মানবিক আবেদন: বৈষ্ণব পদাবলিতে তত্ত্বের গুরুত্ব থাকলেও তা আর শুধু বৈষ্ণবের গান নেই, চিরন্তন মানবলীলার স্বাক্ষর বহন করে হয়ে গিয়েছে বিশ্বমানবের গান।
বৈষ্ণব পদাবলির সর্বজনীন আবেদন সম্পর্কে লিখ।


বৈষ্ণব পদাবলির মানববিক আবেদন বা প্রেম ও সৌন্দর্য ভাবনার পরিচয়
বৈষ্ণব পদাবলি বৈষ্ণব তত্ত্বের রসভাষ্য। রাধা-কৃষ্ণের রূপকে বৈষ্ণব ভক্তরা জীবাত্মা-পরমাত্মার বিরহ-মিলন নীলা প্রত্যক্ষ করেছেন। তবে, বৈষ্ণব পদাবলি ধর্মীয় আবরণে গড়া সাহিত্য হলেও মধ্যযুগের সাহিত্যের ইতিহাসে বৈষ্ণব পদাবলি গতানুগতিক ধূলি-ধূসর পথে ভিন্ন আমেজ নিয়ে আসে। আধুনিক কালের আগ পর্যন্ত এই একটি মাত্র শাখা বিশ্ব সাহিত্যের পর্যায়ভূক্ত হতে পেরেছে। এ প্রেমলীলা মানবিক চিত্তকে জয় করে অনন্তলোকে যাত্রা করে। বৈষ্ণবকবিতায় রাধা-কৃষ্ণের প্রেম-লীলার মধ্যে সাধারণ নর-নারীর হৃদয় বেদনার অপূর্ব ছবি ফুটে উঠেছে। তাই প্রশ্ন ওঠে”একি শুধু বৈকুণ্ঠের তরেই?”


ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আনন্দাংশের বহিঃপ্রকাশ হলো রাধা। তাদের প্রেমলীলা তাই ভগবানেররই লীলাখেলা। পৌরাণিক এ কাহিনী সাহিত্যের আঙিনায় এসে যুগে যুগে লৌকিক জীবনের সাথে মিশে একাকার হয়ে লৌকিক জীবনের অমর প্রেম-গাঁথা হয়ে গেছে। কবিতার পংক্তি হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের হৃদয়-বার্তার বাহক। চৈতন্যপূর্ণ বৈষ্ণব কবিতার চিত্র মোটামুটি এমনই।
চৈতন্যদেব ও তার শিষ্যারা বৈষ্ণব কবিতার উপরে আধ্যাত্মিকতার প্রলেপ দিয়ে একটা দর্শনের উপর দাঁড় করাতে চেয়েছেন। তবে, প্রচলিত বৈষ্ণব ধর্মে চৈতন্যদেব সহজ মানবীয় প্রেম-সাধনা যোগ করেন। এতে নব প্রাণের সঞ্চার হয়। নবপ্রেমের জোয়ারে উল্লসিত হয়ে বৈষ্ণব কবিতা হয়ে ওঠে সার্বজনীন প্রেম-কীর্তন-নীতির অপূর্ব উদাহরণ।
চৈতন্যপূর্ব যুগে জয়দেব, বিদ্যাপতি ও চন্ডীদাসের হাতে যে প্রেম-ধর্মের উৎকর্ষ লাভ ঘটেছিল, তার সাথে প্রেমের জীবন্ত মূর্তি চৈতন্যদেবের সংস্পর্শ ঘটে। বৈষ্ণব কবিরা এ জীবন্তমূর্তিকে প্রত্যক্ষ করে বা কবি-মানসে রেখে রাধা-কৃষ্ণের অপার্থিব প্রেমগীতিহার রচনা করেন। চৈতন্যপূর্ববর্তী লৌকিক প্রেমভিত্তিক কবিতায়ও বৈষ্ণব ভক্তরা অলৌকিক রূপের প্রলেপ এঁটে দেয়। বৈষ্ণব ভক্তদের মত অনুযায়ী বৈষ্ণব পদাবলিকে সাধারণ নর-নারীর প্রেমরূপে গ্রহণ করা চলে না। তবে, কথা থেকেই যায়।
বৈষ্ণব কবিতা ধর্মমূলক হলেও তার মধ্যে এমন কতকগুলো বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে, যা আমাদের কান্না-হাসি জড়িত সংসারের কথা মনে করিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈষ্ণব পরকীয়া প্রেমের মধ্যে মানব মনের এক নিগূঢ় চেতনভাকে আবিষ্কার করেছেন। তাঁর মতে, মানুষের সমাজ-শৃঙ্খলার খাতিরে যে স্বাধীন প্রেমকে স্বীকার করা সম্ভব হয় নি, ধর্মীয় সাহিত্যের পরকীয়া প্রেম-গীতিতে সেই অস্বীকৃত প্রেমকে প্রকাশ করা হয়েছে। বাস্তব জীবনের অপূর্ণ প্রেমতৃষ্ণাকে আধ্যত্মিকতার প্রলেপে ঢেকে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-
সত্য করে সহ মোরে হে বৈষ্ণব কবি
কোথা তুমি পেয়েছিলে এই প্রেমচ্ছবি,
কোথা তুমি শিখেছিলে এই প্রেমগান,
বিরহ তাপিত। হেরি কাহার নয়ান
রাধিকার অশ্রুআঁখি পড়েছিল মনে?
বৈষ্ণব কবিতা, সোনার তরী কাব্য
সমগ্র পাঠক-সমাজেরই একই প্রশ্ন যে এই অপূর্ব প্রেমের ছবি, গোপন দূরহ অভিসারের রূপক ছরি বৈষ্ণব কবিরা পেলেন কোথায়? জীবনের অভিজ্ঞায় না মিললে শুধু কল্পনার দ্বারা এ রকম জীবন্ত ছবি অঙ্কন করা কখনই সম্ভব নয়। বৈষ্ণব কবিরা দেবতার উদ্দেশ্যে যে প্রেমগীতি উপহার দিয়েছেন, তার মধ্যে সমাজ-সংসারের প্রেমতৃষিত নর-নারীর স্নিগ্ধ সুকুমার মুখচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায়।
বৈষ্ণব কবিতার মধ্যে নায়ক-নায়িকার বাস্তবসম্মত পূর্বরাগ, অনুরাগ, মান-অভিমান, অভিসার, প্রতীক্ষা, বিরহ ইত্যাদির যে-ছবি বৈষ্ণব কবিরা এঁকেছেন, তাতে রক্তমাংসে গড়া প্রাণ-চঞ্চলতায় ভরা নর-নারীর জীবনলীলা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুগের খোলসটুকু ঝেড়ে ফেললে চির মানবের অন্তরের চিত্র বের হয়ে আসে। রাধার যে মানবী প্রতিমা অঙ্কিত হয়েছে, তার মাধ্যমে বৈষ্ণব কবিরা রঙ্গরসে ভরা আধ্যাত্মিক প্রেমের কথা প্রকাশ করেছেন। সেজন্য পাঠক সমাজ বিস্ময় বিমূঢ় চিত্তে রাধার মুখসের আড়ালে জগতের শাশ্বত নারীরই রূপ লক্ষ্য করে।। আমরা যাকে ভালবাসি, তাকেই জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ নিবেদন করি। কাজেই ভালবাসার মধ্যে দিয়ে যদি দেবতার সেবা করা যায়, তাতে দোষ কোথায়? তাই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-
দেবতারে যাহা দিতে পারি, দিই তাই
প্রিয়জনে -প্রিয়জনে যাহা দিতে পাই
তাই দিই দেবতারে, আর পাব কোথা।
দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা।”
বৈষ্ণব কবিতা, সোনার তরী কাব্য
দেবতার উদ্দেশ্যে হৃদয়ের আত্মনিবেদন করতে গিয়ে বৈষ্ণব কবিতার মধ্যে এমন কিছু প্রকাশ ঘটেছে, যার জন্য বাংলা সাহিত্যের পাঠক মাত্রই কিছু কিছু পংক্তিকে নিজের ভাষা বলে স্বীকার করে নিয়েছে। অনুভূতি প্রকাশের গাঢ়তায় ও আন্তরিকতায় বৈষ্ণব কবিতা আর বৈষ্ণবের গান নেই, রাধা-কৃষ্ণের লীলাও নেই, তা চিরন্তন মানব-লীলার স্বাক্ষর বহন করে হয়ে গিয়েছে বিশ্ব মানবের গান, চিরবিরহী হৃদয়ের প্রণয়লীলার গান। যেমন চন্ডীদাসের কবিতায়-
চলে নীল শাড়ি নিঙ্গাড়ি নিঙ্গাড়ি
পরাণ সহিত মোর
সেই হৈতে মোর হিয়া নহে থির
মনমথ জ্বরে ভোর।
অথবা, জ্ঞানদাসের সেই অপূর্ব দুটি পূর্বরাগের উক্তি-
রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর
প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর।
এর ভাব যতই আধ্যাত্মিক হোক না কেন, প্রেমের কবিতা এর চেয়ে স্বচ্ছন্দ এবং সত্য বোধ হয় হতে পারে না। কী অপরূপ সুস্পষ্ট আত্মত্মভাবের প্রকাশ। এমন সরল প্রেম-বেদনার প্রকাশ কবিতায় খুব একটা দেখা যায় না। বৈষ্ণব কবিতার প্রতিটি পংক্তিতেই অনুরণিত হয়েছে এরকম কামনা-বাসনা। এ কামনা অবশ্যই মানবীয়; কবির অন্তরের ছোঁয়া কিছুটা অস্পষ্ট হলেও পাঠকের হৃদয়ে প্রভাব ফেলে। কাব্যালঙ্কারে বা আধ্যাত্মিকতায় কোথাও কোথাও আচ্ছন্ন থাকলেও মানবীয় গুণের বিষয়টি কোথাও বিলুপ্ত হয় নি। তাই, তা সর্বকালের, সবলোকের, সবদেশের চিরবিরহী আত্মার ভাষা হয়ে গেছে। যেমন-
দুহু কোরে দুহু কান্দে বিচ্ছেদ ভাবিয়া।
আধ তিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া।
অথবা,
সই, কেমনে ধরিব হিয়া
আমার বঁধুয়া আন বাড়ি যায়
আমারি আঙিনা দিয়া।
চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, বলরামদাস, লোচনদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাসসহ অন্যান্য কবিদের পদাবলি বিশ্লেষণ করলে যে ভাব ও রূপ পাওয়া যায়, তা একান্তভাবে বৈষ্ণব জগতের নয়, রূপের দিক থেকে কিছুটা বৈষ্ণব জগতের হলেও ভাব স্পষ্ট সহজিয়া সাধনার জগতের। সুনীতিকুমার ও সুকুমার সেনের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায়-
হয়তো বাংলার পুরোনো সহজিয়া সাধনায় বৈষ্ণব এবং সুফী প্রেরণারও রসকে অঙ্গীকার করে নিয়েছে।
তাই পরম সুমহৎ ঘোষণা সহজিয়া চণ্ডীদাসের-
শুনহ মানুষ ভাই সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।
মধ্যযুগের সাহিত্যে মানবতার স্বপক্ষে এত বড় বাণী আর নেই। উক্ত কবিতার সঠিক কাল ও পরিচয় না থাকলেও পদাবলির ধারায় এসেছে যখন, তখন মানবতার পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য উল্লেখ করা যেতে পারে।
বৈষ্ণব কবিতার মূল বিষয় প্রেম। মানবের হোক আর দেবতার হোক প্রেমের স্বরূপ একই। রাধার হৃদয়ের যে আর্তি তা মর্ত্যের সকল প্রেমিকের ভাষা-
রাধার কি হৈল অন্তরে ব্যথা
ঘরের বাহিরে দণ্ডে শতবার।
অথবা,
আমার পরাণ যেমতি করিছে
তেমতি হউক সে।
এখানে বিরহ-ব্যাকুলা হৃদয়ের যে বেদনা, তা দেশ-কাল নির্বিশেষে সকল প্রেমিকার অন্তর-বেদনার প্রতিচ্ছবি হয়েই ধরা পড়েছে। কৃষ্ণের বাঁশি শুনে রাধার অনুভূতি-
ওপার হইতে বাজাও বাঁশি এপার হইতে শুনি
অভাগীরা নারী হামহে সাঁতার নাহি জানি।
জসীম উদদীনের সোজন বাদিয়ার ঘাটের দুলিও রাধার মতো জাত-কুলমান ত্যাগ করে নদীর ঘাটে না এসে পারেনি। দুলির বিরহ, মেঘদূত কাব্যের দক্ষের বিরহ, রাধার বিরহ বা অন্য নারী-পুরুষের বিরহের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সবাই সমান –
এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর
এ ভরা ভাদর
শূন্য মন্দির মোর।
বৈষ্ণব পদাবলি জীবাত্মা-পরমাত্মার লীলা হলেও প্রতিভাবান বৈষ্ণব কবিরা আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে রাধা-কৃষ্ণের রূপকের আড়ালে পৃথিবীর মানব-মানবীর সুখ-দুঃখ ও আশা-আকাঙ্ক্ষাকে রূপায়িত করেছিলেন বলেই দেব-মাহাত্ম্যের ঊর্ধ্বে তা মহৎ মানবীয় রসের অমর কীর্তি বলে অভিহিত হয়েছে। আর তা মহৎ সাহিত্যে বলে স্বীকৃতি পেয়েছে।
বিশ্বের আর কোনো দেশের সাহিত্যে মানবীয় রসের আড়ালে কোনো দেব-দেবীকে কেন্দ্র করে এমন বিপুল সাহিত্য রচিত হয়নি।
রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা বৈষ্ণব পদাবলিতে বিধৃত হলেও পদাবলিতে রাধিকাকে মর্ত্যের চিরন্তন প্রেমিকার মতই সাজিয়েছেন। প্রেম ও সৌন্দর্য সম্পর্কে তাদের চিরন্তন রুচির পরিচয় পাওয়া যায়। প্রেমের সাথে সৌন্দর্সবোধের যে একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, তা তাঁরা জানতেন। আর জানতেন রলেই রাধা-কৃষ্ণের পরিচয় পর্ব, তাদের রূপের উপমা, কৈশোর-যৌবনের সন্ধিঃক্ষণের ছবিগুলো অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় লোকজ জীবনের নানা উপাদান দিয়ে স্পষ্ট করে তুলেছেন।
বৈষ্ণব পদাবলির বিভিন্ন পর্যায়গুলো আলোচনা করলে দেখা যায় যে, সবক্ষেত্রেই মানবিকতার চিরকালীন রূপচিত্র ফুটে উঠেছে। বাল্যলীলা, রূপানুরাগ, পূর্বরাগ, অনুরাগ, অভিসার, মিলন, বিরহ, প্রেমবৈচিত্ত্য, ভাব-সম্মিলন প্রার্থনা-প্রতিটি পর্যায়েই আমরা পৃথিবীর শাশ্বতকালের নর-নারীর জীবনকাহিনির প্রতিফলন লক্ষ করে থাকি।
পরিশেষে বলা যায় যে, ধর্মীয় আবরণ ও যুগের খোলস ঝেড়ে ফেললে বৈষ্ণব পদাবলির যে মহিমা তা মানবীয়তায় উজ্জ্বল । পদকর্তারা যা-ই বলুক না কেন, তারা মর্ত্যেরই মানুষ। তাদের হৃদয় অনুভূতি পদাবলির মধ্যে তত্ত্বের আড়ালে প্রকাশ পেয়েছে। তাই, ধর্মীয় প্রভাব থাকলেও তারা যে প্রেমের চিত্র এঁকেছেন তা মর্ত্য-প্রেমেরই প্রতিকৃতি।
তাদের প্রেমকথা সর্বকালের মানবের চিরন্তন গান হয়ে গেছে। বলার ভাঙ্গির মধ্যে তাদের প্রেমকথা মাঝে মাঝে লৌকিক থেকে অলৌকিক পথে পা বাড়ালেও পদাবলির চিরন্তন মানবিক আবেদনকে অস্বীকার করা যায় না।