প্রশ্ন: –বৈষ্ণব পদাবলি অবলম্বনে বৈষ্ণব , ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন আলোচনা কর।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

বৈষ্ণব পদাবলির ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন

মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলির মধ্যে বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন বিধৃত। বৈষ্ণব মত প্রচারের মানসে বৈষ্ণব ধর্মকে আশ্রয় করে বৈষ্ণব পদাবলি রচিত। সাহিত্যের মধ্যে থেকে সাহিত্য-রস খুঁজে বের করা যত সহজ, রূপকধর্মী ধর্মাশ্রয়ী সাহিত্যের মধ্যে থেকে ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন বের করা তত সহজ নয়। বিভিন্ন সহায়ক গ্রন্থ অবলম্বনে বৈষ্ণব পদাবলিতে বিধৃত বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের পরিচয় দেবার চেষ্টা করা যেতে পারে।

প্রাচীনকাল থেকে শঙ্করের জ্ঞানবাদ ও অদ্বৈতবাদকে কেন্দ্র করে অনেকে এদেশে বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন প্রচার করেন। সকলেই ভক্তিভাবকে মোক্ষলাভের উপায় হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। প্রবক্তা অনেকে হলেও শ্রীচৈতন্যদেব প্রবর্তিত ‘অচিত্ত্যদ্বৈতাদ্বৈতবাদ’-ই বৈষ্ণব পদাবলিতে বিধৃত। চৈতন্য-পূর্ববর্তী ও চৈতন্য-পরবর্তী পদাবলির মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তবে, পার্থক্য থাকলেও ভক্তিভাবের দ্বারা রাধা কৃষ্ণের যুগল মূর্তির উপাসনার মধ্যে দিয়ে মোক্ষলাভের উপায়ই মূলত সমস্ত বৈষ্ণব পদাবলির মধ্যে প্রকাশিত।

বৈষ্ণব পদাবলির ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন

বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন আলোচনা করতে গেলে নিম্নের বিষয়টি বিবেচ্য।

বৈষ্ণবরা মনে করে স্রষ্টা ও সৃষ্টি অভিন্নও বটে, আবার ভিন্নও বটে। যেমন পানি ছাড়া ঢেউ হয়না, কিন্তু পানি ছাড়াও ঢেউয়ের একটা রূপ কল্পনা করা যায়। তেমনি রোদ ও সূর্যকে একাধারে ভিন্ন ও অভিন্ন কল্পনা করা যায়। ফল, বীজ, গাছ, একই জিনিস, আবার আলাদা। এ রকম স্রষ্টার থেকে সৃষ্টির জন্য, তবুও এক হয়েও তারা এক নয়।

বৈষ্ণব মতে বিধাতা তাঁর একাকিত্ব ঘুচানোর জন্য নিজ অংশ থেকে নারী স্বরূপাকে সৃষ্টি করে ‘যুগল’ হয়েছেন। নারী শক্তি স্বরূপা, নারী সম্পর্কেই পুরুষ হয় শক্তিমান। নারী পুরুষের মিলনেই সৃষ্টির উদ্ভব। তাদের সম্পর্ক প্রেমের। সৃষ্টিও তাই প্রেমজ। বিধাতা নিজেকে বিচিত্রভাবে উপভোগ করতে গিয়ে আনন্দের সহচর হিসেবে সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। স্রষ্টা-সৃষ্টির সম্পর্ক তাই আনন্দের, তথা প্রণয়ের। তাই সেখানে আনুষ্ঠানিক ধর্মের কোনো নিয়ম-নীতি খাটে না। অনুরাগে প্রেমের উন্মেষ বিরহবোধে এর উপলব্ধি এবং মিলনে এর সার্থকতা।

বৈষ্ণব পদাবলির ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন

বৈষ্ণবদের মতে ভগবান রস-স্বরূপ। তিনি সবার প্রিয় বন্ধু ও আত্মাস্বরূপ। তিনি রূপময়, যেমন মধুর, তেমনি সুন্দর। ভগবান রূপের আকর এবং গুণের ভাণ্ডার। এ রূপ দেখে মনে আস্বাদনের সাধ জাগে। মন উতালা হয়। তখন-

রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ কোর।

রূপময়, রসময় ভগবানের প্রতি এটা হচ্ছে পূর্বরাগ ও অনুরাগ। স্রষ্টার হৃদয়ের পরশের জন্য সৃষ্টির হৃদয় কাঁদে। প্রেমের জন্য পরান স্থির থাকে না, হৃদয়ের মাঝে বাঁশি ডাকে। সে সুর কানের ভিতর দিয়ে মরমে পৌছায়। ঘরে থাকা দায় হয়ে যায়। “বেদনার ঢেউ উঠে জাগি সুদূরের লাগি।’ শুরু হয় বিরহ। মিলন-পিপাসু বিরহী আত্মার করুণ কান্নার ধ্বনি শোনা যায়। কারণ ‘জনম অবধি রূপ নেহারলেও নয়ন তৃপ্ত হয় না: আর’ লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়া রাখলেও হিয়া জুড়ায় না।’


ভগবানের ভক্ত অনেক, কিন্তু ভক্তের ভগবান একজন। তাই সাক্ষাৎ পেলেও না পাওয়ার বেদনা আর পেয়ে হারানোর ভয় মানব হৃদয়ে চিরন্তন দুঃখ জাগিয়ে রাখে।

দুহু কোড়ে দুহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া আধ তিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া।

খণ্ড মানবাত্মা অখন্ড ব্রহ্মেলীন হতে চায়। তাই, বিচ্ছেদের ও বিরহের জন্য এ বেদনা ও আকুলতা।

বৈষ্ণবদের মতে-

আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে বলি কাম কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইংয়া ধরে প্রেম নাম।

কৃষ্ণ-প্রেমই বৈষ্ণবদের লক্ষ্য। আনন্দময় রসস্বরূপ কৃষ্ণ-প্রেম হৃদয়ে ধারণ করতে পারলেই মানুষের যথার্থ আনন্দ তথা মুক্তি। কৃষ্ণ-প্রেম পেতে হলে শুদ্ধভক্তির সঙ্গে কৃষ্ণের ভজনা করতে হবে। কৃষ্ণের চরণে আত্মসপর্মণ করতে হবে। তাহলে, সংসারের মায়া থেকে মুক্তি সম্ভব।

কৃষ্ণপ্রেম পেতে হলে শুদ্ধভক্তির দ্বারা চিত্তকে বিশুদ্ধ করতে হয়, বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে এসে তবেই পরিপূর্ণ কৃষ্ণ-প্রেম পাওয়া যায়। এ প্রেমের জন্য শাস্ত্রীয় অনুশাসন ও বিধি মানার দরকার নেই, আত্মচিন্তা বিলুপ্ত করে, নিঃস্বার্থ ভক্তিসাধনা দরকার।

বৈষ্ণব পদাবলির ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনে পরিপূর্ণ কৃষ্ণ-প্রেমের স্তরগুলো হলো-

রতি, প্রেম, স্নেহ, মান, রাগ, প্রণয়, অনুরাগ, ভাব ও মহাভাব।

চৈতন্য পূর্ববর্তী পদাবলিতে প্রেমের বিভিন্ন স্তরের পর্যায়ক্রম তেমন পাওয়া যায় না। চৈতন্য পরবর্তী পদাবলিতে পূর্বরাগ, অভিসার, মান, কলহান্তরিতা, প্রেমবৈচিত্ত্য আক্ষেপানুরাগ, মাথুর, ভাব-সম্মিলন এইভাবে প্রেমের গাঢ়তা অনুসারে স্তর নির্দেশিত হয়েছে।

পূর্বরাগ: পূর্বরাগের পদে প্রথমে ভগবানের নামকীর্তন করা হয়।

না জানি কতেক মধু শ্যাম নামে আছে গো

বদন ছাড়িতে নাহি পারে।

জপিতে জপিতে নাম অবশ করিল গো

কেমনে পাইব সই তারে।

ভগবানকে সহজে পাওয়া যায় না, কষ্ট সহ্য করতে হয়। অভিসারের পদে সাধন পথের বিভিন্ন কষ্টের কথা পাওয়া যায়-

কণ্টক গাড়িক মল সম পদতল

মঞ্জীর চিরহি ঝাঁপি।
গাগরি বারি ঢারি করি পিছল

চলভহি অঙ্গুলী চাপি।

মাধব, তুয়া অভিসারক লাগি।

ফুজ-থেমে বিভোর অফকে ছেড়ে কৃষ্ণ অন্যত্র গেলে বা ভডের প্রতি কৃষ্ণের অবজ্ঞা দেখা দিলে মানের উত্তর হয়।

সই, কেমনে ধরিব হিয়া

আমার বধুয়া

আন বাড়ি যায়

আমার আঙিনা দিয়া।।

ভক্তের ভগবান একজন, আর কেউ নেই, কিন্তু জগবানের ভক্ত সংখ্যা অনেক। ভগবান অন্যত্র গেলে মান হয়। সে মান এক সময় অনুশোচনায় রূপ নেয়। কলহাভরিতার গদে অনুশোচনার প্রকাশ পায়। চক্রের মান

আর মোহে কি পুসছি

হামারি অভাগি

ব্রজ ফুল নন্দন

ছান্দ উপেখদু

দারুণ মানক ল্যাগি।।

ও হত বিধির বিধানের নিয়মে মাঝে মাঝে ভক্তের জীনে দুঃখ বিপদ, যন্ত্রণা ইত্যাদি নেমে আসে, ভক্ত বিভ্রান্ত হতাশ হয়। মাথুরের পদে সেই হতাশা প্রকাশ পায়।

শূন ভেল মন্দির শূণ ভেল নগরী

খুন ভেল দশদিশ খুন ভেল সগরি।।

জপ্রেমে পরিপূর্ণ আত্মনিবেদন সহজ নয়। কষ্ট সহ্য করতে হয়। জাত-কুল-মান ত্যাগ করে কলঙ্কের ডালি মাথায় নিতে হয়। আবার পেয়ে না পাওয়ার বেদনা বা হারাবার ভয়ও থাকে, এসব ভাব প্রেমবৈচিতা পদে । কৃষ্ণলেমে বিভোর ভক্ত ভগবানকে না পেয়ে অনেক সময় নিজ কর্মের জন্য আক্ষেপ করে। আক্ষেপ প্রেম বৈচিে চিত্তোর মধ্যে পড়ে। আক্ষেপে মূলত অনুরাগই ধরা পড়ে। প্রকাশ পায়

সুখের লাগিয়া এ ঘর বাধিনু

অনলে পুড়িয়া গেল।

অমিয়া সাগরে সিনান করিতে

সকলি গরল ভেল।।

ভক্ত আত্ম্যবিমোহিত হয়ে ভগাবানের পায়ে যখন নিজেকে সঁপে দেয় তখন আর তার বাহ্যিক জ্ঞান থাকে না। সব কিছু ছাপিয়ে ভগবানের ভাবনাই গজের মনে স্থান পায়। এ পর্যায়ের নাম ভাব-সম্মিলন।

দুখিনীর দিন দুখেতে গেল মথুরা নগরে ছিলে ত ভাল এই সব দুখ কিছু না গণি তোমার কুশলে যুশল মানি।


ভক্ত যেমন ভগবানকে চায়, ভগবানও ভক্তকে চায়, তাই ভগবান ভক্তের সাথে মিলিত হতে হয়-

দুহু কোড়ে দুই কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া আধতিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া।

বৈষ্ণব পদাবলির প্রেমের শেষ পর্যায় হলো মহাভাব। মরণের পরও রাধা কৃষ্ণের সাথে মিলিত হতে চায়। মরণের পরে যদি কৃষ্ণের সাথে অনুক্ষণ সান্নিধ্য পাওয়া যায়, তবে মরনই রাধার কাম্য-

সর্বাঙ্গ খাইওরে কাক না খাইও মোর আঁখি শ্যাম দরশনে মোর আঁখি রেখ বাকী।।

বৈষ্ণব পদাবলির ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের সার কথা:

বৈষ্ণব পদাবলির এ প্রেম আসলে জীবাত্মা-পরমাত্মার প্রেম। জীবাত্মা পরমাত্মার খণ্ডাংশ। বিন্দু বিন্দু পানি নিয়ে সমুদ্র, কিন্তু বিন্দুর একক শক্তি খুবই কম। বিন্দু নিজের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই সমুদ্রের সাথে মিলিত হতে চায়। বিন্দু- স্বরূপ জীবাত্মাও তাই সমুদ্র-স্বরূপ পরমাত্মার সাথে মিলনের জন্য ব্যাকুল হয়। পরমাত্মারও আকুলতা আছে, কেননা জীবত্মা ছাড়া পরমাত্মার লীলা ভোগ হয় না। তবে বিশেষ কোনো জীবাত্মার জন্য পরমাত্মার মাথা ব্যথা নেই, কেননা তাঁর যোলশ গোপিনী আছে। কিন্তু রাধার কৃষ্ণ ছাড়া আর কেউ নেই। পাছে বাদ পড়ে তাই একক জীবাত্মা সদা উদ্বিগ্ন থাকে। প্রেমের পরিণতি একাত্মতার মধ্যে। বৈষ্ণবরা তাকে ‘যুগল ‘রূপ ও অভেদ রূপ বলে।

চৈতন্য পরবর্তী ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন:

চৈতন্য পরবর্তী বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের বদ্ধমূল ধারণা বা বিশ্বাস যে, পরমাত্মা ভগবান শ্রীকৃষ্ণই শ্রীরাধিকার ভাবযুক্ত হয়ে শচীনন্দন গৌরাঙ্গরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। উদ্দেশ্য রাধার কৃষ্ণপ্রেমের স্বরূপ স্বদেহে আস্বাদন করা। বৈষ্ণব পদাবলরি মধ্যে এ তত্ত্বও প্রকাশিত। রাধা-কৃষ্ণের যুগ্মাবতার চৈতন্যদেব। তাঁকে স্মরণ করেই রাধা-কৃষ্ণের সাধনা করতে হবে।

অনেকের মতে-

বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন মূলত মানবজীবনে প্রেম, ভক্তি ও আত্মসমর্পণের আদর্শ স্থাপন করেছে। এই ধর্মতত্ত্বে ঈশ্বর ও জীবের সম্পর্ক ব্যাখ্যা পেয়েছে ভক্তির মাধ্যমে, আর দর্শনে প্রকাশ পেয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক একত্ববোধ। তাই বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন কেবল ধর্মীয় চিন্তাধারা নয়, এটি মানবমনের নৈতিকতা, প্রেম ও মুক্তির এক চিরন্তন দার্শনিক অভিব্যক্তি।

পরিশেষে ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন নিয়ে বলা যায় যে, মহাভাব স্বরূপিনী রাধার কৃষ্ণপ্রেমে আত্মবিলুপ্তি তথা জীবাত্মা ও পরমাত্মার লীলা খেলা এ তত্ত্বই বৈষ্ণব পদাবলির মূল সুর। বৈষ্ণব ধর্মের প্রকাশ বা প্রচার করার মানসেই বৈষ্ণব সম্প্রদায় পদাবলি সাহিত্যের সহায়তা গ্রহণ করেছিলেন। এজন্য বৈষ্ণব পদাবলি বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের রসভাষ্য বলে স্বীকৃত।

প্রফেসর মো; আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।

খোলা পাতা বাংলা সাহিত্য ও শিক্ষামূলক ব্লগ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *