দেওয়ানা মদিনা পালায় মদিনার প্রেম ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু তাতেও প্রেমের জয় ঘোষিত হয়েছে।- আলোচনা কর।

অথবা, দেওয়ানা মদিনা পালা ব্যর্থ প্রেমের কাহিনি হলেও তাতে প্রেমের অনন্যতার পরিচয় বিদ্যমান।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক …

দেওয়ানা মদিনা পালার ট্র্যাজেডি

বাংলাদেশের লোকসাহিত্যের সবচেয়ে নন্দিত ও ঐতিহ্যের ধারক ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র অন্তর্গত পালাগান বা গাথাগুলো আমাদের প্রাণের সাহিত্য হিসেবে পরিচিত। ‘মৈমনসিংহ গীতিকার’র পালাগুলোর মধ্যে ‘দেওয়ানা মদিনা’ একটি অন্যতম পালা। বস্তুনিষ্ঠতা, একনিষ্ঠ প্রেমের মহিমায় গ্রাম বাংলার জীবন চিত্রণে, আবেগ ও হৃদয়বৃত্তির প্রকাশে পালাটি পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

দেওয়ানা মদিনা পালাটি করুণ রসের আলেখ্য। এর দুটো অংশ। একটি অংশে সৎমায়ের ষড়যন্ত্রে আলাল-দুলালের নির্বাসিত জীবন এবং আলালের সংগ্রামশীলতায় পুনরায় দেওয়ানি লাভ। অন্য অংশে রয়েছে মদিনার প্রেম এবং দুলাল-মদিনার দাম্পত্যজীবন, বিচ্ছেদ ও মদিনার মৃত্যু। তবে মদিনার সহজ-সরল অকৃত্রিম প্রেমের কারণে পালাটি অন্যান্য পালা থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদা লাভ করেছে। দুটো অংশ থাকলেও পালাটির মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে দুলাল-মদিনার দাম্পত্য প্রেমকাহিণী এবং তাদের জীবনের সকরুণ ট্র্যাজেডি।

দেওয়ানা মদিনা পালা
মৈমনসিংহ গীতিকা দেওয়ানা মদিনা

দেওয়ানা মদিনা পালা বেদনার বাঁশিতে ভক্তির সুর এবং করুণ রসে সিক্ত

দেওয়ানা মদিনা পালাটি করুণ রসের আলেখ্য হয়েছে মদিনার জীবনে সংঘটিত দুঃখ ও করুণ পরিণতির জন্য। আলাল পালিয়ে গেলেও দুলাল গৃহস্থ ইরাধরের কন্যা মদিনাকে ভালবেসে বিয়ে করে সুখের সংসার গড়ে তোলে। মদিনাও প্রেমের ঐশ্বর্যে স্বামীর জীবন ভরে তোলে। কিন্তু এ সুখেল দিন মদিনার কপালে স্থায়ী হয় নি।

বড় ভাই আলালের কথায় দেওয়ানির লোভে দুলাল মদিনাকে তালাক দিয়ে চলে যায়। তালাকনামা হাতে পেয়েও মদিনা বিশ্বাস করতে পারে না যে, স্বামী তাকে পরিত্যাগ করতে পারে। স্বামীর প্রতি অটল বিশ্বাসে মদিনা স্বামীর পথপানে চেয়ে বসে থাকে। মদিনার পথ চাওয়া শেষ হয়নি, ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। হৃদয়-বিদারক ও বিয়োগন্তক এ কাহিণী পাঠক ও শ্রোতাদের মধ্যে করুণ রসের সৃষ্টি করে।

দেওয়ানা মদিনা পালা মানবপ্রেম থেকে ঈশ্বরপ্রেমে এবং করুণ রসে রূপান্তর

বাহ্যিকভাবে মদিনার জীবন ব্যর্থ হলেও তাতে প্রেমের অনন্যতা প্রকাশমান। দুলালের প্রতি মদিনার গভীর প্রেম তাকে স্বামীগরবিনি করে তোলে। স্বামীর গভীর অটল বিশ্বাসে আবদ্ধ হয় সে। প্রেমের গভীরতা ও বিশ্বাসের গাঢ়তায়

তালাকনামাকে মদিনা হেসে উড়িয়ে দেয়Ñ
তালাকনাম যখন পাইল মদিনা সুন্দরী।
হাসিয়া উড়াইল কথা বিশ্বাস না করি \
তারে ছাড়িয়া দুলাল রইতে না পারিব।
কতদিন পরে খসম নির্চয় আসিব \

স্বামী যে তাকে ছেড়ে অন্য নারী বিয়ে করে সুখে থাকতে পারে এটা বিশ্বাস করতে গার কষ্ট হয়। সুখে-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায় তাদের প্রেমের বন্ধন এত নিবিড় যে, মদিনার বিশ্বাস স্বামী ফিরে আসবেই। স্বামী ফিরে আসবে বলে পুকুরে মাছ ধরতে দেয় না, দুলাল এলে মাছ ধরবে। নানা রকম খাবার ও পিঠা-পুলি তৈরি করে স্বামীর আশায় পথ চেয়ে থাকেÑ

আইজ বানায় তালের পিডা কাইল বানায় খৈ।
ছিক্কাতে তুলিয়া রাখে গামচা-বান্দা দৈ \
শাইল ধানের চিড়াা যতন করিয়া।
হাঁড়ীতে ভরিয়া রাখে ছিক্কাতে তুলিয়া \

স্বামী ফিরে না আসলে মদিনা তার ভাই ও সন্তানকে স্বামীর কাছে পাঠায়। দুলাল সন্তানকে ফিরিয় দিলে মদিনার আশাভঙ্গ হয়। আশাহতের বেদনায় মদিনা আে স্ত আে স্ত শুকিয়ে যেতে থাকে, আর দাম্পত্যপ্রেমের স্মৃতিচারণ করে। দাম্পত্যপ্রেমের মধুময় দিনের কথা ভাবতে ভাবতে জীবনের শেষ বেলায় চলে যায়।

 দেওয়ানা মদিনা পালা করুণ রসের জগত  যেখানে কান্না কবিতায় রূপ নেয়

স্বামী তাকে ছেড়ে গেছে, কিন্তু প্রেমের গাঢ়তায় উজ্জ্বল মদিনা স্বামীল স্মৃতিকে কোনোদিন মুছে ফেলতে পারে না, অন্তরে প্রেমের প্রদীপ জ্বালিয়েই সে চলমান জীবনের অবসান ঘটিয়েছে। প্রেমের বন্ধন-ছিন্নের বেদনায় সে শেষ পর্যন্ত পাগল হয়ে যায় এবং মৃত্যুবরণ করে।

অন্তরের আর্তি ও আত্মসমর্পণ: করুণ রসের প্রতিমা দেওয়ানা মদিনা  পালা

মদিনার জীবন ব্যর্থ হলেও তার প্রেম ঐশ্বর্যময় হয়ে পাঠকের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছে। মদিনার জীবন-পরিণতি করুণ এটা ঠিক, তবে ‘দেওয়ানা মদিনা’র ট্র্যাজিক রসের সম্পূর্ণটা ধারণ করেছে দুলাল। দুলাল চরিত্র দ্ব›দ্বময়। দ্ব›েদ্ব দ্ব›েদ্ব তার হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে।

ভক্তির ব্যথায় ভেজা শিল্পকাব্য: করুণ রসে দেওয়ানা মদিনা

দুলাল মদিনার প্রেমকে উপেক্ষা করে দেওয়ানির লোভে দাম্পত্যজীবন ছেড়ে চলে যায়। পুত্রস্নেহকেও অস্বীকার করে। মদিনাকে ছেড়ে যাওয়ার পরেই দুলাল বুঝতে পারে কী ছেড়ে এসেছে বস। বেদনায় দগ্ধ হতে থাকে সবসময়। মদিনার প্রেম দুলালকে দেওয়ানির মোহ থেকে ছুটিয়ে নিয়ে আনে, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে যায়।

যে মদিনার প্রেমে-সোহাগে, সেবায় দুলালের জীবন ধন্য করেছিল, সে কবরের মাটির সাথে মিশে গেছে। পড়ে আছে চারপাশে মদিনার নানা স্মৃতি। মদিনার মৃত্যুতে দুলালের জীবন হাহাকারে ভরে যায়। দুলালের হৃদয়ের করুণ দীর্ঘশ্বাস ও হৃদয় বিদারক হাহাকারের মধ্যে দিয়ে ‘দেওয়ানা মদিনা’ পালার সমাপ্তি ঘটে-

দুলালের কান্দনেতে পাথর গল্যা পানি।
জালাল গাইনে গায় গীত দুঃখের কাহিণী \
দুলাল জিগায় সুরুজ মদিনা কোথায়।
চোখে হাত দিয়া সুরুজ, কয়বার দেখায় \

মদিনার প্রেমের টানে দেওয়ানির মোহ ত্যাগ করে দুলালের ফিরে আসার মধ্য দিয়ে মদিনার প্রেমের জয় ঘোষিত হয়েছে। হাহাকারের মধ্যে দিয়ে অনুতপ্ত দুলালেল প্রায়শ্চিত্ত শুর হয়। মদিনা অসীম কষ্টে জীবন অতিবাহিত করলেও মৃত্যুতে তার সকল যন্ত্রণার অবসান ঘটে। অন্যদিকে দুলাল বেঁচে থেকেও মৃত্যুর অধিক যন্ত্রণা ভোগ করে। ট্র্যাজেডির করুণ রসকে বুকে ধারণ করে বেঁচে থেকে এ পালাকে গভীর ট্র্যাজেডির মর্যদা এনে দিয়েছে। এই যে বেঁচে থেকে মদিনার প্রেমকে বুকে ধারণ করে অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হওয়া এতে মদিনার প্রেমেরই জয় ঘোষিত হয়েছে।

গ্রাম-বাংলার গৃহস্থ কন্যা মদিনা অল্পতেই তুষ্ট। যা পায়নি, তার জন্য কোনো মনোবেদনা নেই, বরং যা পেয়েছে তাই দিয়েই জীবনকে ভরিয়ে তুলে অন্যের জীবনকেও সার্থক করেছে। আর দশটা গ্রাম্য নারীর মতই সে প্রেমে-কর্তব্যে, স্বামী-সন্তানকে স্নিগ্ধ মধুরতায় ভরিয়ে তুলেছে। প্রচলিত সমাজ ও বংশ গৌরবের নির্মমতা তাকে বাঁচতে দেয় নি। ‘দেওয়ানা মদিনা’ পালার সম স্ত ঘটনা মদিনার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে। মনে হয় মদিনার মৃত্যু বেদনাকে ঘণীভূত করতেই সম স্ত ঘটনা সাজানো। ফলে এটি ট্র্যাজিক বৈশিষ্ট্য সমুজ্জ্বল হয়েছে।

মদিনা-দুলালের দাম্পত্য সুখের স্থায়িত্ব খুবই স্বল্প সময়ের। দুলাল মদিনাকে ত্যাগ করার পর থেকেই শেষ পর্যন্ত টান টান বেদনার বাষ্প ঘণীভূত হয়েছে। দুলাল বেঁচে থেকে সম স্ত বেদনাকে অন্তরে লালন করে অষ্টপ্রহর বেদনায় দগ্ধ হয়েছে। মদিনা ছলছল আঁখিতে স্বামীর পথ চেয়ে জীবন কাটিয়েছে এবং মৃত্যুতে ঢলে পড়েছে। পাঠকের চোখকেও ভিজিয়েছে সে। প্রেম তাকে জীবনে ব্যথা ছাড়া আর কিছু না দিলেও মৃত্যুর পর তাকে করেছে মহীয়ান। সুতরাং ব্যর্থ প্রেমের আলেখ্য হলেও মদিনার প্রেম অনবদ্য। কাব্যটি শেষ পর্যন্ত করুণ রসাত্মক বিরহে ক্ষত-বিক্ষত মদিনার বেদনার ইতিহাস হয়ে উঠেছে। মদিনার বিরহে শুধু দুলাল নয় পাঠকের হৃদয়-মনও বেদনায় ভরে ওঠে।
উক্কায় ভরিয়া তামুক ভরিয়া।

খসমের লাগ্যা থাকি পন্থপানে চাইয়া \
হায়রে পরাণের বন্ধু রইলা কোন দেশে।
অভাগী কান্দিয়া মরে তোমার উদ্দেশ্যে \

সুর, শ্রদ্ধা ও শোকের সেতুবন্ধ: দেওয়ানা মদিনা  পালার করুণ সৌন্দর্য

মৈমনসিংহ গীতিকার দেওয়ানা মদিনা পালাটি  কেবল ধর্মীয় ভক্তি ও প্রেমের কাব্য নয়, এটি মানবিক বেদনা ও আত্মসমর্পণের এক অনুপম শিল্পরূপ। দেওয়ানা মদিনার প্রতিটি পর্বে করুণ রস এমনভাবে বোনা হয়েছে যে, শ্রোতা বা পাঠক অবচেতনে ভক্তির সঙ্গে সঙ্গে সহানুভূতির স্রোতে ভেসে যায়। কৃষক-কন্যা মদিনার জীবনের করুণ কাহিনির মধ্যে গ্রাম-বাংলার যাপিত-জীবনের দুঃখ, বিরহ, ত্যাগ ও ঈশ্বরানুরাগ—সব প্রকাশ পেয়েছে। মদিনা-সুরুজ-আলাল-দুলাল তাদের জীবনের সব কিছু  মিলিয়ে এই পালাটি করুণ রসের এক জীবন্ত প্রতিমা। তাই দেওয়ানা মদিনা কেবল একটি পালা নয়, এটি আমাদের অন্তর্জগতের ব্যথা ও ভক্তির মেলবন্ধনে নির্মিত এক শাশ্বত শিল্পসৌন্দর্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *