বিষাদসিন্ধু: মানবিক বেদনার এক মহাকাব্যিক কাব্যরূপ
বিষাদসিন্ধুর রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২) বাংলা সাহিত্যে এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর রচিত বিষাদসিন্ধু বাংলা সাহিত্যে অবিস্মরণীয় উপন্যাস। কারবালার বিষাদময় ঘটনা এ গ্রন্থের মূল উপজীব্য। কাহিনী বিন্যাস, চরিত্রসৃষ্টি, ভাষা, জীবন দর্শন- সবদিক থেকেই লেখক এ গ্রন্থে চরম সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন।
বিষাদসিন্ধুর পটভূমি
গ্রন্থের উৎস প্রসঙ্গে লেখক বলেছেন- “পারস্য ও আরব্য গ্রন্থ হইতে মূল ঘটনার সারাংশ লইয়া ‘বিষাদসিন্ধু’ রচিত হলো।” তবে লেখক উক্ত উৎসের চেয়ে প্রচলিত পুঁথি ও কিংবদন্তি— থেকে কাহিনি বেশি সংগ্রহ করেছেন বলে মনে হয়। কারবালার কাহিনির মধ্যে মানব ভাগ্যের করুণ লীলা খেলা দেখে মধুসূদন মহাকাব্য লেখার প্রেরণা অনুভব করেছিলেন। মশাররফ হোসেনও সেই ধর্মনিরপেক্ষ প্রবল মানবীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ‘বিষাদসিন্ধু’ রচনা করেছিলেন। হাসান-হোসেনের সাথে এজিদের বিরোধ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব মাত্র, একথা ঐতিহাসিক সত্য। বিষাদসিন্ধুতে এই দ্বন্দ্বের মূল কারণ এজিদের অনিবার্য রূপতৃষ্ণা।
(আলোচনা শুনতে নিচে ক্লিক করতে হবে)
বিষাদসিন্ধুর উপর সুন্দর আলোচনা।
বিষাদসিন্ধু’তে এজিদের যে রূপতৃষ্ণা, তাকে লেখক নিন্দা করেন নি, বরং শিল্পী মনকে জাগ্রত রেখে অবলোকন করেছেন। এ প্রেমের মধ্যে তিনি নিয়তির খেলা দেখেছেন। তাই, রূপতৃষ্ণায় কাতর হয়ে এজিদ যে রোষবহ্নি জ্বালিয়েছে, তাতে সকল চরিত্রই আত্মাহুতি নিতে বাধ্য হয়েছে। এজিদ ও এজিদের প্রণয় এই মর্মান্তিক ঘটনার উপলক্ষ্য মাত্র। কেননা-
‘যেদিন প্রভু মোহাম্মদ শিষ্যমন্ডলীর মধ্যে উপবেশন করিয়া ধর্মোপদেশ প্রদান করিতেছিলেন, সেই সময় স্বর্গীয় প্রধান জিব্রাইল আসিয়া তাঁহার নিকট কারুণিক পরমেশ্বরের আদেশ বাক্য কহিয়া অন—র্ধান হইলেন।”
ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্ব ধারণা এই ট্র্যাজেডিকে গভীরতা দান করেছে।
বিষাদসিন্ধুর ট্র্যাজেডি জানার পর থেকেই তা এড়িয়ে যাবার কত চেষ্টাই না হয়েছে। কিন্তু এই চেষ্টার প্রতিটি পদক্ষেপ ধ্বংসের অতল গহবরে চলে গেছে। অন্যদিকে এজিদ যে মুহূর্তে সাফল্য পেয়েছে, সে মুহূর্তে সর্বনাশী নিয়তি তাকে গ্রাস করার জন্য ছুটে এসেছে। এজিদের পতনের জন্য দায়ী হানিফা আত্মসংযমে অক্ষম হওয়ায় নিয়তি নির্ধারিত দন্ড লাভ করেছে।
‘বিষাদসিন্ধু’তে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত— মানব ভাগ্যের শোচনীয় পরিণামের কাহিনি ধীরে ধীরে উদঘাটিত হয়েছে। মানব ভাগ্যের এই আবেগময় রূপায়ণের জন্যেই ‘বিষাদসিন্ধু’ মূল্যবান।
মীর মশাররফ হোসেনের মানবপ্রীতি ও শিল্পবোধের কারণে ‘বিষাদসিন্ধু’র ধর্মীয় উদ্দেশ্য গুরুতর রূপে ব্যাহত হয়েছে। গদ্যে লেখা হলেও ভাষায় গীতিময়তা ও নাটকীয়তার একই সাথে সমাবেশ ঘটেছে।
হাসান ও হোসেনের নির্ধারিত করুণ পরিণতি বর্ণনা করার জন্যই লেখক এত পরিশ্রম করেছেন। তবে লেখকের মনোভাব আরো সুন্দর হতো যদি কথা অতিরিক্ত দীর্ঘায়িত না করতেন। ক্রমান্বয়ে তরঙ্গের ন্যায় কাহিনী এগিয়ে গেছে। কখনো নাটকীয়তা সৃষ্টি হয়েছে।
মাবিয়া হযরতের (সঃ) এর বিশেষ অনুসারী। তিনি কখনো চান নি তার ঔরসজাত সন—ান হাসান-হোসেনের মৃত্যুর কারণ হোক। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন চিরকুমার থাকবেন। কিন্তু তা হলে তো চলবে না। মারিয়া অসুস্থ হলেন এবং লেখক তার নিরাময়ের একমাত্র ঔষধ দিয়েছেন স্ত্রী সহবাস। কাহিনী গতি পেয়েছে এবং নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়েছে। মাবিয়া জীবন ধারণের তাগিদে সন—ান ধারণে অক্ষম স্ত্রী লোককে বিয়ে করেন। কিন্তু এ বিয়ের ফল নাটকীয় ভাবে নতুন মোড় নিয়েছে। বৃদ্ধা স্ত্রীর গর্ভে এজিদের জন্ম হয়েছে। এজিদের জন্মের পরই হত্যার প্রতিজ্ঞা করেছিল মাবিয়া। কিন্তু এজিদের লাবন্যময় মুখের দিকে তাকিয়ে মাবিয়া সকল প্রতিজ্ঞা ভুলে যান।
ধর্মীয় ভাব ও বিশ্বাস নয়, আসলে এজিদের হৃদয়ের ট্র্যাজেডিকেই অপরূপ করার জন লেখকের এক বিরাট সাধনা ছিল। তাই, বলার মাঝে তিনি গীতিময়তা এনেছেন, একই সাথে নাট্যকৌশল অবলম্বন করেছেন। উপন্যাস রচনা করলেও হৃদয় ছিড়ে যাওয়া দুঃখ-বেদনা মিশ্রিত সংলাপ রচনা করেছেন। যেমন-
“এজিদ তোমার মনের কথা খুলিয়া আমার নিকট বল। অর্থে হউক বা সামর্থ্যে হউক, বুদ্ধি কৌশলে হউক যে কোন প্রকারেই হউক তোমার মনের আশা আমি পূর্ণ করিবই করিব।”
লেখক হৃদয়ের আবেগ দিয়ে বড় যত্ন করে এজিদ চরিত্র অঙ্কন করেছেন। এজিদকে লেখক দুর্বৃত্ত বলে চিহিৃত করেন নি। এজিদ আসলে নিয়তির দুর্বোধ্য স্বেচ্ছাচারিতার শিকার। এজিদ-অন—রের অপ্রতিরোধ্য রূপতৃষ্ণা বিষাদসিন্ধুর কেন্দ্র বিন্দু। লেখকের শিল্পদৃষ্টিতে এজিদ নায়কের মহিমায় উদ্ভাসিত। ইতিহাসের প্রকৃত মরু প্রান—র নয়, এজিদের প্রেমদীর্ণ হৃদয়ই এখানে কারবালায় রূপান—রিত হয়েছে।
লেখক প্রথম থেকেই পাঠক চিত্তকে উপন্যাসের সাথে অন—রঙ্গ যোগসূত্রে আবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন। এই আত্মীয়তার ফলে অতি সহজেই পাঠক স্বয়ং সমগ্র কাহিনীর অংগীভূত হয়ে পড়ে। অতঃপর ঘটনা প্রবাহের বিচিত্র উত্থান-পতন, চরিত্রসমূহের দ্বন্দ্ব, সংযম, জয় পরাজয়ের সাথেই পাঠক চিত্ত সমভাবেই আন্দোলিত হতে থাকে।
ভাষাশৈলী ও সাহিত্যিক মূল্য
গ্রন্থাটির বিশেষ সম্পদ এর ভাষা ঐশ্বর্য। বঙ্কিমীরীতি ও বিদ্যাসাগরী গদ্যের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। শব্দ প্রয়োগে, শব্দ যোজনায়, উপমা-বাগধারার ব্যবহারে, সন্ধি-সমাস যুক্ত বাক্য রচনায়, বাগধারার ব্যবহারে লেখকের অনন্য দক্ষতা লক্ষ্যণীয়। এ গ্রন্থের ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ঠ্য এর সঙ্গীতধর্মীতা। গদ্যভাষার অন—র্লীন সঙ্গীত প্রবাহ গ্রন্থটিকে বহুলাংশে কাব্য সৌন্দর্য দান করেছে। লেখক দক্ষতার সাথে পদসমূহের মধ্যে ধ্বনি সামঞ্চস্য স্থাপন করে গদ্য ভাষায় প্রবহমান ছন্দগীতি সৃষ্টি করেছেন। সঙ্গীতময়তা, ছন্দের সুষম যতি বিন্যাস, ভাষাকে করেছে বেগবান। এ গ্রন্থের শোক শুধু হোসেন পরিবারের নয়, এ শোক সকলের, যুগে যুগে তা প্রবহমান। লেখক তা জানতেন বলেই সতর্কভাবে শব্দ ব্যবহার করেছেন।
বিষয়বস্তুর স্বার্থে নিঃসঙ্কোচে তৎসম শব্দের ব্যবহার, বাক্য রচনায় বৈচিত্র্য সৃষ্টি, বেগ সঞ্চারের প্রয়োজনে পরপর স্বল্প দৈর্ঘ্যরে বাক্য সংযোজন, বিশেষ করে প্রশ্ন বোধক বাক্যের সহায়তায় একটি চিত্রকে জীবন— ও চলমান করে তোলা ইত্যাদি গ্রন্থের সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়। ক্রমবিকশিত ভাবনা কল্পনা বা অনুভূতির বর্ণনায় লেখক ছোট বাক্য থেকে ক্রমদৈর্ঘ্য বাক্য পরপর সংযোজন করেছেন।
বস্তুত ‘বিষাদসিন্ধু’র মূল বিষয়বস্তু ইসলামের ইতিহাস থেকে সংগৃহীত। তবে মূল বিষয়বস্তু ইতিহাস থেকে গৃহীত হলেও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লেখকের কল্পনা, রোমাণ্টিকতা। প্রধান চরিত্রগুলোর উলেখ ইতিহাসে থাকলেও অপ্রধান চরিত্রগুলো নিজস্ব সৃষ্টি। এ ছাড়া মহাকাব্যে যেমন মূল কাহিনীর পাশাপাশি অসংখ্য ঊঢ়রংড়ফব থাকে, তেমনি বিষাদসিন্ধুতেও ছড়িয়ে আছে অসংখ্য শাখা কাহিনী, যা লেখকের কল্পনা থেকে উৎপন্ন। মূলত এখানেই বিষাদসিন্ধুর লেখক মীর মশাররফ হোসেনের সৃষ্টিশীলতার পরিচয়।
বাংলা সাহিত্যে বিষাদসিন্ধুর অবস্থান
পরিশেষে বলা যায়, ‘বিষাদসিন্ধু’ মীর মশাররফ হোসেনের এক অনন্য সৃষ্টি। মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্যে উনিশ শতকের নব জাগ্রত যে জীবনাদশ দেখা গিয়েছিল, বিষাদসিন্ধুতেও তার পরিচর্যা দেখা যায়। উনিশ শতকের মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে মশাররফ হোসেনই প্রথম ধর্মীয় সংস্কারমুক্ত ও অসামপ্রদায়িক সাহিত্যিক হিসেবে আবির্ভূত হন। ‘বিষাদসিন্ধু’ হচ্ছে এর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। সুতরাং, যে দিক থেকেই আলোচনা করা হোক না কেন ‘বিষাদসিন্ধু’ই মীর মশাররফ হোসেনের শ্রেষ্ঠ রচনা।
বাংলা বিভাগ,
সরকারি মাইকেল মধুসূধন কলেজ, যশোর
যারা নিবন্ধন পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা এগুলো সংগ্রহ করতে পারে।