বাংলা গদ্যের বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও লেখকগোষ্ঠীর অবদান


উত্তরঃ- বাংলা গদ্যের জন্ম আধুনিক কালে। উনিশ শতকের আগে সাহিত্য হিসেবে গণ্য করা যায় এমন গদ্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ছিল না, যা ছিল তা দলিল-দস্তাবেজে, চিঠি-পত্রে, এবং বৈষ্ণবদের গদ্য-পদ্যরচিত কড়চায়। চর্যাপদ থেকে শুরু করে ভারতচন্দ্র-রামপ্রসাদ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে যা কিছু রচিত হয়েছে, সমস্তই কবিতায়। উনিশ শতকের শুরু থেকেই প্রকৃত গদ্য তৈরি হতে থাকে। এ যাত্রায় সবচেয়ে বড় অবদান ফোট উইলিয়াম কলেজের।


বাংলা গদ্যের প্রারম্ভিক অবস্থা : অনুবাদ ও ধর্মপ্রচারক যুগ
সতের শতকের গোড়ার দিকে পর্তুগীজ পাদরিরা খৃষ্ট ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এদেশে বাংলা গদ্য সৃষ্টির পথ কিছুটা সুগম করে। তাঁদের মধ্যে দোম আন্তনিও রচিত ‘ব্রাহ্মণ-রোমান ক্যাথলিক সংবাদ’ এবং পাদরি মনো-এল-দা-আসসুম্পসাম্ রচিত ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’ই বাংলা গদ্যের আদি নিদর্শন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের বাংলা শেখার পথ সহজ করার জন্য ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড ১৭৭৮ খ্রিঃ ইংরেজিতে ‘A Grammar of Bengal Language’ রচনা করেন। এর কিছু অংশ অক্ষরে ছাপানো হয়েছিল।
কলেজের অনুবাদ কার্যক্রম ও গদ্য রচনার উদ্দেশ্য
এরপর ইংরেজরা খৃষ্টধর্ম প্রচারের মধ্যে দিয়ে এদেশের মানুষকে মুক্তি দেবার মানসে শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠা করে। এরাই বাংলা ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করে। এখান থেকেই বাংলা গদ্যের প্রথম যুগের গ্রন্থগুলো মুদ্রিত হয়ে সাধারণের মধ্যে প্রচারিত ও পরিবেশিত হতো। বাংলা গদ্যের প্রথম পর্যায়ে রচিত এসব গ্রন্থে কোনো মার্জিত ও পূর্ণাঙ্গ পরিচয় না থাকলেও গদ্য রচনার প্রবর্তক হিসেবে এদের মূল্য অপরিসীম।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক পটভূমি
এদেশে কর্মরত কোম্পানির ইংরেজ কর্মচারীদের দেশীয় ভাষা শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০ খ্রিঃ৪ মে)। ১৮০১ সালে খোলা হয় বাংলা বিভাগ এবং শ্রীরামপুর মিশনের পাদরি উইলিয়াম কেরি বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পান। কেরি দায়িত্ব পাবার পর থেকে পাঠ্য পুস্তকের তীব্র অভাব বোধ করলেন। এ অভাব দূর করার জন্য নিজে পাঠ্য পুস্তক রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি বাংলা বিভাগে দুই জন পণ্ডিত এবং ছয়জন সহকারী পণ্ডিত নিয়োগ দেন। পণ্ডিত দুজন হলেন মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার ও রামনাথ বাচস্পতি। সহকারী পণ্ডিত হলেন শ্রীপতি মুখোপাধ্যায়, আনন্দচন্দ্র, রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়, কাশীনাথ, পদ্মলোচন চূড়ামণি ও রামরামবসু। এরা সকলেই পুস্তক রচনায় আত্মনিয়োগ করেন।
বাংলা গদ্য সাহিত্যের উদ্ভব ও বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কেন্দ্রিক পণ্ডিতেরা বাংলা গদ্যের প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপন করেন। এ ভিত্তির উপরেই পরবর্তী কালের সাহিত্যসৌধ গড়ে ওঠে।
“কথোপকথন “ও “ইতিহাস মালা” গ্রন্থদুটো কেরির নিজের লেখা। মৌখিক ভাষায় শিক্ষার উপযোগী করে “কথোপকথন” গ্রন্থটিতে সে আমলের কলকাতার শ্রীরামপুর অঞ্চলের সকল স্তরের নারী-পুরুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, সামাজিক রীতিনীতি ধর্ম ও আচার ব্যবহার নিয়ে কথোপকথন রচিত হয়েছে। কোথাও সাধু ভাষা, আবার কোথাও সাধু ভাষার সাথে কথ্যভাষার মিশ্রন রয়েছে।
‘ইতিহাসমালা‘য় বাংলাদেশে প্রচলিত কতকগুলো গল্প স্থান পেয়েছে। প্রতাপাদিত্য, রূপ, সনাতন আকবর, বীরবল প্রমুখ ঐতিহাসিক ব্যক্তি গ্রন্থে স্থান পাওয়া গল্পগুলোর নায়ক।
উইলিয়াম কেরি ও বাংলা ভাষা চর্চার নবজাগরণ
কেরিই প্রথম বাংলা ভাষার লুপ্ত গৌরব ফিরিযে আনেন। বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতঘেঁষা করার নেতৃত্বও তিনি দেন। তিনি ভাষাকে ভদ্র ও শিক্ষিত জনের উপযোগী করে তোলেন। কেরির রচনার উৎকর্ষতা খুব বেশি না থাকলেও বাংলা গদ্যরীতির সম্ভাবনার যে দ্বার খুলে দিয়েছিলেন, গদ্যের উন্মেষ যুগে তা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণযোগ্য। বিশেষত কেরির মত পণ্ডিতের প্রীতি ও পরিচর্যা না পেলে বাংলা গদ্যের বুনিয়াদ এত দ্রুত গড়ে উঠতে পারত না।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকগণ ও তাঁদের অবদান
পণ্ডিতদের মধ্যে পুস্তক রচনায় প্রথম ও প্রধান ছিলেন রামরাম বসু (১৭৫৭-১৮১৩)। তাঁর লেখা ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র (১৮০১)’ ও ‘লিপিমালা (১৮০২)’ গ্রন্থদুটো শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। তিনি ভাল ফারসি জানতেন। তিনি ফারসি থেকে অনেক উপকরণ সংগ্রহ করেন।
প্রতাপাদিতকে নিয়ে লেখা গ্রন্থটি বাংলা গদ্যে লেখা পূর্ণাঙ্গ মৌলিক ইতিহাস লেখার প্রয়াস হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর রচনারীতি সাধুভাষা ঘেঁষা হলেও সংস্কৃতানুসারী ছিল না। তিনি অনেক আরবি ফারসি শব্দের ব্যবহার করেছেন। বাংলা গদ্যের ইতিহাসে তাঁর অবদান অসীম।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকারই ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন ও অধিকতর খ্যাতির যোগ্য। তিনি ‘বত্রিশ সিংহাসন (১৮০২)’, ‘হিতোপদেশ১৮০৩’,’ রাজাবলী‘ (১৮০৮), ‘বেদান্তচন্দ্রিকা (১৮১৭)’ ও ‘প্রবোধচন্দ্রিকা (১৮১৩)’ নামে পাঁচটি গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি ভাষাবিদ ও ভাষাশিল্পী ছিলেন। ‘বত্রিশ সিংহাসন’ তাঁর অনুদিত গ্রন্থ। এ গ্রন্থে তিনি সংস্কৃতঘেঁষা ও চলিতঘেঁষা দু’রীতিই প্রয়োগ করেছেন। সতেজ প্রকাশভঙ্গি এবং সরল শব্দবিন্যাস তাঁর রচনায় বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়।
‘হিতোপদেশ’-এর ভাষাও সংস্কৃতঘেঁষা। ‘রাজাবলী’-তে চন্দ্রবংশ থেকে শুরু করে বাংলাদেশে কোম্পানির শাসন প্রতিষ্টা পর্যন্ত উপমহাদেশের একটি ধারাবাহিক ইতিহাস রচনার প্রয়াস আছে। এর ভাষা প্রাঞ্জল বলে গ্রন্থটি তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা। বিভিন্ন কলেজের পাঠ্যপুস্তকের তালিকাভুক্ত থাকার কারণে ‘প্রবোধচন্দ্রিকা’ লেখকের অন্যতম উল্লেখযোগ্য রচনা।
রাজা রামমোহন রায়ের বেদান্তগ্রন্থ‘ ও ‘বেদান্ত সার’– এর জবাবে মৃত্যুঞ্জয় ‘বেদান্ত চন্দ্রিকা‘ রচনা করেন। এতে তাঁর প্রতিক্রিয়াশীল মনের পরিচয় পাওয়া যায়। মুহম্মদ আবদুল হাই তাঁর রচনারীতি সম্পর্কে বলেছেন
“বাংলা গদ্যের সংস্কৃতানুসারী, তদ্ভব শব্দ প্রধান সহজ সরলরীতি এবং তৎসম-তদ্ভব শব্দের মিলনজনিত এ তিন রীতির যে চল বাংলা সাহিত্যে দেখা যায়, মৃত্যুঞ্জয় তাঁর রচিত সাহিত্যে এ তিন রীতিরই প্রয়োগ -পরীক্ষা করেছিলেন। বিশুদ্ধ সংস্কৃত ভঙ্গীর নানা ত্রুটি সত্ত্বেও তাঁরই হাতে বাংলা গদ্য বিষয়বস্তুর দিক থেকে এবং রচনা পদ্ধতিতে মোটামুটি একটা সুষম রূপ পেয়েছিল। তিনি বাংলা গদ্যের সার্থক শিল্পী না হলেও প্রথম সক্ষম শিল্পী ছিলেন।”
উক্ত কলেজের বাংলা বিভাগকে কেন্দ্র করে অনেক বই লিখিত ও মুদ্রিত হয়েছিল। তার মধ্যে গোলকনাথ শর্মার অনুবাদ গ্রন্থ ‘হিতোপদেশ’ (১৮০২), রাজীব লোচন মুখোপাধ্যায়ের ‘মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রং (১৮০৫), চন্ডীচরণ মুনশীর ‘তোতা ইতিহাস (১৮০৫) এবং হরপ্রসাদ রায়ের ‘পুরুষ পরীক্ষা ‘(১৮১৫)-র নাম করা যেতে পারে।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ সম্পর্কে মন্তব্য:
- বাংলা গদ্যের মান্য রূপ নির্ধারণে কলেজের ভূমিকা
- বাংলা গদ্যের ভাষা, শৈলী ও শব্দচয়নে নবত্বের সূচনা
- রাজা প্রকাশ’, ‘বোধোদয়’, ‘ইতিহাসমালা’ ইত্যাদি গ্রন্থের গুরুত্ব
- গদ্যের রচনাধারা থেকে সাহিত্যের গদ্যে উত্তরণ
- ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ : নবজাগরণের অগ্রদূত
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ১৮৫৪ খ্রিঃ পর্যন্ত চালু থাকলেও প্রথম পনের ষোল বছর বাংলা গদ্যের বিকাশের জন্য উল্লেখযোগ্য গুরুত্বের অধিকারী। এর পরে এদেশের মানুষ সাহিত্য সচেতন হয়ে ওঠে। কলেজের গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমে আসে।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অধ্যক্ষ কেরির তত্ত্বাবধানে যে সব বই রচিত হয়েছিল তা মূলত পাঠ্য বই এবং লেখা হয়েছিল ইংরেজ কর্মচারীদের ভাষা শেখাবার জন্য। এ বইগুলো নানা কারণে জনসমাজে বেশি প্রচারিত হয়নি। তার মধ্যে একটা কারণ হলো বইগুলোর মধ্যে খৃষ্ট ধর্মের কথা থাকতো। অনেকে এসব বই ছুঁয়েও দেখতো না।
কলেজের পণ্ডিতেরা যখন গদ্য রচনা করেন তখন গদ্যরীতির কোন স্থায়ী রূপ ছিল না। কেউ সংস্কৃতি রীতি, কেউ ফারসি রীতি, কেউ ইংরেজি ধরনের রীতি, কেউ মুখের অমসৃন কথাকেও সাহিত্যে ব্যবহার করেছেন। এভাবে তাঁরা গদ্যের রীতি নিয়ে পরীক্ষা করেছেন। এদের মধ্যে মৃত্যুঞ্জয় সাধু গদ্যরীতির কাঠামো অনেকটা ধরতে পেরেছিলেন।
বাংলা গদ্যের প্রাথমিক যুগে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখদের অবদান সম্পর্কে মুহম্মদ আবদুল হাই বলেছেন-
“ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা বিশেষভাবে পাঠ্যপুস্তক রচনার কাজে বাংলাগদ্যের প্রয়োগ করলেও, এতে দুরূহ জটিল বিষয়ের আলোচনা তাঁরাই করেছিলেন। বহু কিছুর চর্চায় এবং কর্ষণে তাঁদেরই হাতে বাংলা গদ্যের পথ যেমন অনেকটা নিশ্চিত হয়েছিল, তেমনি ভাষার বিকাশপথে বাংলা সাহিত্যের পথও সুগম হয়েছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই।”
উপসংহার : বাংলা গদ্যের শৈল্পিক বিকাশে এক ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান
পরিশেষে, একথা বলা যায় যে, বাংলা গদ্যের উষালগ্নে এবং বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের সূচনালগ্নে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ তথা কেরির মত পণ্ডিত ব্যক্তির সাহায্য পেয়ে উপকৃতই হয়েছে। কেরির অদম্য পরিশ্রম ও সুদক্ষ পরিচালনার জন্যই অন্যান্য পণ্ডিতরা তাঁর হাতে হাত মিলিয়ে বাংলা গদ্যের গোড়া পত্তনে সচেষ্ট হয়েছিল। এসব পণ্ডিতদের তৈরি করা ভিত্তির উপরেই গড়ে উঠেছে বাংলা গদ্যের শিল্পিত ইমারত।