ভূমিকা: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মনোমুগ্ধকর সজীবতা ও চমকপ্রদ নান্দনিকতা সৃষ্টিকারী প্রতিভাদের অবদান ও মূল্যায়ন শীর্ষক প্রবন্ধটি লিখতে বসে মনে হয়েছে আমাকে হাত-পা বেঁধে সাগর সাঁতরাতে বলা হয়েছে। লেখালেখির জগতে আমি দীন-হীন ব্রাত্যজন, কীটানুকীটের কীট। আদিষ্ট হয়ে বা অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে গিয়ে প্রাণ আমার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। লাল নীল দ্বীপাবলি সমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্যাকাশের গ্যালাঙ্েিত সমৃদ্ধশালী আলোকবর্তিকাময় নিহারীকা বা নক্ষত্র খুঁজতে চোখ ধাঁধিঁয়ে গেছে। ধাঁধানো চোখে যা দেখেছি, তাই বলেছি। চর্যাপদ থেকে শুরু করতে গিয়ে আমার মনে হলো সেই বিখ্যাত চর্যার কথা-


নগর বাহিরি রে ডোম্বি তোহোরি কুড়িআ।
ছোই ছোই জাসি বামহণ নাড়িআ\

লেখালেখির জগতে আমি আসলেই ডোম্বি, ডোম্বির মতো আমিও বাংলা সাহিত্যে সজীবতা সৃষ্টিকারী বামহণ-দের ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছি। আর এ জন্য হয়তো চৌর্যবৃত্তি, অনুকরণ, অনুসরণ-সব অপকর্ম করেছি, নকলনবিশ এমনকি মাছি মারা কেরানির ভূমিকায়ও অভিনয় করেছি। লেখাটি পড়ে কেউ যে-কোনো ধরনের অভিযোগের আঙুল তুললে আমি বিনম্র চিত্তে যে নিন্দার কাঁটা মাথায তুলে নেব, তবে আমি নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থী আমার অক্ষমতার জন্য।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সজীবতা ও নান্দনিকতার সন্ধানে:


ইতিহাস ও ঐতিহ্যসমৃদ্ধ বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি জাতি। কালের বিবর্তনে বহু বিচিত্র জনপদের রূপান্তরের মাধ্যমে নানা জাতির সংমিশ্রণে অন্তত দেড় হাজার বছরের অনুশীলন, গ্রহণ-বর্জন ও রূপান্তরীকরণে বাঙালি-জনজীবন গড়ে উঠেছে। বিচিত্রভাবে গড়ে ওঠা জনজীবনের জীবনাচরণের প্রেক্ষিতে সৃষ্ট বাংলা সাহিত্যও বড় বৈচিত্র্যময়। প্রবহমান নদীর মতো এর নানা বাঁক, পরতে পরতে বিচিত্র রঙ, সবুজে সবুজে শ্যামল। আর এ সজীবতার পেছনে রয়েছে নানা প্রাণের স্পন্দন ও বহু মনের নির্যাস।

(১ম খণ্ডের পর থেকে)

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ:

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের মনোমুগ্ধকর সজীবতা ও চমকপ্রদ নান্দনিকতার দৃষ্টান্ত: শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও বড়ুণ্ডীদাস


মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সজীবতাদানকারী প্রথম ব্যক্তি হলেন বড়ু চণ্ডীদাস। মধ্যযুগের আদি নিদর্শন তাঁর রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য। চতুর্দশ শতকের শেষদিকের কবি বড়ু চণ্ডীদাস রচিত রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা বিষয়ক কাব্যটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার কাঁকিল্যা গ্রামে এক গৃহস্থ বাড়ির গোয়ালঘর থেকে পুঁথি আকারে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ কর্তৃক ১৯০৯ সালে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য আবিষ্কৃত এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ১৯১৬ সালে প্রকাশিত।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যটি চরিত্র-চিত্রণে, অনুভূতির গভীরতায়, আখ্যান-গ্রন্থনে, উপমা-অলংকারের নিপুণ প্রয়োগে, ছন্দ-বৈচিত্র্যে, মানবিক রসের ব্যঞ্জনায়, সমকালীন সমাজচিত্র অঙ্কনে ও জীবনবোধের পরিচয়ে,নাট্যিকগুণের সমারোহে – যে সার্থক নিপুণতার পরিচয় চোখে পড়ে, তাতে মধ্যযুগের সাহিত্যে এ কাব্যের গুরুত্ব অপরিসীম এবং বড়ুচণ্ডীদাসের উঁচুমানের কবিত্ব-শক্তি সম্পর্কে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না। এ কাব্যের কাহিনী সৃষ্টিতে ভাগবত, বিষ্ণপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ ইত্যাদির প্রভাব থাকলেও মূল কাহিনির ভিত্তি লোকগাথা। অধিকাংশ খণ্ডের কাহিনি অপৌরাণিক । ধারণা করা হয়, সে সময়ে বাংলার পল্লী-অঞ্চলে রাধা-কৃষ্ণের বৃন্দাবন-লীলা নিয়ে অনেক লোকগীতি প্রচলন ছিল, কবি সেসব লোকগাথা অবলম্বনেই এ কাব্যের কাহিনি সাজিয়েছেন।


বৈষ্ণব পদাবলি ও পদকর্তা


বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের ধূলিধূসর পথের মাঝে প্রেম-সৌন্দর্য ও অধ্যাত্মলোকের আলোকতীর্থ তৈরির অন্যতম দাবীদার পদাবলি সাহিত্য বিশেষ করে বৈষ্ণব পদাবলি। বৈষ্ণব পদাবলির মধুময় লালিত্যের জয়জয়কার অতি আধুনিক কালেও গ্রামে ও নগরে সব দিক ছাপিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পদাবলির ললিত মাধুর্যধারা বৈষ্ণব ধর্মের গণ্ডী পেরিয়ে বাঙালি জীবনের সকল অনুভূতির মর্মে স্থান করে নিয়েছে। বৈষ্ণব পদাবলি বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সর্বজনীন মহৎ ঐতিহ্য।

বৈষ্ণব সাহিত্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের আড়ালে জীবাত্মা-পরমাত্মার মিলনলীলাই প্রাধান্য পেয়েছে। তবে সেই সাথে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার আড়ালে এদেশের মানুষের হৃদয়বৃত্তির কামনা-বাসনা, তৃপ্তি-অতৃ্িপ্ত, প্রেম-প্রীতিসহ নানা সুকুমার অনুভূতিকে বৈষ্ণব কবিরা বৈষ্ণব পদাবলির মধ্যে প্রকাশ করেছেন। তাই বিষয় ও শিল্পগুণে সমুন্নত হয়ে মধ্যযুগের সীমানা অতিক্রম করে আধুনিক যুগের বাংলা ভাষাভাষী এমন কি বিশ্বের দরবারে নিজের আসনকে পাকাপোক্ত করতে পেরেছে।

বৈষ্ণব পদাবলির কবিরা বৈষ্ণব পদকর্তা হিসেবে পরিচিত। চৈতন্যপূর্ববর্তী চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতি এবং চৈতন্যপরবর্তী জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস এই চার কবির পদের মাধুর্য শিল্প-সৌকর্যে বৈষ্ণব পদাবলি সারা বিশ্বে নন্দিত। সুমহৎ ঘোষণা এদের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে-
শুনহ মানুষ ভাই
সবার উপরে মানুষ সত্য
তাহার উপরে নাই।
অথবা,
ওপার হইতে বাজাও বাঁশি এপার হইতে শুনি
অভাগীরা নারী হামহে সাঁতার নাহি জানি।
চণ্ডীদাস:


চণ্ডীদাস বৈষ্ণব পদাবলির চিরবহমান রসধারার আদি গঙ্গা। মহাপ্রভূ চৈতন্যদেব এ চণ্ডীদাসের মধুস্বাদী পদ আস্বাদন করে ভাবে বিভোর হতেন। চণ্ডীদাসের পদই যুগ যুগ ধরে চিরবিরহী হৃদয়ের অতৃপ্ত তুষ্ণাকে মেটাতে সাহায্য করেছে। চণ্ডীদাস বিরহের কবি, আত্মনিবেদনের কবি। চণ্ডীদাসের রাধা প্রথম থেকেই কৃষ্ণপ্রেমে ধ্যানমগ্না। তাইতো দুঃখের কবি চণ্ডীদাসের হাতে বৈরাগীর একতারা, মর্মস্পর্শী উদাস করা সে সুর।


সই, কেবা শুনাইল শ্যাম নাম
কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো
আকুল করিল মোর প্রাণ\
আক্ষেপের /মানের পদ
সই, কেমনে ধরিব হিয়া
আমার বঁধুয়া আন বাড়ী যায়
আমার আঙিনা দিয়া।


চণ্ডীদাসের কবিত্বশক্তির গুণে মধ্যযুগের পদাবলি আধুনিক যুগের গীতিকবিতার সমকক্ষ হয়ে উঠেছে। তাঁর কিছু কিছু পদ ধর্মের খোলস ছেড়ে সাধারণ নর-নারীর হৃদয়-বেদনার ভাষাচিত্র হিসেবে সর্বকালীন হয়ে উঠেছে। চণ্ডীদাসের পূর্বরাগ, অনুরাগ, রূপানুরাগ, প্রেমবৈচিত্ত্য, অভিসার, মিলন, আক্ষেপ, বিরহের ইত্যাদি বিষয়ক পদগুলো বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

বিদ্যাপতিঃ


মিথিলার রাজসভাকবি মৈথিলি কোকিল বিদ্যাপতি একাধারে বাংলা পদাবলি না লিখলেও মাতৃভাষা মৈথিলি ভাষায় পদ লিখে বাঙালির অন্তরে ঠাঁই করে নিয়েছেন। বিদ্যাপতির মৈথিলি ভাষার সাথে বাংলা ভাষা মিশে নতুন এক ভাষারূপ ব্রজবুলি সৃষ্টি হয়। রবীন্দ্রনাথ গীতিকবিতার বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে যে কবিতার উদাহরণ টেনেছেন, তা এই বিদ্যাপতির লেখা-


এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর
এ ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মনিদর মোর


বিদ্যাপতির রাধা মর্ত্যরে মানবী, সে ভোগবতী, দেহজ-কামনা ও প্রেমঘন চাঞ্চল্যে ভরপুর। তাঁর পদাবলিতে সাধারণ মানুষের হৃদয়-আর্তির প্রকাশ বেশি, রাধার কৈশোর, যৌবন ও বয়ঃসন্ধিকালের সব রকম হৃদয়-বাসনার নিখুঁত ছবি আছে বিদ্যাপতির পদাবলিতে। বিদ্যাপতি ইন্দ্রিয়-সচেতন, সৌন্দর্যপ্রিয় কবি, তাই পরকিয়া প্রেমের অভিসার, চিরনবীনা রাধার দেহ-মন-পোশাক সমস্ত কিছুর বর্ণনা করেছেন।

জ্ঞানদাস


মধ্যযুগের কেন, জ্ঞানদাস যে কোনো যুগের দুর্লভ কবি, চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য। ষোড়শ শতকের কবি বাংলা ও ব্রজবুলি উভয় ভাষাতেই পদ লিখে প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। রূপবর্ণনা, অতৃপ্ত প্রেমের জ্বালা, ব্যাকুলতা, মিলনের উল্লাস, বিরহের আর্তি ইত্যাদি বিষয় তাঁর পদের মধ্যে অপূর্ব ভঙ্গিমায় প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর বিখ্যাত পদ


রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর
প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর\


জ্ঞানদাসের পদে ব্যক্তিক কবিসত্তার লিরিকধর্মী প্রেমভাবনার প্রকাশ চিরন্তনতা পেয়েছে। চিরন্তন কবি হৃদয়ের প্রকাশ
সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু
অনলে পুড়িয়া গেল।

গোবিন্দদাস


বিদ্যাপতির ভাবশিষ্য গোবিন্দদাস ব্রজবুলি ও বাংলায় পদ লিখলেও ব্রজবুলিতে তাঁর অপূর্বশৈলী, চিত্রকলা, সঙ্গীতধর্মিতা অনুপম হয়ে ধরা পড়েছে। কবির পদে ছন্দ-অলংকার ও পদবিন্যাসের বৈচিত্র্য একক ও তুলনা রহিত। গৌরচন্দ্রিকা, পূর্বরাগ, মাথুর ও অভিসারের পদে কবির কৃতিত্ব লক্ষণীয়। কবির রূপক ও উপমা অলংকার প্রয়োগের বৈচিত্র্য দেখে বিস্মিত হতে হয়। কৃষ্ণরূপ ও রাধারূপ বিষয়ক পদগুলো মধ্যযুগের ইতিহাসে দুর্লভ।


নন্দ নন্দন চন্দ চন্দন
গন্দ নিন্দিত অঙ্গ।


অভিসারের পদে কবির জুড়ি মেলা ভার, যেন মানবাত্মার অভিসার-


কণ্টক গাড়ি কমল সম পদতল
মঞ্জির চিরহি ঝাঁপি
গাগরি বারি ঢারি করি পিছল
চলতহি অঙ্গুলি চাপি চাপি।
মাধব, তুয়া অভিসারক লাগি\
অথবা
মন্দির বাহির কঠিন কপাট\


গোবিন্দদাস ভক্তকবি। তিনি যত বড় ভক্ত, তত বড় কবি। তাঁর রাধা কৃষ্ণপ্রেমে অন্ধ, অভিসারে নির্ভয়, সর্বত্যাগী। তাঁর রাধা মানবীয়।

মঙ্গলকাব্য: মুকুন্দরাম ও ভারতচন্দ্র


মধ্যযুগের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী শাখা মঙ্গলকাব্য বিশেষ তাৎপর্যের দাবিদার। আনুমানিক খ্রিষ্টীয় তের শতকের শুরু থেকে আঠারো শতকের কবি ভারতচন্দ্রের কাল পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে যে বিশেষ এক শ্রেণির ধর্ম বিষয়ক আখ্যান কাব্য প্রচলিত ছিল, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মঙ্গলকাব্য নামে পরিচিত। বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন অবস্থার সম্মুখীন হয়ে বাংলাদেশের লৌকিক ও বহিরাগত বিভিন্ন ধর্মমতের যে অপূর্ব সমন্বয় সাধিত হয়েছে, মঙ্গলকাব্যগুলো তারই পরিচয় বহন করে। বিভিন্ন যুগের ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আচার-আচরণ, সংস্কার-সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাসের বিস্তৃত ভিত্তির উপরই মঙ্গলকাব্যের প্রতিষ্ঠা। সংস্কৃত সাহিত্যে বিবিধ মহাপুরাণ ও উপপুরাণগুলো যে উদ্দেশ্যে রচিত হয়, বাংলা মঙ্গলকাব্যগুলোও সেই উদ্দেশ্যেই সর্ব প্রথম রচিত হতে শুরু করে। পৌরাণিক ও লৌকিক সংমিশ্রণে দেবদেবীর লীলা-মাহাত্ম্য ভক্তি-কাহিনি অবলম্বনে মঙ্গলকাব্যগুলো রচিত হয়।

বলা যেতে পারে দেবদেবীর মাহাত্ম্যবাচক কাহিনির আলোকে যে সব আখ্যানকাব্য রচিত হয়েছে সেগুলোই মঙ্গলকাব্য। সাধারণভাবে যে দেবীর কথা শ্রবণ বা পাঠ করলে মঙ্গল হয় এবং শ্রোতা ও পাঠক পূণ্য পায়, তাকে মঙ্গলকাব্য বলে।
আরেকটি মত হলো-এ আখ্যানকাব্যগুলো ষোল পালায় বিভক্ত ছিল এবং এক মঙ্গলবারে শুরু হয়ে পরের মঙ্গলবারে শেষ হতো, তাই মঙ্গলকাব্য। দেবীর পুজো কীভাবে মর্ত্যে প্রচলিত হলো, তারই বিস্তারিত কাহিনি মঙ্গলকাব্য।

দেবীর বা দেবতার নামানুসারেই মঙ্গলকাব্যগুলোর নামকরণ করা হয়েছে। যেমন- মনসামঙ্গলকাব্য, চণ্ডীমঙ্গলকাব্য, অন্নদামঙ্গল, কালিকামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, শীতলামঙ্গল, শিবমঙ্গল ইত্যাদি। তবে চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল ও অন্নদামঙ্গল বিশেষস্থান দখল করে আছে।

মুকুন্দরাম চক্রবর্তী:


চণ্ডীমঙ্গল মঙ্গলকাব্যের ধারায় সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারা। আর তা সম্ভব হয়েছে মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর জন্য। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যধারার সর্বশ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয় কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। তার আত্মপরিচয় অংশ মধ্যযুগের সমসাময়িক যুগের এক প্রামাণ্য দলিল। জমিদার রঘুনাথ কবির কবি-প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে কবিকঙ্কণ উপাধি দেন এবং তার নির্দেশে শ্রীশ্রীচণ্ডীমঙ্গল কাব্য রচনা করেন। কবি বর্ধমান জেলার দামুন্যা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ডিহিদার মাহমুদ শরীফের অত্যাচারে কবি জন্মভূমি ত্যাগ করেন এবং মেদিনীপুর জেলার আড়রা গ্রামের ব্রাহ্মণ জমিদার বাঁকুড়া রায়ের কাছে আশ্রয় নেন। এই বাঁকুড়া রায়ের ছেলে রঘুনাথ। কবির জন্ম ও কাব্যের রচনাকাল নিয়ে মতবিরোধ আছে। দীনেশ সেনের মতে, আনুমানিক ১৫৩৭ খ্রিঃ অর্থাৎ ষোড়শ শতকের পূর্বভাগে কবি জন্মগ্রহণ করেন।

মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল গতানুগতিক মঙ্গলকাব্যের ধারায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কবি। তিনি ছিলেন প্রতিভাবান জীবন সচেতন ও বাস্তববোধ সম্পন্ন জীবনরসিক মানুষ। তীক্ষ্ন পর্যবেক্ষণ শক্তির সাহায্যে চারপাশের বাসতব ছবিকে তুলে এনেছেন। ধর্মীয় প্রভাব থাকা সত্ত্বেও কবি তৎকালীন সাধারণ বাঙালি জীবনের খূঁটিনাটি চিত্র নিখুঁতভাবে তাঁর কাব্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। চরিত্র-চিত্রণেও কবির সমকক্ষ কোনো কবি মধ্যযুগে আছে কিনা সন্দেহ। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বাস্তব-জ্ঞানকে তিনি কাব্যের মধ্যে অপূর্ব ভাষারূপ দিয়েছেন। নিপুণ সমাজচিত্র-অঙ্কন, চরিত্র-সৃষ্টির দক্ষতা, জীবনবোধের প্রকাশ ইত্যাদি গুণ তাঁকে ঔপন্যাসিকের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তাই, ডঃ শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মত প্রকাশ করেছেন- এ যুগে জন্ম গ্রহণ করিলে তিনি যে কবি না হইয়া ঔপন্যাসিক হইতেন তাহাতে সংশয় মাত্র নাই।
জীবনঘনিষ্ঠ ও বাস্তবজ্ঞান সম্পন্ন কিছু উক্তি-

১. পিপীড়ার পাখা উঠে মরিবার তরে/ কাহার ঘোড়শী কন্যা আনিয়াছ ঘরে।
২. শাশুরী ননদী নাহি নাহি তোর সতা/ কার সঙ্গে দ্বন্দ্ব করি চক্ষু কৈলি রাতা।

ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর:


মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য ধারার শেষ কবি ভারতচন্দ্র। তিনি প্রচলিত কাব্য-কাঠামো অনুসরণে কাব্য রচনা করলেও তাঁর অন্নদামঙ্গল স্বতন্ত্র মর্যাদার দাবীদার। তাঁর প্রখর কবিত্ব-শক্তি, বুদ্ধিদীপ্ত ভঙ্গি তাঁর কাব্যে ফুটে উঠেছে। ভারতচন্দ্র যে সময়ে কাব্য রচনা করেছেন, সে সময়ে সমাজ-জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। নাগরিক-জীবনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়ে গিয়েছে। কবি নিজে ছিলেন রাজসভার কবি। দেবী-মাহাত্ম্য ও ভক্তির ধারা পাল্টাতেও শুরু করেছে। ফলে সমাজ-বাস্তবতার কথা মেনে নিয়ে কবি দেবী-মাহাত্ম্য প্রচারের উদ্দেশ্যটুকুই শুধু ঠিক রেখেছেন।

তাই কাব্য-কাঠামোতে সৌন্দর্যবৃদ্ধির জন্য শিল্পরীতির দিকে বেশি মনোযোগী হয়েছিলেন। ভারতচন্দ্র শক্তিমান ও শিল্পকুশলী কবি। তাঁর মতো শব্দ-কুশলী ভাষা-শিল্পী শুধু মধ্যযুগে কেন, সমগ্র বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দুর্লভ। সেকালের রুচি ও পরিবেশ তাঁর কাব্যে যেমন অবলীলায় মূর্ত হয়ে উঠেছে, তেমনি খাঁটি বাংলা ভাষার সাবলীল শ্রী ও মাধুর্যগুণ তাঁরই হাতে প্রথমবারের মতো সার্থক ভাবে ধরা পড়েছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-


রাজ সভাকবি ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল গান রাজকন্ঠের মণিমালার মতো, যেমন তাহার উজ্জ্বলতা তেমনি তাহার কারুকার্য। শিল্প নৈপূণ্যের দিক থেকে ভারতচন্দ্রের কৃতিত্ব অনন্য, ছন্দের বৈচিত্র্যে ও শব্দ-ঐশ্বর্যে ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য রত্নমালার মত উজ্জ্বল।


কবির মননশীলতা ও বাগবৈদগ্ধ্যের গুণে অনেক পংক্তি বাঙালির মর্মে প্রবচনের মর্যাদা লাভ করেছে। শব্দের ঝংকারে, যমকের মাদকতায়, অনুপ্রাসের মাধুর্যে পংক্তিগুলো কালোত্তীর্ণ হয়েছে। যেমন-
১. নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায় ?
২. মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন
৩. যে করে বিস্তর মিছা কহে সে বিস্তর।
৪. বড়র পিরীতি বালির বাঁধ।
৫. আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে।

রোমান্টিক প্রণযোপাখ্যান কাব্যধারা ও কবিগণ:

ধর্মনির্ভর দেবমাহাত্ম্যমূলক মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ধারায় মুসলমান কবিদের রচিত রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান কাব্যে জীবনরসের প্রতিফলনে অনন্য। একমাত্র বৈষ্ণব পদাবলির সাথেই এর তুলনা চলে সমগ্র মধ্যযুগে। আরবি-ফারসি-হিন্দি সাহিত্যের ভাণ্ডার থেকে রস সংগ্রহ করে নতুন ধারার প্রবর্তন করে পাঠকদের রুচির বদল করেন। দেবদেবীর প্রাধান্যের মধ্যযুগে মুসলমান কবিগণ মানব-মানবীর প্রেম-কাহিনি রূপায়ণ করে ব্যতিক্রমের সৃষ্টি করেন। ধর্মীয় বিষয়ের সাথে সম্পর্কহীন এ কাব্যধারায় ঐশ্বর্যবান, প্রেমশীল, সৌন্দর্যপূজারি জীবনপিপাসু মানুষের ছবি আছে। নতুন ভাব-বিষয় ও নতুন রসের যোগানে নতুন ঐতিহ্যের সৃষ্টি হয়েছে। ড. ওয়াকিল আহমদ বলেছেন-

মানুষের প্রেমকথা নিয়েই প্রণয়কাব্যের ধারা, কবিগণ মধুকরী বৃত্তি নিয়ে বিশ্বসাহিত্য থেকে সুধারস সংগ্রহ করে প্রেমকাব্যের মৌচাক সাজিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে তা অভিনব ও অনাস্বাদিতপূর্ব। মুসলমান কবিরাই এ কৃতিত্বের অধিকারী।

ইরানি কবি ফেরদৌসি ও জামির কাব্যের ভাবধারা নিয়ে ইউসুফ-জোলেখা কাব্য রচনা করে শাহ মুহম্মদ সগীর এ কাব্যধারার সূচনা করেন। দেশি ভাষায় সুফিতত্ত্বের প্রচার-মানসে কাব্যটি রচনার উদ্দেশ্য থাকলেও শেষ পর্যন্ত মানবীয় প্রেমকাহিনি হিসেবেই রূপলাভ করেছে। ফারসি কবি জামির লায়লী-মজনু কাব্যের ভাবানুবাদে রচিত দৌলত উজির বাহরাম খানের লায়লী-মজনু কাব্যটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। ড. এনামুল হকের মতে-


নিছক কাব্যরস, নিপিচাতুর্য, ভব্যতা ও শালীনতায় লায়লী-মজনুর সমকক্ষ কাব্য খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যে একটিও নাই বলিলে অত্যুক্তি হয় না।

আহমদ শরীফ লায়লী-মজনু কাব্যকে ছয়টি যুগদুর্লভ গুণে অনন্য বলে দাবী করেছেন। গুণগুলো হলো- লায়লী-মজনু যথার্থ ট্র্যাজেডি, অলৌকিকতামুক্ত বাস্তব জীবনভিত্তিক, অশ্লীলতামুক্ত প্রেমোপাখ্যান, স্বাধীন অনুবাদ তথা মৌলিক রচনা এবং ঋতুপর্যায়ের গীতিনাট্যিক রূপায়ণ। কবির কবিত্বশক্তির গভীরতা নিয়ে কারো দ্বিমত নেই।

আলাওল ও পদ্মাবতী:


মধ্যযুগের বাংলা কাব্যের ধারায় আলাওল শ্রেষ্ঠ কবি। রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান কাব্যধারায় শ্রেষ্ঠ কাব্য এবং কবি-প্রতিভায় উজ্জল দৃষ্টানত ‘পদ্মাবতী’ রচনা করে আলওল বাংলা সাহিত্যে অমরত্ব লাভ করেছেন। কাব্যটি অনুবাদমূলক হলেও এতে আলাওলের মৌলিক প্রতিভার স্বাক্ষর রয়েছে।
আলাওল পণ্ডিত কবি, কিন্তু তাঁর পাণ্ডিত্য নিয়ে অনেকে বিরুপ মনতব্য করলেও কবিত্ব-শক্তির সাথে পাণ্ডিত্য যুক্ত হয়ে আলাওলকে করেছে মহিমান্বিত। আলাওলের পাণ্ডিত্য ছিল সুগভীর। বিভিন্ন শাস্ত্র সম্পর্কে ছিল তাঁর গভীর জ্ঞান। রাজদরবারের বিচিত্র অভিজ্ঞতাও ছিল তাঁর দখলে। আলাওল ছিল সহজাত কবিত্ব-শক্তির অধিকারী। তিনি আগে কবি, পরে পণ্ডিত।


পদ্মাবতী কবির নিজস্ব সৃষ্টি নয়। হিন্দি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর পদুমাবৎ কাব্যের ভাবানুবাদ এটি। কিন্তু আলাওলের কবিত্ব শক্তির গুণে অনুবাদমূলক কাব্য হয়ে উঠেছে মূলের মতো আকর্ষণীয় ও উপভোগ্য। আলাওলের উচুঁমানের কবিত্ব-শক্তির স্পর্শেই পদ্মাবতী কাব্য মধ্যযুগে তো বটেই, আধুনিক কালে এসেও মহিমা লাভ করেছে।
উচ্চপ্রতিভা সম্পন্ন কবি আলাওল সম্পর্কে ড. ওয়াকিল আহমদ এর মন্তব্য-
অন্যান্য কবির গুণাবলী কমবেশি আলাওলের মধ্যে আছে, কিন্তু আলাওলের সবগুণ একত্রে কোনো কবির কাব্যে নেই। আলাওল গীতিকবি, আখ্যান কবি, তাত্ত্বিক কবি। কবিত্বের বিচারে আলাওল মহাকবি আখ্যায় যথার্থভাবেই ভূষিত হওয়ার যোগ্য।

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধিতে মুসলমান কবি ও পৃষ্ঠপোষকদের অবস্থান


মুসলিম কর্তৃক বঙ্গবিজয় বাঙালি জাতীয় জীবনে ব্যাপক রূপান্তর সৃষ্টি করে। বাংলার রাজনীতি, ধর্মনীতি, সমাজনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এর প্রভাব অসামান্য। বাইরে থেকে এলেও জনগণের হৃদয়ে স্থান পেতে দেশীয় ভাষাকে মর্যাদা দেয়, কবিদের প্রতি উদার পৃষ্ঠপোষকতা দান করে। তাঁদের উদ্দীপনায় হিন্দুদের পুরাণাদি, রামায়ণ, মহাভারত ও ভগবৎ এর অনুবাদ আরম্ভ হয়। অন্যদিকে মুসলমান কবিরা বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় ভিন্ন স্বাদ ও রুচির প্রবর্তন ঘটায়। ফলে বাংলা সাহিত্য এক নতুন যুগে প্রবেশ করে, সাহিত্যে আসে বৈচিত্র্য ও উৎকর্ষতা, খুলে যায় ভবিষ্যতের সম্ভাবনার স্বর্ণদ্বার। ডঃ দীনেশ চন্দ্র সেন বলেছেন-


গৌড়েশ্বরগণের উৎসাহেই বঙ্গভাষার শ্রীবৃদ্ধির প্রথম কারণ। মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়ই বঙ্গ ভাষার সৌভাগ্যের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল।


সুলতান রুকন উদ্দিন বরবাকশাহের উৎসাহে মালাধর বসু রচনা করেন শ্রীকৃষ্ণবিজয়, জালালুদ্দিন মুহম্মদ শাহের আমলে কৃত্তিবাস অনুবাদ করেন রামায়ণ, আলাউদ্দিন হুসেন শাহের আমলে বিজয়গুপ্ত রচনা করেন মনসামঙ্গল ইত্যাদি বিষয়গুলো মধ্যযুগে ভাষার গাথুঁনি, সাহিত্যের প্রসারে ভাবে-গঠনে শ্রীবৃদ্ধিতে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল।

(৩য় খণ্ড- আধুনিক যুগ পরবর্তীতে পাওয়া যাবে)

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন,

বাংলা বিভাগ,

সরকারি মাইকেল মধুসূধন কলেজ, যশোর

One Response

  1. যুগোপযোগী চমৎকার আলোচনা।
    অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা রইল।
    স্যার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *