চর্যাপদের গুরুত্ব আলোচনা কর। অথবা, কোন বিশেষ রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে চর্যাপদ রচিত হয়েছিল- আলোচনা কর।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক …

চর্যাপদ রচনার প্রেক্ষাপট

উত্তর: চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন। কাল বিচারে চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের মহামূল্যবান কীর্তি। শুধু বাংলা ভাষার নয়, সমস্ত পূর্ব ভারতের নব্যভাষার প্রথম গ্রন্থ হিসেবে চর্যাপদের মূল্যায়ন করা হয়। চর্যাপদ আবিষ্কারের আগে ময়নামতির গান, গোরক্ষবিজয়, শূন্যপুরাণ, ডাক ও খনার বচন, রূপকথা ইত্যাদি বিষয়গুলোকে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে ধরা হতো। তাই, চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চর্যাপদের ভাষা ও পদকর্তাদের বিবর্তন কাল ধরেই বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। নিম্নে চর্যাপদের গুরুত্ব আবিষ্কারের ইতিহাস, চর্যাপদ রচনার প্রেক্ষাপট আলোচনা করার প্রয়াস নেব।

চর্যাপদ পুথি
আদি নিদর্শন চর্যাপদ

চর্যাপদ আবিষ্কারের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট :কে, কবে, কখন চর্যাপদ আবিষ্কার করেন ?

চর্যাপদ বৌদ্ধ ধর্মের সাধন পদ্ধতিমূলক গান। বৌদ্ধসিদ্ধাচার্যরা এর রচয়িতা। ১৯০৭ সালের আগে এ বৌদ্ধগানগুলো সম্পর্কে কোনো ধারণাই বা কোনো তথ্যই জানা ছিল না। রাজেন্দ্রলাল মিত্র সর্বপ্রথম নেপালে যান বৌদ্ধ ধর্মের বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে। ১৮৮২ সালে প্রকাশিত The Sanskrit Buddhist Literature in Napal গ্রন্থে তিনি নেপালের বৌদ্ধতান্ত্রিক সাহিত্যের কথা প্রকাশ করেন।

রাজেন্দ্রলালের মৃত্যুর পর ১৮৯১ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী পুঁথি সংগ্রহের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি নেপালে বৌদ্ধ ধর্মের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য ১৮৯৭ ও ১৮৯৮ সালে নেপালে যান এবং কিছু সংস্কৃত পুঁথির সন্ধান পান। সে-সব সংস্কৃত পুঁথির মধ্যে একটি হলো ডাকার্ণব।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর নেপালে যাওয়ার প্রেক্ষাপট:

এরপর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে পুনরায় নেপালে যান এবং কতকগুলো পুথি আবিষ্কার করেন। এর মধ্যে একটি হলো চর্যাচর্যবিনিশ্চয়। এতে কিছু কীর্তনজাতীয় গান ও তার সংস্কৃত টীকা আছে। গানের নাম চর্যাপদ গানগুলো অনেকটা বৈষ্ণবদের কীর্তনের মতো। আর একটি পুঁথি হলো দোঁহাকোষ, গ্রন্থকারের নাম সরহপা, টীকাটি সংস্কৃতে, টীকাকারের নাম অন্বয় বজ্র। দোঁহাকোষ নামে আরও একটি গ্রন্থ পান, যার রচয়িতার নাম কৃষ্ণাচার্য, সংস্কৃত টীকাকারের নাম আচার্য পদ

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল থেকে ফিরে এসে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় পুঁথি সংগ্রহের ইতিহাস বর্ণনা করেন। ১৯১৬ সালে হরপ্রসাদ শ্রান্তীর সম্পাদনায় গ্রন্থগুলো বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত হয়। চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, বজ্রগীত কোষ, ডাকার্ণব, সরহপাদের ও কৃষ্ণাচার্যের দোঁহাকোষ একত্রে হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোঁহা নামে প্রকাশিত হয়। সংক্ষেপে এগুলোই বৌদ্ধগান ও দোঁহা বা চর্যাপদ নামে পরিচিত। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মনে করেছিলেন এগুলো সবই বাংলায় লেখা। কিন্তু এগুলোর মধ্যে একমাত্র চর্যাপদই প্রাচীন বাংলায় লেখা অন্য তিনটি বাংলায় নয়। অপভ্রংশ ভাষায় রচিত।

চর্যাপদ রচনার প্রেক্ষাপট: (কোন রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে চর্যাপদ রচিত হয়েছিল)

বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ বৌদ্ধসিদ্ধাচার্যদের সাধন সঙ্গীতমূলক গান। বৌদ্ধ ধর্মের সাধন প্রণালী এতে বর্ণিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে চর্যাপদ রচিত হয়েছিল। নিম্নে তা আলোচনা করা হলো।

পাল আমলে চর্যাপদগুলো রচিত হয়। অসীত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে বলেছেন যে, পাল আমলে বৌদ্ধ তান্ত্রিকতা, কৌলমার্গ, নাথপন্থ, হিন্দু তান্ত্রিকতা ইত্যাদির মধ্যে একটা সমন্বয় দেখা যায়। শ্রেণিবিভক্ত সমাজ ব্যবস্থায় নতুন করে ব্রাহ্মণ্য পুরাণের প্রভাব স্থাপিত হয়। এ সময়ে শঙ্করাচার্যের ও কুমারিল ভট্টের চেষ্টার ফলে ভারতবর্ষে পৌরাণিক হিন্দুধর্ম শাস্ত্রসংহিতার নিয়ম-কানুন মেনে নিয়ে পুনরায় চালু হয়। এ প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ।

বিস্তারিত প্রেক্ষাপট

পাল রাজারা মহাযানী বৌদ্ধ হলেও ব্রাহ্মণ্যমতসহ অন্যান্য মতের প্রতি কখনো বিরূপ ছিলেন না। তাদের কেউ কেউ হিন্দু পুরাণ সাহিত্যেরও ভক্ত ছিলেন। সমাজের উঁচু স্তরে পৌরাণিক হিন্দু ধর্ম স্থান লাভ করলেও অন্ত্যজ শ্রেণীর মধ্যে রহস্যবাদী, কায়াসাধন প্রণালীকে কেন্দ্র করে হিন্দু ও বৌদ্ধ দর্শন গোপনে চালু হয়।

উঁচু স্তরে পুরাণ ও স্মৃতিসংহিতা চালু থাকলেও অন্ত্যজ সমাজে বজ্রযান, সহজযান, কুলাচার, নাথধর্ম ইতাদি অর্ধরহস্যবাদী ও অর্ধদেহবাদী গুহ্যতান্ত্রিক মত যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে পরবর্তীকালে সেন আমলে সংস্কৃত ভাষা সাহিত্য গড়ে উঠলেও পাল আমল থেকেই অপভ্রংশ ও দেশীয় ভাষায় গোপন সাধন প্রণালী কেন্দ্রিক চর্যাপদ সৃষ্টি হয়। চর্যার কবিদের জীবনকাল এবং পাল রাজাদের শাসনকাল মেলালে বোঝা যায় যে, চর্যাপদ পাল আমলে রচিত।

ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সমর্থক সেনদের দ্বারা পাল রাজারা পরাজিত হলে বৌদ্ধধর্ম সেনরাজাদের রোষানলে পড়ে। খ্রিস্টিয় পঞ্চম শতক থেকে প্রিয় স্বদেশ ভারতভূমি থেকে হিন্দু ও ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বৌদ্ধগণ তিব্বত, নেপাল, চীন প্রভৃতি দেশে গমন করে বৌদ্ধদের উপর সীমাহীন নির্যাতনের কারণে তারা এদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। স্বদেশভূমি থেকে বিতাড়িত বৌদ্ধগণ নতুন দেশে নতুন করে জীবন, ধর্ম ও সাহিত্য সাধনায় মগ্ন হয়। ফলশ্রুতিতে চর্যাপদের ন্যায় ধর্মীয় সাহিত্য রচিত হয়।

বৌদ্ধদের ধর্মীয় প্রেক্ষাপট:

বৌদ্ধরা ছিল ধর্মপরায়ণ। সাধনা ছিল তাদের ধর্মের মূল প্রেরণা। তাদের ধর্মও ছিল। সঙ্গীতনির্ভর। ফলে বৌদ্ধরা ধর্মীয় নির্বাণ লাভের জন্য ধর্মীয় সংগীত রচনা করে এবং ধর্মীয় সংগীতের মধ্যে তাদের সাধন প্রণালী বর্ণনা করে। এভাবে চর্যাগুলো ব্যাপক হারে রচিত হয়।

যোগব্রত ও তান্ত্রিক সাধনা বৌদ্ধধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ সাধনা জটিল ও কঠিন। তাই সিদ্ধাচার্যরা তাদের তান্ত্রিক সাধনা পদ্ধতিকে সংরক্ষণের আশায় গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করার জন্য চর্যাপদ রচনা করেন।

বৌদ্ধধর্মের একটি প্রধান শাখা হলো মহাযান। এই মহাযান থেকে সৃষ্ট সহজিয়া পন্থীদের ধর্মগ্রন্থ হলো চর্যাপদ। ফলে চর্যাপদে সহজিয়া ধর্মমতের প্রাধান্য বিদ্যামান। সহজিয়া ধর্মমত কী: তার ব্যাখ্যাকরণের উদ্দেশ্যেই চর্যাপদ রচিত হয়েছিল।

বৌদ্ধদের বিতাড়িত হওয়ার প্রেক্ষাপট:

বৌদ্ধরা ভারতবর্ষ থেকে বিতাড়িত হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই তারা নেপালে বা নতুন জায়গায় মানবেতর জীবনযাপন করত। এতে তাদের মনে ক্ষোভ থাকাটাই স্বাভাবিক। তাদের সে মানবেতর জীবনযাপনের ছবি এবং ক্ষোভ লিপিবদ্ধকরণার্থে চর্যাপদ রচিত হয়ে থাকতে পারে। চর্যাপদে তার প্রমাণ মেলে। তাই, ধর্মীয় সঙ্গীত ও সাধন-প্রণালী বর্ণিত হলেও তৎকালীন সমাজচিত্র দারুণভাবে চর্যাপদে ফুটে উঠেছে।

অনেকে মনে করেন বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনার প্রয়াস থেকেও চর্যাপদ রচিত হতে পারে। নেপালে অবস্থিত সিদ্ধাচার্যদের মধ্যে অনেক বাঙালি পণ্ডিতও ছিলেন। তাঁরা বাংলা ভাষার উদ্ভবকালে এ ভাষার উৎকর্ষ সাধনে তৎকালীন জনপ্রিয় বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্মতত্ত্ব নিয়ে চমৎকার সব চর্যা রচনা করে।

ধর্মমত প্রচারের উদ্দেশ্যেও চর্যাপদ রচিত হয়ে থাকতে পারে। অনেকে বলেন যে, মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্মমতের প্রচারই চর্যাপদ রচনার প্রধান কারণ। বৌদ্ধধর্মের তান্ত্রিক সাধনা ছিল জটিল ও কঠিন। সে সাধনাকে অপেক্ষাকৃত সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করে সাধারণের কাছে এ ধর্মের বাণী পৌছে দিয়ে তাদেরকে আকৃষ্ট করাই ছিল চর্যাপদ রচনার মূল লক্ষ্য। তাই নিসন্দেহে বলা যায় যে, বৌদ্ধ ধর্মমতের প্রচারের কারণেই চর্যাপদের সাধন সংগীতগুলো রচিত হয়েছিল।

চর্যাপদ রচনার প্রেক্ষাপট নিয়ে নানা মতের সমাহার। সামাজিক প্রেক্ষাপট না রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রচনার পশ্চাতে কাজ করেছে তা নিশ্চিত করে বলা হায় না। তবে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সবচেয়ে বেশি বলেই মনে হয়। বৌদ্ধদের ধর্মীয় সাধনাপদ্ধতি জটিলল ও কঠিন, ফলে তারা তাদের সাধন প্রণালি লিখে রাখার তাগিদ অনুভব করে। এ প্রেক্ষাপটই চর্যাপদ রচনার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চর্যাপদের স্থান/গুরুত্বঃ

চর্যাপদ প্রাচীন যুগের সাহিত্য। চর্যাপদের মূল্য বহুমাত্রিক। সমসাময়িক কালের ভাষাবিচার, সাংস্কৃতিক পরিচয়, বাঙালির জীবন-সংগ্রামের চিত্র, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, শ্রেণীসংগ্রাম এবং ধর্মীয় প্রেক্ষাপট সবই চর্যাপদের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

চর্যাপদ বাংলা ভাষায় লেখা। চর্যাপদ থেকেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যাত্রাশুরু। ফলে নবা ভারতীয় আর্যভাষার মধ্যে সহজেই বাংলা ভাষার অবস্থান নির্ণয় করা যায়। চর্যার মধ্যে দিয়ে বাংলার শব্দসম্পদ, ফানিতত্ত্ব, বুপতত্ত্ব, ও ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে।

চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন। চর্যাপদ ছাড়া প্রাচীন যুগের আর কোনো প্রত্যক্ষ নিদর্শন পাওয়া যায় নি। চর্যাপদই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম মাইল ফলক। এ পথ ধরেই বাংলা ভাষা কালের বুকে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করে মধ্য যুগ পাড়ি দিয়ে আধুনিক যুগে এসে পৌঁছেছে: ফুলে ও ফলে সমৃদ্ধ হয়ে যৌবনে পদার্পণ করেছে।

গীতিকবিতার আদি উৎস হিসেবেও চর্যাপদের মূল্যায়ন করা হয়। বিহারীলালকে বাংলা গীতিকবিতার জনক বলা হলেও তার অনেক আগে থেকেই যে গীতিকবিতার জন্ম হয়েছে তার প্রমাণ চর্যাপদ। চর্যাপদে ধর্মতত্ত্ব আলোচিত হলেও মানব হৃদয়ের অনুভূতির কথা সেখানে পাওয়া যায়। আছে প্রেম-বেদনা ও রসের কথা। নীরস ধর্মতত্ত্বকে আকর্ষণীয় করতে সিদ্ধাচার্যরা চর্যাগুলোকে রসমণ্ডিত করে সৃষ্টি করেছে। এ রকম আদি রসাত্মক গানের দৃষ্টান্ত –

দিবসহি বহুড়ী,কাউহি ডর ভাই
রাতি ভইলে কামরু জাই। (২নং চর্যা)

চর্যাপদের মাধ্যমে বাংলার সুংগীত জগতের ইতিহাসের ধারণা জন্মে। চর্যাপদগুলো মূলত ধর্মীয় গান। সে যুগের সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যই হলো ধর্মসংগীত। সব কিছুই ধর্মীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হতো।

চর্যাপদ সমকালীন জীবনযাত্রার বাস্তব দলিল। এটি ধর্মীয় গান হলেও পমকর্তারা উপমা-রূপক ব্যবহারের ক্ষেত্রে লোকায়ত জীবনকে ব্যবহার করেছেন। এতে ধরা পড়েছে সমসাময়িক যুগের বাঙালি জীবন ও সমাজ। ধরা পড়েছে বাঙালি সংস্কৃতির নানা ঐতিহ্য। প্রাচীন বাঙালি জীবনের অনেক লুপ্ত ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্যের ইঙ্গিত মেলে চর্যাপদের মধ্যে। দৈনন্দিন জীবন থেকে উপমা প্রতীক ব্যবহারের ফলে চর্যাপদ প্রাচীন সমাজের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক তথ্যের উৎস হিসেবে বিশেষ গুরুত্বের দাবীদার।

চর্যাপদের মধ্যে সমাজ জীবনের বাস্তব ছবি অঙ্কিত হয়েছে বলে অনেকে চর্যাপদের মধ্যে উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য খুঁজে দেখেছেন। ফলে এর মধ্যে উপন্যাসধর্মিতা রয়েছে বলা যায়। কেননা, চর্যাপদের মধ্যে তৎকালীন সমাজের মানুষের জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিক প্রকাশ পেয়েছে। এখানে আছে উচ্চবিত্ত দ্বারা নিম্নবিত্তের মানুষগুলো কীভাবে লাঞ্ছিত আর বঞ্চিত হয়, তাদের সাংসারিক অবস্থা কেমন ছিল, প্রেমের ব্যাপারে নারী-পুরুষের অবস্থান কেমন ছিল ইত্যাদি। আছে নানা উৎসব অনুষ্ঠানের কথা

চর্যাপদে রয়েছে নাটকীয়তা। চর্যাপদে মানবজীবনের কাহিনি যেভাবে বর্ণিত হয়েছে তার মধ্যে নাটকীয়তা রয়েছে। আকস্মিক ঘটনাপ্রবাহ ও কৌতূহলপূর্ণ তথ্য পাঠককে চমকিত করে। এখানে রয়েছে উচ্চবিত্তের সাথে নিম্নবিত্তের দ্বন্দ্ব: যা নাটকীয়তায় ভরপুর। চর্যাকারদের উপযুক্ত ভায়া শব্দব্যবহার, উপমা-প্রতীকের ব্যবহার, আদিরস ও করুণ রসের ব্যবহার নৈপুণ্য চর্যাপদকে নাটকীয়গুণে ভাস্বর করেছে।

চর্যাপদ একই সাথে গীত ও পাঠযোগ্য রচনা। চর্যাগুলো দেবতার গুণকীর্তন ও মাহাত্ম্যমূলক গান। ফলে এগুলো মানুষের মুখে মুখে গাওয়া গান হিসেবে প্রচলিত হয়ে ওঠে। আবার গানগুলো কাব্যিত করেও সৃষ্টি করা হয়েছে। এই সাহিত্যিকগুণ না থাকলে এটি নিম্নক ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবেই বিবেচিত হতো। সাহিত্যিক গুণ গ্রন্থটিকে গাওয়ার যোগ্য ও পাঠযোগ্য করে তুলেছে।

পরিমিতিবোধ, যে-কোনো শ্রেষ্ঠ শিল্পীর শ্রেষ্ঠ রচনার মধ্যে পাওয়া যায়। প্রকাশভঙ্গিতে পরিমিতিবোধ না থাকলে শ্রেষ্ট রচনার মর্যাদা পায় না। চর্যাপদে এ পরিমিতিবোধ খুঁজে পাওয়া যায়। চর্যাকারগণ মিত ভাষণের মাধ্যমে অতি চমৎকারভাবে যে-কোনো প্রত্যক্ষ বিষয় ফুটিয়ে তুলেছেন।

ভবণই গহণ গম্ভীর বেগে বাহা।
দুআস্তে চিখিল মাঝে ন খাহী। (৫ নং চর্যা।

বেদনাবোধের প্রকাশ আধুনিক যুগের সাহিত্যের মধ্যে লক্ষ্যণীয়। চর্যাপদের মধ্যেও চর্যাকারগণ এক গভীর শূন্যতা বা বেদনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। পৃথিবীর সব কিছুই নশ্বর, কেউই চিরদিন এখানে থাকবে না। এ রকম এক মহাশূন্যতা চর্যার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে-

জে জে আইলা, তে তে গেলা।

অর্থাৎ যে যে এসেছিল, সে সে চলে গেল। শুধু চিরন্তন বেদনাই পড়ে থাকে।

সুখ-দুঃখ ও আনন্দ বেদনার প্রকাশই হলো সাহিত্যের উদ্দেশ্য। চর্যাগুলো ধর্মীয় সাধন সংগীত হলেও চর্যার রচয়িতারা রূপকের আড়ালে অন্তরের নানা অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়েছে।

চর্যাপদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তথা বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের নিদর্শন। বাংলা ভাষা যে কোনো ভূঁইফোড় ভাষা নয়, চর্যাপদ তা প্রমাণ করে। ভাষাগত দিক থেকে চর্যাপদের গুরুত্ব তাই অপরিসীম। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর বৌদ্ধ গানের ভাষা গ্রন্থে বলেছেন-

হিন্দি, আসামী, মৈথিলি, উড়িয়া প্রভৃতি ভাষার সাথে চর্যাপদের ভাষার কিছু সাদৃশা থাকলেও চর্যাপদের ভাষা মূলত বাংলা ভাষা এবং পরবর্তী ভাষার সাথে তার ব্যাকরণগত সাদৃশ্য রয়েছে।

এ ছাড়াও ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ড. সুকুমার সেন প্রমুখ ভাষাবিজ্ঞানী চর্যাপদের ধ্বনিতত্ত্ব ও বিভক্তি আলোচনা করে দেখিয়েছেন যে, চর্যাপদের ভাষা একমাত্র বাংলাই।

বাংলা ছন্দের ক্রমবিকাশে চর্যাপদে ব্যবহৃত ছন্দের গুরুত্ব রয়েছে। চর্যাপদের ছন্দে সংস্কৃত কু্জ্ঝটিকা ছন্দের প্রভাব রয়েছে। এই ছন্দে প্রতি চরণে ষোল মাত্রার চরণে চার পর্ব বিদ্যমান। যা চর্যাপদে ব্যবহৃত হয়েছে। চর্যাপদের ছন্দ সাধারণত মাত্রাবৃত্ত ছন্দরীতিতে লেখা হলেও তা সর্বত্রই মানা হয় নি।

চর্যাপদের ছন্দে সাধারণত চরণের শেষ পর্ব দীর্ঘ মাত্রার দুটি অক্ষর হিসেবে বিবেচিত হয়। কোথাও কোথাও শেষ অক্ষরটি দ্বিমাত্রিক হয় নি। পরবর্তীকালে এগুলো অবলম্বন করেই বাংলা ছন্দের একাবলি, পয়ার, ত্রিপদী প্রভৃতি ছন্দ গড়ে ওঠে। জয়দেবের গীতগোবিন্দ কাব্যেও চর্যাপদের ছন্দের ব্যবহার দেখা যায়।

অলঙ্কারের ব্যবহার বাংলা কাব্য-কবিতার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ব্যাপার। চর্যাপদেও শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে অনুপ্রাসের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। চর্যাপদের সর্বত্রই অন্ত্যানুপ্রাস ব্যবহৃত হয়েছে।

ধর্মীয় সাধন সঙ্গীত হলেও চর্যাপদের সাহিত্যিক মূল্য অপরিসীম। রসাত্মক বাক্যই কাব্য এ কথা চর্যাপদের ক্ষেত্রেও প্রযোজা। চর্যাপদে কাব্যরস রয়েছে প্রচুর। রসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আদিরস। চর্যাকারগণ সচেতনভাবে পদের মধ্যে এর সার্থক প্রয়োগ করেছেন। কোমল ও করুণ রসও কাব্যিক করে ব্যবহৃত হয়েছে। রসের সার্থক প্রয়োগ না হলে চর্যাপদ নিছক ধর্মগ্রন্থ হিসেবে পূজার্চনায় ব্যবহৃত হতো। রসের সার্থক প্রয়োগের জন্য এটি সকল সাহিত্য প্রেমিক পাঠকের কাছেই আদৃত।

পরবর্তী কালে সাহিত্য সৃষ্টিতেও চর্যাপদের রয়েছে ব্যাপক প্রভাব,। চর্যাপদগুলো দেশীয় মেজাজে ও ঢঙে লিখিত। ফলে বাঙালির প্রাণের স্পন্দন এর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। সহজ-সরল বর্ণনার কারণে নতুন ছন্দ, অলঙ্কার, বাক্যরীতি সৃষ্টি হয়। চর্যাপদের গানে রাগ ও ভণিতার উল্লেখ আছে। এ রীতি অনুসরণ করেই পরবর্তীতে সাহিত্য রচিত হয়। জয়দেব চর্যাপদের রীতি ও ভণিতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েই গীতগোবিন্দ কাব্যে তা ব্যবহার করেন। গীতগোবিন্দই বৈষ্ণব পদাবলির আদি উৎস। এভাবে পর্যায়ক্রমে পরবর্তী সাহিত্য সৃষ্টিতে চর্যাপদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল।

পদাবলি সাহিত্যের আদি উৎস হিসেবেও এর গুরুত্ব রয়েছে। পদাবলি সাহিত্য ধর্মীয় সাহিত্য, ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যেই তা রচিত হয়। চর্যাপদের মধ্যেও তা লক্ষ্যণীয়।  চর্যাপদের পরবর্তী ধারা হলো বৈষ্ণব পদাবলি। বৈষ্ণব পদাবলির ভাব, ভাষা, ছন্দ ইত্যাদি বিষয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে চর্যাপদের সাথে এর গভীর মিল রয়েছে। এ জন্য বলা হয়ে থাকে যে, চর্যাপদ বৈষ্ণব পদাবলির আদি উৎস।

আর্যদের ভারত বর্ষে আসার আগে এদেশে অনার্যরা বাস করতো। তাদের ভাষায় কোনো শিল্পচর্চা হয়েছিল কিনা তা জানা যায় না। তবে চর্যাপদ সমাসাময়িক কালের ভাষায় রচিত,: যে ভাষা অন্ত্যজ শ্রেণীর ভাষা ছিল। এদিক থেকে চর্যাপদের একটা ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে।

মানসী কাবোকে যেমন রবীন্দ্রকাব্যের অণুবিশ্ব বলা হয়ে থাকে, তেমনি চর্যাপদ পরবর্তী সাহিত্যে চর্যাপদের প্রভাব দেখে চর্যাপদ প্রাচীন ও মধ্যযুগের অন্যান্য সাহিত্যের অনুবিশ্ব বললেও অত্যুক্তি হয় না। গীতিধর্মিতা, সমাজ চিত্র অঙ্কন, উপন্যাসধর্মিতা, নাটকীয়তা, ছন্দ, অলঙ্কার, ভাষা, প্রকাশভঙ্গি, ভাষাগত দিক, সাহিত্যিক মূল্য, রীতি ও ভণিতার ব্যবহার, বসের ব্যবহার, গানের বিভিন্ন রাগের ব্যবহার, পদাবলি সাহিত্য সৃষ্টিতে চর্যার প্রভাব ইত্যাদি বিষয়গুলো উক্ত কথা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।

উপসংহার: প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব

চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন। বাংলা সাহিত্যের তো বটেই বাঙালি জাতির জন্যও অত্যন্ত গৌরবের। ভাষা ও জাতির ঐতিহ্য হিসেবে চর্যাপদের গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে, ঐতিহ্য সম্পর্কে বিশদ জানার জন্য চর্যাপদ রচনার প্রেক্ষাপট নিয়ে পণ্ডিতমহলে চর্চার শেষ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *