গল্প দিয়ে শুরু করি

তিন ভাই খেতে বসেছে। নতুন ভাবির হাতের রান্না খেতে খেতে ছোট ভাই বলে উঠল- ‘রতুন ভাবি রাউ নেধেছে, তা রুন হয় নি।’ ছোট ভাইয়ের ভাষাগত ভুলে তাড়িত হয়ে মেঝে ভাই বলে উঠল-‘এই একটু শুজ্জু করে বল।’ ছোট দুভাইয়ের এ হেন ভাষাজ্ঞানের পরিচয় পেয়ে নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করার জন্য আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলে বড় ভাই বলল- ‘এরা সব ল্যাকা।’

বানানের ধূম্রজালে আচ্ছন্ন হয়ে বা গোলকধাঁধাঁয় পড়ে তিন ভাইয়ের কারো না কারো সঙ্গী হতে হয় না- এমন লোকের সংখ্যা খুবই নগণ্য। মহারথীরা সম্মান বাঁচাতে মাঝে মাঝে যে কৌশলী হন না, তা নয়। অর্থাৎ অভিধানের সাহায্য নিয়ে বৈতরণি পার হন। মহাজ্ঞানীর তকমাধারী যারা নন, তারা অক্ষমের কাতারে দাঁড়িয়ে নিজের অসহায়তার কথা অকপটে স্বীকার করে নেন। বিড়ম্বনায় পড়ি আমরা, যারা জ্ঞান বিতরণের পেশায় আছি।

বিড়ম্বনার কারণও আছে। ছাত্রজীবনের ভাষাজ্ঞান, পেশাগত জীবনের অর্জিত ভাষাজ্ঞান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-মিডিয়ার প্রচারিত অসামঞ্জস্য ভাষা, অসামঞ্জস্য দূরীকরণের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বানান সংশোধনী এবং নানা মুনির নানা মত- সব মিলে আমাদের ভাষাজ্ঞানের চারপাশে একটা ধোঁয়াশার সৃষ্টি করে।

পৃথিবীর সব ভাষাতেই বানান জটিলতা কমবেশি আছে। বিবর্তনের পথ ধরে ভাষা এগিয়ে চলে। বিবর্তিত হতে হতে শব্দ তার পুরনো খোলস ছেড়ে নিত্য নতুন রূপ ধরে। প্রাণময় মানুষের বিচিত্র মনের সংস্পর্শে এসে শব্দটিও লুকোচুরি খেলে। ভাষাবিজ্ঞানের পথিক ছাড়া অন্যরা তাল মেলাতে পারে না। ভাষা প্রবহমান নদীর মতো। প্রতিনিয়ত ভাঙাগড়া চলে। অর্থাৎ শব্দের গ্রহণ-বর্জন চলে। এতে ভাষার গাঁথুনি মজবুত হলেও বানানে আসে বৈচিত্র্য। বাংলা ভাষাও এর ব্যতিক্রম নয়।

আমরা কী ভুল লিখি, আর কেনই বা ভুল লিখি-এ বিষয়গুলো লক্ষ করলে বানান ভুলের হাত থেকে রেহাই পেতে পারি। সাধারণত বানানে অশুদ্ধ, বাক্য গঠনের ক্ষেত্রে শব্দের অপপ্রয়োগ, পদবিন্যাসের ভুল, সাধু-চলিতরীতির মিশ্রণ ইত্যাদি ভাষা বিড়ম্বনার সৃষ্টি করে।

বানান জটিলতার নানাবিধ কারণ রয়েছে। বিবর্তিত শব্দ, অন্য ভাষা থেকে আগত শব্দ, সমোচ্চারিত শব্দ, সমার্থক শব্দ, যুক্তাক্ষরের আধিক্য ও তার নান্দনিকতাসহ ইত্যাদি বিষয় বাংলা বানানকে জটিল করেছে। আবার আমরা যা বলি, তা লিখি না, যা লিখি, তা বলি না। যেমন- পদ্মা (পদ্দাঁ ), সহ্য (শোজ্ঝো); একই ধ্বনির ভিন্ন ভিন্ন রূপ, যেমন- ই/ঈ, উ/ঊ, জ/য, ত/ৎ, শ/স/ষ; ধ্বনি আছে চিহ্ন নেই, যেমন – এ্যা; একই অর্থ ধারণকারী ভিন্ন ভিন্ন রূপের শব্দ, যেমন-বাড়ি/বাড়ী, গাড়ি/গাড়ী ইত্যাদি।

এছাড়াও তৎসম-অ-তৎসম শব্দের সমাহার, অভিধান ব্যবহারে অনীহা, এপার বাংলা-ওপার বাংলার মানসিকতার দ্বন্দ্ব, কৌলীন্যবোধ, অল্পপ্রাণতা-মহাপ্রাণতা, ঘোষতা-অঘোষতা, বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত বাংলা বানানের নিয়মগুলো সম্পর্কে অসচেতনতা ইত্যাদির কথা না বললেই নয়। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতাও অন্যতম কারণ। NCTB প্রকাশনার ক্ষেত্রে তাদের প্রবর্তিত বানানরীতি মেনে চললেও দেশে শত শত প্রকাশনাগুলো তা অনুসরণ অনেকক্ষেত্রেই করে না।

মিডিয়াগুলোও NCTB বা বাংলা একাডেমির নিয়ম অনুসরণ না করে খেয়াল-খুশিমত চলে। ফলে বানানে সমতা তো আসেই নি, বরং সাধারণ মানুষ আরও বিভ্রান্ত হয়েছে। এ যেন গরুর বটগাছ খাওয়ার মতো। এক গৃহস্থের উঠানে গরুতে বটগাছ খাচ্ছে। এক পড়শি এসে বলে যে, গরুতে গাছ খেয়ে যাচ্ছে, গৃহস্থ কেন চুপচাপ তা দেখছে ? গৃহস্থ তার উত্তরে বলল-‘এক দেবতা আর এক দেবতাকে খাচ্ছে , আমি মানুষ হয়ে কী আর করতে পারি ?’

টিভির পর্দায় একই শব্দের বানান বৈচিত্র্য দেখে বিভ্রান্ত হতে হয়। মিডিয়া ব্যবহৃত শব্দ আমাদের স্থির জ্ঞানের প্রাচীর ভেঙে দেয়, অভিধান দেখে আশ্বস্ত হয়েও মনের ঘোর কাটে না। পর্দার আড়ালের কুশিলবদের মানসিকতার বৈচিত্র্য থাকা ভাল, তবে বৈকল্য, অজ্ঞতা, উদাসীনতা ভাল নয়। এতে বানান নিয়ে স্থিরতা প্রত্যাশাকারীদের মনের আকাশে ভেসে থাকা ধোঁয়াশার মেঘকে আরও গাঢ় করে। সেই মেঘ সাঁতরিয়ে বানান-বিমানকে বন্দরে অবতরণের রানওয়েতে নিয়ে যাওয়া ভার হয়ে ওঠে।

উচ্চারণের ত্রুটির কথাও আসে। ঠিকমতো উচ্চারিত না হলে শব্দের বানানে ভুল হতে পারে। ‘মুখস্ত’ না ‘মুখস্থ’ হবে, ‘ঘনিষ্ট’ না ‘ঘনিষ্ঠ’ হবে, তা ঠিকমতো উচ্চারণের উপর নির্ভর করে। শব্দদুটোর শুদ্ধরূপ হলো-‘মুখস্থ‘ ও ‘ঘনিষ্ঠ‘। অনেক সময় ব্যুৎপত্তি জ্ঞানের অভাবেও বানান ভুল হয়। ‘অত্যান্ত’ না ‘অত্যস্ত’- অনেক সময় সন্দেহের সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে ব্যুৎপত্তিই সহজ পথ। অতি + অন্ত = অত্যন্ত; সন্ধির নিয়ম অনুযায়ী আ-কার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

বানান জটিলতার জট খুলতে অনেক কসরত করা হয়েছে। ১৭৭৮ সালে হ্যালহেডের ব্যাকরণে বাংলা উদাহরণ ছাপার জন্য উইলকিন্স ও পঞ্চানন কর্মকারের চেষ্টায় বাংলা বর্ণমালাকে ছাঁচে ঢালার মধ্যে দিয়ে বাংলা বানান ও বর্ণের সুস্থিত করার প্রয়াস শুরু হয়। তবে বর্ণের অবয়ব স্থির হলেও বানানে স্থিরতা আসে নি। উনিশ শতকে ব্যুৎপত্তি নির্ভর মান বানান শুরু হলে সংস্কৃতপন্থীরা মেনে নিলেও বাংলাপন্থীরা মানে নি। কেননা ব্যুৎপত্তি নির্ভর বানান ও তার উচ্চারণে ব্যাপক ব্যবধান। এখনও অনেক শব্দ যেভাবে লিখি, সেভাবে উচ্চারণ করি না। লিখি সংস্কৃত, কিন্তু উচ্চারণ করি বাংলা।

উনিশ শতকে বাংলা ভাষার বানান প্রমিত করতে গিয়ে তৎসম শব্দের বানান সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু, অ-তৎসম শব্দের বানানে শৃঙ্খলা আসে নি। তদুপরি প্রত্যয়, বিভক্তি, উপসর্গ ইত্যাদি সহযোগে গঠিত নানা রকম মিশ্র শব্দের বানানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ভাষায় চলিতরীতির ব্যাপক প্রচলনে একই শব্দের বানানে ভিন্নতা বেড়েই চলে।

এরপর চেষ্টার পর চেষ্টা চলে। বিশ শতকের বিশের দশকে বিশ্বভারতীর চলিত ভাষার বানানের নিয়ম, ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বানানের নিয়ম, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক ১৯৮৪ সালে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির বানানের সুপারিশ, পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক ১৯৯২ সালে প্রকাশিত ‘পাঠ্য বইয়ের বানান‘, বাংলা একাডেমির ১৯৯২ সালের ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’, বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা বানানের সঙ্গে সমতা বিধানের লক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক ২০০৫ সালে গঠিত ‘বানানরীতি সমতা বিধান কমিটি’র বানান সুপারিশ ইত্যাদি প্রচেষ্টার কথা বলতেই হয়। কিন্তু, সচেতনতার অভাবে বা সংগ্রহ করার মানসিকতার অভাবে এসব নিয়মগুলো সর্বমহলে সর্বত্রগামী হয় নি। ফলে পেশাজীবী মহলে সংশ্লিষ্টরা ছাড়া অন্যদের অবসথা তথৈবচ।

বানানের সামগ্রিক আলোচনা একটা কঠিন কাজ। আমি সেদিকে যাব না। আলোচ্য নিবন্ধে বানান সম্পর্কিত ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে আলোকপাত করব এবং সেই সাথে যে-সব ক্ষেত্রে বানান নিয়ে আমরা মহা ঝামেলায় পড়ি সে-সব বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করব। ভ্রান্ত ধারণার ভ্রান্তি অনেক আছে। এই ভ্রান্তিতে বিভ্রান্ত হয়ে নিজেরা নানারকম ভ্রান্তি করে বসি। এ রকম কিছু ভ্রান্তি নিয়ে কথা বলা যেতে পারে।

বাংলা বানানে ই/ঈ এবং উ/ঊ এর দ্বন্দ্ব

বাংলা বানানের সমতা বিধানের কথা প্রচারের পর সাধারণমহলে ই/ঈ এবং উ/ঊ সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। তারা মনে করেন ভাষাকে সরলীকরণ বা তরলীকরণ করতে সব শব্দেই ই এবং উ ব্যবহৃত হবে। তাই তারা ঈ এবং ঊ-কে একেবারেই ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে চান। কিন্তু নিয়মটি হলো এ রকম- যে-সব তৎসম শব্দে ই, ঈ এবং উ, ঊ উভয় শুদ্ধ, সেইসব শব্দে কেবল ই বা উ এবং এদের -কার চিহ্ন (ি ু) ব্যবহৃত হবে। যেমন- কিংবদন্তি, পদবি, ভঙ্গি, সরণি, সূচিপত্র, উনা, উষা ইত্যাদি। আর, সকল অ-তৎসম শব্দে কেবল ই, উ এবং এদের -কার চিহ্ন (ি ু) ব্যবহৃত হবে। যেমন- বাড়ি, তরকারি, রেশমি, সোনালি, মুলা, পুজো ইত্যাদি।

এ প্রসঙ্গে একটা গল্প বলা যেতে পারে। এক ব্রাহ্মণের তিন জামাই। বড়টি বাদে ছোটদুটি সংস্কৃতে পণ্ডিত। সেই লজ্জায় বড় জামাই অন্য জামাইয়ের সাথে শ্বশুর বাড়ি আসেন না। জামাইষষ্ঠীতেও আসেন না। একবার ব্রাহ্মণ অনেক বলে কয়ে জামাইষষ্ঠীতে বড় জামাইকে নিয়ে আসলেন। নইলে অন্য জামাইয়ের কাছে মান থাকছিল না। বড় জাম্ইা আগে থেকেই এসে খাটের নিচে লুকিয়ে ছিলেন। অন্য জামাইয়েরা এসে সংস্কৃত ভাষায় আলাপ করছিলেন। বড় জামাই অনেকক্ষণ তাদের কথা শুনে (ভাবলেন সংস্কৃত মানেই তো অনুস্বার যোগ করা) খাটের নিচ থেকে বের হয়ে বলতে লাগলেন-‘অনুস্বার দিলেই যদিং সংস্কৃত হং, তবে কেনং বড়ং জামাই খাটের তলেং রং।’ বানান সংস্কারের মর্মকথা না জেনে আমরা অনেকেই বড় জামাইয়ের গোত্রভূক্ত হয়ে পড়ি।

সাধারণত যে-সব ক্ষেত্রে ই-কার হয়, তাহলো- ক্রিয়াবাচক শব্দে- করি, লিখি ইত্যাদি; স্ত্রীবাচক অ-তৎসম শব্দে- মাসি, পিসি, ভাবি ইত্যাদি; ভাষা ও জাতির ক্ষেত্রে-জাপানি, আরবি ইত্যাদি; পেশা ও ভাববাচক শব্দে- ডাক্তারি, কেরানি ইত্যাদি; অ-তৎসম শব্দের বিশেষণে- রেশমি, বুনিয়াদি ইত্যাদি।

কিছু কিছু ঈ-কার যুক্ত শব্দ; যাদের শেষে প্রত্যয় বা শব্দ যোগ করলে ঈ-কার ই-কার হয়ে যায়। যেমন-
দায়ী + ত্ব= দায়িত্ব; উপকারী + তা=উপকারিতা; অভিমানী + ইনী = অভিমানিনী; প্রাণী + জগৎ = পাণিজগৎ; পরীক্ষার্থী+বৃন্দ=পরীক্ষার্থিবৃন্দ; মন্ত্রী+সভা= মন্ত্রিসভা, প্রতিযোগী + তা =প্রতিযোগিতা ইত্যাদি।
কিন্তু, শব্দটি যদি -ইন ভাগান্ত না হয় , তবে হবে না। যেমন- নারীত্ব, গোপীনাথ ইত্যাদি। আবার খাঁটি বাংলা বিভক্তি র এবং দের যুক্ত হলেও ঈ, ই হবে না। যেমন- মন্ত্রী + র =মন্ত্রীর ; মন্ত্রী + দের = মন্ত্রীদের।

কালী, দেবী, ষষ্ঠী প্রভৃতি স্ত্রীবাচক শব্দের শেষে ‘দাস‘ কথাটি যুক্ত হলে ই-কার হয়। যেমন- কালী+দাস= কালিদাস, দেবিদাস, ষষ্ঠিদাস; কিন্তু পদ শব্দ যুক্ত হলে ঈ-কার থেকে যাবে। যেমন- দেবী+পদ= দেবীপদ, কালীপদ ইত্যাদি।
কৃত, ভবন, ভূত, করণ – যুক্ত হলে তার আগে ঈ-কার যুক্ত হয়। যেমন- আত্ম + কৃত = আত্মীকৃত, সম+ভবন = সমীভবন, এ রকম ঘনীভূত, আত্মীকরণ ইত্যাদি। ব্যতিক্রম- নামকরণ, জাতীয়করণ ইত্যাদি।

ঊ-কার যুক্ত তৎসম শব্দ থেকে উৎপন্ন তদ্ভব শব্দে উ-কার হবে। যেমন- কূপ-কুয়ো; তূলা -তুলো; ধূলি ু ধুলা/ধুলো; পূজা – পুজো; ভূমি-ভুঁই ইত্যাদি।

বিদেশি ও খাঁটি দেশি শব্দে উ-কার হবে। যেমন- কুলো, ঘুড়ি, মুড়ি ইত্যাদি।
অদ্ভুত এবং ভুতুড়ে শব্দের ভুত ছাড়া সব ভূতই ঊ-কার দিয়ে হবে। অভূতপূর্ব, আবির্ভূত ইত্যাদি।

দু (দ-য়ে উ-কার) এবং দূ (দ-য়ে ঊ-কার) নিয়ে অনেকেরই মহা ঝামেলা বাধে। এ ঝামেলা সহজেই এড়ানো যায়। দুঃ/দুর যুক্ত শব্দের অর্থ সব সময় মন্দ বা খারাপ বা কষ্টকর হয়। যেমন- দুঃসহ, দুরাত্মা, দুর্গম, দুরন্ত ইত্যাদি। দূ বা দূর যেখানে থাকবে, সেখানে দূরত্ব (ফরংঃধহপব) বিষয়ক একটা ভাব থাকবেই। যেমন- দূর, দূরে, দূরপাল্লা, দূরাগত ধ্বনি, দূরপ্রাচ্য ইত্যাদি। ব্যতিক্রম-দূত, দূর্বা, দূষিত ইত্যাদি।
উ/ঊ + উ/ঊ = ঊ – সন্ধির এ সূত্রের ফলে গঠিত সকল শব্দেই ঊ-কার হবে। যেমন –
বধূ +উক্তি = বধূক্তি; কটু + উক্তি = কটূক্তি; সু + উক্ত = সূক্ত ইত্যাদি।

বাংলা বানানে রেফ ( র্ ) নিয়ে ভোগান্তি

রেফ-এর ( র্ ) পরে ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব হয় না। দ্বিত্ব ঘটেছে এ রকম শব্দ (পুরনো গ্রন্থ বাদে ) এখন প্রচলন নেই বললেই চলে। তবে ‘কার্য্যালয়’ শব্দটি অফিস-আদালতের নামফলকের বদৌলতে অনেকদিন জীবিত ছিল। শব্দটির শুদ্ধ রূপ ‘কার্যালয়’। য-এর দ্বিত্বরূপ এককরূপ হয়েছে। অনেকের ধারণা রেফ ( র্ ) থাকলে য-ফলা হবে না। ফলে অনেকে ‘দৈর্ঘ্য‘, ‘সামর্থ্য‘ ইত্যাদি শব্দ থেকে য-ফলা বাদ দেন। কিন্তু এখানে য-ফলা রেফের জন্য হয় নি। এখানে ‘য’ প্রত্যয়। দীর্ঘ+ য = দৈর্ঘ্য; সমর্থ +য =সামর্থ্য। কবি নজরুলের ‘সূর্য্য-িমামা’ ধরে সূর্যের বানান যদি কেউ ‘সূর্য্য’ লেখে, তাহলে সূর্য-মামা ভাগ্নেকে ক্ষমা করবেন না নিশ্চয়।

বাংলা বানানে কি এবং কী এর তেলেসমাতি

কি এবং কী নিয়েও জল ঘোলা কম হয় না। এ দুটো শব্দকে গুলিয়ে ফেলা হয়। কি হলো অব্যয়, আর কী হলো সর্বনাম, ক্রিয়া বিশেষণ ও বিশেষণ পদ। ‘তুমি কি যাবে ?‘ ‘সে কি এসেছিল ?‘ এখানে অব্যয় হিসেবে ব্যবহৃত। ‘তুমি কি/ খেয়েছ ?‘ এখানে প্রশ্নকর্তা জানতে চাচ্ছেন- খাওয়া হয়েছে কিনা। এর উত্তর হতে পারে- হ্যা বা না। কিন্তু ‘তুমি /কী খেয়েছ ?‘ এখানে জিজ্ঞাস্য কোন কোন দ্রব্য খাওয়া হয়েছে। এখানে আর হ্যা বা না উত্তর দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ খাওয়া দ্রব্যের নামগুলো হবে। আবার, ‘কী কী দ্রব্য নিয়ে এসেছে ?‘ এখানে সর্বনাম হিসেবে ব্যবহৃত। ‘কী বিচিত্র এই দেশ !‘

এখানে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত। কেননা, মূল কথা হল – ‘কত বিচিত্র এই দেশ।’ ‘কী‘ এখানে বিচিত্র শব্দের বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত। অনেক শিক্ষক একটু আগ বাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের বলে থাকেন যে, যেসব প্রশ্নের উত্তর মাথা ঝাঁকিয়ে দেওয়া যায় সেখানে ‘কি‘, আর যার উত্তর মুখ ফুটে বলতে হয় সেখানে ‘কী‘ হয়।

বাংলা বানানে ণত্ব-বিধান ও ষত্ব-বিধানের দোলাচল

বানানের ক্ষেত্রে ণত্ব-বিধান ও ষত্ব-বিধান সরাসরি জড়িত। এর নিয়মগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। কিন্তু দুঃখের বিষয় ণত্ব-বিধান সম্পর্কে অনেকরই ধারণা ঋ, র, ষ, র-ফলা, রেফ, ক্ষ -এর পরে ণ বসানো, কিন্তু মোটেই তা নয়। তৎসম শব্দেই ণত্ব-বিধান ও ষত্ব-বিধান প্রযোজ্য। এরও বিস্তারিত নিয়ম রয়েছে। তাছাড়া তৎসম শব্দ বাদেও অনেক অ-তৎসম শব্দ বাংলায় রয়েছে। সেখানে ণ এর ব্যবহার নেই। আবার কিছু শব্দ আছে স্বভাবতই ণ হয়। যেমন- মণি, মাণিক্য, গণিত ইত্যাদি।

খাঁটি বাংলা ও বিদেশি শব্দে ণ হয় না। যেমন- ধারণা কিন্তু ধরন, দারুণ কিন্তু দরুন ইত্যাদি।

বক্ষ্যমাণ- শব্দটি বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়- ব্ +অ+ক্ +ষ্ +য্ +অ +ম্ +আ + ণ । এখানে ষ এবং ণ এর ব্যবধান অনেক। তবুও কেন ণ হয়েছে? এ বিষয়টি আমরা অনেকেই জানি না। ঋ, র, ষ, র-ফলা, রেফ, ক্ষ -এর পরে ণ হয় এটা ঠিক, কিন্তু এরা তাদের মাঝে কিছু বর্ণকে মেনে নিয়েছে। সেগুলো হলো – স্বরবর্ণ, ক বর্গ (ক, খ, গ, ঘ, ঙ), প বর্গ ( প, ফ, ব, ভ, ম) এবং য, য়, হ, ং। অর্জন – অ+ র+জ+ন এখানে র এবং ন এর ব্যবধান জ , তাই ন হয়েছে। কিন্তু অর্পণ শব্দে র এবং ণ এর ব্যবধান প. তাই ণ হয়েছে। (অ+র+প+ণ)

সমাসবদ্ধ শব্দে আবার ণ হয় না। যেমন – ত্রিনয়ন, সর্বনাম, হরিনাম, বীরাঙ্গনা ইত্যাদি।

একটা মজার ব্যাপার দেখি। ‘নাম‘ ও ‘নয়‘ শব্দের বানানে ন। কিন্তু এদের আগে প্র, পরি, নির যোগ করলে হয়- প্রণাম, পরিণাম, নির্ণয়, পরিণতি , প্রণয়, প্রণাম ইত্যাদি। প্রতিক্ষেত্রে ন, ণ হয়ে গেছে। কারণ এ উপসর্গগুলোর শেষে র বা র-ফলা আছে।

গোলমাল বাধে অহ্ন, প্রাহ্ন, অপরাহ্ন, মধ্যাহ্ন, আহ্নিক ইত্যাদি শব্দ নিয়ে। এখানে হ্ন = হ + ন; এবং হ্ন = হ + ণ । যেখানে ণ হয়েছে, সেখানে দেখা যাবে আগে র, র-ফলা আছে।

দুঃ উপসর্গ যোগে গঠিত শব্দে ণ হয় না। যেমন – দুর্নাম, দুর্নীতি।
তৎসম শব্দ বিবর্তিত হয়ে তদ্ভব/ খাঁটি বাংলায় সথান পাওয়া শব্দে ণ হবে না। যেমন – যন্ত্রণা- যাতনা; কর্ণ – কান, ঘৃণা – ঘেন্না ; কঙ্কণ – কাঁকন ইত্যাদি।

ষত্ব-বিধানেরও অনেক নিয়ম রয়েছে। স্বল্প পরিসরে বলা সম্ভব নয়। কিছু কথা না বললেই নয়। নিচের উদাহরণগুলো দেখুন।
পরি+সদ=পরিষদ; বি+সম = বিষম; সু +সম = সুষম; সভা +সদ =সভাসদ; অ +সম= অসম ইত্যাদি। এখানে কিছু শব্দে স ষ হয়ে গেছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে হয় নি। যে-সব উপসর্গের শেষে ই-কার বা উ-কার থাকে, তার পরের স ষ হয়। তবে ব্যতিক্রমও আছে – সুসংবাদ, প্রতিসরণ, বিসর্জন, অনুসরণ, সুসহ ইত্যাদি।

বিসর্গ সন্ধিতে বিসর্গের পরে ক, খ, প, ফ থাকলে বিসর্গ স্থানে স বা ষ হয়। কিন্তু এখানেও সেই ঝামেলা কথন স আর কখন ষ হবে। বিসর্গের আগে যদি ই বা উ থাকে তবেই ষ হবে, নইলে নয় –
এজন্য পরিঃ+কার = পরিষ্কার-এ ষ , কিন্তু পুরঃ+কার =পুরস্কার-এ স হয়েছে। এভাবে আরও কিছু দৃষ্টান্ত- নিঃ + পাপ = নিষ্পাপ; দুঃ +কর = দুষ্কর; চতুঃ +পদ = চতুষ্পদ; তিরঃ +কার =তিরস্কার;
ভাঃ + কর = ভাস্কর ইত্যাদি।

খ্রিষ্ট ও খ্রিষ্টাব্দ শব্দ ষ্ট দিয়ে লিখতে হবে।

বাংলা বানানে প্রত্যয়, সন্ধি , সমাস এবং অন্যান্য বিষয়ের খুঁটিনাটি

প্রত্যয়জনিত ভুল আমরা অনেকেই করি। মনে রাখা দরকার একই শব্দে দুবার প্রত্যয় যুক্ত হয় না। ‘অধীন’ শব্দটিই কাঙ্ক্ষিত অর্থ প্রকাশ করে, এর সাথে নতুন করে কিছু যোগ করে ‘অধীনস্থ’ করলে ভুল হবে। এরকম অসহনীয়/অসহ্য শুদ্ধ, কিন্তু অসহ্যনীয় অশুদ্ধ। অর্থনীতিক নয়, আর্থনীতিক। ব্যবহারিক নয়, ব্যাবহারিক। দৌরাত্ম নয়, দৌরাত্ম্য। বিবাদমান নয়, বিবদমান। মৌন হবে, মৌনতা নয়। সখ্য হবে, সখ্যতা নয়। সৌজন্য/সুজনতা হবে, সৌজন্যতা নয়। ধীর+তা = ধীরতা বা ধীর+ য = ধৈর্য, তাই ধৈর্যতা অশুদ্ধ।

শব্দটি যদি বিশেষ্য বা বিশেষণ হয়, তবে প্রত্যয় যোগ করে আবার বিশেষ্য বা বিশেষণ করা মানেই ভুল। বিশেষ্যকে বিশেষণে, আর বিশেষণকে বিশেষ্যে রূপান্তরের প্রয়োজনেই প্রত্যয় যুক্ত হয়।

কিছু তৎসম শব্দ রয়েছে যাদের সাথে অ, য, এয়, ইক, আয়ন ইত্যাদি প্রত্যয় যুক্ত হলে শব্দে প্রথম স্বরের পরিবর্তন ঘটে। একে ব্যাকরণের ভাষায় বৃদ্ধি বলে। এ বৃদ্ধি সম্পর্কে ধারণা না থাকার কারণে বানানে অনেক ভুল হয়। বৃদ্ধি এরকম- অ স্থানে আ, ই/ঈ/এ স্থানে ঐ, উ/ঊ/ও স্থানে ঔ এবং ঋ স্থানে আর হয়। যেমন-
নগর +ইক = নাগরিক। এখানে নগর শব্দে ন-এর সাথে অ ছিল, ইক প্রত্যয় যোগ করার কারণেই অ স্থানে আ হয়েছে।
পথ + এয় =পাথেয়, অগ্নি + এয় =আগ্নেয়, সেনা + য = সৈন্য, মুনি + অ = মৌন, উপন্যাস +ইক = ঔপন্যাসিক, পুরুষ + অ = পৌরুষ, মনু + অ = মানব, শিশু + অ = শৈশব, পৃথিবী+অ=পার্থিব, স্মৃতি+অ=স্মার্ত , উপনিবেশ +ইক =ঔপনিবেশিক ইত্যাদি।

সন্ধি
সন্ধির ক্ষেত্রে ভুল খুব বেশি না হলেও কম না। বিশেষ করে বিভিন্ন সূত্রের সাহায্যে আগত বর্ণ সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবই ভুলের কারণ। ‘রবি‘ ও ‘ইন্দ্র‘ দুটো শব্দেই ই-কার। কিন্তু সন্ধির ফলে গঠিত শব্দ হবে-রবীন্দ্র।
উপরি+উক্ত = উপর্যুক্ত; যা উপরে বলা হয়েছে। এ অর্থে উপরোক্ত শব্দটি বহুল প্রচলিত। কিন্তু সন্ধি তা সমর্থন করে না। উৎ+ লিখিত = উল্লিখিত; তাই উল্লেখিত শব্দটি ভুল। এমনিভাবে উপরি+উপরি=উপর্যুপরি।

সমাস
সমাসবদ্ধ শব্দে আমরা বাহুল্যদোষ ঘটিয়ে থাকি। যেমন- আয়ত্ত/অধীন, কিন্তু আয়ত্তাধীন নয়; আরক্ত/রক্তিম, কিন্তু আরক্তিম নয়; সুবুদ্ধি/বুদ্ধিমান, কিন্তু সুবুদ্ধিমান নয়; স্বাগত, কিন্তু সুস্বাগত নয়; ইত্যাদি।
স্বাস্থ্য শব্দের অর্থই সুস্থতা, নিরাময়তা, তাই সুস্বাস্থ্য ভুল।

স্ত এবং স্থ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব
মহাগোলমেলে হলো ‘স্ত‘ ও ‘স্থ‘ যুক্ত শব্দসমূহ। তবে পণ্ডিতেরা বলে থাকেন যে, শব্দ থেকে ‘স্ত‘ বাদ দিলে তার আর অর্থ থাকে না, কিন্তু ‘স্থ‘ বাদ দিলে অর্থবোধক শব্দ পড়ে থাকে। একটু সতর্ক হলেই এ গোলমাল থেকে বাঁচা সম্ভব। আর একটি বিষয় হলো- স্থ অর্থ থাকা বা অবস্থান। মুখস্থ- মুখে স্থ যার; অর্থাৎ মুখে থাকে যা; গৃহস্থ- গৃহে থাকে যে; কণ্ঠস্থ- কণ্ঠে থাকে যা ইত্যাদি।

স্বত্ব, সত্ত্ব, সত্তা নিয়ে অন্ধকারে
স্ব + ত্ব = স্বত্ব; এখানে স্ব মানে নিজে, শব্দটি বিশেষণ। ত্ব যোগ করে বিশেষ্য করা হয়েছে। শব্দটির অর্থ হলো নিজস্ব বা মালিকানা। যেমন- এ জমিতে আমার স্বত্ব আছে।
সত্ত্ব -এর তিনটি অর্থ।
এক. সৎ + ত্ব = সত্ত্ব; সন্ধি ঘটেছে-ৎ+ত্ব=ত্ত্ব । এখানে সৎ অর্থ বিদ্যমান। গঠিত শব্দের অর্থ হল অস্তিত্ব বা বিদ্যমানতা। যেমন-

মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা। অর্থাৎ মেয়েটির অস্তঃ-তে বা অভ্যস্তরে আরেকটি প্রাণের অস্তিত্ব আছে।
দুই. সত্ত্ব শব্দটির আরেকটি অর্থ হলো-প্রকৃতির তিনটি গুণের(সত্ত্ব, রজঃ , তম)মধ্যে শ্রেষ্ঠগুণ। মানুষের মনের শ্রেষ্ঠ অনুভূতির(দয়া, মায়া, প্রেম,বিবেক ইত্যাদি) সম্মিলিত রূপই হলো সত্ত্ব গুণ।
তিন. সত্ত্ব এর তৃতীয় অর্থ হলো- রস, ফলের রস। ‘আমসত্ত্ব’- আমের রস গাঢ় করেই বানানো হয়।
সত্তা-সৎ + তা; সৎ অর্থ বিদ্যমান। সৎ-এর সাথে তা প্রত্যয় যুক্ত করে বিশেষ্যে রূপান্তর করা হয়েছে। এর অর্থ হলো- বিদ্যমানতা, অস্তিত্ব। যেমন- সত্তা হারিয়ে গেল।

বাংলা বানানে একসাথে হবে, না আলাদা হবে ঃ

শব্দ ফাঁক-ফাঁক হবে না গায়ে-গায়ে হবে, তা ধরতে না পারলে বিপদ বাড়বে। যেমন-
ক. দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত।
খ. জনাব মন্টু মিয়া দেশের বুদ্ধিজীবীসমাজের কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ।
এখানে দুটো বাক্যই শুদ্ধ, কিন্তু অর্থের ভিন্নতা স্পষ্ট।

গ. বর্তমানের কবিতা পাঠক কবিতা পড়লেও মর্ম বোঝে না। বাক্যটিতে কোনো বানান ভুল নেই, তবুও অর্থহীন। অর্থবোধক করতে হলে অবশ্যই লিখতে হবে- কবিতাপাঠক/কবিতা-পাঠক।

প্রকার বা ভেদ অর্থে বিশেষ শব্দটি শব্দের শেষে যুক্ত হবে। যেমন- গ্রন্থবিশেষ, অবস্থাবিশেষ। কিন্তু বিশেষণ হিসেবে আগে বসলে আলাদা হবে। যেমন- বিশেষ অবস্থা, বিশেষ গ্রন্থ ইত্যাদি।

বাংলা বানানে না, নি, নেই, নয় – এগুলো কখনো শব্দের শেষে একসাথে বসবে না। যেমন- আসে নি, যায় না ইত্যাদি।

‘নয় তো’ অর্থ নয়, কিন্তু ‘নয়তো’ অর্থ বিকল্প। যেমন-
ক. সোমবার নয়, তো মঙ্গলবার যাবে ?
খ. মনটা খাঁটি নয় তো, মাকাল ফল।
গ. মনে ধরলে এস আমার কাছে, নয়তো এসো না।

‘হয় তো’ অর্থ হ্যা সূচক, কিন্তু ‘হয়তো’ অর্থ অনিশ্চয়তা / অসম্ভাব্যতা। যেমন-
তুমি হয় তো অফিসে যাবে, কিন্তু আমার শরীরের যা অবস্থা, হয়তো নাও যেতে পারি।

‘না হয়’ অর্থ হ্যা সূচক, কিন্তু ‘নাহয়’ অর্থ পক্ষান্তরে, বরং।
ক. আরও কিছুক্ষণ না হয় রহিতে কাছে ? আরও কিছুক্ষণ না হয় বাসিতে ভাল ?
খ . তুমি নাহয়, আজ না এসে কাল এস।

কেন না / কেননা
আমি কেন না বললাম, তার কাছে আমারও যাওয়ার দরকার, কেননা অনেক কিছু বলার ছিল।
‘কেন না’ -এখানে দুটো শব্দই অর্থবোধক, কেন প্রশ্নবোধক, না নেতিবাচক, অর্থাৎ আমি যাব না বললাম কেন? ‘কেননা’ অর্থ কারণ বা যেহেতু।

তার পর/ তারপর
ক. তোমার সংসারে এসে জীবনে যা ঘটে গেল, তার পর আর থাকতে ইচ্ছে করে না।
খ. তুমি এলে, তারপর আমি গেলাম।
‘তার পর’ – ‘এত কিছু ঘটবার পর’, আর ‘তারপর’ – ‘কোনো কিছুর অব্যবহিত পরে’। (পরপরই)

এক রকম / একরকম
ক. বাজারে যাচ্ছ যাও, তবে বাচ্চাদের এক রকম পোশাক কিনবে।
খ. মানুষ শোক যতই পাক, দিন একরকম কেটে যায়।
‘এক রকম’ অর্থ ‘প্রায় সাদৃশ্য’(ংধসব ঃুঢ়ব), ‘একরকম’ অর্থ ‘কোনোভাবে’।

বোধ হয়/বোধহয়
‘বোধ হয়’ অর্থ মনে হয় , কিন্তু ‘বোধহয়’ অর্থ সম্ভবত। যেমন-
ক. আমার বোধ হয় , তোমার মনের কথা ধরতে পেরেছি।
খ. সে যে ধাক্কা খেল ব্যাপারটিতে , বোধহয় আর এখানে আসবে না।
ব্যাপ্তি বোঝাতে প্রতি একসাথে বসবে- প্রতিদিন, ছাত্রপতি, আর উদ্দেশে বা লক্ষ করে বোঝালে পৃথক বসবে। যেমন – জনতার প্রতি, আমাদের প্রতি ইত্যাদি।

বচন সংক্রান্ত
বাক্যে বচনের দ্বিত্ব হয় না। যেমন- ক্লাশে অনেক ছাত্রীরা এসেছিল। অশুদ্ধ
ক্লাশে অনেক ছাত্রী এসেছিল। শুদ্ধ

উদ্দেশ/উদ্দেশ্য
উদ্দেশ অর্থ- অন্বেষণ/খোঁজ/সন্ধান/লক্ষ্য; উদ্দেশ্য অর্থ -অভিপ্রায়/অভিসন্ধি/লক্ষ্য/তাৎপর্য;
বাক্যে প্রয়োগ করলে এর অর্থ আরও পরিষ্কার হবে। যেমন-
ক. কার উদ্দেশে একথা বলা হল, তা কেউ বুঝতে পারল না।
খ. লোকটা সুবিধের নয় , উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো কাজ করে না।

লক্ষ্য/লক্ষ/উপলক্ষ
লক্ষ্য, লক্ষ ও উপলক্ষ শব্দগুলোতে য-ফলার বিড়ম্বনায় বিড়ম্বিত অনেকে।
লক্ষ -অর্থ একশত হাজার।
লক্ষ -অর্থ লাক্ষা বা গালা;
লক্ষ/লক্ষ্য- অর্থ নজর/দৃষ্টি/খেয়াল/ লক্ষ করা/লক্ষ রাখা;

উদ্দেশ্য বা দেখা অর্থে লক্ষ্য ও লক্ষ দুটো বানানই ঠিক। কিন্তু বাক্যে প্রয়োগে এদের ভিন্নতা রয়েছে। যেমন-
ক. দেশপ্রেমিকের লক্ষ্য দেশের উন্নতি করা। (উদ্দেশ্যে অর্থে )
খ. পড়াশোনার দিকে তার কোনো লক্ষ্য নেই। (দৃষ্টি বা নজর অর্থে)
গ. মেয়েটি সংসারের দিকে লক্ষ করে না/লক্ষ্য রাখে না। ((দৃষ্টি বা নজর অর্থে)
অর্থাৎ দৃষ্টিপাত করা বা মনোযোগ দেওয়া অর্থে এই শব্দের বানান দু রকম হয়েছে। বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহার করলে য-ফলা দিতে হবে। আর ক্রিয়াপদ হিসেবে ব্যবহার করলে য-ফলা হবে না।
উপলক্ষ- অর্থ প্রয়োজন/উদ্দেশ্য/অজুহাত ইত্যাদি। এখানে য-ফলা ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।

বাংলা বানানে বহুল প্রচলিত ভুল
অফিস-আদালতে বহুল প্রচলিত একটি ভুল শব্দ ‘এতদ্বারা’। শুদ্ধরূপ হবে ‘এতদ্দ্বারা’, এতদ্+দ্বারা=এতদ্দ্বারা। আমরা লিখি ‘যুদ্ধকালীন সময়ে’, ‘খেলা চলাকালীন সময়ে’। ‘কালীন’ শব্দটি ‘কাল’ বিশেষ্যের বিশেষণ, অর্থ সময়ে। তাই কালীন লেখার পর আবার ‘সময়ে’ লেখা পদের অপপ্রয়োগ।

বাংলা বানানে সাধু-চলিতের গোলকধাঁধাঁ
এ আর এমন কী ?-সাধু-চলিতরীতি নিয়ে এ রকম একটা ভাব অনেকেরই মধ্যে। অনেকেই মনে করেন ক্রিয়াপদগুলো সংক্ষিপ্ত করে দিলেই চলিতরীতি হয়ে যায়। ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। কয়েকটা শব্দের সাধু থেকে চলিতরূপ দেখি-
চন্দ্র-চাঁদ, বৃন্ত-বোঁটা, চর্ম-চামড়া, রাজাজ্ঞা- রাজার হুকুম, জন্য-জন্যে, দ্বারা -দিয়ে, অপেক্ষা-চেয়ে, বরঞ্চ -বরং ইত্যাদি। এখানে একটা শব্দও কিন্তু ক্রিয়াপদ নয়। নইলে, তাহলে, হয়তো, নয়তো, মতন শুধুই চলিতে ব্যবহৃত। ‘গুরু-চণ্ডালী, দোষ ভাষাকে কলুষিত করে।

বিসর্গ নিয়ে খটকা
পদান্তে বিসর্গ হবে না। যেমন- মূলত, প্রধানত, ক্রমশ ইত্যাদি। পদমধ্যে বিসর্গ হবে। যেমন- নিঃশেষ, দুঃসহ, পুনঃপুন ইত্যাদি। পদমধ্যে বিসর্গ বাদ দিলে যদি ব্যাকরণ মেনে নেয়, তবে বাদ দেওয়া যাবে। যেমন- নিঃস্ব/নিস্ব, দুঃস্থ/দুস্থ ইত্যাদি। এ পর্যন্ত সোজা হিসেব। কিন্তু যখন ‘ইতোমধ্যে’ আর ‘ইতঃপূর্বে’ সামনে আসে, তখনই খটকাটা মাথায় ঢোকে। কেন এ পার্থক্য। বিসর্গ সন্ধির দিকে তাকানো যাক।

সূত্র: বিসর্গের পরে ক, ক্ষ, খ, প, ফ, র থাকলে বিসর্গ বজায় থাকে, আর বিসর্গের পরে বর্গের ৩য়, ৪র্থ, ৫ম বর্ণ, এবং য, ল, হ থাকলে বিসর্গ স্থানে ও-কার হয়।
মনঃ + যোগ = মনোযোগ; কিন্তু মনঃ +কষ্ট = মনঃকষ্ট। ইতঃ + মধ্যে = ইতোমধ্যে; কিন্তু ইতঃ + পূর্বে = ইতঃপূর্বে। এ রকম অন্তঃরাষ্ট্রীয়, মনঃপূত ইত্যাদি। এই নিয়মের ভ্রান্তিতে অনেকেই আবার ভুল করে লেখেন- প্রাতঃরাশ, পুনঃরুক্তি। ব্যুৎপত্তির দিকে নজর দিই- প্রাতঃ +আশ= প্রাতরাশ, পুনঃ +উক্তি = পুনরুক্তি।
এখানে র কোথায় যে বিসর্গ বজায় থাকবে। সন্ধির নিয়ম অনুসারে অনেক শব্দে বিসর্গ স্থানে র হয়। সে-নিয়ম অনুসারে এখানে বিসর্গ স্থানে র হয়েছে।

চন্দ্রবিন্দুর ভোগান্তি ( ঁ)

চন্দ্রবিন্দুর ভোগান্তিতে আমরা জোসনা না দেখে দেখি অমানিশার ঘোর অন্ধকার। বাংলা বর্ণমালায় নাসিক্য বর্ণ আছে ছয়টি- ঙ, ং, ঞ, ণ, ন, ম (প্রকৃত ধ্বনি তিনটি- ঙ, ন, ম)। অনেকে এদেরকে ভুতের বর্ণ বলে থাকেন। ভুত যেমন নাকে তুলে কথা বলে(সিনেমা-নাটকের বদৌলতে জানি), তেমনি এ বর্ণগুলো উচ্চারণের সময় নাকে তুলে উচ্চারণ করতে হয়। প্রচলিত বিশ্বাস ভুত চলে যাওয়ার সময় একটা চিহ্ন রেখে যায়। ঠিক তেমনি নাসিক্য বর্ণগুলো কোনো শব্দ থেকে লুপ্ত হওয়ার সময় তাদের চিহ্নস্বরূপ চন্দ্রবিন্দু রেখে যায়।

যেমন
চন্দ্র-চাঁদ, অন্ধকার-আঁধার, বন্ধন-বাঁধন, অঞ্চল-আঁচল পঞ্চ-পাঁচ, বংশ-বাঁশ, হংস-হাঁস ইত্যাদি। এখানে একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, মূল শব্দগুলো কিন্তু অ-কার যুক্ত, চন্দ্রবিন্দু হওয়ার সময় আ-কার হয়েছে। ভুত শুধু চিহ্ন রেখে যায় নি, সঙ্গের স্বরবর্ণকেও পরিবর্তন করেছে। (অ স্থানে আ হয়)। ষণ্ড-ষাঁড়।
পাঁচযুক্ত সংখ্যা যেমন, পঁচিশ, পঁয়ত্রিশ, পঁয়তাল্লিশ চন্দ্রবিন্দুযুক্ত। কিন্তু পনের, পঞ্চান্ন চন্দ্রবিন্দু ছাড়া, কেননা এখানে নাসিক্যধ্বনি রয়ে গেছে।
কিছু শব্দ আছে কারণ ছাড়াই চন্দ্রবিন্দু ধারণ করে আছে। যেমন- পুঁথি। এদেরকে স্বতোনাসিক্যধ্বনি বলে।
সম্মান জ্ঞাপন করতেও চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার করা হয়। যেমন- তাঁর, ওঁর, ওঁ ইত্যাদি।

শেষ কথা

বাংলা বানান সম্পর্কে উদাসীন থাকা মানেই মাতৃভাষাকে অপমান করা। ‘হাত আলিস্যে গোঁফ নষ্ট’ বা ‘পণ্ডিতের ময়লা সর্বত্র লাগে’-প্রবাদকে জীবনে বাস্তবায়ন করে নিজের যেমন বারোটা বাজছে, তেমনি মহান বায়ান্নর ত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত মাতৃভাষার দেহ ক্ষত-বিক্ষত করে অবজ্ঞা প্রকাশ করছি। বানান নিয়ে সতর্ক হই, অন্যকে প্ররোচিত করি, বিভিন্ন সময়ে প্রবর্তিত বানানরীতিগুলো অনুসরণ করি- তাহলেই মাতৃভাষার প্রতি মমত্ব প্রকাশ পাবে।

একটি গল্প দিয়ে শেষ করব। ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় বহু মানুষ হতাহত। ডাক্তার এসে নিহত ও আহত চিহ্নিত করে আহতদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আর নিহতদের মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। আহতদের নিয়ে যাওয়ার পর ডোম আসে লাশ নিতে। এদের মধ্যে একজন ছিল বেহুঁশ হয়ে, ডাক্তার মৃত মনে করে লাশের মধ্যে রেখে যায়। ঠ্যাং ধরে টান দিতেই জেগে যায়। বলে ওঠে – ‘এই কী করিস ? কী করিস ?’ ডোম বলে- ‘এই কথা বলিস না, ত্ইু মরে গেছিস।‘ লোকটি বলে- আমি কথা বলছি, তুই বলছিস মরে গেছি। ডোম বলে ওঠে-‘এ্যা ডাক্তারের চেয়ে তুই বেশি জানিস ? ডাক্তার বলেছে, তুই মরে গেছিস।’

প্রাণময় বিচিত্র মনের মানুষের প্রাণের ছোঁয়ায় ভাষা নিত্য নতুন জীবন পায়। রূপ বদলিয়ে খোল-নলচে পাল্টে ফেলে। তাই, চরম শুদ্ধ কথাটি চলে না। আমরা জ্ঞানী হয়ে নির্দেশিকা মানব, কিন্তু ডোমের সারিতে কখনো যাব না।

জীবন্ত ও সদা পরিবর্তিত ভাষার শব্দের বানানরীতি নির্ধারণ জটিল ও কঠিন বিষয়। ভাষার একটা মান বানান থাকা দরকার। কিন্তু তা বিজ্ঞানসম্মত হতেও পারে, নাও পারে। বিজ্ঞানসম্মত বানান পৃথিবীর কোনো ভাষায়ই মূলত থাকে না। গৃহীত বানানই শুদ্ধ; অগৃহীত বানান অশুদ্ধ, যতই যুক্তিসঙ্গত হোক না কেন। গ্রহণকারীর গ্রহণ করার মানসিকতা ও সমন্বয়ধর্মিতার উপর ‘সুস্থিত সুশৃঙ্খল সামঞ্জস্যপূর্ণ বানানরীতি’ নির্ভর করে।


……………………………………………………

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *