বাংলা ভাষায় ব্যঞ্জনধ্বনির উচ্চারণধর্মী বিভাজন ও বিশ্লেষণ
ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণিবিন্যাস: উচ্চারণরীতি অনুযায়ী: উচ্চারণরীতি বলতে সাধারণত সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় উচ্চারক প্রত্যঙ্গগুলির মধ্যেকার উল্লম্বা (vertical) সম্পর্ককে বোঝায়। অন্যকথায়, বায়ুপ্রবাহ কীভাবে মুখের মধ্যে বাধাপ্রাপ্ত হয় তা-ই উচ্চারণরীতি। বায়ুপ্রবাহের এই বাধার প্রকৃতি বিচার করে বাগধ্বনিগুলোকে দুভাবে বিচার করা যায়।
এক ফুসফুসীয় বায়ুপ্রবাহ
দুই, অফুসফুসীয় বায়ুপ্রবাহ।
বাংলা ভাষার ধ্বনিগুলো ফুসফুসীয় বায়ুপ্রবাহের দ্বারা উচ্চারিত হয়। অসফুসফুসীয় বায়ুপ্রবাহের সাথে বাংলা ধ্বনির কোন সম্পর্ক নেই। ফুসফুসীয় বায়ুপ্রবাহের দিকে থেকে বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনি কয়েক প্রকার। মুহম্মদ আবদুল হাই এর মতে উচ্চারণরীতি অনুসারে বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনি সাত প্রকার। যেমন স্পর্শ, ঘৃষ্ট, নাসিক্য, তাড়ন, কম্পন, পার্শ্বিক, ও উষ্ম বা শিস।
জীনাত ইমতিয়াজ আলী ধ্বনিবিজ্ঞানের ভূমিকা https://www.rokomari.com/book/7321/dhonibigganer-bhumikaগ্রন্থে উচ্চারণরীতি বিচারে ব্যঞ্জনধ্বনি আট প্রকার বলেছেন ।
যথাঃ-স্পর্শ ধ্বনি, নাসিক্য ধ্বনি, কম্পনজাত ধ্বনি, টোকাজাত বা তাড়নজাত ধ্বনি, ঘর্ষণজাত ধ্বনি, পার্শ্বিক ঘর্ষণজাত ধ্বনি, নৈকট্যমূলক ধ্বনি ও পার্শ্বিক নৈকট্যমূলক ধ্বনি।
বিভিন্ন ধ্বনিবিজ্ঞানীদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও উচ্চারণরীতি অনুযায়ী বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনিকে মোটামুটি নিম্নোক্তভাবে ভাগ করা যায়।
ক) স্পর্শ বা স্পষ্ট ধ্বনি ঃ যে সব ধ্বনি উচ্চারণের সময় বাকপ্রত্যঙ্গের দুটি অঙ্গ পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়ে অথবা স্বরতন্ত্রী দুটো পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়ে শ্বাসবায়ুকে যদি ক্ষণকালের জন্য সম্পূর্ণ বাধ্য দেয় এবং বাধাদানকারী বাকযন্ত্রদুটিকে বাতাস সজোরে আলাদা করে বেরিয়ে যায়, তবে সে-সব ধ্বনিকে স্পর্শ ধ্বনি বলে।
দুটো বাকপ্রত্যঙ্গের সংযোগে এ ধ্বনি উচ্চারিত হয় বলে একে স্পর্শ ধ্বনি বলে।
ক.খ.গ. ঘ. ঠ ড. ঢ, ত, থ, দ, ধ, প, ফ, ব, ভ স্পর্শ ব্যঞ্জন ধ্বনি। ‘
খ) ঘৃষ্ট বা ঘর্ষণজাত ধ্বনি: উচ্চারণরীতির দিক থেকে দৃষ্ট ধ্বনি দ্বৈত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। প্রথমাংশ স্পৃষ্ট ধ্বনির মতো এবং শেষাংশ ঘর্ষণজাত ধ্বনির অনুরূপ। তাহলে বলা যায় যে-সব ধ্বনি উচ্চারণের সময় বাতাস মুখের ভেতর রুদ্ধ হয় এবং বাতাস বের হওয়ার সময় ঘর্ষণের সৃষ্টি হয় সে-সব ধ্বনিকে ঘষ্ট বা ঘর্ষণজাত ধ্বনি বলে।
সংক্ষেপে বলা যায় স্পৃষ্ট ঘর্ষণজাত ঘৃষ্ট ধ্বনি। যেমন চ, ছ, জ, ঝ।
বাংলা প্রমিত উচ্চারণে প্রকৃত ঘৃষ্ট ব্যঞ্জন পাওয়া যায় না বলে মুহম্মদ আবদুল হাই, দানীউল হক, জীনাত ইমতিয়াজ আলী প্রমুখ ধ্বনিবিজ্ঞানীরা এপার বাংলায় খৃষ্ট ধ্বনিকে নিঃসংশয়ে মেনে নিতে পারেন নি। উপভাষায় ও ঢাকার আদিবাসীদের মুখে ঘৃষ্ট উচ্চারণ পাওয়া যায়। তবে পবিত্র সরকার ও গণেশ বসুর মতে চ, ছ, জ, ঝ খৃষ্ট ধ্বনি। পশ্চিমবঙ্গে প্রমিত উচ্চারণে এর স্বীকৃতি রয়েছে।
(যারা সৃষ্ট ধ্বনি স্বীকার করেন না তাদের মতে স্পর্শ ধ্বনি ২০ টি, আর যারা ঘৃষ্ট ধ্বনি স্বাঁকার করেন তাদের মতে স্পর্শ ধ্বনি ১৬টি।)
গ) নাসিক্য ধ্বনি ঃ যে ফানি উচ্চারণের সময় বাতাস মুখের মধ্যে প্রথমে বাধা প্রাপ্ত হয় এবং তারপর নাক দিয়ে অথবা নাক ও মুখ দিয়ে যুগপৎভাবে বেরিয়ে যায়, তাকে নাসিক্য ধ্বনি বলে। এখানে বাতাস নাক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় নাকের গহ্বরের দেওয়ালে ঘর্ষিত হয়ে অনুরণনের সৃষ্টি করে। বাংলায় ঙ ন. ম. নাসিকা জানি।।
( অবশ্য নাসিক্য বর্ণ আছে ঙ, ঞ, ণ, ন, ম, ং)
নাসিকা ধানি উচ্চারণের সময় মুখ ও ঠোঁট বন্ধ থাকে বলে এ ফানিকে ইচ্ছামত প্রলম্বিত করা যায়, সে কারণে একে প্রলম্বিত ধ্বনিও বলা হয়ে থাকে।

ঘ) কম্পনজাত ধ্বনি: যে ধ্বনি উচ্চাররেণর সময় জিভের অগ্রভাগ কম্পিত হয়ে উচ্চারণস্থান স্পর্শ করে তাকে কম্পনজাত ফানি বনে। যেমনর।
৩) তাড়নজাত ধ্বনিঃ যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভ উল্টিয়ে দন্তমূলে একটিমাত্র টোকা দেওয়া হায়, তাকে তাড়নজাত ধ্বনি বলে।
যেমন ড় ড়।
তাড়নজাত ধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভের নিচের অংশ দাঁতের মূলে একটিমাত্র টোকা দিয়ে উচ্চারিত হয়। সে-হিসেবে এ-সব ধ্বনিকে টোকাজাত ধ্বনিও বলে।
চ) পার্শ্বিক ধ্বনি। যে সব ধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভ শ্বাসবায়ুকে বাধা দেয় এবং বাতাস জিভের মাঝখান দিয়ে না গিয়ে জিভের দুপাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়, তাকে পার্শ্বিক ধ্বনি বলে। যেমন ল
ল ধ্বনিকে তরল ধ্বনিও বলা হয়।
ছ) উম্ম বা শিসজাত ধ্বনি: ফুসফুস আগত বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার সময় মুখগহবরের নানা স্থানে বায়ুপথ সংকীর্ণ হয়ে, ঘষা লেগে বা চাপা খেয়ে এক প্রকার শিস ধ্বনির সৃষ্টি হয়। একেই শিসজাত বা উষ্মধ্বনি বলে।
যেমন শ স হ।

ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণিবিন্যাস :কোমল তালুর অবস্থান বিচারে
কোমলতালুর অবস্থা অনুসারে ব্যঞ্জন ধ্বনিকে মৌখিক ও নাসিক্য এই দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যায়।
ক) মৌখিক ধ্বনি: যে-সব ধ্বনি উচ্চারণের সময় কোমল তালু উপরে উঠে গিয়ে নাসিক্যপথ বন্ধ করে দেয় এবং বাতাস কেবল মুখ দিয়ে বের হয়, সে-সব ধ্বনিকে মৌখিক ধ্বনি বলে।
ঙ, ন, ম এই তিনটি নাসিক্য ধ্বনি ছাড়া বাকী সব মূল ব্যঞ্জনধ্বনিগুলো মৌখিক ধ্বনি।
খ) নাসিক্য ধ্বনিঃ যে-সব ধ্বনি উচ্চারণের সময় কোমল তালু নিচে নেমে আসে এবং ফুসফুস আগত বাতাস মুখের ভেতর বা দুই ঠোঁটের সাহায্যে সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে নাসারন্ধ্র দিয়ে বের হয়, সে-সব ধানিকে নাসিকা ফানি বলে। কিছু নাসিকা ফানি উচ্চারণে অবশ্য বাতাস নাক ও মুখ দিয়ে একই সাথে বেরিয়ে যেতে পারে।
বাংলা ঙ, ন, ম নাসিক্য ধ্বনি।
আরও ভালো করে জানতে ভিডিও দেখা যেতে পারে। -https://www.youtube.com/watch?v=tHGFJMMLJm8
স্বরতন্ত্রের অবস্থা অনুসারে ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণিবিন্যাস:
স্বরতন্ত্রের অবস্থা-অনুযায়ী ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণিবিন্যাস করা হয় দুই ভাগে । যেমন-ক) অঘোষ ও খ) ঘোষ
ক) অঘোষ ধ্বনিঃ যে-সব ধ্বনি উচ্চারণের সময় স্বরযন্ত্রের ভেতরকার স্বরতন্ত্রী যথারীতি কেপে ওঠে না, সেগুলোকে অঘোষ ধ্বনি বলে। যেমন প্রতি বর্গের প্রথম ও দ্বিতীয় ধ্বনি এবং শ, স অঘোষ ধ্বনি।
স্বরতন্ত্রীদ্বয় উন্মুক্ত থাকলে স্বররক্তে বা গুটিসও উন্মুক্ত থাকে। ফলে বাতাস বের হওয়ার সময় কোনো রকম বাবার সৃষ্টি হয় না এবং স্বরতন্ত্রে কোনো অনুরণন ঘটে না। অর্থাৎ, স্বরতন্ত্রের অনুরণন ছাড়া উচ্চারিত কানিগুলোই অঘোষ ধ্বনি।।
বর্তমানে ভাষাবিজ্ঞানে অযোধ্বনির পরিচয় দিতে গিয়ে আরো সুক্ষ্মতর পদ্ধতি, বাগযন্ত্রের অবস্থা ও বায়ুপ্রবাহের বৈশিষ্ট্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে দানীউল হক বলেছেন
ফুসফুস থেকে বাতাস বেরিয়ে বায়ুনালী দিয়ে এসে স্বরযন্ত্রস্থিত স্বরতন্ত্রীর মধ্যবর্তী ফাঁক বা পথ (গ্লটিস) দিয়ে মুখবিবরে পৌঁছায়। যদি স্বরতন্ত্রী সরে থাকে (অর্থাৎ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে) তবে বায়ুপ্রবাহ মধ্যবর্তী ফাঁকে বাধাপ্রাপ্ত হয় না এবং তা মুক্তভাবে চলে যায় ্এবং ঐ ফাঁকের উপরের অংশে অর্থাৎ মুখবিবরে স্বরতন্ত্রী না কাঁপিয়ে (অথবা খুবই সামান্য রকম কাঁপিয়ে) এই ভাববে যে ধ্বনি উৎপন্ন হয় তাকে বলে অঘোষ ধ্বনি (unvoiced/voiceless sound)
তাহলে বলা যায় যে, স্বরতন্ত্রের অনুরণন ছাড়া উচ্চারিত বাগধ্বনিই হচ্ছে অঘোষ ধ্বনি।
খ) ঘোষ ধ্বনিঃ যে-সব ধ্বনি উচ্চারণের সময় স্বরযন্ত্রের ভেতরকার স্বরতন্ত্রী রীতিমত কেঁপে ওঠে, সেগুলোকে ঘোষ ফরনি বলে।
যেমন- গ, ঘ, ঙ. জ, ঝ, ড. ঢ . দ, ধ, ন, ব, ভ, ম, র, ল, ড়, ঢ়. হ. রহ (rh), মহ(mh), লহ (lh), নহ(nh)
স্বরতন্ত্র দুটি সংযুক্ত হলে এ দুই বাকপ্রত্যঙ্গের মধ্যে একটি স্বল্প আয়তনের শূন্যস্থানের সৃষ্টি হয়। ফুসফুস-আগত বাতাস তখন স্বরতন্ত্রে অনুরণন সৃষ্টি করে সবেগে বেরিয়ে যায়। এভাবে স্বরতন্ত্রের অনুরণনের ফলে উচ্চারিত ধ্বনিগুলিকেই চিহ্নিত করা হয়েছে ঘোষ ফানি হিসেবে। স্বরধ্বনি মাত্রই ঘোষ। আর বাঞ্জন ধ্বনি ঘোষ ও অঘোষ দুই-ই হয়ে থাকে।
বাতাসের আধিক্য অনুযায়ী ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণিবিন্যাস:
বাতাসের চাপের আধিক্য অনুযায়ী ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণিবিন্যাস দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন অল্পপ্রাণ ও মহাপ্রাণ।
অল্পপ্রাণ ধ্বনিঃ যে-সব ব্যঞ্জন ধ্বনি উচ্চারণের সময় মুখ দিয়ে কম বাতাস বের হয় এবং মুখের বাধার কাঠিন্য তুলনামূলক ভাবে কম, সেগুলিই হচ্ছে অল্পপ্রাণ ফানি।
বাংলা বর্গীয় প্রথম (ক. চ. উ, ত. প), তৃতীয় ধধ্বনি (গ.জ.ড, দ.ব), নাসিকা ধ্বনি (ঙ, ন.ম) তরল ধ্বনি (র, ল), তাড়ন (ড়) ও শিস ধ্বনি (শ, স হলো অল্পপ্রাণ ধ্বনি।
মহাপ্রাণ ধ্বনিঃ প্রাণ শব্দের অর্থ নিঃশ্বাস বা ‘হ-কার জাতীয় ধ্বনি (সুনীতি কুমার)। সে-অর্থে হ-ধ্বনির উচ্চারণ-প্রাধান্যযুক্ত ধ্বনিগুলিই হচ্ছে মহাপ্রাণ ধ্বনি। কিন্তু ভাষাবিজ্ঞানে আরো সূক্ষ্মতর পদ্ধতিতে, মুখের বাধার কাঠিন্য (পবিত্র সরকার ও মুখ দিয়ে নির্গত বাতাসের পরিমাণের (দানীউল হক) আলোকে ধ্বনির মহাপ্রাণতা বিচার করা হয়। তাহলে বলা যায়-
যে-সব ব্যঞ্জন ধ্বনি উচ্চারণের সময় মুখ দিয়ে বেশি বাতাস বের হয় এবং মুখের বাধার কাঠিন্য তুলনামূলক ভাবে বেশি, সেগুলিই হচ্ছে মহাপ্রাণ ধ্বনি। বাংলা বর্গীয় দ্বিতীয় ধানি (খছ ঠঘফ) চতুর্থ ধ্বনি (ঘঝঢধত) তাড়ন (চু), শিস (হ) মহাপ্রাণ ধ্বনি।
বিঃদ্রঃ উচ্চারণরীতি অনুসারে ব্যঞ্জন ধধ্বনির শ্রেণীবিনাস করতে হলে- উচ্চারণরীতি অনুযায়ী ৭টি লিখতে হবে। সেইসাথে কোমল তালুর অবস্থা বিচার, স্বরতন্ত্রীর অবস্থা বিচার ও বাতাসের চাপের আধিক্য-এ তিনটিকেও উচ্চারণ বীবির অন্তর্ভূক্ত করা হয়। তাই এ তিনটি মাপকাঠির আলোকেও আলোচনা করতে হবে।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন,
বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।
অসাধারণ, স্যার!
শুভ কামনা রইল 🙏
প্রিয় স্যার,
আমাদের জন্য আপনার এই নিরলস পরিশ্রম সার্থক হোক।🥰🥰