নীলদর্পণ নাটকের বিখ্যাত সংলাপ ও তার ব্যাখ্যা:


ভূমিকা
নীলদর্পণ নাটক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক প্রতিবাদী শিল্পরূপ। উনিশ শতকের সমাজবাস্তবতায় নীলদর্পণ নাটক কৃষকজীবনের যন্ত্রণা ও শোষণের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। নীলকরদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক বিবেক জাগ্রত করতে নীলদর্পণ নাটক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাস্তব ঘটনার আলোকে রচিত নীলদর্পণ নাটক কেবল সাহিত্য নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল। গ্রামীণ জীবনের কান্না, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ নীলদর্পণ নাটক–এ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে নীলদর্পণ নাটক আজও প্রাসঙ্গিক। শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে নীলদর্পণ নাটক। নাট্যগঠনের বাস্তবতা ও আবেগের সমন্বয়ে নীলদর্পণ নাটক পাঠককে নাড়া দেয়। সমাজসংস্কারের আহ্বান হিসেবে নীলদর্পণ নাটক বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। তাই বাংলা নাট্যধারায় নীলদর্পণ নাটক একটি অনন্য সৃষ্টি।
নীলদর্পণ নাটক বিখ্যাত সংলাপ ও ব্যাখ্যা:
১) বড় বাবু আপনি পালতি পাত্তেন, সমিন্দির কান দুটো মুই ছিঁড়ে আনতান, খোদার জীব পরাণে মাত্তাম না।
৫ম অঙ্ক, ২য় গর্ভাঙ্ক।
তোরাপ বলে নবীন মাধবকে পুরোহিত মুখে রক্ত দেখে তোরাপকে প্রশ্ন করলে তোরাপ উক্তিটি করে। ক্ষেত্রমণিকে উদ্ধারে গেলে নবীনমাধব আই আই উডের আঘাতে গুরুতর আহত হলে তোরাপ সাহেবের কান কামড়ে ছিঁড়ে দিয়ে আসে।
২) যদি নিতান্তই টাকার সুযোগ করতে না পারি তবে কন্য তোমার অলঙ্কার গ্রহণ করিব।
৩য় অঙ্ক ২য় গর্ভাঙ্ক।
উক্তিটি নবীন মাধব করে, স্ত্রী সৈরিন্ধ্রীর কাছে। বাবা গোলক বসুর মাধবের চোখে জল দেখে স্ত্রী- নিজের সর্বস্ব অলংকার দিয়ে শ্বশুরকে মুক্ত করতে বলে। স্ত্রীর প্রতি মহানুভূতিশীল হয়ে পরম মমতায় নবীন মাধব উক্তিটি বলে।
৩) এমন মিথ্যা মোকদ্দমায় যদি মেয়াদ হয়, তবে বুঝিলাম যে এদেশে প্রলয় উপস্থিত। ৩য় অঙ্ক, ২য় গর্ভাঙ্ক।
নবীন মাধব বাবা গোলক বসুর জেলে যাওয়া প্রসঙ্গে স্ত্রীর কাছে এ কথা বলে।
৪) মোরে এমন কথা বল না, মুই পরান দিতি পারবো ধর্ম দিতি পারবো না, মোরে কেটে কুচি কুচি কর, মোরে পুড়িয়ে ফেল, ভাসিয়ে দাও, পুঁতে রাখ, মুই পরপুরুষ ছুঁতি পারবো। ৩য় অঙ্ক, ৩য় গর্ভাঙ্ক।
রেবতীর মেয়ে ক্ষেত্রমণি এ উক্তি করে। উড সাহেবের কাছে নিজেকে সমর্পণ না করার কথা জানিয়ে এ আকুতিভরা উক্তিটি করেছিল।
৫) লাঙ্গল গোরুসব বিক্রি করে ব্যবসা কর তাতে যে আয় হবে সুখে ভোগ করা যাবে, এ ঘাতনা আর মৃত্যু সহ্য হয় না।
৩য় অঙ্ক, ২য় গর্ভাঙ্ক।
নবীন মাধবের মা সাবিত্রী বলেছে। স নানান সংকটের আবর্তে জর্জরিত তারা, সে প্রসঙ্গে মা ছেলে আলোচনা করার সময় সাবিত্রী বলে। গোলক বসু জেলে, জমি সব নীলকরেরা নিচ্ছে, নীলের দাম পাচ্ছে না, সাধারণ মানুষ না খেয়ে মরছে। এ রকম অবস্থায় তারা এ রকম সিদ্ধান্ত নেয়।
(৬) আমরা স্বভাবত মন্দ নই, নীলকম্মে আমাদের মন্দ মেজাজ বৃদ্ধি হইয়াছে। একজন মানুষকে মারিতে মনে দুঃখ হইত। এখন দশজন মেয়ে মানুষকে নিদ্দন করিয়া রামকান্ত পেটা করতে পারি।
৩য় অঙ্ক, ৩য় গর্ভাঙ্ক। নীলকর রোগ সাহেবের উক্তি। শুনিয়েছে ক্ষেত্রমনিকে।
নীলকরেরাও মানুষ, তবে নীলের কারণে মনুষ্যত্ব,দয়া , মায়া বিলুপ্ত হয়েছে। ক্ষেত্রমনি মরতে প্রস্তুত, তবুও সতীত্ব বিসর্জন দেবে না। রোগ সাহেব তখন শাসানোর সুরে এ কথা বলে।
(৭) পোড়া কপাল বিবির পোশাকের- চট পরে থাকি সেও ভাল তবুও স্যান বিবির পোশাক পরতি না হয়। ৩য় অঙ্কের ৩য় গর্ভাঙ্ক।
উক্তিটি ক্ষেত্রমনির। রোগ সাহেবের কামরায় অবস্থান-কালে ক্ষেত্রমনিকে বিছানায় আনার জন্য প্রলোভন দেখাতে গিয়ে বিবির পোশাকের প্রসঙ্গ আসলে ক্ষেত্রমনি একথা বলে।
ক্ষেত্রমনি কুপ্রস্তাবে রাজি না হলে পদী ময়রানী তাকে নানা ছলে বুঝাতে থাকে। এক পর্যায়ে বলে- বিছানায় পেলে সাহেব তাকে একটা বিবির পোশাক দেবে। ক্ষেত্রমনি কোনো আকর্ষণ বোধ না করে বরং উল্টো করে বলে।
(৮) ও সাহেব মুই তোমার মা, মোরে ন্যাংটো করো না, তুমি মোর ছেলে, মোর কাপড় ছেড়ে দাও।
৩য় অঙ্ক, ৩য় গর্ভাঙ্ক।
ক্ষেত্রমনির উক্তি। জীবন বাজি রেখেও রোগ সাহেবকে নিবৃত্ত করতে না পেরে আর্তনাদের সুরে সাহেবের কাছে কৃপা প্রার্থনা করে।
নিষ্ঠুর সাহেব দয়া তো করেই না, বরং ব্যঙ্গ করে বলে, সে ক্ষেত্রমনির ছেলের বাপ হতে চাই।
নীলদর্পণ নাটক
(৯) তুই আমাকেও কেন তলব দিলিনে আমি পতি পুত্রের সঙ্গে জেলায় য্যেতাম, এ শ্মশানে বাস অপেক্ষাা আমার সে যে ছিল ভাল।
৩য় অঙ্কের ৪র্থ গর্ভাঙ্ক।
সাবিত্রীর উক্তি। গৃহে প্রবেশ করে যখন জানতে পারলেন যে তার স্বামী জেলে, আর তখনই তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এ কথা বলেন। হাকিম অর্থাৎ বিচারককে উদ্দেশ করে চলে।
(১০) শুনলেম সউরে মেয়েগুলো মিনসেগার ভাড়া করে রাখে, আর মা বাপিরি না খাতি দিয়ে মারে, এ বউডোরে দেখে জানলাম, এডা কেবল গুজব কথা।
৫ম অঙ্ক, ১ম গর্ভাঙ্ক।
একজন গোপ বলেছে গোপীনাথ দাসের কাছে। একজন গোপের শহুরে মেয়ে সম্পর্কে ভুল ধারনা ছিল,কিন্তু বসু পরিবারের ছোট বউ সরলতাকে দেখে তার ভুল ভাঙে। এ কথাটাই দেওয়ান গোপীনাথ দাসকে বুঝানো প্রসঙ্গে উক্তিটি করে।
নীলদর্পণ নাটক
- ১ম অঙ্কে-৪ গর্ভাঙ্ক
- ২য় অঙ্কে-৩য় গর্ভাঙ্ক
- ৩য় অঙ্কে-৪ গর্ভাঙ্ক
- ৪র্থ অঙ্কে-৩য় গর্ভাঙ্ক
- ৫ম অঙ্কে-৪র্থ গর্ভাঙ্ক।
(১১) হুজুর আমি আপনাকে ৫০ টাকা সেলামি দিতেছি, এ বৎসর এ স্থানটায় নীল করবেন না। ৫ম অঙ্ক হয় গর্ভাঙ্ক। নবীন মাধবের ভক্তি। বাবার শ্রাদ্ধের জন্য পুষ্করিনীর পাড়ে নীল চাষ বন্ধ করার অনুরোধ করতে গিয়ে সাহেবকে এ কথা বলে।
বাবার আত্মহত্যার পর বাবার আত্মার শান্তি কামনায় শ্রাদ্ধ করার জন্য পুকুর পাড়ে এ বছরের জন্য নীলচাষ বন্ধ করতে সাহেবকে অনুরোধ করতে যায়। এতে নবীন মাধবের অসহায়ত্ব প্রকাশ পেয়েছে।
(১২) প্রসব বেদনার মত আর বেদনা নাই, কিন্তু যে অমূল্য রতœ প্রসব করিয়াছি মুখ দেখে সব দুঃখ গের।
৫ম অঙ্ক ২য় গর্ভাঙ্ক।নীলদর্পণ নাটক
সন্তান শোকাতুরা সাবিত্রীর উক্তি। পুত্রের মৃত্যুকে পরখ করে মায়ের মনে পড়ে যায় সন্তান প্রসবের যে বেদনাঘন মুহূর্তটিকে, আর সে প্রসঙ্গে উক্তিটি করে।
(১৩) তোমার কি লোকাতীত মহিমা। তুমি বিধবাকে মধবা কর, বিদেশীকে দেশে আন, তোমার স্পর্শে কারাবাসীদের শৃঙ্খল ছেদ হয়।
৫ম অঙ্ক ৪র্থ গর্ভাঙ্ক।নীলদর্পণ নাটক
বিন্দু মাধবের স্ত্রী সরলতার ভাবনা। বিধাতা বা মৃত্যুর মহিম এমনই কেউ কাছ থেকে দুরে যায়, আবার কেউ দূর থেকে কাছে আসে। এ রকম অলৌকিক প্রসঙ্গে এ কথা বলেছে।
(১৪) ঠাকুরপো আমি সহমরণে যাই, আমারে বাধা দিও না। ৫ম অঙ্ক ৪র্থ গর্ভাঙ্ক। স্বামী শোকাতুরা সৈরিন্ধ্রী
যন্ত্রনা দমিত করতে না পেরে সান্তনা দানকারী বিন্দু মাধবকে এ কথা বলে।
(১৫) ভাতারই যেন জানতি পারলো না- ও পরের দেবতা তো জান্তি পারবে, দেবতার চকি তো ধুলো দিতি পাবো না। ৩য় অঙ্কের ৩য় গর্ভাঙ্ক।নীলদর্পণ নাটক
উক্তিটি ক্ষেত্রমনির। রোগ সাহেবের সাথে দৈহিক মিলনে রাজি করতে পদীময়রানী ক্ষেত্রমনিকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। এক সময় কথা প্রসঙ্গে জাষায় যে, একথা তার স্বামী জানতে পারবে না। এ কথার উত্তরে ক্ষেত্রমনি এ কথা বলে।
(১৬) আমি তখনি বলেছিলাম, কর্ত্তামহোদয়ে, আর এদেশে থাকা নয়, তা আপনি শুনিলেন না। কাঙ্গালের কথা বাসি হলে খাচে।
১ম অঙ্ক ১ম গর্ভাঙ্ক।নীলদর্পণ নাটক
সাধুচরণ গোলক বসুকে বলে।
সাধুচরণ নীলচাষের কারনে কর্তামহাশয়কে দেশ ছেড়ে চলে যাবার কথা বলে। গোলক বসু শোনে নি। এক পর্যায়ে গোলক বসুর মধ্যেও এ বোধের উদয় হলে সাধুচরণ এ কথা বলে ওঠে।
(১৭) বল কি বাপু আমার সোনার স্বরপুর কিছুরি ফ্লেশ নাই। ক্ষেতের চাল, ক্ষেতের ডাল, ক্ষেত্রের তেল, ক্ষেতের গুড়, বাগানের তরকারি পুকুরের মাছ এমন সুখের বাস ছাড়তে কার হৃদয় না বিদীর্ণ হয় ? ১ম অঙ্ক ১ম গর্ভাঙ্ক। গোলকবসুর কথা। সাধুচরণ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলেছিল। গোলকবসু কেন যায় নি, তা বলতে গিয়ে এ কথা বলে।
(১৮) কর্ত্তামহাশয় আপনিও দেশের মায়অ ত্যাগ করুন। গতবারে আপনার ধান গিয়েছে, এই বারে মান যাবে। ১ম অঙ্ক ১ম গর্ভাঙ্ক।
নীলকরদের অত্যাচারে দেশের মানুষ জর্জরিত। এমনই মুহূর্তে গোলকবসুকে সতর্ক করে সাধুচরণ এ উক্তিটি করে।
(১৯) আমার গত সনের ৫০ বিঘা নীলের দাস চুকাইয়া না দিলে এ বৎসর এ বিঘাও নীল করিব না, এতে প্রাণ পর্যন্ত পণ, বাড়ি ফি ছার।
১ম অঙ্ক ১ম গর্ভাঙ্ক।নীলদর্পণ নাটক
সাধুচরণ নবীন মাধবের সাহসিকতার বিষয়টি তুলে ধরতে এ উক্তি করে।
গত বছরের ৫০ বিঘা নীলের টাকা না পাওয়াতে এবার জমিতে আমিন খালাসিরা গেলে তাড়িয়ে দেয়, নীলকর তার ঔদ্ধত্র দেখে মিষ্মিত হয় এবং নবীন মাধবকে জানিয়ে দেয় যে চিহিৃত জমিতে নীলচাষ না করলে তাদের বাড়ি ভেঙ্গে বেত্রবতী নদীর জলে ফেলে দেবে এবং নবীন মাধবকে গুদামে ভরে রাখবে। তখন প্রতিবাদী যুবক নবীন মাধব এ উক্তি করে।
(২০) এমন সুখের বাস ছাড়তে কার হৃদয় না বিদীর্ণ হয় ? ১ম অঙ্ক ১ম গর্ভাঙ্ক।
চৌদ্দপুরুষের মুখের বসতভিটা সহজে ত্যাগ করে যাওয়া যায় না, স্বরপুরের গোলকবসু সাধুচরণের গ্রাম ত্যাগ করার কথার প্রতি উত্তরে এ কথা বলে।
(২১) দেড়খানা লাঙলে নয় বিঘা নীল দিতে হলে, হাঁড়ি সিকেয় উঠবে।
১ম অঙ্ক ১ম গর্ভাঙ্ক।নীলদর্পণ নাটক সাধুচরণ নীলচাষের ফলে তার যে শোচনীয় অবস্থা তা বলতে গিয়ে এ উক্তি করে।
(২২) পরমেশ্বর এ ভিটায় স্নান আহার করিতে দেন, এমত বোধ হয় না।
সাত পুরুষের ভিটার গোলকবসুর সুখের বাস। কিন্তু নীলকরদের অত্যাচারে দিশেহারা, ৬০ বিঘা নীল চাষ করতে হবে, পুকুর পাড়ে নীল হবে, মেয়েরা পুকুরে যেতে পারবে না, বাড়ি বেত্রবতী নদীর জলে ভাসয়ে দেবে, নবীনকে জেলে দেবে এমনই হালচাল, এমন সময় আদুরী স্নান করে খাওয়ার কথা বললে গোলকবসু ভাবে হয়তো এ ভিটায় বসে আহার করার সুযোগ আর তাদের থাকবে না।
(২৩) বেটা বেন পাদরি হয়ে রয়েছে।
১ম অঙ্ক ৩য় গর্ভাঙ্ক।নীলদর্পণ নাটক
কৃষকের বিপদে আপদে নবীনমাধবের সহানুভূতির বিষয়টি ক্ষেভের সাথে নীলকরের দেওয়ান গোপীনাথ এ কথা বলেছে।
নীলের বিরুদ্ধে নবীনই একমাত্র প্রতিবাদী, ৫০ বিঘার টাকা না দিলে এবার নীল করবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়। সাধু ও রাইচরনকে ফিরিয়ে আনে, ক্ষেত্রমনিকে উদ্ধার করেছে, পলাশপুরে নীলকরেরা যে আগুন দিয়েছে তা নীবনই সবাইকে জানিয়ে দেয়। সে উকিল মোক্তারকে এমন পরামর্শ দেয় যে, হাকিমের রায় পাল্টে যায়, এরই চেষ্টায় সাবেক দেওয়ানের দু বছর জেল হয়। কৃষকদের উপকার করা তার ব্রত। নীলকরদের কাছে আতঙ্ক। তাই গোপীনাথ ক্ষেভের সাথে উক্তি করে।
(২৪) পোড়া কপাল টাকার। ধর্ম কি ব্যাচবার জিনিস।
১ম অঙ্ক ৪র্থ গর্ভাঙ্ক।
পদী ময়রানী রোগ সাহেবের হয়ে ক্ষেত্রমনিকে যে কুসিত প্রস্তাব দিয়েছে, যে প্রসঙ্গে ক্ষেত্রমনির মা রেবতী এ কথা বলে।
(২৫) ম্যারে ক্যান ফ্যালায় না, মুই নেমোখ্যারামি কত্তি পারবো না। ২য় অঙ্ক ১ম গর্ভাঙ্ক।নীলদর্পণ নাটক
দরিদ্র কৃষক বসু পরিবারের অনুগত তোরাপ জীবন দেবে, তবু পরোপকারী নির্দোষ নিরীহ গোলক বসুর নামে মিথ্যে সাক্ষ্য দিতে পারবে না সে প্রসঙ্গে এ উক্তি করে।
(২৬) আমি এমন নির্দ্দয় দস্যু হইলাম। আমি বালিকাকে বঞ্চিত করিব ? জীবন থাকিতে হইবে না নরাধম নিষ্ঠুর নীলকরও এমন কর্ম করিতে পারে না।
৩য় অঙ্ক ২য় গর্ভাঙ্ক।নীলদর্পণ নাটক
গোলক বসুর মামলার খরচের জন্য সৈরিন্ধ্রী নিজের এবং ছোট জা মরল্যার অলংকার বিক্রির প্রস্তাব দিলে নবীনমাধব এ কথা বলে।
(২৭) বড়বাবু পরের জাত, কি কলাম, কেন এনেলাপ, বড় সাধে সাদ দেবে ভেবেলাম। ৩য় অঙ্ক ২য় গর্ভাঙ্ক।
বিবাহিত কন্যা রেবতী নবীনমাধবের কাছে এসে কান্নাকাটি করে।
(২৮) এই আইনে কত ব্যক্তি বিনাকারাণে কারাগারে ক্রন্দন করিতেছে তাহাদের স্ত্রী পুুত্রের দুঃখ দেখিলে বক্ষঃ বিদীন হয়। ৩য় অঙ্ক ২য় গর্ভাঙ্ক।
কৃষকদের অত্যাচারের জন্য নীলকরদের অনুকূলে ইংরেজরা যে আইন করেছে, তা মূলত বেআইনি, এ বিষয়টি অত্যন্ত গভীর বেদনার সাথে নবীন মাধব ব্যক্ত করেছে। এই আইন নামক বেআইনীর জোরেই গোলক বসু মিথ্যা মামলায় জেল হাজতে যায়।
(২৯) ও সাহেব তুমি মোর বাবা, মোরে ছেড়ে দাও।
নীলদর্পণ নাটক ৩য় অঙ্ক ৩য় গর্ভাঙ্ক। ক্ষেত্রমণি রোগ সাহেবকে বলে।
(৩০) নীরব, শীর্ণ কলেবর, স্পন্দহীন মৃতকপোতবৎ কারাগাত্ত¡র পিঞ্জরে পতিত আছেন।
৪র্থ অঙ্ক ২য় গর্ভাঙ্ক।
গোলকবসুকে মিথ্যা ফৌজদারিতে জড়িয়ে জেল হাজতে দিলে তার যে বেদনাদায় অবস্থা হয়েছিল, তা বোঝাতে বিন্দুমাধব এ রকম মন্তব্য করে। জামিন না হলে গোলকবসু মাথা হেট করে কাঁদতে থাকে, চারদিন খায় না, মৃতপ্রায় কবুতরের মতো খাঁচার মধ্যে নিথর।
(৩১) পিতার উদ্বন্ধনে মৃত্যু হইয়াছে/পিতা আমাদের মায়া একেবারে ত্যাগ করিলেন ?
৪র্থ অঙ্ক ৩য় দৃশ্য।
মিথ্যা মামলায় জামিন না হওয়ার লজ্জা ওকষ্ট সহ্য করতে না পেরে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে, কিন্দু মাধব আহাজারি করতে গিয়ে এ কথা বলে।
(৩২) এক ঝাঁড়ের বাঁশ বটে কোন খানায় দূর্গা ঠাকুরুনের কাঠাম, কোন ঠাকুরনের কাঠাম, কোন খানায় হাড়ির ঝুড়ি।
৪র্থ অঙ্ক ৩য় গর্ভাঙ্ক।
ইংরেজ পাদরি ও ইংরেজ নীলকরের আচরণগত পার্থক্যর বিষয়টি তুলে ধরতে ডেপুটি ইনসপেকটর ইন্দ্রাবাদের জেলখানায় পন্ডিত, ডাক্তার, বিন্দু মাধবের সামনে বলে। গোলক বসুর ঝুলন্তদেহ সামনে করে নিয়ে। নীলকর দেখলে গ্রামের মানুষ দৌড় দেয়, পাদরি দেখলে শ্রদ্ধায় কাছে আসে।
নীলদর্পণ নাটক:
(১) দেড়খানা লাঙ্গল ৯ বিঘা জমিতে নীল চাষ সাধুচরণ। সাধুচরণের মোট আবাদি জমি ২০ বিঘা।
(২) সাঁপোলতলার ৫ কুড়ো ভূঁই যদি নীলি গেল তবে মাগ ছ্যালেরে খাওয়ার কি। কাঁদাকাটি কাব্যে দেখবো যদি
না ছাড়ে তবে মোরা কাযিই দ্যাশ ছেড়ে যাব রাইচরণ।
(৩) নাট্যকারের মূল অভিপ্রায় নীলকর বিষধর দংশন কাতর প্রজাবর্গের দুঃখের কাহিনী পরিস্ফুট করা।
(৪) বড়বাবু মোর ছেলে দুটোর দেখো, তাদের খাওয়াবার আর কেউ নেই গেল মন আপগাড়ী নীল দেলাম তার
একটা পয়সা দেলে না, আবার বকেয়া বাকী বলে হাতে দড়ি দিয়েছে। নবীন মাধবকে, একজন রায়ত।
(৫) দাদন না নিতে চাইলে কুটিতে আবদ্ধ করে দৈহিক নির্যাতন, প্রাপ্য অর্থ চাইলে শ্যামচাঁদ প্রহার।
(৬) মুই সোনার নক্বি ভেসয়ে দিতে পারবো না মারে, মুই কনে যাব রে সাহেবের সঙ্গি থাকা যে মোর ছিল ভাল মা রে রেবতীর কথা, মৃত্যুপথযাত্রী ক্ষেত্রমণিকে দেখে।
নীলদর্পণ নাটক
(৭) নীবনকে গোলকবসু স্বরপুরের বৃকোদর বলতেন, কারণ নবীনমাধব পরোপকারী, সহৃদয়, ও বলিষ্ঠ প্রকৃতির।
(৮) স্বরপুর গ্রামে বসু পরিবারের সাতপুরুষের বসবাস।
(৯) বিগত বছরে ৫০ বিঘা জমিতে বসু পরিবার নীল চাষ করেছে, দাম পায় নি। এবার ৬০ বিঘা জমিতে নীল চাষ করতে হবে
(১০) তোমরা তো যবনের ভাত খাও না। কুঠিয়াল সাহেব নবীন মাধবকে বলেছে।
কেন ঃ নবীন মাধব যখন বলে যে, তাদের জমি, লাঙল, গুর লোকজন সাহেব নিয়ে নিক, শুধু সারা বছরের আহারের ব্যবস্থা করুক, তখন সাহেব উপহাস করে উক্ত উক্তি করে।
নীলদর্পণ নাটক
(১১) ক্ষেত্রমনি অন্তঃসত্ত¡া অবস্থায় বাবার বাড়িতে আসে।
(১২) আমিন দুই পেয়াগ সাথে করে সাধু ও রাইচরণকে কুটিতে ধরে নিয়ে যায়।
(১৩) ক্ষেত্রমণিকে দেখে আমিন ভাবেÑ ছোট সাহেবকে উপটোকন দিতে হবে।
আমিন তার নিজের বোনকে উপহার দিয়ে বড় পেস্কারি পেয়েছে।
(১৪) ধানের আবাদের চেয়ে নীলের জমিতে চারগুণ কারকিত করতে হয়। সুতরাং ৯ বিধায় নীল চাষ করতে হলে বাকি ১১ বিঘা অনাবাদি থাকবে।
(১৫) নবীনবাবু, বাড়াবাড়ি কাজ কি, আপনি বাড়ি যান। গোপনীনাথ বলে সাধুচরনকে নির্যাতন শুরুকরলে নবীন বাধা দেয়, উড সাহেব অশিষ্ট ভাষায় অপমান করে। গোপীনাথ সহ্য করতে না পেরে বলে।
(১৬) পদী ময়রানী ক্ষেত্রমণিকে রোগ সাহেবের ঘরে যেতে বলে, রোগ ক্ষেত্রমণিকে “কুঠির কামরাঙ্গার ঘরে যাতি বলেছে”Ñ এ স্তাবে ক্ষেত্রমণি “ঝমকে ঝমকে ওটাচ”।
(১৭) মুই সব সইতে পারি, প্যাঁক্তির গোন্দো সইতে পারিনা, সাহেবদের প্রসঙ্গে আলোচনার সময় ক্ষেত্রমণি
রেবতী এদের সাথে আদুরি একথা বলে।
নীলদর্পণ নাটক
(১৮) মুই তো কখনুই পারবো না জান কবুল গোলকবসুর বিরুদ্ধে মিথ্যা সম্য দেওয়া প্রসঙ্গে তোরাপ বলে।
(১৯) গোলক বসুর নামে মিথ্যা মামলা তিনি নাকি নীল চাষে বাধা সৃষ্টি করেছেন।
(২০) যদি সকলে অমরনগরের ম্যাজিষ্ট্রেটের ন্যায় ন্যায়বান হইতেন, তবে কি রাইয়তের পাকা ধানে মই পড়ে, শস্যপূর্ণ ক্ষেত্রে শলভপতন হয় ? নবীন মাধব বাবার সুবিচার নিয়ে চিন্তিত, ম্যাজিষ্ট্রে দের হাতে আইন যমদন্ডস্বরূপ স্বরূপ। সে প্রসঙ্গে উক্ত উক্তি করে।
(২১) ইন্দ্রাবাদের ফৌজদারি আদালতে রোগ ও উড সাহেবের সাথে হাস্যপরিহাস ও আলাপরত ম্যাজিষ্ট্রেট
গোলক বসুকে হাজত বাসের আদেশ হয়। তিনি দিন উপবাস থেকে উদ্বন্ধনে আত্মহত্যা করে।
(২২) পুকুর পাড়ে নীল চাষ বন্ধের জন্য কত টাকা সেলামী দিতে চেয়েছিল ?
৫০ টাকা। গোলকবসুর আত্মার শান্তির জন্য শ্রাদ্ধের সময়।
(২৩) সাহেব নবীন মাধবের হাঁটুতে জুতো ঠেকাই কেন ? অপমান করার জন্য। পুকুর পাড়ে নীল বন্ধের জন্য ৫০ টাকা সেলামি দিতে সম্মত হলে সাহেব পায়ের জুতো নবীনকে স্পর্শ করে আর বলেÑ
“যবনের ছেলে চোর ডাকাইতের সঙ্গে তোর পিতার ফাঁস হইয়াছে তার শ্রাদ্ধে অনেকে ঘাঁড় কাটিতে হইবে, এই নিমিত্তে টাকা রাখিয়া দে। জুতো স্পর্শের তাৎপর্য হলো “তোর বাপের শ্রাদ্ধে ভিক্ষা এই।”
সহ্য করতে না পেরে নবীন সাহেবের বুকে লাথি মারে। সড়কিওয়ালারা ঘিরে ধরে, উড সাহেব লাঠি দিয়ে নবীনের মাথায় মারে। নবীন পড়ে যায়। ছোট সাহেব (রোগ) তলোয়ার দিয়ে আঘাত করতে গেলে তোরাপ সেই আঘাত নিজ হাতে গ্রহণ করে নবীনকে নিয়ে পালায়। তোরাপ বড় সাহেবের নাক কামড়ে ছিঁড়ে দেয়।
১ম অঙ্ক ৪টি গর্ভাঙ্ক।নীলদর্পণ নাটক
গোলকবসু ও সাধুর কথোপকথন। মোড়লদের দুরবস্থার কথা। দেশ ত্যাগের কথা, নীল চাষের অত্যাচারের কথা। হয় গর্ভাঙ্ক সাঁপোলতলার ৫ কুড়ো জমিতে নীলের দাগ, রাইচরণের হাহাকার, গ্রাম ছাড়ার সংকল্প, পেয়াদা এসে দুই ভাইকে ধরে নিয়ে যায়।
৩য় গর্ভাঙ্ক ঃ সাধু ও রাইচরণের উপর নির্যাতন, ৯ বিঘায় নীলচাষ করলে ১১ বিঘা পড়ে থাকবে, উঠ সাহেব শ্যামচাঁদ প্রহার করে, দাদন নিয়েছে নীল করতেই হবে। নবীন তাদের বাঁচাতে এসে অপমানিত হয়। নীলকরদের রাগের কারণ তোর দাদনের জন্য দশখানা গ্রামের দাদন বন্ধ রয়েছে। দেওয়ান গোপীনাথ নবীনকে বাড়ি যেতে অনুরোধ করে।
৪র্থ গর্ভাঙ্ক ঃ গোলক বসু পরিবারের প্রীতি ও মমতার কথা, বেরতী এসে বলে পদী ক্ষেত্রমণিকে রোগ সাহেবের কাছে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। সেচ্ছায় না গেলে “নেটেলা দিয়ে ধরো নিয়ে যাবে।” আদুরীর সরল গ্রাম্য রসিকতা এ দৃশ্যে আলো ছড়িয়েছে।
১ম অঙ্ক- প্রস্তুতি পর্ব। দাদন গছাইয়া দিয়ে ভাল জমিতে নীল চাষ বাধ্য করা ও অত্যাচার- এ অঙ্কের মূল ঘটনা।
সময়ের দিক থেকে- একটি দিনের মধ্যে ঘটনা বর্ণিত।
স্থান ঃ স্বরপুরের গোলকবসু ও সাধুর রাসগৃহ ও বেগুন বেড়ের কুটি।
২য় অঙ্ক ঃ ৩টি গর্ভাঙ্ক।নীলদর্পণ নাটক
১ম গর্ভাঙ্ক ঃ তোরাপসহ চার জন রাইয়ত বেগুন বেড়ের কুটিতে আটক ও গোলক বসুর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে তাকে কয়েদ করতে সাহায্য করতে বলে। অত্যাচারের চোটে কাষ পর্যন্ত রাজী হওয়ার ভান করে। অত্যাচারের চোটে রাইয়তগণ গত বছরের সম্পূর্ণ দাম না পেয়েও এবার ১৫ বিঘার দাদন নিতে রাজি হয়। যারা রাজি হয় না, তাদের চোখ বেঁধে রাতে অন্য কুটিতে নিয়ে যায়। যাতে তাদের পরিবারের লোক কোনো সংবাদ না পায়। এখানে তারা পাঁচদিন আটক রয়েছে।
২য় গর্ভাঙ্ক ঃ সরলতার কাছে লেখা বিন্দু মাধবের পত্রে জানা যায় বসুপরিবার যাতে নীলের বিরুদ্ধে কথা না বলে, তার জন্য গোলক বসুর নামে মিথ্যা মামলা করেছে। বাবাকে কারাবদ্ধ করতে পারলে নবীন জব্দ হবে। তখন সাহেবদের বিরুদ্ধতা করতে কেউ সাহস পাবে না।
৩য় গর্ভাঙ্ক ঃ পিতার বিপদে নবীন বিচলিত। একদিকে নিরাপত্তার জন্য গ্রাম ত্যাগ, আবার গ্রামের মানুষের উপকারের জন্য গ্রাম ত্যাগ না করা- এ দ্ব›দ্ব। শেষ পর্যন্ত থাকে। কিন্তু বিপদ তার মাথায়। কেননা ম্যাজিস্ট্রেড উড সাহেবের অনুগত। সুবিচার পাওয়া যাবে না।
২য় অঙ্ক ঃ সময় পরদিন। তিনটি গর্ভাঙ্ক সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে। ২য় গর্ভাঙ্কে আদুরীর কথা থেকে জানা যায় সরলতার জন্য সৈরিন্ধ্রী ঘাটে যেতে পারছে না। নবীন সাক্ষী যোগাড়ে গ্রামে গিয়েছে। স্থান হলো- নীলকুঠির গুদাম, বিন্দু মাধবের শয়নগৃহ ও স্বরপুরের রাস্তা।
৩য় অঙ্ক ঃ ৪টি গর্ভাঙ্ক।নীলদর্পণ নাটক
ঘটনা এক দিনের জোর করে দাদন দেওয়া, গোলকবসুর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, মামলা চালানোর জন্য নবীনমাধবের অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা, পরিবারকে সান্ত¡না, মিথ্যা অপরাধে ধৃত চারজন রাইয়তের পরিবারের সাহায্যের জন্য নবীনমাধব কর্তৃক তাদের জমি চাষের ব্যবস্থা, সংকটের দিনে বসুদের পুকুড় পাড়ে নীল চাষের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র, রোগ সাহেবের কুটি থেকে ধর্ষিতা ক্ষেত্রমণিকে তোরাপের সহায়তায় নবীনমাধবের উদ্ধার, পিতার মুক্তির জন্য ইন্দ্রাবাদ যাত্রা।
৩য় অঙ্কের সময় পরদিন, শুধু ৪র্থ গর্ভাঙ্কের ঘটনা কয়েকদিন পরের। ক্ষেত্রমণি উদ্ধার ও ইন্দ্রাবাদ যাত্রার মধ্যে দুই একদিন পার হয়েছে।
স্থান ঃ বেগুনবেড়ের কুঠি, নবীনমাধবের গৃহ, রোগ সাহেবের কামরা।
৪র্থ অঙ্ক ঃ ৩টি গর্ভাঙ্ক ঃনীলদর্পণ নাটক
ইন্দ্রাবাদের আদালতে বিচারে মিথ্যা সাক্ষ্যর অজুহাতে গোলক বসুর হাজত বাসের আদেশ, প্রতিবাদী পক্ষের মোক্তার সাক্ষীগণের সাক্ষী মিথ্যা প্রমাণের জন্য সাক্ষীদের পুনরায় আদালতে হাজির করার আবেদন, ম্যাজিস্ট্রেটের প্রত্যাখ্যা, তিনদিন উপবাস থেকে অপমানে গোলক বসুর আত্মহত্যা।
সময় ঃ মনে হয় ৩য় অঙ্ক ও ৪র্থ অঙ্কের মধ্যে তিনদিন অতিক্রান্ত হয়েছে।
স্থান ঃ ইন্দ্রাবাতের আদালত, বিন্দুমাধবের বাসাবাড়ী, জেলখানা।
৫ম অঙ্ক ঃ ৪টি গর্ভাঙ্ক। নীলদর্পণ নাটক
অত্যাচারীর অন্যায় উৎপীড়নে, নির্যাতনে, পাশবিক অত্যাচারে বসুপরিবার ও সাধুচরনের পরিবারের করুণ পরিণতি, পিতৃ- শ্রাব্দের পর নবীন মাধবের গ্রাম ছাড়ার সংকল্প, ৫০ টাকা সেলানি দিয়ে পুকুর পাড়ে নীল চাষ বন্ধ রাখার অনুরোধ, উড সাহেব নবীন মাধবের হাঁটুতে জুতো স্পর্শ করে, ব্যঙ্গোক্তি করে।
নবীনমাধব সাহেবের বুজে লাথি মারে, সাহেব লাঠি দিয়ে নবীনমাধবের মাথায় মারে, ছোট সাহেব তলোয়ার দিয়ে মারে, তোরাপ হাত দিয়ে ঠেকায়, নবীন মাধবকে নিয়ে তোরাপ চলে আসে, উড সাহেবের নাক কামড়ে ছিঁড়ে দেয়, আঘাতে নবীনের মৃত্যু, অন্যদিকে গর্ভপাতের ফলে ক্ষেত্রমণির ‘শয্যাকন্টকি’ দেখা দেয়, তার মৃত্যু হয়, বেবতীর ক্রন্দন, পুত্রশোকে সাবিত্রী উন্মত্ত অবস্থায় সবলতাকে সাহেবের বিবি মনে করে গলায় পা দিয়ে হত্যা করে, পরে জ্ঞান ফিরলে অনুতপ্ত অবস্থায় মৃত্যুমুখে পতিত হয়। সময়ঃ তিন দিন। ১ম গর্ভাঙ্কে জানা গেল গোপীনাথ জানাচ্ছে পরদিন পুকুর পাড়ে নীল বোনা হবে। পরদিন নবীনমাধব সাহেব কর্তৃক প্রহৃত হয়ে পরদিন মারা যায়।
স্থানঃ বেগুনবেড়ের কুঠি, সাধুচরণ ও নবীনমাধরের গৃহ।
নীলদর্পণ নাটক আখ্যান মূল্যায়ণ ঃ
একদিকে প্রবল গর্বোদ্ধত সত্যাচারী অন্যদিকে প্রতিরোধে শক্তিহীন ও সুবিচারে বঞ্চিত দুর্বল অত্যাচারিতগণের মধ্যে অসম সংঘাতে যে মর্মন্তুুদ পরিনাম রচিত হল, তাতে নাট্যকাহিনী সমাপ্ত হয়েছে। আখ্যান রচনায় শিল্পগত উৎকর্ষ প্রমানিত হয়েছে। অত্যাচারীর প্রকৃত স্বরূপ নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে পরিষ্টুট করেছেন।
বেগুনবেড়ের কুঠিতে আবদ্ধ অসহায় রাইতদের কথোপকথন, ক্ষেত্রমণির ওপরে ধর্ষণ, মিথ্যা মামলায় গোলক বসুর অসম্মান হেতু আত্মহত্যা, বিচারের নামে পক্ষপাতুদুষ্ট আচরণের ফলে ন্যায় বিচারের প্রহসন সৃষ্টি, এসব ঘটনার মধ্যে দিয়ে নীলকরদের অত্যাচারের ছবি স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে অসহায় চাষীদের মনের ক্ষোভ ও প্রতিকারে অসমর্থ হয়ে বেদনার প্রকাশ, জীবনমাধবের নেতৃত্বে তাদের মধ্যে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের উন্মোষ নাটকীয় সংঘাতকে তীব্রতর করে তুলেছে। ঘটনা বিন্যাসের চাতুর্যে সূচনা থেকে পরিণতি পর্যন্ত নাট্য প্রবাহে কোথাও গতি কমে নি। দ্ব›দ্ব অসমভিত্তিক হলেও পরিণতির জন্য দর্শক মনে উৎকন্ঠা শেষ পর্যন্ত জাগরুক থাকে।


উপসংহার
সব দিক বিবেচনায় নীলদর্পণ নাটক একটি যুগসচেতন সামাজিক নাটক। শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে নীলদর্পণ নাটক। কৃষকজীবনের বেদনা ও সংগ্রামকে ইতিহাসের অংশ করেছে নীলদর্পণ নাটক। মানবিক মূল্যবোধের প্রশ্নে নীলদর্পণ নাটক আমাদের বিবেককে জাগ্রত করে। ঔপনিবেশিক শাসনের নির্মম রূপ অনুধাবনে নীলদর্পণ নাটক বিশেষভাবে সহায়ক। নাট্যসাহিত্যের সামাজিক দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয় নীলদর্পণ নাটক। সময় অতিক্রম করেও প্রাসঙ্গিকতার দাবি রাখে নীলদর্পণ নাটক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব না থাকার শিক্ষা দেয় নীলদর্পণ নাটক। ইতিহাস, সাহিত্য ও সমাজচেতনার সেতুবন্ধন রচনা করেছে নীলদর্পণ নাটক। তাই বলা যায়, বাংলা সাহিত্যে নীলদর্পণ নাটক চিরস্মরণীয় এক প্রতিবাদী সৃষ্টি।
ধন্যবাদ স্যার!