আবেগ ও প্রাণস্পন্দনের সুরভি: দেওয়ানা মাদিনা গীতিকাটির শিল্পরস ও সঙ্গীতসত্তা


দেওয়ানা মদিনা’ গীতিকাটির শিল্পমূল্য আলোচনা কর।
বাংলার মানুষের প্রাণের সম্পদ লোকসাহিত্যের অন্তর্গত এক অমূল্য সম্পদ ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’। গীতিকাগুলো বস্তুনিষ্ঠ, জীবনঘনিষ্ঠ, ত্যাগ ও প্রেমের মহিমায় উজ্জ্বল। প্রতিটি গীতিকায়ই প্রেমের জয় ঘোষিত হয়েছে চোখের জলের মধ্যে দিয়ে। ‘দেওয়ানা মদিনা’ গীতিকায় মদিনার প্রেমের সহজ-সরল অনবদ্য রূপ দেখানো হয়েছে। তবে মদিনার প্রেম ব্যর্থ হলেও তাতে প্রেমের জয় ঘোষিত হয়েছে। প্রেমের অমর গাঁথা হিসেবে এ গীতকার যেমন অনন্য, তেমনি সাহিত্যগুণে ও শিল্পমানেও শ্রেষ্ঠ। অনবদ্য কাহিনি, আকর্ষণীয় চরিত্র চিত্রণ, ভাবঅনুযায়ী ভাষার ব্যবহার, সমাজ চিত্রণে ছন্দ প্রকরণ, অলংকার, ভাব-কল্পনা, চিত্রকল্প, রস ইত্যাদি বিচারে এর শিল্প সার্থকত অনন্য।


‘দেওয়ানা মদিনা’র কাহিনি সাদামাটা। আবহমান গ্রাম-বাংলার চিরপরিচিত আবহে এর কাহিনি পরিণতির দিকে এগিয়ে গেছে। মদিনার দাম্পত্য জীবনের করুণ আলেখ্য বর্ণনা মনসুর বয়াতির উদ্দেশ্য হলেও আলাল-দুলালের ছোটবেলার কাহিণী বর্ণনা করতে গিয়ে সোনাফর গাজীর প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু, দ্বিতীয় বিয়ে, সৎ মায়ের অত্যাচার, জল্লাদের হাতে আলাল-দুলালকে তুলে দেওয়া, মেলার কথা, সওদাগরের কাছে আলাল-দুলালের হস্তান্তর, হিরাধরের কাছে ধানের বিনিময়ে বিক্রি ইত্যাদি ঘটনা প্রসঙ্গে ক্রমে টেনে আনা হয়েছে। আখ্যানের শৈথিল্য গীতিকার বৈশিষ্ট্য হলেও ‘দেওয়ানা মদিনা’ গীতিকাটিতে সংহত ও পরিমিতিবোধের পরিচয় যায়।
গানের ভিতর গাঁথা অনুভূতি: দেওয়ানা মদিনা-এর রস ও রূপের জগৎ
গীতিকাগুলো ঘটনা বা কাহিনি প্রধান। তাই এতে ঢিলেঢালা চরিত্র লক্ষ্যণীয়। তবে মূল চরিত্র আলাল, দুলাল ও মদিনা স্ব-স্ব বৃত্তে আকর্ষণীয় হয়ে ফুটে উঠেছে। আলাল চরিত্রে বৈচিত্র্যে নেই, আভিজাত্যের মোহে সে অন্ধ ও প্রতিহিংসা পরায়ণ। স্বার্থের মোহে মানবতাবর্জিত। আলাল চরিত্রটি দ্ব›দ্ব-সংঘাতময়। নানা উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে পাঠকের সহানুভূতি লাভ করেছে। সহজ, সরল, শাশ্বত গ্রাম বাংলার কৃষক কন্যা মদিনা প্রেমে, আত্মত্যাগে উজ্জ্বল। মদিন চরিত্রের সৌন্দর্যে শুধু বাঙালি পাঠকই নয় যুদ্ধের ফ্রান্সের বোঁমা রোঁলা পর্যন্ত বিমুগ্ধ হয়েছেন। অন্যান্য চরিত্রগুলোও স্বাভাবিকতা নিয়ে কাহিনির মধ্যে বেড়ে উঠেছে।
সমাজ চিত্র: ময়মনসিংহ এলাকার কাহিনি। তাই হাওর বেষ্টিত গ্রাম বাংলার চিত্রসহ সাধারণ লোক জীবনের অনেক ছবিই এতে অঙ্কিত। সৎ মায়ের অত্যাচার, দ্বিতীয় বিয়ে, গ্রাম্য মেলাকে ঘিরে উৎসব, অর্থের বিনিময়ে সন্তান হত্যা, পণ্যের বিনিময়ে সন্তান বিক্রি, শ্রেণি বৈষম্য, বাংলার কৃষাণ-কৃষণীর দৈনন্দিন জীবন যাত্রা, বাঙালি বধূর বিশ্বাস ও স্বামীভক্তি, লোক বিশ্বাস, রীতি-প্রথা ইত্যাদি নানান বিষয় সমাজ বাস্তবতার ছবিই ফুটিয়ে তোলে।
ভক্তির সুরে প্রেমের ঝঙ্কার: দেওয়ানা মদিনা গীতিকা
রসঃ মদিনার দাম্পত্য জীবনের যে করুণস্পর্শী বর্ণনা, তাতে করুণ রসের আলেখ্য হিসেবেই গাঁথাটি সার্থকতা লাভ করেছে। কাহিণীর শুরু মৃত্যু দিয়ে। আলাল-দুলালের দুঃখময় জীবন, মদিনার বিরহ ও মৃত্যু, দুলালের সংসার ত্যাগ পাঠকের চোখের জল শুকাতে দেয় না কখনো।
চিত্রকল্প: লোক সাহিত্যের অন্তর্গত এ গীতিকার মধ্যে লোক জীবনের ছবি। কৃষিভিত্তিক সমাজ জীবনের মধুর দাম্পত্য জীবনের ছবি কবি-কল্পনায় অপূর্ব ব্যঞ্জনা পেয়েছে। স্বামীর পথ চেয়ে বসে থাকা মদিনার অন্তর্জগতের ও কর্মময় জীবনের ছবি-
আইজ বানায় তালের পিডা কাইল বানায় খৈ।
ছিক্কাতে তুলিয়া রাখে গামচা বান্দা দৈ।
শাইল ধানের চিড়া কত যতন করিয়া।
হাঁড়িতে ভরিয়া রাখে ছিক্কাকে তুলিয়া।
নামকরণ : মদিনার দাম্পত্যজীবনের করুণ কাহিনির এ পালার মূল বিষয়। তবে প্রথম অংশে আলাল-দুলালের দেওয়ান গিরি থেকে বঞ্চিত হওয়া, পরবর্তীতে দেওয়ানগিরি ফিরে পাওয়া কাহিনিকে ত্যাগে সহায়তা করেছে এবং এ রকম দ্বন্দ্বে কাহিনি রসময় হয়েছে। ফলে ‘দেওয়ানা মদিনা’ নামকারণ সার্থক ও শিল্পময়। তাছাড়া মদিনার প্রেমে শেষ পর্যন্ত দুলালের সংসার ত্যাগ করে ফকিরী ধর্ম গ্রহণ করে দেওয়ানা হবার একটা ইঙ্গিত রয়েছে। অর্থাৎ মদিনার প্রেমে দেওয়ানা।
আবেগের মদিরায় দুলে থাকা এক শিল্পযাত্রা: দেওয়ানা মদিনা
শব্দ ও ভাষা: ভাবনুযায়ী ভাষার ব্যবহারে রচনা হৃদয়গ্রাহী হয়ে ওঠে। ‘দেওয়ানা মদিনা’ পালাটি সাধারণ মানুষের রসতৃপ্তির জন্যই রচিত। তাই এর শব্দ চয়ন ও ভাষাশৈলী একেবারেই আটপৌরে। সহজ, সরল প্রাণবন্ত শব্দ প্রয়োগে ভাষাকে প্রাঞ্জল করে তোলা হয়েছে। ভাবঅনুযায়ী ভাষার ব্যবহার পালাটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। আরবি-ফারসি এমনকি আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগও দেখা যায়।
ভাষার প্রাঞ্জলতার উদাহরণ- (লোমুখে প্রচলিত শব্দ তার প্রাকৃত রূপেই ব্যবহৃত হয়)
“বালাই সতীন গেছে রাখ্যা দুই কাঁটা।
বড় অইলে আমার নছিবে কেবল মুড়্যা ঝাটা।
ছন্দ : “গাথা সাহিত্যের ভাষা পাড়াগেঁয়ে, ছন্দ শিশুর আধ আধ বুলির মত ভাঙা ভাঙাÑ পূর্ণতা পায় নাই।” ‘দেওয়ানা মদিন’ পালা সম্পর্কে এ কথা প্রযোজ্য। তৎসম শব্দের চুমকি নেই, চাষীর পাড়াগোঁয়ে ভাষায়, ভাঙা ভাঙা ছন্দ দিয়ে, মদিনার করুণ কাহিণী গ্রাম্য কবি প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। পয়ারে লেখা তবে পংক্তিগুলো সহজ সরল গ্রাম্য আঞ্চলিক বা প্রকৃতি/অপভ্রংশ শব্দে নির্মিত বলে ছন্দ কোথাও কোথাও ভাঙা ভাঙাÑ
ইতে আন না অইব ধরি পাও দুটি।
ছড়ার পয়ার ছন্দে গাথাটি সাবলীল হয়েছে। উদ্দীপনাপূর্ণ শব্দ ও সুরের ঝংকারের কারণে ছন্দের ত্রুটি কানে বাজে না !
কান্দিয়া কান্দিয়া বিবির দুঃখে দিন যায়।
খানাপিনা ছাড়্যা কেবল করে হায় হায় \
অলংকার ঃ প্রাত্যহিক গ্রামীণ জীবন থেকে উপকরণ নিয়ে অলংকারের ডালি সাজানো হয়েছে। কুন্দ, ভাটফুল, মহুয়া ফুল যেমন গ্রাম প্রকৃতির শোষা বৃদ্ধি করে, তেমনি লোক উপাদান ভিত্তিক আটপৌরে অলংকারে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে কাব্যটি গ্রাম্য উপাদান উপাচার ও গ্রামীণ শব্দ প্রয়োগে সরল উপমা ঃ
“বগা যেমন চউখ বুজঞা পাগারের ধারে,
সাধু অইয়া বস্যা থাক্যা পুডী মাছ ধরে।”
অনুপ্রাস : “ক্ষণে হাসে ক্ষণে কান্দে ক্ষণে দেয় গালি
ক্ষণে পানিতে আরে দৌঁড়ের নাও সাজাইয়া
আরং জমির কত দেশ ভাসাইয়া।”
বাংলার অনবদ্য সম্পদ ভ্রাতৃত্ববোধ, বিয়ের চিত্র, তালাকের কথা শুনেও অটল বিশ্বসে স্বামীর পথ চেয়ে থাকা, দুলাল ও মদিনার দাম্পত্য ও গাইস্থ্য জীবনের চালচিত্র গ্রাম্য সহজ গ্রাম্য শব্দে প্রকাশ ইত্যাদি বিষয় নিরক্ষর কবির কবি প্রতিভার দ্যুতি বহণ করে।
মদিনার মৃত্যুর পর মদিনার খোঁজে আসা দুলালেল মনবেদনা ও তাদের দাম্পত্যজীবনের করুণ পরিণতি কী অপূর্ব ব্যঞ্জনা পেয়েছে কয়েকটি গ্রাম্য শব্দ ও সংস্কৃতির ব্যবহারেÑ
ঘরে কান্দে পালা বিলাই গোয়ালে কান্দে গাই।
সকলিত আছে আমার পরাণের দোসর নাই \
মানুষের গন্ধ নাই বাড়ীর ভিতরে।
কাউয়ায় করে কা-কা চালের উপর \
প্রচলিত সমালোচনা তত্তে¡র বিচারে হয়ত গীতিকাটি উচ্চ পর্যায়ের শিল্পকর্ম হিসেবে মর্যাদা পাবে না। কিন্তু কবি হৃদয়ের আন্তরিকতার স্পর্শে সহজ-সরল আটপেীরে ভাষায় বিভিন্ন অভিব্যক্তি সেভাবে অনুভূতিময় হয়ে পাঠক হৃদয় স্পর্শ করে তাতে বিষ্ময় জাগে। মনসুর বয়াতিরা ছন্দ বা শব্দ ঐশ্বর্যের কাঙালি হতে পারে, বড় বড় তালমানের সন্ধান নাও জানতে পারে, তবে প্রকাশভঙ্গির সাবলীলতায়, করুণ রসের ব্যঞ্জনায়, অকৃত্রিম সমাজ ও জীবনের চিত্র অঙ্কনে, গ্রামীণ আবহ সৃষ্টিতে তাদের কোনো ঘাটতি নেই।
সুরে সুরে মদিনার মায়া ও করুণ আলেখ্য: শিল্পচেতনায় দেওয়ানা মদিনা
পরিশেষে “দেওয়ানা মদিনা” লোক কবি মনসুর বঘাতির হৃদয় রসে সিক্ত হয়ে কালোত্তীর্ণ মর্যাদা পেয়েছে। বাংলায় শাশ্বত কুলবধূর দাম্পত্য জীবনের করণ আলেখ্য ভাষাছন্দ, অলংকারে সমৃদ্ধ হয়ে পাঠকে হৃদয়কে মুগ্ধ করেছে। নিটোল কাহিনি, সংঘাতময় চরিত্র চিত্রনে ভাষাচিত্র নির্মাণে ভাবের গভীরতায় পালাটি শিল্পময় হয়ে উঠেছে।