বিদ্যাপতির রাধা নবীনা নবস্ফূটা, চণ্ডীদাসের রাধা গভীর ও ব্যাকুলা এ উক্তির আলোকে বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য নির্দেশ কর।


মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বৈষ্ণব সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা। এ শাখার দু’জন প্রতিভাবান কবি-পুরুষ হলো বিদ্যাপতি ও চন্ডীদাস। এরা দু’জন সমসাময়িক বৈষ্ণব মহাজনদের মধ্যে গুরুস্থানীয়। তাদের প্রবল প্রেরণায় রাধা-কৃষ্ণের লীলামাধুরী মধ্যযুগের সীমানা পেরিয়ে বিশ্ব সাহিত্যের দরবারে স্থান করে নিয়েছে।
চৈতন্যপূর্ব এই দুই কবি বৈষ্ণব পদাবলি রচনায় দুটি ধারার প্রবর্তন করেন। সেই দুটি ধারার মিলন ক্ষেত্রের উপর দাঁড়িয়ে চৈতন্যপরবর্তী পদাবলি গানের বিপুল সমারহ দেখা যায়।
চণ্ডীদাস বাংলার রজকিনী প্রেমিক বাসুলী সেবক পল্লীকবি এবং বিদ্যাপতি মিথিলার তৎকালীন শাস্ত্রবিদ, ছন্দবিদ, আলঙ্কারিক, রাজ-দরবারের শ্রেষ্ঠ নাগরিক কবি। তারা দু’জনেই একই বিষয় নিয়ে পদ রচনা করেছেন। তবে তারা পৃথক আধারে সাজিয়ে রসিক শ্রোতার কাছে পরিবেশন করেছেন। রাধা চরিত্র চিত্রণে, ভাব, ভাষা, বর্ণনাভঙ্গি, আঙ্গিক, রীতি ও পদ্ধতিগত দিক থেকে তাদের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
রাধা চরিত্র চিত্রণে – বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস
বিদ্যাপতি রাধার চরিত্রকে অপূর্ব দক্ষতার সাথে চিত্রিত করেছেন। রাধার বয়ঃসন্ধি থেকে পরিপূর্ণ নারীতে পরিণত হওয়ার প্রতিটি স্তর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন। রাধার বয়ঃসন্ধিকালের চঞ্চলতা, কিশোরী রাধার দেহে যৌবনাগম এবং তার ক্রমবিকাশ, মনোজগতের পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়কে নানা আলঙ্কারিক বিশ্লেষণে প্রকাশ করেছেন।
বিদ্যাপতির রাধার চিত্র বর্ণবৈভবে, কৈশোর-বয়ঃসন্ধি-নবযৌবনের আলোয় আলোকিত। পূর্বরাগ, অভিসার, মান, ভাব-সম্মিলন-প্রতিটি স্তরের জ্যোতি পাঠককে যেন প্রতি মুহূর্তে চমকিত করে রাখে। শৈশব ও যৌবনের দ্বন্দ্বে, লজ্জায়-ভয়ে, আনন্দে-সংশয়ে, কৌতূহলে ও অনভিজ্ঞতায় রাধা একবার এগিয়ে গেছে, একবার পিছিয়ে এসেছে। কবির বর্ণনায়-
কবহু বান্ধএ কচ কবহু বিথারি।
কবহু ঝাঁপএ অঙ্গ কবহু উথারি।
বিদ্যাপতির রাধার ক্রমবিকাশ থাকলেও চণ্ডীদাসের রাধা পরিণত, প্রথম থেকেই বৈরাগী বেশে কৃষ্ণপ্রেমে আত্মহারা। সে আজন্ম কৃষ্ণপ্রেমে পাগলিনী। বিদ্যাপতির রাধার মতো চন্ডীদাসের রাধা মন ও দেহের বর্ণোজ্জ্বলতায় তত চমক সৃষ্টি করে না।
চণ্ডীদাস কুড়ে ঘরে বসে মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে অল্প কথায় সহজ-সরল নিরলংকৃত ভাষায় কাম-আসক্তি বিহীন প্রেমমুগ্ধা রাধার পূর্বরাগ, আক্ষেপ, মান ও বিরহের বেদনাময় মুর্তিটি অপূর্ব দক্ষতার সাথে অঙ্কন করেছেন। চন্ডীদাসের প্রেম-বিভোর রাধা চিত্রের প্রথম দৃশ্যেই দেখা যায়-
রাধার কি হল অন্তরে ব্যথা।
বসিয়া বিরলে থাকয়ে একলে
না শুনে কাহারো কথা।
এ রকম রাধার জন্যে দুটি রঙই যথেষ্ট; বাইরের সাজে নিরাভরণ যোগিনীর রাঙা রঙ, অন্তরে গাঢ় কৃষ্ণ-শ্যাম রঙ। চণ্ডীদাসের রাধা শ্যামল বাংলার নরম মাটির কোমল মেয়ে।
বিদ্যাপতি রাধার ক্রমবিকাশের স্তর দেখিয়েছেন। তাই, রাধা কৃষ্ণরূপ দেখে বা শুনে পূর্বরাগ বা অনুরাগের অনুভূতিতে চঞ্চলা হয়েছে। চন্ডীদাসের রাধা পূর্বরাগ পর্যায় থেকেই কৃষ্ণপ্রেমে আত্মসম্বিত হারিয়েছে। কেননা, শ্যাম-নাম কানের ভেতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করে দেহ-মন আকুল করে দিয়েছে। রাধার উপলব্ধি-
এছন করল গো
নাম পরতাপে যার অঙ্গের পরশে কিবা হয়।
যেখানে বসতি তার নয়নে দেখিয়া গো
যুবতী-ধরম কৈছে রয়।
পূর্বরাগের পদে বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস
চণ্ডীদাসের এ রাধাকে পূর্বরাগের নায়িকা না বলে কৃষ্ণপ্রেমে বিভোর অনুরাগিনী বলাই ভাল। কালিয়া বধূর সঙ্গে নব পরিচয়ের দিনেই রাধার অন্তর কৃষ্ণপ্রেমের রঙে রঙিন হয়েছে। কৃষ্ণকে দেখার আশায় ব্যাকুলা রাধার চিত্র-
ঘরের বাইরে দণ্ডে শতবার
তিলে তিলে আইসে যায়,
মন উচাটন নিশ্বাস সঘন
কদম্ব কাননে চায়।
রূপানুরাগের পদে বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস
বিদ্যাপতির পদে রূপানুরাগের ছবি আছে। কেননা, রাধা নবীনা। যৌবনের নানা চিহ্ন সবেমাত্র দেহ-মনে এসেছে। তাই, রূপানুরাগের কথা আসে। অন্যদিকে চণ্ডীদাসের রাধা দেখার আগেই কৃষ্ণের নাম শুনে কৃষ্ণকে অন্তরে স্থান দিয়েছে। উভয়ের প্রগাঢ়-প্রেমের বাইরের রূপের বর্ণনা চন্ডীদাস আবশ্যক মনে করেন নি। চণ্ডীদাস নব অনুরাগের মিলন-দিনের ছবি এঁকেছেন এভাবে-
এমন পিরীতি কভূ দেখি নাই শুনি
পরানে পরানে বাঁধা আপনা আপনি।
দুই কোরে দুই কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া
আধ তিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া।
অভিসারমূলক পদে বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস
বিদ্যাপতির অভিসারমূলক পদে লীলাময়ী রাধাকে সাজ-সজ্জায় দুর্ণিবার পথ পাড়ি দিতে দেখা যায়। এখানে রাধা একেশ্বরী অনন্যা। কোনো বাধাকেই সে বাধা মনে করে না। অভিসারের জন্য রাধার দীর্ঘ প্রস্তুতির পরিচয়ও মেলে।
চন্ডীদাসের প্রেমাকুলা রাধা বিদ্যাপতির রাধা থেকে একেবারেই স্বতন্ত্র। অভিসার প্রস্তুতির মধ্যে কিছুটা বাহ্য অলঙ্কার আছে বলেই চণ্ডীদাসের পক্ষে রাধার অভিসারের চিত্র আঁকা সম্ভব হয় নি।


রাধা সখীকে দিয়ে কৃষ্ণের কাছে খবর পাঠিয়েছে। রাধার গৃহকর্মে, স্বামী সেবায় দিন যায়। কৃষ্ণের কাছে যেতে রাধা ব্যাকুল হলেও যাবার সময় কোথায়? রাধার যেতে দেরি দেখে কৃষ্ণ নিজেই দেখা দিলে রাধা সব বাঁধা জলাঞ্জলি দিয়ে বেরিয়ে আসে।
এ ঘোর রজনী মেঘের ঘটা
কেমনে আইল বাটে।
আঙিনার মাঝে বধূয়া ভিজিছে
দেখিয়া পরান ফাঁটে।
তাই
কলঙ্কের ডালি মাথায় করিয়া
আনলে ভেজাই ঘর।
মান বিষয়ক পদে বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস
মানের পদে বিদ্যাপতির বৈচিত্র্য অসাধারণ। সমাজ অভিজ্ঞতা, লোক-চরিত্র জ্ঞান, প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য দিয়ে তিনি মানিনী রাধার ছবি এঁকেছেন। পুরুষ জাতির প্রতি তিরস্কারের অগ্নি বর্ধিত হয়েছে অনেক স্থানে। চণ্ডীদাসের খণ্ডিতা রাধার চিত্রে দেখা যায় তিরস্কারের অগ্নি সেখানে অভিমান-অশ্রুতে নির্মল হয়ে উঠেছে। রাধা মান প্রসঙ্গে অন্তরের দুঃখের কথা প্রকাশ করেছে-
সই, কেমনে ধরিব হিয়া
আমার বঁধুয়া আন বাড়ী যায়
আমার আঙিনা দিয়া।
আর যে অপরাধিনী শ্যামকে ভাঙিয়ে নিয়েছে, তার প্রতি রাধার চরম অভিশাপ ঝরে পড়েছে। যে প্রেমের জন্য রাধা ইহলোকে সব কিছু ছেড়েছে, সেই শ্যামকে যে যুবতী ভাঙিয়ে নিয়েছে, তার উদ্দেশ্যে বলেছে-
আমার পরান যেমতি করিছে
তেমতি হউক সে।
বিদ্যাপতি ব্রজবুলি ভাষায় পদ রচনা করেছেন। সংস্কৃত, প্রাকৃত, মৈথিলি ভাষা থেকে সম্পদ সংগ্রহ করে অপূর্ব সৌন্দর্যময় করে বিচিত্র ছন্দ ও অলঙ্কারে সাজিয়ে রাধার বিভিন্ন ক্রমন্তর বর্ণনা করেছেন।
চন্ডীদাস অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় অপার্থিব আত্মনিবেদনের পদ লিখেছেন। তাঁর ভাষা বাংলার নিজস্ব ভাষা। তাঁর ভাণ্ডারে দু-চারটি মাটির অলংকার ও মাটির ফুল ভিন্ন কোনো হিরা-মাণিক্য নেই। চণ্ডীদাসের ভাষা-ই বৈষ্ণব সাহিত্যের সাধারণ ভাষা।
বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস সম্পর্কে বিভিন্ন পণ্ডিতদের মতামত
চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপরিত তুলনা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-
বিদ্যাপতি সুখের কবি। চন্ডীদাস দুঃখের কবি। বিদ্যাপতি বিরহে কাতর হইয়া পড়েন। চন্ডীদাসের মিলনেও সুখ নাই। বিদ্যাপতি জগতের মধ্যে প্রেমকে সার বলিয়া জানিয়াছিলেন। চণ্ডীদাস প্রেমকেই জগৎ বলিয়া মানিয়াছেন। বিদ্যাপতি ভোগ করিবার কবি। চন্ডীদাস সহ্য করিবার কবি। চন্ডীদাস সুখের মধ্যে দুঃখ এবং দুঃখের মধ্যে সুখ দেখিতে পাইয়াছেন। বিদ্যাপতির অনেক স্থলে ভাষার সৌন্দর্য বর্ণনার মাধুর্য আছে। কিন্তু চন্ডীদাসের নতুনত্ব আছে। ভাবের মহত্ত্ব আছে। আবেগের গভীরতা আছে। চন্ডীদাসের পিরীতি গভীর দুঃখ-বেদনার পথেই সুখের সন্ধান করিতেছে। বিদ্যাপতির রাধা তরুণী নায়িকা। চন্ডীদাসর রাখা প্রবীণা সাথিকা।
বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন-
বিদ্যাপতির কবিতা স্বর্ণহার, চন্ডীদাসের কবিতা রুদ্রাক্ষমালা। বিদ্যাপতির গান সুরজবীণাসঙ্গিনী স্ত্রী-কণ্ঠগীতি। চন্ডীদাসের গান সায়াহ্ন সমীরণের দীর্ঘশ্বাস।
রবীন্দ্রনাথের কথায়-
বিদ্যাপতির কবিতায় প্রেমের ভঙ্গী, প্রেমের নৃত্য, প্রেমের চাঞ্চল্য। চন্ডীদাসের কবিতায় প্রেমের তীব্রতা, প্রেমের আলোক।
পরিশেষে বলা যায় যে, বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস দুজনই চৈতন্যপূর্ব কবি। তাই বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের পদে স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য অনেক বেশি। সার্থকতার দিক থেকে বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস দু’জনে সমান সমান। দু’জন দু’ধারার শ্রেষ্ঠ দিকপাল। চন্ডীদাসের পূর্বরাগ, আক্ষেপানুরাগ ও ভাব-সম্মিলন এবং বিদ্যাপতির বয়ঃসন্ধিকালের অনুভূতি, রূপবর্ণনা, প্রেম-বৈচিত্ত্য, মান, বিরহ, মাথুর ইত্যাদি পদের মধ্যে যেমন সামঞ্জস্য আছে, তেমনি স্বাতন্ত্র্যও আছে।
চণ্ডীদাসের সরলতা, আন্তরিকতা, ভাব-গভীরতা, দেহ গমনহীনতা যেমন বিদ্যাপতিতে নেই। তেমনি বিদ্যাপতির সূক্ষ্ম শিল্প-চাতুর্য চণ্ডীদাসে নেই। তবে পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করার ক্ষেত্রে দু’জনই সমান পারদর্শী