ধ্বনি পরিবর্তনের সূত্র বলতে কী বুঝ ? সূত্রগুলো উদাহরণসহ আলোচনা কর/গ্রীমের সূত্র, গ্র্যাসম্যানের সূত্র ও ভার্ণারের সূত্র আলোচনা কর/ গ্রীমের সূত্র ব্যাখ্যায় কীভাবে গ্রীসম্যানের সূত্র সহায়তা করে/ভার্ণারের সূত্র গ্রীমের সূত্রের পরিপূরক।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য।

ধ্বনি পরিবর্তনের সূত্র

ভূমিকা:: ধ্বনি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। আর এ পরিবর্তন চলে একটি নির্দিষ্ট নিয়মে। ভাষাবিজ্ঞানীরা ভাষার ধ্বনিতাত্তি¡ক ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে দেখেছেন যে ধ্বনি পরিবর্তন ঘটে কতকগুলো প্রক্রিয়ায়। প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে রয়েছে একটা সর্বজনীনতা। ধ্বনি পরিবর্তনের এই নির্দিষ্ট নিয়মকে ধ্বনি পরিবর্তনের সূত্র বলে। [সূত্র/ধ্বনিতাত্তি¡ক সূত্র/ধ্বনি পরিবর্তনের সূত্র]

সংজ্ঞা: “ধ্বনি পরিবর্তনের সূত্র হলো – কোনো একটি বিশেষ/সুনির্দিষ্ট সময়ে, ধ্বনির অবস্থানবিশেষে, কোনো ভাষার ধ্বনি উচ্চারনের ব্যাপারে এক ধরণের নিয়মসঙ্গত পরিবর্তন।”

কোনো এক বা একাধিক কারণে ভাষার ধ্বনির পরিবর্তন ঘটে। পরিবর্তনটি যখন নিয়মিত হয় তখনই তাকে সূত্রাকারে প্রকাশ করা যায়।

আধুনিক ভাষাতত্ত্ব
তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান – হুমায়ুন আজা

ধ্বনি পরিবর্তনের সূত্র– ব্যাখ্যা

ধ্বনি পরিবর্তন সম্পর্কে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার। ধ্বনি পরিবর্তনের সূত্র একটি ভাষায় বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষ অবস্থায় প্রযোজ্য। নিয়মিত ধ্বনিগত পরিবর্তন না হলে তাকে ‘ধ্বনিসূত্র’ বলা যাবে না। ধ্বনি সূত্র কেবল একটি বিশেষ ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। এই বিশেষ প্রকার পরিবর্তনের ব্যাপারটি কোনো বিশেষ/নির্দিষ্ট ভাষা-সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য,-অন্যত্র নয়। সর্বকালের জন্য ধ্বনিসূত্র প্রযোজ্য নয়, কেবল, একটি বিশেষ কালের জন্যই তা প্রযোজ্য । শব্দের মধ্যে ধ্বনিগুলোর সুনির্দিষ্ট সংস্থানের ফলেই ধ্বনির পরিবর্তন ঘটে, অন্যথায় নাও ঘটতে পারে।

গ্রীমের সূত্র: তুলনামূলক পদ্ধতিতে ধ্বনিতাত্ত্বিক আলোচনায় রাস্ক ও গ্রীমের নাম করতেই হয়। রাস্কই প্রথম বিভিন্ন ভাষার তুলনামূলক আলোচনা করতে গিয়ে বলেন যে, মূল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার ব্যঞ্জণধ্বনি জর্মান ভাষায় পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তন সম্পর্কে পরিপূর্ণ সূত্র দিতে পারেননি। রাস্কের সূত্র আরো শৃঙ্খলাবদ্ধ করেন জ্যাকব গ্রীম এবং সূত্রাকারে প্রকাশ করেন। গ্রীমের প্রবর্তিত সূত্রই গ্রীমের সূত্র নামে পরিচিত।

ধ্বনি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তিনি দেখান যে, ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষার স্পৃষ্ট ব্যঞ্জনধ্বনিগুলো জার্মানিক শাখায় এসে পরিবর্তিত হয়েছে। তিনি ইন্দো-ইউরোপীয় শাখার প্রতিনিধি হিসেবে গ্রীক, আর জার্মান ভাষার প্রতিনিধি হিসেবে গথিক-কে গ্রহণ করে ধ্বনিগত পরিবর্তন নিম্নলিখিত ভাবে বর্ণনা করেন।

আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ এর আধুনিক ভাষাতত্ত¡ গ্রন্থ অবলম্বনে- ধ্বনি পরিবর্তনের সূত্র

ধ্বনিগত পরিবর্তন : বর্ণের রূপান্তর ও উদাহরণ

১.  বর্গের ১ম বর্ণ পরিবর্তিত হয়েছে বর্গীয় দ্বিতীয় বর্ণে — [অঘোষ স্পর্শধ্বনি > অঘোষ শ্বাসধ্বনি]

গ্রিক গথিকপরিবর্তন
PousFotusp → ph → ফ
TreisThreist → th → থ
KardiaKhairtok → kh → খ

২.   বর্গীয় তৃতীয় বর্ণ পরিবর্তিত হয়েছে ১ম বর্ণে — ঘোষ স্পর্শধ্বনি > অঘোষ স্পর্শধ্বনি]

গ্রিকগথিকপরিবর্তন
ClekaTaihumd → t → ত
GenosJunig → k → ক

৩.    বর্গীয় ২য় ধ্বনি পরিবর্তিত হয়েছে বর্গীয় ৩য় ধ্বনিতে

গ্রিকগথিকপরিবর্তন
PheroBoiranph → b → ফ→ ব
ThygaterDauhtarth → d → থ→ দ
ChortosGardsch → g → খ→ গ

গ্রিমের অভিজ্ঞান ও বর্তমান অভিজ্ঞান (ধ্বনি পরিবর্তনের সূত্র)

গ্রিমের অভিজ্ঞানধ্বনির ধরনবর্তমান অভিজ্ঞানধ্বনির ধরন
Tenues (প, ত, ক)অঘোষ স্পর্শধ্বনিঅঘোষ স্পর্শধ্বনি
Mediæ (ব, দ, গ)ঘোষ স্পর্শধ্বনিঘোষ স্পর্শধ্বনি
Aspiratae (ফ, থ, খ)অঘোষ উচ্ছ্বাসধ্বনিঅঘোষ উচ্ছ্বাসধ্বনি

গ্রিম এই পরিবর্তনগুলোকে একটি চক্রের মাধ্যমে নির্দেশ করেছেন।

ধ্বনি পরিবর্তনের দিকচিত্র — ধরা যাক —

এবং পরিবর্তনক্রম: T → A → M → T  (একটি ঘূর্ণায়মান চক্র) এটি নিচের চিত্রে বোঝানো যায়—

     A
   ↗   ↘
 M      T
   ↖   ↙

সারসংক্ষেপ

গ্রীমের সূত্র ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষার সঙ্গে জার্মান ভাষার ধ্বনি পরিবর্তনের প্রধান দিকগুলো নির্দেশ করলে ও তাঁর সূত্র পরিবর্তনের সমস্ত দিক ব্যাখ্যা করেত সমর্থ হয়নি। গ্রীমের সূত্রের এই অপূর্ণতা পরবর্তীকালের ভাষাতাত্ত্বিকদের সূত্র দ্বারা পূরণ হয়েছে। এদের মধ্যে গ্রাসম্যানের সূত্র ও ভার্ণানের সূত্র উল্লে­খযোগ্য। এজন্য এ সূত্রদ্বয়কে গ্রীমের সূত্রের পরিপূরক বলা হয়।

ধ্বনি পরিবর্তনের সূত্র (গ্রাসম্যানের সূত্র)

গ্রাসম্যানের সূত্র। ড়্রীমের সূত্রের ভিতরের ত্রুটি লক্ষ্য করে গ্রাসম্যান পরবর্তীকালে যে সূত্র প্রয়োগ করেন, তা গ্রাসম্যানের সূত্র নামে পরিচিত। তাঁর সূত্রটি হলো:

“ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষার কোনো পদে পাশাপাশী এই অক্ষরে মহাপ্রাণ ধ্বনি থাকলে তার মধ্যে একটি গ্রীক ও আর্য শাখায় (সংস্কৃত ও বৈদিক ভাষায়) অল্পপ্রাণ ধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়েছে।” যেমন-

মূল ভাষার ‘ভোধতি’ শব্দে ‘ভ’ ও ‘ধ’ পরপর দুটি মহাপ্রাণ ঘোষধ্বনি ছিল। তাই ‘ভ’ পরিবর্তিত হয়ে সংস্কৃতে ‘ব’ হয়ে গেছে। ভোধতি > বোধতি > বোধতি। শব্দটি পথিকে Buidan.. গ্রীমের সূত্রানুযায়ী সংস্কৃতে ‘ভোধতি’ হওয়ার কথা ছিল।

ভার্নারের সূত্র: গ্রীমের সূত্রের আরো কিছু ব্যতিক্রম ১৮৭৫ খ্রিঃ কার্ল ভার্ণার ব্যাখ্যা করেন। জার্মান এই ভাষাতত্ত্ববিদ শ্বাসাঘাত বৈচিত্র্য আলোচনা করে প্রমাণ করলেন যে, শব্দগুলোর উচ্চারণে যদি শ্বাসাঘাতের স্থান বদল হয়, তবে ঐ শব্দে গ্রীমের সূত্র অনুযায়ী পরিবর্তন হবে না। ভার্ণারের সূত্রটি হলো –

মূল ভাষার পদটি একাক্ষর না হলে ব্যঞ্জনধ্বনিটির অব্যবহিত পূর্ববর্তী অক্ষরে স্বর বা শ্বাসাঘাত না থাকলে বর্গের প্রথম ধ্বনি ও ‘স’ জার্মানিক শাখায় যথাক্রমে বর্গের তৃতীয় এবং জ (ত) ধ্বনিতে পরিণত হয়েছে।

মূল ইন্দো-ইউরোপীয় শব্দ Kmtom– কমতোম, সংস্কৃতে-শতম, গ্রীকে- Hekaton,, ল্যাটিনে Centum (কেনটাম) হয়েছে।

এখানে ‘ত’ অপরিবর্তিত আছে। কিন্তু গথিকে- Hund,, ইংরেজিতে Hundred-– (হানদ্রেদ) হয়েছে। এখানে ‘’ স্থানে ‘দ’ হয়েছে। গ্রীমের সূত্র অনুযায়ী ‘’-তে পরিণত হয়নি।

উষ্মধ্বনি (-ধ্বনি) জার্মান ভাষায় এই সূত্রানুসারে (ত) হওয়ার পর ইংরেজিতে ‘’-তে পরিবর্তিত হয়েছে।

Haza থেকে Hara (প্রাচীন ইং) → Hare.

হুমায়ুন আজাদের তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানে গ্রীমের সূত্র নিম্নরূপ-

১) প্রত্ন ইন্দো-ইউরোপীয় ঘোষ মহাপ্রাণ bh, dh, gh (ভ, ধ, য)
প্রত্ন জার্মানিতে যথাক্রমে ঘোষ ম্পর্শধ্বনি b, d, g (ব, দ, গ) হয়েছে অর্থাৎ ৪র্থ > ৩য় হয়েছে।

২) প্রত্ন ইন্দো-ইউরোপীয় ঘোষ স্পর্শধ্বনি b, d, g (ব, দ, গ) প্রতœ জার্মানীতে যথাক্রমে ( p, t, k ) অঘোষ স্পর্শধ্বনি হয়েছে। অর্থাৎ ৩য় > ১ম হয়েছে।
৩) প্রত্ন ইন্দো-ইউরোপীয় অঘোষ স্পর্শধ্বনি p, t, k প্রত্ন জার্মানিতে যথাক্রমে ( f, u, h ) অঘোষ শিসধ্বতি পরিণত হয়েছে।

এটি ঘটে যেন চক্রাকারে

                        মহাপ্রাণ / শ্বাসধ্বনি
           (Aspirated)
                 ▲
                 │
                 │
   ঘোষ স্পর্শধ্বনি (Voiced) ───► অঘোষ স্পর্শধ্বনি (Voiceless)
          (b, d, g)                    (p, t, k)
                 ▲                        │
                 │________________________│

৬। রামেশ্বর ‘শ’ তাঁর সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা গ্রন্থে গ্রীমের সূত্র –

১) ১ম > ২য় হয়েছে- অঘোষ অল্পপ্রাণ স্পর্শ > মহাপ্রাণ অঘোষ উষ্ম Pater > Fadar.
২) ৩য় > ১ম হয়েছে, deka > tiuhun
৩) ৪র্থ > ৩য়- ভ্রাতা brodor, bh > b

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *