবং চর্যার সাধকরা মূল বৌদ্ধ ধর্মেরই বিদ্রোহী একটা শাখা বলে মনে হয়।
চর্যাপদে প্রতিফলিত ধর্ম ও দর্শন আলোচনা শেষে নিজের মতামত প্রসঙ্গে যা বলা যেতে পারে–
১. ভূমিকা: বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদে প্রতিফলিত ধর্ম ও দর্শন কেবল সাহিত্যিক নয়, আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতেও অনন্য। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে রচিত এই পদাবলিতে বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের গূঢ় ভাবধারা প্রতিফলিত হয়েছে।
২. বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্মচিন্তা
চর্যাপদে প্রতিফলিত ধর্ম ও দর্শন প্রধানত বৌদ্ধ সহজিয়া মতবাদের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এখানে জীবনমুক্তি বা নির্বাণ লাভের পথ সহজ ও মানবিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সাধকের অন্তরের “সহজ” বা “স্বভাব” অবস্থাই মুক্তির প্রতীক। বাহ্যাচার নয়, অন্তরাচারই এখানে মুখ্য।
৩. মানবতাবাদ ও সমানাধিকারের ধারণা
চর্যাকাররা মানুষের ভেতরের ঈশ্বরকে খুঁজেছেন। বর্ণ-ভেদ, জাতিভেদ, ধর্মীয় আচার—এসবের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁরা এক সর্বজনীন মানবতাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। এভাবেই চর্যাপদে প্রতিফলিত ধর্ম ও দর্শন মানবমুক্তির আদর্শে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
৪. নারী-পুরুষ ও যোগদর্শনের সংমিশ্রণ
চর্যাকারদের সাধনায় নারী-পুরুষ উভয়ই মুক্তির সহযাত্রী। নারী এখানে কাম নয়, শক্তির প্রতীক। এ যোগদর্শন মন ও প্রাণের ঐক্যে পৌঁছানোর পথ দেখায়। ফলে চর্যাপদে প্রতিফলিত ধর্ম ও দর্শন হয়ে ওঠে দেহতত্ত্ব ও আত্মতত্ত্বের সমন্বিত এক সাধনরূপ।
৫. প্রতীক ও রূপকের ব্যবহারে দর্শনের গভীরতা
চর্যাকাররা তাঁদের ভাবকে প্রকাশ করেছেন প্রতীক ও রূপকের মাধ্যমে—‘পাখি’, ‘নৌকা’, ‘সমুদ্র’, ‘গুরু’, ‘সোনার দেহ’ প্রভৃতি প্রতীকে। এই প্রতীকের আড়ালে লুকিয়ে আছে জীব-জগত, মায়া ও মুক্তির চিরন্তন রহস্য।
যেমন- কায়া তরুবর পাঞ্চ বি ডাল
চঞ্চল চিএ পৈঠা কাল
৬. উপসংহার
সব মিলিয়ে চর্যাপদে প্রতিফলিত ধর্ম ও দর্শন আমাদের জানায় যে মুক্তি বাহিরে নয়, অন্তরে। মানুষের আত্ম-সন্ধান ও সহজ জীবনের মধ্য দিয়েই সত্য উপলব্ধি সম্ভব। তাই বলা যায়, চর্যাপদে প্রতিফলিত ধর্ম ও দর্শন বাংলা সাহিত্যের আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক ঐতিহ্যের প্রথম দীপশিখা, যা আজও আমাদের চিন্তা ও চেতনার মূল প্রেরণা হয়ে আছে।
খুব সুন্দর সাজানো গোছানো তথ্য🌸অনেক ধন্যবাদ স্যার