ভাষাবিজ্ঞানের শাখা/ধারা/উপধারার পরিচয় দাও।
ভাষাবিজ্ঞানের শ্রেণি বিভাগ
ভাষার বিজ্ঞানই ভাষাবিজ্ঞান। ভাষা সম্পর্কিত বিভিন্ন উপাও সংগ্রহ, উপাত্তের ভিতরের শৃঙ্খলা আবিষ্কার এবং শৃঙ্খলা সূত্রের সাহায্যে প্রকাশ করা ভাষাবিজ্ঞানের কাজ।
ভাষাবিজ্ঞানের সংজ্ঞা: ভাষাবিজ্ঞানীরা ভাষার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নানা কৌশল অবলম্বন করেছেন। এই কৌশল বা উপায় পদ্ধতি নামে পরিচিত। বিভিন্ন পদ্ধতির জন্যই এর বিভিন্ন শাখার বিকাশ ঘটেছে। এ প্রসেঙ্গ হুমাযুন আজাদ বলেছেন-
যে বিশেষ এক এক ধরনের উপাও ও পদ্ধতির উপর জোর দিলে বিকাশ ঘটে ভাষাবিজ্ঞানের এক এক শাখার।
মুহম্মদ দানীউল হক বলেছেন
বিভিন্ন দৃষ্টিকোনের ব্যাখ্যা ও পদ্ধতির দিক থেকে ভাষার শৃঙ্খলাকে বিভিন্নভাবে উদঘাটনের চেষ্টা হয়েছে। ভাষাবিজ্ঞানীদের বিশেষ অনুসন্ধিৎসু (ঋড়পঁং) এবং আগ্রগের উপর ভিত্তি করেই ভাষা শৃঙ্খলার বিভিন্ন শাখা গড়ে উঠেছে।
প্রথাগতভাবে এর বিভিন্ন শাখা হিসেবে ধ্বনিতত্ত্ব, রূপমূলতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব ও বাগর্থতত্ত্বকে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এগুলো আসলে ভাষাবিজ্ঞানের বিভিন্ন ‘বিধা’ (অংঢ়বপঃ) বা আলোচ্য বিষয়। ভাষাবিজ্ঞানের সব শাখাতেই এ বিষয়গুলো আলোচিত হয়।
বিভিন্ন দৃষ্টিকোণের ব্যাখ্যা ও পদ্ধতির দিক থেকে ভাষাবিজ্ঞানের শাখা/ধারাগুলো হলোÑ
১) তাত্ত্বিক বা সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ২) বর্ণনামূলক ভাষা বিজ্ঞান ৩) ঐতিহাসিক বা কালুনক্রমিক ভাষাবিজ্ঞান ৪) তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান ৫) কালকেন্দ্রিক ভাষাবিজ্ঞান ৬) বৈপরীত্যসূচক ভাষাবিজ্ঞান ৭) সাংগঠনিক ভাষাবিজ্ঞান ৮) রূপান্তরমূলক সৃষ্টিশীল ব্যাকরণ।
এভাবে বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগে বা শাখায় বিভক্ত হওয়ার মূলকথা হলোÑ
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের উপাত্ত ও পদ্ধতির উপর জোর দেওয়ার কারণে ভাষাবিজ্ঞান বিকশিত হয়েছে বিশেষ কোনো একভাবে বা অন্যভাবে ; ফলে প্রাধান্য ঘটেছে বিশেষ ধরনের উপাত্ত ও পদ্ধতি নির্ভর তত্ত্ব এবং বিভিন্ন শৃঙ্খলা পদ্ধতির। [ভাষাবিজ্ঞানের কথা ; দানীউল হক]
ভাষাবিজ্ঞানের সাথে অন্যান্য শাস্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্কের কারণে তত্ত্বীয় বা প্রায়োগিক উভয়ে দিক থেকে জন্ম নিয়েছে ভাষাবিজ্ঞানের নতুনতর শাখার। যেমন-
- ১) নৃ-তাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞান
- ২) জীবতাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞান
- ৩) শিক্ষাকমূলক ভাষাবিজ্ঞান
- ৪) জাতিগত ভাষাবিজ্ঞান
- ৫) দার্শনিক ভাষাবিজ্ঞান
- ৬) স্নায়ুতন্ত্রীয় ভাষাবিজ্ঞান
- ৭) গাণিতিক ভাষাবিজ্ঞান
- ৮) মনো ভাষাবিজ্ঞান
- ৯) সমাজ ভাষাবিজ্ঞান
- ১০) প্রায়োগিক ভাষাবিজ্ঞান
- ১১) কম্পটরীয় ভাষাবিজ্ঞান
- ১২) পরিসংখ্যানমূলক ভাষাবিজ্ঞান ইত্যাদি।
আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ এগুলোকে ভাষাবিজ্ঞানের সহোদর শাখা হিসেবে অভিহিত করেছেন। ভাষাবিজ্ঞানীরা অবশ্য উপর্যুক্ত শাখা ছাড়াও আরো নতুনতর এবং বহু শৃঙ্খলাঘটিত শাখায় ঈঙ্গিত দিয়েছেন।
এবার প্রধান প্রধান ভাষাবিজ্ঞানের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হলো-
১) সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান: বিভিন্ন মানব ভাষা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে ভাষার সংগঠন ও ভূমিকা সম্পর্কে তত্ত্ব রচনা করা তাত্ত্বিক বা সাধারণ ভাষাবিজ্ঞানের কাজ। এ শাখা কিছু তাত্ত্বিক ধারণা ও ক্যাটেগরি, যার সাহায্যে বিশেষ বিশেষ ভাষা বর্ণনা, বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করা যায়।
২) বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান: বর্ণনামূলক পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে এ শাখার জন্ম। কোনো কালে প্রচলিত কোনো একটি ভাষার বিচার-বিশ্লেষণ এবং রীতি প্রয়োগ সম্পর্কিত ব্যাখ্যা এ ধারার উপজীব্য। এর আলোচনা কৌশল বৈজ্ঞানিক হিসেবে সকলে কাছে গৃহীত হয়েছে। তাই ভাষাবিজ্ঞানের শাখার মধ্যে এটি প্রাধান্য লাভ করে। এটি সাংগঠনিক ভাষাবিজ্ঞান বা কালকেন্দ্রিক ভাষাবিজ্ঞান নামেও পরিচিত।
৩) ঐতিহাসিক বা কালানুক্রমিক ভাষাবিজ্ঞান: ভাষার পরিবর্তনশীলতা লক্ষ্য করে ভাষাবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ভাষার ঐতিহাসিক বিকাশের প্রক্রিয়া উদঘাটন করেছিলেন। সেই সাথে ভাষা পরিবর্তন সম্পর্কিত সার্বজনীন তত্ত্বও আবিষ্কার করেছিলেন। গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান। বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের সাথে এ শাখার তুলনা করতে গিয়ে ভাষাবিজ্ঞানী ফের্দিন দ্যা সোস্যুর এ ভাষাবিজ্ঞানকে কালনুক্রমিক ভাষাবিজ্ঞান নামে অভিহিত করেন। এ শাখাটি ভাষার কালানুক্রমিক পরিবর্তনের সূত্র উদঘাটন করে।
৪) তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান ঃ দুটো ভাষার মধ্যে সম্পর্ক উদঘাটনের পদ্ধতিকে তুলনামূলক পদ্ধতি বলে। বিভিন্ন ভাষার মধ্যে সম্পর্ক উদঘাটন বা অভিন্ন বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করতে গিয়েই তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের সৃষ্টি। দূর বা নিকট সম্পর্কিত অপর ভাষার সাথেও তার সম্পর্ক নির্ণয় করা এ ভাষাবিজ্ঞানের কাজ। হাজার হাজার ভাষার মধ্যে সম্পর্কিত ভাষাগুলোকে একত্রে করে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছে এ শাখাটি।
৫) কালকেন্দ্রিক ভাষাবিজ্ঞান ঃ এটিকে বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান বলা চলে। কোনো একটি বিশেষ ভাষার বিশেষ কালে সীমাবদ্ধরূপ অবলম্বন করে যে আলোচনা সাধিত হয়, তাকে বলা হয় সমকালিক বা ঐককালিক বা কালকেন্দ্রিক ভাষাবিজ্ঞান। ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের সাথে বর্ণনমূলক ভাষাবিজ্ঞানের মৌলিক পার্থক্য নির্দেশ করতে গিয়ে বিখ্যাত সুইস ভাষাবিজ্ঞানী ফার্দিন্যন্দ দ্য সোস্যু বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানকে কালকেন্দ্রিক ভাষাবিজ্ঞান নামে অভিহিত করেছিলেন।
৬) বৈপরীত্যসূচক ভাষাবিজ্ঞান: যে ভাষাবিজ্ঞানের উদ্দেশ্য হলো একাধিক ভাষার মধ্যে পার্থক্যগুলো প্রধানরূপে তুলে ধরা হয়, তাকে বৈপরীত্যসূচক ভাষাবিজ্ঞান বলে।
৭) সাংগঠনিক ভাষাবিজ্ঞান: বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানই ক্রমবিকশিত হতে হতে বিভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সাংগঠনিক ভাষাবিজ্ঞান বা আঙ্গিকবাদ। এ ধারার ভাষাবিজ্ঞানীরা ভাষার উপাদান তথা উপাঙ্গের উপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। জীবন্ত দেহের মতই
ধ্বনি, শব্দ, বাক্য ভাষা-দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মাত্র। এ তত্ত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলোÑ অর্থ একেবারেই উপেক্ষিত। মারিও পেই, ব্লুমফিল্ড ও স্যাপীর প্রমূখ ভাষাবিজ্ঞানীরা বলেনÑ
“ভাষা স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থা, যেখানে এর পরস্পর নির্ভর প্রত্যঙ্গ বা উপাদান অর্থাৎ শব্দ বা পদ সমগ্র বাক্যের সঙ্গে সম্পর্ক সূত্রে যথেষ্ট সক্রিয়।”
৮) রূপান্তরমূলক সৃষ্টিশীল ব্যাকরণ ঃ ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসে সর্বশেষ ধারা হলো রূপান্তরমূলক সৃষ্টিশীল ব্যাকরণ। এর আবির্ভাব অভিনব ও বিপ্লবাত্মক। এ ধারাটি পুরোপুরি বিজ্ঞানসম্মত। ষাটের দশকে নোয়াম চমস্কি গঠন সর্বস্বতা বা আঙ্গিকবাদ বা সাংগঠনিক তত্ত্বের বিরোধিতা করে নতুন তত্ত্ব প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে- গঠন সর্বস্বতা বা আঙ্গিকবাদকে কখনো মেনে নেওয়া যায় না। কেননা দেহের যেমন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থাকলেই চলে না, প্রাণ সত্ত্বার প্রয়োজন হয় ; তেমনি ভাষার অঙ্গ বা উপাদান থাকলেই হয় না, ভাষার প্রাণসত্ত্বার প্রয়োজন। অর্থাৎ শুধু ধ্বনি, শব্দ, বাক্য নয়, অর্থের বিশ্লেষণও প্রয়োজন।
তিনি মনে করেন যে, মানুষ তার নিজের বোধবুদ্ধির দ্বারা তার সীমাবদ্ধ জ্ঞানের দ্বারা ভাষার মূলনীতির যথাযথ প্রয়োগের দ্বারা সৃজনী শক্তির সাহায্যে পরিবেশ অনুযায়ী বাক্য তৈরি করে থাকে। এ শাখাটি আসলে বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানীদের সাধনার সর্বশেষ সংযোজন।
পরিশেষে বলা যায় যে, ভাষার শৃঙ্খলা আবিষ্কার করতে গিয়ে বিভিন্ন মনীষীদের নানান দৃষ্টিভঙ্গি ও বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগের ফলেই ভাষাবিজ্ঞানে নানান ধারা বা শাখার জন্ম। প্রতিটি শাখার আলোচনার বিষয় হলোÑ ভাষা এবং ভাষার বিভিন্ন স্তর। পদ্ধতিগত ভিন্নতা থাকলেও সব শাখার উদ্দেশ্য ভাষার শৃঙ্খলা আবিষ্কার। তাই তাদের মধ্যে যেমন বিরোধ রয়েছে। তেমনি একে অপরের পরিপূরকও বটে।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন
বাংলা বিভাগ
সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
- ধ্বনিবিজ্ঞানের ভূমিকা- জীনাত ইমতিয়াজ আলী;
- আধুনিক ভাষাতত্ত্ব- আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ;
- ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব- মুহম্মদ আবদুল হাই;
- সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা- রামেশ্বর শ ;
- তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান- হুমায়ুন আজাদ;
- অনলাইন উইকিপিডিয়া;
- অনলাইন বাংলা উইকিপিডিয়া;
- ভাষাবিজ্ঞানের কথা- মহম্মদ দানীউল হক
- ভাষাতত্ত্বের সহজ কথা- ড. মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল;
- ভাষাবিদ্যা পরিচয়- শ্রীপরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য;
- ভাষা সন্দর্শন- কাজী রফিকুল হক;
- আধুনিক ভাষাতত্ত্বের প্রসঙ্গ ও প্রকৃতি- সালিম সাবরিন;
- ভাষাতত্ত্ব – রফিকুল ইসলাম।