প্রাকৃত ভাষার উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে আলোচনা কর প্রাকৃত ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্পর্কে আলোচনা।


প্রাকৃত ভাষা : উদ্ভব ও বিবর্তন।
উত্তর: প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষার বিবর্তনের ইতিহাসে পালি প্রাকৃত ও অপভ্রংশ স্তর মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষা নামে পরিচিত। Dr.framke এর মতে-এই মধ্যভারতীয় আর্য ভাষার পর্যয়কে প্রাকৃত নামে অভিহিত করা যায়। এক সময়ে এমনই প্রভাব বিস্তারী ছিল এই প্রাকৃত ভাষা। এ ভাষায় লেখা হয়নি কোন ঐশ্বরিক শ্লোক, এভাষা পায়নি কোন সমাজ প্রভুদের স্নেহ। তবুও এ ভাষাতেই আমরা ভারতীয় রচনার প্রথম পাঠযোগ্য লিখিত প্রমান পাই। কিন্তু প্রাকৃত শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ নিয়েও নানা মুনির নানা মত। ”প্রকৃতিতে যাহা জাত ” তার নামই প্রাকৃত। অনেকে বলেন এই,প্রকৃতি হল সংস্কৃত ভাষা আর প্রাকৃত হল সংস্কৃতের বিকৃতি। কারও মতে স্বভাব থেকে যে ভাষা আর প্রাকৃত। প্রাকৃত লোকের ভাষা প্রাকৃত ভাষা)
শুধু প্রাকৃত শব্দ নয় প্রাকৃত ভাষার উৎপত্তির ইতিহাস নিয়েও পন্ডিত মহলে মতপার্থক্য বিদ্যমান। (অন্ত নেই) জার্মান পন্ডিত ওয়েবারের মতে- সংস্কৃত কোন সময়ই জনসাধারনের মুখের ভাষা ছিল না। কাজেই সংস্কৃত থেকে প্রাকৃতের উৎপত্তি কথাটি মিথ্যা। বৈয়াকরণের হাতে পরিমার্জিত হয়ে সংস্কৃত ভাষায় দাঁড়িয়েছে। অন্য শাখাটি ক্রমশ লোক মুখে পরিবর্তিত হয়ে অনিয়ত বেগে প্রবাহিত হয়ে সৃষ্ঠি করেছে প্রাকৃত ভাষার। তাই বৈদিকের একটি রূপ শিষ্ঠ মার্জিত, পরিচ্ছন্ন যার নাম সংস্কৃত, অন্যটি লৌকিক ধারায় প্রবাহিত সহজতর, সরলতর, সৃষ্ঠি ছাড়া গতির আনন্দে পাগল-পারা, যার নাম প্রাকৃত। সেই জন্যে প্রাকৃত ভাষার অনিয়ম এমনকি বহু শব্দের মূল, সংস্কৃতে দেখতে পাওয়া যায় না, কিন্তু বৈদিক ভাষায় পাওয়া যায়।


অধ্যাপক ঔপ্রেকটের মতে, আর্যরা প্রথম এসে ছিল পাঞ্জাবে। ফলে বৈদিক ঋকবেদের ভাষা সমগ্র ভারতে প্রচলিত হতে পারে না। অনার্যদের নিজস্ব একটা ভাষা ছিল। আর্যরা ভারতে আসার পর আর্য ও অনার্যদের মধ্যে ক্রমশ সংমিশ্রণ ঘটে এবং স্বাভাবিক ভাবেই আর্য ভাষার মধ্যে অনার্য ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটে। পরবর্তী কালে রাজনৈতিক বিপ্লবে অনার্যরাই সক্ষমতায় আসে এবং তাদের ভাষাই প্রাধান্য লাভ করে। ফলে সাধারণের চলতি ভাষা প্রাকৃত প্রাধান্য পেল। ফলে অধ্যাপক ঔপ্রেকটের মতে প্রাকৃত ভাষা গঠিত হয়েছে দুই ভাবে-বৈদিকের সরলতর রূপ থেকে এবং আর্যদের পূর্বে যে সমস্ত অনার্য জাতি এদেশে বাস করতেন তাঁদের ভাষা থেকে শব্দ সংগ্রহ করে।
অধ্যাপক ল্যাসেন বলেন- এক সময় বৈদিক ছিল জনসাধারণের কথিত ভাষা। পাণিনি এই লৌকিক ভাবে কথিত বৈদিক ভাষাকে নিয়মশৃঙ্খলায় আবদ্ধ করে সংস্কৃতে রূপ দেন। সংস্কৃত ভাষা গঠিত হওয়ার পর যে লৌকিক ভাবে ব্যবহৃত বৈদিক ভাষা থাকল, সেটাই তখন সহজতর সরলতর হয়ে প্রাকৃতে এসে দাঁড়াল। তাঁর মতে সংস্কৃত প্রাকৃত একসঙ্গে উৎপন্ন হয়নি। প্রথমে বৈদিক পরে বৈদিকের বিকৃতি এবং তার থেকে প্রাকৃত; পরে সংস্কৃতের উৎপত্তি। প্রাকৃত অনেক আগের স্তরের ভাষা- সংস্কৃত এসেছে পরে।
অধ্যাপক বেনফি প্রমাণ করেছেন যে- মহরাজ অশোকের সময় গুজরাটে ও মগধে দুই রকম দেশি ভাষা প্রচলিত ছিল। এদের কোনোটার সাথে সংস্কৃত ভাষা পাশাপাশি প্রচলিত ছিল না। তাঁর মতে এ সমস্ত প্রদেশে ভাষা ক্রমশ পরিবর্তিত হয়েছে। বৌদ্ধরা বলেন বুদ্ধ তাঁর বাণী সংস্কৃতে নিবদ্ধ করতে বারণ করেছিলেন। ষষ্ঠ শতাব্দীতে যখন ভারতে বুদ্ধের আর্বিভাব হয় তখন লোকের কথ্য ভাষা সংস্কৃত ছিল না। বেনফির মতে এর দুই তিন শতাব্দী পূর্বে সংস্কৃত জন সাধারণের ভাষা হিসাবে প্রচলিত থাকলেও থাকতে পারে।
হেমচন্দ্র নামে একজন ভারতীয় প্রাকৃত বৈয়াকরণ বলেছেন- প্রাকৃতঃ সংস্কৃত; তত্র ভবং তত আগত; বা প্রাকৃতম।- সংস্কৃতই হচ্ছে প্রকৃতি বা মূল। তার থেকে যা এসেছে বা উৎপন্ন হয়েছে তাই প্রাকৃত।” (প্রাকৃত চন্দ্রিকা রচয়িতা কৃষ্ণ পন্ডিতও বলেছেন- সংস্কৃতই প্রকৃতি তা আবার সংস্কৃতসম (তৎসম), সংস্কৃতভব (তদ্ভব) এবং দেশি-এই তিন রকম।”)
ডঃ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, শুধু বৈদিক ভাষা-ভাষীর আর্যরা ভারতে আসেন নাই, তাদের সঙ্গে অন্য উপভাষা-ভাষী আর্যগণও ভারতে আসতে পারে। সেই উপভাষার বিবর্তনের ফলেও প্রাকৃত ভাষার উৎপত্তি হতে পারে। অতএব বলা যায় প্রাকৃত ভাষার উৎপত্তি সংস্কৃত ভাষার মত নয়। পালি বিশারদ রবীন্দ্র বিজয় বড়ুয়া বলেন, “প্রাকৃত সংস্কৃত অপেক্ষা বৈদিকের নিকটতম এবং আর্যদের কোনো উপভাষা হইতেই সম্ভবত প্রাকৃত বা মধ্যভারতীয় আর্যভাষার উৎপত্তি হয়। সংস্কৃত হইতে প্রাকৃতের উৎপত্তি হয় নাই।”
প্রাকৃত ভাষার ক্রমবিকাশ
ভারতীয় আর্য ভাষা (Indo Aryan/Indic) প্রাচীন পর্ব চুকিয়ে মধ্য পর্বে প্রবেশ করেছে খ্রীষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে, আর এই পর্বের জের চলেছে প্রায়-খ্রিষ্টীয় ১১শ শতক পর্যন্ত। ভারতীয় আর্য ভাষার এই স্তরটিতে এসে গণ-সংস্কৃতের চঞ্চল প্রাণ ভোমরাটি যেন বন্ধ কোটা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। এই গণমুক্তির স্বাদ বয়ে এনেছিল একটি ভাষা যার নাম প্রাকৃত। (প্রাকৃত ভাষার আদি ভাবের সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া গেল ভারতের বিপুল পরিধির অন্তরে ভাষা তারুণ্যের দুর্দমতা। লোক-সংস্কৃত বা কথ্য-সংস্কৃত-কেন্দ্রিক বিবর্তনের ফলেই জন্ম নিয়েছে মধ্যভারতীয় আর্য ভাষা। মধ্যভারতীয় আর্য ভাষা বা সাধারণ প্রাকৃত কয়েকটি সুস্পষ্ট স্তর অতিক্রম করে পরিণতি লাভ করেছে। জর্জ গ্রীয়ার্সন, ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ বিদ্যানদের মতে এই কালানুক্রমিক বিবর্তিত স্তর বিন্যাস হল–
১। আদি উপস্তর (IMIA) : আনুমানিক স্থিতিকাল খ্রীঃ পূঃ ৬০০-২০০ অব্দ। রচনা নির্দেশন:
- ক) অশোক শেখ (খ্রীঃ পূ ৩য় শতক-খ্রীষ্টীয় ২য় শতক)
- খ) খ্রীষ্ট-পূর্ব শতকের অন্যান্য প্রতœ লেখ।
- গ) হীনযান মতাবলম্বী বৌদ্ধদের প্রাচীনতম গ্রন্থে ব্যবহুত পালি ভাষা (খ্রীঃপূ.৩০০-খ্রীষ্টীয় ২০০)
- ঘ) মহাযানী বৌদ্ধদের রচিত বৌদ্ধ মিশ্র সংস্কৃত সাহিত্য (খ্রীঃপূ ২০০-খ্রী.৩০০)
২। ক্রান্তিপর্ব (Thasitianal MIA): আনুমানিক স্থিতিকাল (খ্রীঃ পূ. ২০০-খ্রীষ্টীয় ২০০ অব্দ) রচনা নির্দেশন: মধ্য এশিয়ায় প্রাপ্ত খরোপী লিপিতে লিখিত খরোপী বা খোর্টানী ধস্মপদ (এবং চীনা তুর্কীস্থানে প্রান্ত খরোপী লিপিতে লিখিত নিয়া প্রাকৃত নির্দেশন)
৩। মধ্য উপস্তর: আনুমানিক স্থিতি কাল-খ্রীষ্টীয় ২০০ থেকে ৬০০ অব্দ। রচনা নিদের্শনঃ সাহিত্যিক প্রাকৃত।
৪। অন্ত্য উপস্তর(MIA/Lala MIA) বা অপভ্রংশ: আনুমানিক স্থিতিকাল-খ্রীঃ ৬০০-১০০০) রচনা নির্দেশন- বিপুল অপভ্রংশ সাহিত্য।
খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে অশোকের যে সমস্ত অনু শাসন পাওয়া গিয়েছে তাতে তখনকার প্রাকৃতের ৪টি উপভাষার পরিচয় পাওয়া যায়-
- ১) উত্তর-পশ্চিমা (শাহবাজগড়ী ও মানসেহরা অনুশাসন)
- ২) দক্ষিণ পশ্চিমা (গিরনার অনুশাসন)
- ৩) প্রাচ্যমধ্য (কালসী ও ছোট অনুশাসন)
- ৪) প্রাচ্যা (ধোলী ও জৌগড় অনুশাসন)
একজন পাশ্চাত্য পন্ডিত এ. সি. উলজার মধ্য উপস্তরকে নিম্ন লিখিত ভাগে ভাগ করেছেন:
- ১) মহারাজ ও দাক্ষিণাত্যের গীতি কবিতার ভাষা
- ২) কালিদাস এবং তার পরবর্তীদের নাটকে ব্যবহৃত এবং ব্যাকরণে উল্লিখিত ভাষা। যেমন- শৌরশেনি ও মারাঠি।
- ৩) পরবর্তী কালে জৈন গ্রন্থের উপভাষা।
- ৪) বৃহৎ কথা নামক গ্রন্থের ভাষা।
এদেশে এক সময় প্রাকৃত ভাষার খুবই প্রাধান্য ছিল। সমগ্র ভারতব্যাপী প্রাকৃত ভাষা প্রচলিত ছিল। প্রাকৃতের আর্বিভাবে কেবল ভাষা বিবর্তনের নতুন ইতিহাসই সূষ্টি হয়নি, জনগণ-মানসের আদর্শগত দ্ব›েদ্বর প্রতিচ্ছবি ও ভাষাগত দ্ব›েদ্বর বৈপরীত্যের প্রতিফলনও ফুটে উঠেছিল। বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির সঙ্গে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম অধিষ্ঠিত পূর্বাঞ্চলের পার্থক্য জীবনাদর্শ ও ধ্যান-ধারণার পার্থক্য ঘনায়মান হয়ে উঠেছিল। এই ঋন্ধিক প্রত্যয়ের আকুতি প্রকাশের আবেগ খুঁজছিল উপযুক্ত মাধ্যম। তাই, কোনো প্রথাগত ভাষাদর্শকে আকড়ে থাকার মত রক্ষণশীলতার বিরূদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার জন্যই যেন আর্বিভূত হল প্রাকৃত জনের ভাষা প্রাকৃত ভাষা। তাই কালক্রমে প্রাকৃত ভাষার ছত্রছাযায় জমে উঠল অগণিত সাধারণ মানুষের ভীড়, বিচিত্র পথে বৈচিত্র্যের সমারোহ ছড়িয়ে পড়ল তার অশান্ত গতিতে। প্রাকৃত ভাষার ব্যাপকতা ও বিষয়-বৈচিত্র্য দেখান যায় এই ভাবে-
- ১। ধর্মীয় প্রাকৃত: যথা পালি, অর্ধমাগধী, জেন মহারাজী জৈন শৌরসেনা এবং অপভ্রংশ।
- ২। সাহিত্যিক প্রাকৃত: যথা মহারাশ্রী, শৌরসেনা মাগধী, পৈশাচী এবং বিভিন্ন উপভাষা সহ অপভ্রংশ সংস্কৃত নাটকে বিশেষভাবে ব্যবহাত হওয়ার জন্য প্রথম তিনটি নাটকের প্রাকৃত বা Dramatie Prakrit বলা হয়। এই সাহিত্যিক প্রাকৃতের মধ্যে আঞ্চলিক স্থানিক বিভেদ অনাদীকাল।
- ৩। বৈয়াকরণে উল্লিখিত প্রাকৃত: মহারাষ্ট্রী. পৈশাচী. চুলিকা পৈশাচী
- ৪। বহির্ভারতীয় প্রাকৃত: খোটানে আবিস্কৃত খরোপী লিপিতে লিখিত প্রাকৃত ধস্মপদের অংশ বিশেষ এবং নিয়া ও খোটানী প্রাকৃত।
- ৫। শিলালেখে উৎকীর্ণ: ব্রাহ্মী ও খরোষ্টী লিপিতে লিখিত অশোক ও তার পরবর্তী যুগে উৎকীর্ণ শিলালেখা পাওয়া যায় সমগ্র ভারতে।
- ৬। কথ্য সংস্কৃত: এর মূলে আছে প্রাকৃতের সংস্কৃতায়ন। প্রমানণ মিলেছে হিন্দুদের মহাকাব্য দুটিতে বৌদ্ধদের সহদুর এবং জৈন সংস্কৃত।
বৃহত্তর ভারতবর্ষে প্রাকৃত ভাষা তার আঞ্চলিক বিশেষত্ব নিয়ে চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত। যথা- মাগধী, মহারাষ্ট্রী, শৌরসেনি এবং পৈশাচি একটি ভাগ-অর্ধ মাগধী। সামাজিক এবং প্রকৃতির নিয়মে এক এক অঞ্চলের প্রাকৃতে এক এক রকম স্থানীয় বিশেষত্ব এসেছে। মাগধী প্রাকৃত সংস্কৃত নাটকে অশিক্ষিত ইতর জনের কথ্য ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত কবিতা বা গানের ভাষা হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। শৌরসেনী সংস্কৃত নাটকে নারী ও অশিক্ষিত পুরুষের কথ্য ভাষা হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। পৈশাচি প্রাকৃতে রচিত হয়েছে নিম্ন সমাজে প্রচলিত লোক সাহিত্য।
প্রাকৃত সাহিত্যের ব্যাপকতাও উপেক্ষণীয় নয়। অর্ধ মাগধীতে রচিত বিপুল জৈন শাস্ত্র প্রাকৃত সাহিত্যেরও বৃহত্তর অংশ। এছাড়াও আছে এ ভাষায় রচিত উৎকৃষ্ট কাব্যগ্রন্থ। এ ভাষায় লেখা হয়েছে বিভিন্ন মহাকাব্য, আখ্যানকাব্য, নাটক, দার্শনিক গ্রন্থ, ব্যাকরণ, বিভিধ কোষ ইত্যাদি। খ্রী পূঃ চতুর্থ শতক থেকে চতুর্থ শতাব্দ পর্যন্ত সময় পরিধির মধ্যে প্রান্ত প্রধান প্রতœলেখ এবং মুদ্রালিপি মুখ্যত এই প্রাকৃত ভাষাতেই লিখিত। এমনি ভাবে দীর্ঘ কাল ধরে ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত এই প্রাকৃত ভাষা ভারতের মাটিতে বিচিত্রভাবে ক্রম বিকশিত হয়েছে। এই দীর্ঘ ব্যাপ্তিতে তার বিকাশ হয়েছে পরিপূর্ণ।
নিম্নে বংশলতিকা ও সংক্ষিপ্ত চার্ট দেওয়া হলো, যা অন্য উৎস থেকে সংগৃহীত।
প্রাকৃত ভাষার উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ
বংশলতিকা (Genealogical Tree)
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা
│
└── ইন্দো-ইরানীয় ভাষা
│
└── ইন্দো-আর্য ভাষা
│
├── বৈদিক সংস্কৃত
│
├── ভাষিক (লোক-সংস্কৃত / উত্তর-সংস্কৃত)
│
└── প্রাকৃত ভাষা
│
├── মধ্যভারতী (Middle Indo-Aryan)
│ │
│ ├── পালি
│ ├── অর্ধমাগধী
│ ├── শৌরসেনী
│ └── মহারাষ্ট্রী
│
└── অপভ্রংশ (Apabhramsha)
│
├── পুরাতন বাংলা
├── পুরাতন হিন্দি
├── গুজরাতি-রাজস্থানি রূপ
└── অন্যান্য নতুন আর্য ভাষার পূর্বরূপ
│
└── আধুনিক বাংলা, হিন্দি, ওড়িয়া, অসমিয়া প্রভৃতি
প্রাকৃত ভাষার ক্রমবিকাশ চার্ট
(Vedic → Prakrit → Apabhramsha → Modern Languages)
বৈদিক সংস্কৃত (c. 1500–600 BCE)
│
▼
লোক-সংস্কৃত / প্রাকৃতের পূর্বরূপ
│
▼
প্রাকৃত ভাষা (c. 600 BCE – 1000 CE)
│
├── পালি (বৌদ্ধ সাহিত্যে)
├── অর্ধমাগধী (জৈন আগম)
├── শৌরসেনী (উত্তর ভারতের নাট্যভাষা)
└── মহারাষ্ট্রী (প্রাচীন গীতি ও কবিতা)
│
▼
অপভ্রংশ (c. 1000–1400 CE)
│
▼
পুরাতন বাংলা (চর্যাপদ)
│
▼
মধ্য বাংলা / মধ্যযুগ
│
▼
আধুনিক বাংলা (19শ শতক–বর্তমান)
সংক্ষিপ্ত বক্স চার্ট (Blog-Friendly Version)উৎসভাষা → পরিবর্তন → ফলিত ভাষা
| স্তর | সময়কাল | ভাষা | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|---|
| ১ | প্রাচীন | বৈদিক সংস্কৃত | ইন্দো-আর্য ভাষার প্রাচীনতম ধাপ |
| ২ | প্রাচীন → মধ্য | লোক-সংস্কৃত | কথ্য সংস্কৃত; প্রাকৃতের পূর্বরূপ |
| ৩ | মধ্য | প্রাকৃত | পালি, অর্ধমাগধী, শৌরসেনী, মহারাষ্ট্রী |
| ৪ | মধ্য → নতুন | অপভ্রংশ | আধুনিক ভাষাগুলোর সরাসরি উৎস |
| ৫ | নতুন যুগ | পুরাতন বাংলা | চর্যাপদ |
| ৬ | মধ্য যুগ | মধ্য বাংলা | কাব্য, বৈষ্ণব সাহিত্য |
| ৭ | আধুনিক | আধুনিক বাংলা | গদ্য, সংবাদপত্র, আধুনিক লেখনভাষা |
প্রাকৃত ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্পর্ক
কোমল মধুর বিদ্রোহী আমরি বাংলা ভাষা কোথা থেকে এলো? কোন ধূসর অতীতের পথ মেড়ে এলো সে আমাদেরই ধান-কাউনের আঙিনায় আমার। প্রিয় দুখিনি বর্ণমালার জীবনি জানতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই প্রাকৃতের পোড়ো বাড়ীতে ফিরে যেতে হবে। হ্যাঁ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় বাংলা তথা নব্যভারতীয় আর্যভাষা এসেছে পূর্ববর্তী স্তর মধ্যভারতীয় আর্যভাষা তথা ব্যাপক অর্থে প্রাকৃতের ক্রোড় থেকে। তাই বাংলা ভাষার ইতিহাস ভিত্তিক ভাষাতাত্বিক পঠন-পাঠনের জন্যে প্রাকৃত ভাষা সম্বন্ধে জ্ঞান অপরিহার্য।
সংস্কৃত নয় প্রাকৃতের সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। আর এই জন্যেই বাংলা কোনো শব্দের মূল অন্বেষণ করতে হলে আমাদেরকে প্রথম স্মরণ নিতে হয় পালি প্রাকৃতের। তবে কোন প্রকৃত থেকে কোন মূহূর্তে বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছিল তা নিয়েও পন্ডিত মহলে মতভেদ আছে। ড. সুনীতিকুমার মনে করেন মাগধী প্রাকৃত থেকে এসেছে বাংলা ভাষা। কিন্তু ড মুহাঃ শহীদুল্লাহ বাংলা উৎপত্তি সম্পর্কে একটু ভিন্ন মত পোষণ করেন। মাগধী প্রাকৃতের সংগে অনেক ক্ষেত্রেই বাংলার সম্পর্কে নেই। তিনি মনে করেন একটি প্রকৃতের নাম গোড়ৗ প্রাকৃত। গোড়ৗ প্রাকৃতেরই পরিণত অবস্থা গোড়ৗ অপভ্রংশ থেকে উৎপত্তি ঘটে বাঙলা ভাষার। যা হোক প্রাকৃত ভাষা থেকেই বাংলার জন্ম হয়েছে- এ কথা ঠিক। তবে কোন ভাষার প্রভাব বাংলায় বেশি তা নিয়ে এখনও পন্ডিতগণ একমত হতে পারেন নি।