বাউল গানে বা পদাবলিতে হিন্দু-মুসলমানের কণ্ঠ একসাথে মিশেছে।
বাউল গানে বা পদাবলি: এর আবেদন সর্বস্তরের মানুষের কাছে।


বাউল গান বা পদাবলি : বাউলের উদ্ভব, বাউল তত্ত্ব ও দর্শন।
মধ্যযুগের শেষ দিকে একদল রহস্যবাদী সাধক সম্প্রদায় ছিল, যারা উৎকৃষ্ট অভিনব অধ্যাত্ম-সংগীত রচনা করেছিলেন, তারাই বাউল সম্প্রদায় নামে পরিচিত। বাউল পদাবলির মধ্যে বাউল ধর্মমত ও দর্শন প্রকাশ পেয়েছে। তবে, এর মধ্যে এমন একটা উদার অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধ প্রকাশ পেয়েছে, যা বাংলার সর্বস্তরের মানুষের কাছে সমান ভাবে আবেদন রেখেছে।


বাউল সম্প্রদায়ের উদ্ভবের প্রেক্ষাপটই তাদেরকে মানবধর্মে দীক্ষা দেয়। আলোচ্য নিবন্ধে আমরা বাউল পদাবলিতে প্রতিফলিত অসাম্প্রদায়িক উদার মানবতাবোধের পরিচয় দেবার চেষ্টা করবো।
প্রাকৃত সমাজে বসবাসকারী সহজিয়া ও নাথপন্থীরা ব্রাহ্মণ্যধর্মের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে একসময় ইসলাম ও বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হয়। আবার অনেকে মসজিদ-মন্দির কোনো দিকে না গিয়ে উদার আকাশের তলে মুক্তির পথ খুঁজেছিল।
অন্যদিকে যারা নবধর্মে দীক্ষিত হয়েছিল, তারাও তাদের আজন্ম লালিত বদ্ধমূল সংস্কার ত্যাগ করতে পারে নি। এসব কারণে হিন্দু-মুসলমানের সমন্বয়ে বাউল মতের উদ্ভব ঘটে। অনেকের মতে মধ্যযুগে সহজিয়া সাধক সম্প্রদায়ের সাথে সূফীমত ও বৈষ্ণব সহজিয়া তত্ত্ব মিলেই বাউল তত্ত্বের উত্থান।
বাউল তত্ত্ব ও দর্শনই তাদেরকে উদার মানবতাবাদে দীক্ষা নিতে সহায়তা করে। তারা তাত্ত্বিক ঠিকই, তবে তারা সমাজ, জীবন ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন। তাদের ধর্ম সাধনার মূল কথা-
নিজের দেহের মাঝে আত্মারূপ মনের মানুষ বাস করে, তাকে খুঁজে বের করা এবং দেহের মধ্যে তাকে অনুভব করতে পারলেই আলেখ নুরের (পরম জ্যোতি) সন্ধান পাওয়া যায়। তখন বাইরের সীমাবদ্ধ বস্তুজগৎ থেকে মুক্তি নিয়ে দেহ ও মনে ঈশ্বর সত্ত্বা লাভ সম্ভব হয়।
মনের মানুষ সন্ধানই তাদের কাছে বড় কথা, তাই নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের নিয়ম-কানুনের প্রয়োজন পড়ে না। মানুষই তাদের কাছে বড়। ধর্মের ভেদ, জাতি ভেদ, পুজো-অর্চনা, নামা- রোজা, মসজিদ-মন্দির, কাবা-কাশী ইত্যাদি সম্পর্কে তারা উদাসীন।
মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তারা স্বীকার করে না। আর ধর্ম, বর্ণ গোত্র নিয়ে মানুষে মানুষে যে ভেদাভেদ সমাজে প্রচলিত, তা দেখে তাদেরকে উদার মানবতারোধে দীক্ষা নিতে উদ্বুদ্ধ করে। সেই সাথে সমাজ ও জীবন সম্পর্কে তারা গভীর সচেতনতার পরিচয় দিয়েছে।
বাউলেরা ভেদবুদ্ধিহীন মানবতার উদার পরিসরে সাম্য ও প্রীতির সুউচ্চ মিনারে বসে সাধনা করে গেছেন। আধুনিক কালে এসে মানুষ যে সহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির বাণী শোনায়, তা কতকাল আগে থেকেই পথে-প্রান্তরে পরম নিষ্ঠার সাথে বাউলেরা উচ্চারণ করে এসেছেন।
সাধনার মধ্যে শুধু ভক্তি নয়, শুধু প্রেম নয়, তার মধ্যে অখণ্ড জীবন এবং জীবনের বিচিত্র আলোড়ন স্পন্দিত হয়েছে। বাউলেরা জীবনেরই দূত, তাদের একতারার একটি তার থেকেই বিচিত্র জীবন-সঙ্গীত মানুষের দ্বারে দ্বারে পরিবেশন করেছে।
বাউলেরা উঁচু-নিচু জাতিভেদ বিশ্বাস করতো না। তাদের এ সাম্যবাদ কোনো বিশেষ ধর্ম বা সমাজের রীতি নীতি দ্বারা গণ্ডীবদ্ধ নয়। তার মধ্যে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোকই সমানভাবে স্থান পেয়েছে।
সাম্প্রদায়িক জীবনের বিচ্ছিন্ন ধারাগুলি বরং বাউল জীবনের বিরাট সাম্যের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে।
তারা সংকীর্ণ কোনো বন্ধনকেই মানতে রাজি নয়। তাই তারা নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের নিয়ম-কানুনের প্রয়োজন বোধ করে নি। এখন কি হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে স্বাভাবিক ধর্মীয় ভেদাভেদ তাও তারা মানে না। ধর্মভেদ সম্বন্ধে তাদের ধারণা
তোমার পথ ঢাইক্যাছে মন্দিরে-মসজিদে ও তোর ডাক শুনে সাঁই চলতে না পাই আমায় রুখে দাঁড়ায় গুরুতে মুর্শীদে।
বাউল গানের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ সব ধর্মের শব্দ ও রূপক বাউল তত্ত্ব ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত হয়েছে। মানুষে মধ্যে উঁচু-নিচু, জাত-পাত কোনো কিছুই তারা মানে না। সব সৃষ্টি একই স্রষ্টার। একই চাঁদ-সূর্যের আলোয় প্রতিপালিত।
স্রষ্টার কাছে ভক্তিই সব। ভক্তির জোরে স্রষ্টাকে পাওয়া যায়। লালন বলেন-
ভক্তির দ্বারে বাঁধা আছেন সাঁই হিন্দু কি যবন বলে তার কাছে জাতের বিচার নাই। ভক্ত কবির জেতে জোলা প্রেম ভক্তিতে মাতোয়ালা রামদাস মুচি এই ভবের পরে পেলো রতন ভক্তির জোরে তার স্বর্গে সদাই ঘন্টা পড়ে।
জীবন ও সমাজ সচেতন বাউলদের জাতিভেদ সম্পর্কে বক্তব্য-
জেতের কিরূপ দেখলাম না এ নজরে। সুন্নত দিলে হয় মুসলমান, নারীলোকের কি হয় বিধান? বামন চিনি পৈতার প্রমাণ বামনী চিনি কি ধরে।
ভণ্ড সার্থবাদীরাই মানুষে মানুষে এই ভেদাভেদ সৃষ্টি করেছে। মানুষকে ভালবাসা ও মানুষের মূল্যায়নের মধ্যেই অসাম্প্রদায়িকতার বীজ লুকানো থাকে। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ নিরর্থক। কেননা-
কেউ মালা, কেউ তসবি গলায় তাইতে কি জাত ভিন্ন বলায় যাওয়া কিবা আসার বেলায় জেতের চিহ্ন রয় কার রে।
মানব-জীবন বাউলদের কাছে পরম আরাধনার বিষয়। তারা মনে করে বহু ভাগ্যের ফলেই মানব জীবন পাওয়া যায়। ফেরেসতা দেবতা সবাই আরাধনা করে মানবরূপে জন্ম নিতে। মানব মহিমাকে বড় ঐশ্বর্যময় করে বাউলরা বাউল গানে প্রকাশ করেছে-
অনন্তরূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই শুনি মানবের উত্তম কিছুই নাই দেব-দেবতাগণ করে আরাধন জন্ম নিতে মানবে।
বাউলেরা তাদের বাউল গান বা পদাবলিতে হিন্দু-মুসলমানের ঐতিহ্য একত্রে ব্যবহার করেছেন। এতে তাদের অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন-
বেদ-বেদান্ত পড়বে যত বাড়বে তত লক্ষণা। লালন কয় নাম ধরেছে কৃষ্ণ করিম কালা। নামটি লা শরিকাকালা সবার শরীক সেই একেলা। প্রেম দুয়ারে নানা তালা পুরাণ কোরান, তসবি মালা।
বাউল গানে মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসার দৃষ্টান্ত-
এই মানুষে আছে রে মন যারে বলে মানুষ রতন লালন কলে, পেয়ে সে ধন পারলাম না রে চিনিতে।
বাউলরা অশিক্ষিত। উঁচু সমাজে তারা ছিল অবহেলার পাত্র। কিন্তু তাদের চিন্তা-ভাবনা শিক্ষিত বিত্তবান মানুষের তুলনায় অনেক উপরে। তারা যে সাম্য ও মানবতার বাণী শিখিয়ে গেছেন, তা আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার ভিত হতে পারে।
তাদের এ মানবতা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবতার সমগোত্রীয়। তারা যে গান গেয়েছে, সেই বাউল গান, তা মানবতার গান, প্রেমের গান। বাউল গান শুধু ধর্মসংগীত নয়, এ গান দর্শন, ভজন, সংগীত ও সাহিত্য। তাও শুধু লোক-সাহিত্যমাত্র নয় এগুলো সাধারণ মানুষের প্রাণের কথা, মনীষার ফসল। জগৎ ও জীবন সম্পর্কিত উপমা- রূপক তারা গ্রহণ করে আটপৌরে ভাষায় যেভাবে বর্ণনা করেছেন, তাতে কাব্যশ্রীও ফুটে উঠেছে। তারা ভাব অনুযায়ী যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা স্নিগ্ধ গীতিমূর্ছনায় পূর্ণ। তাই, এসব গানের আবেদন বাংলার সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌছে গেছে।
বাউল গানে কোনো সাম্প্রদায়িক চিহ্ন নেই বলে সব ধর্মের লোকই সহজে এ গানকে প্রাণে ধারণ করেছে। কুষ্টিয়ায় লালনের সমাধি প্রতি বছর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের তীর্থ ভূমিতে পরিণত হয়।
এটা বাউলদের অসাম্প্রদায়িকতার কারণেই সম্ভব। রবীন্দ্রনাথ বাউলদের মানবতাবোধ ও অসাম্প্রদায়িংক চেতনার কারণেই এদের প্রতি শিক্ষিত মানুষকে উৎসুক করে তোলেন।