পৃথিবীর প্রধান প্রধান ভাষাগোষ্ঠীর চমকপ্রদ বর্ণনা
ভাষাগোষ্ঠী : পরিচয়।
পৃথিবীতে হাজার হাজার ভাষা রয়েছে। এসব ভাষার প্রাচীন ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যায় অনেকগুলো ভাষার মধ্যে পূর্বরূপে মিল রয়েছে। অর্থাৎ কোন একটা মূল ভাষা থেকে অনেকগুলো ভাষা সৃষ্টি হয়েছে। পন্ডিতেরাও অনুমান করেন যে আদিকালে মানুষ কোনো এক ভাষায় কথা বলতো। পরিবর্তনের স্্েরাতে ভেসে ভেসে মানুষ মূল ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন ভাষায় কথা বলেছে।
আজকের পৃথিবীতে যে ভাষাগুলো আছে, এছাড়াও অনেক ভাষা হারিয়ে গেছে। আবার যে ভাষাগুলোর সন্ধান পাওয়া গেছে, তার সবকটির লিখিত রূপ নেই, আবার এমন কতগুলো ভাষা আছে যার লিখিত রূপ থাকলেও তাদের উচ্চারণগত ভাষা প্রবাহ নেই। ফলে সেগুলো মৃত ভাষায় পরিণত হয়েছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা এই সব ভাষাকে একটা সূত্রের ভিত্তিতে কয়েকটি গেষ্ঠীতে ভাগ করেছেন। সূত্রটি হলো
“যদি বিভিন্ন ভাষার ক্রমপরিণতির বিভিন্ন স্তরের মধ্যে শব্দকোষে এবং ব্যাকরণে বিশেষ মিল দেখতে পাওয়া যায়, কিংবা যদি দুটি ভাষার আদি রূপের মধ্যে বিশেষ মিল দেখতে পাওয়া যায়, তবে জানতে হবে সেই ভাষাগুলোর পরস্পরের সঙ্গে মৌলিক সর্ম্পক থাকবেই।”
এই সূত্রানুযায়ী পৃথিবীর সব ভাষাকেই যে শ্রেণীবিন্যাস করা গেছে তা নয়, তবে বিজ্ঞানম্মতভাবে শ্রেণীবিন্যাস করতে যে-সব ভাষা তার আওতায় পড়েনি, সেগুলো বাদ দিয়ে পৃথিবীর ভাষাগুলোকে ১২টি ভাগে ভাগ করেছেন।
১) ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী:
বাংলাসহ উত্তর ভারতীয় ভাষাগুলো এবং পশ্চিম সীমায় ইংরেজিসহ ইউরোপের ভাষাসমূহ এই পরিবারের অন্তর্ভূক্ত। ভাষাবিজ্ঞানীগণ এই অঞ্চলের ভাষাগুলোর ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক অধ্যয়নের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, ভারত-ইরান-ইউরোপের সমস্ত ভাষা এক মূল ভাষা থেকে উৎপন্ন হয়েছে। এই মূল ভাষার নাম ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবার। এই মূল ভাষা থেকে নানা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বাংলা, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, গ্রিক, রুশ সুইডিশ, ইটালিয়ান, ইত্যাদি।
ইউরোপীয় এবং ভারতীয় হিন্দি, উড়িয়া, গুজরাটি, অসমিয়া সিন্ধি ইত্যাদি ভাষাগুলো জন্ম নিয়েছে। এই ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষা কেলটিক, ইটালীয়, জার্মানি, আলবেনিয়ান, আর্মেনিয়ান বালটো স্লাভিক, তুখারিয়ান, গ্রিক ও ইন্দো ইরানীয় এই মোট ৯টি শাখায় প্রাচীনকালে বিভক্ত ছিল।

২) সেমিটিক ও হেমিটিক ভাষাগোষ্ঠী:
এশিয়া মহাদেশের পশ্চিমাঞ্চল ও আফ্রিকার উত্তরাংশে বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে এই গোষ্ঠীর বিভিন্ন ভাষারূপ প্রচলিত। সম্প্রতি এই ভাষা পরিবারের নামকরণ করা হয়েছে। ‘আফ্রো-এশীয়’। এই গোষ্ঠীর ভাষাবর্গ নিম্নরূপ ঃ
ক) সেমিটিক- আরবি, হিব্রু, ইথিওপিয়ান, ফিনীসিয় ইত্যাদি।
খ) হেমিটিক- মিশরীয় (কপটিক)
গ) বেরবের- কাবিলে, হেনাগো।
ঘ) কুশীয়- সোমালী, গাল্লা
ঙ) চাঁদ- হৌসা।
বহুকাল আগে প্রচলিত অধুনালুপ্ত ধর্মশাস্ত্রের ভাষা হিসেবে হিব্রু ভাষা আজ আবার ইজরাইলের কথ্যভাষা হিসেবে পুনরুজ্জীবন লাভ করেছে। সেমিটিক শাখায় আরবিই প্রধান। ‘কোরান শরীফ’ আরবি ভাষায় রচিত। খ্রিষ্টপূর্ব চার হাজার বছর আগের মিশরীয় ভাষার নিদর্শন পাওয়া গেছে। প্রাচীন মিশরীয় থেকে উ™ু¢ত একটা ভাষার নাম কপটিক, যা সপ্তদশ শতাব্দিতে এসে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
৩) দ্রাবিড় ভাষা গোষ্ঠী:
উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন স্থানে এবং বর্তমান শ্রীলঙ্কার উত্তরাংশে প্রচলিত বিভিন্ন ভাষা এই পরিবারভূক্ত। যেমন-
ক) দক্ষিণ ভারতে- তামিল, তেলেগু, কানাড়ী এবং মালয়ালম।
খ) বেলুচিস্তান- ব্রাহুই (কথ্য ভাষা)
গ) অন্যান্য- টুডু, কোডাগু, টোডা, কোটা, গোন্ডী, কুই মালপাহাড়ী, মন্ডা ইত্যাদি।
মালপাহাড়ী পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার রাজমহল অঞ্চলে প্রচলিত।
৪) বান্টু ভাষা গোষ্টী/ভাষা পরিবার:
সেমিটিক-হেমেটিক ভাষাগোষ্ঠীর বাইরে সমগ্র আফ্রিকার ভাষাগোষ্ঠীকে বান্টু ভাষা পরিবার নামে অভিহিত করা যায়। এই গোষ্ঠীর অন্তর্গত ভাষাবর্গ নিম্নরূপ-
ক) নিগার কঙ্গো- সোয়াহিলি, কঙ্গো, লুবা, জুলু ইত্যাদি।
খ) চারিনাইল- দিনকা, মাসাই, নুবা, মোরু ইত্যাদি।
গ) খোইসান- বুশম্যান, হটেনটট ইত্যাদি।
৫) তুর্কী-মোঙ্গল-মাঞ্চু ভাষা গোষ্ঠী:
এই গোষ্ঠীর তিনটি শাখা। এই তিনটি শাখাকে অনেকে তিনটি স্বতন্ত্র বংশের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার পক্ষপাতী। এদেরকে অনেকে এক সঙ্গে ‘আলটাইক’ পরিবার বলেছেন। তিনটি শাখার ভাষাবর্গ নিম্নরূপ:
ক) তুর্ক-তাতার: তুর্কি, উজবেক, তাতার, কিরগিজ, আজারবাইজানি।
খ) মোঙ্গল: মোঙ্গলিয়ান ভাষাসমূহ (অবশ্য) বর্তমানে মোঙ্গালিয়াতে সীমাবদ্ধ নেই, ইউরোপ, এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে।
৬) ফিন্নো-উগ্রিকভাষাগোষ্ঠী:
সমগ্র ইউরোপে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলোর মাঝে ফিন্নো-উগ্রীয় ভাষাগোষ্ঠী একটি দ্বীপের মতো। এই পরিবারের ভাষাবর্গ নিম্নরূপ:
ক) হাঙ্গেরীয়- ম্যাজর বা হাঙ্গেরীয়ন ভাষা।
খ) স্ক্যান্ডেনভিয়ার- ল্যাপিস।
গ) ফিনল্যান্ডের- ফিনিশ ভাষা।
ঘ) এন্থেনিয়ার- উস্টোনিয়ান ভাষা।
ঙ) সাইরেবিয়ার- সামোয়াদি।
৭) অস্ট্রিক ভাষাগোষ্ঠী:
পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং মালয় থেকে ইস্ট্রার দ্বীপপুঞ্জ- মাদাগাস্কার এবং হাওয়াই থেকে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত এই গোষ্ঠীর বিভিন্ন ভাষা বিস্তৃত। এর দুটো শাখা।
ক) অস্ট্রো-এশিয়াটিক এ শাখার দুটো উপশাখা মোন-খমের এবং কোল। বর্মা-মালয় ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ মোন-খমের ভাষা প্রচলিত। আর পশ্চিমবঙ্গ, ছোটনাগপুর মাদ্রাজ ও মধ্য প্রদেশে কোল ভাষা প্রচলিত।
খ) অট্রোনেশিয়ান/মালয়-পলিনেশীয়: মালয়, যবদ্বীপীয়, বলিদ্বীপীয় ইত্যাদি প্রধান। ফিলিপাইন, মালয় ও নিউজিল্যান্ড, সামোয়া, তাহিতি, হাওয়াই, ফিজি, প্রভূতি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে এই শাখার ভাষার প্রচুর ব্যবহার রয়েছে।
৮) ককেশীয় ভাষাগোষ্ঠী:
কৃষ্ণসাগর এবং কাস্পিয়ান সাগরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে প্রচলিত ভাষাসমূহ এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এই গোষ্ঠরি ভাষাসমূহ নিম্নরূপ:
ক) উত্তর-ককেশীয়: আবখসিয়ান, চেচেন, কাবার ডিয়ান।
খ) দক্ষিণ- ককেশীয়: জর্জীযান, মিনগ্রেলিয়ান ইত্যাদি।
৯) চীনা তিব্বতি/ভোট-চীনীয় ভাষাগোষ্ঠী:
চৈনিক, থাই আর ভোট-বর্মী নিয়ে এই ভাষাগোষ্ঠী। চীনা ভাষায় খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার বছরের নিদর্শণ পাওয়া গেছে। শ্যামদেশের শ্যামি বা শিয়ামি, আর ভোটবর্মী বা তিব্বতীয় অঞ্চলের বার্মিজ, বর্মি-টিবেটান, গারো থোডো, টিপরাই, মাগা, কাচিন, বোডো ইত্যাদি ভাষা এই গোষ্ঠীর অন্তর্গত।
হিমালয়ের পূর্ব পাদদেশে, বাংলাদেশের উত্তর পূর্ব দিকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বোডো, কাচিন, নাগা প্রভূতিস্থানে বোডো ভাষার সন্ধান পাওয়া যায়।
১০) এসকিমো ভাষাগোষ্ঠী:
উত্তর মেরুর দেশে, গ্রিনল্যান্ত ও অ্যালেউশিয়ান দ্বীপপুঞ্জে এই ভাষা প্রচলিত।
১১) হাইপারবোরীয় ভাষাগোষ্ঠী:
এশিয়ার উত্তর-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলের অল্প সংখ্যক লোকের মধ্যে এই গোষ্ঠীর ভাষা প্রচলিত। এই ভাষাগোষ্ঠীর প্রধান ভাষার নাম চুকচি (ঈযঁশপযবব)।
১২) আদি আমেরিকান/আমেরিকান ভাষাগোষ্ঠী:
উত্তর আমেরিকা মেক্সিকো, ও মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার আদিম অধিবাসীদের ভাষাগত পরিচয় সম্পূর্ণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। তাই আদি আমেরিকান ভাষাগোষ্ঠীর নির্ণয়ে পন্ডিতেরা বহু বিভক্ত। তবে প্রধান ভাষাগুলো নিয়ে আদিম অধিবাসীদের ভাষাকে আটটি শাখায় বিভক্ত করেছেন। তা হলো মিান, সিউয়ান, শোশেনিয়ান, ইরেকিয়ান, মুসকোজিয়ান, আলগঙ্কীয়ান, আথাবাসকান ও নাহুয়াটলান।
https://youtu.be/1NSTBq0qeXQ?si=bPSNoaXaQ9rx_KDh
এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রচলিত বিভিন্ন ভাষার শ্রেণীকরণের চেষ্টা করা হয়েছে তবুও অনেকগুলি ভাষার শ্রেণীকরণ করা যায় নি। যেমন- উত্তর পশ্চিম ভারতের বুরুসাসকি ভাষা। দক্ষিণ ফ্রান্স ও উত্তর স্পেনে প্রচলিত বাস্ক ভাষা। এসব সমস্যা মেনে নিয়েই ভাষাবিজ্ঞানীরা পৃথিবীর সমস্ত ভাষাগুলোকে শ্রেণীবিন্যাস করে একটা শৃঙ্খলা আনতে চেয়েছেন। বেশির ভাগ ভাষাবিজ্ঞানীই পৃথিবীর যাবতীয় ভাষাগুলোকে উক্ত ১২টি ভাষাগোষ্ঠীতে ভাগ করেছেন।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন
বাংলা বিভাগ
সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
সহায়ক গ্রন্থসমূহ:
- ধ্বনিবিজ্ঞানের ভূমিকা- জীনাত ইমতিয়াজ আলী;
- আধুনিক ভাষাতত্ত্ব- আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ;
- ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব- মুহম্মদ আবদুল হাই;
- সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা- রামেশ্বর শ ;
- তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান- হুমায়ুন আজাদ;
- অনলাইন উইকিপিডিয়া;
- অনলাইন বাংলা উইকিপিডিয়া;
- ভাষাবিজ্ঞানের কথা- মহম্মদ দানীউল হক
- ভাষাতত্ত্বের সহজ কথা- ড. মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল;
- ভাষাবিদ্যা পরিচয়- শ্রীপরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য;
- ভাষা সন্দর্শন- কাজী রফিকুল হক;
- আধুনিক ভাষাতত্ত্বের প্রসঙ্গ ও প্রকৃতি- সালিম সাবরিন;
- ভাষাতত্ত্ব – রফিকুল ইসলাম।