৩টি দৃষ্টিকোণ থেকে মীর মশাররফ হোসেনের শ্রেষ্ঠ কৃতির সাহিত্যিক মূল্যায়ন

বিষাদসিন্ধু: মীর মশাররফ হোসেনের (১৮৪৭-১৯১২) ‘বিষাদসিন্ধু’ (১৮৮৫, ১৮৮৭, ১৮৯১) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অত্যন্ত জনপ্রিয় গ্রন্থ। এ গ্রন্থই মীর মশাররফ হোসেনকে কালজয়ী করেছে। কারবালার বিষাদময় ঐতিহাসিক ধর্মীয় কাহিনি অবলম্বনে গ্রন্থটি রচিত বলে এর প্রকৃতি নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। ধর্মীয় কাহিনির জন্য এটি ধর্মীয় গ্রন্থ, ঐতিহাসিক ঘটনার জন্য ইতিহাস বলে মনে হতে পারে, সরস গদ্য, বিকাশমান চরিত্র ও বিষাদময় কাহিনীর জন্য এটি উপন্যাসের স্বাদযুক্ত, আবার ভাষার ওজস্বীতা, গভীর ট্র্যাজেডি, অসংখ্য চরিত্র, বিশালাকার কাহিনির কারণে গদ্য মহাকাব্যের গুণও রয়েছে।

কারবালার বিষাদময় কাহিনরি জন্য অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত মুসলমান এ গ্রন্থ পাঠে ধর্মীয় অনুভূতি পেলেও কোরআন হাদিস যে অর্থে ধর্মীয় গ্রন্থ, বিষাদসিন্ধু তা নয়। লেখক কোনো ধর্মীয় তত্ত্ব বা ধর্মীয় কাহিনিও ব্যাখ্যা করেন নি। বরং শিল্পীর সংবেদনশীল মন নিয়ে এখানে এজিদের হৃদয় বেদনাকে প্রকাশ করেছেন।

ঐতিহাসিকতা বিচার

‘বিষাদসিন্ধু’র ঘটনা ও চরিত্রের প্রায় সবই ঐতিহাসিক। তবে প্রসিদ্ধ আরবি ঐতিহাসিক তাবারী, মাসুদী, হিট্টি, মুইর, আমীর আলী প্রমূখের ইতিহাস গ্রন্থে বর্ণিত ইতিহাসের সাথে বিষাদসিন্ধুতে বর্ণিত ইতিহাস ও চরিত্রের পার্থক্য অনেক। জাএদা সম্পর্কে ইতিহাস নীরব।

ইতিহাসে দেখা যায় হোসেন ও এজিদের বিরোধ রাজনৈতিক (রাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের), কিন্তু গ্রন্থের বিরোধ প্রণয়ে। হোসেনের ছিন্ন মস্তক থেকে প্রবাহিত রক্তের ধারায় আরবি হরফে এজিদের পরিণাম লিখিত হওয়া, খন্ডিত মস্তক আকাশে উড়ে যাওয়া, পতন, সমাধিস্থ হওয়ার সময় আলী ফাতেমাসহ অন্যান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতি, গাছ থেকে রক্ত বের হওয়া, দুই পাহাড়ের মাঝখানে হানিফার বন্দী হওয়া, কেয়ামত পর্যন্ত গভীর কূপে এজিদের জীবিত থাকা, কাশেমের বাহুর কবজে সখিনাকে বিয়ের নির্দেশ ইত্যাদি ইতিহাস সম্মত নয়। মনে হয় লেখক ইতিহাস অপেক্ষা পূঁথি, কিংবদন্তি ও কাব্যের উপর বেশি নির্ভর করেছেন। এ গ্রন্থে প্রকৃত ইতিহাস অপেক্ষা কল্পনা প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে ‘বিষাদসিন্ধু’ ইতিহাস নয়।

মহাকব্যিক রূপ

বিষাদসিন্ধুকে অনেকে গদ্য মহাকাব্য বলতে চেয়েছেন, এ গ্রন্থের পটভূমি বিশাল। সংঘর্ষ ব্যক্তিক নয়, দুই রাজার, বহু চরিত্র এ সংঘর্ষের সাথে জড়িত, সবকিছু আবর্তিত হয়েছে একটি নারীকে কেন্দ্র করে। এ যেন ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ ও ‘ইলিয়াড’- এর স্বগোত্রীয়। লেখক নিজেও ‘এজিদ বধ’ পর্বের শেষ দিকে একে মহাকাব্য হিসেবে উলে­খ করেছেন। ভাষা ও ছন্দের দিক থেকেও মহাকাব্যিক গুণ বর্তমান। তবুও শেষ পর্যন্ত এটি প্রকৃত গদ্য মহাকাব্য হয়ে উঠে নি।


উপন্যাসের সমস্ত গুণই বিষাদসিন্ধুর মধ্যে রয়েছে। তাহলে এটি যথার্থ উপন্যাস, না ঐতিহাসিক উপন্যাস তা বিচার করে দেখা যেতে পারে।

কাহিনির বিন্যাস

মহরম, উদ্ধার ও এজিদ বধ- এ তিনটি পর্বে ঘটনাগুলো যেভাবে সজ্জিত হয়েছে, তাতে উপন্যাসের উপযুক্ত নিটোল কাহিনী হয়ে উঠেছে। নাটকীয় ভঙ্গিতে চরিত্রগুলো নড়াচড়া করেছে, ঘটনাবলির কার্যকারণ সূত্র সূক্ষ্ণভাবে বিশে­ষিত হয়েছে, যার মধ্যে লেখকের জীবনদর্শনকে পাওয়া যায়। কিছু অলৌকিক ও অবাস্তব চরিত্র থাকা সত্ত্বেও এমন কিছু মানবিক গুণসম্পন্ন চরিত্র এ গ্রন্থে আছে, যা গ্রন্থটিকে কেবল উপন্যাস হিসেবেই নয়, বরং বিশ্ব সাহিত্যে মর্যাদার স্থান করে দিয়েছে। আবার আগে উল্লিখিত অলৌকিক ঘটনা, ভবিষ্যৎ বাণীর মাধ্যমে গ্রন্থের শুরু হওয়া এবং সে অনুযায়ী গ্রন্থের সমাপ্তির কারণে অনেকেই এ গ্রন্থকে উপন্যাস বলতে দ্বিধান্বিত।

তবে এ প্রসঙ্গে বলা যায় যে, বঙ্কিম চন্দ্রের (১৮৩৮-১৮৯৪) উপন্যাসেও অলৌকিকতা রয়েছে, তাতে দোষ নেই, কেননা তা শিল্পসম্মত। বিষাদসিন্ধুর মধ্যে যে অলৌকিক বিশ্বাস তা সে সময়ের মুসলমানের মজ্জাগত। আজও সে বিশ্বাস অটুটু। সীমার সম্পর্কিত বিশ্বাসও বদ্ধমূল রয়েছে। বরং শিল্পীর শিল্পসম্মত ব্যবহারে তা গ্রন্থটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। আরবীয় ঐতিহ্যে তার সমর্থনও মেলে।

লেখকের অভিপ্রা


মীর মশাররফ হোসেন সজ্ঞানে উপন্যাস রচনা করতে চেয়েছিলেন। কারবালার প্রকৃত ইতিহাস লেখক যে জানতেন না, তা নয়। তবুও কারবালার প্রকৃত ইতিহাস অনুসরণ না করে বিভিন্ন কিংবদন্তিমূলক উপাখ্যান বা পুঁথি সাহিত্যকে অনুসরণ করেছেন। ফলে ‘বিষাদসিন্ধু’ যথার্থ উপন্যাস হয়ে উঠতে পারে নি। মিশ্রজাতীয় উপন্যাস হয়ে উঠেছে। হাসানের মৃত্যু পর্যন্ত যে মানবতা, বাস্তবতা ও শিল্প কৌশলের পরিচয় পাওয়া যায়, বাকি অংশে তার প্রকাশ নিতান্তই বিচ্ছিন্ন ও আকষ্মিক। কাহিনী শিথিল, চরিত্র বর্ণনামূলক এবং আবেগধর্মী। এজিদ, মাবিয়া, জাএদা ইত্যাদির মতো সার্থক চরিত্র শেষের দিকে পাওয়া যায় না। তারপরেও কাহিনী, চরিত্র, নাটকীয়তা, উপযুক্ত গদ্যভাষা, শিল্পীর জীবনবোধ, আধুনিক উপন্যাসের লক্ষণ ইত্যাদি বিচারে এটি উপন্যাসই।

প্রকৃত ইতিহাস অনুসরণ করা হয় নি বলে ঐতিহাসিক উপন্যাসও হয় নি। ইতিহাসের রাজনৈতিক বিরোধকে উপেক্ষা করে প্রেমের বিরোধকে বড় করে দেখা হয়েছে। ইতিহাসের চেয়ে মানবিকতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রূপজমোহ, সপত্নীবাদ ইত্যাদি সামাজিক সমস্যার আবর্তে চরিত্রগুলো ঘুরপাক খেয়েছে, ইতিহাসকে প্রতিষ্ঠা করতে তারা ছুটে নি।

লেখক প্রকৃত ইতিহাস অনুসরণ না করে কারবালা সংক্রান্ত কিংবদন্তিমূলক পুঁথির বেদনাকে মুসলমানদের জাতীয় বেদনা হিসেবে পরিচিত করতে চেয়েছেন। মুসলমানদের এ জাতীয় বেদনাকে গভীরতা দেবার এবং সুদূর প্রসারি করে তোলার জন্যই তিনি বিষাদের সমুদ্র সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। তাই মহরম সম্পর্কিত প্রচলিত গালগল্প, এবং পূঁথি কাহিনীগুলো থেকে বিষাদময় ঘটনা ও কাহিনী আহরণ করে তিনি তাঁর বিষাদসিন্ধুর শ্রী ও সম্পদ বৃদ্ধি করেছেন। ঘটনা ও চরিত্রের সাথে লেখকের মনের মাধুরী মিশে বিষাদসিন্ধুকে রোমাণ্টিক মনোবৃত্তিসম্পন্ন, সুলভ রসঘন এক সংকর সৃষ্টিতে পরিণত করেছে, আদর্শ ঐতিহাসিক উপন্যাস হতে দেয় নি।

‘বিষাদসিন্ধু’ গ্রন্থের প্রকৃতি সম্পর্কে মুহম্মদ আব্দুল হাই উক্ত গ্রন্থের বিবিধ গুণ লক্ষ্য করে বলেছেন-

“ ‘বিষাদসিন্ধু’ খাঁটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়, জীবনচরিতও নয়, তেমনি আঁটঘাট বাঁধা, বিধিবদ্ধ ঙৎমধহরপ চষড়ঃ এর উপন্যাস নয়। এ ইতিহাস, উপন্যাস, সৃষ্টিধর্মী রচনা ও নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের সর্ববিধ সংমিশ্রণে রোমাণ্টিক আবেগ মাখানো এক সংকর সৃষ্টি।”

যথার্থ উপন্যাসের রস ক্ষুণ্ন হলেও শিল্প ও সাহিত্য সৃষ্টি হিসেবে ‘বিষাদসিন্ধু’ বাংলা সাহিত্যে এক অভিনব ও একক সৃষ্টি রূপে পরিগণিত হয়েছে। লেখকের চবৎংড়হধষ জবভষবপঃরড়হ এর জন্য ‘বিষাদসিন্ধু’র কলেবর যেমন বেড়েছে, তেমনি এ উপন্যাসের ভিতরে ভিতরে বহু মননশীল সৃষ্টিধর্মী রচনারও সৃষ্টি হয়েছে। এ সৃষ্টিধর্মী মননশীল রচনার জন্যই ‘বিষাদসিন্ধু’ গদ্যকাব্যের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। এটি একাধারে ইতিহাস আশ্রিত রোমাণ্টিক উপন্যাস ও গদ্য মহাকাব্য।

‘বিষাদসিন্ধু’র বাংলা গদ্য শব্দবন্ধে ও ছন্দস্পন্দে নদীর খরস্রোতের মত দ্রুত প্রবাহিত হয়ে গেছে। ‘বিষাদসিন্ধু’ শুধু বিষাদের সিন্ধু নয়, সার্বজনীন অনুভূতিতে, শাশ্বত সত্যের প্রকাশে এবং গৌরবময় প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের স্বাদ-গন্ধসহ এক ক্লাসিক রূপেই ভাস্বর হয়ে উঠেছে। ভাষার উর্মিমূখর তরঙ্গোচ্ছ্বাসের মধ্যেই লেখকের সাহিত্যিক প্রতিভারও যথাযথ বিকাশ ঘটেছে।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন,

অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ,

সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *