পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব – রোমান্টিসিজম, রিয়ালিজম, ন্যাচারালিজম, মার্কসিজম, ফ্রয়েডিজম ও ফেমিনিজম

পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব

পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব মানবজীবন, সমাজ, কল্পনা ও বাস্তবতার বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে। বিশেষ করে বিচিত্র মানব মনের এবং মানবসৃষ্ট সমাজের যাপিত জীবনের বহু বাঁকের ভাঁজের বিচিত্র বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছে পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব। রোমান্টিসিজম থেকে শুরু করে রিয়ালিজম, ন্যাচারালিজম, মার্কসিজম, ফ্রয়েডিজম ও ফেমিনিজম— প্রতিটি তত্ত্বই পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্বের বিকাশে আলাদা দিক উন্মোচন করেছে। সমাজ ও সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে শিল্প, চিন্তা ও সংস্কৃতির পরিবর্তনের ধারায় পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব আমাদের শেখায় কীভাবে সাহিত্য শুধু রচনাশৈলী নয়, একটি সামাজিক ও মননশীল প্রতিক্রিয়া। পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্বের নানাবিধ মূলধারা থেকে কয়েকটি এখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্বের আগ্রহী পাঠক পড়ে যদি তাদের মনের তৃপ্তি আসে তবে আমাদের চেষ্টা সার্থক হবে।

পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব : ধারণা, বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব

পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব – রোমান্টিসিজম:


রোমান্টিসিজম কথাটি এসেছে রোমান্টিক থেকে। বাস্তবের সাথে কল্পনার রং মিশিয়ে রহস্যময় কোনো জগতের বা চেতনালোকের সন্ধান করা এবং সেই অনুসন্ধানের মাধ্যমে কল্পনার আলোয় জীবনকে বাস্তবাতীত করে উপভোগ করার নামই হলো রোমান্টিসিজম।


রোমান্টিসিজমের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কল্পনার প্রতি বিশ্বাস। বস্তু জগতের বাইরে যে অলৌকিক জগত আছে তা আবিষ্কার করতে পারে কল্পনাশক্তি। কল্পনার সাহায্যে অলৌকিক রহস্যময় জগতের সন্ধান করা যায়।
জড়বাদী দর্শনের মূল কথা হলো প্রত্যক্ষের সীমা। এর বাইরে এরা আর কোনো অস্তিত্ব মেনে নেয় না। আর প্রত্যক্ষের সীমার বাইরের জগৎকে দেখা হলো রোমান্টিক দর্শনের মূল কথা।


পঞ্চেন্দ্রিয়ের প্রত্যক্ষ বস্তু জড়বাদীদের বিষয়, আর পঞ্চেন্দ্রিয়ের অতীত অতীন্দ্রিয় জগৎকে পাবার আকুলতা রোমান্টিকতার মূল উদ্দেশ্য। যা চোখে দেখা যায় না, তাকে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে খোঁজেন রোমান্টিক শিল্পী। রোমান্টিক শিল্পী অদেখাকে দেখে, অধরাকে ধরে। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে দেখার জগৎকে অতিক্রম করে অতীন্দ্রয়ের রহস্যলোকের সন্ধান কাম্য রোমান্টিকের।

পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব – রিয়ালিজম (বাস্তববাদ)

জগৎ, জীবন ও প্রকৃতিকে যথাযথ এবং বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করা হয় যে শিল্প-সাহিত্যে, তাই বাস্তববাদ বা রিয়ালিজম নামে পরিচিত। রোমান্টিসিজমের বিপরীত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় রিয়ালিজমে।


বস্তুজগতের বাইরের অংশের নিখুঁত এবং বিশ্বাসযোগ্য উপস্থাপনই রিয়ালিজমের মূল উপজীব্য। বস্তুপুঞ্জের যথাযথ রূপায়ণ, সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নানা বিষয় ও তার সমস্যার স্বরূপ খুঁজে বের করা, সমস্যাকে বাস্তবতার দিক দিয়ে বিশ্লেষণ, ভাব ও ভাষার সামঞ্জস্য বিধান করা বাস্তববাদীদের মূল কাজ।


প্রাচীন কাল থেকেই সাহিত্যে বাস্তববাদের প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। ১৮৫০ খ্রি. ফরাসি দেশে প্রথম এ বিষয়টির প্রয়োগ ঘটে সাহিত্যে ও সমালোচনার ক্ষেত্রে জীবনের কঠিন ও রূঢ় বাস্তবতার বিশ্বস্ত চিত্রণে।


চর্যাপদ থেকেই বাংলা সাহিত্যে বাস্তবতার ছোঁয়া পাওয়া যায়। তত্ত্বকথার ফাঁকে ফাঁকে জীবন ও সমাজের যে বিবরণ রয়েছে তাতে সমকালীন বাস্তবতার চিত্রই ফুটে ওঠে। মুকুন্দরামের চ-ীমঙ্গলে কালকেতু-ফুল্লরার সংসার চিত্র অথবা অন্নদামঙ্গলের ঈশ্বরী পাটুনীর সেই বিখ্যাত উক্তি Ñ “ আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে।” এ সবের মধ্যে বিশ্বস্ত বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যায়।


বাংলা সাহিত্যের শুরুতেই বাস্তববাদ ছিল। পরে পাশ্চাত্য বাস্তববাদের ছোঁয়া বাংলা সাহিত্যের এসে পড়ে। মধ্যবিত্ত, নি¤œমধ্যবিত্ত তথা সমাজজীবনই গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, চলচ্চিত্র সবখানেই মূখ্য হয়ে ওঠে। কথা সাহিত্যে শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য, নাটকে গিরিশচন্দ্র ঘোষ, শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আবদুল্লাহ আল মামুন, সৈয়দ শামছুল হক এবং সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন প্রভুতি চলচ্চিত্রকার শিল্প-সাহিত্যে বাস্তবতাকে প্রাধান্য দেন।


রিয়ালিজম প্রসঙ্গে ম্যাজিক রিয়ালিজম (ঐন্দ্রজালিক বাস্তবতা)-এর কথা আসে। ল্যাতিন আমেরিকার সাহিত্যে বাস্তবতার সাথে পুরাণ, অতিকথা, রূপক কাহিনি, জাতীয় বীরগাাঁথাÑএ সব কিছুর মিশ্রণে ফ্যান্টাসি ও বাস্তবতার একটি অগাধ মিলন লক্ষ করা যায়। এভাবে বাস্তবতার সাথে ফ্যান্টাসি বা কল্পনার মিশ্রণে যে সাহিত্যে গড়ে– ওঠে তাকে ম্যাজিক রিয়ালিজম বলে। এতে আপাত অবাস্তব কল্পনা বা ফ্যান্টাসির মিশ্রণ থাকলেও এর লক্ষ্য সম্পূর্ণ বাস্তব।

পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব ন্যাচারালিজম (প্রকৃতিবাদ)


যে সাহিত্যে কেবল জগৎ ও জীবনকে পর্যবেক্ষণ করবে না, সমস্ত অনুপুঙ্খের রেকর্ড সংকলন করবে, চরিত্রসমূহের রুচি, আবেগ, সংবেদনশীলতা নিয়ে রাসায়নিকের মতো বস্তুর কারবারি হবে, সে সাহিত্যকে ন্যাচারালিজম বা প্রকৃতিবাদ বলে।
জোলা‘র ঞযব ঊীঢ়বৎরসবহঃধষ ঘড়াবষ (১৮৮০) শীর্ষক রচনাটিকে প্রকৃতিবাদের ম্যানিফেস্টো হিসেবে গৃহীত হয়েছে। অন্যদিকে গঁফুর ভ্রাতৃদ্বয়ের রচনায় প্রকৃতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই প্রতিফলিত হয়েছে। তারা দেখিয়েছেন যে জনসাধারণের মৌলিক আশা-আকাক্সক্ষা দাবি-চাহিদা ইত্যাদি বড় কথা নয়, তার সাথে অবক্ষয়িত সমাজের ফটোগ্রাফিও প্রয়োজন।


এডমন্ড গঁফুরের হাতে জন্ম নেওয়া ডড়সধহ ড়ভ চধৎরং গ্রন্থে গণিকাজীবন, গণিকাপল্লীর অবিকল প্রতিলিপি পাওয়া যায়।
জোলা যেমন প্রকৃতিবাদী সাহিত্যের অগ্রনায়ক তেমনি এই পথের ভ্যানগার্ড বলা যায় মোপাসাঁকে। মোপাসাঁর টহব ঠরব (১৮৮৩), ইবষ অসর (১৮৮৫) ইত্যাদি উপন্যাস এবং ২০০ এরও বেশি গল্পে প্রকৃতিবাদ প্রকাশ পেয়েছে। মোপাসাঁ বেশিরভাগ গল্পে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ দৃষ্টিভঙ্গি সহকারে চরিত্র, তার পরিবেশ ও অবক্ষয়িত মূল্যবোধ অত্যন্ত রূঢ় বাস্তবতার সাথে তুলে ধরেছেন।

পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব — রিয়ালিজম রোমান্টিসিজম ন্যাচারালিজম


যে সাহিত্যে জীবন ও প্রকৃতিকে বস্তুনিষ্ঠভাবে তার যথাযথরূপে রূপায়িত করার প্রয়াস থাকে, তাকে বাস্তববাদ সাহিত্য বলে। আর এ ধরনের লেখককে বলা হয় বাস্তববাদী বা রিয়ালিস্টিক।


বাস্তববাদী সাহিত্য থেকে রোমান্টিক সাহিত্য আলাদা এ কারণে যে, রোমান্টিক সাহিত্য জীবনকে বাস্তবসম্মত ও বস্তুনিষ্ঠভাবে চিহ্নিত করা হয় না, চিত্রিত করা হয় আকাক্সিক্ষত ও প্রত্যাশিতরূপে, বাস্তবের চাইতে অধিকতর মোহনভঙ্গিতে। এখানে জীবন বীরত্বব্যঞ্জক এবং নানা রকম দুঃসাহসিক অভিযানে পূর্ণ থাকে। আর থাকে স্বপ্ন-মায়া কল্পনার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। বাস্তববাদের অবস্থান কল্পনা প্রবণতার বিপরীত দিকে।


প্রকৃতিবাদী বা স্বভাববাদী সাহিত্যিকরা বাস্তববাদীদের চেয়েও বেশি নিঁখুত ও নির্ভুলভাবে প্রকৃত জীবনসত্যকে পরিবেশন করার চেষ্টা করেন। তাছাড়া কিছু সুস্পষ্ট তত্ত্বকে ভিত্তি করে প্রকৃতিবাদী সাহিত্য (উপন্যাস) গড়ে ওঠে। এর মধ্যে রয়েছে পুরুষানুক্রম, জৈবতাড়না, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবাদ এবং অপ্রতিরোধ্য নিয়তি বা ঘটনাচক্রের দৈব সংঘটনের বিষয়। এখানে শুধু যে মহান আদর্শবাদ বা রঙিণ সুখী কল্পনা বিলাসের কোনো অবকাশ নেই তা নয়, এর ঝোঁক হলো বাস্তবজীবনের সেই অংশের প্রতি যা রক্তাক্ত, যন্ত্রণাক্লিষ্ট, ক্লেদময় নিষ্ঠুর ও নীচ।

পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব — মার্কসিজম:


রুশ দেশে অকটোবর বিপ্লবের পরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক মতবাদের ভিত্তিতে যে মতবাদে সামাজিক স্তরবিন্যাস, রাষ্ট্রের উত্থান-পতন, শোষক-শোষিতের সংঘর্ষ এবং শেষে শোষিতের বিজয়ে আশাবাদ থাকে, সাহিত্যে প্রতিফলিত সে মতবাদকে মার্কসিজম বলে।

পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব :মার্কসিজম এর জনক


মার্কসবাদীরা সমাজ, শিল্পকর্ম, সাহিত্যকর্ম- সবকিছুই মার্কসিজমে বিচার করতে চান। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ মার্কসবাদীদের প্রধান আশ্রয়। তারা মানব জীবনের প্রতিটি কর্মের পিছনে একটি অর্থনৈতিক কারণ লক্ষ করেন।
মার্কসবাদীরা সাহিত্য বিচার করতে গিয়ে শুরুতেই ধরে নেন, সাহিত্য সামাজিক মানুষের মুকুর বা দর্পণমাত্র। যে সাহিত্যে সামাজিক মানস প্রতিফলিত হয় না, তা তাদের কাছে নিরর্থক। তারা মনে করেন জীবন-সত্য উদঘাটন করাই হলো সাহিত্যের কাজ।


সাহিত্য-শিল্পের আলোচনায় মার্কসবাদ প্রযুক্ত হলে সেই মতবাদকে বলা হয় সমাজতান্ত্রিক বস্তুবাদ।
যুদ্ধোত্তর পাশ্চাত্য জগতে আর্নস্ট ফিশার হলেন মার্কসবাদের প্রবক্তা। তাঁর ঞযব ঘবপবংংরঃু ড়ভ অৎঃ; অ গধৎীরঃ অঢ়ঢ়ৎড়ধপয’ (১৯৫৯) গ্রন্থটি এক্ষেত্রে প্রামাণ্য গ্রন্থ। এ গ্রন্থের আলোকে সমাজতান্ত্রিক বস্তুবাদ সম্পর্কে বলা যায় যে, মার্কসবাদী শিল্পীর দৃষ্টি ভবিষ্যতের দিকে, তারা মেহনতী মানুষের ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। মেহনতী মানুষের ক্ষমতায় আস্থা রাখেন। তাদের সকল শিল্পকর্মের লক্ষ্য পরিণত মানবমন, নিছক প্রমোদ সৃষ্টি তাদের লক্ষ্য নয়। গোর্কি, ব্রেখট, মায়াকোভস্কি, এলুয়ার, মাকাবেজো প্রমুখ শিল্পীরা মেহনতী শ্রেণির ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ করে সোশালিস্ট সমাজকে স্বীকার করেছেন।


বাংলাদেশের চিন্তাজগতে মার্কসবাদের শুরু ‘পরিচয়’ পত্রিকাকে ঘিরে ১৯৩০ সালের পরে। তবে দুঃখের বিষয় বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত মার্কসীয় সাহিত্য সমালোচনা কোনো সংহত রূপ লাভ করেনি। গোপাল হালদার, সরোজ আচার্য, হীরেন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও সুশোভন সরকারের মতো বুদ্ধিমান সমালোচকরা গোড়া থেকেই এর সাথে যুক্ত ছিলেন। আবু সাঈদ আইয়ুবও এই পথের পথিক। নীরেন্দ্রনাথ রায়ের ‘সাহিত্যবীক্ষা’, বিনয় ঘোষের ‘শিল্প সাহিত্য ও সমাজ’, শ্রী সরোজ আচার্যের ‘বই পড়া’, ও সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব‘াংলা উপন্যাসের কালান্তর’ এ ক্ষেত্রে স্মরণীয়। অরবিন্দু পোদ্দারের ‘বঙ্কিমমানস’ (১৯৫১) এবং শীতাংশু মৈত্রের ‘যুগন্ধর মধুসূদন’ (১৯৫৮) মার্কসীয় বিচার পদ্ধতি প্রয়োগ করলেও উক্ত রীতি পুরোপুরি অনুসৃত হয়নি।

পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব — ফ্রয়েডিজম:


মানব মনের তিন স্তর(অবচেতন, প্রাকচেতন ও চেতন) নিয়ে সিগমুন্ড ফ্রয়েড মানব মন সম্পর্কে যে তত্ত্ব দিয়েছেন, তাকে ফ্রয়েডিজম বলে।
ফ্রয়েড মানব বনের তিনটি স্তরের সমন্বয়ে একটি মানসিক যন্ত্র কল্পনা করেছেন। মানুষের অসামাজিক কামনা বা কামনাগুলো অবচেতন স্তরে দমন করে রাখা হয়। এগুলো সম্পর্কে মানুষ সচেতন থাকে না। যেসব অভিজ্ঞতা প্রাকচেতন স্তরে জমা থাকে সেগুলো একটু চেষ্টা করলে সচেতন স্তরে নিয়ে আসা যায়।


ফ্রয়েড মনে করেন মানুষের চলমান আচরণ ও গতিশীলতার জন্য তার আদিম কামনাগুলো দায়ী।
ফ্রয়েডিজম শিল্প-সাহিত্যে প্রচ- আলোড়ন সৃষ্টি করে। ফ্রয়েডিজমের মূলকথা এই যে, আদিম বর্বর মানুষ যখন ধীরে ধীরে সভ্য হতে শুরু করে তখন তারা নিজেরাই কিছু বিধি-নিষেধ নিজেদের উপর আরোপ করে এবং আত্মশাসনের মাধ্যমে সভ্য মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে চাইল।


মানুষ যতই আত্মশাসন করুক না কেন, মনের দুর্বার প্রবৃত্তিগুলোকে একেবারে দমন করতে পারে না। সজ্ঞানে মানুষ দুর্বার প্রবৃত্তিগুলোকে সরিয়ে রাখলেও তা অবচেতন মনে স্বপ্নের আকারে জেগে উঠতে লাগলো। ফ্রয়েড স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, অতৃপ্ত প্রবৃত্তি ও কামনাগুলোই স্বপ্নে ভিন্ন ভিন্ন মূর্তিতে আবির্ভূত হয়। মানুষের চেতন সত্তার অন্তরালে অবচেতন মনে দমিত প্রবৃত্তিগুলো ক্রিয়াশীল থাকে। সেগুলোই স্বপ্নের আকারে বের হয়ে আসে।


ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব সাহিত্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। মানব মনের এই বিচিত্র ক্রিয়াশীল রূপকে উপন্যাস ও গল্পের বিষয়বস্তু করে তুলেছেন এবং সচেতন ক্রিয়ার সাথে অবচেতন মনের অবয়বহীন অস্ফূট আশা-আকাক্সক্ষাকে একত্রে মিশ্রিত করে মানব মনের জটিলতাকে প্রকাশ করার চেষ্টা করলেন।


ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনেকটা মার্কসের তত্ত্বের কাছাকাছি পর্যায়ে চলে গেছে। ফ্রয়েড মনে করেন বর্তমান সমাজ যে নিষ্ঠুর অত্যাচারী হয়ে উঠেছে তার অন্যতম কারণ অবদমন। ফ্রয়েডের বক্তব্য হচ্ছে যে, কোনো সমাজ যদি উন্নয়নের নামে এমন এক বিন্দুতে এসে থাকে যেখানে একদল মানুষের তৃপ্তি ও সমৃদ্ধি অন্য আরেক দলের নিপীড়নের উপর নির্ভর করছে, তাহলে এটা খুবই স্বাভাবিক যে অবদমিত শ্রেণি সেই সংস্কৃতি সম্পর্কে তীব্রবৈরিতা পোষণ করবে। যার উদ্ভব ও বিকাশ সম্ভব হয়েছে তাদেরই নিরন্তর অধ্যবসায়ে। অথচ অর্জিত সম্পদে শরিক হওয়ার কোনো অধিকার তাদের নেই। এদিক বিচারে ফ্রয়েড আশ্চর্যজনকভাবে মার্কসের কাছাকাছি এসে গেছেন।

পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব — ফেমিনিজম:


যুগ যুগ ধরে বিশ্বের নারী অবহেলিত, অত্যাচারিত। সমাজের গভীরে ধীরে ধীরে এ যন্ত্রণা থেকে জেগে ওঠার বাসনাও তীব্র হয়েছে। প্রতিবাদী নারী বিরূপ বিশ্বে নিজের অবস্থান খুঁজে নিয়ে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব হিসেবে পুরুষের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার যে সক্রিয় প্রচেষ্টা, চিন্তা, তাই ফেমিনিজম। সহজ কথায় অন্ধকার ভেদ করে আলোর পথে জেগে ওঠাই হলো নারীচেতনা।


উনিশ শতকের শেষ দশকে নারীচেতনাবাদ জেগে ওঠে। নারী তার নিজের ক্ষমতা ও জ্ঞানের সন্ধান করে। নিজেকে পুরুষের কর্মসঙ্গিনী হিসেবে না ধরে, নিজেকে যৌন পুতুল হিসেবে না মেনে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রত্যাখ্যান করে, নিজের ভাগ্যকে জয় করার অধিকার সে নিজেই পেতে চেয়েছে। নারী হিসেবে সে চেয়েছে ব্যক্তি হিসেবে স্বতন্ত্র স্বীকৃতি। নারীর এসব চাওয়াটাই ফেমিনিজম বা নারীচেতনাবাদ।


সমাজে নারীর অবমূল্যায়নই মূলত ফেমিনিজমের উৎস। সমাজে নারী ভোগের বস্তু, নারী শব্দটির প্রতিশব্দের মধ্যে অবমূল্যায়ন, নারী মানে পুষ্টি দান করে, স্ত্রী মানে যে বেষ্টন করে থাকে, রমণী অর্থ রমণযোগ্য, অর্থাৎ যার মধ্যে ভোগের গন্ধ রয়েছে, বণিতা অবলা অর্থেও নারীকে দেখা হয়। সংস্কৃত ভাষায় ভৃত্য ও ভার্যা একই ক্রিয়াপদ ভূ থেকে উৎপন্ন, অর্থাৎ ভরণ-পোষণ করা, পতœী বলে তার কোনো মর্যাদা নেই, ভরণ-পোষণের বিনিময়ে সেবা পাওয়াই পুরুষের লক্ষ্য। বধূ মানে যাকে বহন করে নিয়ে যেতে হয়, দিতে হয় ভরণ-পোষণ, নারী ঊনমানব অর্থাৎ পুরোপুরি মানব নয়। নারীকে ইচ্ছা মতো ব্যবহার করা, ইচ্ছেমতো ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া এমন কি প্রয়োজনে হত্যা করাও যায়।


পাশ্চাত্যেও নারী সম্পর্কে খারাপ ধারণা ছিল। এরিস্টটল মনে করেছিলেন কিছু কিছু আবশ্যিক গুণাবলি নেই বলেই তাকে নারী হয়ে থাকতে হয়। মূলত নারী পুরুষেরই অধীন। সে কন্যা জায়া ভগিনী বধূ জননী যেই হোক না কেন। পীড়ন যেখানে প্রতিবাদ সেখানে। ক্ষোভ, যন্ত্রণা থেকেই নারী জেগেছে।নিজের অস্তিত্ব ও সত্তার জন্য সংগ্রাম করেছে। নিজের মর্যাদা পেতে চেয়েছে। নারীর অধিকার সচেতনতায় গড়ে উঠেছে ফেমিনিজম।

উপসংহার:

সাহিত্য জীবনেরই রূপ। পৃথিবীর নানা প্রান্তের সাহিত্যের মতো সার্বিকভাবে পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব মানবজীবনের নানামুখী রূপ—কল্পনা, বাস্তবতা, প্রবৃত্তি, সমাজ ও লিঙ্গচেতনার গভীর বিশ্লেষণ। সময় ও সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্বও নতুন ব্যাখ্যা ও দর্শনে সমৃদ্ধ হয়েছে। এই সাহিত্যতত্ত্ব মানবমন ও সভ্যতার বিকাশকে বোঝার এক অনবদ্য পথপ্রদর্শক হিসেবে আজও সমান প্রাসঙ্গিক। মননশীল মানুষ চিরকালই সাহিত্যতত্ত্বের কদর করে আসছে, ভবিষ্যতেও করবে।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।

4 Responses

  1. ,, ধন্যবাদ আমার প্রাণপ্রিয় স্যার আক্তার হোসেন, এত সুন্দর করে সহজে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য।
    নিয়মিত আপনার এমন পোস্ট চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *