Table of Contents

বাংলা সম্মান শ্রেণির বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১ এর বিগত ১০ বছরের পরীক্ষার প্রশ্নের আলোকে তৈরি

বিষয়: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১

বিষয় কোড: 221001

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১ চর্যাপদ ও প্রাচীন সাহিত্য সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

  1. চর্যাপদ আবিষ্কৃত হয় কত সালে?
    ১৯০৭ সালে।
  2. চর্যাপদ রচনা করেন কারা?
    বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকেরা।
  3. চর্যায় প্রথম পদটির রচয়িতা কে?
    লুইপা।
  4. চর্যাপদে ডোম্বীর বাস কোথায়?
    নগরের বাইরে।
  5. চর্যার প্রাপ্ত পুঁথিতে মোট কতটি পদ পাওয়া গেছে?
    ৪৬½ (সাড়ে ৪৬টি)।
  6. সর্বাধিক সংখ্যক চর্যাপদ কে রচনা করেছেন?
    কাহ্নপা (১৩টি পদ)।
  7. চর্যাপদে মোট কতজন কবির পরিচয় পাওয়া যায়?
    ২৩ জন, মতান্তরে ২৪ জন।
  8. চর্যাপদ কোন সম্প্রদায়ের সাধন সংগীত?
    বৌদ্ধ সহজিয়া সম্প্রদায়ের।
  9. ‘চর্যা’ শব্দের অর্থ কী?
    আচরণ।
  10. ড সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে চর্যাপদের রচনাকাল কত?
    ৯৫০ – ১২০০ খ্রিস্টাব্দ।

মধ্যযুগীয় সাহিত্য — বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১

  1. ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কে আবিষ্কার করেন?
    বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ (১৯০৯ সালে)।
  2. ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কত খণ্ডে বিভক্ত?
    ১৩ খণ্ড।
  3. ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যটি কে সম্পাদনা করেন?
    বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ (১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে)।
  4. ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এর প্রধান কাহিনি কোথা থেকে সংগৃহীত?
    ভাগবত, পুরাণ, জয়দেবের গীতগোবিন্দ ও লোককাহিনি।
  5. ‘শূন্যপুরাণ’-এর রচয়িতা কে?
    রামাই পণ্ডিত।
  6. ‘শূন্যপুরাণ’ কী ধরনের গ্রন্থ?
    সংস্কৃত ভাষায় গদ্য-পদ্য মিশ্রিত চম্পুকাব্য।
  7. ‘মনসামঙ্গল’-এর আদি কবি কে?
    কানাহরি দত্ত।
  8. চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের আদি কবি কে?
    মানিক দত্ত।
  9. ‘মহাভারত’ বাংলায় প্রথম অনুবাদ করেন কে?
    কবীন্দ্র পরমেশ্বর।
  10. মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবি কাকে বলা হয়?
    ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর।

  1. মধ্যযুগের সর্বশেষ কবি হিসেবে কাকে ধরা হয়?
    ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর।
  2. মধ্যযুগের কোন কবিকে ‘মৈথিল কোকিল’ বলা হয়?
    বিদ্যাপতি।
  3. মধ্যযুগের প্রথম মহিলা কবি কে?
    চন্দ্রাবতী।
  4. মধ্যযুগের মহিলা রামায়ণ অনুবাদক কে?
    চন্দ্রাবতী।
  5. অন্ধকার যুগের কালসীমা কত?
    ১২০১ – ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ।
  6. সুলতানি যুগের কালসীমা কত?
    ১৫৪২ – ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দ।

মুসলিম কবি ও পুঁথি সাহিত্য – বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১

  1. বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলমান কবি কে?
    শাহ মুহম্মদ সগীর।
  2. শাহ মুহম্মদ সগীরের বিখ্যাত কাব্য কোনটি?
    ইউসুফ-জোলেখা
  3. সৈয়দ সুলতানের দুটি কাব্যগ্রন্থের নাম কী?
    নবীবংশরসুলবিজয়
  4. ‘রসুলবিজয়’ কাব্যের রচয়িতা কে?
    সৈয়দ সুলতান।
  5. কোরেশী মাগন ঠাকুরের গ্রন্থের নাম কী?
    চন্দ্রাবতী
  6. ‘গুলে বকাওলী’ কাব্যের রচয়িতা কে?
    নওয়াজিস খান।
  7. ‘দেওয়ানা মদিনা’ পালার রচয়িতা কে?
    মনসুর বয়াতি।
  8. পুঁথি সাহিত্যের জনপ্রিয় কবি কে?
    ফকির গরীবুল্লাহ।
  9. পুঁথি সাহিত্যের প্রথম সার্থক কবি কে?
    শাহ গরীবুল্লাহ।

অন্যান্য কবি ও সাহিত্যিক – বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১

  1. রাজা লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি কে ছিলেন?
    জয়দেব।
  2. ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যের রচয়িতা কে?
    জয়দেব।
  3. বিদ্যাপতির উপাধি কী?
    মৈথিল কোকিল।
  4. আলাওল কোন রাজসভার কবি ছিলেন?
    আরাকান রাজসভা।
  5. কবি মালাধর বসু কার কাছ থেকে ‘গুণরাজ খান’ উপাধি লাভ করেন?
    গৌড়ের সুলতানের কাছ থেকে।
  6. মালাধর বসুর রচিত কাব্য কোনটি?
    শ্রীকৃষ্ণবিজয়
  7. কবিগানের আদি গুরু কে?
    গোজলা গুই।
  8. বাংলা টপ্পাগান কার রচনা?
    রামনিধি গুপ্ত (নিধু বাবু)।
  9. ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর কোন রাজার সভাকবি ছিলেন?
    নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র।

লোকসাহিত্য ও অন্যান্য – বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১

  1. বাংলা লোকসাহিত্যের প্রাচীনতম সৃষ্টি কী?
    ছড়া।
  2. ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ কে সংগ্রহ করেন?
    চন্দ্রকুমার দে।
  3. ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ কে সম্পাদনা করেন?
    ড. দীনেশচন্দ্র সেন।
  4. ‘মর্সিয়া’ শব্দের অর্থ কী?
    শোককাব্য।
  5. ব্রজবুলি কী?
    বাংলা ও মৈথিলির সংমিশ্রণে সৃষ্ট কৃত্রিম কবি ভাষা।
  6. চৈতন্যদেবের বাল্যনাম কী?
    বিশ্বম্ভর মিশ্র (ডাকনাম নিমাই)।
  7. ‘কড়চা’ কী ধরনের গ্রন্থ?
    শ্রীচৈতন্যদেবের জীবনীমূলক গ্রন্থ।
  8. ‘ODBL’-এর পূর্ণরূপ কী?
    The Origin and Development of the Bengali Language
  9. ‘বাঙালি ও বাংলা সাহিত্য’ গ্রন্থটির রচয়িতা কে?
    ড. আহমদ শরীফ।
  10. ‘সেক শুভোদয়’ গ্রন্থের লেখক কে?
    হলায়ুধ মিশ্র।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১

খ-বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন) – চূড়ান্ত সাজেশন

প্রাচীন সাহিত্য – বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১

  1. চর্যাপদের নামকরণের বিষয়টি সংক্ষেপে আলোচনা কর। :
  2. চর্যাপদের ধর্মমত সম্পর্কে সংক্ষেপে বিবরণ দাও।
  3. চর্যাপদের ভাষাকে ‘সান্ধ্যভাষা’ বলা হয় কেন?
  4. চর্যাপদসহ বাংলাদেশের প্রাচীন নিদর্শনগুলির পরিচয় দাও।
  5. কাহ্নপা সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখ।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১ এর খ অংশের উত্তর:

চর্যাপদের নামকরণ:

১৯০৭ সালে আবিষ্কৃত। ১০১৬ সালে প্রকাশিত। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, সরহপাদ ও কৃষ্ণপাদের দোহা ও ডাকার্ণব এই চারটি বই াহাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষার বৌদ্ধগান ও দোহা নামে প্রকাশিত। এর মধ্যে চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ই একমাত্র বাংলা ভাষার আর বাকি তিনটি অপভ্রংশ ভাষার। চর্যাচয়, চর্যাশ্চর্যোচয়, আশ্চর্যচর্যাচয়, চর্যাশ্চচর্যবিনিশ্চয়, চর্যাগীতিকোষ, , চর্যাগীতিকা , বৌদ্ধগান ইত্যাদি নামে এটি পরিচিত গলেও চর্যাপদ নামেই সমধিক পরিচিত। চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও নামকরণ নিয়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস এ নানা মতের সৃষ্টি করেছে।

চর্যাপদের ভাষাকে ‘সান্ধ্যভাষা’ বলা হয় কেন? ( বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১ খ বিভাগ)

উত্তর :  সান্ধ্যভাষা বা সন্ধ্যাভাষা বা সন্ধাভাষা বলতে ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মনে করেন, আলো-আঁধারি ভাষা, কতক আলো, কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায়, খানিক বুঝা যায় না। তবে বিশেষ লক্ষ্যে ব্যঞ্জনার্থে  ব্যবহৃত ভাষাকে আমরা সান্ধ্যভাষা বা সন্ধ্যাভাষা বলতে পারি। মূল কথার আড়ালে ব্যঞ্জনার্থ সন্ধান করতে হয় বলে চর্যাপদের ভাষাকে সান্ধ্য বা সন্ধ্যাভাষা বলা সমীচীন।

  1. সহজিয়াগণের সাধন পদ্ধতিমূলক গান। 
  2. উদ্দেশ্য হচ্ছে রূপকের মাধ্যমে সাধকদের গূঢ় সাধনার কথা প্রচার করা।
  3. অন্যের কাছে গোপন রাখতেই  রূপক প্রতীক-সংকেত তথা প্রহেলিকার আশ্রয় গ্রহণ।
  4. যে সময়ে চর্যাপদ রচিত হয় বাংলা ভাষা তখনও পর্যন্ত স্বকীয় মূর্তি সম্পূর্ণরূপে পরিগ্রহ করতে পারেনি। অপরিণত ভাষায় পদকর্তাগণ চর্যাপদ রচনা করেন। তবে চর্যার ভাষাকে অনেকেই সান্ধ্যভাষা বলেছেন।
  5. চর্যাপদের ভাষা  ধর্মতত্ত্বের ভাষা তাই এর ভাষা প্রধানত দ্ব্যর্থবোধক-বাগার্থ, ব্যাচ্যার্থ এবং ব্যঞ্জনার্থ, ব্যঙ্গার্থ বা গূঢ়ার্থ।
  6. পদের এক অর্থ গেছে অন্তর্নিহিত তত্ত্বের দিকে, অপর অর্থ দৃশ্যের দিকে। বিশেষজ্ঞগণ এরূপ ভাষাকেই সান্ধ্য বা সন্ধ্যা ভাষা বলেছেন।
  7. চর্যাপদের ভাষার অপর মাত্রা এর তাত্ত্বিক পরিভাষা। বৌদ্ধ ধর্মীয়  পরিভাষার অর্থ না বুঝলে পদের অর্থ হৃদয়ঙ্গম যায় না। পরিভাষাগুলো এসেছে মূলত বৌদ্ধ ও তান্ত্রিকশাস্ত্র গ্রন্থ থেকে।
  8. ধর্মীয় পরিভাষার অর্থ সেই ধর্মের যারা চর্চা করে তারাই বোঝে। ধর্মীয় পরিভাষা,  যার কিছু বুঝা যায়, কিছু যায় না। এরূপ ভাষা যথার্থই আলো-আঁধারির ভাষা অর্থাৎ সন্ধ্যাভাষা।
  9. চর্যাপদগুলোতে বৌদ্ধ সহজিয়ামতের আধ্যাত্নিক তত্ত্বকথা গুরু-শিষ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য রূপক প্রতীকের আড়ালে সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।
  10. পদকর্তাগণ নিজেরাই বলেছে যে কোটি লোকের মধ্যে মাত্র এক জনের হৃদয়ে তার মর্মকথা প্রবেশ করবে। সেই রচনার ভাষা আলো-আঁধারি তো হবেই।
  11.  চর্যাপদের গবেষকগণ গবেষণা করে সিদ্ধান্ত নেন যে, চর্যার ভাষা সান্ধ্যভাষা।

চর্যাপদের ধর্মমত সম্পর্কে সংক্ষেপে বিবরণ দাও। (বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১ খ বিভাগ)

উত্তর চর্যাপদে ধর্মমত বা ধর্মদর্শন বা অধ্যাত্মতত্ত্ব রয়েছে।  

  1. চর্যাপদগুলো মূলত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম সাধনার তত্ত্বদর্শন।
  2. বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ গোপনতত্ত্ব দর্শন ও ধর্মচর্চাকে বাহ্যিক প্রতীকের সাহায্যে ব্যক্ত করেছেন।
  3. চর্যাপদ  মূলত বৌদ্ধ সহজিয়াগণের ধর্মসাধনার রীতিপদ্ধতি ও অধ্যাত্মতত্ত্ব দর্শন।
  4. পদকর্তারা তপঃসিদ্ধ সাধক পুরুষ ছিলেন।
  5. চর্যাপদের মূল ভাবধারা সহজিয়া মতবাদ আশ্রিত হলেও এর সাথে অংশত বজ্রযান, কালচক্রযান ও তান্ত্রিক যোগধর্মের মিশ্রণ রয়েছে।  
  6. মহাসুখস্বরূপ নির্বাণ লাভই হলো চর্যার প্রধান তত্ত্ব। পদকর্তাগণ কেউ কেউ গুরুবাদী।
  7. সাধনতত্ত্বের এ মতপার্থক্য থাকলেও নির্বাণ সম্পর্কে তাদের দ্বিমত নেই।
  8. বাস্তব জীবনের জরামরণ ও পূর্বজন্মের বিষচক্র অতিক্রম করে নির্বাণ লাভ হচ্ছে সিদ্ধাচার্যগণের মূল লক্ষ্য।
  9. মনীন্দ্রমোহন বসু মনে করেন, মহাযান মত দর্শনিক তত্ত্বের ওপরই প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু পরবর্তীকালে বজ্রযানে তান্ত্রিকতা প্রবেশ করায় চর্যায় তন্ত্র ও যোগের উল্লেখ রয়েছে।
  10. চর্যাপদে দার্শনিক তত্ত্ব নয়, সাধনতত্ত্বের দিকটিই প্রাধান্য পেয়েছে।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১ খ বিভাগ

চর্যাপদসহ বাংলাদেশের প্রাচীন নিদর্শনগুলির পরিচয় দাও।

উত্তর: বাংলা সাহিত্যে প্রাচীন যুগের সাহিত্যের একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদ। তবে বাংলা সাহিত্যে প্রাচীন যুগের একমাত্র সাহিত্যিক নিদর্শন চর্যাপদ হলেও অন্যান্য ভাষার সাহিত্যে প্রাচীন যুগের আরো অনেক সাহিত্যিক নিদর্শন রয়েছে। এসব নিদর্শন যুগে যুগে ভাষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজগ্রন্থাগার থেকে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের সাহিত্যচর্চার একমাত্র নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ আবিষ্কার করেন। পরে তারই সম্পাদনায় ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ থেকে ১৯১৬ সালে চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, সরহপা ও কৃষ্ণপার দোঁহা এবং ডাকার্ণব এ চারটি পুথি একত্রে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোঁহা’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এগুলোর মধ্যে একমাত্র চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ই প্রাচীন বাংলায় লেখা, অন্য তিনটি বাংলায় নয়। অপভ্রংশ ভাষায় রচিত।

চর্যাপদে মোট চকিশেজন পদকর্তার পরিচয় পাওয়া যায়। এর মধ্যে পঞ্চাশটি পদ আছে। আর কাহ্নপা হলেন সবচেয়ে বেশি পদ রচয়িতা। চর্যাপদের ভাষা প্রাচীন বাংলা হলেও এর মধ্যে অপভ্রংশের কিছু কিছু নিদর্শন রয়েছে। আর তাই এর ভাষাকে অনেকে ‘সন্ধ্যাভাষা’ বলে অভিহিত করেছেন।

চর্যাপদের রচনাকাল সম্পর্কে বিভিন্ন মনীষী বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। ড. মুহম্মম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, এর রচনাকাল ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ আর ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, এর রচনাকাল ৯৫০ খ্রিস্টাব্দ।

‘চর্যাপদ’ ছাড়াও প্রাচীন যুগের সাহিত্যিক নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ‘। এটি সংস্কৃত ভাষায় রচিত। রাধাকৃষ্ণের লীলা কাহিনি নিয়ে আদিরসাত্মক এই ভক্তিকাব্যটি রচিত হয়েছে।

এছাড়া সেন যুগের দুটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক নিদর্শন হলো ‘কবীন্দ্রবচন সমুচ্চয়’ ও ‘সদুক্তিকর্ণামৃত‘। কবীন্দ্রবচন সমুচ্চয়ের পদকর্তার নাম জানা যায় নি। এতে ১১জন কবির কবিতা সংকলিত হয়েছে। আর ‘সদুক্তিকর্ণামৃত‘র সংকলক ছিলেন শ্রীধর দাস।

প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষায় প্রাচীন যুগে কিছু সাহিত্য রচিত হয়েছিল। এর মধ্যে ‘গাথা সপ্তশতী‘ ও ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল‘ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এছাড়া শৌরসেনী অপভ্রংশে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যের দ্বারা রচিত দোঁহাকোষের কথাও উল্লেখ করা যায়। এতে বজ্রযান ও সহজযান মতাবলম্বী তান্ত্রিক বৌদ্ধদের সাধন-ভজন ও আচার-আচরণের কথা ব্যক্ত হয়েছে।

বাংলা ভাষার প্রাচীন যুগের প্রধান সাহিত্যিক নিদর্শনসমূহের মধ্যে ‘চর্যাপদ’, ‘শূন্যপুরাণ’, ‘সেক শুভোদয়া’, ‘সেকোদ্দেশ ঢীকা’, ‘চতুরাভরণ’, ‘মানসোল্লাস’, ‘দেশীনামমালা’, ‘তাম্রশাসনলিপি’, ‘লোকসাহিত্য‘ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

কাহ্নপা সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখ। ( বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১)

উত্তর- প্রাচীন যুগের বাংলা সাহিত্যের একমাত্র সাহিত্যিক নিদর্শন ‘চর্যাপদ‘। বৌদ্ধ সহজিয়া তান্ত্রিকদের তত্ত্বকথা রূপক ভাষায় চর্যাপদগুলোতে প্রকাশ পেয়েছে। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজগ্রন্থাগার থেকে ১৯০৭ সালে এ পদগুলো আবিষ্কার করেন এবং ১৯১৬ সালে ‘হাজার বছরের পুরান বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোঁহা’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। এতে মোট ২৪ জন পদকর্তার ৫০টি গান বা পদ পাওয়া গেছে। কবি কাহ্নপা তার মধ্যে প্রধান।

চর্যাপদের পদকর্তাদের মধ্যে সর্বাধিক পদ রচয়িতার গৌরবের অধিকারী কাহ্নপা। তাঁর মোট ১৩টি পদ চর্যাপদে গৃহীত হয়েছে। কাহ্নপা রচিত ১৩টি পদ হলো ৭, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৮, ১৯, ২৪, ৩৬, ৪০, ৪২ ও ৪৫। এ সংখ্যাধিক্যের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে কবি ও সিদ্ধাচার্যদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে অভিহিত করা যায়। তিনি কাহ্নপা, কাহ্নপাদ, কানুপা, কৃষ্ণপা ইত্যাদি নামেও পরিচিত। কাহ্নপাকে সিন্ধাচার্যদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিবেচনা করা হয়। তিনি ছিলেন বৌদ্ধধর্মের সহজিয়া মতের অনুসারী। তাঁর বাড়ি ছিল উড়িষ্যায়। তবে তিনি সোমপুর বিহারে বসবাস করতেন। ‘চর্যাপদ’ ছাড়াও তিনি অপভ্রংশ ভাষায় ‘দোঁহাকোষ’ রচনা করেছেন। পণ্ডিতগণ তাঁকে সহজিয়া তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের যোগী বলে অভিহিত করেছেন।

কাহ্নপার জীবনকাল সম্পর্কে পন্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে কাহ্নপার আবির্ভাব হয়েছিল। অন্যদিকে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, কাহ্নপা দশম শতকের লোক। জালখরীপার শিষ্য কাহ্নপা সোমপুর বিহারে ছিলেন। এ সোমপুর বিহার পাহাড়পুরে অবস্থিত এবং পাল রাজা ধর্মপাল কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। অতএব কাহ্নপা খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে ধর্মপালের প্রারত পর্যন্ত জীবিত ছিলেন বলে ধরা যায়। ড.

অন্ধকার যুগ সম্পর্কে লেখ। (বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১)

উত্তর: বাংলা সাহিত্যের যুগবিভাগ প্রধানত তিনটি। প্রাচীন যুগ মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ। মধ্যযুগের দিকে তাকালে দেখা দিকে যে, ১২০০-১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কাল হলো মধ্যযুগের বিস্তৃতিকাল। আর এর মধ্যে ১২০০-১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে ‘অন্ধকার যুগ’ বা ‘তামস যুগ’ বলে অভিহিত করা হয়।

পণ্ডিতেরা কারণ হিসেবে বলেছেন যে, বাংলাদেশে তুর্কি বিজয়ের মাধ্যমে মুসলমান শাসনামলের সূত্রপাতের পরিপ্রেক্ষিতে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সাহিত্য সৃষ্টি হয় নি অনুমান করে এ রকম সিন্ধান্ত বিবেচনায় এসেছে। তবে এ অনুমান পুরোপুরি সত্য নয়।

মুসলমান শাসনের শুরুতে দেশে রাজনৈতিক অরাজকতা অনুমান করে কোনো কোনো পণ্ডিত মধ্যযুগকে অন্ধকার যুগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ড. সুকুমার সেনের মতে, “মুসলমান অভিযানে দেশের আক্রান্ত অংশে বিপর্যয়ের শুরু হয়েছিল।” গোপাল হালদারের মতে, “তখন বাংলার জীবন ও সংস্কৃতি তুর্ক আঘাতে ও সংঘাতে, ফাংসে ও অরাজকতায় মূর্হিত হয়েছিল। হয়তো সে সময়ে কেউ কিছু সৃষ্টি করবার মতো প্রেরণা পায় নি।”

কেউ কেউ মনে করেন এ সময়ে বাংলাদেশের উপর দিয়ে বারংবার হরণকারী বৈদেশিক তুর্কিদের নির্মম অভিযান প্রবল ঝড়ের মতো বয়ে যায় এবং প্রচন্ড সংঘাতে তৎকালীন বাংলার শিক্ষা, সাহিত্য, সভ্যতা সমস্তই বিনষ্ট ও বিলুপ্ত হয়ে যায়।

ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, “শারীরিক বল, সমরকুশলতা ও বীভৎস হিংস্রতার ধারা মুসলমানেরা অমানুষিক বর্বরতার মাধ্যমে বঙ্গ সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তামস যুগের সৃষ্টি করে।” তিনি মনে করেন, “বর্বর শক্তির নির্মম আঘাতে বাঙালি চৈতন্য হারিয়েছিল এবং পাঠান, খিলজী, বলবন, মামলুক, হাবসি সুলতানদের চণ্ডনীতি, ইসলামী ধর্মাবতা ও রক্তাক্ত সংঘর্ষে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় কুর্মবৃত্তি অবলমান করে কোনো প্রকারে আত্মরক্ষা করছিল।”

ভূদেব চৌধুরীর মতে, “বাংলার মাটিতে রাজ্যবিন্দা, জিঘাংসা, যুদ্ধ, হত্যা, আততায়ীর হতে মৃত্যু নারকীয়তার যেন আর সীমা ছিল না। সাথে সাথে বৃহত্তর প্রজাসাধারণের জীবনেও উৎপীড়ন, লুণ্ঠন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ধর্মহানির সম্ভাবনা উত্তরোত্তর উৎকর্ষ হয়ে উঠেছে। স্বভাবতই জীবনের এই বিপর্যয়লগ্নে কোনো সৃজনকর্ম সম্ভব হয় নি।

তবে প্রকৃতপক্ষে বাংলা সাহিত্য বর্জিত তথাকথিত অন্ধকার যুগের জন্য তুর্কি বিজয় ও তার ধাংসলীলাকে দায়ী করা বিভ্রান্তিকর আর এ সময়ে যে সাহিত্যের কোনো সৃষ্টি সম্ভব হয় নি তাও অমূলক। বরং আমরা দেখি এ সময়ে বিভিন্ন সাহিত্যকর্ম যেমন-প্রাকৃত পৈঙ্গলের মতো প্রাকৃত ভাষার গীতিকবিতা গ্রন্থ সংকলিত হয়েছে।

এছাড়া রামাই পণ্ডিত রচিত ‘শূন্যপুরাণ’ এবং এর ‘কলিমা জালাল’ বা ‘নিরজনের রুম্মা’, ডাক ও খনার বচন, হলায়ুধ মিশ্র রচিত ‘সেক শুভোদয়া’র অন্তর্গত পীর-মাহাত্ম্যজ্ঞাপক বাংলা আর্যা অথবা ‘ভাটিয়ালি রাগেন গীয়তে’ নির্দেশক বাংলা গান প্রভৃতি এ সময়ের বাংলা সাহিত্য সৃষ্টির নমুনা হিসেবে উল্লেখযোগ্য।

সবশেষে বলা যায়, তথাকথিত অন্ধকার যুগে বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ধারা যে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সে কথা আদৌ সত্য নয়। এ সময়েও সাহিত্য রচিত হয়েছে কিন্তু তা ছিল তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম।

পদাবলি সাহিত্যে (বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১)

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম গৌরব পদাবলি সাহিত্য। রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা অবলম্বনে এ অমর কবিতাবলির সৃষ্টি। প্রাচীন যুগ থেকেই ধর্ম ও অধ্যাত্ম অনুভূতি প্রকাশ ও প্রচারের জন্য-সংগীতের সহায়তা নেওয়া হতো। পদাবলি সাহিত্যও সেই জাতীয় গীতিকবিতা, যা রোমান্টিক কবিতা ও ভক্তি সাধনার গানের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে। এর বিচিত্র বিষয়বস্তু, রচনারীতি, ভক্তিবাদ, রোমান্টিকতা এ যুগের পাঠকের কাছেও এক পরম বিস্ময়াবহ ব্যাপার বলে গৃহীত। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে পৌরাণিক বৈষ্ণবশাস্ত্র সংহিতা ও পুরাণাদি গ্রন্থ, ভক্তি ধর্ম ও দ্বৈতবাদী দর্শনের প্রভাব।

তবে বাংলা বৈষ্ণব পদাবলি অধিকাংশ স্থলেই নিছক মানব-মানবীর বাস্তব জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত হয়েছে, ভক্তি ও অধ্যাত্ম সাধনার ব্যঞ্জনা আছে অন্তরালে। এতে যেমন রোমান্টিক ধরনের গীতিরসের উচ্ছ্বাস আছে, যা অনেকটা ধর্ম বিরহিত সাধারণ জীবনকে মনে করিয়ে দেয়, তেমনি রাধাকৃষ্ণ সংক্রান্ত গভীর তত্ত্বকথাও একে একটি অতি সূক্ষ্ম রসব্যঞ্জনায় পর্যবসিত করেছে, ধর্মসাধনার সঙ্গে যার একটা বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে।

চৌদ্দ শতকের শেষার্ধ থেকেই রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক বাংলা ও ব্রজবুলি পদ রচিত হয়েছিল। এর নেপথ্যে ছিল ভাগবত, বিষ্ণুপুরাণ প্রভৃতি বৈষ্ণব পুরাণের ভক্তির প্রভাব। কিন্তু চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের পরে এদেশে যে সমস্ত রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলি লেখা হয়েছে, তার প্রায় সবই চৈতন্য ভক্তের দ্বারাই রচিত। ফলে চৈতন্য যুগ ও উত্তর-চৈতন্য যুগের পদাবলিতে চৈতন্য প্রবর্তিত প্রেমভক্তি ও রসসাধনার সাধ্য-সাধনতত্ত্বের বিশেষ প্রভাব সূচিত হয়েছে। চৈতন্য যুগেই রাধাকৃষ্ণ পদাবলি যেমন বিপুল আকার ও ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে তেমনি তাতে সম্প্রদায় বিশেষের অধ্যাত্ম সাধনার ছায়া পড়েছে গাঢ়তর রূপে।

তাই বৈষ্ণব ধর্ম ও দর্শন বিশেষত চৈতন্য প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম সম্পর্কে অবহিত থাকলে বৈষ্ণব পদাবলির নিগূঢ় রস উপলব্ধি করা যাবে না। কারণ এতে তো শুধু রোমান্টিক মানবীয় সম্পর্কের কাহিনী গৃহীত হয় নি, এর সঙ্গে জড়িত হয়ে আছে বিশেষ ধরনের ভক্তিমার্গ, বিশেষ ধর্মসম্প্রদায়ের সাধন-ভজন, বিশেষ দেশকালের স্বরূপ সাধনা।

কেবল বৈষ্ণব ধর্মানুসারীরাই পদাবলি সাহিত্য রচনা করেন নি, অসংখ্য মুসলমান কবিও রয়েছেন যারা পরম আবেগে বৈষ্ণব পদাবলি রচনা করেছেন। ড. দীনেশচন্দ্র সেন বৈষ্ণব পদাবলির ১৬৫ জন কবির নাম উল্লেখ করেছেন। চৌদ্দ শতকের শেষার্ধ থেকে সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্যের ধারা প্রবাহিত হলেও ষোল-সতের শতকে এ সৃষ্টিসম্ভার প্রাচুর্য ও উৎকর্ষপূর্ণ ছিল। চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি চৈতন্য-পূর্ববর্তী এবং গোবিন্দদাস ও জ্ঞানদাস চৈতন্য-পরবর্তীকালের শ্রেষ্ঠ পদাবলি সাহিত্য রচয়িতা।

বাংলা সাহিত্যে পদাবলি সাহিত্যের গুরুত্ব অনেক। বিশেষ করে মধ্যযুগের বাংলা পদাবলি সাহিত্যে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা থেকে সাধন-ভজন ও ভক্তিবাদের বিস্তৃত উপস্থাপনা থাকায় সাহিত্যবিচারে এগুলোর ভূমিকা বিবেচনার দাবি রাখে। সুতরাং বলা যায়, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে পদাবলি সাহিত্যের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

চণ্ডীদাস সমস্যা (বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১) ( সংকলিত)

উত্তর: যারা বাঙালি সাহিত্যরসিকেরা চণ্ডীদাস এক ও অদ্বিতীয় বলে মনে করেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, শ্রীচৈতন্যের পূর্বে চন্ডীদাস সহজ-সরল বাংলা ভাষায় রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক অতি উৎকৃষ্ট পদ লিখেছেন। কিন্তু বিশ শতকের গোড়ার দিকে সর্বপ্রথম চণ্ডীদাস সমস্যার উদ্ভব ঘটে। চন্ডীদাসের বিভিন্ন ভণিতাযুক্ত পদ আবিষ্কৃত হওয়ায় কেউ কেউ একাধিক চন্ডীদাসের অস্তিত্বে বিশ্বাসী হন। কিন্তু ১৯১৬ সালে বসন্তরঞ্জন রায় কর্তৃক আবিষ্কৃত ও সম্পাদিত কবি বড়ু চন্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্য প্রকাশিত হওয়ায় চন্ডীদাস সমস্যা আরো প্রকট হয়। এ সময় মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে কজন চন্ডীদাস ছিলেন, চৈতন্যদেব কার পদ আস্বাদন করতেন এবং কোন চন্ডীদাস তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ইত্যাদি জটিল প্রশ্ন দেখা দেয়।

বড়ু চণ্ডীদাস, চন্ডীদাস, দীন চন্ডীদাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস প্রভৃতি ভণিতা থেকে অনুমান করা যায় যে, মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে নামাঙ্কিত পদাবলি ও আখ্যানে চারটি স্পষ্ট ধারা অনুমান করা যায়। তার মধ্যে দুটি ধারা হচ্ছে আখ্যানের। একটি বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’। এই কবি যে চৈতন্যদেবের পূর্বে বর্তমান ছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বন্ধু চন্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ চৈতন্যদেবের পূর্বে রচিত হলেও এর অন্তর্নিহিত খুলতা ও রসাভাস দোষের জন্য চৈতন্যদেব এ কাব্য পাঠ করে কখনো তৃপ্তি পেতেন না। চৈতন্যদেব যে চন্ডীদাসের পদ আস্বাদন করতেন তিনি পদাবলির চন্ডীদাস। আরেকজন পুরাণের ছায়ায় ও প্রাচীনতম চণ্ডীদাসের পদের আদর্শে আখ্যানধর্মী পদাবলি রচনা করেছিলেন।

তিনি প্রায়ই দীন চণ্ডীদাস ভণিতা ব্যবহার করেন এবং তাঁকে সতের শতকের পূর্ববর্তী বলে মনে হয় না। বাকি দুজন কোনো আখ্যান রচনা করেন নি। তাঁরা শুধু পদ লিখেছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন সহজিয়া চন্ডীদাস। সহজিয়া বৈষ্ণব আদর্শ অনুসরণে পদ রচয়িতা চৈতন্য-পূর্ববর্তী হতে পারেন না। আর ব্যকি একজন উৎকৃষ্ট পদাবলির কবি, প্রাচীনতম চন্ডীদাস। চৈতন্যদেব এরই পদ থেকে তৃপ্তি লাভ করেন। তিনি নিঃসন্দেহে চৈতন্যদেবের পূর্ববর্তী পদাবলির চন্ডীদাস। পরবর্তীকালে যে সমসত পদকর্তা বাংলায় পদ লিখেছিলেন, তাঁদের অনেকেই তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন। তাঁর প্রধান অনুসারী জ্ঞানদাস।

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে নাম নিয়ে যে বিরাট সমস্যা তা হলো মধ্যযুগের কয়জন চন্ডীদাস ছিলেন এবং কোন চণ্ডীদাস পূর্ববর্তী ও কোন চন্ডীদাস পরবর্তী তা নির্ণয়ের সমস্যা। মধ্যযুগের পুঁথি, পদাবলি ইত্যাদিতে উল্লিখিত ভণিতার নামের কারণে এ সমস্যা প্রকট হয়েছে। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ মুদ্রণের পর থেকে এ পর্যন্ত পণ্ডিতমহল নানা আলোচনা, সমালোচনা করেও কোনো স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে নি। সুতরাং বলা যায়, অদূর ভবিষ্যতে ভণিতাযুক্ত পুরাতন পুঁথি পাওয়া না গেলে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে চন্ডীদাস, সমস্যার সমাধানের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

মধ্যযুগীয় সাহিত্য -বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১

  1. অন্ধকার যুগ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা কর।
  2. অন্ধকার যুগে রচিত সাহিত্যের পরিচয় দাও।
  3. মঙ্গলকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য উল্লেখ কর।
  4. চন্ডীমঙ্গল কাব্যের কবিদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
  5. ‘চন্ডীদাস সমস্যা’ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা কর।
  6. বৈষ্ণব পদাবলি সীমিত অর্থে গীতিকবিতা—কেন?
  7. বৈষ্ণব পদাবলি কোন অর্থে নীতি কবিতা?
  8. “বাংলা রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানগুলো মধ্যযুগের সাহিত্যে স্বতন্ত্র” – সংক্ষেপে বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত কর।
  9. চৌতিশা বলতে কী বোঝায়?
  10. শূন্যপুরাণ কী? সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
  11. ‘দোভাষী পুঁথি’র সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
  12. মর্সিয়া সাহিত্যের পরিচয় দাও।
  13. নাথ সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
  14. বিদ্যাসুন্দর কাব্যের পরিচয় দাও।

কবি ও সাহিত্যিক পরিচয় -বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১

  1. শ্রীচৈতন্যদেব সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা কর।
  2. জ্ঞানদাসের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
  3. শাহ মুহম্মদ সগীরের পরিচয় দাও।
  4. মুকুন্দরাম চক্রবর্তীকে দুঃখবাদী কবি বলা হয় কেন?
  5. ভারতচন্দ্রকে কেন ‘নাগরিক বৈদগ্ধ্যের কবি’ বলা হয়?
  6. আলাওলের কবিপ্রতিভার পরিচয় দাও।

লোকসাহিত্য – বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১

  1. রূপকথা ও উপকথা বলতে কী বোঝ?
  2. ডাক ও খনার বচন বলতে কী বোঝ?
  3. বাংলা লোকসাহিত্যের ধাঁধা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত টীকা লেখ।
  4. বারমাস্যা বলতে কী বোঝ?

বিখ্যাত উক্তি/লাইন ব্যাখ্যা – বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১

  1. “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে” – ব্যাখ্যা কর।
  2. “আমার সন্ধান যেন থাকে যুদ্ধে ভাতে” – ব্যাখ্যা কর।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১

(রচনামূলক প্রশ্ন)

প্রাচীন যুগ ( বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১)

  1. প্রাচীন যুগের বাংলা সাহিত্যের নিদর্শনগুলোর পরিচয় দাও।
  2. চর্যাপদের ভাষা কি বাংলা? যুক্তিসহ তোমার মতামত তুলে ধর।
  3. পণ্ডিতদের মতামত উল্লেখপূর্বক চর্যাপদের কাল নির্ণয় কর।
  4. চর্যাগীতিকায় সেকালের বাংলাদেশের ও বাঙালি সমাজ জীবনের চিত্র আলোচনা কর।
  5. বাংলা সাহিত্যে ‘অন্ধকার যুগ’ নিয়ে তোমার বক্তব্য উপস্থাপন কর।

যুগবিভাগ

  1. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যুগবিভাগ সম্পর্কে পণ্ডিতদের মতামত আলোচনা কর।

মঙ্গলকাব্য

  1. মঙ্গলকাব্য কী? মঙ্গলকাব্যের উদ্ভব ও বিকাশ আলোচনা কর।
  2. চন্ডীমঙ্গল ধারার প্রধান কবিদের পরিচয় দাও।
  3. মনসামঙ্গল কাব্যের প্রধান কবিদের পরিচয় দাও।

বৈষ্ণব পদাবলি

  1. মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলির প্রধান কবিদের অবদান আলোচনা কর।
  2. বৈষ্ণব পদাবলীর মানবিক আবেদন আলোচনা কর।
  3. বাংলা সাহিত্যে ‘চন্ডীদাস সমস্যা’ সম্পর্কে আলোচনা কর।
  4. বাংলা সাহিত্যে চন্ডীদাস কয়জন? তাদের পরিচয় দাও।

মুসলমান কবি ও শাসক

  1. মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমান কবিদের অবদান আলোচনা কর।
  2. মুসলমান শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা সাহিত্যের বিকাশ আলোচনা কর।

প্রণয়োপাখ্যান, অনুবাদ, জীবনী

  1. মধ্যযুগের বাংলা রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
  2. মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের বিকাশে অনুবাদ সাহিত্যের ভূমিকা আলোচনা কর।
  3. মধ্যযুগে রচিত জীবনী সাহিত্যের গুরুত্ব আলোচনা কর।

অন্যান্য ধারা

  1. নাথ সাহিত্য কী? এ ধারার উদ্ভব ও বিকাশ আলোচনা কর।
  2. দোভাষী পুঁথিসাহিত্যের উদ্ভব ও বিকাশের ধারা আলোচনা কর।
  3. আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্যের চর্চা সম্পর্কে আলোচনা কর।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একটা আবশ্যিক পাঠ্য। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১ এ অংশে সাধারণত প্রাচীন যুগ ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য নিয়ে সিলেবাস সাজানো হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১ এক ব্যাপক অংশ, যা শিক্ষার্থীদের জন্য স্বল্প সময়ে আয়ত্তে নিয়ে আসা সম্ভব হয় না। ফলে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১ কোর্স থেকে বিগত দশ বছরে পরীক্ষায় যা এসেছে তা পর্যালোচনা করে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-১ এর সাজেশন সাজানো হয়েছে।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *