মানবতাবাদ – ই নজরুলের বিদ্রোহী সত্তার মূল প্রেরণা

নজরুলের মানবতাবাদ-এর স্বরূপ

ভূমিকা: নতুন যুগের অগ্রপথিক তুর্যবাদক নজরুল ছিলেন যুগস্রষ্টা কবি। প্রচলিত রীতি ও বিধানকে পদদলিত করে নিপীড়িত মানুষের বন্ধন-মুক্তির জন্য তিনি গেয়েছেন মুক্তির গান। তাঁর কন্ঠেই প্রথম ধ্বনিত হয়েছে নিপীড়িত মানবাত্মার জয়গান। কবি মূলত মানবতাবাদের কবি । নজরুলের মানবতাবাদ নির্যাতিত মানুষের মুক্তির দলিল।

মানবতার কবি নজরুল

কবি নজরুল বিশ্বমানবতাবাদের কবি । তাই তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন-

বল বীর বল উন্নত মম শির

কবি নিপীড়িত মানবাত্মার মুক্তির জন্য লেখনী ধাবণ করেন। তিনি রাজভয়, সমাজভয়, ধর্মীয় বিধানের ভয় পরিহার করে দৃপ্ত তেজে মানব মহিমার বন্দনাগান গেয়েছেন।


কবি দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছেন-
বল বীর বল উন্নত মম শির ।
এভাবেই কবি বাংলা সাহিত্যে কাব্যের লালিত মধুর পেলবতাকে পরিহার করে আনলেন বিদ্রোহের বাণী। সমস্ত অন্যায়। অত্যাচার কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, রাজার বিরুদ্ধে, সমাজের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন। কবির এ বিদ্রোহ শুধু রাজা ও অত্যাচারীর বিরুদ্ধে নয়, মানবতার শত্রুর বিরুদ্ধেও ।

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান-মানুষকে বড় করে দেখেছেন বলেই তাঁর কাব্যে সংকীর্ণতা নেই। অন্ধ গোত্রপ্রীতি নেই ্ তিনি সকল মানুষের মুক্তির গান গেয়েছেন। অগ্নিবীণা কাব্যে কবির অসমপ্রদায়িক মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেছে। হিন্দু,মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এই পার্থক্যটা তাঁর কাছে বড় ছিল না। সকল সমপ্রদায়কেই তিনি অত্যন্ত আপনজন ভেবেছেন । সকল মানুষের আত্মমুক্তি ও সংস্কারমুক্তির কথা তাঁর কব্যে রয়েছে। হিন্দু-মুসলমান উভয়কে জাগাতে দু’ সমপ্রদায়ের ঐতিহ্যভিত্তিক কবিতা লিখেছেন। চেয়েছেন হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য। অগ্নিবীণা কাব্যে এমন দৃষ্টান্ত অনেক রয়েছে । হিন্দু ঐতিহ্যমূলক কবিতা ‘আগমনী’ ও রক্তাম্বর ধারিণি মা’ যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে ‘শাত-ইল- আরব’, রণভেরী, ‘মহররম’ ‘কামালপাশা’ ইত্যাদি মুসলমান ঐতিহ্যমূলক কবিতা।

নজরুলের মানবতাবাদ – অন্তরালের কথা


নজরুলের মানবতাবাদ মানুষের জন্যই। মানবতার পক্ষে সত্যকথা বলতে গিয়েই নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী হয়েছেন। তিনি আজীবন অন্যায়-অত্যাচার অকল্যাণ ও অশুভশক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। যেখানেই তিনি মানুষকে লাঞ্চিত হতে দেখেছেন। সেখানেই তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠ নির্ভীকতার সাথে গর্জে উছেছে।

কবি জানতেন পরাধীনতা মানেই মানবত্মার বন্ধন, তাই তিনি চেয়েছেন দেশমাতৃকার মুক্তি। পরাধীন জাতির জীবনে তিনি ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়ে জাতিকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে সচেতন করে একত্রিত হয়ে দেশ মাতৃকার বন্ধনমুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবান করেছেন । নজরুলের মানবতাবাদ দেশমাতৃকার মুক্তির সমান্তরাল।

কবির বিদ্রোহের প্রধান লক্ষ্যই ছিল পরাধীন জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করা, দাসত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করা, সমস্ত অন্যায়-অত্যাচার ও সাম্রাজ্যবাদী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জাগিয়ে তোলা। অগ্নিবীণা কাব্যের নানা কবিতায় তাঁর এই মানসচেতনা স্পষ্ট হয়ে আছে।

বিশ্বমানবতার কল্যাণে সংগ্রামরত কবি ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন-


যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না-
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।


অগ্নিবীণা নজরুলের শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ, এর মধ্যে দিয়ে কবি ন্যায়ের পক্ষে এবং বিশ্বমানবতার পক্ষে কথা বলেছেন। ধর্মের নামে মুক্তিহীন কুসংস্কার, শাসনের নামে শোষণ বঞ্চনা, দূর্বলের ওপর সবলের অন্যায়-অত্যাচার, একই জাতির মধ্যে সীমাহীন বর্ণবৈষম্য, মানবতার অপমান এবং সাম্রাজ্যবাদী শাসকের বিরুদ্ধে নজরুল ছিলেন আপোষহীন বিপ্লবী কবি । এ জন্যই তিনি বিদ্রোহী। অগ্নিবীণা কাব্যের সমস্ত বিদ্রোহের জন্য কবিকে জেল জুলুম এবং বহু নিপীড়ন- নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু কারাগারের অন্ধপ্রকোষ্ঠে বন্দী করেও কবির মানবতাবাদী চেতনাকে স্তব্ধ করা যায় নি। এখানেই নজরুলের মানবতাবাদের মূল কথা।

জন্মের পর থেকেই নজরুল দেখেছেন পরাধীন জাতি আর পরাধীন দেশ। দেখেছেন ঘরের মানুষকে পরের হাতে লাঞ্চিত হতে। দেখেছেন অধিকার বঞ্চিত মানুষের দুর্ভোগ দুর্দশা। ফলে সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। কবির বিদ্রোহের স্বরূপটাই ছিল মানবতার জন্যে সংগ্রাম।

নজরুল সবসময় চেয়েছেন মানুষের কল্যাণ। মানুষের কল্যাণের জন্য পুরাতন সবকিছুকেই কবি ধ্বংস করতে চেয়েছেন। ধ্বংসের ভিতরে তিনি নতুন সৃষ্টির সম্ভবনাকে দেখেছেন, যা মানুষের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। অকল্যাণকর পুরাতনের ধ্বংস দেখে কবি ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় সবাইকে জয়ধ্বনি করতে বলেছেন। কেননা –

ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? প্রলয় নূতন সৃজন বেদন।
আসছে নবীন জীবন হারা অসুন্দরের করতে ছেদন।


আর এ ধ্বংসই –
ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চিরসুন্দর।

‘আগমনী’ কবিতায় কবি দেবীকে সমস্ত অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে দশহাতে দশ অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবান করেছেন । কবি জানেন যে মানবতার জয় হবেই । কেননা – “শাশ্বত নহে দানব শক্তি”।

‘রক্তাম্বর ধারিণী মা’ কবিতায়ও কবি মানব কল্যাণের জন্য অসুন্দরের ধ্বংস কামনা করেছেন-


শ্বেত শতদল বাসিনী নয় আজ
রক্তাস্বর ধারিণী মা,
ধ্বংসের বুকে হাসুক মা তোর
সৃষ্টির নব পূর্ণিমা ।

নজরুলের মানবতাবাদ নজরুল-মানসের প্রতিবিম্ব। মানবতার জন্য কবি যেমন বিদ্রোহ করেছেন। তেমনি মানবতাকে মজবুত ও বিকশিত করার জন্য বিদ্রোহের পাশেই তিনি প্রেম- সৌন্দর্যের সমন্বয় করেছেন। প্রেম ও সৌন্দর্য ছাড়া মানবতার ভিত্তি মজবুত হয় না। তাই বিদ্রোহী কবিতায়ই কবি বলেছেন-


মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতুর্য।


নজরুল রোমান্টিক কবি। যুগধর্মের প্রয়োজনেই তিনি বিদ্রোহী হয়েছিলেন। মানুষকে তিনি ভালবাসতেন, তাই মানুষের মহত্তম বৃত্তি প্রেমকে তিনি আত্ম অনুভাবে দীপ্ত করে তুলেছেন তাঁর কাব্যে।

অগ্নিবীণার মূল সুর বিদ্রোহ। আর বিদ্রোহের প্রধান লক্ষ্য মানবতার জাগরণ। কবি সকল জাতির ঐতিহ্যকে সমন্বয় করে অত্যন্ত নৈপুণ্যের সাথে মানবতার জয়গান গেয়েছেন। ধর্মীয় হানাহানির ঊর্ধ্বে থেকে তিনি জাতি ধর্ম নির্বিশেষে পরাধীনতার বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াবার কথা বলেছেন।
পৃথিবীর সকল মানুষের প্রতি ছিল তাঁর দরদ, তাঁর বহু কবিতায় এ রকম দরদের চিত্র আছে। এ জন্যই কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্বমানবতার কবি। নজরুলের মানবতাবাদ তাঁর অন্যান্য কাব্যের মধ্যে সমানভাবে প্রতিফলিত।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন,

অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ সরকারি এম এম কলেজ, যশোর

সহায়ক গ্রন্থের তালিকা:

  1. আবু সাঈদ আইয়ুব। নজরুল-প্রতিভার স্বরূপ। ঢাকা: মুক্তধারা, ১৯৭২।
  2. মুহম্মদ আবদুল হাই। কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সাহিত্য। ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৭৪।
  3. ড. আনিসুজ্জামান। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ও নজরুল ইসলাম। ঢাকা: প্রগতি প্রকাশনী, ১৯৮৫।
  4. গৌরী মাইতি। নজরুল সাহিত্য: মানবতাবাদের দৃষ্টিতে। কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ১৯৯০।
  5. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। নজরুল: ধর্ম ও মানবতা। ঢাকা: নজরুল ইনস্টিটিউট, ১৯৯৯।
  6. নজরুল ইনস্টিটিউট। কাজী নজরুল ইসলাম: নির্বাচিত প্রবন্ধ। ঢাকা: নজরুল ইনস্টিটিউট, ২০০১।
  7. হুমায়ুন আজাদ। নজরুল ইসলাম: সাহিত্য, সমাজ, রাজনীতি। ঢাকা: Agamee Prakashani, ২০০২।
  8. আবদুল মান্নান সৈয়দ। বিদ্রোহী নজরুল। ঢাকা: অন্যপ্রকাশ, ২০০৫।
  9. রফিকুল ইসলাম। নজরুল: কবিতা ও দর্শন। ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০০৮।
  10. কুদরত-ই-খুদা। কাজী নজরুল ইসলামের মানবতাবাদ। ঢাকা: বিশ্বসাহিত্য ভবন, ২০১২।
  11. সৈয়দ আবুল মকসুদ। নজরুল ইসলাম: ধর্ম, সাম্য ও মানবতা। ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৫।
  12. কাজী রফিকুল ইসলাম। নজরুলের সাহিত্য ও মানবতাবাদী চেতনা। ঢাকা: নজরুল ইনস্টিটিউট, ২০১৮।

2 Responses

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *