প্রবন্ধ সংগ্রহ প্রবন্ধ গ্রন্থের আলোকে প্রমথ চৌধুরীর মূল্যায়ন।

প্রমথ চৌধুরী: চলিত রীতির প্রবর্তক, সমুজপত্রের সম্পাদক।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

আজকের এ নিবন্ধে যা আছে বা জানা যাবে তার সংক্ষিপ্ত রূপ:

প্রমথ চৌধুরী

সারসংক্ষেপ:

‘সবুজ পত্র’- এর সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬) রবীন্দ্রযুগে সাহিত্য চর্চা করেও আপন মহিমায় উজ্জ্বল। বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে তিনি নতুন পথের পথিক। তাঁর লেখায়, চিন্তায়, বাচনে, প্রকাশভঙ্গিতে, বিষয়বস্তুর উপস্থাপনার একটি নতুন মনের পরিচয় মেলে। তিনি প্রবন্ধরীতিতে বৈঠকী মেজাজ প্রবর্তন করে যেকোন গাম্ভীর্যপূর্ণ বিষয়কে হালকাভাবে, আবার অতি সাধারণ বিষয়কে গাম্ভীর্যপূর্ণ করে তুলেছেন। সমাজ সাহিত্য, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রাবন্ধিক যুক্তিনিষ্ঠ মতামত বিচিত্র বিষয় অবলম্বনে বিভিন্ন প্রবন্ধের মধ্যে একটি বিশিষ্ট বিষয় নিয়ে নিজস্ব মতামত তুলে ধরেছেন।

বাংলা সাহিত্যের এক বিরলতম প্রতিভা প্রমথ চৌধুরী। তিনি একাধারে প্রাবন্ধিক, কবি, ছোটগল্পকার ও চিন্তাবিদ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর সাহিত্যিক ছদ্মনাম ছিল ‘বীরবল’। বাংলা গদ্যে চলিতরীতির প্রবর্তক হিসেবেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত। তাঁর সম্পাদিত ‘সবুজপত্র’ পত্রিকাটি বাংলা সাহিত্যে এক নবযুগের সূচনা করেছি

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় :
প্রমথ চৌধুরী ৭ আগস্ট ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ ভারতের যশোর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন (বর্তমানে পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার হরিপুর গ্রাম)। তাঁর অগ্রজ আশুতোষ চৌধুরীও স্বনামধন্য সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে বিয়ে করেন, ফলে ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়সূত্রে যুক্ত হন। বড় তাই আশুতোষ চৌধুরী রবীন্দ্রনাথের ভগিনী প্রতিভা দেবীকে বিয়ে করেছিলেন।

কর্মজীবন: প্রমথ চৌধুরী আইন পেশা ও অধ্যাপনার পাশাপাশি ঠাকুর এস্টেটের ম্যানেজার ছিলেন।

শিক্ষাজীবন :
তিনি কলকাতার হেয়ার স্কুল থেকে এন্ট্রান্স, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে এফ.এ এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে দর্শনে বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ প্রথম শ্রেণিতে পাস করে ব্যারিস্টারি পড়তে ইংল্যান্ডে যান। দেশে ফিরে কিছুদিন আইন পেশায় যুক্ত থাকলেও পরে অধ্যাপনা ও সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন।

সাহিত্যজীবন :
প্রমথ চৌধুরী মূলত প্রবন্ধকার হিসেবে বাংলা সাহিত্যে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর প্রবন্ধে যুক্তি, ব্যঙ্গ, রুচি ও সমাজচেতনার এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায়। বাংলা গদ্যে চলিত ভাষার প্রচলনে তাঁর ‘সবুজপত্র’ (১৯১৪) পত্রিকাটি ছিল অগ্রগণ্য ভূমিকা পালনকারী। এই পত্রিকার মাধ্যমে তিনিই প্রথম সাহিত্যে সাধারণ কথ্যভাষাকে মর্যাদা প্রদান করেন।

বাংলা সাহিত্যে চলিতরীতির প্রবর্তনে তার প্রকাশিত সবুজপত্র মাসিক পত্রিকাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

বাংলা সাহিত্যে ইতালীয় রূপবন্ধের সনেট রচনায়ও তিনি পারদর্শিতা প্রদর্শন করেন।

তিনি বিশ্বভারতী পত্রিকার সম্পাদনার কাজও করেছিলেন কিছুদিন।

রচনা সমগ্র’। তাঁর প্রবন্ধ

১. তেল মুন-লাকড়ী (১৯০৬)। ২. বীরবলের হালখাতা (১৯১৬); ৩. নানাকথা (১৯১৯)। ৪, ভাষার কথা। ৫. আমাদের শিক্ষা (১৯২০)। ৬. রায়তের কথা (১৯১৯)। ৭. নানাচর্চা (১৯৩২) এবং ৮. প্রবন্ধ সংগ্রহ।

তার গল্পগ্রন্থগুলো হলো। ১. চার ইয়ারি কথা, ২. আহুতি, ৩. নীললোহিত, ৪. অনুকথা সপ্তক, ৫. যোষালে ত্রিকথা।

তাঁর কাব্যগ্রন্থ দুটি। ১. সনেট পঞ্চাসাৎ (১৯১৩) এবং ২. পদচারণ (১৯১৯)।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। প্রমথ চৌধুরীর অনুপ্রেরণায় রবীন্দ্রনাথও চলিত ভাষায় কিছু সাহিত্য রচনা করেছিলেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী প্রমথ চৌধুরী বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে এক নবযুগের সূচনা করেন। তাঁর সবুজপত্র পত্রিকা বাংলা গদ্যকে প্রাণবন্ত ও আধুনিক করে তোলে। সাহিত্যরস, ব্যঙ্গবোধ ও চিন্তার স্বাধীনতা— এই তিনে তিনি বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

সবুজপত্র পত্রিকার পরিচয়:

প্রমথ চৌধুরী ১৯১৪ সালে সবুজপত্র নামের মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এতে কোনো বিজ্ঞাপন বা ছবি প্রকাশিত হতো না— কারণ তিনি এটিকে বাণিজ্যিক পত্রিকা হিসেবে দেখতে চাননি। এই পত্রিকার মাধ্যমে তিনি চলিত ভাষার চর্চা ও প্রচলনের সূচনা করেন। পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর প্রেরণায় চলিত ভাষায় রচনা শুরু করেন।

প্রথম সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এবং প্রমথ চৌধুরীর লেখা ছাপা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, অতুলচন্দ্র গুপ্ত, বরদাচরণ গুপ্ত, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, হরিদাস দেব, কিরণশঙ্কর রায় প্রমুখ সাহিত্যিক নিয়মিতভাবে এতে লিখতেন।

এ ছাড়া কান্তিচন্দ্র ঘোষ, অমিয় চক্রবর্তী এবং সুরেশ চক্রবর্তী সবুজপত্র-এর নিয়মিত কবি ছিলেন। বাংলা গদ্যে চলিতরীতির বিকাশে এই পত্রিকার ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে বুদ্ধদেব বসু বলেন—

“এর প্রথম দান প্রমথ চৌধুরী বা বীরবল, দ্বিতীয় দান চলিত ভাষার প্রতিষ্ঠা, তৃতীয় এবং হয়তো বা মহোত্তম দান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।”

বুদ্ধদেব বসু আরও বলেন, “প্রমথ চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ— দুজনেরই সবচেয়ে প্রয়োজন ছিল সবুজপত্র-এর। প্রথমজনের আত্মপ্রকাশের জন্য, আর দ্বিতীয়জনের নতুন হবার জন্য।”

প্রমথ চৌধুরী নিজে বলেছিলেন—

“সাহিত্য মানবজীবনের প্রধান সহায়, কারণ তার কাজ মানুষের মনকে নিদ্রার অধিকার হতে জাগরিত করে তোলা। আমাদের সবুজপত্রের মাধ্যমে যদি নতুন সাহিত্যধারা প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে বাঙালি জাতির মনের অভাব অনেকটা পূরণ হবে।”

সাধুরীতির দুর্বোধ্যতা থেকে মুক্ত হয়ে সাহিত্য সহজবোধ্য ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সবুজপত্র ও প্রমথ চৌধুরীর প্রচেষ্টায়। সবুজপত্র শুধু একটি পত্রিকা নয়, এটি ছিল এক নতুন সাহিত্যযুগের সূচনা।

সবুজপত্র কেবল একটি সাহিত্যপত্রিকা নয়, এটি বাঙালি মনের নবজাগরণের প্রতীক। প্রমথ চৌধুরীর নেতৃত্বে এটি বাঙালির চিন্তা, ভাষা ও রুচিকে নতুন করে চিনিয়েছিল নিজেকেই। তিনি দেখিয়েছিলেন—

“আধুনিকতা মানে নিজের ভেতরের আলো জ্বালানো।”
আজও যখন আমরা বাংলা গদ্য পড়ি, ভাবি, লিখি—প্রমথ চৌধুরীর সেই সবুজপত্র-এর সবুজ ছায়া আমাদের চিন্তায় ছড়িয়ে থাকে।

প্রবন্ধ সংগ্রহ – প্রমথ চৌধুরী

প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধ সংগ্রহ গ্রন্থের বিখ্যাত প্রবন্ধসমূহ:

জয়দেব, সনেট কেন চতুর্দশপদী, বঙ্গসাহিত্যের নবযুগ, সবুজপত্র,সাহিত্য সম্মেলন, সাহিত্যে খেলা, যৌবনে দাও রাজটিকা, বীরপল, কথার কথা, বর্তমান বঙ্গসাহিত্য, বই পড়া, সাধুভাষা বনাব চলিত ভাষা, আমাদের ভাষা সংখট, বর্ষা, আমরা ও তোমরা, ভারতবর্ষের ঐক্য, খেয়াল খাতা, রূপের কথা।

প্রমথ চৌধুরী বাংলা সাহিত্যের প্রথম কলাকৈবল্যবাদী লেখক। তিনি বিদেশ থেকে ব্যারিস্টারি পড়ে আসেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় জগত্তারিণী পদকে ভূষিত করেন।

প্রমথ চৌধুরী ছোটগল্পে বেশিরভাগ নময় নীললোহিত নাম ব্যবহার করেন।

কাব্যে অশ্লীলতা বিষয়ে প্রমথ চৌধুরীর অভিমতের ব্যাখ্যা  

তাঁর বিখ্যাত অশ্লীলতা আলংকরিক মত প্রবন্ধে কাব্যে শ্লীলতা-অশ্লীলতা বিষয়ে  মতামত ব্যক্ত করেছেন। সংস্কৃত আলংকারিকেরা অশ্লীলতাকে কাব্যের একটি সুস্পষ্ট দোষ বলে অভিহিত করে থাকেন। অনেকে বলে থাকেন  শ্লীলতা-অশ্লীলতা সুরুচির কথা সুনীতির কথা নয়। প্রমথ চৌধুরী বলেন, অশ্লীলতা কাব্যদেহের শোভা বৃদ্ধি করে। আলংকারিক দত্তী তার ‘কাব্যাদর্শ’ গ্রন্থে বলেন যে, কাব্যের অর্থগত মাধুর্য অলংকারের সাহায্যে আরো মধুর হয়। কাব্যের শব্দ ও অর্থ গ্রাম্যতা দোষে দুষ্ট হলে ভিন্ন কথা। এ প্রসঙ্গে আলংকারিকদের মত হলো- যা রসের প্রতিবন্ধক তাই দোষ।

অশ্লীলতা তো সত্যি সত্যি সাহিত্যের রস উপলব্ধিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাই এটি দোষের।

 এই বিষয়ে আলংকারিক বামন বলেন, “যে কথা শুনে সামাজিকদের মনে লজ্জা, ঘৃণা বা অমঙ্গলের আশঙ্কা উদয় হয়, তাই অশ্লীল। তারা এক্ষেত্রে এথিকসের পরিবর্তে পোয়েটিকসদের ধারা অনুসরণ করেন।

এজন্যই  ভারত চন্দ্র রায় গুণাকরের কাব্যে অশ্লীলতা থাকা সত্ত্বেও তা শিল্পের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়েছে।

তার আলোচিত প্রবন্ধ  ‘বইপড়া’। এখানে তিনি শিক্ষার উদ্দেশ্যে, কৌশল এবং ধারা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

 তিনি মনে করেন বইপড়া ছাড়া কারো পক্ষে সাহিত্যচর্চা করা সম্ভব না। তিনি বিশ্বাস করেন শিক্ষা কেউ কাউকে দিতে পারেন না, শিক্ষা অর্জন করার বিষয়।

তাই তিনি বলেন সুশিক্ষিত লোকমাত্রই স্বশিদিতে। একজন শিক্ষকের আসল স্বার্থকতা তার ছাত্রকে শিক্ষাদান করা নয়। বরং ছাত্রকে তা অর্জন করতে সক্ষম করে তোলা। শিক্ষার পথ দেখান। মনের রাজ্যে ঐশ্বর্যের সন্ধান দেন।

প্রাবন্ধিক বলেন, আজকের বাজারে বিদ্যা দাতার অভাব নেই এমনকি এক্ষেত্রে দাতা কর্ণেরও অভাব নেই এবং আমরা আমাদের ছেলেদের তাদের দারস্থ করেই নিশ্চিত থাকি। এতটা বিদ্যার ধন লাভ করে ফিরে আসবে। যার সুদে তারা বাকি জীবন আরামে কাটিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু এই বিশ্বাস নিতান্তই অমূলক।

মনোরাজ্যেও দান গ্রহণসাপেক্ষ অথচ আমরা দাতার মুখ চেয়ে গ্রহীতার কথাটা একেবারেই ভুলে যাই। শিক্ষক ছাত্রকে শিক্ষার পথ দেখিয়ে দিতে পারেন মনোরাজ্যের ঐশ্বর্যের সন্ধান দিতে পারেন।  কৌতূহল উদ্রেক করতে পারেন, বুদ্ধি বৃত্তিকে জাত করতে পারেন।

যথার্থ গুরু  শিষ্যের আত্মাকে উদবোধিত করেন এবং তার অন্তর্নিহিত সকল প্রচ্ছন্ন শক্তিকে মুক্ত ও বাক্ত করে তোলেন।

বিদ্যার সাধনা শিষ্যকে নিজের করতে হয় আর গুরু উত্তরসাধক মাত্র।

“সুশিক্ষিত লোকমাত্রই স্বশিক্ষিত।” উক্তিটির তাৎপর্য

উক্তিটির তাৎপর্য :
প্রমথ চৌধুরীর মতে, শিক্ষা এমন এক জিনিস যা কেউ কাউকে দিতে পারে না — তা নিজের অর্জন। বইপড়া কেবল তথ্য আহরণ নয়; বরং জ্ঞানকে আত্মস্থ করার এক অন্তর্গত সাধনা। তাই তিনি বলেন, “সুশিক্ষিত লোকমাত্রই স্বশিক্ষিত।”

তিনি ব্যাখ্যা করেন, একজন শিক্ষকের আসল দায়িত্ব কেবল জ্ঞান প্রদান নয়, বরং শিক্ষার্থীর মধ্যে জানার আকাঙ্ক্ষা ও চিন্তার ক্ষমতা জাগিয়ে তোলা। শিক্ষক পথ দেখাতে পারেন, কিন্তু চলার শক্তি শিক্ষার্থীকে নিজের ভেতর থেকেই অর্জন করতে হয়। তিনি বলেন—

“মনোরাজ্যেও দান গ্রহণসাপেক্ষ, অথচ আমরা দাতার মুখ চেয়ে থাকি, গ্রহীতার কথা ভুলে যাই।”

একজন সত্যিকার গুরু শিষ্যের আত্মাকে উদবোধিত করেন, তার অন্তর্নিহিত শক্তিকে মুক্ত করে দেন। সেই শক্তির বলেই শিষ্য নিজের মন নিজে গড়ে তোলে, নিজে বিদ্যা অর্জন করে। অর্থাৎ, শিক্ষা হচ্ছে আত্মপ্রকাশের পথ, যা নিজের প্রচেষ্টা ও আত্মজাগরণ ছাড়া সম্ভব নয়।

কারণ প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের সূচনা হয় নিজের মনন থেকে

শিক্ষা ও সাহিত্যের মধ্যে পার্থক্য


প্রমথ চৌধুরীর মতে, শিক্ষা এবং সাহিত্য — উভয়ই মানুষের বৌদ্ধিক বিকাশ ঘটায়। , তবে তাদের উদ্দেশ্য ও প্রকৃতি আলাদা।

শিক্ষা মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান, যুক্তিবোধ ও নৈতিকতা অর্জনের উপায়; এটি মূলত উপযোগবাদী

সাহিত্য মানবমনের আনন্দ, সৌন্দর্যবোধ ও সৃজনশীলতার প্রকাশ; এটি অলাভজনক হলেও প্রাণবন্ত ও আনন্দমুখর

তিনি মনে করেন, শিক্ষা জীবনের জন্য আবশ্যক, কিন্তু সাহিত্য জীবনের আনন্দ। শিক্ষা মানুষকে উপার্জনের পথ দেখায়, কিন্তু সাহিত্য মানুষকে বাঁচার অর্থ শেখায়। শিক্ষা মস্তিষ্ককে সমৃদ্ধ করে, সাহিত্য হৃদয়কে প্রশান্ত করে।

প্রমথ চৌধুরীর ভাষায়,

“শিক্ষা যেখানে কর্তব্যের, সাহিত্য সেখানে খেলার।”

অর্থাৎ, শিক্ষা জীবনের কর্তব্যের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু সাহিত্য মননের মুক্ত আনন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত।

প্রমথ চৌধুরী ও চলিত রীতির :

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলা ভাষা ছিল প্রাচীন, সংস্কৃতঘেঁষা ও ভারী গঠনের। শিক্ষিত সমাজের বাইরে তা  সাধারণ পাঠকের নাগালের বাইরে ছিল। প্রমথ চৌধুরী ‘সবুজপত্র’ (১৯১৪) পত্রিকায় ব্যবহৃত ভাষাশৈলী , সেটিই পরে “চলিত রীতি” নামে পরিচিত । তিনি  সাহিত্যে দৈনন্দিন কথ্যভাষাকে স্বাভাবিকভাবে প্রয়োগ করেন।—যেখানে লেখার ভাষা পাঠকের নিজের ভাষার কাছাকাছি।

তাৎপর্য

এ  ভাষা আন্দোলন ছিল কেবল সাহিত্যিক নয়, সামাজিকও। তিনি চেয়েছিলেন, ভাষার ব্যবহারে মানুষ যেন কৃত্রিমতা নয়, নিজের ভাব প্রকাশে স্বাধীনতা অনুভব করে। তিনি মনে করতেন যে,  কথার সরলতা, ব্যঙ্গ-রস ও আধুনিক ভাবনার সমন্বয় থাকা দরকার। “বীরবল” ছদ্মনামে তিনি প্রবন্ধ লিখে দেখান—কীভাবে হালকা রসের মধ্যে গুরুতর ভাবও তুলে ধরা যায়।


চলিত রীতির মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যে গণমানুষের কণ্ঠস্বর এনে দেন। এই ধারা পরে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বুদ্ধদেব বসু প্রমুখ লেখকদের লেখায় আরও বিকশিত হয়।

সাহিত্যে মানবজীবন খেলা করে এবং সেই খেলা আনন্দ উৎপন্ন করে

প্রবন্ধ ‘সাহিত্যে খেলা’ তে লেখক মানবজীবন ও সাহিত্যের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছেন।  তিনি বলেন  “সাহিত্যে মানবজীবন খেলা করে এবং সেই খেলা আনন্দ উৎপন্ন করে” —তাঁর মতে, সাহিত্য শুধু শিক্ষার উপকরণ নয়, এটি মানুষের মানসিক বিনোদন ও সৃষ্টিশীল আনন্দের উৎস।

প্রমথ চৌধুরীর ধারণা, সাহিত্য হলো মানুষের আত্মার অবসর ও কল্পনার রূপায়ণ। জীবনের গাম্ভীর্য, কষ্ট বা দুঃখের মধ্যেও মানুষ সৌন্দর্য খুঁজে পায় সাহিত্যের মাধ্যমে।

 তিনি বলেন—যেমন খেলায় মানুষ পরিশ্রম করেও আনন্দ পায়, তেমনই সাহিত্য রচনাও এক ধরনের মানসিক খেলা। এখানে বাস্তব জীবনের জটিলতা রূপ নেয় ভাবের ও রসের আনন্দে।


তাঁর মনে করেন যে,  সাহিত্য কোনো দায়বদ্ধ ধর্মোপদেশ নয়; বরং এটি এমন এক শিল্প, যেখানে মানুষ নিজের মনের গভীর ভাব, হাসি, কান্না, প্রেম, বেদনা—সবকিছুকে রূপ দেয় সৃজনের আনন্দে।  সাহিত্য কেবল বুদ্ধির খোরাক নয়, এটি আত্মার অবকাশ।

“ভাষা মানুষের মুখ হতে কলমের মুখে আসে, কলমের মুখ হতে মানুষের মুখে নয়” —

১৯১৪ সালে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের পূর্বসূরী হিসেবে প্রেমেন্দ্র মিত্র ভাষার স্বাভাবিক ব্যবহারের উপর জোর দেন।

তিনি মনে করেন, সাহিত্যিক ভাষা বইয়ে নয়, মানুষের মুখে জন্ম নেয় — জীবনের কথ্যভাষা থেকেই সাহিত্যভাষা গড়ে উঠবে।

কলম বা কৃত্রিম ভাষা নয়, বরং মানুষের মুখের ভাষাই প্রকৃত ভাষা।

এটি একধরনের প্রাকৃত ভাষাচেতনা, যেখানে বাস্তব জীবনের ভাষা সাহিত্যভাষাকে প্রভাবিত করে।

ফলে সাহিত্যিক ভাষা হয়ে ওঠে জীবন্ত ও জনসম্পৃক্ত।

“বীরবল কে ছিলেন?

বাংলা গদ্য সাহিত্যের প্রবর্তক প্রমথ চৌধুরী  সাহিত্যিক জীবনে “বীরবল” ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন।

ইতিহাসের বীরবলের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

বীরবলের প্রকৃত নাম মহেশ দাস। তিনি ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতের উত্তর প্রদেশের কাল্পি নগরে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম গঙ্গাদাস ও মাতার নাম অনভা দেবী।


তিনি সংস্কৃত, হিন্দি ও ফার্সি ভাষায় শিক্ষালাভ করেন এবং সংগীত ও ব্রজ কবিতায় পারদর্শী ছিলেন। প্রাথমিক জীবনে  রাজা রামচন্দ্রের সভায় কবি হিসেবে কাজ করতেন।


১৫৫৬ থেকে ১৫৬২ সালের মধ্যে তিনি সম্রাট আকবরের রাজসভায় যোগ দেন। তাঁর রসবোধ ও বুদ্ধিমত্তায় আকবর মুগ্ধ হয়ে তাঁকে “কবিরায়” উপাধি দেন এবং পরে “রাজা বীরবল” উপাধিতে ভূষিত করেন।


বীরবল ছিলেন আকবরের “নবরত্ন” সভার একজন খ্যাতনামা সদস্য। তিনি আকবরের উপদেষ্টা, কূটনীতিক ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। আকবরের ধর্মীয় নীতি “দ্বীন-ই-ইলাহী” প্রচারে বীরবল বিশেষ ভূমিকা রাখেন এবং তিনিই একমাত্র হিন্দু যিনি সেই ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।

১৫৮৬ সালে আফগান বিদ্রোহ দমনে যাত্রাকালে তিনি যুদ্ধে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুতে আকবর গভীরভাবে শোকাহত হন।

‘কথার কথা’ প্রবন্ধের মূল বিষয়

 ‘কথার কথা’ প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী মূলত বাংলা ভাষার প্রকৃতি, তার দৈন্য, এবং বিকাশের সঠিক দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।


তিনি মনে করেন — বাংলা ভাষার শক্তি নিহিত আছে তার স্বাভাবিক ব্যবহারে, কৃত্রিমতাহীন প্রবাহে।


তাঁর ভাষায়, “যে ভাষায় আমরা ভাবি, হাসি, কাঁদি, সুখ-দুঃখের কথা বলি — সেটিই আমাদের প্রকৃত বাংলা ভাষা।”

তিনি বিদেশি ভাষার শব্দ গ্রহণে আপত্তি করেননি কিন্তু সতর্ক করেছেন যে,

বাংলা সাহিত্য বিদেশি ভাষার অতিনির্ভরতায় নিজের স্বকীয়তা হারিয়ে  ফেলতে পারে।

সংস্কৃত শব্দের অতিরিক্ত  ব্যবহার বা ইংরেজি ভাবের অনুকরণকে তিনি বাংলা সাহিত্যের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেছেন।


তবে বিদেশি ভাষার প্রয়োজনীয় শব্দ গ্রহণে তিনি সম্পূর্ণ বিরোধী নন — তাঁর মতে, যে শব্দটি একান্ত প্রয়োজনীয়, সেটি ধার করা যেতে পারে, কিন্তু তা যেন বাংলার প্রাণের সঙ্গে মিশে যায়, ধার করে আনা “অচেনা পাথর” যেন না হয়।

প্রমথ চৌধুরী আরও বলেন, ভাষা কলম থেকে মুখে আসে না; মুখ থেকে কলমে আসে। অর্থাৎ, ভাষা মানুষের জীবিত কথার ভেতরেই জন্ম নেয়। কৃত্রিমভাবে গড়া সাহিত্যিক ভাষা যদি জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক হারায়, তবে সে ভাষা স্থবির হয়ে পড়ে।

তাঁর মতে, আধুনিক বাংলা সাহিত্য অনেক সময় “ইংরেজি ভাব, সংস্কৃত শব্দ আর বাংলা ব্যাকরণ মিশিয়ে বানানো এক জগাখিচুড়ি।” তাই তিনি বাংলা ভাষাকে প্রাণবন্ত করতে চেয়েছেন সহজ, প্রাঞ্জল, জীবনঘনিষ্ঠ রূপে।

সাহিত্য ও নৈতিকতা

প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যকে কেবল বিনোদন নয়, একটি নৈতিক ও রুচিশীল অনুশীলন হিসেবে দেখতেন। তাঁর মতে—

“যে জাতির ভাষায় শৃঙ্খলা নেই, সে জাতির চিন্তায়ও শৃঙ্খলা আসবে না।”


তাই তিনি ভাষাকে পরিশুদ্ধ, পরিমিত ও প্রাণবন্ত করে তোলার চেষ্টা করেছেন।

প্রমথ চৌধুরীর মতে- বাঙালিত্ব ও পাশ্চাত্য প্রভাব

প্রমথ চৌধুরী ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, কিন্তু অন্ধ অনুকারী নন। তিনি বলতেন—

“আমরা যদি ইংরেজি চিন্তা ধার করি, তবে তাকে বাংলা হৃদয়ে রোপণ করতে হবে।”

এই মনোভাবেই তিনি তৈরি করেছিলেন বাঙালি আধুনিকতার ভাষা—যেখানে পশ্চিমের যুক্তিবোধ ও বাংলার রসনাবোধ একীভূত হয়েছে। তাঁর গদ্য একদিকে যেমন সভ্যতার চিন্তা বহন করে, তেমনি অন্যদিকে গ্রামীণ জীবনের ঘ্রাণও হারায় না।

রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরী : ভাবের সেতুবন্ধন

প্রমথ চৌধুরী রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক ও ঘনিষ্ঠজন। দুজনের মধ্যে গভীর পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকলেও তাঁদের চিন্তার পথে সূক্ষ্ম পার্থক্য ছিল। রবীন্দ্রনাথ যেখানে মানবতাকে শিল্পের কেন্দ্রস্থল হিসেবে দেখেছেন, প্রমথ সেখানে যুক্তি ও রুচিবোধকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
তবে উভয়ের মিল এখানেই—দুজনেই বাংলা ভাষাকে আধুনিকতার বাহন করেছেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতার মতোই প্রমথের গদ্যও বাঙালির মননকে মুক্ত করেছে অলঙ্কারের শৃঙ্খল থেকে।

প্রমথ চৌধুরীর ভাষা ও প্রবন্ধচিন্তা বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তাঁর রসবোধ ও মানবতাবাদ আজও প্রাসঙ্গিক।

 প্রমথ চৌধুরী: আধুনিক বাংলা গদ্যের জনক

বাংলা গদ্যের ইতিহাসে প্রমথ চৌধুরীর নাম এক অনন্য দীপ্তি। তাঁর হাতে গড়ে উঠেছিল আধুনিক গদ্যের সেই মুক্ত ও রুচিশীল ভাষা, যা কেবল চিন্তার বাহন নয়, এক সৌন্দর্যবোধের প্রকাশমাধ্যম। রবীন্দ্র-যুগের সাহিত্যধারায় তিনি ছিলেন এক স্বতন্ত্র স্রোত—যিনি ভাষাকে বাঁধনমুক্ত করে দিলেন, অথচ তাতে শৃঙ্খলার সৌন্দর্যও রয়ে গেল।

প্রমথ চৌধুরীর জীবন ও শিক্ষাজীবন

১৮৬৮ সালে যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার গড়াই নদীর তীরে জন্ম প্রমথ চৌধুরীর। প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষা শেষে তিনি ইংল্যান্ডে যান ব্যারিস্টারি পড়তে। সেই সময় পাশ্চাত্যের সাহিত্য, দর্শন ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর গভীর পরিচয় ঘটে। দেশে ফিরে তিনি আইনের পেশায় যুক্ত হলেও সাহিত্যই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনব্যাপী সাধনা।

প্রমথ চৌধুরী ও ‘সবুজপত্র’

বাংলা সাহিত্যে “সবুজপত্র” ছিল যেন এক নবযুগের সূচনা। ১৯১৪ সালে এই পত্রিকার মাধ্যমে প্রমথ চৌধুরী ‘বঙ্গীয় গদ্য’কে এক নতুন দিশা দিলেন। এখানে প্রকাশিত লেখাগুলো—বিশেষত ‘বীরবলের হালখাতা’ শিরোনামের প্রবন্ধসমূহ—সেই সময়ের চিন্তাজগতে আলোড়ন তোলে। সবুজপত্র কেবল সাহিত্যপত্রিকা নয়, ছিল ভাবনা ও রুচির নবজাগরণের এক কেন্দ্র।

‘বীরবলের হালখাতা’: রস, ব্যঙ্গ ও দর্শন

‘বীরবলের হালখাতা’ প্রমথ চৌধুরীর সবচেয়ে বিখ্যাত প্রবন্ধমালা। এখানে তিনি সাধারণ জীবনের ঘটনাকে ব্যঙ্গ, রসবোধ ও দার্শনিক দৃষ্টিতে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ব্যঙ্গ কখনো তীক্ষ্ণ, কখনো হাস্যরসাত্মক, কিন্তু সবসময় মানবিক। সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির নানা অসঙ্গতি তিনি যেভাবে সূক্ষ্ম কৌতুকে তুলে ধরেছেন, তা বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে এক অনন্য উদাহরণ।

গদ্যের বিপ্লব: প্রমথের ভাষা

বাংলা গদ্যের ঐতিহ্যে প্রমথ চৌধুরী এক বড় বিপ্লব ঘটান। তিনি আড়ষ্ট, অলঙ্কারপ্রধান ভাষার পরিবর্তে স্বাভাবিক কথ্যরীতির ব্যবহার শুরু করেন। তাঁর ভাষা ছিল সহজ, প্রাঞ্জল, অথচ গভীর ভাববোধে ভরপুর। এই রচনাশৈলী পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদের—বিশেষত রবীন্দ্রনাথ, সজীবচন্দ্র, সজনীকান্ত, হুমায়ুন কবীর প্রমুখ—উপরেও গভীর প্রভাব ফেলে।

প্রমথ চৌধুরী ও রুচিবোধের শিক্ষা

তিনি মনে করতেন, সাহিত্য শুধু চিন্তার নয়—রুচিরও বিষয়। তাঁর লেখায় যেমন যুক্তিবোধ, তেমনি এক সূক্ষ্ম রসনাবোধ কাজ করে। প্রমথের মতে, “সাহিত্য যদি মনের পুষ্টি দেয়, তবে ভাষা তার মুখশ্রী।” এই ধারণাই তাঁকে বাংলা গদ্যের সৌন্দর্যবোধের শিক্ষক করে তুলেছে।

সমাজ ও মানবদৃষ্টি

প্রমথ চৌধুরী ছিলেন মুক্তচিন্তার মানুষ। সমাজের কুসংস্কার, ভণ্ড ধর্মাচার বা রক্ষণশীল চিন্তাধারাকে তিনি কখনো প্রশ্রয় দেননি। তাঁর প্রবন্ধে যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ ও উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রবল। তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে ও বলতে পারে।

সাহিত্য সমালোচনায় প্রমথ চৌধুরী

প্রমথ চৌধুরী বাংলা সমালোচনাচর্চায়ও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তাঁর প্রবন্ধে ব্যক্তিগত মত থাকলেও তা কখনো সংকীর্ণ নয়। তিনি সাহিত্যকে বিচার করেছেন তার রস ও গুণমানের ভিত্তিতে, লেখকের পরিচয়ের নয়। তাই তাঁর সমালোচনা আজও প্রাসঙ্গিক।

প্রমথ চৌধুরীর  উত্তরাধিকার কারা?

বাংলা গদ্যের বিকাশে প্রমথ চৌধুরীর অবদান স্থায়ী ও গভীর। তাঁর প্রভাব শুধু ভাষায় নয়—চিন্তার পদ্ধতিতেও। পরবর্তী যুগে সৈয়দ মুজতবা আলী, আহমদ ছফা, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ লেখকদের রচনায় প্রমথের ছায়া অনস্বীকার্য।

সবুজপত্র: প্রকাশের পটভূমি

১৯১৪ সালের আশ্বিন মাসে প্রথম প্রকাশিত হয় সবুজপত্র। সে সময় বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের আধিপত্য, বঙ্কিমচন্দ্রের প্রভাব এবং নবীন লেখকদের মধ্যে একধরনের অনিশ্চয়তা বিদ্যমান ছিল। প্রমথ চৌধুরী এই প্রেক্ষাপটেই তরুণদের জন্য খুলে দেন মুক্ত ভাবনার এক সবুজ মাঠ।

 তিনি বলেন—

“লেখকের প্রথম কর্তব্য নিজেকে চিনে নেওয়া; অন্যের মতো হয়ে ওঠা নয়।”

এই বক্তব্যেই ধরা পড়ে সবুজপত্র-এর আত্মা—ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের জাগরণ

সম্পাদকের দৃষ্টিতে সাহিত্য

সম্পাদনা মানেই অনেকগুলোর ভিতর থেকে বাছাই করা- এটা প্রমথ চৌধুরী মানতেন না।  ; তিনি বুঝতেন এক সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব।

তাঁর সম্পাদিত পত্রিকায় কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, সমালোচনা—সব কিছুই ছিল এক দৃষ্টিসম্পন্ন রুচির প্রকাশ। তিনি কোনো মতাদর্শ চাপিয়ে দেননি; বরং লেখকদের স্বাধীনতা দিয়েছেন নিজেদের কণ্ঠে কথা বলতে। ফলে সবুজপত্র  হয়ে উঠেছিল মতের বৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল, চিন্তার পরীক্ষাগার, যুক্তিনিষ্ঠা ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ।

আধুনিকতার ধারণা ও তার প্রয়োগ

বাঙালি সমাজে আধুনিকতা হঠাৎ করে  আসেনি ; এটি ছিল দীর্ঘ প্রক্রিয়ার  ভাবনা ও রুচির ক্রমবিকাশের ফল। প্রমথ চৌধুরীর নেতৃত্বে সবুজপত্র  আধুনিকতার যে মডেল তৈরি করে, তার মূল বৈশিষ্ট্য তিনটি—

১. যা বলা হবে তা যুক্তির দ্বারা অর্থাৎ   যুক্তিনিষ্ঠা ও ব্যক্তিস্বাধীনতাপ্রকাশই প্রধান
২. রুচি ও নন্দনবোধের পুনর্মূল্যায়ন, যা ছিল তা রাখতে হবে সে নীতিতে নয়।৩. সাহিত্যে সাধারণ জীবনের প্রতিফলন, জনজীবনের প্রতিফলন ছাড়া সাহিত্য নয়।

এই তিনটি বৈশিষ্ট্য পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের ধারা পাল্টে দেয়।

ভাষার বিপ্লব: “বীরবলের হালখাতা”

সবুজপত্র-এর সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল ‘বীরবলের হালখাতা’। যেখানে বাংলা প্রবন্ধের কোনো ভাষা ছিল না,  সেখানে প্রমথ চৌধুরী বাংলা প্রবন্ধের ভাষাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর ভাষা ছিল কথ্যরীতিনির্ভর, কিন্তু কখনোই অগভীর নয়, গ্রাম্যতাদোষে দুষ্ট নয়।  ‘বীরবলের হালখাতা’তে তিনি রাজনীতি, সমাজ, ধর্ম, শিক্ষা, সাহিত্য—সব ক্ষেত্রকে ব্যঙ্গ ও রসের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন। ব্যঙ্গ, উইট, হিউমার সবকিছুকেই তিনি ব্যবহার করেছেন। একটা নতুন স্টাইল বা রচনারীতি তিনি সৃষ্টি করেছেন।

উদাহরণস্বরূপ তিনি লিখেছিলেন—

“আমাদের সভ্যতা যেন এক রঙিন শাড়ি—বাইরে উজ্জ্বল, ভেতরে সেলাই।”

এই ধরনের বাক্যগঠন প্রমথীয় শৈলীর অন্যতম চিহ্ন।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

4 Responses

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *