আয়না’র নামকরণে আবুল মনসুর আহমদের সার্থকতা

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক …

আয়না’র নামকরণ

বিদগ্ধ সমাজ সচেতন শিল্পী আবুল মনসুর আহমদের আয়না গল্পগ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্পের ধারায় এক বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। সমকালীন সমাজ-বাস্তবতার নিপুন প্রয়োগে গ্রন্থটি আসলেই সমকালের আয়না। ধর্মীয় ভÐমী, পীরবাদের স্বরূপ, ধর্মের নামে মানুষ ঠকানো ইত্যাদি বিষয়গুলো লেখক অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে গ্রন্থের মধ্যে চিত্রিত করেছেন। গ্রন্থটির নামকরণ আয়না কতখানি তাৎপর্যপূর্ণ ও সার্থকতার দাবীদার তা বিচার করে দেখা যেতে পারে।

আবুল মনসুর আহমদ – আয়না
আয়না – আবুল মনসুর আহমদ

নাম ও নামকরণ কী ঃ কোনো কিছুর পরিচয় ও সনাক্তকরণের অনুষঙ্গে নাম প্রয়োজন। সেজন্য পৃথিবীতে নামবিহীন কোনো কিছুই পাওয়া যায় না। নাম অপরিহার্য বলেই হয়ত বাস্তবজীবনে নামকরণের ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব লক্ষণীয়। কারণ, নামে কাজ চলে যাওয়ার ব্যাপারটিকেই মুখ্য করে দেখা হয়। সেজন্য কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন হলেও অসংগত মনে না কেউ।

সাহিত্যে নামকরণ: বাস্তবজীবনের সাথে সাহিত্যের জগৎ কিছুটা ভিন্নতর, একথা মানতেই হবে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে শিল্পচেতনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিল্পসাহিত্যের নামকরণ একটি আর্ট। তাই সামঞ্জস্যহীন নাম সাহিত্যের শিল্পসাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সে-দিকটি খেয়াল রেখেই হয়ত মনীষী ক্যাভেন্ডিস বলেছেন – A beautiful name is batter than a lot of wealth. অর্থাৎ, প্রচুর অর্থসম্পদের চেয়েও একটি সুন্দর নাম শ্রেয়। সাহিত্যে নামকরণ একটি সচেতন শিল্পপ্রয়াস একথা মানতেই হয়।

সাহিত্যে নামকরণের রীতি ঃ পাশ্চাত্যের স্বনামধন্য সাহিত্য সমালোচক ই, এম, ফরস্টার সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণের রীতি সম্পর্কে চমৎকার আলোকপাত করেছেন। তাঁর মতে Ñসাহিত্যের নাম হবে গোটা রচনার অবয়ববিম্বিত একটি ক্ষুদ্র দর্পণ। তিনি নামকরণের ক্ষেত্রে নায়ক-নায়িকার নাম, ঘটনা সংঘটিত হবার স্থান, কালগত বৈশিষ্ট্য এবং সর্বোপরি রচনার বক্তব্যসারকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর বিচারে , বিষয়বক্তব্যকে ধারণ করলেই নামকরণ যৌক্তিকতা পায়। আসলে নামের মধ্যেই রিচনার শিল্প-সুষমা ফুটে ওঠে।

আয়না গল্পগ্রন্থের নামকরণে গৃহীত রীতি ঃ আয়না গল্পগ্রন্থের নামকরণের ক্ষেত্রে লেখক তাঁর অভিপ্রেত মূলভাবকে লক্ষ্য করেই নামকরণ করেছেন। এ নামকরণ কতটুকু সার্থক তা বিচার করে দেখা যেতে পারে।

আয়না গল্পগ্রন্থের নামকরণের সার্থকতা বিচার ঃ বিদগ্ধ সমাজ সচেতন শিল্পী আবুল মনসুর আহমদ তাঁর গল্পগ্রন্থের নাম দিয়েছেন আয়না। এ নামে কোনো গল্প অবশ্য গ্রন্থের মধ্যে নেই। সাহিত্যিকরা সাধারণত কোনো সংকলিত কাব্য/ ছোট গল্পের নামকরণের ক্ষেত্রে গ্রন্থের ভিতরের যে কোনো একটি শিরোনাম ব্যবহার করে থাকেন এবং গ্রন্থের বিষয়ভাবনা ও মূল উপজীব্য উক্ত শিরোনামকে ঘিরে আবর্তিত হয়। যেমন- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাগৈতিহাসিক কবি জীবনানন্দ দাশের বনলতাসেন কাব্য ইত্যাদি।

আবুল মনসুর আহমদ তাঁর আয়না গল্পগ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত বিভিন্ন গল্পের বিষয়ভাবনা ও মূল উপজীব্যের আলোকে প্রতীকী নামকরণ করেছেন। গ্রন্থে বর্ণিত গল্পগুলো মূলত সমকালীন সমাজের আয়না হিসেবে চিহ্নিত। গ্রন্থের বিভিন্ন গল্পের মধ্যে দিয়ে সমকালীন সমাজ বাস্তবতা প্রতিবিম্বিত হয়েছে। আয়না গল্প গ্রন্থের মুখবন্ধ রচনা করতে গিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন-

যে সমস্ত মানুষ হরেক রকমের মুখোশ পরে আমাদের সমাজে অবাধে বিচরণ করছে, আবুল মনসুরের আয়নার ভিতরে তাদের স্বরূপ মূর্তি বন্য ভীষণতা নিয়ে ফুটে উঠেছে। মানুষের মুখোশ পরা এই বহুরূপী বন মানুষগুলোর সবাইকে মন্দিরে, মসজিদে, বক্ততার মঞ্চে, পলিটিক্সের আখড়ায়, সাহিত্য -সমাজে যেন বহুবার দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।

আয়না গল্পগ্রন্থের বিভিন্ন গল্পের মধ্যে সত্যিই সমাজের বিচিত্র ধরনের মানুষের কথাই আছে।

হুজুর কেবলা গল্পের কথা ধরা যাক। এ গল্পের কাহিনি গড়ে উঠেছে এমদাদ নামের এক নাস্তিকের পীরভক্তিকে কেন্দ্র করে। ধর্মের প্রতি পরিপূর্ণ মনোনিবেশের মানসে এমদাদ এক পীর সাহেবের কাছে যায়। কিন্তু পীরের কার্যকলাপ এমদাদের মনে সন্দেহের জন্ম দেয়। পীর অদ্ভূত কেরামতির নামে গ্রামবাসীকে বোকা বানিয়ে এক মুরিদের যুবতী স্ত্রীকে নিজের ৪র্থ বিবিতে পরিণত করে।

এমদাদের কাছে পীরের মুখোশ খসে গিয়ে আসল চেহারা ধরা পড়ে। এমদাদ প্রতিবাদ করে। কিন্তু তারা এতই শক্তিশালী যে এমদাদকেই তারা গ্রাম থেকে বের করে দেয়। পীর সাহেবের সকল অপকর্মের সহযোগী সুফী সাহেব। ভন্ডামি, মিথ্যাবলা, ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করা, অন্যকে প্রতারিত করা ইত্যাদি সকল অপকর্ম তাদের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সুফি সাহেবের সাহায্যেই পীর সাহেব অসহায় কলিমনকে বিয়ে করে। সমাজের তথাকথিত এ রকম মুখোশধারী ভন্ড মৌলবীদের প্রতিচ্ছবিই প্রতিবিম্বিত হয়েছে হুজুর কেবলা গল্পে।

গো-দেওতা কা দেশ গল্পে পশু বাঁচানোর নামে মানুষ নামের পশুরা কীভাবে মানুষ হত্যা করেছে তা নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়েছে। ইংরেজ তাড়াতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। কিন্তু দেখা গেছে এ দুই স¤প্রদায়ের মধ্যে সব সময় সামন্যি বিষয় নিয়ে কলহ। এ কলহ অনেক সময় দাঙ্গা পর্যন্তপৌছেঁছে। ধর্মীয় কলহ বিশেষভাবে এ ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে। এ দাঙ্গার পেছনে ইংরেজ সরকার সব সময় ইন্ধন যুগিয়েছে। একপাল গরু-গাভির সংলাপের মধ্যে দিয়ে হিন্দু-মুসলমানের দ্ব›েদ্বর চিত্র চিত্রায়িত হয়েছে।

নায়েবে নবী গল্পের মধ্যে অর্থলোভী ভন্ড মাওলানাদের কবলে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন কীভাবে দুর্বিসহ হয়ে ওঠে তারই ছবি অঙ্কিত হয়েছে। গরীবুল­াহ সাহেব ও সুধারামী সাহেব দু’জনই ভন্ড ও অর্থলোভী। মৃত ব্যক্তির জানাযা পড়ানোর সময় সিনা বরাবর দাঁড়াতে হবে, না মাথা বরাবর দাঁড়াতে হবেÑ এ নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা তর্কে লিপ্ত হয়েছে। শেষে এক মাতব্বর শ্রেনীর লোকের মধ্যস্থতায় অর্থ সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়ার কথা বলে নিরস্থ করা হয় দুজনকে।

ধর্মরাজ্য গল্পের মধ্যেও ধর্মীয় আচার-আচারণ নিয়ে দাঙ্গা এবং দাঙ্গায় ইংরেজদের ইন্ধন যোগানোর ছবি অঙ্কিত হয়েছে। মানুষ যে অনেক সময় মনুষ্যত্বের চেয়ে ধর্মীয় আচার- আচারণকে বড় করে দেখে, লেখক সে বিষয় নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন। হিন্দু-মুসলমান যখন মসজিদ মন্দিরের সামনে বাদ্যযন্ত্র ও আযান দেওয়া নিয়ে দাঙ্গায় লিপ্ত, তখন ইংরেজ সরকার মধ্যস্থতা করে।

তাদের সিদ্ধান্তহলো যেখানে মসজিদ বেশি সেখানে পুজোর বাদ্য চলবে না। যখন নামাযের সময় নয়, তখন হিন্দুরা পুজো করবে। আর যেখানে মন্দির বেশি, সেখানে মসজিদের সামনে বাদ্য বাজবে। যখন পুজোর সময় নয়, তখন সেখানকার মসজিদে আযান চলবে। এরপর দেখা গেল কোলকাতার সমস্ত ঘরবাড়ি হয় মসজিদে, না হয় মন্দিরে পরিণত হলো। আর সবাই কাজকর্ম ও খাওয়া-দাওয়া ফেলে পুজো ও নামাযে লিপ্ত হয়।

রান্না ঘরও ধর্মশালায় রূপান্তরিত হয়, ফলে মানুষ না খেয়ে মারা গেল। মরা পচাঁ হিন্দু মৃতদেহগুলোর বুকের উপর আবিবের অক্ষরে লেখা আর্যবীর , আর মুসলমানদের বুকের উপর লেখা শহীদ। এভাবে ব্যঙ্গের মধ্যে দিয়ে লেখক তৎকালীন সমাজ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি আমাদেরকে দেখাতে চেয়েছেন।

মুজাহেদিন গল্পেও ভন্ড মৌলবীদের ভন্ডামির চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। এই মৌলবী এত নীচ, কুচক্রী যে, সামান্য স্বার্থ সিদ্ধির জন্য হানাফী ও মোহাম্মদী স¤প্রদায়ের মাঝে দ্ব›দ্ব সৃষ্টি করে। এখানে আরবি শিক্ষাপ্রীতিকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে। আরবি জানা না থাকলে ইমাম মেহেদী ও খানে দজ্জাল Ñ এ দুজনকে সনাক্ত করা যাবে না। কেননা, আরবি ভাষাতেই দজ্জালের কপালে কাফের এবং ইমাম মেহেদীর কপালে মোমিন লেখা থাকবে। নিজেদের মধ্যে, স্বধর্ম অবলম্বীদের মধ্যে হানাহানী খুন খারাবী বাঁধিয়ে দিয়ে মুজাহিদরা কর্তব্য পালন করে।

লিডরে কত্তম গল্পের মধ্যেও এ রকম এক ভন্ড মাওলানার পরিচয় পাওয়া যায়, যে নিজেকে মুসলমান জাতির ত্রাণকর্তা বলে নিজেকে ঘোষণা দেয়। আসলে সে ভন্ড, ধড়িবাজ, অর্থলোভী ছাড়া আর কিছুই নয়। ধর্ম ব্যবসার আধুনিক রূপকারদের চরিত্রও এখানে অঙ্কিত হয়েছে। ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়, মিথ্যা সাংবাদিকতা, তথাকথিত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের অকৃতজ্ঞতা, মাযহাবী কোন্দল লাগাবার চক্রান্তএবং আঞ্জুমানের নামে রিলিফ ফান্ড খুলে নিজের জন্য টাকা সংগ্রহ ইত্যাদি বিষয় ব্যঙ্গের মাধ্যমে অত্যন্তনিপুণতার সাথে অঙ্কিত হয়েছে।

বিদ্রোহী সংঘ গল্পে আফতাব চরিত্রটির মধ্যে দিয়ে তৎকালীন সুবিধাভোগী মানুষের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যাদের কথার সাথে কাজের কোনো মিল নেই। শুধু আফতাব নয় ব্রাদার-ইন-ল সংগঠনের সকল সদস্যদের মধ্যেও একই চিত্র ফুটে উঠেছে। এরা সবাই সুবিধাবাদী বাঙালী, এরা মুখেই শুধু ভারতবর্ষের স্বাধীনতার কথা বলে, দেশ শত্র“মুক্ত করার কথা বলে, দেশের উন্নতির কথা বলে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এরা ইংরেজদেরই দালাল।

লেখক এমনি আয়না সৃষ্টি করেছেন, যার মধ্যে শুধু মানুষের বাইরের ছবি নয়, তাতে মানুষের অন্তরের ভিতরের ছবিও ধরা পড়েছে। আয়না গল্প গ্রন্থের বিভিন্ন গল্পের মধ্যে দিয়ে লেখক সমকালীন সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জীবনের নানা অসঙ্গতিকে আমাদের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন। গল্পগুলোর বিষয় ভাবনা থেকে লেখকের ব্যঙ্গের বিষয়ের একটা তালিকা সহজে করা যায়।

স্বাধীনতার নামে নিজ স্বার্থ অন্বেষণ, বাইরে বিদ্রোহী ভেতরে ইংরেজ ভক্ত, বিদেশী শাসকপ্রীতি, ভন্ড পীর-মোল­াদের বিবাহপ্রীতি, মোল­াদের ভোজনপ্রীতি, মাযহাবী বিরোধী, বাহাসের অসারতা, সা¤প্রদায়িক দাঙ্গাকারী, ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে কলহকারী, মৌলবীদের মধ্যে অশোভন প্রতিদ্ব›িদ্বতা ও সংঘর্ষ, অনাবশ্যক আরবিপ্রীতি, শিক্ষার আধুনিকতা বর্জন, ধর্মীয় পত্রিকা ব্যবসা, আঞ্জুমান জাতীয় সেবা প্রতিষ্ঠান নিয়ে ব্যবসা, মাওলানাদের ভাষা ব্যবহার, মুসলমানদের কাবুলপ্রীতি ইত্যাদি নানা সমাজ বাস্তবতা আয়না’য় প্রতিবিম্বিত হতে দেখা যায়। লেখক সমকালীন ছবি দেখানোর জন্যই একটা আয়নার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। আয়না গল্পগ্রন্থটি সে রকম আয়না হিসেবেই প্রতিভাত হয়। তাই বলা যায় ‘আয়না’ নামকরণ যথাযথ ও সফল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *