ছন্দ-উপাদান: বহুমাত্রিক নান্দনিকতা
ছন্দ-উপাদান বিশ্লেষণের আগে ছন্দের সংজ্ঞা জেনে নিই।
ছন্দ এমন একটি পদবিন্যাস , যা বাক্যকে রসাত্মক, ভাষাকে সুষমামÐিত ও শ্রæতিমধুর করে। যে পরিমিত পদবিন্যাস দ্বারা বাক্যের ধ্বনিপ্রবাহের মধ্যে সামঞ্জস্য সৃষ্টি করে বাক্যকে রসাত্মক ও শ্রæতিমধুর করে তোলে তাকে ছন্দ বলে।
প্রবোধচন্দ্র সেনের মতে Ñ শিল্পিত বাকরীতির নাম ছন্দ।
অমূল্যধন মুখোপাধ্যায় বলেন Ñ
যেভাবে পদবিন্যাস করলে বাক্য শ্রæতিমধুর হয় এবং মনে রসের সঞ্চার হয়, তাকে ছন্দ বলে।
ছন্দ ও কবিতা ঃ
কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য হলো রস সৃষ্টি , আর ছন্দ সেই রস পরিস্ফুটনে সহায়তা করে। কবিতাকে ছন্দ গতিশীল করে। ছন্দের সাথে কবিতার সম্পর্ক প্রধান নয়, কাব্যের প্রাণধর্ম রসের মধ্যে নিহিত, ছন্দ তার পরিস্ফুটনের বাহনমাত্র।
ছন্দ-উপাদান বা উপকরণ ঃ
অক্ষর, মাত্রা, যতি, ছেদ, পর্ব, পংক্তি, চরণ, লয়, পর্ব-সম্মিতি, স্তবক, অক্ষরের মাত্রা হিসেব ইত্যাদি। তবে প্রধান উপাদান হলো অক্ষর ও মাত্রা। ছন্দের ক্ষুদ্রতম একক বা ইউনিট হলো অক্ষর ও মাত্রা। আর বৃহত্তম একক হলো স্তবক। একটি স্তবকের মধ্যে ছন্দের সকল উপদান নিহিত থাকে।
ছন্দ-উপাদান- অক্ষর ঃ
অক্ষরের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘সিলেবল’ (ংুষষধনষব)। সিলেবল বলতে বোঝায় উচ্চারণসাধ্য ক্ষুদ্রতম ধ্বনি। বাংলায় অক্ষর বলতেও তাই বোঝায়। অক্ষরের সংজ্ঞা ঃ উচ্চারণসাধ্য ক্ষুদ্রতম ধ্বনি।
স্বরধ্বনি বা স্বরধ্বনির সাহায্যে উচ্চারিত ক্ষুদ্রতম শব্দ বা শব্দাংশকেই অক্ষর বলে।
বাগযন্ত্রের স্বল্পতম প্রচেষ্টায় যে ধ্বনি উচ্চারিত হয় তাকে অক্ষর বলে।
ছন্দ-উপাদান- অক্ষর ও ধ্বনি ঃ
অক্ষর ও ধ্বনি এক নয় ,যদিও বাংলায় অনেক সময় অক্ষর বলতে ধ্বনি, হরফ বোঝানো হয়ে থাকে। কিন্তু ছন্দের পরিভাষায় অক্ষর ধ্বনি ও হরফ সমার্থক নয়। এখানে অক্ষর বলতে সিলেবল। যেমনÑ কম্পন শব্দে ক,+অ+ম্+প্+অ+ন এই ছয়টি ধ্বনি রয়েছে। কিন্তু এখানে অক্ষর হলো Ñ কম + পন এই দুটি। কাকলি শব্দে হরফ বা বর্ণ হলো কা+ক+ লি। অক্ষরও এখানে তিনটি। কা+ক+লি। ধ্বনি আছেÑক্+আ+ক্+ও+ ল্+ই।
ছন্দ-উপাদান- অক্ষরের প্রকারভেদ ঃ
অক্ষর দুই প্রকার। যেমনÑ মুক্তাক্ষর ও বদ্ধাক্ষর।
মুক্তাক্ষর ঃ স্বরান্ত অক্ষরকে মুক্তাক্ষর বলে। অর্থাৎ, যে অক্ষরের শেষে স্বরধ্বনি আছে। যে অক্ষর উচ্চারণের সময় মুখ খোলা থাকে , তাকে মুক্তাক্ষর বলে। যেমনÑ কা+ক+লি। এখানে তিনটি অক্ষরই মুক্তাক্ষর। স্বরধ্বনি বা মৌলিক স্বরান্ত অক্ষরই মুক্তাক্ষর। মৌলিক স্বরান্ত হলোÑ একটি ব্যঞ্জনের সাথে একটি স্বরধ্বনি। যেমনÑ ক্ + অ = ক, ক্ + আ = কা , অ, আ, ই ইত্যাদি।
ছন্দ-উপাদান- বদ্ধাক্ষর ঃ ব্যঞ্জনান্ত বা হলন্ত অক্ষরকে বদ্ধাক্ষর বলে। অর্থাৎ, যে অক্ষরের শেষে ব্যঞ্জনধ্বনি থাকে । যে অক্ষর উচ্চারণের সময় মুখ বদ্ধ হয়ে যায়, তাকে বদ্ধাক্ষর বলে। যেমনÑ কম্পন শব্দের (কম+পন) দুটি অক্ষরই বদ্ধাক্ষর।
এখানে উলেখ্য যে, যৌগিক বা দ্বি-স্বরধ্বনি বা সন্ধিস্বরকে সব সময় বদ্ধাক্ষর হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এটি স্বরান্ত হলেও বদ্ধাক্ষর। যেমনÑ ঐ>অই>ওই। ঔ>অউ>ওউ। দুটি আলাদা মৌলিক স্বরধ্বনির সমষ্টি বলে এটি বদ্ধাক্ষর।
মুক্তাক্ষরকে অযুগ্মধ্বনি ও বদ্ধাক্ষরকে যুগ্মধ্বনিও বলা হয়ে থাকে।
ছন্দ-উপাদান- মাত্রা ঃ
অক্ষর উচ্চারণের কাল-পরিমাপকে মাত্রা বলে। অর্থাৎ, অক্ষর উচ্চারণের সময়কেই মাত্রা বলে। সাধারণত একটি স্বরধ্বনি বা একটি মৌলিক স্বরান্ত অক্ষর উচ্চারণ করতে যে সময় লাগে, তাকে এক মাত্রা বলে। ব্যঞ্জনান্ত বা বদ্ধাক্ষর ও যৌগিক স্বরান্ত অক্ষরকে অবস্থাভেদে কখনো এক মাত্রা, আবার কখনো দু’মাত্রা ধরা হয়ে থাকে।
মাত্রা চিহ্ন ঃ মুক্তাক্ষরের উপর অর্ধবৃত্ত( ) চিহ্ন আর বদ্ধাক্ষরের উপর ড্যাশ ( Ñ) চিহ্ন দিতে হয়।
অক্ষরের মাত্রা পরিমাপের হিসেবঃ
ছন্দের নাম মুক্তাক্ষর বদ্ধাক্ষর
স্বরবৃত্ত ১ সব সময় ১
মাত্রাবৃত্ত ১ সব সময় ২
অক্ষরবৃত্ত ১ শব্দের প্রথমে, মাঝে হলে ১
শেষে হলে-১ একক হলে -১
যেমনÑ মর্মান্তিক শব্দে Ñ অক্ষর হলো মর+মান+তিক। এখানে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে মাত্রার হিসেব হবেÑ মর শব্দের প্রথমে বলে ১ মাত্রা, মান শব্দে মাঝে বলে ১ মাত্রা আর তিক শব্দে শেষে বলে ২ মাত্রা হবে। কাজ একটি শব্দ আবার একটি অক্ষরও , এটিকে একক অক্ষর হিসেবে ধরে এর মান হবে ২ মাত্রা।
ছন্দ-উপাদান- যতি ঃ
যতি ও ছেদ বলতে উচ্চারণের বিরতি বোঝায়। কোনো কিছু পড়তে গেলে একটানা পড়া যায় না। নিঃশ্বাস বা অর্থের প্রয়োজনে থামতে হয়। কবিতা পড়ার সময় চরণের যে অংশটুকু এক নিঃশ্বাসে পড়ে ঝোঁক নিতে হয়, সেই ঝোঁকের স্থানকে যতি বলে। সহজ কথা কবিতা পড়ার সময় নিঃশ্বাসের যে বিরতি ঘটে তাকে যতি বলে। আর
যতি দুই প্রকার । যথা ঃ অর্ধযতি ও পূর্ণযতি।
অর্ধযতিঃ চরণের কিছু ধ্বনি পড়ার পর ঝোঁকের জন্য চরণের মধ্যে জিহবার যে বিরাম ঘটে তার নাম অর্ধযতি বা হ্রস্বযতি।
পূর্ণযতি ঃ চরণের শেষে উচ্চারণের বিরতিস্থলকে পূর্ণযতি বলে। যেখানে কম বিরতি ঘটে তাকে অর্থযতি বলে। আর যেখানে পূর্ণ বিরতি ঘটে, তাকে পূর্ণযতি বলে ।
এইখানে তোর / দাদির কবর / ডালিম গাছের / তলে, //
একটা দাগ যেখানে পড়েছে সেটি অর্ধযতি, দুই দাগ যেখানে পড়েছে সেটি পূর্ণযতি।
ছন্দ-উপাদান- ছেদঃ অর্থের জন্য সেখানে থামতে হয়, তাকে ছেদ বলে। অর্থের সাথে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চারণের বিরতি প্রকাশের স্থানকে ছেদ বলে। ভাবের দিক থেকে বাক্য যেখানে শেষ হয়, সেখানে ছেদ বসে।
ছেদ দুই প্রকার। যেমনÑ উপচ্ছেদ ও পূর্ণচ্ছেদ।
উপচ্ছেদঃ চরণের ভিন্ন অর্থবোধক বাক্যাংশের শেষে যেখানে স্বল্পকালের বিরতি ঘটে, তাকে উপচ্ছেদ বলে।
পূর্ণচ্ছেদ ঃ চরণের সমাপ্তিতে সেখানে ভাবের পূর্ণ বিরাম ঘটে তাকে পূর্ণচ্ছেদ বলে ।
এই কথা শুনি, * আমি আইনু পুজিতে
পা দুখানি। ** আনিয়াছি কৌটায় ভরিয়া
সিন্দুর।** করিলে আজ্ঞা,*সুন্দর ললাটে
দিব ফোঁটা। **
এখানে এক তারকা উপচ্ছেদ, আর দুই তারকা পূর্ণচ্ছেদ। যতি ও ছ্দে এক স্থানে পড়তেও পারে, আবার নাও পড়তে পারে। যতির সাথে অর্ধের কোনো সম্পর্ক নাও থাকতে পারে। তবে ছেদের সাথে অর্থের সম্পর্ক রয়েছে। ছেদের আরেক নাম অর্থযতি।
যতি ও ছেদের একস্থানে অবস্থান ঃ
গগনে গরজে মেঘ/* ঘন বরষা //**
কূলে এক বসে আছি/* নাহি ভরসা //**
ছন্দ-উপাদান- পর্ব ও পর্বাঙ্গ ঃ
যতি দ্বারা বিভাজিত অংশকে পর্ব বলে। অথবা, চরণের শুরুথেকে যতি পর্যন্ত বা যতি থেকে আরেক যতি পর্যন্ত অংশকে পর্ব বলে। যতি প্রয়োগের ফলে চরণ কতকগুলো ধ্বনিপ্রবাহে বিভক্ত হয়ে পড়ে, এক একটি খন্ডকে পর্ব বলে। কবিতা আবৃত্তি কালে এক এক বারের ঝোঁকে বা এক এক নিঃশ্বাসে চরণের যতটুকু অংশ উচ্চারিত হয়, তাকে পর্ব বলে। পর্বকে কেউ কেউ পদও বলে।
পর্বের ছোট ছোট অংশকে পর্বাঙ্গ বলে।
এইখানে তোর / দাদির কবর / ডালিম গাছের / তলে, //
এখানে চারটি পর্ব।
এইখানে ঃ তোর / দাদির ঃ কবর / ডালিম ঃ গাছের / তলে ঃ//
(খটখট ঃ খট / খটাস ঃ খটাস / খটাস ঃ খটাস / খট //
এখানে প্রতি পর্বের পর্বাঙ্গ দেখানো হয়েছে।
বিভিন্ন মাত্রার পর্ব হতে পারে। সাধারণত স্বরবৃত্ত ছন্দে চার মাত্রার পর্ব, মাত্রাবৃত্ত ছন্দে পাঁচ, ছয়, ও সাত মাত্রার পর্ব এবং অক্ষরবৃত্ত ছন্দে আট মাত্রার পর্ব হয়ে থাকে।
ছন্দ-উপাদান– পর্বের প্রকারভেদ ঃ
ব্যবহারিক দিক থেকে সাত রকমের পর্ব হতে পারে। যেমন Ñ
১. মূলপর্ব বা পূর্ণ পর্ব, ২. হ্রস্ব পর্ব, ৩. দীর্ঘ পর্ব, ৪. সমপর্ব, ৫. অতিপর্ব, ৬. অসম, বিষম বা মিশ্র পর্ব, ৭. অপূর্ণপর্ব।
১. মূলপর্ব বা পূর্ণ পর্বঃ চরণের মূল মাত্রামাপ সে বিশেষ পর্বকে ঘিরে গড়ে ওঠে তাকে মূল বা পূর্ণ পর্ব বল্।ে ২. হ্রস্ব পর্বঃ চরণের যে শেষ পর্বটি মূলপর্বের তুলনায় ছোট হয়, তাকে হ্রস্ব পর্ব বলে।
৩. দীর্ঘ পর্বঃ চরণের যে শেষ পর্বটি মূলপর্বের তুলনায় বড় হয়, তাকে হ্রস্ব পর্ব বলে।
৪. অসম, বিষম বা মিশ্র পর্ব ঃ চরণের মধ্যে যে পর্বগুলো মাত্রামাপের দিক থেকে পরস্পর অসম বা বিষম হয়ে থাকে, তাকে অসম বা বিষম পর্ব বলে।
৫. অতিপর্বঃ বক্তব্যে প্রথম থেকেই ঝোঁক বা গতি সঞ্চারের জন্য মূল পর্বের মাত্রা শুরুর আগেই যে অতিরিক্ত পর্ব যোগ করা হয়, তাকে অতিপর্ব বলে। এটি কোনো রকমেই ছন্দের মূল হিসেবের মধ্যে আসবে না। মূল পর্ব থেকে অতিপর্ব ছোট হয়। সাধারণত চরণের শুরুতে বসে।
বাগিচায় / বুলবুলি তুই / ফুলশাখাতে/
দিসনে আজি/ দোল // (৩)+৪+৪+৪+১
অথবা,
আমি / বিদ্রোহী ভৃগু / ভগবান বুকে / এঁকে দিই পদ / চিহ্ন // (২) +৬+৬+৬+৩
৬. সমপর্ব ঃ চরণের অন্তর্গত যে পর্বগুলো মাত্রামাপের দিক থেকে পরস্পর সমান, তাদের নাম সমপর্ব।
যেমন Ñ
থাকবো নাকো/ বদ্ধ ঘরে /দেখবো এবার/ জগৎটাকে,// ৪+৪+৪+৪
কেমন করে /ঘুরছে মানুষ /যুগান্তরের /ঘুর্ণিপাকে । // ৪+৪+৪+৪
৭. অপূর্ণপর্বঃ চরণের শেষে মূল পর্বের চেয়ে মাত্রামাপে ছ্টো যে পর্ব থাকে, তাকে অপূর্ণপর্ব বা খÐ পর্ব বলে। বাংলা ছন্দে সাধারণত চরণের শেষ পর্বটি অপূর্ণপর্বই হয়ে থাকে। নিম্নে তলে অপূর্ণপর্ব।
এইখানে তোর / দাদির কবর / ডালিম গাছের / তলে, // ৬+৬+৬+২
অতিপূর্ণ পর্ব ঃ সমপার্বিক ছন্দে পংক্তি বা চরণের শেষের পর্বটি অন্য পর্বের চেয়ে বড় হলে তাকে অতিপূর্ণ পর্ব বলে। এ ক্ষেত্রে মাত্রাসংখ্যা অন্যান্য পর্বের চেয়ে বেশি।
পর্বত চাহিল হতে/ বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ। ৮+১০
শেষ পর্ব দশ মাত্রার বলে তা অতিপূর্ণ পর্ব।
ছন্দ-উপাদান- পর্বসম্মিতি ঃ
একই চরণের মূল পর্বের সাথে মূল পর্বের অথবা এক চরণের মূল পর্বের সাথে অন্য চরণের মূল পর্বের মাত্রামাপের যে মিল থাকে, তারই নাম পর্বসম্মিতি। বাংলা ছন্দে সমদৈর্ঘ্যরে পর্বের সাথে পর্বের পুনরাবর্তনজনিত যে বিশিষ্ট বন্ধন বা মিল ঘটে তারই নাম পর্বসম্মিতি।
পর্বসম্মিতির উপর নির্ভর করেই ছন্দ নির্ণয় করা হয়ে থাকে। স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দে পর্বসম্মিতি থাকে সাধারণত একই চরণে পাশাপাশি অবস্থিত সমদৈর্ঘ্যরে পর্বগুলোর মধ্যে।
স্বরবৃত্ত ছন্দের পর্বসম্মিতি ঃ
থাকবো নাকো/ বদ্ধ ঘরে /দেখবো এবার/ জগৎটাকে,// ৪+৪+৪+৪
কেমন করে /ঘুরছে মানুষ /যুগান্তরের /ঘুর্ণিপাকে । // ৪+৪+৪+৪
মাত্রাবৃত্ত ছন্দের পর্বসম্মিতি ঃ
এইখানে তোর / দাদির কবর / ডালিম গাছের / তলে, // ৬+৬+৬+২
অক্ষরবৃত্ত ছন্দের পর্বসম্মিতি ঃ
মহাভারতের কথা /অমৃত সমান // ৮+৬
কাশীরাম দাস কহে/ শুনে পূণ্যবান// ৮+৬
এখানে পাশাপাশি অবস্থিত পর্বগুলোর মধ্যে কোনো পর্বসম্মিতি নেই, আছে পরস্পর দুটি চরণের উপরে-নিচে একই ধরনের মাত্রামাপের পর্বের মিল।
ছন্দ-উপাদান- ছন্দের লয়,গতি বা চাল ঃ
কবিতা আবৃতির সময় কখনও । দ্রæত, কখনও বিলম্বিত বা টেনে টেনে , কখনও ধীরে ধীরে পড়তে হয়। এক এক শ্রেণির ছন্দের কবিতা পড়ার গতি এক এক রকম। ছন্দে এর নাম লয় বা গতি বা বেগ বা চাল। এক কথায় Ñ কবিতা পড়ার ভঙ্গীকে লয় বলে। কবিতা পঠনের সময় পঠনের গতিভঙ্গী বা উচ্চারণের বেগ থেকে যে সুরের সৃষ্টি হয় তার নাম লয়।
বাংলায় ছন্দ তিন শ্রেণিরÑ স্বরবৃত্ত, মাত্রাবত্ত ও অক্ষরবৃত্ত। তিন ছন্দের লয়ও তিন প্রকার।১. । দ্রæতলয়, ২. বিলম্বিত বা মধ্যম লয় ও ৩. ধীরলয়। স্বরবৃত্তের লয় । দ্রæত, মাত্রাবৃত্ত ছন্দের লয় বিলম্বিত বা মধ্যম, অক্ষরবৃত্ত ছন্দের লয় ধীর।
। দ্রæতলয় ঃ যে লয়ের কবিতাপাঠে উচ্চারণের গতিবেগ হয় তুলনামূূলকভাবে সবচেয়ে । দ্রæত এবং যার প্রতিপর্বের আদি অক্ষরে একটি করে প্রবল শ্বাসাঘাত পড়ে তার নাম । দ্রæতলয়
মধ্যম বা বিলম্বিত লয় ঃ যে লয়ের কবিতাপাঠে উচ্চারণের গতিবেগ হয় । দ্রæত এবং ধীর এই দুয়ের মাঝামাঝি বা মধ্যম ভঙ্গীর এবং যাতে প্রতিটি অক্ষর-ধ্বনিই সুস্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয় তার নাম মধ্যম বা বিলম্বিত লয়।
ধীরলয় ঃ যে লয়ের কবিতাপাঠে উচ্চারণের গতিবেগ হয় তুলনামূূলকভাবে সবচেয়ে ধীর এবং যাতে অক্ষরের একটি সুরের টান বা তান বড় হয়ে ওঠে তার নাম ধীরলয়।
শ্বাসাঘাতঃ
কবিতার ধ্বনিপ্রবাহে এক একটি পর্বের বিশেষ বিশেষ অক্ষরে শ্বাসের যে সুস্পষ্ট ঝোঁক বা আঘাত পড়ে তারই নাম শ্বাসাঘাত। একে স্বরাঘাত, প্রস্বর, পর্বাঘাত, ঝোঁক, বল প্রভৃতি নামেও চিহ্নিত করা হয়। । দ্রæতলয়ের কবিতা অর্থাৎ স্বরবৃত্ত ছন্দের কবিতা পড়ার সময় জিভের গতিশীলতার জন্য পর্বের প্রথম অক্ষরে প্রবল শ্বাসাঘাত পড়ে।
চরণ ঃ পূর্ণযতির দ্বারা বিভাজিত ধ্বনিপ্রবাহের নাম চরণ। একটি সম্পূর্ণ বাক্য কবিতায় চরণ নামে পরিচিত। ছন্দের পূর্ণরূপ বোঝাতে যতগুলো পর্ব দরকার হয়, তার সমষ্টিকে চরণ বলে।
নিঃশ্বাসের শুরুথেকে শুরুকরে শ্বাস সম্পূর্ণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ধ্বনিপ্রবাহের যতটুকু অংশ আমরা উচ্চারণ করে পড়ি সেই সমগ্র অংশটুকুই চরণ।
সাধারণ অর্থে বাংলা ছন্দে অপূর্ণ পর্বের পরেই চরণের সমাপ্তি ধরে নেওয়া হয় ।
চরণ ও পংক্তি এক নয়। একটি চরণ এক পংক্তিতে সাজানো হতে পারে , আবার একটি চরণ কয়েক পংক্তিতেও সাজানো যেতে পারে।
পংক্তি ঃ এক সারিতে সাজানো শব্দাবলিকেই সাধারণ অর্থে পংক্তি বলে। লাইন, সারি, ছত্র, শ্রেণি ইত্যাদি অর্থেও পংক্তি ব্যবহৃত হয়। এক লাইন বা এক সারি শব্দামালা হলো পংক্তি।
চিরসুখী জন/ ভ্রমে কি কখন/ ব্যথিত বেদন /বুঝিতে পারে ? //
এখানে পংক্তি একটি, চরণও একটি।
চিরসুখী জন/
ভ্রমে কি কখন/
ব্যথিত বেদন /
বুঝিতে পারে ? //
এখানে পংক্তি চারটি, কিন্তু চরণ একটি।
স্তবকঃ
একই মূলভাব , লয় ও মাত্রা মাপের বিশিষ্ট বিন্যাসের পর্বসম্মিতিযুক্ত সুশৃঙ্খল চরণ পরস্পরার নাম স্তবক।
স্তবক হলো চরণের চেয়ে বৃহত্তর ছন্দ বিভাগ। স্তবকের চরণগুলোতে মূল বক্তব্য এক থাকে। বিন্যাস যেমনই হোক না কেন পর্বসম্মিতি ঠিক থাকে। চরণগুলোর পর্বের লয়ও একই হতে হয়। স্তবকের চরণের অন্তমিল একটি বিশেষ মিলবিন্যাসে হয়।
দুই বা ততোধিক চরণ সুশৃঙ্খলভঅবে একত্র সন্নিবিষ্ট হলে তাকে স্তবক বলে। এক কথায় একে চরণগুচ্ছও বলা হয়ে থাকে।
পদঃ
পারিভাষিক অর্থে পদ বলতে অর্ধযতিবিশিষ্ট ছন্দবিভাগ বোঝায়। পর্বই কোনো কোনো ছন্দে পদ নামে পরিচিত। দ্বিপদী, ত্রিপদী, চৌপদী ইত্যাদি ছন্দে পদ কথাটি পারিভাষিক অর্থেই ব্যবহৃত। পয়ার ছন্দে প্রত্যেক পংক্তি যতি দ্বারা দুটি পদে বিভক্ত।
মহাভারতের কথা /অমৃত সমান,//
কাশীরাম দাস কহে/ শুনে পূণ্যবান \//
এ পয়ার ছন্দে প্রতি পংক্তিতে দুটি করে পর্ব অর্থাৎ দুটি করে পদ। তাই এর আরেক নাম দ্বিপদী।
যে জন দিবসে/ মনের হরষে /
জ্বালায় মোমের বাতি , //
এখানে চরণ একটি, পংক্তি দুটি, পর্ব তিনটি , এই পর্ব তিনটি এখানে তিনটি পদ অর্থে ব্যবহৃত। তাই এর নাম ত্রিপদী ছন্দ।
মিত্রাক্ষর, মিল বা অন্ত্যানুপ্রাস ঃ
পর্বের সাথে পর্বের বা চরণান্তের সাথে চরণান্তের উচ্চারণগত যে ধ্বনিসাম্য বা মিল থাকে তারই নাম মিত্রাক্ষর বা মিল বা অন্ত্যানুপ্রাস।
মহাভারতের কথা /অমৃত সমান,//
কাশীরাম দাস কহে/ শুনে পূণ্যবান \//
এখানে প্রথম চরণের সমান শব্দের সাথে পরের চরণের পূণ্যবান শব্দে ন -এর মিল রয়েছে।
যে জন দিবসে/ মনের হরষে /
জ্বালায় মোমের বাতি , //
আশুগৃহে তার/ দেখিবে না আর/
নিশীতে প্রদীপ ভাতি। //
এখানে প্রথম পর্বের সাথে দ্বিতীয় পর্বের প্রথম চরণের সাথে দ্বিতীয় চরণেরও মিল রয়েছে।
অমিত্রাক্ষর ঃ দুই চরণের বা পংক্তির শেষ অক্ষরে ধ্বনির সমতা না থাকলে তাকে অমিত্রাক্ষর বলে।
সম্মুখ সমরে পড়ি, বীর চূড়ামণি
বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে
অকালে, কহ, হে দেবি অমৃতভাষিণি,
কোন্ বীরবরে বরি’ সেনাপতি -পদে,
পাঠাইলা রণে পুনঃ রক্ষঃ কুলনিধি
রাঘবারি ?
এভাবে মিল বা অমিলের উপর ভিত্তি করে বাংলা ছন্দকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। মিত্রাক্ষর ছন্দ ও অমিত্রাক্ষর ছন্দ।
মধ্যখÐন ঃ পর্ববিন্যাসের প্রয়োজনে কখনও কখনও শব্দ দ্বিখÐিত করতে হয়। একে মধ্যখÐন বলে। ছন্দ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে চরণের কয়েকটি শব্দের পর পর যতিচিহ্ন দিয়ে পর্বভাগ করতে হয়। নির্দিষ্ট মাপের ধ্বনিভাগ করে পর্বসম্মিতি ঠিক রাখতে হয়। এ পর্বসম্মিতি ঠিক রাখতে অনেক সময় চরণের শেষ শব্দের মাঝে যতি ফেলতে শব্দকে দ্বিখÐিত করতে হয়। এরই নাম মধ্যখÐন ।
কাÐারী তব / সম্মুখে ঐ / পলাশীর প্রাণ / তর,// ৬+৬+৬+২
বাঙালির খুনে / লাল হল যেথা / ক্লাইভের খন্ / জর। // ৬+৬+৬+২
এখানে প্রতি পর্বে মাত্রা সংখ্যা ছয়, এই ছয় মাত্রা ঠিক রাখতে চরণের শেষ শব্দ প্রান্তর, ও খঞ্জর শব্দদুটোকে ভেঙে নিতে হয়েছে। এটি মধ্যখÐনের দৃষ্টান্ত।
ছন্দসন্ধি ঃ
ছন্দপতন রোধ করার জন্য পাশাপাশি দুটি ভিন্ন শব্দকে এক শব্দের মত উচ্চারণ করে পড়তে হয়। এর নাম ছন্দ সন্ধি।
হত্যা নয় আজ / সত্যাগ্রহ / শক্তির উদ্বো /ধন
এখানে নয় + আজ = নয়াজ , শক্তির + উদ্বোধন = শক্তিরুদ্বোধন পড়লে ছন্দ পতন ঘটে না।
একথা ওমর জানে / হাফেজ আর রুমে
এখানে হাফেজার পড়লে ছন্দপতন ঘটে না।
ছন্দসমাস ঃ ছন্দের সার্থকতার জন্য অনেক সময় পাশাপাশি দুটো শব্দকে সমাসবদ্ধ করে উচ্চারণ করতে হয়। এ ধরনের মিলনকে ছন্দসমাস বলে।
একি স্নিগ্ধ / সুধারস / ধারা
এখানে এ কিস্স্নিগ্ধ পাঠ করতে হয়।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন,
বাংলা বিভাগ
, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ যশোর
Done 192
অভিনব ভাবে শেখানোর জন্য ধন্যবাদ।
Done ✅
Done ✅ 192
ধন্যবাদ, স্যার !
ছন্দ নিয়ে আর কোনো জিজ্ঞাসা নেই স্যার। পুরো পানির মতো হয়ে গেছে।
অনেক সুন্দর স্যার।নতুন কিছু শিখতে পারলাম।
শ্রদ্ধেয় স্যার, আপনার কাছে থেকে এই সুন্দর বিষয়টা শিখতে পারার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
হৃদয়- অনার্স ৩য় বর্ষ -২৭৭
শ্রদ্ধেয় স্যার, আপনার কাছে থেকে এই সুন্দর বিষয়টা শিখতে পারার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
শ্রদ্ধেয় স্যার, আপনার কাছে থেকে এই সুন্দর বিষয়টা শিখতে পারার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
হৃদয়- অনার্স ৩য় বর্ষ -২৭৭
178 roll
তৃতীয় বর্ষ
খুব সাবলীল লেখা।
অনার্স ৩য় বর্ষ
রোল 223
অনার্স তৃতীয় বর্ষ
রোল 223
অনেক উপকৃত হলাম প্রিয় শিক্ষক। চমকপ্রদ ভাবে সাহায্য করছে ছন্দ শেখায়।
শ্রদ্ধেয় স্যার, আপনার কাছে থেকে এই সুন্দর বিষয়টা শিখতে পারার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
আবু বককার নান্নু – অনার্স ৩য় বর্ষ -৩৪৮
রোল ২২৩
২২৩
২২৩ রোল
সুন্দর উপস্থাপন প্রিয় শিক্ষক
স্যার আপনি ক্লাসে যেভাবে বলেছিলেন ঠিক তেমনি আপনার এই ওয়েবসাইট টি পূর্ণাঙ্গ একটি কোর্স বা তার চেয়ে বেশি Informative.আশা করি শিক্ষার্থীদের এই ওয়েবসাইটে অবাধ Access থাকলে বর্তমান সহ পরবর্তী চাকরি জীবন সফল ভাবে আলোকিত করবে।
আল্লাহ রাব্বুল আলা’মীন আপনাকে নেক হায়াত দান করুক ।
স্যার আপনি ক্লাসে যেভাবে বলেছিলেন ঠিক তেমনি আপনার এই ওয়েবসাইট টি পূর্ণাঙ্গ একটি কোর্স বা তার চেয়ে বেশি Informative.আশা করি শিক্ষার্থীদের এই ওয়েবসাইটে অবাধ Access থাকলে বর্তমান সহ পরবর্তী চাকরি জীবন সফল ভাবে আলোকিত করবে।
আল্লাহ রাব্বুল আলা’মীন আপনাকে নেক হায়াত দান করুক ।
উম্মে সাদিয়া
অনার্স তৃতীয় বর্ষ
রোল:১৪৯
আপনার পরিশ্রম আর যত্নে তৈরি নোট আমাদের জন্য অনেক উপকারি হয়েছে। মন থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই, স্যার।
রত্না – অনার্স ৩য় বর্ষ -১১৩
কৃতজ্ঞতা জানাই স্যার আপনাকে, আপনার পরিশ্রম করে তৈরি করা নোট আমাদের অনেক উপকার হইছে।
রত্না – অনার্স তৃতীয় বর্ষ-১১৩
ছন্দ নিয়ে আর কোন সমস্যা নেই, ধন্যবাদ স্যার।
রত্না – অনার্স তৃতীয় বর্ষ-১১৩
প্রথমে অনেক কঠিন মনে হচ্ছিল কিন্তু এখন অনেক সহজ লাগছে। ধন্যবাদ স্যার।
রত্না – অনার্স তৃতীয় বর্ষ- ১১৩
ধন্যবাদ স্যার
রত্না – অনার্স ৩য় বর্ষ -১১৩
শারমিন আক্তার।
আনার্স ৩য় বর্ষ।
রোল:০৯২.
মাশাআল্লাহ স্যার 🥰
নাম:মেঘলা রায়।
রোল:১০৭
অনার্স তৃতীয় বর্ষ।
নাম:মেঘলা রায়।
রোল:১০৭
অনার্স তৃতীয় বর্ষ।
নাজমুন নাহার রিমি।
রোল: ১৬৯
অনার্স ৩য় বর্ষ।
শারমিন আক্তার।
অনার্স ৩য় বর্ষ।
রোল: ০৯২
ধন্যবাদ শ্রদ্ধেয় স্যার।
উম্মে হাবিবা
রোল: ১৭১
অনার্স ৩য় বর্ষ
দীপা মৌলিক
অনার্স ৩য় বর্ষ
রোল ৭৬
💝💝💝
স্যার আপনার লেখাটা সুন্দর সাবলীল ভাষায় বুঝতে অসুবিধা হয়নি।
রিমি সুলতানা
অর্নাস তৃতীয় বর্ষ
রোলঃ২৩৫