বিশ্ব শিক্ষক দিবস: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ ও প্রত্যাশা

 বিশ্ব শিক্ষক দিবস

৫ই অক্টোবর, বিশ্বব্যাপী বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ১৯৯৫ সাল থেকে পালিত হচ্ছে। ইউনেস্কোর মতে, শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃত স্বরূপ এ দিনটি পালিত হয়। বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশ এ দিনটি পালন করে।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস সম্পর্কে উইকিপিডিয়া –

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপন করার জন্য জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) এবং এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল (ইআই) প্রতি বছর একটি প্রচারণা চালায় যাতে বিশ্বকে শিক্ষকদের সম্পর্কে আরও ভালভাবে বোঝাতে পারে যে, তারা শিক্ষার্থী এবং সমাজকে বিকশিত করতে কতটা ভূমিকা পালন করে। ] তাই তারা তাদের প্রচারণার জন্য বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সাথে কাজ করে, যেমন- গণমাধ্যম সংস্থার  সাহায্যে তারা তাদের কাজ সম্পাদন করে। প্রচারণাটি প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন থিমে আলোকপাত করে থাকে। ( তথ্য সূত্র – উইকিপিডিয়া )

এমনিভাবে ভারতের শিক্ষক দিবসের প্রেক্ষাপট স্মরণ করা যেতে পারে-

১৯৬২ সালের ৫ই অক্টোবর থেকে প্রতি বছর পালন করা হয় শিক্ষক দিবস। ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি, সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্ম তারিখ, রাধাকৃষ্ণণকে জন্মদিনের কথা জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলেন যে, আলাদা ভাবে তাঁর জন্মদিন পালন না করে দেশের সমস্ত শিক্ষকদের জন্য যদি পালন করা হয়- তাহলে তিনি গর্ববোধ করবেন। আর এ দিনটি ‘ সমাজ গঠনে শিক্ষকদের অমূল্য ভূমিকার স্বীকৃতির জন্য নিবেদিত একটি দিন ‘ হবে।  রাধাকৃষ্ণণ-এর এ কথাকে সম্মান দেয়ার জন্যই তাই ১৯৬২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতি বছর পালন করা হয় শিক্ষক দিবস।

তাহলে ধরে নেওয়া যায় – শিক্ষা ও  শিক্ষার্থীদের জীবনে শিক্ষকদের অবদানকে বছরে অন্তত একবার সম্মান ও স্বীকৃতি দেওয়াই বিশ্ব  শিক্ষক দিবসের উদ্দেশ্য। দেশের মানুষকে শিক্ষিত করা, জ্ঞানের আলো ছড়ানো, সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখা ইত্যাদির জন্য শিক্ষকদের প্রশংসা করার জন্য একটা দিন নির্ধারণ করা ।

শিক্ষা ও শিক্ষক একই সমান্তরালের শব্দ তাহলে বিশ্ব  শিক্ষক দিবসের প্রাক্বালে ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসের উক্তি মনে রাখা দরকার।

“শিক্ষা হলো উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ভিত্তিপ্রস্তর। সকলের জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার।  তাহলেই জাতি একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে পরিচালিত হবে। পরিশীলিত ও সম্মিলিত  শিক্ষা সকলকে অনুপ্রাণিত করে, ঐক্যবদ্ধ করে, একটি উজ্জ্বল আগামীদিন গড়ে তুলুক বিশ্ব শিক্ষক দিবস -এ কামনা করি।

কীভাবে শুরু হলো বিশ্ব শিক্ষক দিবস:

১৯৯৩ সালে বিশ্বের ১৬৭টি দেশের ২১০ টি জাতীয় সংগঠনের প্রায় ৩ কোটি বিশ লক্ষ সদস্যদের প্রতিনিধিত্বকারী আন্তর্জাতিক শিক্ষক সংগঠন “এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল” গঠিত হয়, এ আন্তর্জাতিক সংগঠন জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলো কর্তৃক প্রণীত দলিলটি যথাযথ বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করার অর্থবহ উদ্যোগ গ্রহণের জন্য ক্রমাগত অনুরোধ ও আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬ তম অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ইউনেস্কোর মহা-পরিচালক ডঃ ফ্রেডারিক এম মেয়রের যুগান্তকারী ঘোষণার মাধ্যমে ৫ অক্টোবর “বিশ্ব শিক্ষক দিবস” পালনের শুভ সূচনা করা হয়। ( সংগৃহীত )

বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের ক্ষেত্রে এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল( ইআই) ও তার সহযোগী সদস্য সংগঠন মূল ভূমিকা রাখে। এ সব সংগঠনই মূলত এ দিবসটি পালনের ক্ষেত্রে মূখ্য ভূমিকা রাখে। প্রতি বছর একটা প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়, যাতে জনসচেনতা বৃদ্ধি পায় এবং শিক্ষকতা পেশার অবদানকেও স্মরণ করিয়ে দেয়।

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, শিক্ষক হলেন সেই মেরুদণ্ডের স্রষ্টা। সভ্যতার সূচনা লগ্ন থেকেই সমাজ-সভ্যতার বিকাশে শিক্ষকের অবদান অস্বীকার করা যায় না, নৈতিক বিচারে শিক্ষকদের চেয়ে সম্মানিত আর কেউ হতে পারে না, শিক্ষকতার চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পেশাও তাই নেই। কেননা, সমাজে যে যত বড় মহৎ কাজ করুক, যত বড় প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, সে কোনো না কোনো শিক্ষকের কাছে জ্ঞান অর্জন করেছে, জ্ঞানের জন্য কোনো না কোনো শিক্ষকের কাছে ঋণী , প্রত্যক্ষ  বা পরোক্ষভাবে। পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সেই ঋণ  সবাই স্বীকারও করে।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস – আমাদের করণীয়:

শিক্ষকতা পেশার সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নইলে মেধারীরা এখন যেমন আসতে চায় না, ভবিষ্যতেও আসতে চাইবে না।

যে-কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিমা, বিশেষ ঋণ সহায়তা প্রদান করে জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা বিধান করা।  

শ্রেণি অনুযায়ী বেতনকাঠামো নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। যাপিত জীবনের প্রেক্ষাপটে বেতনের মানদণ্ড ও সম্মান সমন্বয় করা।

যে পেশায় মেধারীদের আসার কথা, সেখানে মেধারীরা আসতে চায় না, সেই মেধাবীদের বিমুখ মনোভাব দূর করে মেধারীদের যে-কোনো মূল্যে এ পেশায় ফিরিয়ে আসার ব্যবস্থা করা

শিক্ষকতাকে মহান পেশা বলা হলেও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বর্তমানে এ পেশা অবহেলিত, এ অবহেলার কারণ দূর করা আজ সময়ের দাবি।

বিশ্বব্যাপী আজ স্বীকৃত শিক্ষাখাত সেরা বিনিয়োগের ক্ষেত্র। সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বা দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের জন্য শিক্ষায় বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে মেধারীদের আগ্রহ বাড়িয়ে তাদেরকে এ পেশায় আনতে হবে। ভারতের নোবেল বিজয়ী শিক্ষাবিদ কৈলাশ সত্যার্থী বলছেন, শিক্ষায় ১ ডলার বিনিয়োগ করলে আগামী ২০ বছরের মধ্যে ১৫ গুণ রিটার্ন পাওয়া সম্ভব।

 শিক্ষকতা পেশার অনিশ্চতা ও অনিরাপত্তার জন্য কেউ আসতে চায় না, তবুও এখনো যারা আগ্রহী, তাদের স্বচ্ছ ও যুগোপযোগী মূল্যায় করে এই পেশায় ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তির ভয়াভহ প্রভাবের দিনে শিক্ষকদের আত্মোন্নয়নের বিকল্প নেই। আমাদের দেশে শিক্ষার উন্নয়নে বড় বাধা শিক্ষকের দক্ষতা বৃদ্ধি। শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নে যুগোপযোগী ও বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালার ব্যবস্থা করতে হবে।

শিক্ষককে হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। বৈশ্বিক গতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পারলে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবী প্রতিনিয়ত পাল্টে যাচ্ছে। এ পাল্টানোর সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষকদেরও প্রতিনিয়ত বদলাতে হবে।

সফট স্কিল আত্মস্থ করার বিষয়, অর্জনের বিষয়, অনুভবের বিষয় – যে-কোনো পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে। শিক্ষকের সফট স্কিল ছাড়া বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা অসম্ভব। এর জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রযুক্তিজ্ঞান, ভাষার দক্ষতা আর ক্রমাগত পেশাদারিত্ব।

শিক্ষক-সংকট ও শিক্ষক-বাহুল্যতা সমন্বয় করে সুষম পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। কোথাও শিক্ষক সংকট আবার কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিক্ষক ( শিক্ষার্থীদের তুলনায়) ।

প্রমোশন জটে ফেলে শিক্ষকদের মনোবল দুর্বল করা যাবে না। মনঃস্বাস্থ্য ছাড়া সঠিক পাঠদান দুঃসাধ্য। প্রমোশন, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড শিক্ষকদের কাজের গতি বৃদ্ধি করে।

শিক্ষার্থীদের জীবনের শিক্ষার ভিত্তি হলো প্রাথমিক স্তর। প্রাথমিক স্তর থেকে সুষ্ঠুভাবে শেখন প্রক্রিয়া সম্পাদিত হলে,  এ স্তরে যোগ্য ও যথাযথ দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষক না থাকলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা স্তরের প্রাথমিক সোপান মজবুত হয়। জ্ঞানে ও মানে শক্তিশালী প্রজন্ম হিসেবে গড়ে ওঠে।

প্রাথমিক স্তরে আমাদের দেশে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক-নিয়োগ প্রক্রিয়া সব প্রতিষ্ঠানে নিশ্চিত করতে হবে। একই শিক্ষক দ্বারা সব বিষয় পড়ানোর মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভাব এমন – প্রাথমিক লেবেলে সবাই সবকিছু পড়াতে পারে। একই শিক্ষক বাংলা, ইংরেজি, সমাজ, বিজ্ঞান ও গণিত পড়াচ্ছেন। শিক্ষার মান ‍ুউন্নয়নে এটি একটা বড় চ্যালেঞ্জ বলেই মনে হয়।

প্রাথমিক স্তর থেকে ভাষার দক্ষতা ও গাঁথুনি ভালো না হলে শিশু মনের ভাব প্রকাশে দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। মনের ভাব ও ভাষার সামঞ্জস্যহীন শিশু কখনোই প্রকৃত মানুষ হতে পারে না। দেহ-মনে বড় হয়, কিন্তু বড্ড যান্ত্রিক হয়ে দেহ-মনে বড় হয়। শিক্ষার প্রতিটি স্তরেই ভাষা-শিক্ষার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। দক্ষ শিক্ষক ও উপযুক্ত পাঠ্যসূচি নিশ্চিত করতে হবে।

কাজের স্বীকৃতি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে অসংখ্য প্রতিকূল অবস্থা মোকাবেলা করে শিক্ষক-সমাজ শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছে। শিক্ষকদের কাজের স্বীকৃতি দিলে তারা অনুপ্রাণিত হয়ে কাজে আরও উৎসাহ বোধ করবে। আশার কথা, বাংলাদেশে সরকার শিক্ষকদের সম্মানিত করতে, শিক্ষকদের কাজের স্বীকৃতি দিতে, সমাজে তাদের অবদানকে ছড়িতে দিতে সরকারিভাবে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন নীতিমালা ২০২৫ প্রণয়ন করেছে। এখন থেকে সরকারিভাবে এ দিনটি পালিত হবে। দিবসটি সরকারিভাবে পালিত হলে শিক্ষকরা নিজেদের সম্মানিত বোধ করবেন এবং এটি তাদের জন্য একটা বড় প্রণোদনা।

কোনো সন্দেহ নেই, শিক্ষকতা একটি আদর্শ  ও গুরুত্বপূর্ণ পেশা। শিক্ষা-উন্নয়নে ও জাতি গঠনে শিক্ষকের অবদান অনস্বীকার্য। জাতি গঠন ও শিক্ষার উন্নয়নে শিক্ষকগণ যাতে নির্বিঘ্নে তাদের শিখন প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারে সেদিকে আমাদের সবারই দৃষ্টি দেওয়া দরকার। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের উপর হামলা ও অপমান দেখে শঙ্কিত হই।

আবার পাশাপাশি কিছু শিক্ষকের নৈতিক ও আদর্শিক বিচ্যূতি এবং ব্যবসায়িক মনোভাব আমাদের ব্যথিত করে। জাতি গড়ার কারিগরের এমন প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে মনে ভাবনার উদয় হয়। শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে শিক্ষকতা পেশার মূল্যায়ন ও শিক্ষকদের মানোন্নয়নের বিকল্প নেই।

ছাত্রজীবনে ও প্রায় চল্লিশ বছরের শিক্ষকতা জীবনে  “শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড”—এই অমোঘ সত্যটি বহুবার শুনেছি।  এ  মেরুদণ্ড গড়ে তোলার গুরু দায়িত্ব যার ঘাড়ে তিনি হলেন শিক্ষক। একজন শিক্ষক তাঁর জ্ঞান, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ দিয়ে একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলেন। শিক্ষকের কাছে একটি ছাত্র  শুধু বইয়ের অক্ষর শেখে না, শেখে যাপিতজীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ  জীবনের দর্শন, মানবিকতা এবং দায়িত্ববোধ। শিক্ষক ঠিক তো, ছাত্র ঠিক, ছাত্র ঠিক তো জাতির ভবিষ্যৎ ঠিক, একটি জাতি হয় শক্তিশালী, জ্ঞানসমৃদ্ধ এবং উন্নয়নের পথে অগ্রসর।

বিশ্বে উন্নয়নের জন্য  জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ণয়ে   মানসম্মত শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে,  যা সরাসরি শিক্ষকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কারণ, মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষক হলেন আলোর মশাল, একটা মোমবাতি, একটা প্রদীপ- নিজে জ্বলে জ্বলে  নিঃশেষ করে অন্যের ঘরে,জীবনে, মনে আলো দিয়ে আলোকিত করেন।

  “A great teacher is like a candle. It consumes itself to light the way for others.”

অর্থাৎ, একজন শিক্ষক মোমবাতির মতো, যিনি নিজেকে নিঃশেষ করে অন্যের পথ আলোকিত করেন।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস – শিক্ষকদের বাস্তবতা ও আর্থিক চাপ:

সত্যিই দুঃখজনক, বাংলাদেশের শিক্ষকদের আর্থিক দৈন্য রয়েছে। সরকারি, বেসরকারি, এমপিও, নন-এমপিও, ব্যক্তিমালিকানা, কিন্ডারগার্ডেন নানা ধরনের শিক্ষক রয়েছে, রয়েছে বেতনের পাহাড়সম বৈষম্য। অথচ, কাজ সকলেরই এক। পরিবারের চাপ, সামাজিকতা, লৌকিকতা সব মিলে নাভিশ্বাস ওঠে শিক্ষকদের।  অনেক শিক্ষক ব্যাংক ঋণে জর্জরিত।

এই অর্থনৈতিক চাপ শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে, যা শিক্ষাদানের মানকেও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে। মনে পড়ে, কবি আশরাফ সিদ্দিকী রচিত “তালেব মাস্টার” কবিতার সারমর্ম, সৈয়দ মুজতবা আলীর পাদটীকা গল্পের। পঁচিশ টাকা বেতনের পণ্ডিতের বেতন মাসিক পঁচাত্তর টাকা খরচের তিন ঠ্যাং কুকুরের কয় ঠ্যাঙের সমান- আজও সমস্ত গণিতের শিক্ষকেরা সমাধানে আসতে পারেনি।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কথা বলতে গেলে হিসেব মেলে না। রাষ্ট্রের সব কাজের ক্ষেত্রে তারা সব্যসাচী। রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের যাতাকলে পিষ্ট এ সব শিক্ষকের সমস্যা রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। তাদের বেতন কাঠামো যে কোন গ্রেডের, কেন সেই গ্রেডের তাও এক মহা বিস্ময়। এক সময় এসএসসি পাশের নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকের পাশাপাশি এখন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েও তাদের সেই গ্রেডহীন আকাল গেল না।

সকাল ৯টায় বিদ্যালয়ে উপস্থিত হওয়া, বিদ্যালয় পরিষ্কার রাখা, ঘণ্টা বাজানো, প্রশাসনিক কাজ করা, আবার শ্রেণি পরিচালনা… যে বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে, সেখানে তো কাজের পরিমাণ আরও দ্বিগুণ। নিয়মিতই আসছে নতুন নতুন পরিপত্র। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪:১৫ পর্যন্ত রুটিন! আছে ক্লাস্টার মিটিং, নানা জরিফ। তারপরও দেশের হাজার হাজার  শিক্ষক দেশের জন্য সমাজের জন্য নীরবে আত্মত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত হয়ে নিরলস শিক্ষা দিয়ে চলেছে। এখানেই এ পেশার মহানত্ব। 

শিক্ষামন্ত্রণালয়, বেইনবেস, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষকনিয়োগে সমস্বয়হীনতা শিক্ষকদের চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে ওঠে অনেক সময়। ডিগ্রি ও অনার্স পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগ না দিলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয় না। প্রচলিত জনবলকাঠামোর বাইরে নিয়োগ দিতে বলে।  আবার শিক্ষামন্ত্রণালয় বা বেইনবেজ জনবলকাঠামোর বাইরের শিক্ষকদের বেতন বা এমপিওভূক্ত করে না।

গভনিং বডি বা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি প্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন বিষয় বা বিভাগ চালু করতে যতটা আগ্রহী , শিক্ষকদের বেতন প্রদানে ততটাই অনাগ্রহী। নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুদান নিয়ে কর্তৃপক্ষ চুপচাপ হয়ে যায়। বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত শিক্ষিত যুবকেরা বছরের পর বছর বেতনহীন অবস্থায় চাকরি করে চলে। না পারে ছেড়ে যেতে, না পারে সইতে। আবার মাঝে মাঝে সরকারিভাবে বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আশার আলোর ঝলকানি দেখতে পেয়ে আশায় বুক বেঁধে ওঠে।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস – এ তাদের প্রতি রইল সহানুভূতি।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে সরকারি নীতিমালা

জানা গেছে, প্রতিবছর ইউনেস্কো ঘোষিত নীতিমালা অনুযায়ী বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপন, জাতি গঠনে ভূমিকা ও অবদান সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়ার জন্য সব শিক্ষককে সম্মানিত করা হবে। 

এ লক্ষ্যে নীতিমালা প্রস্তুত করে তা প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে এ নীতিমালা প্রকাশ করা হয়েছে। যার শিরোনাম: এই নীতিমালা “বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপন নীতিমালা ২০২৫” 

এবং  অধিক্ষেত্র: দেশের সকল উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে এই নীতিমালার আলোকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হবে।   স্মারক নম্বর-৩৭.০০.০০০০.০৬২.০৪.০০১.২৩ (অংশ-১)-২৭৬ তারিখ: ২১ আগস্ট ২০২৫

বিশ্ব শিক্ষক দিবস নীতিমালার  উদ্দেশ্য: এ নীতিমালার ৪ ধারায় বলা হয়েছে –

১.  সারাবিশ্বের সাথে একাত্ম হয়ে প্রতিবছর ইউনেস্কো কর্তৃক ঘোষিত প্রতিপাদ্য অনুযায়ী বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপন করা;

২. জাতি গঠনে শিক্ষকের ভূমিকা ও অবদান সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া;

৩. গুণী শিক্ষক সম্মাননা প্রদানের মাধ্যমে সকল শিক্ষককে সম্মানিত করা।

জাতি গঠনে শিক্ষকের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁদের সম্মাননা জানানোর মাধ্যমে সকল শিক্ষককে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে সারা বিশ্বের সাথে সঙ্গতি রেখে প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপনের জন্য এ নীতিমালা।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস ও ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য

২০২৫ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য হলো — “শিক্ষকতাকে একটি সহযোগী পেশা হিসেবে পুনর্গঠন”

বাংলাদেশের চলমান শিক্ষা ও শিক্ষা-উন্নয়নের  প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ।  শিক্ষকদের পরস্পর  বিচ্ছিন্নতা নয়,   তাঁদের পারস্পরিক সম্মিলিত সহযোগিতায় রূপান্তরিত করা এখন সময়ের দাবি।  কারণ, একদল অনুপ্রাণিত ও সহযোগী শিক্ষকই পারেন একটি প্রজন্মকে গড়ে তুলতে। সকল লক্ষিত জন, গোষ্ঠী, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান একই বৃন্তে আসবে শিক্ষকের পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাবে আর তাঁদের জ্ঞানের প্রজ্ঞায়।

 বর্তমানে দুইটি প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষকদের কাজ করতে হচ্ছে।

                 জেন-জি (জন্ম: ১৯৯৭–২০১২)

                আলফা প্রজন্ম (জন্ম: ২০১৩–বর্তমান)

এই প্রজন্ম বড়ই হচ্ছে প্রযুক্তির সঙ্গে । ফলে, তাদের শেখাতে হলে শিক্ষকদের প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন অপরিহার্য। গুণী শিক্ষক বাছাই এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার গুরুত্ব দিয়েই এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবস নীতিমালা -২০২৫ কাজ করছে।

 এ বছরের বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৫-এর প্রতিপাদ্য  ‘শিক্ষকতাকে একটি সহযোগী পেশা হিসেবে পুনর্গঠন’—যা শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সহযোগিতার রূপান্তরমূলক সম্ভাবনা তুলে ধরে

বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ  ও  প্রতিপাদ্য বিষয় : এ বছরের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের মূল সুর হলো শিক্ষকদের বিচ্ছিন্নতা থেকে বের করে এনে একটি সহযোগী ও সম্মিলিত পেশাগত পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করা।

বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ খুবই কম। একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও প্রায় বিচ্ছিন্ন থাকেন,  এককভাবে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন। তাঁদের পেশাগত উন্নয়ন, মানসিক সুস্থতা কিংবা পাঠদান পদ্ধতির আধুনিকায়নে সহকর্মী, পরামর্শদাতা বা স্কুল নেতাদের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত।

এই বিচ্ছিন্নতা  শিক্ষার মানের ওপর প্রভাব ফেলে, পারস্পরিক জ্ঞানের আদান-প্রদানের অভাবে জ্ঞানের বিকাশ ঘটে না। ফলে আন্তসম্পর্কহীন সৌহার্দশূন্য পরিবেশে  শিক্ষকদের পেশায় ধরে রাখার ক্ষেত্রেও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। ২০২৫ সালের এই দিবসের লক্ষ্য হলো শিক্ষাদানকে এমন একটি পেশা হিসেবে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা, যেখানে পারস্পরিক সমর্থন, জ্ঞানের আদান-প্রদান এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধকে উৎসাহিত করা হবে।

প্রতিপাদ্যটির প্রাসঙ্গিকতা :

বাংলাদেশের জন্য ২০২৫ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্যটি বিশেষভাবে অর্থবহ। বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রবর্তিত পাঠক্রম বাস্তবায়নে সমস্ত অংশীজনদের পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া সফলতা সম্ভব নয়।  সবচেয় বড় কথা  দেশের শিক্ষাক্রমের সাফল্য বহুলাংশে নির্ভর করে শিক্ষকদের পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর। এই ব্যবস্থায় শিক্ষকরা শুধু জ্ঞানদাতা নন, বরং সহায়ক।

 শিক্ষাক্রমের বেশির ভাগ কাজ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক। এখানে দলগত কাজ, প্রজেক্টভিত্তিক শিখন এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত, যা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে শিক্ষকদের মধ্যে নিবিড় বোঝাপড়া ও সহযোগিতা অপরিহার্য।

শিশুর মানসিক বিকাশে দরকার ভাষাচর্চা, বিজ্ঞানচর্চা, শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চা। আর সবই বাস্তবায়িত হয় একজন শিক্ষকের সমন্বয়ে। ফলে শিক্ষক যদি চর্চার সম্প্রদায় না গড়ে তোলেন, তাহলে তারা পরস্পর জ্ঞানের আদান-প্রদান করতে পারবেন না। রিসোর্স শেয়ার করতে পারবেন না। চর্চা সম্প্রদায় গড়ে তুললে যে-কোনো সমস্যা সম্মিলিতভাবে সমাধান করতে পারবেন। এই সহযোগী মনোভাবই নতুন শিক্ষাক্রমের মূলশক্তি।

শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকদের যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে, সেখানে শুধু জ্ঞান বিতরণ নয়, বরং শিক্ষকদের মধ্যে সহযোগিতামূলক মানসিকতা তৈরির চেষ্টা চলছে। কেননা, নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের সফলতা নির্ভর করছে এই পারস্পরিক সহযোগিতামূলক মনোভাব।

শিক্ষকদের সহযোগী পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ

 ১. প্রতিষ্ঠানগত বিচ্ছিন্নতা : অনেক স্কুলে শিক্ষকদের মধ্যে সহযোগিতার কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামো নেই। যার যার বিষয় নিয়েই ব্যস্ত থাকে। সহযোগিতার সুযোগ নেই অথবা মানসিকতার অভাব। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কর্তৃপক্ষ যদি সপ্তাহে বা মাসে একবার শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয় সভা করেন তাহলে এ সমস্যা দূর হতে পারে।

২. সময়ের অভাব : পাঠদান এবং প্রশাসনিক কাজের চাপে শিক্ষকরা একে অপরের সঙ্গে পেশাগত আলোচনার জন্য পর্যাপ্ত সময় পান না। শিক্ষকদের পেশাগত চাপ কমিয়ে তাদের পেশাদারিত্ব বৃদ্ধির সুযোগ করে দিতে হবে।

৩. মেন্টরশিপের অভাব : অভিজ্ঞ শিক্ষকদের কাছ থেকে নতুন শিক্ষকরা শেখার বা পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ পায় না। নতুন পরিবেশে সিনিয়রদের কাছ থেকে অসহযোগিতার মনোভাবের কারণে বা প্রয়োজনীয় সমর্থন ও পরামর্শের অভাবে  কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করে। এ সমস্যা দূরীকরণে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বা ক্লাস্টারভিত্তিক মেন্টরশিপ চালু করতে হবে।

প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার : এখন প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তি জ্ঞানকে বা ব্যক্তিকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে।  অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষকরা নিজেদের মধ্যে নেটওয়ার্ক তৈরি করে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারেন।

সরকারি সহায়তা : সরকারিভাবে  শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে সহযোগিতামূলক কার্যক্রমকে আরো গুরুত্ব দেওয়া এবং উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষকদের জন্য জ্ঞান বিনিময়ের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে।

পেশা নয়, নেশা:

আমি নিজে একটি শিক্ষক পরিবারে জন্মেছি। আমার বাবা শিক্ষক, চাচারা শিক্ষক, চাচাতো ভাই-বোন শিক্ষক, আমরা আট ভাই-বোন শিক্ষক। আমার নিজের সহধর্মিনী শিক্ষক, যার মেয়ে নিয়েছি তিনিও শিক্ষক।  শিক্ষকদের জীবনযাত্রা ও সংগ্রাম আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, শিক্ষকদের মর্মকথা আমার চেয়ে আর কেউ বেশি জানে না।

পূর্বপুরুষ , বর্তমান পুরুষ শিক্ষক হওয়াতে মনে-প্রাণে কখন যেন শিক্ষক হওয়াটাই আমার জন্মগত প্রাপ্যতা আত্মস্থ করে ফেলেছি। ফলে, শিক্ষকতা পেশা হলেও পেশাদারিত্বের পাশাপাশি এ কাজকে একটা ব্রত বা নেশা হিসেবে নিয়ে ফেলেছি। আমার পরিবারে এমন এক আদর্শ ও মহান শিক্ষক ছিলেন, যাঁর মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানের দাবিতে, এলাকার মানুষের ভালোবাসার দাবিতে তাঁকে সেই প্রতিষ্ঠানের গ্রাউন্ডে কবরস্থ করতে হয়েছে, পারিবারিক দাবি সেখানে ঠাঁই পায়নি। আমার আদর্শিক স্থানে সেই মুখখানি আাঁকা ছিল।

ফলে, যতদূর পেরেছি সেই আদর্শকে আদর্শ মেনে জনসাধারণের কাছে না হোক শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে একটুখানি জায়গা খুঁতে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছি, জানি না কতখানি সফল হয়েছি, আমার শিক্ষার্থীরা জানে। তবে আমার আত্মতৃপ্তি আছে, আমার সক্ষমতার পরিপূর্ণটা দিতে কোনো ত্রটি নেই। এ পেশার প্রতি আমার  ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা, অন্য কোনো শিক্ষক বা অন্য কোনো পেশার মানুষ বুঝবেন না।

মনে পড়ে যায় কবি কাদের নেওয়াজ রচিত কালজয়ী “শিক্ষাগুরুর মর্যাদা” কবিতাটি।

তিনি লিখেছিলেন—

বিশ্ব শিক্ষক দিবস : আমাদের করণীয়

মনে পড়ে আমার আমি হয়ে ওঠার পেছনে আমার সেই শিক্ষাগুরুদের কথা। তাঁদের সেই আত্মত্যাগ ও মহানুভবতার ছোঁয়া যা আমাকে বড় হয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল, তখন না জানলেও এখন মহাবিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। বেসরকারি হাই স্কুলের অনুদান ( উল্লেখ করে সেই মহান আত্মাদের অবমাননা না করি) তিন মাস পর পর পেতেন। সেই যৎসামান্য অনুদানে কীভাবে তাঁরা হাসিমুখে শিক্ষার গুরুদায়িত্ব পালন করে গেছেন। ধর্মঘট করেছেন কি না বলতে পারব না, অভিযোগ করেছেন কি না বলতে পারব না। তাঁরা অনুস্মরণীয়, এক একজন প্রতিষ্ঠান হয়ে গেছেন অন্যের কাছে। ঋণী তাঁদের কাছে সমাজ ও রাষ্ট্র, ঋণী আমিও, যা কখনো শোধ করা যাবে না। তবে দায়বদ্ধতা থেকে যা করার তা করে গেছি।

অন্তরের অন্তঃস্তল থেকে তাঁদের প্রতি রইল কোটি কোটি প্রণাম, সেইসাথে বিশ্বের সকল শিক্ষকের প্রতি।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *