ফ্রয়েডীয় চেতনা: মানিকের ছোটগল্পে
ফ্রয়েডীয় চেতনা — ভূমিকা
ফ্রয়েডীয় মতাদর্শ : সংক্ষিপ্ত ধারণা
১. অচেতন মন— ফ্রয়েডের মতে মানুষের আচরণ অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রিত হয় অচেতন মনের দ্বারা।
২. প্রবৃত্তি ও দমন—- যৌনতা ও আক্রমণাত্মক প্রবৃত্তি দমন করলে তা নানা রূপে প্রকাশ পায়।
৩. স্বপ্ন, কল্পনা ও প্রতীক— অচেতন ইচ্ছা স্বপ্ন বা প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
৪. ইড, ইগো ও সুপার ইগো — মানুষের মানসিক গঠনকে ফ্রয়েড তিন ভাগে ভাগ করেছেন—ইড (প্রবৃত্তি), ইগো (বাস্তবতা), সুপার ইগো (নৈতিকতা)।
ফ্রয়েডীয় চেতনা
মানিক বন্দোপাধ্যায় একজন বাস্তববাদী ও জীবনমূখী শিল্পী। তিনি কথা-সাহিত্যের মত তাঁর “প্রাগৈতিহাসিক” গ্রন্থেও বিভিন্ন গল্পের মধ্যে অত্যন্ত সন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে মানব মনের গহীন অন্ধকার থেকে বিভিন্ন জটিল বিষয়ের অবগুন্ঠনকে মুক্ত করেছেন। বিচিত্র ধরনের মানুষের অন্তরতলে অসংখ্য তন্তুজালে জড়িত যেসব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া ক্রমাগত ঢেউ তোলে, ভাঙ্গে-গড়ে তিনি সেসব বিষয়ের মর্মোদঘাটন করেছেন। তাঁর গল্পের বিভিন্ন চরিত্রের এই অন্তরমুখী চিন্তা ও মনোবিশ্লেষণের সাথে ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণ তত্ত্বের ঐক্য পরিলক্ষিত হয়।
“প্রাগৈতিহাসিক” গল্পে মানিকের জীবন-ভাবনা, শিল্পবোধ ও নির্মাণ দক্ষতার অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। এ গল্পে মানব-জীবনের দুটি মৌলপ্রবৃত্তি ইন্দ্রিয়, আবেগ ও উদর তাড়না-ভিখুর জীবনাচরণের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। গল্পশেষে উচ্চারিত জীবন-দর্শন এক প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারের দিকে আমাদের অঙ্গুলি নির্দেশ করে যেখানে মানব-জীবন-শক্তির মূলসুর হিসেবে যৌনাবেগই মূখ্য হয়ে ওঠে। মানিকের ভাষায়-
“হয়তো ওই চাঁদ আর এই পৃথিবীর ইতিহাস আছে। কিন্তু যে ধারাবাহিক অন্ধকার মাতৃগর্ভ হইতে সংগ্রহ দেহের অভ্যান্তরে লুকাইয়া ভিখু ও পাঁচী পৃথিবীতে আসিয়াছিল এবং যে অন্ধকার তাহারা সন্তানের মাংস আবেষ্টনীর মধ্যে গোপন রাখিয়া যাইবে তাহা প্রাগৈতিহাসিক, পৃথিবীর আলো আজ পর্যন্ত তাহার নাগাল পায় নাই, কোনদিন পাইবেও না।
মানিকের এ বক্তব্য শাশ্বত সর্বযৌনবাদ সংক্রান্ত ফ্রয়েডীয় জীবন ব্যাখ্যার সাথে একান্তভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।
ফ্রয়েডীয় চেতনা
ফ্রয়েডের মতে, মানুষের জীবনপ্রবৃত্তির অন্তর্নিহিত মূল শক্তির নাম লিবিডো। সকল তেজ ও উদ্যমের মূল হল লিবিডো। লিবিডো প্রকৃতিতে সম্পূর্ণ যৌনধর্মী। তবে ফ্রয়েড সকল প্রকার আসক্তি বা সুখ অন্বেষার সর্ববিধ প্রচেষ্টাকেই যৌনতা বলে মনে করেন। ফ্রয়েড মানব মনের উদ্দেশ্য-সমষ্টির উৎসকে ইদম, অহম ও অধিসত্তা-এই তিন স্তরে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে ইদম প্রকৃতিতে সম্পূর্ণ নীতিহীন এবং কেবল সুখ ভোগই এর উদ্দেশ্য। সন্দেহ নেই, ভিখুর জীবন পরিণতিকে ফ্রয়েডীয় চেতনার সমান্তরালে বিন্যাস করা হয়েছে। আসলে, সমগ্র ভিখু চরিত্র পরিকল্পনায় ফ্রয়েডীয় ভাবাদর্শ অনেকাংশে সক্রিয়। গল্পের উপসংহার অংশে প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকার রুপ যৌনাকাঙ্ক্ষার প্রসঙ্গটি যেভাবে প্রাধান্য পেয়েছে তাতে এমন ধারণা করাই সঙ্গত যে, ভিখুর জীবনদীপ্ত বাসনাগুলোর মূলে কেবল ইদ্রিয়-তাড়নাই ক্রিয়াশীল।
ফ্রয়েডীয় চেতনা
মনোবিশ্লেষণধর্মী গল্প হচ্ছে “ভূমিকম্প”। মনোরোগগ্রস্ত প্রসন্ন চরিত্রের নিখুঁত বিবরণ শিল্পী নিপুণতার সাথে তুলে ধরেছেন। প্রসন্নের রাত্রিকালীন নিদ্রার মধ্যে ভূমিকম্পনপীড়িত পরিস্থিতিতে গৃহাবদ্ধ হয়ে প্রসন্নের মনে এক স্নায়ু-ছেঁড়া মৃত্যুভীতির সৃষ্টি হয়। এই মৃত্যুভয় তার মনে নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ভয়, সন্দেহ ও অনিশ্চয়তার নানা বাতিক সৃষ্টি হয়। বাস্তব কল্পনা, বিমর্ষতা ও বেঁচে থাকার অর্থহীনতা উপলদ্ধি প্রভূতি তার মনোজগতে দানা বাঁধে। এর মধ্যে সে এক ভীতিকর স্বপ্ন দেখে। সে পর্বতের উপর থেকে পড়ে যাচ্ছে, পর্বতের ঠিক নিচে অজানা রহস্যময় এক ইদাঁরা। ইদাঁরার ভেতরভাগে পড়ার বিপদ এড়িয়ে সে শূন্যে সাঁতার কেটে অবশেষে ইদাঁরার পাড়ে আছড়ে পড়ে। প্রসন্নের এই স্বপ্নদর্শন ফ্রয়েডীয় মতাদর্শে ব্যাখ্যা করা যায়।
ফ্রয়েডীয় মনোবিকোলন তত্ত্ব ভিডি
https://www.youtube.com/watch?v=c9yPWaluK0c
ফ্রয়েডের মতে, শিশুকে আদর করতে গিয়ে বড়রা অনেক সময় তাকে হাত-পা ধরে শূন্যে দোলাতে থাকে। বড় হলে তাই অনেকে শূন্যে ভাসার স্বপ্ন দেখে। এ ধরনের স্বপ্নের সাথে যৌনতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। প্রথম যৌন-চেতনার সঙ্গে ছোট বেলায় দোল খাওয়া, লম্ব-ঝম্ব, কোনো কিছু বেয়ে উপরে ওঠা ইত্যাদির সম্পর্ক আছে। অর্থাৎ, এই সব কাজ করার সমই বালক-বালিকারা প্রথম যৌনতাবোধ করে।

“ভূমিকম্প” গল্পেও দেখা যায় প্রসন্ন স্বপ্ন দর্শন শেষে ঘুম ভেঙ্গে নিঃসঙ্গতা বোধ করে। আর সেই সাথে স্ত্রীর অভাববোধ। প্রসন্নের মাও তাকে বিয়ের কথা বলে। অফিসের বড় বাবুও তাঁর নিজ কন্যাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। মোট কথা, প্রসন্নের মাধ্যে যে ভীতিবিহবলতা, চিত্ত-বৈকল্য কিংবা উত্তেজনা লক্ষ করা যায়, তা বদ্ধস্থানে থাকার আতঙ্কজনক ব্যাধিরই সুস্পষ্ট প্রকাশ।
“অন্ধ” গল্পের মধ্যেও ফ্রয়েডীয় মতাদর্শের প্রকাশ ঘটেছে। এ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সনাতন। সনাতন দোতলা অট্টলিকা নির্মাণকালে অর্থাভাবে স্ত্রীর অলঙ্কার বিক্রি করলে সেই শোকে সনাতনের সাত বছরের কন্যা ও স্বামীকে রেখে স্ত্রী প্রথমে গৃহত্যাগ ও পরে মৃত্যুবরণ করে। স্ত্রীর মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী করে সনাতন অনুশোচনায় দগ্ধ হয় এবং আত্মগ্লানিতে জর্জরিত হয়। এ হৃদয়দহন থেকে মুক্তির জন্য সনাতন পানাভ্যাস গড়ে তোলে। এরপর সে অন্ধ হয়ে যায় এবং স্বার্থপীড়িত জীবনে প্রবেশ করে। সনাতনের এ সকল আচরণের মধ্যে দিয়ে যে প্রবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায়, তা ফ্রয়েড কথিত মৃত্যুপ্রবণতার সাথে সম্পর্কযুক্ত। ফ্রয়েড মানুষের সহজাত আদিম প্রবৃত্তির মধ্যে দুটি ভিন্নতর রুপ প্রত্যক্ষ করেছেন।
ফ্রয়েডীয় চেতনা
তিনি এর একটির নাম দিয়েছেন জীবন-প্রবৃত্তি, অন্যটির নাম মরণ-প্রবৃত্তি। অস্তিত্ব রক্ষার উদ্যমের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে এক প্রকার আত্মক্ষয়ী উদ্দীপনার কথা ফ্রয়েড বলেছেন। আত্মগ্লানি ও অনুশোচনা থেকে মানুষ জীবন-বিরোধী প্রবৃত্তির দ্বারা আক্রান্ত হয়। সনাতনও জীবনবিরোধী প্রবৃত্তির ফলে একাকিত্বকেই একমাত্র আরাধ্য বলে মেনে নেয়। কন্যাকেও সে দ্রুত বিয়ে দিয়ে শ্বশুর বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। আত্মগ্লানির আগুন থেকে চিরমুক্তিলাভের মত বড় সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণে অক্ষমতার ফলে সনাতন স্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা করে। তাই চাকুরী পরবর্তী অবসর জীবনে পানাভ্যাসের ব্যয়ের কথা ভেবে অর্থ সঞ্চয় করে। কন্যার বিয়েতে সে কার্পণ্য করে। পরিণামে শ্বশুর বাড়িতে মেয়ে অত্যাচারিত হলেও সনাতন নির্বিকার থাকে। পাপবোধ-তাড়িত সনাতনের জীবন আচরণগুলো বিশ্লেষণ করলে তার অসুস্থতা ও অস্বাভাবিকতা যেমন সুস্পষ্ট হয়, তেমনি এর মধ্যে দিয়ে তার মনোজগতের বিকারগ্রস্ততারও সন্ধান মেলে।
ফ্রয়েডীয় চেতনা
“মাথার রহস্য” গল্পের পতিতপাবন ও তার ছেলে যাদবের অস্বাভাবিক আচরণ ফ্রয়েডীয় মতাদর্শ দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়। প্রধান চরিত্র পতিতপাবন শেষ বয়সে জীবন-বীমার দুই হাজার টাকা হারিয়ে মস্তিষ্ক-বিকৃত হয়ে পড়ে। সংসারে উপার্জনশীল ব্যক্তি নেই, সংসারে খরচও অনেক। সম্বলমাত্র মাসে মাসে সাঁইত্রিশ টাকা পেনশন। ফলে সারাজীবনের সঞ্চয়কৃত অর্থ হারিয়ে এই বৃদ্ধ বয়সে তার মনোগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়াটাই স্বাভাবিক।
এ গল্পে লেখক শুধু পতিতপাবনের মনঃপীড়ার ছবিই আঁকেননি, পুত্র যাদবের অস্বাভাবিক বিকারগ্রস্থ হয়ে পড়ার ছবিও এঁকেছেন। পতিতপাবনকে সুস্থ করার মানসে ছেলে কুরুপা মেয়েকে বিয়ে করে দুই হাজার টাকা যৌতুক নিয়ে তা বাবাকে ফেরত দেয় এবং বলে পুঁতে রাখা টাকা পাওয়া গেছে। এরপর পতিতপাবন সুস্থ হয়ে ওঠে। পিতার এ ধরনের আচরণ যাদবকে অস্বাভাবিক ও বিকারগ্রস্ত করে তোলে। ডাক্তারের মুখ থেকে এর কারণ হিসেবে জানা যায় যে, এমন অনেক ঘটনা দেখা যায় যে একটা আঘাতে কোনো মানুষ হঠাৎ পাগল হয়ে যায়, আবার অন্য একটা আঘাতে হঠাৎ সে সুস্থ হয়ে উঠেছে।
মানুষের মনোব্যাধিগত আচরণের জন্য ফ্রয়েড লিবিডো তত্ত্বকে দায়ী করেছেন। কিন্তু মনোবিজ্ঞানী ইয়ুং বলেন,
জীবন যাত্রার অসহনীয় আঘাতমূলক ঘটনা থেকে ভারসাম্যহীনতা বা মনোব্যাধি হতে পারে। আর সে কারণ দূর করাই হল চিকিৎসা।
এ গল্পে ফ্রয়েডের চেয়ে ইয়ুং এর যুক্তিই গ্রহণযোগ্য।
“চোর” গল্পের মধ্যেও জৈবিক তাড়নার টান টান উত্তেজনা লক্ষ করা যায়। মধুঘোষের জীবনেও যৌনাচারের পরিচয় মেলে। তবে ভিখুর মত আবেগহীন, মমতাহীন যৌনাচারের পরিচয় মধুর মধ্যে নেই। মধূ বরং মাসে দশ টাকা ও ভরণ-পোষণের বিনিময়ে সৌদামিনীর পরিবর্তে দুইশো টাকা পণ দিয়ে কাদুকে বিয়ে করে। প্রবৃত্তির তাড়না তার মধ্যে আছে, তবে রুচিমুগ্ধ ও রূপমুগ্ধ মার্জিত মনের পরিচয় পাওয়া যায়। রাখাল মিত্রের নিদ্রিতা তরুণী কন্যার রূপ দেখে মধুর মুগ্ধ হওয়ার মধ্যেও তার পরিচয় মেলে। পান্নালাল কর্তৃক কাদু অপহরণের পেছনেও জৈবলালসা সক্রিয়।
ফ্রয়েডীয় চেতনা
মনোবিকলন তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে মানিক রচনা করেছেন “ফাঁসি” গল্পটি। খুনের আসামীর স্ত্রী হিসেবে রমা চরিত্রের মনোবিশ্লেষণ করে লেখক দেখিয়েছেন। স্বামী ফাঁসির আসামী হলেও রমাকে বিমুখ করেনি। অসহনীয় হয়েছে সমাজের নিন্দা ও কলঙ্ক। ধর্ম সংস্কারের দোহাই দিয়ে স্বামীর প্রতি তার বিরাগ বা অশ্রদ্ধাকে সে অবজ্ঞা করতে পারে। কিন্তু সামাজিক দুর্নাম উপেক্ষা করতে পারে না। তাই গনপতির মুক্তির পর তাকে নিয়ে রমা দূরে কোথাও গিয়ে শান্তির আশ্রয় খুঁজতে চেয়েছে। কিন্তু গনপতি রমার এই মানসিক অবস্থাকে বুঝতে চেষ্টা করেনি। ফলে রমা স্বেচ্ছামৃত্যুকে বেঁছে নেয়। এভাবেই লেখক রমার মনোগত অবস্থা বিশ্লেষণ করেছেন।
এ গ্রন্থেও অন্যান্য গল্পগুলোও মনোবিশ্লেষণধর্মী। চেতন-অবচেতন মনের নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া মানিক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। মানব মনের নানাবিধ আচরণ নিয়ে গবেষণার অন্যতম পথিকৃত ফ্রয়েড। মানিক বন্দোপাধ্যায় ফ্রয়েডীয় মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই তাঁর বিভিন্ন গল্পের মধ্যে মানব মনের নানান রহস্য নিয়ে চুল চেরা বিশ্লেষণ করেছেন। অবশ্যই সব বিশ্লেষণই যে ফ্রয়েডের অনুসরনের মতো তা নয়। তবে ফ্রয়েড দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি এ ধরনের মনোবিশ্লেষণধর্মী গল্পের অবতারণা করেছেন বলেই মনে হয়।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাস্তবতার শিলালিপি আঁকতে গিয়ে মানুষের অচেতন মন, দমনকৃত ইচ্ছা ও প্রবৃত্তির টানকে অস্বীকার করেননি। বরং প্রাগৈতিহাসিক গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন, সভ্যতার আবরণ যতই শক্ত হোক, মানুষের ভেতরে আদিম ও প্রাগৈতিহাসিক প্রবৃত্তি ক্রমাগত সক্রিয়। এই দিক থেকেই তাঁর গল্পগুলিতে ফ্রয়েডীয় মতাদর্শ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
আলোচনার শেষে বলা যায় যে
প্রাগৈতিহাসিক গল্পগুলিতে ফ্রয়েডীয় মতাদর্শের প্রকাশ যেভাবে ঘটেছে—
১. প্রবৃত্তির টান ও অচেতন মানসিকতা
“প্রাগৈতিহাসিক” গল্পে চরিত্রগুলির আচরণে প্রবলভাবে প্রকাশ পায় প্রাচীন প্রবৃত্তি ও অচেতনের প্রভাব। মানুষের সভ্যতাবোধের আড়ালে লুকিয়ে থাকে আদিম হিংস্রতা ও যৌনচেতনা।
২. যৌনতার আকাঙ্ক্ষা ও দমন
গল্পে নারী-পুরুষ সম্পর্ককে মানিক কেবল সামাজিক কাঠামো দিয়ে ব্যাখ্যা করেননি; বরং ফ্রয়েডীয় যৌন প্রবৃত্তির দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষণ করেছেন। দমনকৃত যৌনতার অস্থিরতা ও বিপর্যয় পাঠক অনুভব করেন।
৩. হিংসা, আগ্রাসন ও মৃত্যুপ্রবৃত্তি
গল্পের চরিত্রেরা সভ্য সমাজে বসবাস করলেও তাদের ভেতরে ফ্রয়েডীয় ‘ডেথ ইনস্টিংক্ট’ বা মৃত্যুপ্রবৃত্তির প্রকাশ ঘটে। হিংসা, দ্বন্দ্ব, ধ্বংসের আকাঙ্ক্ষা তাদের আচরণে প্রতিফলিত হয়।
৪. প্রতীক ও স্বপ্নময়তা
অনেক ক্ষেত্রে মানিক গল্পের পরিবেশকে প্রতীকময় করেছেন, যা ফ্রয়েডীয় মনোবিশ্লেষণের অংশ। মানুষের ভেতরের অস্থিরতা বাহ্যজগতের প্রকৃতি ও পরিস্থিতির প্রতীকের মধ্য দিয়ে ধরা পড়ে।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।
রেফারেন্স তালিকা
- Freud, Sigmund. The Interpretation of Dreams. London: Hogarth Press, 1900.
- Freud, Sigmund. Three Essays on the Theory of Sexuality. London: Imago Publishing, 1905.
- বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক। প্রাগৈতিহাসিক। কলকাতা: দেব সাহিত্য কুটির, ১৯৪০।
- গঙ্গোপাধ্যায়, আশাপূর্ণা। বাংলা ছোটগল্পের ধারা। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৮৫।
- মিত্র, নীলিমা। মনোবিশ্লেষণ ও বাংলা সাহিত্য। ঢাকা: প্রগতি প্রকাশনী, ১৯৯৫।
- দেব, অমলেশ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: জীবন ও সাহিত্য। কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ২০০৪।