বাংলা ভাষার উদ্ভব নিয়ে পণ্ডিতদের মতামত বিশ্লেষণ

বাংলা ভাষার উদ্ভব: ৩টি মত

বাংলা ভাষার উদ্ভব সম্পর্কে বিভিন্ন পন্ডিতদের মতামত বিশ্লেষণ:

বাংলা ভাষার উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের পথ বৈচিত্র্যময়, তাৎপর্যপূর্ণ ও নানা মতের সমাহারে ভরা। ইন্দো-ইউরোপীয় মূলভাষার শতম শাখার অন্তর্গত ইন্দো-ইরানীয় বা আর্যভাষার ভারতীয় শাখা কালের বিবর্তনে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসে নব্য ভারতীয় আর্য ভাষায় রূপ লাভ করেছে। ন.ভা.আ ভাষা বাংলা সপ্তম, অষ্টম শতকে জন্ম লাভ করেছে। তবে পূর্ববর্তী কোন স্তর থেকে বাংলা ভাষার জন্ম, তা নিয়ে রয়েছে মতভেদ। প্রচলিত তিনটি মত হলো-

১. বাংলা ভাষা সংস্কৃত ভাষার দুহিতা


২। স্যার জর্জ গিয়ারসন ও ডঃ সুনীতিকুমার মনে করেন- মাগধী- প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার জন্ম।
৩। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন মাগধি নয়, গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার উদ্ভব।

প্রতিটি মতামতের বিশ্লেষণঃ
সংস্কৃত পন্ডিতদের ধারণা সংস্কৃত ভাষা থেকেই বাংলা ভাষা সাক্ষাৎ উৎপন্ন হয়েছে। কিন্তু সংস্কৃত থেকে বাংলা ভাষা সরাসরি উৎপন্ন হয় নি।

প্রা.ভা. আর্যভাষা থেকে আধুনিক ভারতীয় ভাষার ইতিহাস দেখলে দেখা যায় যে, বাংলার আগের অংশ অপভ্রংশ তার আগে রয়েছে প্রাকৃত যুগ। প্রাকৃতের যুগে সংস্কৃত ছিল সাহিত্যিক ভাষা। ব্রাহ্মণ বা পন্ডিতেরা সংস্কৃত ব্যবহার করতো সাধারণ মানুষ এ ভাষায় কথা বলতো না।

চিত্রব্যাবহারিক বাংলা ও ভাষার ইতিহাস

প্রাকৃতের পূর্বের স্তরে রয়েছে প্রাচীন প্রাকৃত বা পালি ভাষার যুগ। ডঃ শহীদুল্লাহ প্রচলিত কয়েকটি শব্দের বিবর্তন দেখিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, বাংলা ভাষার এ শব্দগুলো সংস্কৃত থেকে সরাসরি বাংলায় আসে নি। যেমন-

বাংলা ——- আমি তুমি মা বাবা বোন হাত গরু

সংস্কৃত —— অস্মদ যুম্মদ মাতা পিতা ভাগিনী হস্ত গো
প্রাকৃত——- অম্মে তুম্মে মাআ বপ্প্ বহিনী হত্থ গোরুঅ


স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে সংস্কৃত শব্দগুলোর সাথে বাংলা শব্দগুলোর কোনো মিল নেই, বরং প্রাকৃত শব্দের সাথে বাংলা শব্দের মিল রয়েছে।

ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দুটো বাক্যের উদাহরণও দিয়েছেনÑ
বাংলা আমি দেখি (আমরা দেখি) তুমি আছ (তোমরা আছ)
সংস্কৃত অহং পশ্যামি (এক বচন) ত্বম অসি (এক বচনে)
বয়ং পশ্যাম (বহুবচন) যুয়ংস্থ (বহু বচনে)

সংস্কৃত ‘বয়ং পশ্যম’ থেকে বাংলা আমরা দেখি—- এ বাক্য যে উৎপন্ন হয় নি, তা সুস্পষ্ট।

প্রাকৃতে উক্ত বাক্য দুটোর রূপ হলো—
আমি দেখি — অমহে দেকখি অই।
তুমি আছ ——- তুমহে আচ্ছহ।

বাংলা ভাষার উদ্ভব নিয়ে
অডিও ভিডিও শুনতে ক্লিক

এভাবে আলোচনা বা প্রমাণ দ্বারা বলা যায় যে, বাংলা সরাসরি সংস্কৃত ভাষা থেকে আসে নি। তবে এটা নিশ্চিত যে সংস্কৃতের সমগোত্রীয় এক প্রাচীন ভারতীয় আর্য কথ্য ভাষা থেকে এর উৎপত্তি।

বাংলা ভাষার উদ্ভব

বাংলা ভাষার উদ্ভব নিয়ে মতামত বিশ্লেষণ:

স্যার জর্জ গিয়ারসন ও ড. সুনীতিকুমার মনে করেন, মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার জন্ম । এদের মতে বাংলা ভাষা আসামী, উড়িয়া এবং বিহারী ভাষাগুলোর সহদরাস্থানীয় এবং এদের মূল একই। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এ মতের বাইরে অবস্থান করেছেন এবং যুক্তি দিয়ে এদের মত খন্ডন করেছেন।

মাগধী প্রাকৃতের সাথে বাংলা ভাষার কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। যেমন- বাংলায় শ, স, ষ- স্থানে ‘শ’ ব্যবহৃত হয়। মাগধী প্রাকৃতেও তাই। মাগধী প্রাকৃতের মতো বাংলায়ও কর্তৃকারকে ‘এ’ বিভক্তির প্রয়োগ হয়। ডঃ শহীদুল্লাহ বলেন যে, মাগধীতে ‘র’ স্থানে ‘ল’ হয়, কিন্তু বাংলার সহোদরাস্থানীয় কোনো ভাষাতেই শ-কার, এবং ‘র’ স্থানে ‘ল’- এ দুটো পরিবর্তন এক সঙ্গে দেখা যায় না। বাংলা শ-কার আছে, কিন্তু ‘র’ স্থানে ‘ল’ হয় না। সামান্য ক্ষেত্রে ‘র’ স্থানে ‘ল’ হয়, সেগুলো মাগধী প্রাকৃত ভিন্ন অন্য প্রাকৃতের মধ্যে দিয়েও আসতে পারে। যেমন- হরিদ্রা > হলদ্দী > হলুদ (হলদি)

শুধু শ-কারের অস্তিত্ব ও সাদৃশ্য দেখে ‘মাগধী প্রকৃত’ থেকে বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে, এমন কথা বলা যায় না। বাংলার সহোদরা ‘বিহারীতে’ স-কার এবং ‘আসামীতে’ হ-কার দেখা যায়। বাংলার পশ্চিম প্রান্তের উপভাষায় এখনও শ-কার আছে। 

কর্তৃকারকে ‘এ’ বিভক্তির প্রয়োগ শুধু মাগধী প্রাকৃতের বিশেষ লক্ষণ নয়। সকর্মক ক্রিয়ায় ‘আসামীতে’ কর্তৃকারকে ‘এ’ বিভক্তি নিয়মিত দেখা যায়। যেমন- রামে বোলে। পূর্ব বাংলার উপভাষাতেও এটি দেখা যায়। ডঃ শহীদুল্লাহ মনে করেন যে, কর্তায় ‘এ’ বিভক্তিটি করণ কারকের এ-কার (এঁ-কার) থেকে এসেছে। এর সাথে মাগধী প্রাকৃতের কর্তৃকারকের এ বিভক্তির কোনো সম্পর্ক নেই।

ভিডিও ক্লিক https://www.youtube.com/watch?v=Dk2LX_0vtiI

প্রাচীন বাংলা উত্তম পুরুষের একবচনে হঁউ শব্দটি মাগধীর হকে, হগে<সং অহকম থেকে আসতে পারে না বলে শহীদুল্লাহ মনে করেন। এটি অশোকের প্রাচ্য লিপি হকং<অহকম<অহমÑ থেকে এসেছে বলা যায়।

‘মড়া’ শব্দটি মাগধী প্রাকৃত। বাংলায় আছে। অন্য প্রাকৃত থেকেও আসতে পারে। সংস্কৃত কৃত, গত স্থানে মাগধীতে কড়, গড় হয়, কিন্তু বাংলায় হয় না। শুধু কয়েকটি শব্দের উপর ভিত্তি করে ভাষার উৎপত্তি স্থির করা বিজ্ঞান সম্মত নয়। কেননা, এক উপভাষা থেকে অন্য উপভাষায় শব্দের ঋণ গ্রহণ সাধারণ ঘটনা।

শহীদুল্লাহর মতে গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষা এসেছে। তুলনামূলক ভাষাতত্তে¡র সাহায্যে তা প্রমাণও করা যায়। আনুমানিক খ্রিঃ ষষ্ঠ শতকে দন্ডী তাঁর কাব্যাদর্শ্যে গৌড়ীয় প্রাকৃতের নাম উল্লেখ করেছেন।

তুলনামূলক ভাষাতত্তে¡র সাহায্যে গৌড়ীয় প্রাকৃতের কিছু বৈশিষ্ট্য
১) পৈশাচী প্রাকৃতের মতো ণ, ন স্থানে ‘ন’ হতো।
২) শব্দের প্রথমে বর্গীয় ‘ব’ এবং অন্তঃস্থ ‘ব’ দুটোই বর্গীয় রূপে ছিল।
৩) মহারাষ্ট্রী প্রাকৃতের মতো শব্দের প্রথমে য স্থানে জ এবং অন্যত্র দ্য, র্জ, র্য্য স্থানে জ্জ হতো।
৪) ‘র’ ধ্বনির কোনো পরিবর্তন হতো না ইত্যাদি।

গৌড়ীয় প্রাকৃতের পরের স্তরের নাম গৌড়-অপভ্রংশ। প্রাকৃত বৈয়াকরণে মার্কন্ডেয় ২৭টি অপভ্রংশের যে তালিকা দিয়েছেন তাতে এ অপভ্রংশের উল্লেখ আছে। গৌড়ী অপভ্রংশের ভাষাতাত্তি¡ক বৈশিষ্ট্য শহীদুল্লাহর মতে নিম্নরূপঃ

১) কর্তৃকারক ও কর্মকারকে বিভক্তি লোপ পেত। যেমনÑ বুদ্ধ ঘোড়অ দেক্খই (বুদ্ধ ঘোড়া দেখে)
২) সম্বন্ধ পদ বিশেষণের ন্যায় সম্বন্ধীয় বিশেষ্যের লিঙ্গভাগী হতো। যেমনÑ রামকেরী বাড়ীত্ত বহুত্ত গচ্ছানি আচ্ছন্তি (রামের বাড়িতে বহুত গাছ আছে)
৩) নামযুক্ত বাক্যে কর্তায় ও বিধেয় বিশেষণে কখনও কখনও অকারান্ত শব্দে এ-কার হতো। যেমনÑ এহু গচ্ছে বড্ডে (এই গাছ বড়)
৪) সকর্মক ক্রিয়ার অতীত ও ভবিষ্যৎকালে ক্রিয়া কর্মের লিঙ্গ-ভাগী হতো। যেমনÑ মইঁ তেন্তিলী খাইল্লী (আমি তেতুল খাইলাম)
৫) অকর্মক ক্রিয়ার অতীত ও ভবিষ্যৎকালে ক্রিয়া কর্তার লিঙ্গ অনুসরণ করতো। যেমন- বহিনী ঘরে গহল্লী।
৬) করণ কারকে এঁ বিভক্তি, সম্বন্ধে ‘কর’ এবং ‘ক’, স¤প্রদানে ‘ক’, অপাদানে হু এবং অধিকরণে এ, ‘হি’ বিভক্তি যুক্ত হতো।
৭) অতীতকালে ইল্ল এবং ভষ্যিতে ইব্ব প্রত্যয় যুক্ত হতো।

ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে এই গৌড়ী অপভ্রংশ থেকেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি। এজন্য বাংলা ভাষাকে এক সময় গৌড়ীয় ভাষা বলা হতো। কাহ্নের ও সরহের দোহাকোষে এবং প্রাকৃত পৈঙ্গলে গৌড়ী অপভ্রংশ ভাষার কিছু নিদর্শন পাওয়া যায়।

বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। আমরা এ মত সমর্থন করি। ডঃ এনামূল হক এ মতের সমালোচনা করলেও শহীদুল্লাহর মতকে খন্ডন করার মতো উপযুক্ত প্রমাণ দেখাতে পারেন নি। পরিশেষে বলা যায় যে, সংস্কৃত থেকে সরাসরি বাংলা ভাষা আসে নি। দূর সম্পর্কের হলেও একেবারে অনাত্মীয়া নয়।

ব্যবহারিক বিভিন্ন প্রয়োজনে বাংলা ভাষা তার এই আত্মীয়টির (অফুরন্ত ধনাধিকার অকৃপণ আত্মীয়া) কাছে সার্বিক সাহায্য চেয়ে কখনো নিরাশ হয় নি। অন্যদিকে প্রাচ্য প্রাকৃতেরই একটি বিশিষ্ট অপভ্রংশ রূপের পরিবর্তন পরম্পরার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে। সে প্রাকৃত, মাগধী না গৌড়ী তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও সাধারণভাবে বলা যায় যে, প্রাচ্য প্রাকৃতেরই বিশিষ্ট পরিবর্তন পরম্পরায় যে বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে, তাতে কারো দ্বিমত নেই। চর্যাপদই এর একমাত্র প্রামাণিক নিদর্শন সকলে স্বীকার করেছেন।

বাংলা—‘তুমি আছ’;
সংস্কৃত—- যুয়ং স্থ ;
প্রাচীন প্রাকৃতে (পালি)—- তুমহে আচ্ছত্থ ;
মধ্য প্রাকৃতে ও অপভ্রংশে—- তুম্হে আচ্ছহ ;
প্রাচীন বাংলায়——- তুমহে আছহ ;
মধ্য বাংলায়———- তোহ্মে বা তুহ্মি আছহ
আধুনিক বাংলায়—— তুমি আছ।

এ থেকে প্রাচীন ভারতীয় আর্য কথ্য ভাষা বা আদিম প্রাকৃত ‘তুম্মে অচ্ছথ’ পুনর্গঠন করা যায়।

আদিম প্রাকৃত থেকে বাংলা পর্যন্ত আমরা যে কয়েকটি স্তর দেখলাম, তাতে এটা স্পষ্ট যে, “তুমি আছ”Ñ কিছুতেই সংস্কৃত ‘যুয়ং স্থ’ থেকে উৎপন্ন হতে পারে না। তাই বলা যায় বাংলা ভাষা সংস্কৃতের দুহিতা নয়, তবে দূর সম্পর্কীয়া আত্মীয়া বটে।
বাংলা ভাষা সংস্কৃতের সমগোত্রীয় এক প্রাচীন ভারতীয় আর্য কথ্য ভাষা থেকে উৎপত্তি।

স্যার জর্জ গিয়ারসন ও ড. সুনীতিকুমার মনে করেন, মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার জন্ম । এদের মতে বাংলা ভাষা আসামী উড়িয়া এবং বিহারী ভাষাগুলোর সহদরাস্থানীয় এবং এদের মূল একই। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এ মতের বাইরে অবস্থান করেছেন এবং যুক্তি দিয়ে এদের মত খন্ডন করেছেন।

ডঃ শহীদুল্লাহর মতে গৌড়ীয় প্রাকৃতের শেষ স্তর গৌড়ীয় অপভ্রংশ থেকেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি। এজন্য বাংলা ভাষাকে এক সময় গৌড়ীয় ভাষা বলা হতো।

বাংলা ভাষার উৎপত্তি বিষয়ক সব মতামত আলোচনা করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, বাংলা সংস্কৃতের কন্যা নয়। অনাত্মীয়াও নয়। ব্যবহারিক প্রয়োজনে বাংলা ভাষা তার এই আত্মীয়টির (অফুরন্ত ধনাধিকার অকৃপণ আত্মীয়া) কাছে সার্বিক সাহায্য চেয়ে কখনো নিরাশ হয় নি।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *