ভাষাতত্ত্বের শাখা নিয়ে চমকপ্রদ আলোচনা।

ভাষাতত্ত্বের সংজ্ঞা: ভাষা বিষয়ক যাবতীয় তথ্যানুসন্ধান ও তত্ত্ব উদ্ধার অর্থাৎ ভাষার বৈজ্ঞানিক পঠন-পাঠনই হলো ভাষাতত্ত্ব বা ভাষা বিজ্ঞান। ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, ভাষার আদি রকম বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার ও গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা, ভাষার পরিবর্তনের স্বাভাবিক নিয়ম ও ব্যতিক্রম নিয়মের আলোচনা, ভাষার অন্তর প্রকৃতি ও আঙ্গিকভাবে বৈশিষ্ট্য নিরূপণসহ বিভিন্ন ভাষার মধ্যে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য নির্ণয় করে শ্রেণীবিন্যাস ও সম্পর্ক নির্ণয় ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করে বিশ্লেষণ করাই হলো ভাষাতত্ত্বের উদ্দেশ্য ও বিষয়।
অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর মতে, “ভাষাতত্ত্বের কাজ ভাষার অঙ্গ ব্যবচ্ছেদ ভাষার অবয়ব সংস্থানের শৃঙ্খলা আবিষ্কার এবং ব্যবহার প্রণালী বর্ণনা।”
ভাষার বিজ্ঞানই ভাষাবিজ্ঞান। “ভাষাবিষয়ক বিভিন্ন উপাত্ত সংগ্রহ, ওই উপাত্তের অভ্যন্তর শৃঙ্খলা উদঘাটন এবং ওই শৃঙ্খলা সুস্পষ্ট সূত্রের সাহায্যে প্রকাশ করা ভাষাবিজ্ঞানের কাজ।”
ভাষাতত্ত্বের শাখা
ভাষাতত্ত্বের সংজ্ঞা ও বিষয় লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে ভাষা বিশ্লেষণে ভাষার বিভিন্ন রূপের সামগ্রিকতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়ে থাকে। ভাষার ক্ষুদ্রতম উপাদান থেকে বৃহত্তম উপাদান এবং উপাদানগুলোর সমন্বয় ও অর্থগত দিক বিবেচনা করে ভাষার উপাদানগুলো বিভিন্ন পর্যায় বা ভাষাতত্ত্বের শাখায় বিন্যস্ত করা হয়। ভাষার বিভিন্ন স্তরীয় উপাদানগুলো একই শ্রেণীতে ক্রমবিন্যাসের মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায় বা ভাষাতত্ত্বের শাখায় বিভক্ত করা হয়।
ভাষাতত্ত্ব ভাষার যে উপাদানগুলো নিয়ে আলোচনা করে তার উপর ভিত্তি করে ভাষাতত্ত্বের শাখাগুলো হলো–
(১) ধ্বনিতত্ত্ব (২) রূপমূলতত্ত্ব (৩) বাক্যতত্ত্ব ও (৪) বাগর্থতত্ত্ব।
(১) ধ্বনিতত্ত্ব:
ভাষার ক্ষুদ্রতম উপাদান ধ্বনি। ধ্বনি হচ্ছে ভাষার মৌল উপাদান। ফুসফুস থেকে আগত বাতাস মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় বাক্-প্রত্যঙ্গের সংস্পর্শে স্বর ও ব্যঞ্জনধ্বনি গঠিত হয়। ধ্বনির নিজস্ব কোন অর্থ নেই, কিন্তু অর্থ প্রকাশক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ভাষাতত্ত্বের শাখার এ অংশে ধ্বনির গঠন, বিকৃতি ও পরিবর্তন গত দিক আলোচনা করা হয়। ধ্বনিতত্ত্বে ধ্বনিকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সাহায্যে বিশ্লেষণ করা হয়। এগুলির মধ্যে প্রধান হচ্ছে-
ক . . উচ্চারণীয় ধ্বনিতত্ত্ব: উচ্চারণীয় ধ্বনিতত্ত্বে বাক্ প্রত্যঙ্গের সাহায্যে ধ্বনি কীভাবে গঠিত হয় ও ধ্বনি কীভাবে রিবর্তন লাভ করে সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
খ . . মূল ধ্বনিতত্ত্ব: এখানে ধ্বনি কীভাবে উচ্চারিত হয় সেটি বড় কথা নয়। ভাষার ব্যবহৃত ধ্বনির বৈশিষ্ট্য, ধ্বনির বিন্যাস প্রভৃতি দিকগুলো নানাভাবে বিশ্লেষিত হয়।
গ. . শ্রুতিগত ধ্বনিতত্ত্ব: ধ্বনি গঠিত হয় ফুসফুস থেকে আগত বাতাস মুখের ভিতরে বিভিন্ন বাক্-প্রত্যঙ্গের সংস্পর্শের ফলে। বাতাস মুখবিবরে অবরুদ্ধ হয়ে চাপের সৃষ্টি করে। এর ফলে যে তরঙ্গ সৃষ্টি হয়, তার বিভিন্ন ধারিক পর্যালোচনা শ্রুতিগত ধ্বনিতত্ত্বের অন্তর্গত।
(২) রূপমূলতত্ত্ব: ভাষার ক্ষুদ্রতম উপাদান ধ্বনি এবং ধ্বনি অর্থহীন। এই অর্থহীন ধ্বনি সমন্বয়ে গঠিত হয় রূপমূল। রূপমূল হলো অর্থদ্যোতক ক্ষদ্রতম ভাষাতাত্ত্বিক উপাদান। রূপমূলগুলো বিভিন্ন বস্তু ও ভাবের নির্দেশক রূপে সেই বস্তু ও ভাবের প্রতীকী অর্থ প্রকাশ করে। রূপমূলগুলো ক্ষুদ্রতম ভাষাতাত্ত্বিক উপাদান হলেও এর সাথে প্রত্যয়, বিভক্তি যুক্ত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে।
গঠন অনুসারে রূপমূল বিভিন্ন প্রকার হতে পারে। যেমন-
ক) . মুক্ত রূপমূল: যে রূপমূলের সাথে কোন প্রত্যয়, বিভক্তি যুক্ত থাকে না, সেগুলো মুক্ত রূপমূল।
খ) . বদ্ধ রূপমূল: প্রত্যয়, বিভক্তি সাধারণত বদ্ধ রূপমূল রূপে বিবেচিত এভাবে চিহ্নিত করার কারণগুলো হলোÑ মুক্ত রূপমূল স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হতে পারে, কিন্তু বদ্ধ রূপমূলগুলো মুক্ত রূপমূলের সাথে সংযুক্তি ছাড়া নিজের অর্থ প্রকাশে সক্ষম নয়। যেমন- ‘ক্যালেন্ডার’ মুক্ত রূপমূল এবং ‘গুলো’ বদ্ধরূপমূল।
গ) . বৃহত্তর রূপমূল: মুক্ত রূপমূলের সাথে মুক্ত রূপমূল বা বদ্ধ রূপমূল সংযুক্ত হয়ে বৃহত্তর রূপমূল গঠিত হয়ে থাকে। যেমনÑ ‘ডাক’ ও ‘বাক্স’ মুক্ত রূপমূল মিলে গঠিত বৃহত্তর রূপমূল ‘ডাকবাক্স’।
রূপমূলগুলোর অর্থ প্রকাশের দিক বিচার করে এদেরকে আবার ভাগ করা যায়। যেমন-
(১) সাধিত রূপমূল ঃ যে রূপমূল ব্যাকরণগত কোন ক্রিয়া নির্দেশের পরিবর্তে প্রত্যয়, বিভক্তির সাহায্যে পদান্তর বিন্যাস নির্দেশ করে, তাকে সাধিত রূপমূল বলে। যেমন- দরিদ্র (বিশেষণ), দারিদ্র্য (বিশেষ্য)।
(২) সম্প্রসারিত রূপমূল ঃ যে রূপমূল ব্যাকরণগত বিভিন্ন প্রক্রিয়া নির্দেশ করে, তাকে সম্প্রসারিত রূপমূল বলে। যেমন- ছেলে, ছেলেরা, ছেলেদের।
(৩) বাক্যতত্ত্ব: ধ্বনির সমন্বয়ে রূপমূল আর রূপমূলের সমন্বয়ে বাক্য গঠিত হয়। ভাষাতাত্ত্বিক উপাদানের মধ্যে বাক্য সবচেয়ে বৃহত্তর। রূপমূলের সাহায্যে বস্তুর বিশেষ অর্থ প্রকাশিত হয় আর বাক্যের সাহায্যে বস্তু বা ভাবের বিস্তৃততর অর্থ প্রকাশিত হয়ে থাকে। রূপমূলগুলো পরস্পর সন্নিবেশের সাহায্যে কীভাবে বাক্য গঠিত হয় তা ভাষাতত্ত্বের শাখার এ অংশে আলোচিত হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।
রূপমূলগুলো পরস্পর সম্পর্কিত হয়ে কীভাবে বাক্য গঠন করে তার বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয় গঠনমূলক বাক্যতত্ত্ব নামক ভাষাতত্ত্বের শাখায়।
চমস্কি কর্তৃক রূপান্তরমূলক সৃষ্টিশীল পদ্ধতি প্রয়োগে বিভিন্ন সূত্রের সাহায্যে বাক্যতত্ত্ব বিশ্লেষণ করা হয় রূপান্তরমূলক বা বিশ্লেষণমূলক বাক্যতত্ত্বে।
এছাড়াও গণিত, দর্শন ও মনস্তত্ত্বের বিভিন্ন সূত্র প্রয়োগের সাহায্যেও বাক্যগত কাঠামো বিশ্লেষণ করা হয়।
(৪) বাগর্থতত্ত্ব: বাগর্থতত্ত্ব ভাষাতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ শাখা। রূপমূল ও বাক্যতত্ত্ব বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বাগর্থতত্ত্বের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রূপমূল ও বাক্যের অর্থগত দিক বিভিন্ন পর্যায়ে বাগর্থতত্ত্বে প্রকাশিত হয়। বাগর্থতত্ত্বের একাধিক শাখা রয়েছে।
প্রথম পর্যায়ে দুটি ভাগে বিভক্ত। যথা-
ক) . লাক্ষণিক তত্ত্ব ও খ ) বাগর্থতত্ত্ব।
ক) . লাক্ষণিক তত্ত্ব: এখানে মানব বা কৃত্রিম ভাষার পর্যালোচনাই প্রধান। এর তিনটি শাখা-
(১) বাক্য গঠনবিধি বাক্য গঠণ বিধিতে বাক্যের অর্থ গৌণ, বিভিন্ন চিহ্নের আলোচনাই মূখ্য।
(২) বাগর্থতত্ত্ব বাগর্থতত্ত্বে অর্থের দিক থেকে ভাষাতাত্ত্বিক চিহ্নের আলোচনা অন্তর্ভূক্ত।
(৩) প্রয়োগবাদ। প্রয়োগবাদে ব্যবহৃত ভাষার বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
অন্যদিকে ভাষাতত্ত্বে ব্যবহৃত বাগর্থতত্ত্বে রূপমূলের অর্থবিন্যাস ও অর্থ পরিবর্তনের কারণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
ভাষা বিশ্লেষণে ভাষার বিভিন্ন উপাদানের সামগ্রিক রূপের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। তাই ভাষার উপাদানের ভিত্তিতে উপযুক্ত চারটি শাখাই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। উক্ত উপাদানভিত্তিক শাখাগুলো তুলনামূলক, ঐতিহাসিক বর্ণনামূলকসহ বিভিন্ন পদ্ধতির সাহায্যে বিচার বিশ্লেষণ করা হয়।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর