ভূমিকা: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের তিন যুগে সজীবতা সৃষ্টিকারী প্রতিভাদের অবদান ও মূল্যায়ন শীর্ষক প্রবন্ধটি লিখতে বসে মনে হয়েছে আমাকে হাত-পা বেঁধে সাগর সাঁতরাতে বলা হয়েছে। লেখালেখির জগতে আমি দীন-হীন ব্রাত্যজন, কীটানুকীটের কীট। আদিষ্ট হয়ে বা অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে গিয়ে প্রাণ আমার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। লাল নীল দ্বীপাবলি সমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্যাকাশের গ্যালাঙ্েিত সমৃদ্ধশালী আলোকবর্তিকাময় নিহারীকা বা নক্ষত্র খুঁজতে চোখ ধাঁধিঁয়ে গেছে। ধাঁধানো চোখে যা দেখেছি, তাই বলেছি। চর্যাপদ থেকে শুরু করতে গিয়ে আমার মনে হলো সেই বিখ্যাত চর্যার কথা-

নগর বাহিরি রে ডোম্বি তোহোরি কুড়িআ।
ছোই ছোই জাসি বামহণ নাড়িআ\

লেখালেখির জগতে আমি আসলেই ডোম্বি, ডোম্বির মতো আমিও বাংলা সাহিত্যে সজীবতা সৃষ্টিকারী বামহণ-দের ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছি। আর এ জন্য হয়তো চৌর্যবৃত্তি, অনুকরণ, অনুসরণ-সব অপকর্ম করেছি, নকলনবিশ এমনকি মাছি মারা কেরানির ভূমিকায়ও অভিনয় করেছি। লেখাটি পড়ে কেউ যে-কোনো ধরনের অভিযোগের আঙুল তুললে আমি বিনম্র চিত্তে যে নিন্দার কাঁটা মাথায তুলে নেব, তবে আমি নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থী আমার অক্ষমতার জন্য।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সজীবতার সন্ধানে:
ইতিহাস ও ঐতিহ্যসমৃদ্ধ বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি জাতি। কালের বিবর্তনে বহু বিচিত্র জনপদের রূপান্তরের মাধ্যমে নানা জাতির সংমিশ্রণে অন্তত দেড় হাজার বছরের অনুশীলন, গ্রহণ-বর্জন ও রূপান্তরীকরণে বাঙালি-জনজীবন গড়ে উঠেছে। বিচিত্রভাবে গড়ে ওঠা জনজীবনের জীবনাচরণের প্রেক্ষিতে সৃষ্ট বাংলা সাহিত্যও বড় বৈচিত্র্যময়। প্রবহমান নদীর মতো এর নানা বাঁক, পরতে পরতে বিচিত্র রঙ, সবুজে সবুজে শ্যামল। আর এ সজীবতার পেছনে রয়েছে নানা প্রাণের স্পন্দন ও বহু মনের নির্যাস।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের আগে বাংলা ভাষার ইতিহাস:

আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে এশিয়ার পশ্চিম ও ইউরোপের সমস্তভাগে যে জাতি বাস করতো, তাদের ভাষাকে বলা হতো ইন্দো-ইউরোপীয়। এটিই পৃথিবীর আদি ভাষা। পৃথিবীর প্রধান প্রধান ১২টি ভাষাবংশের মধ্যে অন্যতম হলো এই মূল ইন্দো-ইউরোপীয় বা মূল আর্য ভাষা। এ আদি উৎস থেকে স্বাভাবিক ক্রমবিকাশের ধারায় মধ্যবর্তী অনেকগুলা স্তর পেরিয়ে বাংলা ভাষা জন্ম লাভ করেছে। মূল আদি ভাষার দুটো শাখা- কেন্তম ও শতম। বাংলা ভাষা শতম শাখার অন্তর্গত।

আনুমানিক ২৫০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দের কাছাকাছি সময় থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ইন্দো-ইউরোপীয় বা মূল আর্য ভাষাভাষীগোষ্ঠী ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এশিয়াতে আগমনের সময় মোটামুটি খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে খ্রিষ্টপূব ১২০০ অব্দ পর্যন্ত। এ ভাষাবংশ বিভিন্ন দেশ ঘুরে ভারতে আসে। ইরানে যে অংশ আসে তার নাম ইন্দো-ইরানীয়, যে অংশ ইউরোপে থেকে গেছে তার নাম ইন্দো-জার্মানিক, আর খাইবার গিরিপথ অতিক্রম করে যে অংশ ভারতে আসে, তার নাম ভারতীয় আর্য ভাষা।

ভারতীয় আর্য উপভাষাটি ভারতে প্রবেশ করে আনুমানিক ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। যিশুখ্রিষ্টের জন্মের দেড় হাজার বছর আগে থেকে যিশুখ্রিষ্টের জন্মের প্রায় দু’হজার বছর পর্যন্ত ভারতীয় আর্য ভাষার এ সাড়ে তিন হাজার বছরের ইতিহাসকে বিবর্তনের স্তরভেদে প্রধানত তিনটি যুগে ভাগ করা যায়। যেমন-

১.প্রাচীন ভারতীয় আর্য: আনুমানিক ১২০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ৫০০ থ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত। এ যুগের আর্য ভাষার নাম দিতে পারি বৈদিক ভাষা, ব্যাপক অর্থে সংস্কৃত ভাষা। এর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ঋগ্বেদ, সংহিতা।
২.মধ্যভারতীয় আর্যভাষা : এ যুগের স্থিতিকাল ৫০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। এ যুগ আবার তিন স্তরের।

ক) আদি স্তর-এ স্তরের সময়কাল হচ্ছে ৫০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ২০০ খ্রিষ্টাব্ধ। এ স্তরের ভাষার নাম প্রাচীন প্রাকৃত ও পালি ভাষা। এ ভাষার নিদর্শন পাওয়া যায় অশোকের অনুশাসনে এবং হীনযান মতাবলম্বী বৌদ্ধদের পালি শাস্ত্রের প্রাচীনতম গ্রন্থগুলোতে।

খ) মধ্যস্তর- এর সময়কাল হচ্ছে ২০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। এই স্তরের ভাষার নাম প্রাকৃত। যেমন- সিংহলী প্রাকৃত, মাগধী প্রাকৃত, গৌড়ীয় প্রাকৃত ইত্যাদি। এ স্তরের ভাষাকে মধ্য প্রাকৃত বা নাটকীয় প্রাকৃত বলা হতো। সংস্কৃত নাটকে এবং জৈনধর্ম সংক্রান্ত নাটকে এ স্তরের ভাষা ব্যবহৃত হতো।

গ) অন্তস্তর – এর সময়কাল ৪৫০ থেকে ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ। এ কালের ভাষাকে অপভ্রংশ বলে। এটিই ছিল এ সময়ের সাহিত্যিক ভাষা। বৌদ্ধ ও জৈন সমাজে প্রথম দিকে এ ভাষার ব্যবহার দেখা যায়। পরে ব্রাহ্মণ সমাজেও এর ব্যবহার লক্ষ করা যায়।

৩.নব্য ভারতীয় আর্যভাষা : ৬৫০ খ্রিঃ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত। প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার শেষ স্তর অপভ্রংশ থেকেই এ উপমহাদেশের অধিকাংশ ভাষার জন্ম। এ নতুন ভাষাগুলোই নব্যভারতীয় আর্যভাষা। যেমন- বাংলা, হিন্দি, উড়িয়া,ভোজপুরিয়া,গুজরাটি,মারাঠি, আসামি ইত্যাদি।

প্রতিটি প্রাকৃতের পরবর্তী স্তরের নাম অপভ্রংশ। প্রাকৃতের নামানুসারে অপভ্রংশের নামকরণ করা হয়েছে। যেমন- মাগধী প্রাকৃতের শেষ স্তর মাগধী অপভ্রংশ ইত্যাদি। বাংলা ভাষাও অপভ্রংশের পরের স্তর, তবে প্রাচীন বাংলা কোন অপভ্রংশের মধ্যে দিয়ে বিবর্তিত হয়েছে, তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

জর্জ গিয়ারসন ও সুনীতিকুমার মনে করেন, মাগধী প্রাকৃত থেকে মাগধী অপভ্রংশের স্তর পেরিয়ে প্রাচীন বাংলার উৎপত্তি। অন্যদিকে, ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমাণ করেছেন যে, মাগধী নয়, গৌড়ীয় প্রাকৃতের শেষ স্তর গৌড়ীয় অপভ্রংশের মধ্যে দিয়েই বাংলা ভাষার উৎপত্তি। এ মতই বেশিরভাগ পণ্ডিত মেনে নিয়েছেন।

বাংলা ভাষার বা বাংলা সাহিত্যের জন্ম ঃ
দিনক্ষণ দিয়ে ভাষার বা সাহিত্যের ইতিহাসের জন্মকাহিনি লেখা যায় না। বাংলা ভাষার বা বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। বাংলা ভাষার জন্মলগ্ন নিয়ে নানা মুনির নানা মত থাকলেও চর্যাপদই যে বাংলা সাহিত্যের একমাত্র আদি নিদর্শন এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই।

চর্যাপদের রচনাকালকেই গবেষকগণ বাংলা সাহিত্যের সূচনাকাল হিসেবে মেনে নিয়েছেন। চর্যাপদের পদকর্তাদের আবির্ভাব কাল বা ভাষার বিবর্তনের ইতিহাস বিচার করে চর্যাপদের রচনাকাল ৬৫০ থেকে ১২০০ খ্রিঃ পর্যন্ত ধরা হয়। কেউ বলেছেন, ৯৫০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে চর্যাপদগুলো রচিত হয়েছে। বাংলা ভাষা মোটামুটি সপ্তম শতকে নিজস্ব রূপ পরিগ্রহ করে। চর্যাপদ বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন, তাই তাতে প্রাকৃত-অপভ্রংশের প্রভাব কিছুটা থাকলেও স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছে সপ্তম শতক থেকেই।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের যুগবিভাগঃ


চর্যাপদের রচনাকালকে বাংলা সাহিত্যের সূচনাকাল ধরে বর্তমান পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের পথপরিক্রমাকে পঠন-পাঠনের সুবিধার্থে তিনটি যুগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন- প্রাচীন যুগ (৬৫০খ্রি: -১২০০খ্রি:), মধ্য যুগ (১২০৪ খ্রি: – ১৮০০ খ্রি:) এবং আধুনিক যুগ (১৮০১ খ্রি: – বর্তমান পর্যন্ত)।

প্রাচীন যুগ ও চর্যাপদ:
প্রাচীন যুগের একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদ। তবে অমরকোষ-এর সর্বানন্দ রচিত টীকায় প্রদত্ত চার শতাধিক বাংলা প্রতিশব্দে, বৌদ্ধ কবি ধর্মদাস রচিত ‘বিমুগ্ধ মুখণ্ডল’ গ্রন্থে উৎকলিত দু’চারটি বাংলা কবিতায় এবং সেক-শুভোদয়া’য় উদ্ধৃত গানে ও ছড়ায় প্রাচীন বাংলার নিদর্শন রয়েছে।

হরপ্রসাদশাস্ত্রী কর্তৃক নেপালের রাজগ্রন্থশালা থেকে ১৯০৭ খ্রিঃ-এ আবিস্কৃত এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত‘ হাজার বছরের পুরাণ বাংলা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’ গ্রন্থের চব্বিশজন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যের রচিত কতকগুলো গানই চর্যাপদ নামে পরিচিত। চর্যাপদ সাধনপ্রণালী বর্ণিত ধর্মীয় গান। এর রচয়িতাগণ বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য। নির্বাণ লাভের আশায় এরা সমাজ-সংসার ত্যাগ করে নিজেকে সাধনায় নিমজ্জিত করেছেন। চর্যাকাররা চর্যাপদে বৌদ্ধধর্মের গূঢ় এবং দুরূহ সাধনপ্রণালী ও ধর্মদর্শনতত্ত্ব নানা প্রকার রূপকের সাহায্যে আভাসে-ইঙ্গিতে সহজবোধ্য করে ভক্তজনের কাছে উপস্থাপন করেছেন। আর সেইসাথে কবিত্বশক্তির উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন।

চর্যার ২৪ জন পদকর্তারা সজ্ঞানে সাহিত্য লেখেন নি, তাঁদের ধর্মমত-দর্শনকে অনুসারীদের কাছে উপাদেয় বা বোধগম্য করার জন্য জগৎ-সংসার থেকে উপমা-প্রতীক ব্যবহার করেছেন। ভক্তকুল ভজনের মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পেরেছে কিনা জানি না, রচিত হয়েছে বাংলা সাহিত্যের সেই আঁতুড়লগ্নে অমর সাহিত্য। ।

চর্যাপদে মোট ২৪ জন পদকর্তার নাম পাওয়া যায়। গানের মাঝে ও শেষে তারা ভণিতা দিয়েছেন। কেউ কেউ গুরুর ভণিতা দিয়েছেন। নামের শেষে গৌরবসূচক পা যোগ করা হয়েছে। লুইপা, কুক্কুরীপা, বিরুআপা, গুঞ্জরীপা, চাটিলপা, ভুসুকুপা, কাহ্নপা, কামলিপা, ডোম্বীপা, শান্তিপা, মহিত্তাপা, বীণাপা, সরহপা, সবরপা, আজদেবপা, ঢেণ্ডণপা, দারিকপা, ভাদেপা, তাড়কপা, কঙ্কণপা, জঅনপা, ধামপা, তন্ত্রীপা, ও লাড়ীডোম্বীপা। এসব নামের বেশিরভাগ ছদ্মনাম। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি থেকে তারা এসেছেন, এদের মধ্যে অনেকে বাঙালি ছিলেন। চর্যাপদে সবচেয়ে বেশি পদ রয়েছে কাহ্নপার, সংখ্যায় ১৩টি। এছাড়া ভুসুকুর আট, সরহের চার, লুইপা, শান্তিপা শবরপার রয়েছে দুটি করে, অন্যদের একটি করে।

মোঃ আখতার হোসেন
অধ্যাপক, বাংলা
সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

4 Responses

  1. স্যার,সত্যিই অসাধারণ বর্ণনা করেছেন।
    আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *