জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাসের পদাবলির ভাব, ভাষা ও রূপ-বৈচিত্র্য। 

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক …

জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস: চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতির ভাবশিষ্য।

পদাবলি সাহিত্যে যাদের অবদান সর্বজনস্বীকৃত তাঁদের মধ্যে চৈতন্য পরবর্তী জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাসের নাম উল্লেখযোগ্য। একজন যদি কাঁঠালিচাঁপা হন, অপরজনের কাব্যে হাস্নাহেনার সুবাস। তাঁদের কাব্যলক্ষ্মী শত আভরণে সুশোভিতা। উভয়ের কবি-কল্পনা আকাশছোঁয়া, তাঁদের ধ্যানে, জ্ঞানে, চিন্তায়, মননে রাধা-কৃষ্ণ প্রাধান্য পেয়েছে। তাঁরা দু’জনেই একই সুরের পথিক হলেও তাঁদের সুরে রয়েছে বৈচিত্র্য। তাঁদের ধ্যান-ধারার মান, ভঙ্গি, আভা, প্রভা, প্রকাশ, বিকাশ একই সুরে বাঁধা নয়। তাঁদের দু’জনের পদাবলির ভাব, ভাষা ও রূপ-বৈচিত্র্য আলোচনা করে তাদের মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য দেখার প্রয়াস পাব।

বৈষ্ণব পদাবলির ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন
বৈষ্ণব পদাবলির ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন

প্রথমেই  জ্ঞানদাসের কথায় আসা যাক। জ্ঞানদাস চন্ডীদাসের ভাবশিষ্য। তিনি চণ্ডীদাসের মত নিরাভরণ ও নিরলঙ্কার ভাষায় তপস্বিনী রাধার প্রেম-বিভোর মূর্তি এঁকেছেন। নায়িকার রূপ বর্ণনা, অতৃপ্ত প্রণয়াঙ্ক্ষার তীব্র জ্বালা, মিলনের জন্য ব্যাকুলতা, মিলনের গভীর উল্লাস এবং বিরহের মর্মস্পর্শী আর্তি প্রতিটি ক্ষেত্রেই জ্ঞানদাস চন্ডীদাসের মত ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।

জ্ঞানদাসের কিছু পদ প্রেমের বাণী হিসেবে দেশকাল জয় করেছে। যেমন-

রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর।
প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর।
হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে।
পরাণ পিরীতি লাগি  থির নাহি বান্ধে।

জ্ঞানদাসের রাধা কৃষ্ণ প্রেমে যোগিনী সেজেছেন। সব সময় বিষাদ-ক্লিষ্ট, তার কথায়, আচরণে সব সময় বিষাদের সুর বেজে ওঠে। জ্ঞানদাসের রাধা বেদনার সাগরে হাবুডুবু খেলেও সে স্বভাবে হাসিখুশি, মিলনের জন্য ব্যাকুলা, সুরসিকা নায়িকা।

নায়কের রূপ বর্ণনায় জ্ঞানদাসের মৌলিক প্রতিভার পরিচয় মেলে। কৃষ্ণরূপ দেখে রাধা বিমোহিতা। মুগ্ধা রাধার দৃষ্টিতে জ্ঞানদাস শ্রীকৃষ্ণের রূপকে ভাষার বন্ধনে আবদ্ধ করতে চেয়েছেন।

কি রূপ হেরেনু কালিন্দীকূলে।
অপরূপ মেঘ কদম্বমূলে।
অচলা চপলা সহিত তায়
মৃগাঙ্ক-বিহীন শশাঙ্ক ভায়।

কৃষ্ণের সৌন্দর্যে মুগ্ধা রাধার মনে যে গভীর স্পন্দন ও কম্পনের সৃষ্টি করে, তা জ্ঞানদাস ভাষায় ব্যক্ত করতে পারেন না-

দেখিতে যে সুখ উঠে কি বলিব তা।
দরশ পরশ লাগি আউলাইছে গা।

আক্ষেপানুরাগের পদেও কবির কৃতিত্ব রয়েছে। তার বিখ্যাত পদ-

সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু
অনলে পুড়িয়া গেল।

কবির ভাষা সরল-সহজ অলঙ্কার বর্জিত, কিন্তু প্রবল আবেগে পরিপূর্ণ। তবে আবেগের সঙ্গে দার্শনিক তত্ত্ব এবং কবির মননশীলতা যুক্ত হয়েছে।

জ্ঞানদাসের পর এবার গোবিন্দদাসের কথায় আসা যাক। গোবিন্দদাস বিদ্যাপতির ভাবশিষ্য। কবির পদে ছন্দ, অলঙ্কার ও পদবিন্যাসের বৈচিত্র্য একক ও তুলনা রহিত। গৌরচন্দ্রিকা, পূর্বরাগ, মাথুর ও অভিসারের পদে কবির কৃতিত্ব লক্ষ্যণীয়। কবির রূপক ও উপমা প্রয়োগের বৈচিত্র্য দেখে বিস্মিত হতে হয়। কবির গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদের মধ্যে মহাপ্রভুর প্রেমময় জীবন্ত মূর্তিকে লক্ষ্য করা যায়। তার রূপানুরাগের বিখ্যাত পদ-

ঢল ঢল কাঁচা- অঙ্গের লাবণি
অবনি বহিয়া যায়।

কবির প্রেমবৈচিত্তোর, কলহান্তরিতার, মাথুরের প্রভৃতি বিষয়ক পদগুলো অপূর্ব। অভিসারের পদে গোবিন্দদাসের জুড়ি মেলে না। কবির অভিসারের পদগুলো যেন মানবাত্মার অভিসার-

কন্টক গাড়ি     কমল-সম পদতল
মঞ্জীর চীরহি ঝাঁপি।
গাগরি-বারি ঢারি করি পিছল
চলতহি অঙ্গুলি চাপি।
মাধব, তুয়া অভিসারক লাগি।
দুতর পন্থ-  গমন ধনি সাধয়ে
মন্দিরে যামিনী জাগি।
কর-যুগে নয়ন  মুদি চলু ভামিনী
তিমির পয়ানক আশে।
কর-কঙ্কন-পণ  ফণি মুখ-বন্ধন
শিখই ভুজগ-গুরু-পাশে।
গুরুজন-বচন  বধির সম মানই
আন শুনহি কহ আন।
পরিজন বচনে   মুগধী সম হাসই
গোবিন্দদাস পরমাণ।
   ( মধ্যযুগের বাংলা গীতিকবিতা – ১৫০ গোবিন্দদাস

অথবা,

মন্দির বাহির কঠিন কপাট

কবির প্রকাশভঙ্গি অনবদ্য, তাই এগুলো রসোত্তীর্ণ। তাঁর মত চিত্রকল্প আর কোনো কবিই নির্মাণ করতে পারে নি। কবি যেন কৃষ্ণকে নয়নে রেখেই পদ রচনা করেছেন, তাই তাঁর বিরহব্যাকুলা রাধা আমাদেরকে মহাপ্রভুর কথা মনে করিয়ে দেয়।

গোবিন্দদাস ব্রজবুলিতেও অনেক পদ রচনা করেছেন। তাঁর রচনাভঙ্গি, পদ-বিন্যাস-চাতুর্য এবং অলঙ্কারের বহুল প্রয়োগ স্বভাবতই তাকে বিদ্যাপতির পাশে নিয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে শিষ্য গুরুকে ছাড়িয়ে গেছে।

গোবিন্দদাস ছিলেন ভক্তকবি। তিনি যত বড় ভক্ত, তত বড় কবি। তাঁর রাধা কৃষ্ণপ্রেমে অন্ধ, অভিসারে নির্ভয়, সর্বত্যাগী। তাঁর রাধা তত্ত্বেরই মানবীয় রূপ।

গোবিন্দদাস ভাব অনুযায়ী কবিতার দেহ তৈরি করেছেন। পদের বাইরের অঙ্গকে সজ্জিত করার ক্ষেত্রেও তাঁর কৃতিত্ব রয়েছে। ধ্বনি-মাধুর্যের দ্বারাই তিনি শ্রোতাকে দ্রুত মুগ্ধ করতে চান। তাই, তিনি কৃত্রিম ব্রজবুলিকে ভাষারূপে ব্যবহার করেছেন।

জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস উভয়ে পদাবলি সাহিত্যে মিষ্টি মধুর আলোক শিখা। গোবিন্দদাসের প্রায় প্রতিটি পদ বসন্ত-বাতাসে স্নাত, কোকিলের কুহুধ্বনিতে মুখরিত। তিনি রাজসিক কবি। জ্ঞানদাসের এক হাতে দুঃখের সানাই, আরেক হাতে সুখের শঙ্খধ্বনি।

জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস: সুরের বৈচিত্র্য

গোবিন্দদাস সুরসাধকের মতো প্রতিটি পদে সুরের বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে সুখ পেয়েছেন। জ্ঞানদাস গীতিকবি, একজন গীতিকবির গীতিকবিতায় যে-সব ভাব ও কল্পনা এবং ছন্দ থাকার কথা, তার সব কিছু না থাকলেও তাদের অনেক কিছুর স্পর্শ তাঁর পদকে গীতিধর্মীতার মহিমা দান করেছে। রূপ সাগরে ডুব দিয়ে গোবিন্দদাস রাধাকৃষ্ণের প্রেমবিষয়ক পদগুলোকে মানিক-রতনের মতো ছন্দ অলংকার দিয়ে সাজিয়েছেন।

জ্ঞানদাসও পিছিয়ে নেই, নীরব নিথর ছায়াবীথিতলে বসে মাটির মাধুরী অঙ্গে মেখেছেন। বাস্তবতাকে সামনে রেখে তিনি তাঁর কাব্যকে ছন্দ-অলঙ্কার উপমা-রূপক দিয়ে মায়াবী প্রলেপ দিয়েছেন।

জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস উভয়েই চৈতন্য-পরবর্তীকালের কবি। তাই এঁদের মধ্যে ব্যক্তি বৈশিষ্ট্যের প্রভাব কম। তাঁরা দু’জনেই গৌড়ীয় বৈষ্ণব তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত। তাই জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস অনেকাংশে ব্যক্তি-প্রতিভা বিকাশের সুযোগ হারিয়েছেন। তবে জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস রচনা রীতিতে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

গোবিন্দদাসের কল্পনার পাখাটি রাধাকৃষ্ণের প্রেমের খাঁচায় বন্দী হয়ে আর্ত চিৎকার করে না। সে সুললিত সুরে গান ধরে। বিদ্যাপতির অনেক গুণ গোবিন্দদাসের কল্পনাকে সমৃদ্ধ করেছে। তবে তা একান্তই গোবিন্দদাসের নিজস্ব।

জ্ঞানদাসের পদাবলিতে ভাব এবং ভাষার মধুমিলন ঘটেছে। আবেগ কবির ভাব প্রকাশে গতি এনে দিয়েছে। তাঁর সহজ-সরল প্রকাশ তাঁর কাব্যে রূপ-রসের সুন্দর সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে। চণ্ডীদাসের প্রভাব তাঁর মধ্যে থাকলেও নিজস্ব ভঙ্গিও তাঁর ছিল। জ্ঞানদাসের রাধা এ ধরার ধুলোয় বাঁধা, মানবীয় মূর্তিতে সাজানো-গোছানো একান্ত চেনা-জানা বলে মনে হয়।

বাংলার বর্ষা প্রকৃতিকে তাঁরা উভয়েই সুন্দর করে উপস্থাপন করেছেন। বৈষ্ণব পদাবলিতে বর্ষা ঋতু এসেছে প্রাণসখা রূপে। জ্ঞানদাস নিপুণ শিল্পীর মতো তুলির এক টানে বর্ষাকে আরো মোহনীয় ও অর্থবহ করে কাব্যকে সরস রূপ দান করেছেন।-

রজনী শাঙন ঘন ঘন দেয়া গরজন
রিমি ঝিমি শবদে বরিষে।

গোবিন্দদাসের বর্ষার বর্ণনা প্রাণ উজাড় করে, হৃদয়ের জানালা খুলে দিয়ে প্রকৃতিকে চিনিয়ে দেয়।

তহি অতি দূরতর বাদর দোল।
বারি কি বারই নীল নিচোল।

জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস: অভিসার বিষয়ক

গোবিন্দদাস অভিসারের পদে সকলকে ছাড়িয়ে গেলেও জ্ঞানদাস অভিসারের পদে ততখানি নয়।

বিরহ-বেদনা পদাবলি সাহিত্যকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলেও গোবিন্দদাসের হৃদয়ে এ শোক সাগরের ঢেউয়ের মতো আঘাত করতে পারে নি। তিনি বিরহের অথৈ জলে স্নান করেন নি। জ্ঞানদাস অবশ্য একটু বেশি সিক্ত হয়েছেন। তাঁর করুণার সরোবরের বাঁধ যেন ভাঙা। তাঁর রাধার চোখে সবসময় জল।

রাধাকৃষ্ণের প্রেমে বাঁশির সুর গভীর আবেদন সৃষ্টি করে। জ্ঞানদাস বাঁশি নিয়ে অনেক পদ লিখেছেন। গোবিন্দদাসও বাঁশি নিয়ে লিখেছেন। তবে জ্ঞানদাসই বেশি প্রাণমন খুলে লিখেছেন।

জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস: ব্রজবুলি

বিদ্যাপতির মতো গোবিন্দদাস ব্রজবুলি ভাষায় পদ রচনা করেছেন। বিদ্যাপতির পদাবলিতে যে সঙ্গীতময়তার অভাব ছিল গোবিন্দদাস সঙ্গীতময়তা এসে তা পূর্ণতা দিয়েছেন। জ্ঞানদাস ব্রজবুলিতে পদ লিখলেও সফলতা কম।

জ্ঞানদাস ভাবের কবি, গোবিন্দদাস রূপের কবি। তাই গোবিন্দদাসের পদে চিত্রধর্মিতার প্রাধান্য।  অর্থময় চিত্রাত্মক শব্দসম্ভারের সাহায্যে তিনি রাধা ও কৃষ্ণের রূপাঙ্কনে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। পক্ষান্তরে জ্ঞানদাস গীতিপ্রাণতায় বা ভাবাতিশয্যে চিত্ত উল্লসিত করেছেন।

কুন্দ কুসুমে উরু, কবরিক ভার।
হৃদয়ে বিরাজিত মোতিম হার।
চন্দন-চরচিত রুচির কপুর।
অঙ্গহি অঙ্গ অনঙ্গ ভরপুর ॥

চিত্রধর্মিতা ছাড়াও গোবিন্দদাসের পদের অন্যতম গুণ সঙ্গীতধর্মিতা। তাঁর কাব্যে লিরিকময়তা না থাকলেও সঙ্গীত গুণ রয়েছে। তাঁর রচনার এই দুটি বিশেষ ধর্ম সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। তাই তিনি উল্লেখ করেছেন-

রসনা রুচির শ্রবণবিলাস।
রচই রুচির পদ গোবিন্দদাস।

গোবিন্দদাস ব্রজবুলি পদ রচনায় যতটা স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেছেন, জ্ঞানদাস এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যর্থ। তবে, বাংলায় পদ রচনা করতে গিয়ে জ্ঞানদাস যে রসগাঢ়ত্ব সৃষ্টি করতে পেরেছেন তা সত্যিই অপূর্ব। জ্ঞানদাস কৃষ্ণের রূপ বর্ণনায় লিখেছেন-

কালার কপালে চাঁদ চন্দনের মিকিমিকি
কেবা দিলে ফাগু রঙ্গিয়া।
রজতের পাতে কেবা কালিন্দী পূজিয়াছে।
জবা কুসুম তাহে দিয়া ॥

আমরা আনন্দে পুলকিত হই। কিন্তু ব্রজবুলির পদ তেমন নয়। জ্ঞানদাসের ব্রজবুলি ভাষায় রচিত পদ অনেক বেশি কৃত্রিম, আড়ষ্ট ও ছন্দহীন।

জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস: নাটকীয়তা

গোবিন্দদাসের পদের অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নাটকীয়তা, এ রকম নাটকীয়তা জ্ঞানদাসের পদে নেই। গোবিন্দদাস অভিসার বিষয়ক পদে যে তাৎপর্যময় পরিচয় দিয়েছেন তার মধ্যেও নাটকীয়তা রয়েছে। চিত্রধর্মিতা ও নাটকীয়তা বিষয়ে সমালোচক দেখিয়েছেন-

 “গৌরচন্দ্রিকায় উভয়ের মিলন, রূপানুরাগে চিত্ররসের প্রাধান্য, অভিসারে নাটকীয়তা, মহারাসেও তাই।”

জ্ঞানদাস প্রাণতন্ময় কবি, আর গোবিন্দদাস রূপতন্ময় কবি। গোবিন্দদাসের প্রসাধন-কলায় শ্রেষ্ঠ, জ্ঞানদাস উন্নততর, অনুভূতির গভীরতায়  জ্ঞানদাসের শ্রেষ্ঠ।

জ্ঞানদাসের মতো গোবিন্দদাসে গভীরতা নেই-

আলো মুঞি জানো না-
জানিলে যাইতাম না কদম্বের তলে।
যৌবনের বনে মন হারাইয়া গেল।
ঘরে যাইতে পথ মোর হৈল অফুরান।

গোবিন্দদাস রূপচিত্র অঙ্কন করেছেন অলঙ্কারের চিত্র যুক্ত করে সেইসাথে  যুক্ত হয়েছে সাঙ্গীতিক উপাদান।

জ্ঞানদাসের পদে সাঙ্গীতিক উপাদান তথা Rhymne নেই বললেই চলে। যেমন,

নন্দনন্দন      চন্দচন্দন
গন্ধনিন্দিত অঙ্গ।
জলদ সুন্দর     কম্বুকন্দ্বর
নিন্দি সিন্ধুর ভঙ্গ ॥

জ্ঞানদাস রূপসৃষ্টিতে কত স্বাভাবিক । যেমন –

“দেইখ্যা আইলাম তারে সই দেইখ্যা আইলাম তারে।
এক অঙ্গে এত রূপ নয়নে না ধরে।

জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস উভয়েরই  ভাবে বৈচিত্র্যতা আছে, তবে উভয়েই সব ক্ষেত্রে সমান দক্ষতা দেখাতে পারেননি।  

গোবিন্দদাস গৌরচন্দ্রিকা বিষয়ক পদে তাঁর প্রতিভার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করেছেন। এ ধরনের পদ রচনায় তিনি যে অনুপম শৈলীর বিদর্শন করেছেন যা বাংলা কাব্যে তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই-

নীরদ নয়নে  নীর ঘর সিঞ্চনে
পুলক-মুকুল-অবলম্ব।
স্বেদ মকরন্দ   বিন্দু বিন্দু চুয়ত
বিকশিত ভাব-কদম্ব ॥

পূর্বরাগ ও আক্ষেপানুরাগ পদে জ্ঞানদাসের শ্রেষ্ঠত্ব অনস্বীকার্য। এ ধরনের পদে জ্ঞানদাস যে ধরনের গীতিপ্রাণতার স্বাক্ষর রেখেছেন, তা  গোবিন্দদাসে অনুপস্থিত। যেমন-

রূপলাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর।
প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর ॥

অভিসার বিষয়ক পদ রচনায় গোবিন্দদাস যেখানে রাজাধিরাজ, জ্ঞান দাসের প্রচেষ্টা সেখানে অনেকটা ম্লান। যেমন-

মন্দির বাহির কঠিন কপাট।
চলইতে শঙ্কিল পঙ্কিল বাট ॥
তঁহি অতি দূরতর বাদর দোল।
বারি কি বারই নীল নিচোল ॥

জ্ঞানদাসের পদাবলির সর্বত্র মাধুর্যের প্রকাশ, অতিশয় আনন্দ বা বেদনার মুহূর্তেও গভীরতা নেই; গভীর বেদনার মুহূর্তেও যেন জ্ঞানদাস অনেকটা প্রশান্ত, অন্যদিকে গোবিন্দদাসের প্রধান সুর উল্লাসের।

রূপ বর্ণনার ক্ষেত্রে গোবিন্দদাস অপূর্ব প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। ভাব, ভাষা ও ছন্দের সাহায্যে তিনি রাধাকৃষ্ণের যে রূপ গঠন করেছেন, তাতে ‘আমিত্ব’ নেই। কিন্তু জ্ঞানদাস ‘আমিত্ব-বঞ্চিত’ রূপগঠনের দিকেই যাননি, তাঁর রূপদর্শন মানেই স্বরূপ দর্শন।

পরিশেষে একথা স্বীকার করতেই হয়,জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস এ দুই কবির মেধা চিন্তা ও মানসের সার্বিক আলোচনা এ ক্ষুদ্র পরিসরে পরিপূর্ণ করে লেখার চেষ্টা করা, ঝিনুক দিয়ে সাগর সিঞ্চনের প্রয়াসমাত্র। জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস দুজনেই স্ব স্ব মহিমায় উজ্জ্বল। তাঁদের শিল্পসুষমাময় পদাবলি বাংলা বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। স্ব স্ব ক্ষেত্রে জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস রাজাধিরাজ।  চৈতন্য-পূর্ববর্তী কবি হিসেবে বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের যে মর্যাদা, চৈতন্য-উত্তর যুগের বৈষ্ণব পদকর্তা হিসেবে জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাসের একই মর্যাদা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *